সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_১২
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
আকসা পাঁচ মিনিট যাবত ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেজবাহ ওকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি এখনো৷ ও ঘরের বাইরে থেকে ভেতরে মেজবাহকে ড্রয়ারে নিজের জামাকাপড় ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখতে দেখে আর প্রবেশ করেনি। বাইরে থেকেই দরজায় কড়া নেড়েছে। তবে মেজবাহ এখনো অবধি ওকে ভেতরে প্রবেশের কথা কিছু বলেনি। আকসার বরাবরই ধৈর্য কম। পাঁচ মিনিট ওর কাছে কালক্ষেপণে অনেকটা সময়। এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওর পায়ে ঝিম ধরে গেছে। আকসা ফোন স্ক্রল করে সময় কাটাতে লাগলো। নিউজফিডে ঢুকে সবে একটা রিলস দেখতে ব্যস্ত হয়েছে, তখনই ঘরের ভেতর থেকে গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসলো।
“ভেতরে আসো”— কথাটা শোনামাত্র-ই আকসা আর বিলম্ব না করে চটজলদি ভেতরে প্রবেশ করলো। সর্বপ্রথম ওর চোখ বিছানার দিকে গেল। লাগেজটা বিছানার ওপরে হাট করে মেলে রাখা। মেজবাহ কিসব ইংরেজি বই পড়ে, সেগুলোও বিছানার ওপরেই রাখা৷ মেজবাহ’র ঘরে একটা মাঝারি আকৃতির বুকশেলফ আছে। সেখানেই বইগুলো অবস্থান করে সর্বদা। ইংরেজির প্রতি বরাবরই অনীহা থাকায় আকসা কখনো বইগুলো ছুঁয়েও দেখেনি। মেজবাহ বোধহয় বাসায় ফিরেই নিজের ঘরের সব জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত হয়েছে। ঘরটা দেখে আপাতত সেরকম-ই মনে হচ্ছে আকসার। বেশ পরিপাটি লাগছে।
মেজবাহ বইপত্র সব একত্র করতে ব্যস্ত। আকসা ওর পেছনে মিনিটখানেক যাবত দাঁড়িয়ে আছে। তবু যেন মেজবাহ ওকে তোয়াক্কা করছে না। উপেক্ষায় শেষমেশ অধৈর্য হয়ে আকসা-ই উৎকন্ঠার সহিত বলে উঠলো, “ডেকেছেন?”
“না ডাকলে তোমার এখানে উপস্থিত থাকার কথা?”
আকসার প্রশ্নের বিপরীতে পেছনে ঘুরে মেজবাহ পাল্টা প্রশ্নটা করলো। সুক্ষ্মভাবে অপমান। ক্ষণিকের জন্য আকসা হজম করে নিলো। মেজবাহ লাগেজের বাকি জামাকাপড় ড্রয়ারে রাখতে রাখতে আকসাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “সাড়ে আটটা বাজে এখন। নয়টার মধ্যে রেডি হবে। এক মিনিটও লেট হয় না যেন।”
শেষোক্ত কথাতে একটু সতর্কবাণী শোনা গেল। আকসা জিজ্ঞাসা করতে গেল, “কিন্তু এখন রেডি হবো কেন? কোথায় যাবো এতো রাতে?”
কিন্তু মেজবাহ ওর প্রশ্ন শুনেও শুনলো না। শার্ট-প্যান্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। আকসা হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। কি হচ্ছে, কি করবে— কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এমন হুটহাট তৈরি হবেই বা কেন? আকসা উদ্বিগ্নভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ঘরের বাইরে বের হলো। ড্রয়িংরুমে বাচ্চাকাচ্চা সবাই বসে হৈ-হট্টগোল করছে। বাড়ির অধিকাংশ পুরুষেরা বাইরে। মহিলারা রান্নাঘরে রান্না করতে এবং গল্প-গুজবে ব্যস্ত। আকসা ড্রয়িংরুমে টিভি-কেবিনেটের একপাশে দাঁড়িয়ে নখ কামড়াতে লাগলো। তখনই কোথা থেকে ছোট চাচি ছুটে এসে খপ করে আকসার হাত ধরলেন। অস্থিরভাবে বললেন, “তুমি এখানে মা! তোমাকে আরো সারা বাড়িতে খুঁজছি আমি। চলো আমার সাথে।”
ছোট চাচি আকসাকে টেনে তার ঘরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। আকসা উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “কী হয়েছে চাচি?”
ছোট চাচি ওকে তার নিজের ঘরে নিয়ে এসে আলমারি খুলে জামাকাপড় ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে জবাব দিলেন— “আজ তোমাদের মেজবাহ’র এক বড়ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত। ছেলেটার নাম রিফাত। মেজবাহ’র আসার খবর শুনেই নাকি ছেলেটা তার বউকে নিয়ে তোমাদের জন্য রাতের খাবার আর বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করেছে। আরো কারা জানি থাকবে। মেজবাহকে ফোন করেছে কিছুক্ষণ আগে। মেজবাহ প্রথমে যাওয়ার ব্যাপারে না করে দিয়েছিল। কিন্তু ছেলেটা একা হাতে সব কষ্ট করে করেছে বলে পরে মেজবাহ কল করে জানালো, যাবে সেখানে। না গেলে আবার মন্দ দেখায়। রিফাত বলেছে, অবশ্যই যেন তোমাকে নিয়ে যায় মেজবাহ। ওদের বাসা একটু দূরে তো। মফস্বলের ওদিকে। যেতে অনেকটা সময় লাগবে। তাই মেজবাহ তাড়াহুড়ো করছে। আমাকে বললো, তোমাকে যেন জলদি তৈরি করিয়ে দিই। শাড়ি-টাড়ি পড়ে একটু বউয়ের মতো সেজে যেও, বুঝেছো মা? নতুন বিয়ে হয়েছে তো তোমাদের, মেজবাহ’র পরিচিতজনের বাসায় যাচ্ছো; দেখে যেন বোঝা যায়, তুমি নতুন বউ। নাও এই শাড়িটা পরো এখন। আমার শাড়ি এটা। তোমার চাচা একবার টাঙ্গাইলে গিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। অনেক যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। তুমি পরলে খুব খুশি হবো।”
একটা গাঢ় বেগুনি রঙের কাতান-বেনারসি শাড়ি আকসার হাতে ধরিয়ে দিলেন ছোট চাচি। শাড়িটা ভীষণ সুন্দর। আকসার শাড়ির প্রতি অবসেশনটা বরাবরই অনেক বেশি। শাড়ি সংগ্রহের প্রতিও বড্ড ঝোঁক আছে ওর৷ একবার শপিংমলে ঠিক এরকম রঙের প্রায় কাছাকাছি নকশার একটা শাড়ি দেখেছিল ও। তবে সেদিন ওর আম্মুর তাড়া থাকায় আর কেনা হয়নি। সেই আফসোস আকসার আজও মেটেনি। তবে এই শাড়িটা হাতে পেয়ে মনে মনে বড্ড আনন্দিত হলো ও। শাড়িটা হাতে নিয়ে বুলিয়ে দেখতে লাগলো। ছোট চাচি ওকে তাড়া দিলেন তৈরি হওয়ার জন্য। আকসা দ্রুত চাচিদের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজেদের ঘরে গেল। দেখলো, মেজবাহ ততক্ষণে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। আকসা এই ফাঁকে দ্রুত পেটিকোট আর ব্লাউজ বের করে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
.
.
“জি ভাইয়া, আমি আর আমার ওয়াইফ আসছি। হ্যাঁ হ্যাঁ, শিওর। আমি কথার খেলাপ করি না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমরা শিওর আসছি। এইতো ধরেন, আনুমানিক সাড়ে নয়টা বেজে যাবে। আচ্ছা.. আচ্ছা। ভাবীকে বেশি কষ্ট দিয়েন না। সিম্পলি কিছু করলেই হবে। রাখছি তাহলে এখন।”
রিফাত ভাইয়ার সাথে কথা বলা শেষ করে মেজবাহ ফোনটা রেখে ব্যালকনি থেকে ঘরে প্রবেশ করতেই একমুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আকসা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি নিয়ে আঁতিপাঁতি করছে। মেজবাহ’র হাতে থাকা ফোনটা আরো বেশি শক্তভাবে মুঠোবন্দী হলো।
আকসা শাড়ি খুব ভালোভাবেই পরতে পারে। এমনকি, বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে পরিচিত মেয়েদের পরিয়েও দিয়েছে বহুবার। তবে এই শাড়িটা তুলনামূলক যথেষ্ট বড়। এজন্য আকসার একা হাতে সবটা সামলে পরতে একটু কষ্ট হচ্ছে। কেউ এসে যদি আঁচলটাও মিনিট কয়েকের জন্য ধরে রাখতো, তবে ওর জন্য একটু সুবিধা হতো। মেজবাহকে দেখে আকসা তড়িৎ গতিতে ব্লাউজের খোলা পিঠের ওপর সামনের চুলগুলো টেনে ছড়িয়ে দিলো, যাতে পিঠ দেখা না যায়। আকসা ভাবলো, এখনই মেজবাহ এসে ওকে বলবে, “শাড়ি পরতে আমি হেল্প করি তোমাকে?”
আকসা তখন নিজের খোলা চুলগুলো মেজবাহ’র মুখের ওপর ঝাপ্টা মেরে খুব ভাব নিয়ে জবাব দেবে, “না। আমার কারো সাহায্যের দরকার নেই। আপনি আসতে পারেন।”
আকসা অপেক্ষা করতে লাগলো, কখন মেজবাহ এগিয়ে এসে এই কথা বলবে এবং বিপরীতে ও কড়া জবাবটা দেবে। তবে এমন কিছুই ঘটলো না। মেজবাহ মিনিটখানেকের মতো দাঁড়িয়ে থেকে এরপর গটগট পায়ে হেঁটে ওকে পাশ কাটিয়ে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। আকসা হতবুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো শাড়ির আঁচল হাতে নিয়ে।
.
.
মেজবাহ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গেইটের সামনে। আকসাকে একবার রিমুকে দিয়ে ডাকতে পাঠিয়েছে। এমনিতেই দেরি হয়ে যাচ্ছে। তারওপর এই মেয়ে আরো বেশি দেরি করছে। মেজবাহ বারবার হাতঘড়িতে সময় দেখছে। সহজে অধৈর্য হয় না ও। তবে এদিকে রিফাত ভাইয়া কল দিচ্ছেন বারবার। এজন্যই মেজবাহ আকসার দেরি করাতে বিরক্ত হচ্ছে বেশ। ও মুখ উঠিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো, কেচিগেইট খুলে বের হচ্ছে আকসা। মেজবাহ’র ভ্রু স্বয়ংক্রিয়ভাবে কুঁচকে গেল। আকসার পরনে বেগুনি রঙা শাড়ি। কানে আর গলায় স্বর্ণের দুল এবং গহনা। নাকে ছোট্ট একটা ডাল আকৃতির নাকফুল। হাতে দু’টো চিকন বালা। পায়ে সেমি হিল। মেজবাহ মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। আকসা দ্রুত তাড়াহুড়ো করে হেঁটে এগিয়ে এসে বললো, “চলেন।”
“ওঠো।”
মেজবাহ’র গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে আকসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “উঠবো মানে?”
“বাইকে ওঠো!”
“বাইকে? কেন?”
“তো কি আমার মাথায় উঠতে চাচ্ছো?”
আকসা হতভম্ব হলো। আমতাআমতা করে বললো, “আমি বাইকে উঠি না কখনো। এমনকি ভাইয়ার বাইকেও না। ভয় লাগে আমার। গাড়িতে চলুন না প্লিজ।”
“আস্তে চালাবো, উঠে এসো।”
মেজবাহ বাইকে উঠে বসে শান্ত স্বরে কথাটা বলতেই আকসা এবার কিছুটা ভরসা পেল। হাতের আড়ং থেকে সপ্তাহ দুয়েক আগে কেনা নতুন পার্সে ফোনটা রেখে উঠে বসলো বাইকে। আকসা উঠতেই মেজবাহ বাইক স্টার্ট দিলো।
.
.
আকসার মাথা ঘুরছে। সামনের দিকে ভয়ে তাকাতে পারছে না ও। বাইকের স্পিড এতোটা বেশি! রীতিমতো ভয় হচ্ছে আকসার। এটা বড় রাস্তা। দু’ভাগের সমান রাস্তাটা এদিকে এসে প্রায় একভাগ হয়ে গেছে। মেজবাহ বাইকে ওঠার আগে ওকে বলছিল, আস্তে চালাবে। অথচ এখন এতোটা জোরে চালাচ্ছে যে মনে হচ্ছে, সামনে গিয়েই বোধহয় আছড়ে পরবে বাইকটা। অথচ দু’পাশ দিয়ে বড় বড় বাস-ট্রাক যাচ্ছে। রাস্তার পাশে সারি সারি গাছপালা, ঢালুতে ধানক্ষেত। যেকোনো সময় বিপদ ঘটতে পারে।
এবার মেজবাহ বোধহয় সর্বোচ্চ স্পিডে বাইক চালাচ্ছে। আকসার চুল বাতাসে উড়ছে অনবরত। শাড়ির আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল আকসা। এবার ওর বুক ধ্বক করে কেঁপে উঠলো। ও দ্রুত মেজবাহ’র বুকে দুই হাত জড়িয়ে ধরে রেখে জোরে গলায় অস্থিরভাবে প্রশ্ন করলো, “কি করছেন মেজবাহ?! এতো জোরে বাইক চালাচ্ছেন কেন?”
আকসার কন্ঠ শুনে মেজবাহ বাইকের স্পিড আরো বাড়িয়ে দিলো। মৃদু হেঁসে জবাব দিলো, “অ্যাজ মাই উইশ।”
“প্লিজ আস্তে চালান মেজবাহ। ভয় পাচ্ছি আমি। অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে তো!”
“স্যে স্যরি।”
“হোয়াট?!”
মেজবাহ’র কথা শুনে চরম আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলো আকসা। মেজবাহ নির্বিকারভাবে পুনরায় বললো, “স্যে স্যরি।”
আকসা এতোক্ষণে বুঝতে পারলো পুরো ব্যাপারটা। মেজবাহ কেন এতো স্পিডে বাইক চালাচ্ছে, সেটাও বুঝে গেল ও। ইঙ্গিতটা বোঝা ওর জন্য খুব একটা কঠিন নয়। আকসা হতবিহ্বল হয়ে গেছে৷ সামান্য একটা কারণের জন্য মানুষ এমন করতে পারে? তবে এই মুহূর্তে বিরোধ করা জরুরি নয়। মেজবাহ ওকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে বাইকের স্পিড আরো বাড়িয়ে দিলো। একটা বড় ট্রাক একদম মেজবাহ’র বাইকের গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। আকসা প্রায় কেঁদেই ফেললো। পেছন থেকে নিজের হাতদু’টো মেজবাহ’র বুকে জড়িয়ে ধরে শার্টের কাছের অংশটুকু শক্তভাবে আঁকড়ে কান্নারত আকুল কন্ঠে বলে উঠলো, “স্যরি মেজবাহ। না বুঝে ভুল করে ফেলেছি। একটা বাজে মজা করে ফেলেছি। আপনার গায়ে পানি ফেলা উচিত হয়নি আমার। আর কখনো এমন করবো না। রিয়েলি স্যরি।”
আকসার আকুল কন্ঠস্বর আর ‘স্যরি’ শব্দটা শুনে মেজবাহ এবার বাইকের গতি কমিয়ে দিলো। হালকা হেঁসে বিরবির করলো, “ট্রিট ফর ট্যাট!”
চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৯
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৫
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় গল্পের লিংক
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১১
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৩
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১০