Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪২.২


শেষপাতায়সূচনা [৪২.২]

সাদিয়াসুলতানামনি

বাসায় এসে পৌঁছে কলিংবেলে দিতেই আঞ্জুমানই দরজা খুলে দেয়। পূর্ণতাকে এই অসময়ে আসতে দেখে আঞ্জুমান ঘাবড়ে যায়। তার ঘাবড়ানোর সাথে চমকানো যোগ হয় তখন, যখন কিনা সাথে জাওয়াদকেও দেখতে পায়।

জাওয়াদও আঞ্জুমানকে পূর্ণতার বাড়িতে দেখে ভীষণ চমকে গিয়েছে। সে তার বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেসই করে ফেলে–

—আঞ্জুমান, তুমি এই বাড়িতে কি করছো?

আঞ্জুমান জাওয়াদের প্রশ্ন শুনে ঘামতে শুরু করে। পূর্ণতা বাসার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল–

—আরে আপনি তো জানেনই না, আমার না হওয়া সতীন এখন আমার ভাইয়ের বউ।

—হোয়াটটটটটট?

প্রচন্ড বিস্ময়ে জাওয়াদ যেন কথা বলাই ভুলে যায়। সে এসব বিষয়ে কিছুই জানত না। হ্যাঁ, শুনেছে আরিয়ান বিয়ে করেছে কিন্তু কখনো নিজ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করেনি আরিয়ানের বউকে দেখার। নিজের বউকে দেখে, তাকে নিয়ে ভেবেই কুল পায় না। অন্যের বউকে দেখার ইচ্ছা নিতান্তই বিলাসিতা।

পূর্ণতা জাওয়াদকে বসতে বলে নিজে উপরে চলে যায়। এরই মধ্যে আরিয়ান, টনি আর ভাড়াটে গুন্ডারা চলে আসে। অজান্তা বেগম আর আহনাফ সাহেবও উপস্থিত হয়েছেন ইতিমধ্যে আহমেদ বাড়ির ড্রয়িংরুমে।

অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর ভেঙে অবশেষে পূর্ণতা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। তার পদচারণায় ছিলো অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। না কোন তাড়াহুড়ো, না দ্বিধা।

তার এক হাতে ধরা মোটা কাটা-যুক্ত চাবুক, অন্য হাতে গা”ন। দুই হাতেই যেন দুই ভিন্ন ইতিহাস—একটি রক্তাক্ত অতীতের, অন্যটি আসন্ন বর্তমানের। চাবুকটা তার দাদার বাবার ছিল এককালে। তার দাদার বাবা আগের যুগের জমিদার ছিলো। বড় বাবা মানে পূর্ণতার দাদার বাবা এক দূর্রাগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার জন্য প্রায় সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে হয়। এজন্য তার বাবা-চাচাদের শৈশবটা তেমন একটা সচ্ছলতায় না কাটালেও, যৌবন কালে কর্মঠ হওয়ার দরুন সফল হতে বেশি একটা সময় লাগে নি।

মৃত্যুর আগে আদরের নাতনিকে নিজেই এই চাবুক খানা দিয়ে গিয়েছিলেন একসময়কার আহমেদ পরিবারের সেই প্রধান ব্যক্তিটি। পূর্ণতা নিচে এসেই গু”ন্ডাদের উদ্দেশ্যে বলে–

—ভাইয়া, বড় বাবা আর মিসেস আহমেদের পাশে গিয়ে একজন একজন করে দাঁড়িয়ে পড়ো। কাজে সময় ব্যগড়া দেওয়া আমার পছন্দ না। লাগলে দড়ি আর কাপড় দিয়ে তাদের আঁটকে রাখবে।

গু”ন্ডারা তাই করে। সকলে পূর্ণতার কথায় ও কাজে ক্ষণে ক্ষণে অবাক হয়ে যাচ্ছে। আরিয়ানকে সোফায় বসিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে এক ইয়া মোটাসোটা লোক। আহনাফ সাহেব ও অজান্তা বেগমের ক্ষেত্রেও তাই করা হয়।

পূর্ণতা এবার ভাড়া করে আনা পালোয়ান মেয়েটিকে বলে–

—একজন এর (আঞ্জুমানকে দেখিয়ে) ডান হাতটা এমনভাবে ভাঙবে যাতে জীবনে ঐ হাত দিয়ে আর কাজ করার ক্ষমতা না রাখতে পারে। আর আরেকজন ওর মুখের বাম পাশটা থেঁতলে দিবে। কিভাবে দিবে তোমাদের বিষয়। কাজটা ১৫মিনিটের মধ্যে শেষ করবে। শুরু করো।

পূর্ণতার কথা শুনে আঞ্জুমানসহ উপস্থিত সকলের পিলে চমকে ওঠে। আরিয়ান বিরোধিতা করে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে–

—হোয়াট রাবিশ! পূর্ণতা, এসব কি বলছিস? আমার ওয়াইফ……

—চুপপপপপপ…..

পূর্ণতার একটা ধমকে পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে যেন। পূর্ণতার চোখদুটো তখন আর চোখ নয়, জ্ব”লন্ত অঙ্গারের রূপ নিয়েছে। রাগে তার শ্বাস ওঠানামা করছে হিসহিস শব্দে, যেন বুকে আটকে থাকা আগুন বের হওয়ার পথ খুঁজছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে—

—আজ আমার কাজের মাঝে যে-ই আসবে… তার শেষদিন আজই। আজ আমি কাউকে চিনি না। না কারও বোন, না কারও ভাতিজি। আজ আমি শুধু এক র”ক্তপিপাসু, প্রতিশোধপরায়ণ, বিক্ষুব্ধ মা। যে নিজের প্রতি হওয়া অন্যায় আর নিজের ছোট সন্তানের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার নিজেই করবে।

একটু থামে সে। তারপর ধীরে, খুব ধীরে চারপাশে তাকায়। চোখে এমন এক শীতলতা যা কারও প্রাণ কেঁপে ওঠার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট।

—নিজের ভালো চাও তো চুপ হয়ে বসো। সব জানানো হবে। সো… জাস্ট কিপ ইউর ফা””কিং মাউথ শাট।

শেষ কথাগুলো বলার সময় পূর্ণতা নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ধরে এক অদ্ভুত, বিকৃত ভঙ্গিতে। যেন নিস্তব্ধতার ওপর নিজের মালিকানা ঘোষণা করছে।
সেই মুহূর্তে তাকে স্বাভাবিক মানুষ মনে হচ্ছিল না।
মনে হচ্ছিল কোনো ভাঙা আত্মা, যাকে বছরের পর বছর জমে থাকা কষ্টগুলো, পাগলামির কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

তারপর সে হেঁটে গিয়ে সোফায় বসে পড়ে পায়ের ওপর পা তুলে। পাঁচ বছর আগের সেই নির্লজ্জ, উদ্ধত এটিটিউড নিয়ে। এক হাতে লোড করা গা”ন। অন্য হাতে কাটা-যুক্ত চাবুক। দুই হাতেই বিচার। দুই চোখেই উন্মাদ নীরবতা।
ঘরজুড়ে সকলের মাঝে তখন শুধু একটা অনুভূতিই কাজ করছে। সেটা হলো–আজ এখানে কিছু ভয়ংকর ঘটতে চলেছে।

মেয়েগুলো যেন আগেই থেকেই প্রস্তুত ছিল। পূর্ণতার একটুখানি চোখের ইশারা আর তাদের কাজ শুরু। পাঁচ মিনিটও লাগে না কাজটি সম্পন্ন করতে। শুকনো ডাল ভাঙার মতো শব্দ তুলে আঞ্জুমানের ডান হাতটা মো”চ”ড় দিয়ে ভে”ঙে ফেলে একজন। তার কুৎসিত সৌন্দর্য যার অহংকারে সে এতদিন বুক ফুলিয়ে চলেছে, মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে যায় মেয়েগুলোর নির্দয় আ”ঘা”তে।

আঞ্জুমানের করুণ স্বরে করা আর্তচিৎকার…. আর্তনাদ….কান্না। এসবের শব্দের ক্ষণে ক্ষণে
আহমেদ বাড়ির দেয়ালগুলো কেঁপে উঠতে থাকে।
উপস্থিত সবাই যেন পাথর হয়ে যায়। কিন্তু কারও চোখে দয়া নেই, আছে শুধু আতঙ্ক।

আর সেই আতঙ্কের মাঝখানে একজন মানুষ হাসছে।
গাল ভরে ধীর, তৃপ্ত সে এক হাসি। ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, আনাবিয়া আহমেদ পূর্ণতা। তার চোখে কোনো জল নেই, নেই কোনো মায়ার এক বিন্দু ছাপ। আছে শুধু প্রতিশোধের জ্ব”লন্ত আগুন ও নিষ্ঠুরতা। এমন এক বিকৃত প্রশান্তি খেলা করছে সেখানে, যা বলে দিচ্ছে সে বহুদিনের জমে থাকা হিসাব গুলো একে একে শোধ করছে।

আরিয়ান আর স্থির থাকতে পারে না। প্রিয়তমা স্ত্রীর এমন করুণ পরিণতি দেখে সে উঠে দাঁড়ায়, ছুটে যেতে চায় আঞ্জুমানের দিকে। কিন্তু তাকে পাহারায় থাকা গু”ন্ডাটি তাকে শক্ত করে চেপে ধরে আঞ্জুমানের কাছে যাওয়ার আগেই। আরিয়ান ছটফট করতে থাকে মুক্ত হওয়ার জন্য তার এসব হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি আর চিল্লাপাল্লায় পূর্ণতা বিরক্ত মুখে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে–

—উফফফ… ভাইয়া, কতদিন পর একটা ভালো মিউজিক শুনছি। ডিস্টার্ব না করে নিজেও ইনজয় করো, আর আমাকেও ইনজয় করতে দাও।

তার কণ্ঠে এমন এক স্বাভাবিকতা, যেন সত্যিই কোনো কনসার্ট চলছে সামনে। তারপর হালকা হেঁসে যোগ করে–

—বয়েজ, ভাইয়ার মুখটা বন্ধ করো আপাততের জন্য। কিন্তু হ্যাঁ… অত্যন্ত কোমলতা আর সম্মানের সহিত করবে।দশটা না, পাঁচটা না… একটা মাত্র ভাই আমার। আপন না হোক, চাচাতোই সই।

পূ্র্ণতার দৃষ্টি তখমও আঞ্জুমানের র”ক্তিম, বিকৃত মুখের দিকে। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক বিকৃ”ত ডে”ভিল স্মাইল।
সেই হাসিতে মানবিকতার লেশমাত্র নেই, আছে শুধু বেহিসাবি নিষ্ঠুরতা।

গু”ন্ডারা আদেশমতো কাজ শুরু করে। আরিয়ানের মুখ চেপে ধরা হয়। আহনাফ সাহেব এই সময়ে কিছু বলতে উদ্যত হলে পূর্ণতা কেবল আঙুলের ইশারায় থামিয়ে দেয়।
একটা নীরব ইশারা। কিন্তু সেই ইশারায় এমন কর্তৃত্ব, যেন পুরো ঘরের উপস্থিত সকলের শ্বাসও তার অনুমতির অপেক্ষায়।

আহনাফ সাহেবের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত উপলব্ধি জন্ম নেয়। তার মন বলছে, পূর্ণতা অকারণে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে না। এছাড়া কিছুক্ষণ আগের তার কথাগুলো, তার চোখের আগুন। দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে ফেলেছেন তিনি। অজান্তা বেগম ভয়ে স্বামীর গা ঘেঁষে বসে আছেন।
তার মনে হচ্ছে, আজ এই মেয়েটা আর সেই পরিচিত পূর্ণতা নেই। আজ সে যেন পাঁচ বছর আগের সেই রূপে ফিরে গেছে। না, না। তার চেয়ে আরও কঠিন, আরও ভয়ংকর। এক হাতে লোড করা গা”ন, অন্য হাতে ঐতিহ্যবাহী চাবুক।

অবশেষে একসময় আঞ্জুমানের শরীর আর সাড়া দেয় না।
এত আঘা”ত, এত ব্যথার পর চিৎকার করবার শক্তিটুকুও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে তার। তার কণ্ঠ ভাঙা, শ্বাস ছিন্নভিন্ন, চোখে কেবল অসহায় আতঙ্ক।

—গার্লস, স্টপ।

পূর্ণতার গলাটা আওয়াজে মেয়েগুলো তার দিকে তাকালে হাত তুলে ইশারা করে তাদের সরে যাওয়ার। ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। ঝড় থামার পরের ভয়ংকর শান্তির মতো।

পূর্ণতা ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তার হাইহিলের ঠক ঠক শব্দে যেন পুরো ঘরের সকলের স্নায়ু টনটন করে ওঠে। সে এগিয়ে যায় আ”হত আঞ্জুমানের দিকে, একদম শিকারীর মতো স্থির, নিশ্চিন্ত ভঙ্গিমায়।
আঞ্জুমান মাটিতে পড়ে আছে তখনও। তার ডান হাতটা অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে আছে, ব্যথায় নীলচে হয়ে আছে চামড়া।

পূর্ণতা কোনো তাড়াহুড়ো করে না। সে নিজের হাইহিল পরিহিত পা তুলে আঞ্জুমানের ভাঙা হাতের ওপর রাখে।
তারপর ধীরে, খুব ধীরে ধীরে চাপ বাড়াতে থাকে। হাড়ে চাপ পড়ার কর্কশ শব্দ যেন বাতাস চিরে যায়। আর সেই শব্দ শুনে পূর্ণতার ঠোঁট বেঁকে ওঠে।

—এই হাত দিয়ে আমার ছেলের জন্য সিঁড়িতে তেল ফেলেছিলি… না?

চাপ আরও বাড়ে। আঞ্জুমানের মুখ বিকৃত হয়ে ওঠে নীরব চিৎকারে।

—নে… আজকের পর থেকে এই হাত পুরোপুরি অকেজো করে দিলাম।

তারপর সে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে, চোখে শীতল উন্মাদনা নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে–

—হাউ… ইজ ইট ফিলিং, বেব?

অন্যদিকে তার কথা শুনে ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। আজ যেন বিস্ময়েরই দিন। একটার পর একটা ঝটকা খেয়ে কারও মুখে ভাষা নেই। কারও সাহস নেই চোখ সরানোর বা প্রশ্ন করার।

পূর্ণতা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার চোখে জল নেই, কেবল জমাট বাঁধা প্রতিশোধের দীপ্তি। আজ সে কেবল একজন নারী নয়। সে এক ক্ষতবিক্ষত মাতৃত্বের রূপ, যার সামনে মানবিকতা পর্যন্ত নীরব।

পূর্ণতা ধীরে ধীরে পা সরিয়ে নেয় আঞ্জুমানের হাতের ওপর থেকে। হাইহিলের ধারালো গোড়ালিতে লেগে থাকা রক্ত মেঝেতে ছোট্ট এক রেখা এঁকে দেয়। ঘর নিস্তব্ধ। শুধু আঞ্জুমানের ভাঙা শ্বাসের শব্দ।

পূর্ণতা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
সেই দৃষ্টিতে উন্মাদনা আছে, কিন্তু তার থেকেও বেশি এক অদ্ভুত হিসাবি শীতলতা। সে হালকা করে মাথা কাত করে বলে—

—এটা তো শুধু শুরু, আঞ্জুমান।

তার কণ্ঠ আর উঁচু নয়। বরং ভয়ংকরভাবে নিচু, স্থির।

—আমার ছেলেকে মারতে গিয়ে ভাবো নি… একটা মা কী করতে পারে? কি ভেবেছিল,আমি চুপ থাকব এবারও?

সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। পূর্ণতা সকলের দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। তারপর নিজের জামার পকেট থেকে ফোনটা বের করে ভিডিওটা অন করে আরিয়ানের কোলের উপর ফিকে মারে, ইশারায় তাকে দেখতে বলে ফোনটা। একজন গু”ন্ডা এগিয়ে এসে আরিয়ানের হাতের বাঁধন খুলে দেয়। আরিয়ান মুক্ত হতেই ফোনটা তুলে দেখতে থাকে। জাওয়াদও সেসময় তার পাশে এসে দাঁড়ায়।

ভিডিও টায় দেখা যায় কয়েকটা ফুটেজ। বাড়ির আনাচে কানাচে এমন ছোট ছোট হিডেন ক্যামেরা পূর্ণতা বহু আগেই সেট করে রেখেছে। ছেলের সেইফটির কারণেই এই উদ্যোগ তার। প্রথম ফুটেজটা, তাদের বাড়ির রান্নাঘরের। সেই ফুটেজে দেখা যায়, আঞ্জুমান রান্নার তেল নিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলের তলায় লুকিয়ে নেয়। তার কিছুক্ষণ পরই আরওয়া সেখানে এসে রান্না করতে থাকে।

দ্বিতীয় ফুটেজে দেখা যায়, আঞ্জুমান নিচের নামার সময়ের ১০/১২ সিড়ি বাকি থাকে এমন স্থানে এসে তেল ফেলে। এই ফুটেজটা মূলত উপর থাকা নামার সময় সিঁড়ির সাথে লাগোয়া একটা পিলারের একদম উঁচুতে সেট করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সিঁড়িসহ পুরো হলরুম সহজেই দেখ যায়।

তৃতীয় ফুটেজে দেখা যায় পূর্ণতার ঘরের ফুটেজ। জাওয়াদ যেদিন হাতেনাতে ধরা পরলো, তার পরেরদিন পূর্ণতা নিজের রুমেও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছে।

সেই ফুটেজটার আবার সাউন্ড ছিল। সেখানে দেখা যায়, আঞ্জুমান তাজওয়াদকে বলছে–

—তাজ বাবু, তোমার মাম্মা তো তোমার উপর বিরক্ত হয়ে নতুন একটা বাবু নিয়ে আসলো। নিচে গিয়ে দেখো তাকে কোলে তুলে কত আদর করছে। তাকে বলতে শুনলাম, তোমাকে নাকি বোর্ডিংয়ে রেখে আসবে আর নতুন বাবু টাকে নাকি অনেক আদর করবে।

মা পাগল তাজওয়াদ এসব কথা শুনে ছুটে বের হয়ে আসে রুম থেকে আর তার কিছুক্ষণ পরই মাঝ সিঁড়ি ফেলে রাখা তেলে পা পিছলে গড়িয়ে নিচে পড়ে। তাকে নিচে পড়তে দেখে আরিয়ানের হাত থেকে ফোনটা ফ্লোরে ঠাস করে গিয়ে পড়ে। এতকিছু দেখার পর আর কিছু জানার বা জিজ্ঞেস করার থাকে না তার। সে মৃত দৃষ্টি নিয়ে আঞ্জুমানের র”ক্তা”ক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবকিছু কেমন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন লাগে তার কাছে।

পূর্ণতা হঠাৎই অনেকটা ভায়োলেন্স হয়ে যায়। সে আঞ্জুমানকে কাঁ”টাযুক্ত চাবু”কটা দিয়ে এলোপাতাড়ি মা”রতে থাকে। আর চিৎকার করে বলতে থাকে–

—তোর জন্য আমার সংসার ছেড়েছি, নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে ত্যাগ করেছি, তোর ষড়যন্ত্রের কারণে আমার জন্মদাতাকে হারিয়েছি, আমার সন্তান জন্মের এতগুলো বছর হয়ে যাওয়ার পরও তার বাবার সাথে পরিচিত হতো পারল না শুরু মাত্র তোর জন্য। তাও তোর শান্তি হলো না? আমার সুখের উপর তোর এত নজর কেন? আজ তোর সব কেচ্ছাকাহিনী শেষ করে তবে আমি দম নেবো।

বলেছিলাম না, স্ত্রী পূর্ণতা তোকে শিক্ষা দিতে না পারলেও, মা পূর্ণতা তোকে এমন শিক্ষা দিবে যে তুই কেঁদে কুল পাবি না। আজ তার পালা। তোর শরীর থেকে রুহ না বের হওয়া পর্যন্ত আমি শান্ত হবো না। তোর মতো মেয়েরা হচ্ছে সমাজের একেকটা ভাইরাস। আজ সবকিছুর ফয়সালা হবে। বল কেন করলি আমার মাসুম সন্তানের সাথে এমন? তোর সব দোষ অদেখা করেই তো থাকছিলাম, তাও কেন আমার সন্তানের জীবন নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলি? বল…..

পূর্ণতা ততক্ষণ পর্যন্ত মা”রতে থাকে যতক্ষণ না আঞ্জুমানের শরীরের বিভিন্ন অংশের চামড়া ফে”টে র”ক্ত বের হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে সে আরো বেশি ভায়ো”লেন্স, আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে যেতে থাকে।

পূর্ণতার বর্তমান কন্ডিশনে তার এতটা ভায়ো”লেন্স হয়ে যাওয়া মানে, আবারও বড় কোন ক্ষতি হওয়া। জাওয়াদ পূর্ণতার কাছে ছুটে এসে তাকে টেনেহিঁচড়ে আঞ্জুমানের উপর থেকে সরিয়ে আনে। আঞ্জুমান ইতিমধ্যেই চেতনা হারিয়েছে। পূর্ণতা অতিরিক্ত হাইপার হয়ে গিয়েছে বলে তার আজ আবারও নোজ ব্লি”ডিং হতে থাকে। জাওয়াদ তার মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে তাকে শান্ত করতে বলে–

—চুপ, অনেক হয়েছে। শান্ত হও। আল্লাহর ওয়াস্তে একটু শান্ত হও। ছেলেটার কথা ভেবে হলেও। শরীর খারাপ করতে তোমার আবার। নো”জ ব্লিডিং হচ্ছে তোমার। একটু শান্ত হও।

পূর্ণতা নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে জাওয়াদের পিঠের কাছের শার্ট খামচে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দেয়। জাওয়াদ তাকে এতটা শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে আছে যে, পূর্ণতা সুস্থ থাকলেও তার পক্ষে এই বন্ধন থেকে ছোটা পসিবল হতো না।

পূর্ণতার কান্না দেখে সকলে যেমন ভয় পাচ্ছে তার শরীরের কথা ভেবে, তেমনই তার আগের কথা গুলো শুনে হতভম্ব হয়ে আছে। আহনাফ সাহেব, অজান্তা বেগম, আরিয়ান তিনজনই অবাক হয়ে পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে আছে, যে কিনা বর্তমানে হুঁশজ্ঞান হারিয়ে জাওয়াদের বুকে পড়ে নিজের অশ্রু গুলো বিসর্জন দিতে ব্যস্ত।

অনেকটা সময় নিয়ে পূর্ণতা শান্ত হয়। জাওয়াদের থেকে নিজে ছাড়িয়ে নিয়ে মালতি কাকীকে বলে–

—পানি ছিটা দিয়ে ওর জ্ঞান ফেরান। এত সহজে নিস্তার নেই ওর আজ।

মালতি কাকী দৌড়ে গিয়ে পানি এনে আঞ্জুমানের মুখে ছিটাতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আঞ্জুমানের অর্ধচেতনা ফিরলে সে পানি খেতে চায়। পূর্ণতা নির্দেশ দেওয়ার পর মালতি কাকী তাকে পানি খেতে দেয়। পানি খাওয়ার পর একটু স্বাভাবিক হলে মালতি কাকী পূর্ণতার নির্দেশে আঞ্জুমানকে ধরে সোফার সাথে হেলায় দিয়ে বসিয়ে দেয়। তারপর পূর্ণতা আবারও উঠে গিয়ে তার কাছে যায়। নিচ থেকে লোড করা গা”নটা উঠিয়ে এক হাঁটু গেঁড়ে গা”নটা তার কপালে ধরে বলে–

—সত্যি করে বল কেন এমন কাজ করেছিস। সত্যি বললে, হয়ত প্রানে বেঁচে যাবি। নাহলে বিশ্বাস কর, তোর রুহ আজ দেহ থেকে সত্যি সত্যি বের করে ছাড়বো। বল… কি করেছিল আমার ছেলেটা তোর?

আঞ্জুমান ভাঙা ভাঙা গলায় বলে–

—আম…মার ক…থায় ক…রেছি কাজ….টা।

আঞ্জুমান আম্মা বলতে অজান্তা বেগমকে বুঝিয়েছেন।সকলে এই পর্যায়ে হতভম্ব হতেও ভুলে যায়। সকলের মতো পূর্ণতা অবাক হলেও, এতটা হয় না অবাক। কারণ সিসিটিভি ফুটেজে সে দেখেছিল, তাজওয়াদকে সেদিন হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার পর সিঁড়ির গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে অজান্তা বেগম আর আঞ্জুমান কথা বলছিল। কিন্তু কি কথা বলছিলো সেটা শোনা যায়নি।

আহনাফ সাহেব অবাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকান। এমনকি আরিয়ানও। তারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না, এমন একটা জঘন্য কাজের মদদদাতা এই ব্যক্তিটি। কিন্তু সকলে বিশ্বাস না করলেও পূর্ণতা সহজেই বিশ্বাস করে নেয়। কারণ সে তো জানে, এই মহিলা কতটা ঘৃণ্য মন মানসিকতার অধিকারী।

পূর্ণতা এবার আঞ্জুমানের সামনে থেকে উঠে নিজের ক্লান্ত দেহখানা টেনে নিয়ে যেতে থাকে অজান্তা বেগমের দিকে। ডান হাতের আঙ্গুলে গানটা তখনও ঘুরাচ্ছে। তাকে এই মুহূর্তে কোন স্বাভাবিক মানুষ লাগছে না। ইতিমধ্যে সকলেই বুঝতে পেরে গিয়েছে পূর্ণতা তার ছেলের জন্য কতটা পজেসিভ।তাই আরিয়ান পূর্ণতাকে আটকানোর জন্য নিজের জায়গা ছেড়ে তার কাছে যেতে চাইলে দুই জন গু”ন্ডা তাকে দুই পাশ থেকে ধরে ফেলে। আরিয়ান বাঁধা পেয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে–

—পূর্ণতা, তোকে আমার কসম আমার মা’কে কিছু করবি না।

পূর্ণতা এক মুহুর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। ঘাড় কাত করে আরিয়ানের দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তার সেই দৃষ্টিতে ছিল হাহাকার, কষ্ট, হারানো সবের ছাপ। পূর্ণতা তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে নিতে বলে–

—আমার ছেলের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার করতে গিয়ে, যদি তোমাকেও আমার মা”রতে হয়, তাহলে আমি দুইবার ভাববো না মি.আরিয়ান আহমেদ। এমনিতেই তুমিও তো আমার সাথে বেই”মানী করেছো সকলের মতোই। তাও তোমার সাথে এতদিন ভালো ব্যবহার করেছি, এটাই তোমার ভাগ্য।

বেই”মানী?—শব্দটা যেন বিষাক্ত কাঁটার মতো এসে গেঁথে রইলো আরিয়ানের মগজে। কিসের বেইমানী? কোন বিশ্বাস ভাঙার দায় তার কাঁধে চাপাল পূর্ণতা? সে তো আজ পর্যন্ত সচেতন মনে এমন কিছু করেনি, যার জন্য তাকে ‘বেই”মান’ উপাধি দেবে। তবু শব্দটা ঘুরপাক খেতে থাকে তার মন ও মস্তিস্কে। দোষীর আসামির মতো তার বুকের ভেতর দাঁড়িয়ে যায় অদৃশ্য এক কাঠগড়ায়।

আরিয়ান যখন মুক্ত হওয়ার জন্য হাঁসফাঁস করছে, শ্বাসগুলো ছিঁ”ড়ে ছিঁ”ড়ে বেরোচ্ছে, ঠিক তখনই পূর্ণতা এমন কিছু করে বসে যা কেউ কল্পনাও করেনি। এক মুহূর্তের দ্বিধা ছাড়া, দৃঢ় হাতে ট্রিগার চাপে সে। গু’’লির শব্দটা যেন সময়কে বিদীর্ণ করে ছুটে যায়। তারপর? সব কিছু নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়।

মুহূর্তখানেকের জন্য আহমেদ বাড়ির ড্রয়িংরুমের সবকিছু থমকে দাঁড়ায়। কারও মুখে শব্দ নেই, কারও চোখে পলক নেই। সবাই তাকিয়ে থাকে পূর্ণতার দিকে তার চোখে কি আগুন, না বরফ? সে কি প্রতিশোধের ঘোষণা দিলো, নাকি ভাঙা বিশ্বাসের চূড়ান্ত রায়? অজান্তা বেগম হাউমাউ করে কেঁদে বলে ওঠে–

—আরিয়ান……আমার মানিক………

[গল্পটি ভালো লাগলে, বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]

শব্দসংখ্যা~২৫৭৫

চলবে?

[আজকের পর্বটাকে নাম্বারিং করতে বললে, ১০-এ কত নাম্বার দিবেন? আর হ্যাঁ, আজকের পর্বটায় সর্বোচ্চ রেসপন্স চাই। নাহলে আগামী পর্ব ৪দিন পর দিবো।😒 এন্ড আই মিন ইট☺️

অনেক বড় একটা পর্ব। ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply