গল্প: #অতীত। চতুর্থ পর্ব
অন্ধকারটা শুধু আলো না থাকার অন্ধকার ছিল না।
এটা ছিল এমন এক অন্ধকার—যেটা মনে হয় আলোকে গিলে খায়….
কারেন্ট চলে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড কেউ নড়ল না।
শুধু বৃষ্টির শব্দ। আর বজ্রপাতের পর ভেজা বাতাসের একটা ভারী গন্ধ।
তারপর-একটা পুরোনো লোহার তালা খোলার শব্দ।
মিতুর বুকের ভেতর কিছু একটা ধসে পড়ল।
— এটা… বেজমেন্টের দরজা, না?
রাহিবের গলা কাঁপছে।
হাজী আবদুল করিম কিছু বললেন না।
ব্জ্রপাতের মৃদু আলোয় তার চোখে…এই প্রথম তভয় দেখা গেল।
ইকবাল সাহেব অন্ধকারে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন—
— দরজাটা কেউ আজ খুলছে না, রাহিব,ওটা… এতদিন ধরেই খোলা ছিল,শুধু কেউ গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল করেনি।
বজ্রপাতের আলোয় মুহূর্তের জন্য ঘরটা ঝলকে উঠল।
আর সেই আলোতে—মিতু দেখল, ড্রয়িংরুমের কোণে আরেকটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
একজন না,দুজন, নাহ তৃতীয়জন… ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিক থেকে উঠে আসছে।
— এখানে… আর কারা আছে?মিতুর প্রশ্নটা যেন বাতাস কাঁপিয়ে দিল।
একজন পুরুষ কণ্ঠ, নিচু স্বরে—
— যাদের কথা তোমার বাবা-মা কখনো বলতে পারেনি।
মিতুর মাথার ভেতর ঝাকুনি দিয়ে উঠলো…
— আমার বাবা-মা…?
ইকবাল সাহেব ফোনের টর্চ টা অন করলো,
মিতু দেখলো,হাজী সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।এই চোখ বন্ধ করা মানে একটাই—তিনি জানেন।
বেজমেন্টের দিক থেকে একটা ভারী গন্ধ আসতে শুরু করল।
পুরোনো কাগজ, জং ধরা লোহা, আর… পোড়া কাঠের গন্ধ, কেমন যেনো ভোটকা গন্ধ নাকে লেগে গেলো…
এই গন্ধটা মিতু চেনে।
এই গন্ধটা সে পনেরো বছর ধরে ভুলতে পারেনি।
— আমি নিচে যাব,রাহিব হঠাৎ বলে উঠল।
— না!
মিতু তার হাত চেপে ধরল।
— ওটা তোমার জন্য না।
ইকবাল সাহেব তাকালেন মিতুর দিকে।
একটু অবাক চোখে, তারপর মৃদু হেসে বললেন,— খুব দেরিতে হলেও, তুমি বুঝতে শুরু করেছ।
হাজী আবদুল করিম হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে সিঁড়ির দিকে ঘোরালেন।
— নামো…গলা ভাঙা, কিন্তু আদেশের মতো।
— আজ আর পালানোর জায়গা নেই।
বেজমেন্টের সিড়ি গুলো সরু।দেয়ালের রঙ খসে পড়ছে।প্রতিটা ধাপে ধাপে নামার সময় মনে হচ্ছে—বাড়িটা যেন নিশ্বাস নিচ্ছে।
নিচে নামতেই চোখে পড়ে—একটা বড় টেবিল।
তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুরোনো ফাইল, ক্যাসেট, একটা রিভলভার, আর কিছু পোড়া কাগজ।
একটা দেয়ালে বড় করে লেখা—“১৫/০৯/২০০৯”
মিতুর পা কাঁপতে থাকে।— এই তারিখটা…তার কণ্ঠ প্রায় শোনা যায় না।
ইকবাল সাহেব উত্তর দেন—
— তোমার বাড়ির আ-গুন লাগার তারিখ।
রাহিব দেয়ালে হেলান দেয়।
— বাবা… এটা কী?
হাজী সাহেব চোখ তুলে তাকান।
— আমার বিচার।
একজন ছায়া সামনে আসে।এই লোকটা এতোক্ষণ কথা বলেনি,চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো।
চেহারাটা অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
— তুমি…তো.. মিতুর চোখ বড় হয়ে যায়।
— হ্যাঁ,— তোমার বাবার ছোট ভাই।
-ছোট কাকা…!
লোকটা হাসে ও না। কাঁদেও না,তার চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই সে কি ভাবছে….
— আমরা সবাই এখানে কিছু না কিছু হারিয়েছি।
— কিন্তু তোমার বাবা… আর হাজী সাহেব……কথাটা শেষ না করতেই….।
রাহিব চিৎকার করে ওঠে—
— আমার বাবা একা না!
ইকবাল সাহেব শান্ত গলায় বলেন—
— একা না, কিন্তু পুরো প্লানের মাস্টারমাইন্ড ছিল।
তিনি একটা ক্যাসেট প্লেয়ার তুলে নেন।
— এটা শোনো,পুরোনো রেকর্ডিং।
হাজী আবদুল করিমের কণ্ঠ—যুবক, শক্ত, নির্দয়।
“আ-গুন লাগবে। সব শেষ করতে, কোথাও যেনো কো প্রমাণ না থাকে…..
মিতুর শরীর বরফ হয়ে যায়।
তারপর আরেকটা কণ্ঠ—“ভিতরে একটা বাচ্চা ও আছে।”
তারপর হাজী সাহেবের কণ্ঠ—“বাচ্চার ভাগ্যে যেটা লিখা আছে তা-ই হবে,তোমরা তোমাদের কাজ করো।
ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ হয়, ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতার কুয়াশা ঘনি ভত হয়….।
মিতু ধীরে তাকায় হাজী সাহেবের দিকে।
— আপনি… জানতেন আমি ভেতরে ছিলাম।
হাজী সাহেব চোখ নামিয়ে নেন….
— হ্যাঁ!
এই একটা শব্দে ,মিতুর বুকের ভেতর কিছু ভেঙে দিয়ে যায়….
— তাহলে আপনি আমাকে কেন বাঁচালেন?
এই প্রশ্নটার জন্যই সবাই অপেক্ষা করছিল।
হাজী সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন।
তারপর বলতে শুরু করেন—
— যখন আমি তোমাকে দেখি…ওই নি:ষ্পাপ চোখ দুটো আমার বুকের ভীতরে তীরের মতো বিদ্ধ হয়…কেউ যেনো ফিসফিস করে কানে কানে বলছিলো… বাচ্চাটা মরলে তোর নরকেও জায়গা হবে না….।
মিতুর চোখ বেয়ে জল নামে….
— দেরি হয়ে গেছে,ইকবাল সাহেব ধীরে এগিয়ে আসেন।
— না— দেরি হয়নি।
-হাজি সাহেব একটা ফাইল খুলে মেঝেতে ছড়িয়ে দেন।
ভেতরে ছবি,লা-শের ছবি,পোড়া দে-হ,আর কিছু মানুষ—যারা সরকারি নথিতে মৃ-ত।
— এরা সবাই বেঁচে আছে— আর আজ রাতেই ওরা চাইছে, সত্যটা বের হোক।
হঠাৎ ওপর থেকে একটা শব্দ,দরজা খোলার শব্দ।
বেজমেন্টের সিড়ি বেয়ে কেউ একজন নামছে।
মিতু চিৎকার করে ওঠে— আর কে আছে?!
একটা নারীকণ্ঠ— আমি…..।
সবাই ঘুরে তাকায়,সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে একজন নারী,আধা পাকা চুল, চোখে দৃঢ়তা,মলিন কিন্তু কঠিন একটা চেহারা।
মিতুর শ্বাস আটকে যায়,যেনো মাথার ভিতর বজ্রপাত হ’য়ে গেলো….
— মা…?
নারীটি মাথা নাড়ে— হ্যাঁ, মা।
রাহিব হতবাক।
— এটা অসম্ভব…
মিতুর মা ধীরে বলে—
— অসম্ভব ছিল আ-গুন থেকে বেঁচে ফেরা।
— কিন্তু আমরা বেঁচেছি,হাজী আবদুল করিম কাঁপতে থাকেন— তুমি… বেঁচে আছো?
— বেঁচে ছিলাম।
— আজ কথা বলতে এসেছি।
বাহিরে অনবরত বজ্রপাত হচ্ছে যেনো মনের মধ্যেও….
মিতু বেজমেন্টের চারিদিকে দেখে, বেজমেন্টের একদম পেছনের দেয়ালে আর একটা দরজা!
ছোট,লোহার দরজা।
— ওটা কী?মিতু জিজ্ঞেস করে।
ইকবাল সাহেবের মুখ কঠিন হয়— ওটাই শেষ ঘর।
— ওখানে কী আছে?এক মুহূর্ত নীরবতা।
— ওখানে আছে… সেই মানুষটা,— যে আ-গুন লাগিয়েছিল।
সবাই একসাথে তাকায় হাজী আবদুল করিমের দিকে।
তিনি ধীরে মাথা নাড়েন।
— না।
— তাহলে কে?
ইকবাল সাহেব দরজার দিকে এগিয়ে যান।
— যে আজও বেঁচে আছে— আর এই বাড়িতেই আছে।
ধাতব দরজায় হাত পড়তেই—ভেতর থেকে একটা ধাক্কা,আরেকটা ধাক্কা।
ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করে ওঠে—
— দরজা খোলো!— আমি সব জানি!
মিতুর শরীর কাঁপতে থাকে,কারণ এই কণ্ঠটা…
এই কণ্ঠটা সে আগে শুনেছে,খুব কাছ থেকে, যেনো প্রতিদিন শুনে অভ্যস্ত একটা কন্ঠ!
এই কণ্ঠটা—রাহিবের।
মিতু ধীরে ঘুরে তাকায়,তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে।
— তাহলে…— আমার পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে… সে কে?
বেজমেন্টের আলো হঠাৎ জ্বলে ওঠে।
আর সেই আলোয়—মিতু দেখে,
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখ…ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
চেনা মুখটা গলে যাচ্ছে,অন্য এক মুখ।
এমন একজন যাকে সে কখনো দেখেনি।
আর পেছনের দরজার ভেতর থেকে রাহিবের কণ্ঠ আবার ভেসে আসে— মিতু…— ওটা আমি না…
যদি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা রাহিব না হয়—তাহলে সে এতদিন কাকে স্বামী বলে ডেকেছে?🥺
⏭️চলবে……
চতুর্থ পর্ব
গল্প: অতীত
লেখিকা: 1 Minute With Mitu
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE