Golpo হিপনোটাইজ

হিপনোটাইজ পর্ব ৯


তাজনিন_তায়্যিবা

হিপনোটাইজ

পর্ব:9
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
_______________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
___________________

1947 সালের উনিশ নভেম্বর , ফ্লোরেন্সার জন্মের এক অতি সুভ এবং সুন্দরতম দিন ছিলো সেদিন। কিন্তু দিনটা তার সৌন্দর্য রক্ষার্থে ব্যার্থ ছিলো, ঠিক জোসেফের দেওয়া কালো কুচকুচে পাথরের মতোই দিনটা তমসাচ্ছন্ন অন্ধকার ছিলো।নীল আকাশ জুড়ে ছিলো কালো ধোয়ার রাজত্ব,এক পালি সূর্যের কিরনের দেখা মিলে নি সারা দিনে। ফ্লোরেন্সা মন মরা, মোড়া পেতে বসে আছে বাড়ির উঠানে, ফুলমতি নিপুণ কৌশলে তার চুলে তেল মেখে দিচ্ছে।স্নিগ্ধ ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া আর চুলে আচড় কাটায় আরাম পেয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে ফ্লোরেন্সা।

হটাৎ করেই গঞ্জের মানুষের হৈচৈ এর আওয়াজে হকচকালো ফ্লোরেন্সা। খোলা চুলের উপর ওড়না টেনে দৌড়ে গেলো বাড়ির শেষ সীমানায়, সবাই দল বেধে দক্ষিন দিকে যাচ্ছে, ফ্লোরেন্সা কৌতুহল মেটাতে একজনকে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে আপনাদের? কোথায় যাচ্ছেন এভাবে?”

“খবর শুনো নি নাকি দিদিমণি, তোমাদের বাড়িতে কাজ করতো সুফি আছে না ওদের বাড়িতে লাশ পাওয়া গেছে, আহারে মেয়েটা।” আক্ষেপের সহিত কথাগুলো বলে লোকটা দ্রুত পা চালালো লোকটা।

অথচ ফ্লোরেন্সা বাকরুদ্ধ, এক অজানা আশঙ্কায় দ্বিখণ্ডিত হলো হৃদয়, “সুফির কিছু হয়ে যায় নি তো?”


অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনটা যেনো আরেকটু বিষাধময় তিক্ত রুপ ধারন করেছে আজ। দক্ষিনের ছোট্ট বাড়িটায় আজ শোকের কালো ছায়া, আর্তনাদ আর হাহাকারে কম্পিত প্রতিটি বাষ্প কনা।

নিস্প্রভ প্রকৃতির মতোই গুমোট মেরে বসে আছে সুফি, নিস্পৃহতা ঘিরে আছে তাকে। কেমন যানি অনুভূতি শূন্য্য পাথরের মতো লাগছে, মেয়েটাকি সত্যি সত্যি পাথর হয়ে গেলো? হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়?মা বাবার রক্তে দু হাত কেমন টকটকে লাল হয়ে আছে এই অবস্থায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখা যে খুব কঠিন।এমন অসাধ্য কাজটা যে সেও করতে পারলো না, বাবা মায়ের এমন নিসংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে কেমন নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরেছে আষ্টেপৃষ্টে। কষ্ট গুলো যেনো দলা হয়ে বুকেই আটকে রয়েছে।হাও মাও করে চিৎকার করার কোন প্রয়াস নেই তার মধ্যে, যেনো সে এক নির্জিব প্রানী।

ভির ঠেলে দৌড়ে এসে হাটু ভেঙে বসলো ফ্লোরেন্সা, জাপ্টে ধরলো সুফির রক্তে রাঙা শরীর। কন্ঠে তার আতংক বিরাজমান,

“এগুলো কি করে হলো সুফি?কে করলো এসব?”

ফ্লোরেন্সার মমতাময়ী স্পর্শে,দলা কান্নার বাধ ভাঙলো সুফির, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো,

“আমার আব্বা আম্মা আর নাইরে ফ্লোরেন্সা, আমি এতিম হইয়া গেলাম রে, আমার দুই কুলে আর কেউ রইলো না, কে করলো এমন?আমার সহজ সরল আব্বা আম্মার সাথে কার শত্রুতা ছিলো?আমার আব্বা আম্মায় তো কারো ক্ষতি করে নাই। তবে তাদের জীবনটা কেন অকালে হারাতে হইলো?”

ফ্লোরেন্সা কি বলবে কোন শব্দ খুজে পেলো না,কম্পিত গলায় শুধু ভরসা দিলো কেবল,

“কে বলেছে তোর কেউ নেই?আমি আছি, আমার পুরো পরিবার আছে, আমার পরিবার তো তোর পরিবার, নিজেকে একা ভাবিস না দয়া করে।আমি ছায়ার মতো তোর পাশে আছি।”

“আমার আব্বা আম্মা তারা তো ফিরবে না রে আজীবনের মতো আমাকে ছাইড়া চইলা গেলো।”

“নিজেকে সামলা সুফি যেই জানোয়ার টা এমন জঘন্য কাজ করেছে তাকে খুজে বের করতে হবে, শাস্তি দিতে হবে, তুই এভাবে ভেঙে পরিস না।”

“ফ্লোরেন্সা ঠিক বলেছে সুফি, নিজেকে শক্ত করো, আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।” পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে এগিয়ে এলো আইরিশ, মাত্রই সুফির বাবা মায়ের দাফন কাপনের কাজ শেষ করে এলো।সুফির জন্য খুব খারাপ লাগছে, মেয়েটা এই বয়সে এমন জঘন্য পরিস্থিতির শিকার না হলেও পারতো।

আইরিশের কন্ঠটুকু কানে যেতেই মরুভূমিময় বৃষ্টিবিরল ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে প্রলেপ দেওয়ার মতোই এক ফোটা জলের সঞ্চার হলো বুঝি।হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়ে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো আইরিশ কে,প্রিয় মানুষের প্রসস্ত বুকে মাথা রাখতেই নেতিয়ে এলো শরীর, চিৎকার দিয়ে কাদতে চেয়েও পারলো না কাদতে, বিরবির করলো কেবল,

“আমার আর কেউ রইলো না আইরিশ ভাই, আপনি থাকবেনতো আমার পাশে?”

সুফির এহেন কাজে আইরিশ হতহ্বিবল, এক পলক তাকালো ফ্লোরেন্সার দিকে, ফ্লোরেন্সা চিবুক নামিয়ে ঠায় বসে আছে। আইরিশের মন চাইলো সুফিকে টেনে সরিয়ে দিতে, কারন এই বুকে থাকার অধিকার শুধু ফ্লোরেন্সার। কিন্তু নিজের ইচ্ছেটুকু নিরবে বিসর্জন দিলো আইরিশ, মেয়েটা সদ্য তার বাবা মাকে হারালো, কাদুক একটু হালকা করুক নিজেকে, আজকের মতো নাহয় সহ্য করে নিবে সবটা।

আইরিশ সহানুভূতি প্রকাশ করতে নিজের হাতটা সুফির মাথায় রেখে বললো,

“আমরা আছি সুফি, আজ থেকে তুই একা নয়, তুই আমাদের পরিবারের একজন সদস্য, আমাদের সাথেই থাকবি।”

আইরিশের এই কথাটুকুন শুনতে পেলো কি সুফি? নাহ! পায়নি তো, প্রিয় প্রেমিক পুরুষের এক বিঘে জমিন সমান বুকটায় আশ্রয় পেয়েই তো জ্ঞান হারিয়েছে অভাগি মেয়েটা।


সেই ঘটনার পর তৃতীয়তম দিন আজ,সুফির বাবা মায়ের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে খান বাড়িতে।

চারদিকে শোক শোক বার্তার সাথে আরো একটি বার্তা এসে কানে পৌছালো ফ্লোরেন্সার। গঞ্জের সবাই বলাবলি করছে লর্ড মাউন্টের পুত্র প্রিন্স জোসেফ নাকি এই গঞ্জেই ছদ্মবেশ ধারন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সবার ধারনা গঞ্জে সংঘটিত হওয়া একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা গুলো প্রিন্স জোসেফের কর্মকান্ড। কিন্তু ফ্লোরেন্সার মন সেই গুঞ্জনের বিপক্ষে, তার মন কিছুতেই সাই দেয় না জোসেফের বিরুদ্ধে এরুপ অন্যায় মন্তব্যের পক্ষে। সবার কথার বিরোধিতা কেবল শুধু সে একাই করে মুখে নয় বরং নিজের বিবেকের সাথে মনের।

সাদা সেলোয়ার-কামিজ পড়েছে ফ্লোরেন্সা, মাথায় আটসাট করে ঘোমটা দিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো , হাতের মধ্যে এক বাটি মিষ্টি। জোসেফের জন্য লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলো সে, মিষ্টি গুলো এখন তাকেই দিতে যাচ্ছে, হটাৎ করেই কেনো যানি উথাল-পাতাল লাগে, মন থেকে ওই নীল রঙা নীলাদ্রি লোকটাকে সরাতে পারে না কিছুতেই। কেমন একটা খাপছাড়া ভাব আষ্টেপৃষ্টে খামচে ধরে আছে হৃদয়৷। মন মস্তিষ্ক যেনো বারন মানে না, কথা শুনে না, নির্লজ্জের মতো স্মরণ করে দেয় মানুষ টা কে।

পা টিপেটিপে উঠোন পেরোতেই পেছন থেকে ডেকে বসলো আইরিশ,
“ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”

ফ্লোরেন্সার পা বরফের মতো জমে গিয়েছে, ভয়ে হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ।খোলা উঠোনে দুপুরের উত্তপ্ত রোদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভয়, যা এই মুহূর্তে ঝলসে দিচ্ছে ফ্লোরেন্সার কলিজা।ফ্লোরেন্সার উত্তর না পেয়ে এগিয়ে এলো আইরিশ, আইরিশ এগোনো মাত্রই তড়িঘড়ি করে মিষ্টির বাটিটা ওড়না দিয়ে লুকাতে চাইলো ফ্লোরেন্সা, কিন্তু সেখানেই ঘটলো বিপত্তি, অসাবধানতা বসত ওড়নার কিছুটা অংশ নড়চড় হওয়ায় স্পষ্ট ভাবে ধরা দিলো গলায় ঝুলানো কালো পাথরের অলংকার টি।আইরিশের নজর এড়ালো সেটি,কপাল কুচকে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো পাথর টি,

“এটা কোথায় পেলি তুই?কে দিলো?”

ফ্লোরেন্সা বড় করে শুখনো ঢোক গিললো, কি উত্তর দিবে ভাবতে পাড়ছে না কিছুতেই, জ্বিভের আগায় আটকে গিয়েছে কথা, কি করেই বা বলবে, আইরিশ ভাই যদি জানতে পারে মালাটা অন্য কোন পুরুষের দেওয়া উপহার যেটা কিনা খুব যত্ন করে গলায় স্থান দিয়েছে সে তবে তো কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে ছাড়বে। কিন্তু কি উত্তর দিবে এখন জ্বিভের ডগা অবশ হয়ে গিয়েছে প্রায়। ফ্লোরেন্সার নিরবতা রাগীয়ে দিলো আইরিশ কে, ধমকে উঠলো ওমনি,

“কি জিজ্ঞেস করেছি কথা কানে যাচ্ছে না?উত্তর দিচ্ছিস না কেনো?কে দিয়েছে এটা?”

আইরিশের ধমক শুনে কম্পিত হলো ফ্লোরেন্সার শরীর। চোখ খিচে আমতা আমতা করে বলতে চাইলো কিছু অস্পষ্ট শব্দ,

“ভা,, ভাইয়া,,, মালাটা,, আ,,আমাকে,,,,,

” মালাটা আমি ওকে দিয়েছি জনাব আইরিশ খান।”
জোসেফের উত্তর টা কর্নপাত হওয়া মাত্রই ছোট খাটো একটা ব্লাস্ট হলো যেনো।আইরিশের ললাট শক্ত হয়ে এলো রাগে,ঠাস করে থাপ্পড় বসানোর জন্য হাত উঠালো ফ্লোরেন্সার গালের উপর ফ্লোরেন্সা ঠোঁট কামড়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো এমন একটা পরিস্থিতি মুখোমুখি তার হয়তো হওয়ারই ছিলো,অনেক্ষন চোখ বন্ধ থাকার পরেও যখন নরম তুলতুলে গালে কোন আঘাত উপলব্ধি হলো না তখনি চোখ খুলে তাকালো ফ্লোরেন্সা, সামনের দৃশ্যপট যেনো থাপ্পড়ের আঘাতের চেয়েও ভয়ংকর। আইরিশের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে জোসেফ। দুজনের মুখের ভঙিমা ভিন্ন, ঠিক ঝড় উঠার আগ মূহুর্তের মতোই শান্ত জোসেফের নীল চোখ অথচ আইরিশের দৃষ্টিতে স্পষ্ট ক্রোধ, যেনো ক্রোধের জলোচ্ছ্বাসে লন্ডভন্ড করে দিবে সবকিছু,

“আপনার সাহস কি করে হয় আমার কাজে বাধা দেওয়ার? ভুলে যাবেন না আপনি আমার আশ্রয়ে আছেন।”

“মাপ করবেন জনাব,আপনার কাজে বাধা দেওয়ার ইচ্ছে আমার ছিলো না, যখন ব্যাপারটাতে আমি জড়িত আছি বাধা প্রয়োগ না করেও থাকতে পারলাম না।”

“কি বলতে চাইছেন আপনি? আপনার এমন কাজের জন্য আমি আপনার সাথে কি করতে পারি আপনার ধারনা আছে?”

“যে কোন শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আমি, তবে ফ্লোরেন্সার একটা টোকা লাগতে দিতে পারবো না, এইক্ষেত্রে আমি অপ্রস্তুত যদিও হয় তা অন্যায়।”

“ফ্লোরেন্সা এই বংশের একমাত্র কন্যা, একজন আশ্রিত হয়ে তাকে উপহার দেওয়ার সাহস কি করে দেখালেন আপনি? “

” উপহার দিতে সাহসের প্রয়োজন হয় না জনাব, আমাকে সাহায্যের বিনিময় হিসেবে একটা ছোট্ট উপহার দিয়েছি আমি, যদি সেটা সাহস দেখানো হয়, তবে এমন আরো দুঃসাহস দেখাতে প্রস্তুত আমি।”

“আপনার দুঃসাহস আমি সহ্য করবো না আপনার সেটা যানা উচিত ছিলো।”

“তবে এমন দুঃসাহস দেখানোর জন্য কি শাস্তি বরাদ্দ করা হয়েছে আমার জন্য?”

“আপনি আমার বাড়ির আশ্রিত অবশ্যই সেই দৃষ্টিকোন থেকে আপনাকে শাস্তি দেওয়া দৃষ্টিকটু দেখাবে।তবে আপনার উপর ফ্লোরেন্সা গ্রহন করবে না, আপনার উপহার আপনাকে ফেরত নিতে হবে।”

কথাটা বলে আইরিশ হাত বাড়ায় ফ্লোরেন্সার দিকে ছো মেরে ছিড়ে নিতে চাইলো মালাটা, কিন্তু তাকে আরেকটু অবাক করে দিয়ে ভীতু ফ্লোরেন্সা চেপে ধরলো পাথর টি, কাপা কন্ঠে স্পষ্ট বললো,

“এই মালাটা আমি ফেরত দিতে পারবো না ভাইয়া। আমাকে মাপ করবেন। “
এক নিশ্বাসে কথাটুকু বলে দৌড়ে চলে গেলো ফ্লোরেন্সা, আর একটু সময় ওদের দুজনের মাঝখানে থাকলে হয়তো, আত্মাটাই বেড়িয়ে যেতো।

আইরিশ থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে, ফ্লোরেন্সার কথার বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারছে না, ফ্লোরেন্সার চোখ মুখের ধরন আজ ভিন্ন, যেই আইরিশের কন্ঠের আওয়াজ পেলেই ফ্লোরেন্সা ভয়ে কুপোকাত হতো, সেই ফ্লোরেন্সা কিনা তার মুখের উপর কথা বলার সাহস দেখালো।

“একজন আশ্রিতের কাছে হারার অভিজ্ঞতা কেমন জনাব?”

আইরিশ রাগে ক্ষোভে চেপে ধরে জোসেফের কলার,
“আপনার উদ্দেশ্য কি? আমার মনে হচ্ছে আপনি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এইখানে এসেছেন?যত যাই উদ্দেশ্য থাকুক সে উদ্দেশ্য যদি ফ্লোরেন্সা ঘটিত হয় তবে আপনার হার নিশ্চিত।”

জোসেফ প্রতিক্রিয়া বিহীন ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে বললো,
“আজ পর্যন্ত হারতে শিখি নি আমি, আশা করছি এবারেও হারবো না।”

আইরিশ গর্জে উঠলো,
“তবে এটাও মাথায় ঢুকিয়ে নিন,স্বয়ং আইরিশের সাথে শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছেন আপনি, এর ফল কিন্তু ভয়ংকর হবে, সময় এবং সুযোগ যেদিন আপনার পরিচয় ধরিয়ে দিবে সেদিন কেউ রক্ষা করতে পারবে না আপনাকে।”

“তাই হোক, সময়ের উপর ছেড়ে দিলাম, সমের স্রোত যেদিকে বইবে সেদিকেই বহমান হবে আমার ভাগ্য।”

অথচ মনে মনে আওড়ালো অন্যকথা,
“এই ক্ষুদ্র হার টুকু সহ্য করতে পারলেন না অথচ এর চেয়ে বড় হার আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে, তখন কি করে সহ্য করবেন জনাব?”


সেই দুপুর থেকে ঘরে খিল মেরে বসে আছে ফ্লোরেন্সা, এই পর্যন্ত ঘরের বাহিরে বেড়োনোর সাহস করে উঠতে পারে নি, পাছে যদি আইরিশের সামনে পড়ে যায় তবে নির্ঘাত মেরে গাল ফাটিয়ে দিবে, তার চেয়েও বড় চিন্তা হলো যদি মালাটা কেড়ে নেয় তবে আর তো বাধা দিতে পারবে না সে, কেনো যানি মালাটার প্রতি আলাদা টান অনুভূত হয় তার,এক অদ্ভুত অনুভুতি কেনো যানি খুবলে খায় হৃদয়, আচানক এমন অনিয়ন্ত্রিত অনুভুতির সাথে পেরে উঠছে না ফ্লোরেন্সা, এক প্রকার হাফিয়ে উঠার জো।এমন ঘটনা এর আগে ঘটেনি তার সাথে,এটি কিসের লক্ষন নির্বোধ বালিকা ভালোই আচ করতে পারছে।তবে মুখে স্বীকার করার মতো কুন্ঠা কাটিয়ে উঠতে পারছে না, জটিল মানুষটার জটিলতা ভরা হৃদয়ে তার মতো সরল মেয়ের জন্য কি একই রকম অনুভুতি হয়? নাকি এই অযাচিত অনুভুতি কেবল তার, তাকে দগ্ধ করার জন্যই উঠে পরে লেগেছে।

দরজায় করাঘাত করার শব্দে ধ্যান ছুটলো ফ্লোরেন্সার।দরজার বাহিরে দাড়িয়ে ডাকলো সুফি,

“ভেতরে আসবো ফ্লোরেন্সা।”

“তোর আসার জন্য কি অনুমতির প্রয়োজন আছে?”

দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো সুফি, গিয়ে বসলো ফ্লোরেন্সার পাশে, ফ্লোরেন্সা জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকানো মাত্রই সুফি ঠোঁট নাড়ালো,

“একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ফ্লোরেন্সা?”

“হ্যাঁ বল না, একটা কেনো হাজারটা প্রশ্ন কর।”

“প্রিন্স জোসেফ কে তুই,,,,,,”

“আমি বুঝতে পারছি তুই কি জানতে চাইছিস, কিন্তু বিশ্বাস কর আমি হাপিয়ে যাচ্ছি কেনো যানি, এই অনুভুতির নাম জানি না আমি তবে হুট করে ভালোবাসার কথাও বলতে পারি না, এতো অল্প পরিচয়ে কাউকে ভালোবাসা অসম্ভব।”

“তবে তুই বলতে চাইছিস না চাইতেও তুই ওনাকে ভালোবেসে ফেলেছিস?”

“আমি তেমন কিছু বুঝতে পারছি না, সব গুলিয়ে যাচ্ছে রে।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সুফি,দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“আইরিশ ভাই তোকে খুব ভালোবাসে ফ্লোরেন্সা ওনাকে কষ্ট দিস না উনি কষ্ট পেলে আমিও খুব কষ্ট পাবো।”

আচমকা সুফির এমন কথা শুনে চকিতে তাকালো ফ্লোরেন্সা, চোখের পাতায় বিস্ময়, নেত্রমনিতে টলটলে জলের আভা,জড়িয়ে জড়িয়ে বললো,

“কি সব বলছিস সুফি?আইরিশ ভাই আমাকে কেনো,,,”

“আমি একটু কষ্ট পাই নি ফ্লোরেন্সা, আইরিশ ভাইয়ের চেয়েও তুই আমার কাছে বেশি প্রিয়, আইরিশ ভাই আমার প্রিয় মানুষ কে ভালোবেসেছে এতে আমার একটুও খারাপ লাগছে না।”

“কিন্তু আমি আইরিশ ভাইয়া কে ভাই ছাড়া অন্য কোন দৃষ্টিতে দেখি না।”

ফ্লোরেন্সার মুখ চেপে ধরলো সুফি, ছলছলে নয়নে তাকিয়ে বললো,

“এই কথা মুখে আনিস না ফ্লোরেন্সা, আইরিশ ভাই খুব কষ্ট পাবে, উনাকে আমি কষ্ট পেতে দেখতে পারবো না। তুই দয়া করে তোর সব অনুভূতি বিসর্জন দে, আইরিশ ভাইকে একটু ভালোবাস।”

“এসব তুই কি বলছিস সুফি? আইরিশ ভাই তোর, তোর মতো করে ভাইয়াকে কেউ ভালোবাসতে পারবে না।”

সুফি জড়িয়ে ধরলো ফ্লোরেন্সাকে, ভেতরটা ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে যেনো, আজ দুপুরে উঠানে ওদের তিনজনের কথপোকথন শুনেছে সুফি আর তখনই যা বুঝার বুঝে গিয়েছে। যে পুরুষের মনে অন্য নারীর বসবাস সে পুরুষকে ভালোবেসে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার কোন মানেই হয় না, অথচ সুফি যানে এই মানুষটা কে ভালো না বাসলে মৃত্যু যন্ত্রণার মতোই কষ্ট হবে তার।

“ওই নিষ্ঠুর পুরুষ আমাকে ভালোবাসে না ফ্লোরেন্সা, উনি তোকে ভালোবাসে, তুই দয়া করে উনাকে একটু ভালোবাসা দিস। আমি,,,,

সুফির কথা শেষ না হতেই মধ্যভাগে উপস্থিত হলো আইরিশ। আইরিশ কে দেখে অপ্রস্তুত ভঙিতে চোখের পানি মুছলো সুফি। ফ্লোরেন্সা ভয় এবং জড়তা কন্ঠে শুধালো,

” ভাইয়া আপনি? আপনি এইসময় এইখানে কেনো?”

আইরিশ সুফির দিকে তাকালো। সুফি বুঝে গেলো আইরিশের চোখের ভাষা। চলে যাওয়ার জন্য উদ্যোত হয়ে ফ্লোরেন্সার উদ্দেশ্যে বললো,
“তোর কথা বল আমি আসছি। “

ফ্লোরেন্সা চট করে চেপে ধরলো সুফির হাত,মাথা নাড়িয়ে বারন করলো যেতে।সুফি বিরস মুখে আলগোছে হাত ছাড়িয়ে নিলো ফ্লোরেন্সার, ঠোঁট কামড়ে দমিয়ে নিলো কষ্ট, দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে গেলো কক্ষ থেকে।

সুফি যাওয়া মাত্রই আইরিশ এগিয়ে আসলো ফ্লোরেন্সার দিকে, পকেট থেকে বের করলো একটি আংটির বাক্স, বাক্সটা খুলতেই কেমন ঝিলিক দিয়ে উঠলো ফ্লোরেন্সার চোখ, আংটিতে খচিত পাথর টা অদ্ভুত রকমের দ্যুতি বেড়োচ্ছে,ফ্লোরেন্সা অবাক নয়নে তাকালো আংটিটির দিকে,আইরিশ নিরবে টেনে আনলো ফ্লোরেন্সার তুলতুলে হাত, স্বযত্নে পড়িয়ে দিলো ফ্লোরেন্সার অনামিকায়,গম্ভীর কন্ঠে একদলা অনুভুতি মিশিয়ে বললো,

“আমার সারাজীবনের উপার্জন দিয়ে ক্রয় করেছি পৃথিবীর মহামূল্যবান পাথর আলেকজান্দ্রিত খচিত আংটি, এই আংটি দিয়ে আমি আমার আলেকজান্দ্রা কে নিজের অধিকারস্ত করে নিলাম।আজ থেকে আমার আলেকজান্দ্রার উপর কারো হস্তক্ষেপ চলবে না।”

চলবে,,,,,,,,,

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply