অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৩৭
তানিশা সুলতানা
কতদিন পরে তালুকদার বাড়িতে পা রাখলো নুপুর ঠিক জানা নেই। তবে নিজের কাছে মনে হচ্ছে বহু যুগ পরে পুনরায় আসতে পারলো নিজ বাড়িতে। হ্যাঁ এই বাড়িটা নুপুরের নিজের মনে হয়। তবে এই বাড়ির একটা মানুষও তার নয়। বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি থামে। কালো রঙের এই গাড়ি বাংলাদেশে দুটো রয়েছে। একটা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে অভি চৌধুরীর এবং আরেকটা রানিং প্রধানমন্ত্রীর ছেলে নওয়ান তালুকদারের।
দারোয়ান তাড়াহুড়ো করে গেট খুলে দেয়। এবং চিন্তিত স্বরে সুধায়
“ছোট সাহেব আপনি ঠিক আছেন?
নওয়ান জবাব দেয় না। তবে গাড়ির পেছনের সিট থেকে বল্টু বলে ওঠে
“ভাই একটুও ঠিক নেই। কয়দিন হয়ে গেলো সে ঘুমায় না। এখন জম্পেশ একটা ঘুম দিলে একদম চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
দারোয়ান একটু হাসার চেষ্টা করে নিজ স্থানে চলে যায়। মজনু তালুকদার নিজ কক্ষের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলো। নওয়ানের গাড়িটা বাড়িতে ঢুকতেই কপাল কুঁচকায় তিনি। হাত মুষ্টি বদ্ধ করে ফেলে। ইতোমধ্যে তার কানে খবর পৌঁছে গিয়েছে যে
“ওই মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরছে তার নাতি”
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন এই নিউজটা ভাইরাল। ফেসবুক বা টিভি অন করলেই দেখা যাচ্ছে তালুকদার বংশের একমাত্র রাজপুত্র একটা মেয়েকে কোলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরোচ্ছে। এবং এই মেয়েটা সেই মেয়ে যার বাবা হাজার হাজার লোকের সামনে নায়েব তালুকদারকে খারাপ মানুষ বলেছিলো।
আর ভাবনার মাঝে খেয়াল করে নওয়ান গাড়ির দরজা খুলে বেরুলো। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে তার ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট নেই। যে ছেলেটা এক সেকেন্ডের জন্য সিগারেট ছাড়া বাঁচে না সে এখন সিগারেট খাচ্ছে না।
মজনু তালুকদারের রাগটা তরতর করে বেড়ে যায়। এবং তখনই আবার রাগ কমে কেননা নওয়ন তালুকদার পকেট থেকে বেনসন সিগারেটের প্যাকেট বের করে এবং ঠোঁটের ভাজে গুঁজে নেয়। তাতে দীর্ঘটান দিয়ে নাক মুখে ধোঁয়া উড়ায়। তারপর গাড়ির পেছনের দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দেয় নুপুরের দিকে। শান্ত স্বরে বলে
“এসো চাঁদ।
গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করেছিলো নুপুর। নওয়ানের ডাকে চোখ খুলে। শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় লোকটার মুখপানে। এবং নিজের হাতখানা লোকটার হাতের উপর রাখে।
” হেঁটে যেতে পারবে?
নুপুর মাথা নারিয়ে সম্মতি জানায়। এবং নওয়ানের হাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকে তালুকদার বাড়ির সদর দরজার দিকে।
কাজের মেয়ে কমলা ‘নুপুর কে দেখে খুশি হয়ে বলে ওঠে
“ম্যাডাম আপনি আসছেন?
প্রতিত্তোরে নূপুর শুধু একটু হাসে। দরজা খোলাই ছিলো। তাই আর কলিং বেল চাপতে হয় না।
সবিতা তালুকদার ড্রয়িং রুমে বসে কারো সঙ্গে কথা বলছিলো ফোনে। নওয়ান আর নুপুর কে একসঙ্গে দেখে কলখানা কাটে। এবং ওদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে
” ওই ম্যা** তুই আমার বাড়িতে আবার কেন আসছিস? তোর সাহস হলো কি করে
বাকিটা শেষ করার আগেই নওয়ান গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে
“মাইন্ড ইউওর ল্যাঙ্গুয়েজ।
আর একটা বাজে কথা বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। মাইন্ড ইট।
সবিতা শুকনো ঢোক গিয়ে দু পা পিছিয়ে যায়। মিরা এবং আমিনা কিচেনে ছিলো। নওয়ানের কণ্ঠস্বর পেয়ে এগিয়ে আসে। আমিনা নুপুরকে দেখে খুশি হলেও মীরার চোখমুখে অন্ধকার নেমে আসে। বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে। তার মেয়ে কি সহ্য করতে পারবে? এতদিন সে চাইতো নওয়ান নামক অভিশাপটা তার মেয়ের জীবন থেকে চলে যাক। কিন্তু এই মুহূর্তে চাচ্ছে
“সবকিছু মিথ্যে হোক। এই ছেলেটা তার মেয়ের হয়ে যাক। কয়েকটা দিন তার মেয়ে শান্তিতে বাঁচুক।
তার চাওয়াটা বোধহয় একটু স্বার্থপরের মতোই হলো। কিন্তু কি করবে? নিজের মেয়ের যন্ত্রণা সে আর দেখতে পারছে না। স্নেহার মুখের দিকে তাকালে বুক ফেটে কান্না পায় তার। ইচ্ছে করে বুকের মাঝে চেপে ধরে বলতে
“সোনা রে জীবনটা ছোট। এভাবে নিজেকে শেষ করে দিস না। সবটা ভুলে নতুন করে শুরু কর। তোকে থাকতে হবে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মীরা। পূণরায় কিচেনে যেতে নেয়। ছোট্ট আয়াশ বল নিয়ে খেলা করছিলো। তখনই মীরা কে দেখে আবদার জুড়ে দেয়
” মামনি নুডলস খেতে চাই।
মীরা ছোটে নুডলস বানাতে।
আমিনা নওয়ানের পেছন পেছন তার কক্ষের পানে ছুটছে। আহা কতদিন পরে তার কলিজার টুকরোকে দেখতে পেলো।
সবটাই আগের মত রয়েছে। সেই অগোছালো কক্ষ, সিগারেটের গন্ধ, বেডশীটটা পর্যন্ত চেঞ্জ করা হয়নি। ড্রেসিং টেবিলের উপরে হেয়ার ক্লিপ হেয়ার অয়েল সহ নুপুরের প্রয়োজনীয় সবকিছু রাখা। ঠিক যেমন ভাবে সে রেখে গিয়েছিলো।
সবটা দেখে কান্না পায় নুপুরের। ইচ্ছে করে চিৎকার করে কাঁদতে। নওয়ান তালুকদারের পা জড়িয়ে ধরে বলতে
“আমায় আর দুঃখ দিয়েন না নওয়ান। আমি যে দুঃখ সইতে পারি না। বাবা ভাই আমাকে মোমের পুতুলের মত বড় করেছে। আমার চোখের এক ফোটা পানি মাটিতে পড়তে দেয় নি।
কিন্তু আপনি আমার জীবনে আসার পর থেকে প্রতিনিয়ত কাঁদিয়েছেন।
আমাকে আর কাঁদায়েন না।
নওয়ান বিছানায় শুইয়ে দেয় নুপুরকে। আলমারি থেকে নতুন কম্বল বের করে এনে ওর গায়ে জড়িয়ে দেয়।
তখনই আমিনা কক্ষে ঢোকে। প্রথমেই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
নওয়ান মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে
” এ’ম ওকে আম্মু।
আম্মু কাঁদে না। আম্মু শান্ত হও। আম্মু
নওয়ান কি বলছে সেসব আমিনার কানে ঢোকে না। সে শুধু শুনতে পায় নওয়ান চার বার তাকে আম্মু বলে ডাকলো। কলিজা ঠান্ডা হয়। আরো বার বার শুনতে ইচ্ছে করে। আম্মু খুব ছোট একটা শব্দ। কিন্তু একটা মায়ের কাছে এটাই পৃথিবীর সব থেকে বড় এবং ভারী শব্দ। একটা দিন এই শব্দটা না শুনলে হৃদয় খানা ছটফট করতে থাকে। পৃথিবীর কোন সুখ কে আর সুখ মনে হয় না।
“আম্মু আমি বলছি তো ঠিক আছি।
এবারে আমিনা শান্ত হয়। নাক টেনে কান্না থামায়। নওয়ান এর বুক থেকে মাথা তুলে মুখ পানে তাকায়। ছেলেটা তার বিশাল লম্বা। একদম বাপের মত হয়েছে। দুহাত বাড়িয়ে ছেলের গালে হাত রাখে। ঠোঁটের ভাজে থাকা সিগারেট কেড়ে নিয়ে ফেলে দেয়। এবং বড্ড অভিমান নিয়ে বলে
“একটাবারও মাকে কল করে জানানো যায় না যে আমি ঠিক আছি? বাজান তুমি বুঝতে পারো না তোমার মায়ের তুমি ছাড়া কেউ নেই?
নওয়ান মায়ের কপালে চুমু খায়।
পুনরায় তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে বলে
“আমার কিচ্ছু হবে না আম্মু। সব সময় ঠিক থাকবো।
প্রতিত্তরে আমিনা কিছু বলে না। কিছু মুহূর্ত ছেলেকে অনুভব করে। এবং তখনই স্নেহা দৌড়ে নওয়ানের কক্ষে ঢোকে। হাতে এখনো ক্যানেলো লাগানো। সেন্স ফিরতেই সে জানতে পারে নওয়ান নুপুর কে নিয়ে বাড়িতে চলে এসেছে। এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে স্নেহাও বাড়ির দিকে ছোটে।
“চাঁদ তুমি ঠিক আছো?
হাঁপাতে হাঁপাতে নুপুর কে প্রশ্ন করে স্নেহা।
নওয়ান চোয়াল শক্ত করে ফেলে। নিজের থেকে মাকে সরিয়ে এগিয়ে আসে স্নেহার দিকে। এবং কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঠাস করে থাপ্পর মারে স্নেহা কে। থাপ্পরটা এত জোরে মারা হয়েছে যে টাল সামলাতে না পেরে দুপা পিছিয়ে যায়। মুহুর্তেই ঠোঁট কেটে র/ক্ত গড়াতে থাকে।
এতেও যেনো শান্ত হলো না নওয়ান। চিৎকার করে বলে ওঠে।
“তোকে আমি বলেছিলাম চাঁদের খেয়াল রাখতে। জানোয়ার তুই কোথায় ছিলি? ওই অভি কিভাবে আমার চাঁদকে র/ক্ত দিলো?
আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা তুই।
না হলে আই উইল কিল ইউ
আমিনা এগিয়ে এসে স্নেহাকে ধরে। কিছু বলতে চাইলে নওয়ান আবারও বলে
” আম্মু ওকে যেতো বলো।
স্নেহা আর এক মিনিটও সেখানে দাঁড়ায় না। দৌড়ে নিজ কক্ষে চলে যায়। পেছন পেছন আমিনাও চলে যায়।
নুপুর বলে
“ভালোবাসা বুঝতে শিখুন নওয়ান। স্নেহা আপুর মুখ পানে তাকিয়ে দেখেছেন? সে কতোটা অসুস্থ।
জবাবে নওয়ান বলে
” তুমি কখনো আমার মুখ পানে তাকিয়ে দেখেছো আমি কতোটা অসুস্থ?
ভালোবাসা বুঝতে শিখো চাঁদ।
“আমি তো ভালোবাসা খুঁজে পাই না। শুধু হিংস্রতা দেখতে পাই।
নওয়ান আর কিছু বলে না। কাবাড থেকে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।
অতি যত্নে চোখের পানি লুকিয়ে ফেলে স্নেহা। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা র/ক্ত হাতের উল্টো পিঠে মুছে নেয়। অভিযোগ নেই কোনো। অভিমানও হচ্ছে না। রাগ শব্দটাকে তো সে চেনেই না।
শুধু আফসোস হচ্ছে।
” ভালো নাইবা বাসলো
একটু তো মায়া করতে পারতো।
আমজাদ চৌধুরী বড্ড ক্ষুব্ধ ছেলের উপর। নির্বাচনে তিনি স্বেচ্ছায় আসন ছেড়ে দিয়েছে। তর্ক বিতর্কে জড়ায় নি। এত বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নির্বাচনে তাকে হারানোর ক্ষমতা কারো ছিল না। এবারেও নায়েব তালুকদার তাকে হারাতে পারতো না। কিন্তু ছেলে প্রচন্ড জেদ নিয়ে তাকে বলেছে
“বাবা বাদ দাও রাজনীতি। এসব আমার ভালো লাগছে না আর”
ঠিক আছে তিনি বাদ দিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু এখন ছেলেকেও পাওয়া যাচ্ছে না। যখন যেখানে ইচ্ছে চলে যাচ্ছে তাকে না জানিয়ে।
এই যে দীর্ঘ পাঁচ দিন পরে আজকে বাসায় ফিরলো মহারাজ। আমজাদ চৌধুরী রাগান্বিত হয়ে অভির কক্ষে ঢোকে। ছেলের ক্লান্ত মুখশ্রী দেখে রাগ কিছুটা কমে যায়।
তবুও গম্ভীর স্বরে বলে
“কোথায় ছিলে তুমি?
এক বার জানানোর প্রয়োজন বোধ করো না কোথায় আছো কি করছো?
অভি টলমল নয়নে বাবার মুখপানে তাকায়। এবং মুহূর্তেই বাবার কোমর জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠে।
বলে
“বাবা আমি নুপুরকে ছাড়া থাকতে পারবো না। নুপুর এনে দাও বাবা।
আমজাদ কি বলবে বুঝতে পারে না। ইতিমধ্যেই সে নুপুর সম্পর্কে জেনেছে।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব (২৪+২৫)
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১ (১ম অংশ+ শেষ অংশ)
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২২
-
অন্তরালে আগুন গল্পের লিংক