অন্তরালে_আগুন
পর্ব: ৩৪
তানিশা সুলতানা
বাংলাদেশের অন্যতম একটি সুন্দর জায়গা হচ্ছে রাঙ্গামাটি। এই শহরটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ঘন জঙ্গল এবং জনসংখ্যা কম তাই শান্তিময় একটি শহর। বিভিন্ন শহরের ভ্রমণ প্রিয় মানুষ গুলো একটুখানি রিফ্রেশ এবং শান্তির জন্য এই শহরটিকেই বেছে নেয়।
রাঙ্গামাটি জেলার জিপতলী গ্রামটা নায়েব তালুকদারের। এখানে রয়েছে তার সমস্ত পাপের ঠিকানা। নারী পাচারের অন্যতম একটি জায়গা হচ্ছে জিবতলী।
ঘন জঙ্গলের মাঝখানে রয়েছে ছোট্ট একটি কুটির। বাঁশ বেত এবং মাটি দিয়ে তৈরি এই কুটিরটি বাইরে থেকে দেখতে ভীষণ সুন্দর। বিভিন্ন পর্যটকরা এখানে আসে এই কুটির দেখতে। তবে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। এমনকি ভেতরে প্রবেশ করার কোনো দরজা জানলা কিছুই দেওয়া নেই। কুটিরে স্পর্শ করলে কারেন্ট এর শক লাগে। ভীষণ মাথা খাটিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। কয়েকজন সাহসী এবং বেপরোয়া পর্যটক কুটিরের ভেতরে কি আছে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে এসেছিলো এটি ভাঙতে। তবে ফলাফল শূন্য। যে বস্তু দিয়েই কুটিরে স্পর্শ করে সে বস্তুই কারেন্ট হয়ে যায়। শেষমেষ ঘোষণা করা হলো “জীপতলির গভীর জঙ্গলে অবস্থিত এই কুটির ভুতুড়ে কুটির। এখানে প্রবেশ করা অসম্ভব। এই সৌন্দর্য শুধু বাইরে থেকেই উপভোগ করা যাবে”
অথচ কেউ জানলো না এই কুটিরের ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার মেয়ের ভবিষ্যৎ। এখানেই সমাপ্তি টানা হয় হাজার মেয়ের জীবনের গল্প।
এই কুটির এর ভেতরে কি হচ্ছে সেটা জানা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ভেতরের আওয়াজ বাইরে আসতে পারবে না এমনই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এবং বাইরের আলো বাতাস ও ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না।
কতদিন হয়ে গেলো নুপুর এখানে বন্দি আছে জানা নেই। তার সাথে আরো অনেক মেয়ে ছিলো। সবাইকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নুপুর অনুভব করেছে, তাদের চিৎকার শুনেছে, কিন্তু বাধা দিতে পারে নি। আটকাতে পারে নি মেয়ে গুলোকে।
আনু এক্কেবারে নেতিয়ে পড়েছে। কথা বলা কিংবা তাকানোর শক্তি টুকু তার নেই। বৃষ্টি কেও কাল রাতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মেয়েটা বেশ চটপটে। কত গল্প করেছে নুপুরের সঙ্গে। কত স্বপ্ন তার, কত ইচ্ছে।
বাড়ি ফিরতে চায়, বাবাকে দেখতে চায়, আবার পড়ালেখা করতে চায়, জীবনে অনেক বড় হতে চায়,।
জানে তার স্বপ্নগুলো কোনদিনও পূরণ করা সম্ভব নয়। এখানেই তার জীবনের সমাপ্তি হবে। তবুও মনের খায়েশ মেটাতে বলছে।
বৃষ্টির শেষ কথা গুলো নুপুরের কানে বাজছে
“আমি তো শুধু ভালোবেসে ছিলাম।
তার তো কোনো ক্ষতি করিনি।
তাহলে সে আমার এত বড় ক্ষতি কেনো করলো?
আজকে রবিবার। চীন থেকে দুজন ভদ্রলোক এসেছেন জীবতলী গ্রামে। কুটিরের ভেতরে থাকা প্রায় ৫০ জন মেয়ের মাঝ থেকে তাদের যে কয়টা মেয়েকে পছন্দ হবে মূল্য পরিশোধ করে সেই কটা মেয়েকে চিনে নিয়ে যাবে।
ইয়াং চু এবং জিও নামের লোক দুটোর সঙ্গে এসেছে মজনু তালুকদার। সুট বুট পরিহিত চীনা যুবকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনিও শুট বুট পরিধান করেছেন। চোখে লাগিয়েছে দামি সানগ্লাস।
জীবতলী গ্রামের ঘন জঙ্গলের মাঝখানে গড়ে তোলা কুটিরে প্রবেশ করার একটাই পথ। সেটা হচ্ছে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু করে মাটির তলা দিয়ে সরু এক খানা রাস্তা।
বড্ড বুদ্ধি খাটিয়ে মজনু তালুকদার এই সুরঙ্গ পথ তৈরি করেছিলেন। কতো পর্যটক এখান দিয়ে যায় আসে তবে কেউই এই রাস্তার ঠিকানা খুঁজে পাইনি।
আজকেও চিনা যুবকদের নিয়ে সেই সরু রাস্তা দিয়েই প্রবেশ করে কুটিরে।
চারিদিক থেকে লাইট জ্বলে উঠে। অন্ধকার কুটির মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে ওঠে। নুপুরের চোখ দুটো সবেই বন্ধ হয়ে আসছিলো। চোখে মুখে আলো পড়তেই পিটপিট করে চোখ খুলে। বাকি মেয়েগুলো আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। মজনু তালুকদারের দেহ রক্ষী টগবগে চারজন সু পুরুষ ধমকে সকলকে চুপ করায়।
কত ঘন্টা পরে আলো দেখলো জানা নেই নুপুরের। চারিপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখে সবগুলো নতুন মেয়ে। যাদের সাথে এখানে এসেছিলো তাদের মধ্য থেকে কেউ নেই শুধু আনু ছাড়া।
নুপুর ঠিক আন্দাজ করে উঠতে পারেনা কেনো তাদের দুজনকে সরিয়ে নিচ্ছে না?
কেনই বা পাচার করে দিচ্ছে না?
এর পেছনে কি বড়সড়ো কোনো কারণ আছে? আরো বড় কোন গেম খেলতে চলেছে তালুকদার বাড়ির জানোয়ার গুলো।
মজনু নুপুর এবং আনুর পানে তাকিয়ে বাঁকা হাসে। চিনা যুবকদের ইশারা করে বলে
“এই দুটো মেয়েকে দেখতে পারো।
তারা ভীষণ সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়।
চুং এবং জিও লোভাতুল দৃষ্টিতে নুপুর এবং আনুকে দেখতে থাকে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এই মেয়ে দুটোকে তারা রাখবে এবং বাকিদের দিয়ে দিবে তাদের বসকে।
সেই হিসেবে সবগুলো মেয়ের বিনিময়ে কত টাকা দিতে হবে সেই হিসাবটা চায় মজনু তালুকদারের কাছে।
“১০ কোটি।
৫০ জন মেয়ের জন্য দশ কোটি চাই আমার।।
চিনা যুবক দুটো তাতে রাজি হয়ে যায়। এবং অতি দ্রুত মেয়েদের পাসপোর্ট ঠিক করতে বলে। পাসপোর্ট এর টাকাও তারা দিবে।
এখানে উপস্থিত ৩০ জন মেয়ের পাসপোর্ট অলরেডি বানানো হয়ে গেছে। বাকি ১৯ জনের পাসপোর্ট দু-একদিনের মধ্যেই হাতে চলে আসবে। বাকি আছে শুধু নুপুর।
এই মেয়েকে নিয়ে কি করবে সেটা নিয়েই চিন্তিত হয়ে ওঠে মজনু তালুকদার।
যেভাবেই হোক অতি দ্রুত এই মেয়ের পাসপোর্ট তৈরি করতে হবে।
মজনু তালুকদার নুপুরের সামনে আসে। ওর দিকে খানিকটা ঝুঁকে খিক খিক করে হেসে বলে ওঠে
“500 মেয়েকে বিদেশে পাচার করেছি। গোটা বাংলাদেশ আমার তৈরি দশখানা পতিতালয় রয়েছে। তোর মতো উড়তে থাকা মেয়েদের এভাবেই দমাই আমি।
কি বলেছিলি? চ্যালেন্জ করেছিলি
আমার রাজত্ব ধ্বংস করবি?
দেখ আমি তোকে ধ্বংস করে দিলাম। এবার বিদেশে গিয়ে বিদেশীদের খাঁট কাঁপাবি আর আমার কথা স্মরণ করবি।
তোর গল্প এখানেই শেষ
চলে যেতে নেয় মজনু তালুকদার। নুপুর দুর্বল স্বরে বলে ওঠে
“আমার গল্প শেষ নয়।
আমাকে বাঁচাতে আসবে আপনার নাতী। নওয়ান তালুকদার আসবে। তাকে আসতে হবে আমার কাছে। আসতেই হবে।
প্রচন্ড পরিমাণ রাগান্বিত হয় মজনু তালুকদার। নুপুরের চুলের মুঠি ধরে পাশে থাকা বাঁশের সঙ্গে বারি দেয় কয়েকবার।
মাথা ফেটে র/ক্ত গড়াতে থাকে। হিসহিসিয়ে বলে
“আসবে না দাদুভাই। তাকে আসতে দিবো না।
অবচেতন আনু এসবের কিছুই জানে না,
মজনু তালুকদার চলে যায়। নুপুর তখনও বিরবির করে বলে চলেছে
“আসবে নওয়ান।
তার চাঁদকে বাঁচাতে তাকে যে আসতেই হবে।
নওয়ান তালুকদারের অনেকগুলো রূপের সঙ্গে পরিচিত পুলিশ এবং বল্টু। তাকে হাসতে দেখেছে, বদমাইশি করতে দেখেছে, গান গাইতে দেখেছে, গম্ভীর স্বরেও দেখেছে, এমনকি ভয়ংকর রাগান্বিত অবস্থায়ও দেখেছে। দেখে নি শুধু বিধ্বস্ত চিন্তিত এবং এলোমেলো রূপে। আজকে সেটাও দেখে নিলো।
গাড়ি ছুটে চলেছে অজানা গন্তব্যে। পাক্কা ১৬ ঘন্টা নওয়ানকে সাথে নিয়ে ঘুরছে পুলিশ। কারো পেটে এক ফোটা পানিও পড়ে নি। নওয়ানকে কিছু খেতে বলার সাহস হচ্ছে না কারো। আর যেখানে বস না খেয়ে আছে সেখানে তারাও খাওয়ার আগ্রহ পাচ্ছে না।
সিটে মাথা ঠেকিয়ে, ঠোঁটের ভাজে সিগারেট পুরে আনমনে গান গেয়ে ওঠে নাওয়ান
“এই পাঁজর ভরা ভালোবাসা দুহাত ভরে নাও
এই আধো আলো আধো ছায়া দুচোখ ভরে নাও
এই আমায় কিছু নাই বা দিলে
এই আমায় কিছু নাইবা দিলে নিজের করে নাও
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
শুকনো নদীতে ডিঙি ভাসিয়েছি মোহনার কাছে এসে
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
দুমুঠো আদর ভিক্ষে চেয়েছি দরিদ্র এই বেশে।
চোখের কুর্নিশ বেয়ে দু ফোটা অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ে। পুলিশরা মুগ্ধ হয় নওয়ানের গানে। যেনো এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিল সকলে। গান শেষ হতেই নওয়ান ক্লান্ত স্বরে বলে ওঠে
” আমার চাঁদের কিছু হলে গোটা দুনিয়া ধ্বংস করে দিবো আমি।
গোটা গাড়ি সিগারেটের ছোট ছোট অংশে ভরে গিয়েছে। কত প্যাকেট সিগারেট ফুরিয়েছে জানা নেই কারোর।
পুলিশরা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তাহলে ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছে
“নুপুর নামক রমণীটিকে না পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। নওয়ান তালুকদার ভূমিকম্প বয়ে আনবে।
“রাঙামাটি যাব
হঠাৎ করেই বলে ওঠে নাওয়ান। পুলিশরা পাল্টা প্রশ্ন করার সাহস পায় না। গাড়ি ঘুরিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
আট ঘন্টা জার্নি করে রাঙ্গামাটি ঝুলন্ত ব্রিজের ওপরে এসে থেমে যায় পুলিশের গাড়ি। ইতিমধ্যে নওয়ান তালুকদারের মন বলছে এখানেই তার চাঁদ রয়েছে।
গাড়ি থামতেই নওয়ান নেমে পড়ে। আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে পরিবেশটা দেখে নেয়। এখানে সে নতুন আসে নি। আর আগেও বেশ কয়েকবার এসেছে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা তার বড়ই পছন্দের। তবে আজকে ভালো লাগছে না। চোখ দুটো বড্ড ক্লান্ত। কেউ একজনকে দেখার তৃষ্ণায় কাতর হয়ে আছে।
এতদিন নওয়ানের বেশ কনফিউশন ছিলো।
সে ভাবতো নুপুর তার ভালোলাগা, জেদ।
মূলত জেদের বসেই তার মাঝে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। তবে এই ২৪ ঘন্টায় অনুভব করেছে চাঁদ শুধু তার ভালো লাগা এবং জেদ নয়।
ভালোবাসা।
স্বীকার করতে একটু আপত্তি নেই যে “নওয়ান তালুকদার ভালোবাসে নুপুর শিকদার নামক মেয়েটিকে। অসম্ভব ভালোবাসে”
এ জীবন শেষ হয়ে গেলেও এই ভালোবাসা শেষ হবে না।
বড্ড মায়াবী ওই মেয়েটা। তার চোখ দুটোর পানে তাকালে ঘায়েল হয়ে যায় নওয়ান।
তবে ওই মায়াবীকে ভাঙতে বেশ ভালো লাগে নওয়ানের। কি দারুন তেজ কণ্ঠস্বরে। গমগম সুরে কথা বললে মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত ভয়কে জয় করে ফেলেছে।
বুক চিরে দীর্ঘ শেষ বেরিয়ে আসে। আসমান পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে
“ইয়া আল্লাহ ভালো রেখো তাকে
যার অনুপস্থিতিতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।
এবং এটাও প্রতিজ্ঞা করে ফেলে
” একবার তোমায় ফিরে পেলে
যতদিন বেঁচে থাকবো। এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল করবো না।
“স্যার আমাদের ফোর্স গোটা চট্টগ্রাম ঘিরে ফেলেছে। কোথাও কোন ক্লু পাওয়া যায়নি। আই থিংক আপনার
বাকিটা শেষ করার আগেই নওয়ান বলে ওঠে
” আছে
এখানেই আছে আমার চাঁদ। অনুভব করতে পারছি আমি। দেখুন আমার বুকটা কাঁপছে। চাঁদ আশেপাশে থাকলেই শুধু এমনটা হয়।
বুকের বা পাশে হাত দিয়ে বলে নওয়ান। এসিপি আশিক বিশ্বাস করেন না। ভাবে চিন্তা থেকে আবোল তাবোল বলছে। তবে অবিশ্বাসের কথা উল্লেখ করার সাহস পায় না। বিরক্ত ভঙ্গিমায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
বল্টু এদিক ওদিক ছুটেছুটি করছে। আসলে কোন রাস্তা দিয়ে হাঁটলে নুপুরের সন্ধান মিলবে? তার ভাইয়ের শুকনো মুখ একটুও ভালো লাগছে না।ভাবিকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে কেঁদেছে ভাই।
যেভাবেই হোক খুঁজে পেতে হবে।
নিজ কক্ষের এক কোনায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে স্নেহা। ২৪ ঘণ্টা হবে এক ফোঁটা পানিও স্পর্শ করে নি। ক্ষণে ক্ষণে ভয়ে সিঁটিয়ে উঠছে। আমিনা বেগম কয়েকবার এসেছিলো খাওয়ার জন্য ডাকতে। তবে নিতে পারে নি। মীরা খাবার নিয়ে এসেছিলো। জোর করেও খাওয়াতে পারে নি।
গোটা তালুকদার বাড়ি স্নেহার জন্য চিন্তিত। না খেয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে তো।
সবিতা তালুকদার ইতিমধ্যেই অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে দিয়েছে। তার মতে নূপুরের জন্য এসব কিছু হচ্ছে। ওই মেয়েটার জন্যই স্নেহা না খেয়ে আছে।
নীরব এতদিন বাসায় ছিল না। জরুরী কিছু কাজে শহরে গিয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। কিছু মুহূর্ত আগেই তালুকদার বাড়িতে পা রাখলো। এবং জানতে পারে।
বোনের সাথে কথা বলার জন্য স্নেহার রুমে যায় নিরব।
দেখতে পায় ফ্লোরে হাঁটু মোড়ে বসে খাটের উপর মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।
নিরব গিয়ে ওর পাশে বসে। হাত রাখে মাথায়। কারো স্পর্শে চোখ খুলে স্নেহা।
ভাইকে দেখে বড্ড কাতর স্বরে জিজ্ঞেস করে
“নওয়ান ঠিক আছে? সে নুপুরকে খুঁজে পেয়েছে?
নিরব উত্তর দিতে পারে না। পারবে কিভাবে? নওয়ান তার কল ধরছে না।
“কার জন্য এত চিন্তা তোর? কার জন্য এই কান্না?
তুই কেনো বুঝতে পারিস না? ভাইয়া আর তোর নেই।
স্নেহা তাচ্ছিল্য হেসে জবাব দেয়
” সে কখনোই আমার ছিলো না। আমি সব সময় তাকে আমার মনে করে এসেছি।
বোনের কথা শুনে নিরবের চোখ দুটো টলমল করে ওঠে। বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে। ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছে না পাওয়ার যন্ত্রণা।
“তুই তো ঠিক ছিলিস স্নেহা। কি সুন্দর হাসি খুশি। ভাইয়ের বিয়েটাও মেনে নিয়েছিলি। তাহলে আজকেই মন খারাপ কেনো?
“নুপুরকে পাওয়া যাচ্ছে না। উনি পাগলের মতো এদিক ওদিক খুঁজে চলেছে। এখন পর্যন্ত কিছু খায় নি সিগারেট ছাড়া। ২৪ ঘন্টা হয়ে গেলো আমি তার মুখটা দেখি না।।
পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি ভাইয়া। শান্তি পাচ্ছি না। তাকে দেখার তৃষ্ণায় বুক কাঁপছে।।
একটু থেমে আবার বলে
“তাকে অন্য কারো পাশে মেনে নিতে পারি আমি। কিন্তু তাকে না দেখে থাকতে পারি না।
আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। কলিজা কাঁপতে থাকে।
কি করবো ভাইয়া?
কিভাবে মুক্তি মিলবে এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে?
কি করলে শান্তি পাবো?
আমায় একটু শান্তি দাও না ভাইয়া।
আমি যে ম/রে যাচ্ছি।
কিছু বলার মত ভাষা খুঁজে পায় না নিরব। স্নেহার মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে নিজেও কেঁদে ওঠে নিঃশব্দে। বড্ড আফসোসের স্বরে বলে
“নিয়তি তোর সাথে এমন বাজে খেলাটা না খেললেও পারতো বোন।
অভি নেহাল এবং সিফাত পৌঁছে গিয়েছে চট্টগ্রাম। গোটা শহরে স্পেশাল পুলিশ ফোর্স লাগানো হয়েছিল। তাদের মাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে মজনু তালুকদার চীনা দুজন যুবক নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছে।
তাদের লাস্ট লোকেশন ট্র্যাক করা গেছে জীবতলি ঘন জঙ্গলে সেই ছোট্ট কুটিরে। হেলিকপ্টার এসে কুটির সামনে থামে। অভি নেহাল তাড়াহুড়ো করে হেলিকপ্টার থেকে নামে।
কুটিরের দরজা পাওয়ার উদ্দেশ্যে চারিপাশে ছোঁটা ছুটি করতে থাকে। কয়েকবার স্পর্শও করে কুটিরের দেয়ালে। তবে শক খেয়ে থেমে যায়।
মাথায় হাত বসে পড়ে সেখানেই। নেহাল উচ্চস্বরে কেঁদে ফেলে।
শেষ আশাটাও শেষ হয়ে গেল। নুপুরকে খুঁজে পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা রইল না।
সিফাত গুগলে সার্চ করে জানার চেষ্টা করছে কিভাবে কুটির ভেতরে প্রবেশ করা যাবে? তবে ফলাফল শূন্য। কোনো পথই খোলা নেই।
নওয়ান সিগারেট টানতে টানতে কুটিরের সামনে চলে আসে। তার পেছন পেছন ছুটছে বল্টু এবং পুলিশ। কতটা পথ এভাবে দৌড়ে এসেছে তাদের খেয়াল নেই। তবে হাত-পা ভীষণ বাজে ভাবে ছিলে গেছে। জঙ্গলে বিভিন্ন কাটাযুক্ত গাছ রয়েছে। ভয়ংকর সাপও থাকে এমনটাও জেনেছে এখানকার স্থানীয় দের কাছ থেকে। তবে নওয়ান কোনো কিছুরই ধার ধারেনি। আনমনে গিয়ে এসেছে।
নেহাল এবং অভিকে খেয়ালই করলো না। দুই ভ্রু আড়াআড়ি ভাবে কুঁচকে তাকিয়ে থাকে কুটির টির পানে।
তার বুকের কাঁপন বেড়েই চলেছে। হাত পা অবশ হয়ে আসছে। গাল শুকিয়ে কাঠ কাট হয়ে গেছে। তবুও পানি খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করছে না। এটা পানির তৃষ্ণা নয়। একটা ভয়ংকর নারীকে দেখার তৃষ্ণা। সেই নারীটির খুব কাছাকাছি চলে এসেছে বেশ বুঝতে পারছে নওয়ান। অনুভব করছে পরিচিত শরীরের ঘ্রাণ।
এই কুটিরেই আছে নুপুর। আছেই
” এসিপি এটার মধ্যেই আমার চাঁদ রয়েছে। ভাঙো এটা।
আঙ্গুল দিয়ে কুটিরের দেখিয়ে বলে নওয়ান। অভি এবং নেহাল তাকায় নওয়ানের পানে। তাকে একদম এখানে আশা করে নি।
পুলিশ বিশ্বাস করে না নওয়ানের কথা। চোখ মুখ কুঁচকে একে অপরের মুখ পানে চাওয়া চাওয়ি করে। সিফাতকে এখানে দেখে সবগুলো পুনিশ অবাক হলেও কিছু বলে না।
সিফাত জোর দিয়ে পুলিশ ফোর্সকে আদেশ দেয় কুটির ভেঙে ফেলার। সকলে আদেশ পালন করার জন্য কুটির ভাঙতে উদ্ধৃত হয়। তবে স্পর্শ করার পরেই বুঝতে পারে এটি ভাঙ্গা অসম্ভব।
নওয়ান এদিক ওদিক দৃষ্টি ফিরিয়ে কিছু একটা চিন্তা করে।
তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল করে।
আধ ঘন্টার মধ্যে জিভতলীর এই জঙ্গল ভরে মানুষে। ৩০০ মানুষ লেগে পড়ে কুটির ভাঙতে। প্রথমে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। তারপর সেটা ভাঙার কাজে লেগে পড়ে।
৩০০ জন মানুষের ছোট্ট একটা কুটির ভাঙতে ২ ঘণ্টার মতো সময় লেগে যায়। একটা পুলিশ এলোপাথাড়ি লাথি মেরে বাঁশ এবং বেতের তৈরি বেড়া ভাঙতে যায়।
নওয়ান চিৎকার করে বলে ওঠে
“আমার চাঁদ ব্যথা পাবে।
সাবধান
পুলিশ আর লাথি মারে না। হাত দিয়ে বাঁশসহ বেড়াটা সরায়। তখনই দেখা যায়
নুপুর এবং আনু অবচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। দুজনের শরীরে র/ক্ত লেগে আছে। নওয়ানের কলিজা কেঁপে ওঠে। ঠোঁটের ভাজ থেকে সিগারেট ফেলে দৌড়ে যায় নুপুরের কাছে।
ওর র/ক্তা/ক্ত মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে বিচলিত স্বরে বলে
“এএএই চাঁদ
কি-কি হয়েছে তোমার?
চোখ খুলো। দেখো আমি এসেছি
ততক্ষণে নেহাল এবং অভিও চলে এসেছে।
নুপুর পিটপিট করে চোখ খুলে। মাথা যন্ত্রণায় ঠিকঠাক তাকাতে পারছে না। তবুও অস্পষ্ট নওয়ানের মুখ খানা দেখতে পায়।
এবং ভাঙা স্বরে বলে
“আমি দুঃখ খুঁজতে গিয়ে দেখলাম।
আপনি ছাড়া আমার জীবনে কোনো দুঃখই নাই।
বড্ড অদ্ভুত শোনালো কথা খানা। এখানেই থেমে নেই। নুপুর আবার বলে ওঠে
“ছোঁবেন না আমায় নওয়ান।।
আপনি পাপী
আপনার ছোঁয়া আমার কাছে বিষাক্ত লাগে।
নেহাল ছো মেরে নওয়ানের কোল থেকে নুপুরকে নিয়ে নেয়। অভি ততক্ষণে নিজের শার্ট খুলে ফেলেছে। সেটা দিয়ে বেঁধে দেয় নুপুরের মাথা।
আনুর গালে হাত দিয়ে মৃদু স্বরে ডাকতে থাকে সিফাত।
” আনু চোখ খুলো।
চোখ খুলে আনু। শুকনো ঠোঁটে এক ফালি হাসি ফুটে ওঠে। কাঁপা-কাঁপি হাতটা এগিয়ে স্পর্শ করে সিফাতের গাল।
“কথা রেখেছেন সিফাত।
আপনি এসেছেন।
তবে এবার আসতে দেরি করে ফেলেছেন।
আমার যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
এ জনমে আমাদের আর দেখা হবে না।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৬+২৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৫
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৫(৫.১+৫.২)
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৩