হেইসুইটহার্ট__০৪
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
স্টেজ ঘিরে থাকা চারপাশের আলো কখনো ঝলমলে,কখনো নিস্পন্দ নিয়নের মতো। তার মাঝে পেটানো দেহের,সবুজ চোখের পুরুষটাকে বিচিত্র এক গোলকধাঁধা মনে হলো কুহুর। হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে রইল মেয়েটা। কী ডাকল ওকে- সুইটহার্ট?
এদিকে এলিন,মেহেক সবাই আকাশ থেকে মাটিতে ছিটকে পড়েছে। দুজন দুপাশ থেকে হাঁ করে এক পল সম্রাটকে দেখল,পরপর কুহুকে। সম্রাটের ডাক ওরাও শুনেছে,স্পষ্ট শুনেছে।
কিন্তু এসবে সম্রাটের হাস্যোজ্জ্বল মনির পরিবর্তন হলো না। ভ্রু কুঁচকে নিস্তব্ধ কুহুকেই ফের বলল,
“ হেই…”
অমনি কুহুর মুখ কঠিন হয়ে গেল। দাঁত কিড়মিড় করল চেয়ে চেয়ে। যেখানে চারপাশে মেয়েগুলো হত্যে দিয়ে অপেক্ষা করছে সম্রাটকে একটু ছোঁবে, একটু ঘিঁষবে ওর কাছে সেখানে এই ছোট্ট মেয়েটার ক্ষিপ্ত চাউনিতে সম্রাট মজা পেয়ে গেল। আরো উজ্জ্বলতায় দপদপ করল তার সবুজ নয়ন তারা। এই অভিজ্ঞতা ওর কাছে নতুন! ক্ষুদ্র, বাচ্চা মেয়েটিকে জ্বালাতে দুম করে হাতটা পেতে বলল,
“ উইল ইউ ডান্স উইথ মি, সুইটহার্ট?”
এলিনদের মুখ ফাঁকা হয়ে গেল। মেহেক নিজের কানে একটা আঙুল ঢুকিয়ে ঝারল সাথে সাথে।
কুহু নিজেও আশ্চর্য না হয়ে পারল না। এই লোকের কি মাথা খারাপ? এসব কী ডাকছে ওকে?
সম্রাটের চোখেমুখে জ্বলজ্বলে দুষ্টুমি। ও ভেবেই নিয়েছে কুহু এবার না করতে পারবে না। একে তো সবার দৃষ্টি এদিকে,ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যখন চলমান সেই মূহুর্তে মেয়েটি বাধ্য হয়ে হলেও হাত ধরে স্টেজে উঠে আসবে। যাকে সকালেই ক্যারেক্টরলেস বলে এসেছে,হাত ধরে নাচবে তার সাথে। এমন চরম বিব্রতকর মূহুর্তটা কুহুকে উপহার দেয়া থেকে সম্রাট পিছুপা হতে পারল না।
অথচ সব কিছু ছাপিয়ে গেল কুহুর সাহস,তার স্পর্ধা। তুরন্ত সম্রাটের পেতে রাখা হাতটা ঠেলে সরিয়ে দিলো সে। মুখের ওপর শক্ত ভাষায় বলল,
“ যেখানে আপনাকে ছুঁতেও বাঁধবে,সেখানে ডান্স? নো ওয়ে মিস্টার ক্রিঞ্জ স্টার!”
সম্রাটের চেহারা বদলে গেল। চট করে মুছে গেল সেই চকচকে কৌতুকপূর্ণ হাসিটা। পাল্টাল তার সবুজ চোখের কুটিল তরল ভাষা। একেকটি বাদ্যযন্ত্রের মাথা ধরানো মিউজিকে কুহুর এত মৃদূ স্বর তেমন কেউ না শুনলেও সম্রাটের কানে ঠিক পৌঁছে গেছে। সেই সাথে স্তম্ভিত হয়েছে এলিন ওরাও।
কুহু এত কিছুর তোয়াক্কা অবশ্য করল না। মুখ ঘুরিয়ে সাথে সাথে ঐ ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলো সে। ওপাশে দাঁড়ানো তুহিনের জিভ দাঁতের নিচে পড়ল। ভীষণ বিস্ময়ের সাথে সাথে ঘাবড়ে গেল বেচারা। এই রে,মেয়েটা মনে বসকে সোজাসুজি অপমান করেছে! এবার বস রেগেমেগে উল্টোপাল্টা কিছু না করলে হয়!
তক্ষুনি পিলারের মতো শক্ত শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াল সম্রাট। গানের সুরে ভেসে যাওয়া ঠোঁট টেনে হাসল বাকিদের দিকে চেয়ে। আগের মতো মাইক হাতে চ্যাঁচাল,
“ হু ওয়ান্স টু ডান্স উইথ মি?”
সবাই ‘ মি, মি’ করে ফ্যানা তুলে ফেলল। লাফিয়ে চড়িয়ে হাত বাড়াল মেয়েরা। তবে সম্রাট কোণের একটা ছেলের দিকে চেয়ে বলল,
“ হেই ইউ জ্যাকেট ম্যান। কাম অন দ্য স্টেজ।”
শো-য়ের পরিবেশ বদলেছে। মানুষ হইহই করছে ফের। এলিনরাও ভেসে গেল সেই হৈচৈ এর রেশে। ভুলে গেল একটু আগে কুহু নামের মেয়েটা কীভাবে এক রকস্টারকে মুখের ওপর প্রত্যাখান করে গেল। কিন্তু সম্রাট! আদৌ সে ভুলবে এসব?
কুহুর মেজাজ খুব খারাপ। মেদুর চিবুক শক্ত। দুহাত মুঠো করে রাস্তার লেন ধরে ফসফস করে হাঁটছে সে। হঠাৎ পেছন থেকে ডাকল কেউ,
“ কিয়ু কিয়ু!”
অমনি থামল মেয়েটা। ফিরল চকিতে। মেহেক ছুটে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। কুহু অবাক হয়ে বলল,
“ চলে এলে কেন?”
“ তুমি এলে যে।”
“ আমি তো ভালো লাগছে না দেখে এলাম। তুমি তো এঞ্জয় করছিলে।”
মেয়েটা সরল গলায় বলল,
“ তুমি ছাড়া আমার আবার এঞ্জয়! বয়সে তুমি আমার দু বছরের ছোটো,কিন্তু আমার তোমাকে ছাড়া আজকাল কোথাও ভালো লাগে না। হয়ত বাকিদের সাথে এত ভালো করে মিশতে পারি না,তাই। আর নাহলে বাকিরা তোমার মতো মিষ্টি নয় তাই।”
কুহু ক্লান্ত চোখে হাসল।
“ তাই বলে যার জন্যে দু সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করলে,তার শো ছেড়ে চলে আসবে?”
“ আমার কথা ছাড়ো। আগে তুমি বলো,তুমি এরকম করলে কেন? স্যাম নিজে তোমাকে ডান্স অফার করল আর তুমি ফিরিয়ে দিলে?”
কুহু থমথমে গলায় বলল,
“ আমার এসব ভালো লাগে না। তাছাড়া কী অসভ্য লোক দেখেছ,কেমন সুইটহার্ট সুইটহার্ট করছিল!”
মেহেক হেসে বলল,
“ কিয়ু, এটা সুইডেন। এখানকার কালচার এরকমই। ও হয়ত তোমাকে আদর করে ডেকেছে। ইউ আর রিয়েলি আ সুইটহার্ট, কিউটি। এতে রাগের কী আছে? সুইডেন কিন্তু বাংলাদেশ নয়। তোমাকে এখানে অভ্যস্ত হতে হবে না? এখানে ছেলেদের সাথে কোমর মিলিয়ে নাচের সাথে লিপ কিসও খুব নরমাল! ওইতো ওই ওই দেখো!”
মেহেক উদ্বেগী হয়ে কোথাও একটা আঙুল তুলে দেখাল। সেদিকে ফিরল কুহু। একটা রেস্তোরাঁর ছাউনির সামনে দুজন ছেলে-মেয়ে বসে। দুজনেই এই শীতল বাতাবরণে একে-অন্যের ঠোঁটের ভাঁজে মগ্ন!
কুহু চট করে চোখ ফিরিয়ে আনল। এসব ও নতুন দেখছে না। বিদেশে পা রাখার পর থেকেই এসব প্রতিদিন একবার না একবার চোখে পড়েই। কিন্তু ও এখনো অভ্যস্ত হতে পারেনি। সেই একইরকম লজ্জা পায়,বিব্রত হয়।
মেহেক বুঝল কুহুর অস্বস্তি হচ্ছে।
মূহুর্তে ওর হাতটা ধরে বলল,
“ থাক,তোমাকে এসবে অভ্যেস করতে হবে না। তুমি যেমন আছো তেমনই ভালো!”
কুহুর চেহারায় আলো ফিরল। উচ্ছ্বল চোখে বলল,
“ তুমি আমার বন্ধু কেন হলে না, মেহেক?”
“ ওমা,কে বলল হইনি? আমি তো তোমার বন্ধুই। বন্ধুত্ব কি শুধু একই ব্যাচে হয়?”
“ সত্যি তুমি আমার বন্ধু তো?”
মেহেক মূহুর্তে মেয়েটার গালে চুমু খেয়ে ফেলল। দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ ইয়েস কিয়ু,আই লাভ ইউ সো মাচ।”
রাত প্রায় আড়াইটা বাজে এখন। সম্রাট ভেন্যুতে এসেছিল দেড়টার কাছাকাছি হবে। ঠিক এই এক ঘন্টারই স্কেজিয়ুল দেয়া ছিল তার। এর এক মিনিটও বেশি সময় স্টেজে ও থাকেনি। আর তাতেই ওর পেছনে কর্তৃপক্ষের গুণতে হয়েছে 9,50,000 সুইডিশ ক্রোনা। অর্থাৎ বাংলাদেশের টাকায় প্রায় এক কোটি টাকা। সম্রাট মাত্রই গান-টান শেষে লাউঞ্জে ফিরে এলো। তুহিনও ঢুকল পিছু পিছু। গায়ে জ্যাকেট পরিয়ে দিতে দিতে প্রফুল্ল স্বরে বলল,
“ ইউ আর আমেইজিং বস। এই শরীরেও একদম একইরকম এনার্জি।”
সম্রাট কথা বলল না। টিস্যু তুলে পুরো মুখটা মুছল। চুলে হাত চালিয়ে এক পাশে সুন্দর করে সেট করতে করতে বলল,
“ আচ্ছা তুহিন, আমি যদি ওই মেয়েটার সাথে ডেটে যেতে চাই,তুমি অবাক হবে?”
তুহিন কে নাম বলতে হলো না,নিজে থেকেই বুঝে ফেলল সে। সাথে এও বুঝল,তখন স্টেজে স্বাভাবিক থাকার নাটক করলেও,সম্রাট ব্যাপারটা ইগোতে নিয়ে ফেলেছে।
মুচকি হেসে বলল,
“ না বস,বরং এত দেরি করে বলায় অবাক হয়েছি।”
সম্রাটের ব্যস্ত হাত থামল। আয়নায় নিজের ফুটে থাকা ফরসা মুখটায় চেয়ে বলল,
“ সুইটহার্ট আমার হাত ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে তুহিন। এর জন্য ওর একটা দারুণ শাস্তি পাওনা না,বলো? আর স্যাম কারো লাইফে এন্ট্রি নেয়ার থেকে জঘন্য শাস্তি কারো জন্য আর কী হতে পারে?”
তুহিন বিরস কণ্ঠে বলল,
“ বস,মেয়েটার নাম তো সুইটহার্ট না।”
“ তুমি যে বললে?”
“ সেতো আপনি বুঝতে পারছিলেন না দেখে, সহজ করে ভেঙে বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু ওর নাম এটা নয়, বস। আপনি এভাবে ডাকলে,
সুইডিশ মেয়েরা হয়ত দৌড়ে বুকে এসে পড়বে,কিন্তু বাংলাদেশি মেয়ে, জুতো-টুতো ছুড়ে মারতে পারে।”
সম্রাট ভ্রু নাঁচাল,
“ আচ্ছা? ওরা এত সিরিয়াস হয়?”
“ ইয়েস বস।”
সম্রাট কেমন করে হাসল,
“ তাহলে তো আরো বেশি করে ট্রায়াল দিতে হবে। আমি এর আগে বাংলাদেশি মেয়েদের কখনো ছুঁইনি। নাউ ইটস টাইম টু টার্ন মাই টেস্ট, তুহিন!”
তুহিন মাথা নাড়ল,
“ ওকে বস।”
এর মধ্যে দরজায় টোকা পড়ল। অনুমতি নিয়ে একজন এসে খাবার দিয়ে গেলেন। হাতে স্যানিটাইজ করে টেবিলে বসল সম্রাট। তুহিনকে সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলল ,
“ বোসো।”
অনুমতি পেতেই বসল সে। এমনিতেও ওর খুব খিদে পেয়েছিল। তবে আপাতত সব ছাপিয়ে বসকে একটা জরুরি কথা বলা দরকার।
লোকটি নিজ হাতে খাবার সার্ভ করে দিলেন। বিনয়ী সুরে বললেন,
“ কিছু লাগলে জানাবেন, স্যার!”
তারপর বেরিয়ে গেলেন তিনি। তুহিন সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে এসে বলল,
“ বস একটা কথা বলা হয়নি। বলি?”
সম্রাট ভীষণ মনোযোগ দিয়ে চিকেনের পিসটা ছুরি দিয়ে কাটছিল। বা হাতে প্লাস্টার,অথচ বাকি এক হাত দিয়েই খুব আরামসে ব্রেস্ট পিস থেকে মাংসের টুকরো আলাদা করল সে। বলল,
“ বলো!”
তুহিনের কণ্ঠ নেমে এলো আরো,
“ আপনি একদম ঠিক লোককে সন্দেহ করেছিলেন, বস!”
ঝট করে মুখ তুলল সে। তুহিন ফিসফিস করে বলল,
“ রবার্টই আপনার গাড়ির ব্রেইক ফেইল করিয়েছে। হি ওয়ান্টেড টু কি-ল ইউ, বস।”
“ তোমাকে কে জানাল? স্টিফেন?”
“ হ্যাঁ বস। আপনার কথাতেই তো ওকে কাজটা দিলাম।”
উত্তরে দু সেকেন্ড ঠান্ডা চোখে চেয়ে রইল সম্রাট। পরপরই নিঃশব্দে হেসে ফেলল। তুহিন আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ বস আপনি, আপনি হাসছেন বস? আমার তো কথাটা শোনার পর রাগে গা কাঁপছিল।”
“ হাসব না? মাঠে গোল দিতে না পেরে মাঠের বাইরে লড়াই করতে চাইছে। আ টিপিক্যাল কাওয়ার্ড হি ইজ!”
“ এখন কী করব বস, পুলি…”
“ না! লেট হিম ফ্রি!”
“ ছেড়ে দেবো বস? কী বলছেন?”
সম্রাট ভ্রু কুঁচকে নরম স্যালমনের টুকরোটার দিকে চেয়ে রইল তখন। পরপর তেজি হাতে কাটা চামচ ঢুকিয়ে দিলো তাতে। জ্বলন্ত চোখে, দাঁত পিষে আবার বাইরে আনল চামচটা। আবার ঢুকাল,আবার আনল বাইরে। দূর্বোধ্য রহস্যের জালে দৃষ্টি প্যাঁচিয়ে বলল,
“ আমরা অন্যভাবে খেলব, তুহিন। একদম ভিন্ন এ্যাঙ্গেলে।”
তুহিন কিছু বলার আগেই সম্রাটের আইফোন বাজল। যেটা বেশিই থাকে ওর পকেটে। সাথে সাথে ফোন বসের দিকে এগিয়ে দিলো সে। স্ক্রিনে পাপা লেখা দেখে, রিসিভ করল সম্রাট। স্পিকার অন করে টেবিলে রেখে বলল,
“ ইয়েস পাপা…”
“ কখন আসবে বেটা? অপেক্ষা করছি তো।”
“ আসছি,টু মিনিটস!”
বাড়ির নাম “ নর্ডলিস গোরদেন…”
স্টকহোমের অভিজাত প্রাচীন অঞ্চলে সময়ের অনেক গল্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এই ভবন। যার বাইরের দেওয়াল সাদা পাথরে মোড়ানো। প্রায় ১২ একর জমি নিয়ে তৈরি বাড়িটার খাড়া ছাদ, কালো স্লেট টাইলস, আর লম্বা কাঁচের জানালায় স্টকহোমের আকাশের বিম্ব দেখা যায়। মূল ফটক পেরোলেই একটা বিশাল ঝকঝকে উঠোনের ওপর ট্রিম করা চুলের মতো দূর্বাঘাসগুলো বড়ো যত্ন নিয়ে কাটা। চারপাশে লম্বা লম্বা পাইন গাছ,তার একটু দূরে একটা ছোট্ট হেলিপ্যাড। যেখানে মাত্রই এসে প্রবল গতি কমিয়ে একটা হেলিকপ্টার নামল। সম্রাট মাটিতে দাঁড়াতেই, সঙ্গে সঙ্গে চার পা নিয়ে ছুটে এলো থমাস। কুচকুচে কালো শরীর দুলিয়ে, লেজ নাড়িয়ে ঘেউঘেউ করে উঠল খুব আনন্দের সাথে। ঠোঁট টেনে হেসে ওকে কোলে তুলল সম্রাট। তুহিন বলল,
“ কেয়ারফুল বস, আপনার হাত!”
“ পারব।”
ঐ এক হাতেই কোনোরকম থমাসের নরম শরীরটা বুকে মেশাল সম্রাট। গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ ব্রেভো থমাস,হাউ আর ইউ মাই বয়?”
থমাস চুপ করে থাকে। মাথা নুইয়ে বুকে লেপটে রয়। মাঝে চিকণ স্বরে ডেকে ডেকে বোঝায়,মালিককে পেয়ে ভীষণ খুশি সে।
প্রায় ৬ মাস পর সম্রাট আজ নিজের বাড়ি ফিরেছে। এমনিতে ও এখানে থাকে না। রাত অনেক,স্টকহোমের নব্বই ভাগ মানুষ ঘুমে কাদা। অথচ নর্ডলিসে একইরকম চোখ ধাধানো আলো জ্বলছে তখনো। সম্রাট বুক ফুলিয়ে হাসল। দীপ্ত সবুজ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখল গোটা বাড়ি।
তারপর পেছনে চেয়ে বলল,
“ এসো তুহিন!”
থমাস কে কোলে নিয়েই ঢুকল সে। তুহিনও এগোলো পিছু পিছু। বাকি দেহরক্ষী চারজন বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তুহিন এই বাড়িতে হাজারবার এসেছে। এই উঠোনেই ক্রিকেট খেলেছে এক সময়। আর সেই দিনের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে ওর। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে, কাঁপতে কাঁপতে চোখে আতঙ্কের বিষ নিয়ে ও বল করছিল, আর এক জোড়া রক্ত মাখা হাতে ব্যাট উঁচিয়ে সেই বলের বুকে খুব জোরে বাড়ি মারল সম্রাট। মেঘ ছোঁয়ার মতো উচ্চতায় উড়তে উড়তে বলটা গিয়ে পড়ল বহুদূরে! সম্রাট উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল
“ সিক্স!”
তুহিন চশমা ঠেলে শ্বাস টানল। ধ্যান ভাঙল সম্রাটের আওয়াজে। পাপা, পাপা করে ডাকছে সে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেইড সার্ভেন্টরা মাথা নুইয়ে সম্মান দিচ্ছেন,আপ্লুত হয়ে দেখছেন ওদের। সম্রাটের এসবে ভ্রুক্ষেপ অবশ্য নেই। একটু পরেই এক ইটালিয়ান নারী হাজির হলেন। পরনে লাল স্যাটিন কাপড়,ঢেউয়ের মতো বাঁকা সোনালী চুল। চোখেমুখে হিঁচড়ে আনা ঝিলিক নিয়ে হাসলেন সেই নারী। ছুটে এলেন সম্রাটের দিকে। দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“ আওও স্যাম,মাই বয়। হাউ আর ইউ বেটা?”
সম্রাট পালটা হাসে,এক হাতে একটু আগলায় তাকে।
“ আমি ঠিক আছি রোজি,তুমি কেমন আছো?”
“ তোমাকে ছাড়া ভালো থাকি? এই যে তুমি এসেছ এখন দারুণ আছি। টুহিন হোয়াট এবাউট ইউ?”
তুহিন অপ্রস্তুত হাসল,
“ আসসালামু আলাইকুম, আন্টি। নো নো সরি, সরি, হাই রোজি।”
রোজি ওর গালে টোকা দিয়ে বলল,
“ নটি বয়। বোসো তোমরা, নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত? ডিনার করবে তো?”
সম্রাট সোফায় বসল। কোলে থাকা থমাসের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“ না। পাপা কোথায়?”
“ আসছে। আচ্ছা আমি তো শুনলাম তোমার নাকি খুব সিরিয়াস এক্সিডেন্ট হয়েছিল। এই অবস্থায় কেন স্টেজ করলে বেটা?”
উত্তরের আগেই কথা কেড়ে নিলো কেউ একজন। ছুটে এলো ভীষণ শান্ত তবে গাম্ভীর্যে মোড়ানো এক কণ্ঠ,
“ একই কথা তো আমারো রোজ। কেন এই শরীরে শো করতে হবে? টাকা তো কিছু কম পড়েনি।”
কথার উৎস ধরে ওপরের দিকে ফিরল সবাই।
গ্লাস-স্টিলের মিশেলে তৈরি প্লাটফর্ম লিফটটা বেয়ে হুইলচেয়ারে করে নেমে এলেন এক মাঝবয়েসী সুতনু পুরুষ। নাভেদ শেখ, পেশায় একজন পেইন্টার। গায়ের সাদা ফতুয়ার ওপর উলের সোয়েটার পরেছেন তিনি। তারওপরেও গলায় একটা কালো শাল জড়ানো। চোখেমুখে খুব অদ্ভুত সৌম্যতা বয়ে বেড়ানো লোকটার এই বাড়িতে এক মাত্র সঙ্গী রোজি, আর তার কাজ। তবে তার থেকেও বড়ো সঙ্গী এই লোহার তৈরি হুইলচেয়ারটা। বহু বছর আগে এক ভূতুড়ে, অজ্ঞাত কারণে নাভেদের দুটো পা-ই তার শরীর থেকে নিষ্ঠুর ভাবে বাদ পড়েছিল। তাই ডুপ্লেক্স বাড়ির মূল সিঁড়ির পাশে এই প্লাটফর্ম লিফটের ব্যবস্থা কেবল ওনার জন্যেই করা। যাতে ওপর-নিচে যাতায়াতে কোনো অসুবিধে না-হয়। সম্রাট থমাসকে নামিয়ে দিয়ে, উঠে দাঁড়াল। নরম আলোর মতো হেসে, ঝুঁকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল বাবাকে।
“ হাই পাপা!”
ছেলের শক্ত পিঠে নাভেদ চাপড় কাটলেন।
“ মাই শের, এখন বেটার ফিল করছো তুমি?”
“ করছি।”
“ তুহিন আসেনি?”
তুহিন সহাস্যে বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল।”
নাভেদ প্রসন্ন হয়ে বললেন,
“ ওয়ালেইকুম আসসালাম। শরিফ বেটেকি বাত তো আলাগই হোতিহে!”
আর স্যাম তুমি, তোমাকে আমি কতবার শেখালাম,গুরুজনদের সালাম দিতে হয়। তাও সেই হাই-হ্যালো তে পড়ে আছো। আমাদের রুট, আমাদের অরিজিন কিন্তু পাকিস্তান বেটা। ভুলে যেও না। আজ অবধি উর্দুও অত স্পষ্ট ভাবে শিখলে না তুমি।”
সম্রাট বিরক্ত হয়ে কপাল গোছাল। তবে কথা বাড়াল না। প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,
“ রোজি,আফনান কোথায়?”
নাভেদ হতাশ শ্বাস ফেললেন। রোজি ওনার দ্বিতীয় স্ত্রী! কিন্তু সম্রাট আজ অবধি নাম ছাড়া ডাকল না। নাহ,ভদ্রতা হবে না একে দিয়ে। রোজি বলল,
“ ও শুয়ে পড়েছে। কাল দেখা করো?”
“ তোমরাও শুয়ে যেতে। সবার সাথে নাহয় সকালেই দেখা হতো!”
“ কী বলছো মাই বয়, তুমি আসবে আর আমরা ঘুমাব? আচ্ছা, তো বলো ডিনার যখন করবে না, কী দেব এখন? ফ্রেস এ্যাপেল জুস,অর হট হট কফি?”
“ আপাতত কফি। তোমার হাতের। ”
রোজি সার্ভেন্টকে বলতো। কিন্তু থামল কথাটায়। বসা থেকে উঠে নিজেই চলল কফি মেকারের দিকে।
তুহিন হাসিহাসি মুখ করে বলল,
“ স্যার, আপনি সেদিন বসকে বলেছিলেন না ওনার একটা পেইন্টিং করেছেন? আমি ওটা দেখার জন্যে খুব এক্সাইটেড। কোন থিমে এঁকেছেন স্যার? রকস্টার স্যাম,না সাইক্রিয়াটিস্ট শৌর্য শেখ?”
নাভেদ বললেন,
“ আমি যখন আঁকব তখন তোমার বসের ওসব রকস্টার ভাইব বাদ দিয়েই আঁকব। হেনরি,যাও তো, আমার রুমে পেইন্টিং এর কাগজটা পাবে। নিয়ে এসো।”
তুহিন নড়েচড়ে বসল। মেইড হেনরি ছুটলেন দোতলায়। নেমে এলেন মিনিট পাঁচেকে।
নাভেদ বড়ো ক্যানভাসের মতো কাগজটা মেলে ধরতেই তুহিনের চোখ মুগ্ধতায় বড়ো হয়ে গেল।
একটা পলিশ করা কাঠের তৈরি ডেস্কে বসে আছে সম্রাট। পরনে লং স্লিভস শার্ট। চারপাশে একটা খুব আধুনিক চিকিৎসার আবহের মাঝে মনোযোগ দিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখছে সে।
তুহিন দেখেই বলল,
“ মাইন্ড ব্লোয়িং স্যার। কী দারুণ এঁকেছেন!’’
সম্রাট চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ সেই এক জিনিস। বোর হও না পাপা? একই থিম,একই ছবি।”
ক্যানভাস ফোল্ড করতে করতে হাসলেন নাভেদ,
“ বোর হই না বেটা।
যখন একটু রিলিফ থাকি তখন আমার তোমাকে আঁকতে ভালো লাগে। আর আমার চোখে রকস্টার স্যামের চেয়েও সাইক্রিয়াটিস্ট শৌর্য শেখের দাম অনেক বেশি।”
তুহিন বলল,
“ বস আপনি শুধু ছবির থিম দেখলেন,স্যার আপনাকে আজ নতুন শার্ট পরিয়েছে সেটা দেখলেন না? হাতের পেনটাও একদম নতুন ছিল। সত্যি স্যার,অবাক হই আপনার ট্যালেন্ট দেখে। একদম জীবন্ত ছবি। মুখের প্রত্যেকটা ভাঁজ আলাদা করা যায়। আপনি এত ট্যালেন্টেড বলেই বসেরও এত অতিরিক্ত ট্যালেন্ট। আমি নিশ্চিত, স্যারের যদি পা থাকতো,স্যার এতদিনে গোটা সুইডেনই জয় করে ফেলতেন!”
নাভেদের মুখের হাসি দপ করে নিভে গেল অমনি। সম্রাট শক্ত গলায় ধমকাল,
“ তুহিন, বড্ড বেশি কথা বলো। কিপ ইয়র মাউথ শাট।”
ছেলেটা মুখ কালো করে বলল,
“ সরি বস,সরি স্যার!”
নাভেদ কাষ্ঠ হেসে বললেন,
“ নো বেটা, আমি কিছু মনে করিনি। এসবে এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। তোমার কথায় আর কী হবে? প্রতিদিনই তো নিজের পা ছাড়া উরু দুটোকে দেখি। ইটস নাথিং নিউ টু মি।”
সম্রাট বাবার কাঁধে হাত রাখল।
“ পাপা, মন খারাপ করো না। পা এমন আহামরি কোনো জিনিস নয়। তুমি সুস্থ আছ,এটাই অনেক।”
“ আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ? কিন্তু আমার চেয়েও যে তোমার বেশি মন খারাপ হয় সেটা আমি জানি, স্যাম। তোমার তো অনেক ইচ্ছে ছিল,বাবা একদিন তোমার সাথে স্টেজে উঠব। এওয়ার্ড নেবো।”
“ তখন ছোটো ছিলাম,বলেছি একটা কিছু। ভুলে যাও ওসব।”
“ সবাই তো কতবার প্রস্টেটিক লেগ নিয়ে বলল। আমিও চাইলাম,তুমি কেন রাজি হলে না?”
“ পাপা এসব প্রস্টেটিক লেগ মানুষকে আরো দূর্বল করে দেয়। প্রতি মূহুর্তে ফিল করায় সে পঙ্গু,তার নিজের পায়ে সে চলতে পারে না। বাট মাই পাপা ইজ আ হিরো টু মি। সে তার বাস্তবের সাথে লড়বে। বীরের মতো সব কিছুর মুখোমুখি হবে। আমার পাপা দূর্বল হোক,আমি তো তা চাইতে পারি না। তাই না?”
নাভেদের বুক ভরে গেল। ছেলের হাতটা ধরে বললেন,
“ আমি জানি বেটা! তোমার মতো আমাকে নিয়ে কেউ ভাবে না।”
তুহিন যে মাথা নিচু করল, তুলল না আর। তারওপর এসব ইমোশনাল কথা-বার্তায় মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। কেন যে ওর জিভ এত চলে!
লিভিংরুম তখন থমথমে। নাভেদের নিভন্ত মুখপানে চুপ করে চেয়ে রইল সম্রাট। পরপর তাকাল বাবার ওই অর্ধেক কাটা পা জোড়ার দিকে। সাদা পাজামার আড়ালে যা! অথচ হুট করে ওর সবুজ মনির আর্ত নজর পালটে ভর করল ভিন্নরকম চাউনি। প্রহেলিকা জড়ানো পৈশাচিকতায় বহ্নির ন্যায় জ্বলে উঠল তা। শক্ত হলো চোয়াল।
চিহ্ন তুলল কপালের ফেঁপে থাকা শিরা। ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ছুটিয়ে খুব সামান্য হাসল সম্রাট – আনন্দ, উল্লাস আর শ্লেষের নিঃশব্দ ভয়ানক হাসি।
চলবে…
Share On:
TAGS: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি, হেই সুইটহার্ট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৫