রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
পর্ব_৪৩
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
প্রভাতের এক চিলতে মিঠে রোদ জানালার পর্দা গলে তৃণার চোখে-মুখে এসে লুটিয়ে পড়ল। সেই সোনালি আলোর পরশে মায়াবী এক তন্দ্রা ভেঙে তৃণা ধীরলয়ে চোখ মেলল। দৃষ্টি স্থির হতেই দেখল, ঠিক তার সামনেই নিঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন আরিয়ান। ঘুমের ঘোরে আরিয়ানের ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। সুবিন্যস্ত কুচকুচে কালো দাড়িযুক্ত মুখমন্ডলটি সকালের এই স্নিগ্ধ আলোয় এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর মায়া ছড়িয়ে রেখেছে।
আরিয়ানের সেই শান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে তৃণার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে বালিশের ওপর হাত রেখে আরিয়ানের ঘুমন্ত মুখের প্রতিটি রেখা নিবিষ্ট মনে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। বুকের ভেতর এক অবাধ্য স্পন্দন অনুভব করে সে বিড়বিড় করে বলল,
“কী করে বোঝাবো যে আমি আপনার প্রেমে বড্ড বাজেভাবে ফেঁসে গেছি! প্রতিটি ক্ষণে আমি শুধু আপনাকেই ভালোবাসি, প্রতিটা নতুন ভোরে নতুন করে আপনার প্রেমে পড়ি।”
তৃণার সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ করেই গতরাতের তিক্ত স্মৃতিগুলো ঝড়ের মতো তার মনের আয়নায় ভেসে উঠল। মুহূর্তেই তার মুখের হাসিটুকু কুয়াশার মতো উধাও হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে চট করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। নিজেকে নিজে শাসন করে ভাবল,কেন আমি এই মানুষটার প্রেমে পড়বো? যে মানুষটা আজ অবধি আমাকে ভালোবাসার চোখে দেখেনি, যার কাছে আমার কোনো মূল্য নেই, তার জন্য এত হাহাকার কেন?
তৃণা নিজের অবাধ্য মনকে বোঝাতে বোঝাতে ধীর পায়ে মেঝেতে পা রাখল। গতকাল রাতের ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তার কোনো হিসেব নেই। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখল সকাল ন’টা বেজে গেছে। বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেগে উঠেছে।
তৃণা ফ্রেশ হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখল আজ ড্রয়িংরুমে বেশ রমরমা একটা পরিবেশ। বাড়ির ছোট-বড় সবাই সেখানে উপস্থিত, সবার মধ্যে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য। তবে কেউ যে তৃণা আর আরিয়ানকে সকালের নাস্তার জন্য ডাক দেয়নি।
তৃণা ড্রয়িংরুমের কোণে দাঁড়াতেই নৌশি প্রায় দৌড়ে তার কাছে চলে আসলো। আজ নৌশিকে অন্যরকম লাগছে তার চঞ্চল দুচোখে একরাশ দুষ্টুমি আর মুখে এক আকাশ লজ্জা মাখানো। কাছে এসেই সে তৃণার হাত ধরে বলে উঠল,
“বউমনি, ছিহ্!”
বলেই সে খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি। তৃণা কিছুই বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে ? সাতসকালে এত হাসছো কেন?”
নৌশি হাসি থামিয়ে মুখ টিপে ধরে বলল
“রাতে কি দরজা বন্ধ করে ঘুমানো যায় না? অন্তত ছিটকিনিটা তো দিতে পারতে!”
তৃণা হতভম্ব হয়ে বলল,
“মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?”
“মানে আর কী! দরজা খোলা দেখে ভাবলাম তোমরা বোধহয় অনেক আগেই উঠে গেছো। তাই কফি নিয়ে ভাবলাম রুমে ঢুকি, ওমা! রুমে ঢুকে যা দেখলাম…”
নৌশি কথাটা শেষ না করে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
তৃণা পুরো আত্মবিশ্বাসের সাথে পালটা প্রশ্ন করল,
“দরজা খোলা বা বন্ধ থাকলেই বা কী! আর তুমি এভাবে অকারণে লজ্জা পাচ্ছো কেন?”
নৌশি এবার নাটকীয়ভাবে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তুমি কী বুঝবে বউমনি! আমি যে ঘোর সিঙ্গেল। দুটো কাপলকে চোখের সামনে একসাথে দেখলে আমার মতো সিঙ্গেলদের কষ্টে বুক ফেটে যায়। জানি না আমার কপালে যে গোলামের পুত আছে সে এখন কোথায়! অন্য কোনো বেটির সাথে বসে টাঙ্কি মারছে কি না, কে জানে!”
নৌশির এই অদ্ভুত আর মজার কথা শুনে তৃণার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। তাদের এই হাসাহাসির মাঝেই মিতু এগিয়ে আসলো। সে তৃণার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরিয়ানকে ডেকে আনো, তারপর দুজনে একসাথে নাস্তা করে নাও। বাড়ির সবার খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। তা, তোমাদের মান-অভিমান কি মিটেছে?”
তৃণা মিতুর প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দিল না। মিতু আবারও নরম গলায় বলল,
“গতকাল রাতটা একটু বেশি বেশি হয়ে গিয়েছিল না তৃণা? হ্যাঁ, আমি মানছি আরিয়ানও ভুল করেছে। কিন্তু গতকাল তোমার ওইরকম আচরণে আরিয়ান ভেতর থেকে সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছে। ওর চোখের দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল।”
মিতুর কথায় তৃণার এই প্রথম হয়তল বিরক্ত লাগছে।ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে ভেসে এল আরিয়ানের সেই গম্ভীর কিন্তু আজ একটু বেশিই মোলায়েম কণ্ঠস্বর,
“বউ! কই তুমি?”
তৃণা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ মিতু, নৌশি, এমনকি নুসরাতও বিস্ময়ে ওপরের দিকে তাকালো। আরিয়ান কি তবে সবাইকে চমকে দিতে চাইছে? সবার বিস্ময়কে আরও বাড়িয়ে দিয়ে আরিয়ান এবার আরও একধাপ এগিয়ে ডাকল,
“বউ গো, উপরে আসো। শ্যামলিনী, আসো না!”
তৃণা বিরক্তিতে মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল। এই লোকের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? সকাল সকাল সবাইকে বিনোদন দেওয়ার জন্য এই নাটক শুরু করেছে কেন? সবাই যখন মুচকি মুচকি হাসছিল, তখন নুসরাতের ঠোঁটের কোণে এক হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল,
‘অন্য নারীকে অবহেলা আর কষ্টে পাথর বানিয়ে দেওয়া পুরুষগুলো নিজের নারীর বেলায় বড্ড বেশি যত্নশীল হয়ে ওঠে।’
তৃণা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে ঝড়ের বেগে ওপরে উঠে গেল। রুমে ঢুকেই আরিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল,
“সমস্যা কী আপনার? লজ্জা-শরম কি সব কেজি দরে বিক্রি করে দিয়েছেন? ওভাবে সবাইকে শুনিয়ে হাঁকডাক ছাড়ার মানে কী?”
আরিয়ান ভ্রু নাচিয়ে হাসল। তৃণার রাগী মুখটার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তুমি যাই বলো তৃণা, আমি একটা প্রতিজ্ঞা করেছি। এখন থেকে প্রতিদিন সকালে নিজের বউয়ের একটা চুমু খেয়ে দিনটা শুরু করব।”
তৃণা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। তার মনে হলো সে কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর কথা শুনছে। সে তীব্র স্বরে বলল,
“আপনার শরীর ঠিক আছে তো? নাকি পাগল টাগল হয়ে গেছেন? কী সব আজগুবি কথা বলছেন!”
আরিয়ান দু-পা সামনে এগিয়ে এল। তৃণার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তার দুচোখে এক অদ্ভুত শীতলতা। সে কোমল স্বরে বলল,
“আজগুবির কী দেখলে? নিজের বউকে ভালোবাসতে তো কোনো মানা নেই।”
তৃণা ভীষণ বিরক্ত হলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কে আপনার বউ? কে? আমি আপনাকে স্বামী বলে মানি না।”
আরিয়ান থমকে গেল। ‘মানি না’ শব্দটা তার কানে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দিল। সে যেন মুহূর্তেই বড় বেশি অসহায় হয়ে পড়ল। খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করল,
“মানো না?”
“না।” তৃণার উত্তর ছিল পাথরের মতো শক্ত।
“কেন মানো না?”
“কারণ আপনি ভালোবাসার যোগ্য নন।”
আরিয়ান এবার তৃণার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকালো। তার কণ্ঠে বেদনার সুর ফুটে উঠল,
“কেন যোগ্য না তৃণা? আমি কি কখনো তোমার ওপর জোর করেছি? সজ্ঞানে কি কখনো তোমার গায়ে হাত তুলেছি? আর যখন অচেতন অবস্থায় আমি ভুল করেছি, ততবার আমি ক্ষমা চেয়েছি। অপরাধ না জেনেও তোমার চোখের জল দেখে নিজেকে অপরাধী মনে করেছি। কথা দিচ্ছি, আর কখনো তোমাকে কষ্ট দেব না। একবার সুযোগ দেবে না?”
তৃণা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। আরিয়ানের এই আবেগমাখা কথাগুলো আজ তার মন গলাতে পারছে না। কারণ,
যে মেয়ের মন একবার অভিমানে পাথর হয়ে যায়, তাকে ফেরানো পৃথিবীর কঠিনতম কাজগুলোর একটি। মেয়েদের মন যতটা নরম হতে পারে, পরিস্থিতির চাপে তা পাহাড়ের মতো কঠিনও হতে পারে।
আরিয়ান হার মানতে নারাজ। সে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“বলো, কী করলে তোমার এই পাহাড়সম অভিমান ভাঙবে?”
তৃণা আরিয়ানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“আপনার প্রতি আমার কোনো অভিমান নেই।”
“তাহলে কি রাগ আছে?” আরিয়ানের কণ্ঠে ব্যাকুলতা।
“না।”
“তাহলে আসলে কী আছে তোমার মনে?”
তৃণা এবার ঘুরে দাঁড়াল। আরিয়ানের চোখের দিকে চোখ রেখে অত্যন্ত শীতলভাবে বলল,
“আপনার প্রতি আমার ঘৃণা আছে। আপনাকে দেখলে এখন আমার শুধু বিরক্তি লাগে।”
কথাগুলো তীরের মতো আরিয়ানের বুকে বিঁধল। আজ যেন বারবার তার মনটা ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। তবুও সে দমল না। ঠোঁটে জোরপূর্বক এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“বেশ তো! আমি তোমার এই ঘৃণাকেই একদিন ভালোবাসায় জয় করে নেব।”
তৃণা তার ডাগর ডাগর বাঁকা আঁখি যুগল দিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে তাকালো। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল,
“পারবেন না।”
আরিয়ান হালকা হাসল। তারপর নিজের দুই হাত পিঠের পেছনে বেঁধে কিছুটা নিচু হলো। তৃণার চোখের মণির দিকে নিজের স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নেশাময় কণ্ঠে বলল,
“লোকে বলে ক্যান্সারের থেকে বড় ব্যাধি আর নেই,কিন্তু আমি তো দেখি তোমার চোখের মায়ার ব্যাধি ক্যান্সারের থেকেও ভয়ংকর!ক্যান্সার হলে তো ডক্টর বলে দেয় রোগী কতদিন বাঁচার সম্ভাবনা আছে,কিন্তু আমি তো তোমার চোখের মায়ায় ন্যানো সেকেন্ডেই মরে যাই!”
তৃণা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকে ঠিকই বলে, পুরুষের কণ্ঠের গভীরতা আর শব্দের মায়ায় একটা নারীর হাজার বছরের রাগ-অভিমান মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যেতে পারে। আরিয়ানের এই একটা কথা তৃণার বুকের ভেতর এক অজানা হাহাকারের জন্ম দিল। তার খুব জানতে ইচ্ছে হলো, তার নিজের চোখে এমন কী আছে যার জন্য এই মানুষটা বারবার পাগল হয়?
আরিয়ান যেন তৃণার মনের অব্যক্ত প্রশ্নটা পড়তে পারল। সে আরও কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“নিজের চোখ দেখতে চাও? তাহলে আমার চোখের দিকে তাকাও।”
তৃণা যেন এক সম্মোহনে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সে অবাধ্যভাবে তাকিয়ে রইল ঘন পাপড়িযুক্ত তার স্বামীর চোখের দিকে। সেই চোখের আয়নায় সে নিজেকে দেখল নাকি আরিয়ানের জমে থাকা ভালোবাসা তা কেবল সেই জানে। যে মানুষটার জন্য মনের গহীনে এত টান, তাকে কি সত্যিই দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব? তবুও তৃণা সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে মরিয়া।
আরিয়ান এবার ধীরগতিতে তৃণার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। তৃণা আজ বাধা দিল না। এক গভীর আবেশে সে চোখ বন্ধ করে নিল। আরিয়ান তৃণার কপালের খুব কাছে মুখ রেখেই মৃদু স্বরে বলল,
“আমাকে ভালোবাসতে হবে না শ্যামলিনি। শুধু প্রতিদিন একবার করে তোমার এই কপালটা স্পর্শ করতে দিলেই হবে।”
বলেই আরিয়ান পাশ কাটিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু দরজার ওপাড়ে যেতেই আরিয়ানের মুখের সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল। একরাশ বিষণ্ণতা এসে তার মনে ভিড় করল। এই বিষণ্ণতা কি একজন ব্যর্থ স্বামী হওয়ার গ্লানি, নাকি প্রিয়তমার মনে জায়গা না পাওয়ার হাহাকার?
★★★
নৌশি করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, মাথাটা নিচু করে কী একটা গভীর চিন্তায় সে মগ্ন। ঠিক উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসছে আদনান। নৌশিকে দেখেই আদনানের শয়তান মস্তিষ্ক নড়েচড়ে বসল। সে এমন একখানা ভাব ধরল যেন সে নৌশিকে দেখেও দেখেনি। নৌশি যখন ঠিক তার পাশ কাটালো, আদনান নিজের অভ্যাস বশত টপ করে নিজের পা-টা নৌশির পায়ের সামনে বাড়িয়ে দিল।
আদনানের প্ল্যান ছিল নৌশি হোঁচট খেলে সে চট করে তাকে ধরে নিবে, তারপর হিরো স্টাইলে বলবে ‘কী রে নাদান, একটু দেখে চলতে পারিস না?’ কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না! নৌশি এমনভাবে হুড়মুড় করে গিয়ে ফ্লোরে আছাড় খেল যে আদনান ধরার সুযোগই পেল না। নৌশি একদম উপুড় হয়ে ফ্লোরে পড়ল।
আদনান ভড়কে গেল। নৌশি কোনো নড়াচড়া করছে না দেখে আদনানের কলিজা শুকিয়ে কাঠ! ভাবল, মেয়েটা কি মরে টরে গেল নাকি? সে তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে বসে নৌশিকে তুলতে যাবে, ঠিক তখনই নৌশির হাতের একখানা সলিড ঘুষি সোজা এসে ল্যান্ড করল আদনানের খাড়া নাকের ওপর। আদনান ‘আহ’ করে চিৎকার দিয়ে নিজের নাক চেপে ধরল। নৌশি দাঁত কিড়মিড় করে উঠে বসে বলল,
“আদুর বাচ্চা! তুই সবসময় এমন অসভ্যতা করিস কেন? তোর চামড়া কি গন্ডারের নাকি? তুই কি আস্ত একটা বলদ? এভাবে কেউ পা বাজিয়ে দেয়? শয়তানি করার আর জায়গা পাস না?”
আদনান নাকে হাত ঘষতে ঘষতে চোখ গরম করে বলল,
‘‘তাই বলে তুই এভাবে নাকে ঘুষি মারবি? ভেঙে যেত তো!”
“ভেঙে গেলে নতুন করে প্লাস্টিক সার্জারি করে আসতি!” নৌশি তড়তড় করে উঠে দাঁড়ালো।
আদনানও উঠে দাঁড়িয়ে অবজ্ঞার স্বরে বলল,
“তোর চেয়ে একটা পিঁপড়াও সাইজে বড়। তুই আস্ত এক নাদানের বাচ্চা, তোকে তো মাঝে মাঝে খালি চোখে দেখাই যায় না!”
নৌশির মুখ অপমানে লাল হয়ে গেল। সে তেজের সাথে বলল,
“দেখ, তোর এসব কথা আজকাল আমার একদম ভালো লাগে না।”
“ভালো না লাগলে নাই। তুই এই বাড়িতে পড়ে আছিস কেন? যা তোর স্বামীর বাড়ি গিয়ে ঝগড়া কর!”
“হ্যাঁ, চলেই যাব। শুধু সেই গোলামের পুতটাকে খুঁজে পাচ্ছি না, পেলে ওর সাথে গিয়েই তোকে উদ্ধারের পথ দেখাতাম।”
আদনান হাসতে হাসতে বলল,
“তোর স্বামীর কপাল কতটা খারাপ মাঝে মাঝে ভাবি। তোর মতো এক পিস ঝগড়াটে মেয়েকে যে সারা জীবন সহ্য করতে হবে!”
নৌশিও কম যায় না। সে নাক কুঁচকে বলল,
“আমিও ভাবি তোর বউয়ের ভাগ্যটা কত খারাপ! তোর মতো একটা আদুর বাচ্চা যার শরীর থেকে ছাগলের গন্ধ আসে, তার সাথে সে কীভাবে থাকবে? ছিহ্! ভাবতেই আমার ঘেন্না লাগছে।”
আদনান যখন মোক্ষম কোনো উত্তর দিতে যাবে, তখনই তার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আদনানের মুখে এক অভাবনীয় অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। নৌশি থমকে গেল। আদনানের মুখে এমন স্নিগ্ধ হাসি সে জন্মেও দেখেনি। আদনান সবসময় বিটকেল আর বদমাইশি হাসি দেয়, কিন্তু আজকের হাসিটা যেন একটু বেশিই পবিত্র!
নৌশি কৌতূহল সামলাতে না পেরে উঁকি দিয়ে দেখল ফোনে নাম সেভ করা ‘সুইটহার্ট’। নৌশি কিছু বলার আগেই আদনান ফোনটা কানে চেপে বেশ দূরে সরে গেল। নৌশি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এর আগে আদনান কতগুলো মেয়ের সাথে প্রেম করতে চেয়েছে তার ঠিক নেই, কিন্তু নৌশির কারণে সেগুলো সাত দিনের বেশি টেকেনি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে আদনান সত্যিই খুব সিরিয়াস।
আদনানের সেই হাসিমুখ আর কথা বলার ভঙ্গি দেখে নৌশির মনে অজানাই এক বিষণ্ণতা এসে ভিড় করল। কেন জানি বুকটা চিনচিন করে উঠল তার। নৌশি নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান হাসল।
★★★
আরিয়ান ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ফিটফাট হয়ে রেডি হচ্ছে। আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখে নিয়ে সে পেছন না ফিরেই বলল,
“তৃণা, আমার ঘড়িটা দাও তো। দেরি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।”
তৃণা নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
“নিজে খুঁজে নিন।”
আরিয়ান এবার ঘুরে দাঁড়াল। কপালে সামান্য ভাজ ফেলে বলল,
“এমন করছ কেন? জানো না, স্বামীর সেবা করলে জান্নাত পাওয়া যায়? আমার অফিসে জরুরি মিটিং আছে, লক্ষ্মী মেয়েটার মতো তাড়াতাড়ি ঘড়িটা দাও তো।”
তৃণা আর তর্কে জড়াতে চাইল না। ঘড়িটা বের করে দেওয়ার জন্য এগোতেই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ‘আব্বু’ নামটা দেখে তৃণার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। সে তড়িঘড়ি করে কল রিসিভ করল।
“কেমন আছিস মা?” ওপাশ থেকে উমর হাওলাদারের স্নেহমাখা কণ্ঠ শোনা গেল।
“ভালো আব্বু। তুমি কেমন আছো? তোমার শরীর ঠিক আছে তো?”
উমর হাওলাদার একটু কেশে বললেন,
“হ্যাঁ মা, ভালোই তো আছি।”
তৃণা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“তোমার কণ্ঠস্বর এমন ভাঙা শোনাচ্ছে কেন? তুমি কি অসুস্থ?”
“আরে না রে মা। বয়স হয়েছে তো, একটু আধটু অসুখ-বিসুখ তো থাকবেই।” উমর হাওলাদার একটু চুপ থেকে পরক্ষণেই বললেন, “তৃণা, গত রাতে তৌহিদ সুই*সাইড করতে গিয়েছিল ।”
তৃণা আঁতকে উঠে বলল,
“তৌহিদ! কেন আব্বু? ও কেন এমন করতে গেল? ও এখন কেমন আছে?”
তৃণার কণ্ঠে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। আরিয়ান তখন ঘড়ি পরা বাদ দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃণার দিকে তাকাল। তৌহিদের নাম শুনেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
উমর হাওলাদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“হাতের রগ ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলেছে। অনেকটা র*ক্ত বের হয়ে গেছে শরীর থেকে। এখন আপাতত কিছুটা ভালো আছে।”
তৃণা দ্রুত বলল,
“আচ্ছা আব্বু, আমি আজই একবার হাসপাতালে আসব।”
কলটা কেটে তৃণা আরিয়ানের দিকে ফিরে বলতে চাইল,
“শুনুন, আমাকে একবার হাসপাতালে যেতে হবে…”
কিন্তু ওপাশে ফিরতেই তৃণা অবাক! একটু আগে যে লোকটা মিটিংয়ের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিল, সে এখন আয়েশ করে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। তৃণা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো আপনার? এভাবে শুয়ে পড়লেন কেন? অফিসে দেরি হচ্ছে না?”
আরিয়ান মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘অফিস আর মিটিংয়ের গুষ্টি কিলাই! তৌহিদ শালার খবর শুনে তুমি হাসপাতালে যাবে আর আমি অফিসে ফাইল নাড়াব? তা হচ্ছে না!’
আরিয়ান মুখে একটা কাঁচুমাচু ভাব এনে করুণ স্বরে বলল,
“শরীরটা ভালো লাগছে না তৃণা। ভীষণ অসুস্থ বোধ করছি। আজ আর অফিসে যাব না। তুমি বরং কোথাও না গিয়ে আমার কাছে বসে আমার সেবা করো।”
তৃণা এবার বিষয়টা কিছুটা আন্দাজ করতে পারল। তৌহিদের নাম শোনার পর থেকেই যে আরিয়ানের এই ‘অসুস্থতা’ শুরু হয়েছে, সেটা বুঝতে তার বাকি রইল না। সে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
“তা আপনার ঠিক কী হয়েছে শুনি?”
আরিয়ান সিরিয়াস মুখ করে বলল,
“জ্বরে পেট ব্যথা করছে।”
তৃণা অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“জ্বরে আবার পেট ব্যথা করে? দেখি তো কেমন জ্বর এসেছে আপনার।”
তৃণা আরিয়ানের কপালে হাত দিয়ে জ্বর চেক করতে গেলেই আরিয়ান চিৎকার করে উঠল,
“আহা! আমাকে ছুঁয়ো না। আমার কপালে যে আগুন, তাতে তুমি পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে!”
তৃণা কোনো কথা না শুনেই আরিয়ানের কপালে হাত রাখল। দেখল শরীরের তাপমাত্রা একদম স্বাভাবিক। বিরক্ত হয়ে তৃণা বলল,
“ফাজলামির একটা সীমা আছে। আপনি এভাবেই শুয়ে থাকুন, আমি হাসপাতালে যাচ্ছি।”
তৃণা যেই ঘর থেকে বের হতে যাবে, আরিয়ান এক লাফে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। রাগে আর বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করল, ‘এই তৌহিদ শালার কি ম’রার আর সময় ছিল না? ম’রবি তো একবারে ম’রতি, তা না এখন আমার বউ নিয়ে টানাটানি শুরু করেছিস!’
আরিয়ান দ্রুত পায়ে তৃণার পিছু পিছু যেতে যেতে ডাকল, “বউ! দাঁড়াও, আমিও তোমার সাথে যাব।”
তৃণা দরজায় দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে অবাক হয়ে তাকাল। যে লোকটা একটু আগে বলছিল জরুরি মিটিং আছে, সে এখন সব ফেলে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তৈরি! আরিয়ানের এই শিশুসুলভ হিংসা দেখে তৃণা মনে মনে হাসলেও মুখে গাম্ভীর্য ধরে রাখল।
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪২
-
রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪১ (স্পেশাল)