শেষপাতায়সূচনা [৪৫.১]
সাদিয়াসুলতানামনি
সাত সকালে অনবরত ফোনটা বেজেই চলেছে। পূর্ণতা ঘুমের ঘোরেই বিরক্তবোধ করে। তার স্বাস্থ্যের দ্রুত উন্নতির জন্য প্রচুর ঘুমের প্রয়োজন ডাক্তার বলেছে। রাতে যেন নিরবিচ্ছিন্ন, ভালো একটা ঘুম হয় তাই তাকে পুনরায় অল্প পাওয়ারের ঘুমের ঔষধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে ঘুমের ঔষধ নেওয়ার জন্য। দুইদিন পরপর একটা স্লি”পিং পিল নিবে পূর্ণতা। একমাস এমন ভাবে চলবে। এরপর ডাক্তার তার রিপোর্ট দেখে পরবর্তীতে কীভাবে কি করতে হবে সেটা বলবে।
সেই নিয়ম অনুযায়ী কাল রাতে স্লি”পিং পিল নিয়েছিলো পূর্ণতা। তাই আজ ঘুমটা তার কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। বহু কষ্ট করে চোখটা টেনেটুনে খুলে ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগায়। কিন্তু এরপর যা শুনে তাতে তার সব ঘুম হাওয়া হয়ে যায়। ফোনের অপর পাশে থাকা ইন্সপেক্টর হাবিবউল্লাহ মাহমুদ বলেন–
—ম্যাম, একটা ব্যাড নিউজ আছে। আঞ্জুমান হসপিটাল থেকে পালিয়েছে।
কথাটা শোনা মাত্র পূর্ণতা তার আধবোজা চোখ মেলে তাকায় আর শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসে। তার এমন করে বসায় তাজওয়াদ তার বুকে উপর থেকে সরে গিয়ে পাশের বালিশে পড়ে। বেচারার ছোট কুটুমুটু নাকটা বালিশের সাথে বা”রি লাগায় ঘুমের ঘোরেই সে ফুঁপিয়ে ওঠে। পূর্ণতা ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে আবারও ঘুম পাড়ায়। তাজওয়াদের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে পূর্ণতা চাপা গলায় দাঁত কিড়মিড়িয়ে ইন্সপেক্টরকে জিজ্ঞেস করে–
—আর ইউ কিডিং উইথ মি ইন্সপেক্টর? আপনাদের তত্ত্বাবধানে থেকে একজন দাগী আসামি পালালো কি করে?
নিজেদের ব্যর্থতায় কারণে ইন্সপেক্টর হাবিবের মাথা নুইয়ে যায় লজ্জায়। সে অনুতপ্ত হয়ে বলে–
—ম্যাম, আমরা তার পাহারায় আমাদের একজন কনস্টেবলকে নিয়োজিত করেছিলাম। কনস্টেবলটি আজ ফজরের সময় নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অন্যান্য দিনের ন্যায় একজন নার্স আঞ্জুমানের কেবিনে রেখে যায় নিজের অনুপস্থিতিতে আঞ্জুমানকে পাহারা দিতে। কিন্তু ঐ নার্সটিই মূলত আঞ্জুমানকে পালাতে সাহায্য করেছে।
—হোয়াট? এসব কি বলছেন আপনি? হসপিটালের নার্স?
—হ্যাঁ, ম্যাম। আজ আঞ্জুমানকে পুলিশ কাস্টাডিতে নেওয়ার কথা ছিল তার শরীরের অবস্থা একটু উন্নত হওয়ায়। কিন্তু ভোররাতে সে এক নার্সের সহযোগিতায় পালিয়ে যায় হসপিটালের পেছনের রাস্তা দিয়ে। সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে আমরা পাই, একটা গাড়ি আগের থেকেই সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা ঐ গাড়ি করেই পালায়। সিসিটিভি ফুটেজে আরো দেখা যায়, নার্স মেয়েটিকে দুটো পুরুষ টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। এর থেকে আমরা ধারণা করছি, নার্সটিকে ওরা নিজেদের সাথে জোর করে নিয়ে গিয়েছে, যাতে নার্সটির মাধ্যমে আমরা ওদের পর্যন্ত না পৌঁছাতে পারি।
সেদিন পূর্ণতার হাতে বাংলাওয়াশ হয়ে আঞ্জুমানের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, তাকে ইমিডিয়েটলি হসপিটালে ভর্তি করা হয়। ক্ষ”তবিক্ষ”ত শরীর, ভা”ঙা হাত ও মুখের একপাশ থেঁতলে যাওয়া আঞ্জুমানকে ডাক্তাররা কয়েকদিন হসপিটালে রাখার পরামর্শ দেয়। পুলিশ ডাক্তারদের পরামর্শ গ্রহণ করে একজন কনস্টেবলের নজরদারির মাধ্যমে আঞ্জুমানকে হসপিটালেই রাখে। সে একটু সুস্থ হয়ে ওঠায়, গতকাল ডাক্তার আঞ্জুমানকে হসপিটাল থেকে ছুটি দিয়ে দেয়। আজ সকালেই তাকে কারাগারে নেওয়া হতো, কিন্তু তার আগেই সে পালিয়ে গেলো।
ইন্সপেক্টরের কথা শুনে পূর্ণতার কপালে বেশ কয়েকটা চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে। কারা আঞ্জুমানকে সহায়তা করলো পালাতে? সেই পুরুষ দুটোই বা কে ছিলো? ইত্যাদি প্রশ্নগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।
পূর্ণতা তার ভাবনা থেকে বের হয়ে এসে বলে–
—আচ্ছা আপনারা আঞ্জুমানের পালিয়ে যাওয়া গাড়ি নাম্বার দেখতে পেয়েছেন সিসিটিভি ফুটেজে? তাহলে তো ঐটার মাধ্যমে হলেও আঞ্জুমানকে ধরা যেতে পারে।
—আমরা এটাই করতাম যদি পসিবল হতো। কিন্তু ঐ গাড়ির কোন নাম্বার প্লেটই ছিল না।
—আর যেই পুরুষ দু’টি নার্সটিকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছেন ইন্সপেক্টর?
—সরি টু সে, ম্যাম আমরা এখনও তাদের সম্পর্কে কিছু জানতে পারি নি। আসলে তাদের মুখ কাপড় দিয়ে পেঁচানো ছিলো বলে তাদেরকে শনাক্ত করতে পারা যায়নি।
ইন্সপেক্টরের এত এত নেতিবাচক উত্তর পেয়ে পূর্ণতার মেজাজ গরম হয়ে যায়। সে কর্কশ গলায় বলে–
—আপনারা বুঝতে পারছেন, ওরা পালানোর মানে কি? ও কতবড় একটা সাইকো ক্রিমিনাল সবটা তো জানেনই আপনারা। আপনাদের কি উচিত ছিলো না, আরেকটু সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়া এই বিষয়ে?
—আমরা বুঝতে পারছি ম্যাম আপনার উদ্বেগ। আমরা আমাদের লোকদের লাগিয়ে দিয়েছি ইতিমধ্যেই আঞ্জুমানকে খোঁজার জন্য। শহরের বাহিরে যাওয়ার সড়ক গুলোয় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আশা রাখছি, তাড়াতাড়ি খুঁজে পাবো আমরা তাকে।
—আপনার কি মনে হয়, ওরা এখনও শহরে ঘাপটি মে”রে বসে আছে? যেখানে ওরা জানেই, ওদের পেছনে পুলিশ ও পূর্ণতা হাত ধুয়ে পড়ে আছে।
পূর্ণতার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না ইন্সপেক্টর। মৌনতা অবলম্বন করে। ইন্সপেক্টেরের নীরবতা পূর্ণতাকে আরো রাগিয়ে দেয়। সে কাঠকাঠ গলায় বলে–
—যা করার তাড়াতাড়ি করুন। আমার ছেলে আর ফ্যামিলির উপর ঐ আঞ্জুমানের কালো থাবা পুনরায় পড়ার আগে।
—জি ম্যাম।
পূর্ণতা কল কেটে ফোনটা বেডের উপরই দূরে ছুঁড়ে মা”রে। তারপর নিজের মাথার চুল খামচে ধরে ভাবতে থাকে, কে আঞ্জুমানকে এত বড় সহায়তা করলো? জাওয়াদের নানাবাড়ির কেউ? নাকি অন্যকেউ?
বেলা বাড়ার সাথে সাথে আঞ্জুমানের পালানোর খবরটা সবার মাঝে ছড়িয়ে যায়। সকলে বেশ উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হয়ে পড়ে এমন একটা খবর পেয়ে। আরিয়ান খাবারের প্লেটে হাত রেখে চিন্তিত গলায় বলে–
—তাহলে বোনু, তোকে আর তাজওয়াদকে বর্তমানে সেইফলি থাকতে হবে। ঐ অসভ্য মেয়েটা যা কিছু করে দিতে পারে তোদের।
—হুম ভাইয়া। টনি আমাদের সাথে তো থাকেই সবসময় ছায়ার মতো। এছাড়াও ভাবছি, ছেলেটাকে বাড়ি থেকে বের করাবো না বেশি একটা। আর বাড়িতে আরো বেশি গার্ড নিয়োগ দিবো।
—এটাই ভালো হবে মামনি। আরিয়ান তুমি আজকের মধ্যেই বিশ্বস্ত কোন এজেন্সি থেকে গার্ড হায়ার করো।
ছেলেকে নির্দেশ দিয়ে কথাটি বলেন আহনাফ সাহেব। তারপরের সময়টা সকলেই চুপচাপ নাস্তা করতে থাকে। তাজওয়াদ খেতে খেতে বড় নানাভাই, আলু মামা আর মাম্মার কথা শুনছিলো। তাদের সব কথা না বুঝতে পারলেও, গার্ড রাখার কথা ও তাকে বাহিরে না নিয়ে যাওয়ার কথাটা ঠিকই বুঝতে পেরেছে সে। দু’টো বিষয়ের একটা বিষয়ও তার ভালো লাগে না।
তাজের মাম্মাকে সেইফটি দেওয়ার জন্য টনি আঙ্কেল আর তাজ তো আছেই। তাহলে আরো গার্ড লাগবে কেন? আর তাকেই বা বাহিরে যেতে দিবে না কেন? সেই কতগুলো দিন আগে স্কুলে গিয়েছিল, তারপর জ্বরের কারণে বাসায় ছিলো দুটো দিন। এরপরই তো মাথা ফাটিয়ে কতদিন হসপিটালে ভর্তি ছিল। বিগত দিনগুলোতে বাসা টু হসপিটাল আর হসপিটাল টু বাসা করতে করতে তাজ বিরক্ত। তাই সে চায়, আজ তার বিরক্তিখানা সকলের কাছে পেশ করবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। মুখের খাবারটুকু তাড়াতাড়ি শেষ করে তাজওয়াদ শুরুতেই তার বড় নানাভাইকে বলে–
—নানাভাই, আমি তু আচি মাম্মাল বডিগার্ড, টনি আঙ্কেল আচে। তাও কেনু আলো বডিগার্ড নিবে? তাজ একাই সব পঁচা লোকদেল পাঞ্চ দিয়ে উলিয়ে দিতে পালবে।
তাজওয়াদের কথা শুনে সকলের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। আহনাফ সাহেব নাতিকে বলেন,
—তা তো আমরা জানিই আমাদের তাজওয়াদ নানা ভাই কতটা শক্তিশালী। কিন্তু বর্তমানে সে তো অসুস্থ। হাতে ব্যথা পেয়েছে, মাথায় ব্যথা পেয়েছে। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে সে কি করে পঁচা লোকদের পাঞ্চ দিবে?
বড় নানাভাইয়ের কথা শুনে তাজওয়াদ ভাবুক হয়ে যায়। সে ভেবে দেখে, নানা ভাই ঠিকই বলছে। তাজওয়াদের নিজেরই বর্তমানে মাম্মার হেল্প নিয়ে সব কাজ করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সে পারবে না পঁচা লোকদের পাঞ্চ দিয়ে উড়িয়ে দিতে। কথাগুলো ভেবেই তার মুখটা মলিন হয়ে যায়। মনটা খারাপ লাগতে শুরু করে। ইশশশশশ! সে যদি সুস্থ থাকত তাহলে মাম্মার বডিগার্ড হিসেবে সব দায়িত্ব পালন করতে পারত। মা পাগল তাজওয়াদের সব ভাবনা-চিন্তা একমাত্র তার মাকে কেন্দ্র করেই।
তাজওয়াদ মলিন গলায় বলে–
—মাম্মা, আমাকে বেচি বেচি ওসুদ খাওয়াবে, যাতে তাজ তালাতালি ভালু হয়ে গিয়ে তোমাকে প্রটেক্ট কলতে পালে পঁচা লোকদেল থেকে।
নিজের জন্য ছেলের এত ভাবনা দেখে পূর্ণতা আবেগাপ্লুত হয়ে যায়। ছেলেটা এইটুকু বয়সেই মায়ের কথা কত ভাবে। সে ছেলের চেয়ারটা আরেকটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে তার কপালে একটা চুমু দিয়ে বলে–
—তোমার এত টেনশন করতে হবে না সোনা। তোমার মাম্মা একাই একশ পঁচা লোকদের পাঞ্চ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবে। তুমি শুধু মাম্মার কথা শুনো, এই ব্যথা হাত নিয়ে বেশি দুষ্টুমি করো না। তাহলেই মাম্মা খুশি।
তাজওয়াদ ভদ্র বাচ্চার মতো মাকে কথা দেয়, সে আর দুষ্টুমি করবে না হাত না ভালো হওয়া পর্যন্ত।
আরিয়ান অফিসে চলে যায়। বাসায় রয়ে যায় আহনাফ সাহেব, পূর্ণতা ও তাজওয়াদ। বেলা এগারোটার দিকে আহমেদ ম্যানশনে কয়েকজন আসে। কলিংবেল দিতেই ড্রয়িংরুমে বসে থাকা পূর্ণতা ও তাজওয়াদ দরজার দিকে তাকায়। মালতী কাকী তখন দুপুরের রান্নার জোগাড়জন্ত করছিল বলে, পূর্ণতা নিজে গিয়েই দরজা খুলে দেয়।
কিন্তু দরজা খুলে আগন্তুকদের দেখে পূর্ণতার চোখ রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে যায়। সে ভাবতেও পারেনি, তারা আসবে।
—জিনিয়া, দাঁড়াও আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে।
ক্লাস থেকে বের হয়ে মাত্রই ফোনটা বের করে টনিকে কল করছিলো জিনিয়া, তখনই সিফাত তাকে পেছন থেকে ডেকে ওঠে। জিনিয়া প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে পেছনে ফিরে তাকায়। তারপর ভদ্রতা বজায় রেখে বলে–
—জি, ভাইয়া বলেন।
সিফাত জিনিয়ার সামনে এসে এটিটিউড নিয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাড়ায়। তারপর একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে–
—তোমার সো কলড ফকিন্নি বয়ফ্রেন্ড সম্পর্কে সবকিছু কিন্তু আমি জেনে গিয়েছি।
সিফাত পারসোলানি টনির খোঁজখবর নিয়েছে। এবং জানতে পেরেছে সে এতিম। সেটা নিয়েই কটাক্ষ করছে। টনিকে ছোট করে কথা বলায় জিনিয়া প্রচণ্ড রেগে যায়। তার ফর্সা মুখশ্রী লাল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে। ভালোবাসার পুরুষটির সব কিছু জেনেই জিনিয়া ভালোবেসেছে, তাই আজ তাকে অন্যকেউ সেই বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করলে অবশ্যই তার খারাপ লাগবে। জিনিয়া উঁচু গলায় বলে–
—মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ মি.সিফাত। আমার বয়ফ্রেন্ডকে ছোট করে কথা বলার কোন রাইট আপনার নেই।
—ও মাহ্! ফকিন্নিকে ফকিন্নি বলবো না তো কি বড়লোক বলবো? আমার বুঝে আসে না, তোমার মতো এমন একটা আগুন সুন্দরী মেয়ে ঐ ছোটলোক, এতিম, ফকিন্নি ছেলেটাকে পছন্দ করলো কিভাবে? না, মানে তোমার রুচিতে কুলালো কিভাবে?
সিফাতের কথাগুলো শুনে জিনিয়া রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকে। সে সিফাতকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—যেভাবে আমার রুচি বলেছিল, আপনার মতো মেয়েবাজ, চরিত্রহীন, সো কলড বাপের টাকায় ফুটানি করা ছেলেকে রিজেক্ট করতে। সেভাবেই আমার রুচি বলেছিল একজন সৎ, কর্মঠ, শিক্ষিত ছেলের প্রেমে পড়তে। আরে আপনি তো জামাকাপড় পাল্টানোর মতো করে গার্লফ্রেন্ড চেঞ্জ করেন। কিন্তু আমার পছন্দ করা পুরুষটি শুধু আমাতেই আসক্ত। সে এক নারীটিতে আসক্ত। আপনার মতো বারো ভাতারি না।
তার টাকা পয়সা হয়ত আপনার মতো এত নেই। কিন্তু তার যা আছে, তা আপনার কস্মিনকালেও ছিলো না আর হবেও না। ফারদার যদি আপনি আমার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে এমন কিছু বলেছেন, সেদিন আপনার জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো। অস”ভ্য, ই”তর, কু”কু”র শ্রেণির লোক কোথাকার।
সিফাতকে ইচ্ছা মতো ঝেড়ে জিমিয়া সেখান থেকে চলে যায় তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই। অন্যদিকে সিফাত তার প্রস্থানের দিকে র”ক্ত লা”ল চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে থাকে। জিনিয়া চোখের আড়াল হয়ে যেতেই সিফাত আশেপাশে তাকালে দেখতে পায়, চলতি পথে অনেক স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উক্ত ঘটনার দেখেছে আর বর্তমানে তার উপর হাসছে। তাদের হাসি সিফাতের রাগের আ”গুনে যেন ঘি ঢালার কাজ করে। সে রা”গে ফোঁস ফোঁস করতে করতে সেখান থেকে চলে যায়।
এতক্ষণ কলে থাকা টনি নীরবে জিনিয়া ও সিফাতের ঝগড়া শুনছিলো। জিনিয়ার খেয়াল ছিলো না যে টনি এতক্ষণ কলে ছিল। সে রে”গেমেগে যত দ্রুত সম্ভব একটা রিকশা ডেকে ভার্সিটি থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। একটু পর টনিই কলটা কেটে দিয়ে ডেস্কের উপর দুই হাত রেখে তার উপর মাথা রাখে। এত বড় হয়ে নিজের চোখের পানি কাউকে দেখাতে চাচ্ছে না ছেলেটা তাই এমনটা করলো সে।
ছোট ছোট কদম ফেলে আরওয়া ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক দেখতে দেখতে হাঁটছে। মূলত সে আরিয়ানকে খুঁজছে। এত মানুষের ভিড়ে সে পাচ্ছে না আরিয়ানকে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই কারো সাথে ধা”ক্কা লাগে তার। আরওয়া ভ”য় পেয়ে দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে আগন্তুকের দিকে না তাকিয়েই খানিক ভীত গলায় বলে–
—সরি, সরি। আমি ইচ্ছে করে ধাক্কা দেই নি।
তার ক্ষমার প্রতিত্তোরে আগন্তুক রাশভারি গলায় বলে–
—ইট’স ওকে। আমিই তোমার বেশি কাছে চলে এসেছিলাম, তাই ধাক্কা লেগে গিয়েছে।
পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে আরওয়া ঝট করে মাথা তুলে ব্যক্তিটিকে একবার দেখে নিয়ে, পুনরায় মাথা নুইয়ে নেয়। যেন সে মস্ত বড় কোন ভুল করেছে, আর সামনের সুদর্শন পুরুষটি এখন তাকে সেই ভুলেরই কঠিন শাস্তি দিবে।
আরিয়ান শান্ত দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ আওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার কোমল, শান্ত, মলিন মুখ টার দিকে তাকালেই তার কেন যেন শান্তি শান্তি লাগত। আজ বুঝতে পারছে কেন শান্তি লাগত। সে ছোট করে একটা গলা খাঁকারি দিয়ে নরম গলায় বলে–
—চলো ঐদিকটায় বসি গিয়ে।
আরওয়া তার কথায় নীরব সম্মতি দেয়। আরিয়ান আগে আগে হাঁটতে থাকে আরওয়া তার পেছন পেছন যেতে থাকে। একটা লম্বা বেঞ্চের কাছে এসে আরিয়ান বসে পড়ে। আরিয়ান বসে পড়লেও আরওয়া বসে না, সে দাঁড়িয়েই থাকে। আরিয়ান তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গম্ভীর গলায় বলে–
—মিস আরওয়া আপনাকে কি এখন বসার জন্য নিমন্ত্রণ পত্র দিতে হবে?
আরিয়ানের কথা শুনে আরওয়া ধপ করে বসে পড়ে বেঞ্চটার অপর প্রান্তে। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার মাঝেই কেটে যায়। সময় যত যেতে থাকে আরওয়ার নার্ভাসনেস ততই বাড়তে থাকে। নীরবতা চাদর ছিন্ন করে আরিয়ানই প্রথমে বলতে শুরু করে–
—তুমি আঞ্জুমানের সব ছলচাতুরী আমার কাছে এসে ফাঁস করলে না কেন? কেন জানালে না, ঐ ব্লাডি বি”চ একটা ফ্রড?
আরওয়া ঠোঁটের কোণে বিষাদময় হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে–
—আমি বললে আপনি বিশ্বাস করতেন, এটার কি গ্যারান্টি আছে? আপনার সম্পর্কে আমি যেমন এ টু জেড জেনেছিলাম বিগত বছর গুলোতে। আমার বেস্টফ্রেন্ড হিসেবে সেসব কিছু আঞ্জুমানও জানত। অনেক সময় দেখা যেত, আমি যখন আপনার সাথে কথা বলতাম তখন ও আমার পাশেই বসে থাকত। আপনাকে আঞ্জুমানের বেইমানীর কথা বললে, আপনি প্রমাণ চাইতেন। তখন আমি কি প্রমাণ দিতাম? আমার কাছে যে প্রমাণ করার মতো কিছুই ছিলো না।
আরওয়া কথা গুলো বলে থামতেই তাদের মাঝে আবারও নীরবতা এসে ভর করে। কিছুক্ষণ পর আরিয়ান ধরা গলায় বলে ওঠে–
—সারাজীবন অন্যকে হাসানো ব্যতীত কখনো কষ্ট দিয়ে কথা বলি নি। কাউকে ঠকানো দূরের কথা এসব নিয়ে ভাবিও নি। সেই আমাকেই কিনা নিয়তি এমন বাজে ভাবে ঠকিয়ে দিলো। ভাবলেই হাসি পাচ্ছে। আচ্ছা, আরু তুমি বলতে পারবে, আমার সাথেই এমন কেন হলো? কেন আমি ভালোবেসেও ঠকে গেলাম? নিয়তি কেন আমায় ঠকিয়ে দিলো?
আরওয়া উত্তর দিতে পারে না আরিয়ানের প্রশ্ন গুলোর। উপরন্তু সে দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখে যাতে শব্দ করে কান্না করে না ফেলে। আজ কতগুলো দিন পর সে তার প্রাণসখার মুখে আরু ডাকটা শুনলো। তার চোখ দিয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। আরিয়ান পুরুষ মানুষ হয়েও সেও আজ রমনা পার্কের মতো একটা জনবহুল পাবলিক প্লেসে নিজের চোখের পানি ছেড়ে দেয়। দুই নর-নারী একে অপরকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসে নিয়তির কাছে বাজেভাবে হে”রে গিয়ে ভীষণ ভেঙে পড়েছে আজ।
আরিয়ান বহু কষ্ট করে নিজেকে একটু শান্ত করে। তারপর দুয়েকবার গলা খাঁকারি দিয়ে গলা টাকে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করে। চোখে একপ্রকার আশা নিয়ে শেষবারের মতো নিজের ভালোবাসাকে জেতাতে আরওয়াকে প্রশ্ন করে–
—নিয়তির পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে যদি আমি তোমাকে নিয়ে জীবনের পথচলায় সামনে এগিয়ে যেতে চাই, তুমি কি আমার সাথ দিবে? নাকি একজন বিবাহিত পুরুষ ভেবে আমার ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিয়ে আমাকে আরো একবার হারিয়ে দিবে নিয়তির কাছে?
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২২২২
~চলবে?
[পূর্ণতাদের বাসায় কে এলো আবার? আঞ্জুমানরা? নাকি অন্যকেউ? আর আরিয়ানকে কি সুযোগ দেওয়া উচিত? তাদের দু’জনকে এক করে দেওয়া উচিত কি?
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৩.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.১