রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৮
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
গোধূলির আকাশ তখন শেষ লগ্নে এসে থেমেছে। আরিয়ান আর তৃণা আজ হাওলাদার বাড়ি অর্থাৎ তৃণাদের বাড়ি যাবে।
তৃণা নিজের মনেই বেশ খুশি হয়ে রেডি হচ্ছে। পরনে তার একটি কয়েরি রঙের শাড়ি, যা গোধূলির এই ম্লান আলোয় তাকে আরও মায়াবী করে তুলেছে। অন্যদিকে আরিয়ান পরেছে কুচকুচে কালো রঙের স্যুট-কোট। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আরিয়ান যখন গম্ভীর মুখে হাতে ঘড়ি বাঁধছিল, তৃণা আয়নায় সেই দিকে বেশরমের মতো তাকিয়ে রইল। আরিয়ান বিষয়টি লক্ষ্য করে একটা হালকা গলা খাঁকারি দিতেই তৃণা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল। সে নিজেই বুঝতে পারে না, কেন এই লোকটার দিকে সে বারবার এমন বোকার মতো তাকিয়ে থাকে! ঠিক তখনই গত রাতের সেই ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মনে পড়তে শুরু করল। মুহূর্তেই ভালো লাগাটুকু উবে গিয়ে এক আকাশ সমান ঘৃণা মনের ভেতর ভিড় জমালো।
আরিয়ান ঘড়ি ঠিক করতে করতে বলল,
“এভাবে বোকার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে নিচে আসো। দেরি হচ্ছে।”
তৃণা কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বলল, “নৌশিকে একটু আমার রুমে আসতে বলবেন?”
আরিয়ান ওকে ‘আচ্ছা’ বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
তৃণা একা একাই অনেকক্ষণ ধরে নিজের ব্লাউজের ফিতা লাগানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু কিছুতেই পারছিল না। তাই সে নৌশিকে ডেকে দিতে বলেছিল। কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও নৌশি এলো না। কিছুক্ষণ পর আরিয়ান আবারও রুমে ফিরে এলো। আরিয়ানকে দেখে তৃণা একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“কী হলো, নৌশি আসেনি?”
“নৌশি নিজের সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত, এখন আসতে পারবে না,” আরিয়ান বিছানায় বসতে বসতে বেশ নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল।
তৃণা বিরক্ত হয়ে বলল, “কী অদ্ভুত আপনি! নৌশি ব্যস্ত তো কী হয়েছে? আপনি মিতু ভাবি কিংবা নুসরাতকে তো বলতে পারতেন একবার আসার জন্য।”
আরিয়ান এবার ভ্রু কুঁচকে তৃণার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, “ওরা সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। আর কেন, আমাকে কি তোমার চোখে পড়ে না? আমাকে বলো কী করতে হবে?”
তৃণা একবার আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিল। মৃদু স্বরে বলল,
“না, আপনি পারবেন না।”
‘পারবেন না’ কথাটি শোনা মাত্রই আরিয়ানের জেদ চেপে গেল। সে রাগী কণ্ঠে বলল,
“পারব না মানে কী, হুহ? আমাকে কি তোমার অকর্মণ্য মনে হয়? এখনই বলো কী করব?”
তৃণা এবার কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বলল,
“আপনি আসলে বুঝতে পারছেন না, আপনাকে দিয়ে এটা হবে না। আমি আমার ব্লাউজের ফিতা লাগানোর জন্য ওদের ডেকেছিলাম।”
“এটা কি এমন কাজ যে আমি পারব না?”
আরিয়ান হুট করেই কথাটা বলে ফেলল। কিন্তু যখন কথাটির প্রকৃত অর্থ তার মস্তিষ্কে পৌঁছাল, তখনই সে থমকে গেল। আরিয়ানের এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে তৃণা ফিক করে হেসে দিল। ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বলল,
“কী হলো? এখন চুপ হয়ে গেলেন কেন? কী যেন বলছিলেন খুব জোর গলায়?”
আরিয়ান তৃণার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। হাসলে এই মেয়েটাকে সত্যিই অপার্থিব সুন্দর লাগে। আরিয়ান ধীর কণ্ঠে বলল, “দাও, আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।”
তৃণা চমকে উঠে বলল, “কীহ?”
আরিয়ান আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা করল না। সে তৃণার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো। পিঠ থেকে দীর্ঘ কালো চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে দিয়ে সে খুব সাবধানে, অতি ধীর হাতে ব্লাউজের ফিতা বাঁধতে শুরু করল। তৃণা আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হলো, এই লোকটার পুরো অস্তিত্বেই একটা রহস্যময় জাদু আছে। তৃণার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুরুষটি হলো আরিয়ান মির্জা, যে তার বৈধ স্বামী। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এই মানুষটাকে সে চাইলেও কোনোদিন জীবনসঙ্গী হিসেবে ভালোবাসতে পারবে না।
আরিয়ানের ফিতা বাঁধতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। কাজ শেষ হতেই কোনো কথা না বাড়িয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে চলে গেল।
বিকেলের মিঠে রোদ গায়ে মাখিয়ে তারা অবশেষে বেরিয়ে পড়ল। আরিয়ান আর তৃণা একই গাড়িতে, আর পেছনের গাড়িতে আদনান, নৌশি আর মিতু। মিতু সচরাচর বাড়ি থেকে একদমই বের হয় না। কিন্তু আজ তৃণার অনেক আবদার আর জোরাজুরিতে সে রাজি হয়েছে।
★★★
তৃণাদের বাড়িতে যখন তারা পৌঁছাল, তখন গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে। বিশাল ড্রয়িংরুমের কারুকাজ আর আভিজাত্য অনেকটা আরিয়ানদের বাড়ির মতোই।
বাড়িতে ঢোকার পরপরই সবার আগে দেখা হলো উমর হাওলাদারের সাথে। বাবাকে দেখা মাত্রই তৃণা হাসিমুখে তাকে জড়িয়ে ধরল। ড্রয়িংরুমে সবাই বসতেই উমর সাহেব আরিয়ানকে কুশল বিনিময় করে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো বাবা?”
আরিয়ান বেশ শান্ত গলায় বলল , “না আঙ্কেল, কোনো সমস্যা হয়নি।”
কথার মাঝেই ঘরে প্রবেশ করলেন রৌশনারা বেগম এবং তার পেছনে রিনি। রিনি এসেই বেশ অধিকারবোধ নিয়ে আরিয়ানের ঠিক পাশের সোফায় বসল। বেশ রাশভারী আর কিছুটা কৃত্রিম ঢঙে বলল, “হ্যালো আরিয়ান! কেমন আছো তুমি?”
আরিয়ান রিনির দিকে না তাকিয়েই সংক্ষেপে উত্তর দিল, “জি, ভালো।”
উমর হাওলাদারকে একটি ইমার্জেন্সি কল পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হলো। তিনি বেরিয়ে যেতেই রৌশনারা বেগম সবাইকে আপ্যায়নের ছলে বললেন,
“তোমরা অনেক দূর থেকে এসেছো, সবাই নিজের নিজের রুমে গিয়ে একটু রেস্ট নাও।”
তিনি কাজের লোকদের ডেকে আরিয়ান, মিতু এবং অন্যদের ঘর দেখিয়ে দিতে বললেন।
সবাই ভেতরে চলে যেতে নিলে তৃণা পা বাড়াতে চাইল। কিন্তু রৌশনারা বেগম মুখে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে বললেন,
“তোমরা সবাই যাও, তৃণা থাকুক। মা-মেয়ের কতদিন পর দেখা হলো, কত কথা জমে আছে!”
আরিয়ানরা কোনো আপত্তি না করে ভেতরে চলে গেল। কিন্তু তৃণার বুকটা ভয়ে ঢিপঢিপ করতে লাগল। সে খুব ভালো করেই চেনে তার মায়ের এই মধুর হাসির আড়ালের বিষকে। সে ঘাবড়ে গিয়ে কোনোমতে বলল,
“মা, আমি একটু ভেতরে যাই…”
রৌশনারা বেগমের চোখের চাউনি মুহূর্তেই বদলে গেল। রিনি এসে হেঁচকা টানে তৃণাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“এই! তুই তো দেখি খুব সেয়ানা হয়েছিস? বড় বোনের হবু স্বামীকে এভাবে কেড়ে নিয়ে বিয়ে করতে তোর লজ্জা করল না? কীভাবে পারলি এটা করতে?”
তৃণা আকাশ থেকে পড়ল। সে বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে রিনির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এসব কী বলছো আপু? তুমি নিজে বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে গেলে বলেই তো বাবার মান-সম্মান বাঁচাতে আমাকে ওই আসনে বসতে হয়েছিল। আর এখন তুমি উল্টো আমাকেই দোষ দিচ্ছো?”
তৃণার সত্য কথাগুলো শোনামাত্রই মা আর মেয়ে যেন জ্বলে উঠল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিনি তার সর্বশক্তি দিয়ে তৃণার গালে একটি জোরালো চড় বসিয়ে দিল। অতর্কিত এই আঘাতে তৃণা তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে ছিটকে পড়ল। চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।
রৌশনারা বেগম এবার নিচু হয়ে তৃণার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। হিংস্র গলায় বললেন,
“ভীষণ সাহস বেড়েছে তোর, তাই না? আগে তো কোনোদিন এভাবে মুখে মুখে তর্ক করতি না, আজ এই বাড়িতে পা দিয়েই তোর খুব ডানা গজিয়েছে?”
তৃণা ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। রৌশনারা বেগম এতটাই জোরে মুখ চেপে ধরেছেন যে মনে হচ্ছিল তাঁর নখগুলো তৃণার নরম চামড়ায় গেঁথে যাবে। একটু পর অবজ্ঞার সাথে ঝাড়া দিয়ে মুখটা ছেড়ে দিলেন তিনি। তারপর তীব্র তিক্ত গলায় বললেন,
“শোন, খুব তাড়াতাড়ি তুই আরিয়ানের থেকে ডিভোর্স নিবি। তোর মতো এক টুকরো কালির গলায় কী করে আরিয়ানের মতো দামী মুক্তা মানায়? তুই নিজেকে আরিয়ানের যোগ্য মনে করিস?”
তৃণা আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। বুকফাটা কান্না চেপে ধীর পায়ে সে জায়গা ত্যাগ করল। শরীর আর মনের এই অপমান বয়ে নিয়ে সে করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতে লাগল।
তৃণা আড়াল হতেই রিনির চেহারায় ফুটে উঠল আদিখ্যেতা। সে তার মায়ের হাত ধরে আবদারের সুরে বলতে লাগল,
“মাম্মি, আমি কত বড় ভুল করলাম দেখলে? এই আরিয়ান যে এত হ্যান্ডসাম, সেটা তো ছবিতে দেখে অতটা বুঝিনি। মাম্মি সত্যি বলছি, লোকটাকে সামনাসামনি দেখে প্রথম দেখাতেই আমার পছন্দ হয়ে গেছে। ওকে আমার চাই-ই চাই!”
রৌশনারা বেগম মেয়ের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন যেন। তিনি কিছুটা হতভম্ব হয়ে বললেন, “কী বলছো এসব পাগলীর মতো? ওই তৃণার সাথে তো আরিয়ানের বিয়ে হয়ে গেছে, সামাজিকভাবে সবাই জানে। এখন তুমি কী করে…”
রিনি তার মায়ের কথা শেষ করতে দিল না। সে হাত নেড়ে অবজ্ঞার সুরে বলল, “
সো হোয়াট মাম্মি! বিয়ে হয়েছে তো কী হয়েছে? বর্তমান যুগে বিয়ে ভাঙা কি খুব কঠিন কাজ? আজ বিয়ে হয়েছে তো কাল ডিভোর্স হবে। আর আমি যতটুকু লক্ষ্য করেছি, তাতে আমার স্পষ্ট মনে হয়েছে আরিয়ানও তৃণাকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করে না। ওদের মধ্যে কোনো স্বামী-স্ত্রীর রসায়ন আমি দেখিনি।”
রৌশনারা বেগম মেয়ের যুক্তি শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ধূর্ত হাসি ফুটে উঠল। তিনি মনে মনে হিসাব কষলেন আরিয়ানদের বংশমর্যাদা আর প্রতিপত্তি আকাশছোঁয়া। যদি কোনোভাবে তৃণার থেকে আরিয়ানকে আলাদা করে রিনির সাথে জুড়ে দেওয়া যায়, তবে সেটা তাদের পরিবারের জন্যই বড় জয়।
তিনি হেসে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছো । আরিয়ান যদি তৃণাকে অপছন্দই করে, তবে এই সম্পর্ক বেশিদিন টিকবে না। তুমি শুধু আরিয়ানের মনে নিজের জায়গা করে নাও, বাকিটা আমি দেখে নেব। ওই আপদটাকে বিদায় করতে আমার বেশিক্ষণ সময় লাগবে না।”
★★★
মিতু তার নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইলটার স্ক্রিন জ্বলে আছে, আর সেখানে ভেসে আছে একটি হাসিমুখের ছবি রোহান। তার সেই স্বামী, যাকে সে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিল। অথচ আজ সেই স্বামীর কাছে দিনের চব্বিশটা ঘণ্টার মধ্যে মিতুর জন্য এক মিনিট সময় নেই।
স্মৃতিগুলো মিতুর চোখের সামনে সিনেমা স্লাইডের মতো ভেসে উঠল। তারা দুজন তখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ত। মিতুর রূপ আর স্নিগ্ধতার জন্য কলেজে তাকে সবাই ‘ক্রাশ গার্ল’ বলত। কত ছেলে যে তাকে প্রেমপত্র দিত তার হিসেব নেই। কিন্তু সেই ভিড়ে একজনই ছিল পাগল প্রেমিক, সে হলো রোহান মির্জা। রোহান তখন মিতুকে না দেখে একদিনও থাকতে পারত না। মিতুর জন্য তার সেই পাগলামি দেখে মিতুও নিজেকে সঁপে দিয়েছিল।
ভার্সিটিতে ওঠার পর রোহানের ভয় ছিল, মিতু বুঝি তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই ভয় থেকেই নিজের ক্যারিয়ার গড়ার আগেই মির্জা পরিবারকে রাজি করিয়ে মিতুর পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। রোহানের সেই প্রচণ্ড জেদের কাছে সবাই হার মেনেছিল। বিয়ের প্রথম বছরটা যেন স্বপ্নের মতো কেটেছে। মিতু যেখানেই যেত, রোহানের নজর থাকতো কেবল মিতুর ওপর। চোখের আড়াল হতে দিত না এক মুহূর্তের জন্য।
তারপর রোহান স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ড চলে গেল। শুরুতে কয়েক মাস সব ঠিক ছিল। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, রোহান ততই বদলে গেছে। এখন সে সারাদিনে একবারও কল দেয় না। মিতু নিজে কল করলে ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বিয়ের চার বছর পার হতে চলল, এখন মাসে একদিনও রোহান নিজ থেকে খোঁজ নেয় না। মিতু কল দিলে তবেই কথা হয়, নয়তো না।
মিতুর চোখের জল টুপ করে মোবাইল স্ক্রিনের ওপর পড়ল। স্ক্রিনে থাকা সেই পুরুষটির মুখে কাঁপাকাঁপা আঙুল বুলিয়ে মিতু বিড়বিড় করে বলল,
“মানুষ এতটা বদলে যায় কী করে রোহান? মানুষ তো গিরগিটি না, তবুও ওরা গিরগিটির আগে কীভাবে এভাবে রঙ বদলায়?”
বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে মিতুর। মাঝে মাঝে তার খুব ইচ্ছে হয় এই মিথ্যে মায়ার পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে চলে যেতে। বহুবার সে আত্মহত্যার চেষ্টাও করতে গিয়ে থমকে গেছে। কিন্তু মরার সাহসটুকুও যেন আজ ফুরিয়ে এসেছে।
★★★
আরিয়ান রুমে ঢুকতেই একটা তুলতুলে সাদা বিড়াল এসে তার পায়ে সুরসুরি দিতে লাগল। বিড়ালটার স্পর্শে আরিয়ান নাক-মুখ কুঁচকে দ্রুত কয়েক পা দূরে সরে গেল। এমনিতে সে খুব গোছানো মানুষ, তার ওপর এই জাতীয় জন্তু-জানোয়ার দেখলে তার গা পিত্তি জ্বলে যায়।
বিড়ালটা আরিয়ানের বিরক্তি বুঝতেই পারল না। সে স্থির হয়ে বসে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বারবার ‘মিউ মিউ’ করে করুণ সুরে চিৎকার করতে লাগল। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
“সমস্যা কী তোর, বিলু? ডাকছিস কেন এভাবে?”
বিড়ালটা আরিয়ানের কথা বুঝল কি না কে জানে, সে উত্তরের বদলে আরও জোরে শব্দ করল। ঠিক তখনই তৃণা রুমে ঢুকল। নিজের প্রিয় বিড়ালটাকে দেখামাত্রই তৃণার বিষণ্ণ মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে দরজা থেকেই আদুরে গলায় ডাকল, “মিহু…!”
তৃণার পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই বিড়ালটা তীরের বেগে দৌড়ে তার কাছে চলে গেল। তৃণা পরম মমতায় মিহুকে কোলে তুলে নিয়ে ওর মুখে চুমু খেল। কোলে নিয়ে তৃণা লক্ষ্য করল, এই ক’দিনে বিড়ালটা বেশ শুকিয়ে গেছে। হয়তো ওর অবর্তমানে কেউ ঠিকমতো মিহুকে খাবার দেয়নি। মিহু তৃণার কাঁধে মুখ ঘষছে আর বিরামহীন অভিযোগের সুরে মিউ মিউ করে যাচ্ছে।
তৃণা বিড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে ভীষণ আয়েশি কণ্ঠে বলল, “তোর এখানে থাকতে খুব কষ্ট হয়েছে, তাই না রে? চিন্তা করিস না, এবার তোকে সাথে করে নিয়ে যাব ওই বাড়িতে।”
তৃণার কথা কানে যেতেই আরিয়ান দ্রুত এগিয়ে এসে কড়া গলায় বলল,
“ওই বাড়ি নিয়ে যাবে মানে? খবরদার! আমি এই বিড়ালকে আমার বাড়িতে ঢুকতেই দেব না। এমনিতে তুমিই আমার ঘাড়ে আপদ হয়ে চেপে আছো, এখন আবার আরেকটা ঝামেলা সাথে নিতে চাইছ?”
তৃণা এবার বেশ গম্ভীর হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকালো। শক্ত গলায় বলল,
“একদম ঝামেলা বলবেন না। আপনার মনে কি দয়া-মায়া বলতে কিচ্ছু নেই? এমন একটা সুন্দর বিড়ালকে আপনি ঝামেলা বলছেন!”
কথাটা বলেই তৃণা আবারও মিহুকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে আদর করল। আরিয়ান বিরক্তি ও কৌতূহল মেশানো দৃষ্টিতে তৃণার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, এটা ছেলে বিড়াল নাকি মেয়ে?”
তৃণা বলল, “ছেলে…”
তৃণার কথা শুনেই আরিয়ান বাঁকা এক হাসি দিয়ে বলে উঠল,
“ছিহ্! তোমার লজ্জা করে না একটা ছেলে বিড়ালকে এভাবে বুকের সাথে চেপে ধরতে?”
তৃণা আকাশ থেকে পড়ল। মুখটা হাঁ হয়ে গেল ওর, মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে এল, “এ্যাহ্! মানে কী?”
আরিয়ান সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বলল,
“এ্যাহ্ না, হ্যাঁ বলো। তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। একটা পর-পুরুষ বিড়ালকে এভাবে কোনোভাবেই এত জড়িয়ে ধরা ঠিক না।”
তৃণা এবার পরিস্থিতি বুঝতে পারল। আরিয়ান তাকে নিয়ে মজা করছে। সেও কম যায় না। একটু বাঁকা হেসে জবাব দিল,
“কী করব বলুন? আর কাকে জড়িয়ে ধরব? আমার স্বামী তো আবার মেয়েদের খুব একটা পছন্দ করেন না বলেই মনে হয়!”
তৃণার মুখ থেকে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনে আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সে একদম তৃণার শরীরের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। রাগী কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কী বললে তুমি? আমার মেয়ে মানুষ ভালো লাগে না? এর অর্থ তুমি জানো?”
তৃণা মিহুকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। আরিয়ানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“হুম, আমি তো বুঝেই বলেছি। তা না হলে কি নিজের স্ত্রীর হাতটা অব্দি এই ক’দিনে ঠিক করে ধরতেন না? আপনি তো কেবল আঘাত করতেই জানেন।”
তৃণা কথাটি শেষ করতে পারল না। আরিয়ান তার দিকে এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,
“শোনো শ্যামকন্যা, আমার পুরুষত্ব বা সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তোলো না, তাহলে…”
“তাহলে কী?” তৃণা যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল।
আরিয়ান এবার তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“তাহলে… তাহলে তোমার ‘মা’ ডাক শুনতেও বোধহয় খুব বেশি সময় লাগবে না।”
আরিয়ানের এই অপ্রত্যাশিত জবাবে তৃণা যেন কারেন্টে শট খেল। মুহূর্তের মধ্যে সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তৃণা লজ্জা পেল নাকি ভয় পেল, সেটা বোঝা কঠিন। তবে তার চোখেমুখে এক ধরণের অস্বস্তি ফুটে উঠল। সে তো আরিয়ানকে কেবল একটু রাগাতে চেয়েছিল, কিন্তু আরিয়ান যে এত সরাসরি আক্রমণ করবে তা সে ভাবেনি। তৃণা চায় না আরিয়ান কোনোভাবেই তাকে স্পর্শ করুক। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, ‘পুরুষ মানুষদের না ঘাটানোই ঠিক আছে। এরা রাগের মাথায় কখন যে কী করে ফেলতে পারে!’
আরিয়ান তৃণার সেই ভয়ার্ত আর অপ্রস্তুত মুখখানা দেখে মনে মনে বেশ মজা পেল। সে তৃণার দিকে তাকিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, “কী হলো? এতক্ষণ তো খুব খই ফুটছিল মুখে, এখন কি হাওয়া উড়ে গেল?”
তৃণা আর তর্কে গেল না। হার মানার ভান করে দ্রুত বিছানা গোছাতে শুরু করল। তবে তার হৃদপিণ্ডটা তখনো স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত গতিতে স্পন্দিত হচ্ছিল।
চলবে…
(নয়টায় দিব বলেছিলাম।কিন্তু কিছুটা দেরি হওয়ায় দুঃখিত।কি করব বলো বড় করে দিতে গেলে তে একটু দেরি হবেই।এক টানা লিখে গেছি।যাই এবার একটু পানি খেয়ে আসি🥹)
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE