Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_২৪

লেখা #নিলুফানাজমিননীলা

★★★
পাঁজাকোলে করেই আরিয়ান তৃণাকে নিয়ে হাওলাদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। তৃণা আরিয়ানের শার্টটা শক্ত করে জাপটে ধরে আছে। ব্যথার তীব্রতায় মেয়েটা বারবার ডুকরে কেঁদে উঠছে, তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস যেন আরিয়ানের বুকে তীরের মতো বিঁধছে। গেটের কাছে যেতেই হঠাৎ একটা গাড়ি এসে ব্রেক কষল। আরিয়ানের পা থেমে গেল।
​গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলেন উমর হাওলাদার। তিনি যখন দেখলেন তৃণা আরিয়ানের কোলে অসহায়ের মতো কাঁদছে, তখন মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি এগিয়ে এসে চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“কী হয়েছে আরিয়ান? তৃণা কাঁদছে কেন?”

​আরিয়ান এবার চুপ থাকল না। সে বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে উত্তর দিল,
“নতুন কিছু হয়নি। আগে যা আপনার বাড়িতে তৃণার সাথে হয়েছে, আজও ঠিক তাই হয়েছে।”

​উমর হাওলাদার চমকে তাকালেন। আরিয়ানের কণ্ঠের তীব্র ঘৃণা তাকে স্তব্ধ করে দিল। তার নজর গেল তৃণার পিঠের দিকে। খয়েরি রঙা ব্লাউজটা পুড়ে গিয়ে পেছনের চামড়া কুঁচকে লাল হয়ে আছে, এমনকি ভেতরের কাঁচা মাংসটুকু অব্দি দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে উমর হাওলাদারের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
​আরিয়ান উমর হাওলাদারকে আর কোনো কথা বলার বা কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ দিল না। সে হনহন করে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল। সাবধানে তৃণা সিটে বসাতে গেল, কিন্তু বসামাত্রই তৃণা আবারও এক বীভৎস আর্তনাদ করে উঠল। তার দগ্ধ পিঠটা গাড়ির সিটে ঘষা খেতেই সে যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ল।

​আরিয়ান তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে অপরাধবোধে ম্রিয়মাণ হয়ে বলল,
“আই অ্যাম সরি তৃণা, আমি বুঝতে পারিনি।”

​আরিয়ান এবার তাকে সিটে সরাসরি না বসিয়ে কিছুটা বাঁকা করে বসিয়ে দিল, যাতে তার ক্ষতবিক্ষত পিঠটা সিটের স্পর্শে না আসে। তৃণা তখনও ফোঁপাচ্ছে, তার চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। সে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ব্যাকুল হয়ে বলে উঠল,
“মি..মিহু! আমার মিহু কোথায়?”

তৃণার ব্যাকুল আহ্বানে আরিয়ানের মিহুর কথা মনে পড়ল। ঠিক তখনি আরিয়ান পায়ের কাছে নরম কিছুর স্পর্শ অনুভব করল। নিচে তাকিয়ে দেখল মিহু সেখানে দাঁড়িয়ে করুণ সুরে মিউ মিউ করছে। আরিয়ান আর দেরি করল না, তৃণাকে সাবধানে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে মিহুকে নিজের কোলে তুলে নিল। পরম আদরে বিড়ালছানাটির মাথায় হাত বুলিয়ে সেটিকে তৃণার পাশে বসিয়ে দিল। মিহুও যেন পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শান্ত হয়ে তৃণার গা ঘেঁষে বসে রইল।
​আরিয়ান অত্যন্ত সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করছে, যাতে রাস্তায় কোনো ঝাঁকুনিতে তৃণার পিঠের ক্ষততে চোট না লাগে। তৃণা জানালার বাইরে তাকিয়ে নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। তার কান্না থামছেই না। আরিয়ান বারবার আড়চোখে তৃণার দিকে তাকাচ্ছে, আর প্রতিবারই তার নিজের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসছে।
​আরিয়ান এবার নীরবতা ভেঙে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “খুব ব্যথা হচ্ছে?”

​তৃণা যন্ত্রণায় কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, সে কেবল দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না বলল। কিন্তু তার কুঁকড়ে যাওয়া শরীর আর ফ্যাকাশে মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ব্যথার তীব্রতা কতটা ভয়াবহ। আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল, “আর কিছুক্ষণ সহ্য করো, আমি তোমাকে এখনই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”

​ডাক্তারের কথা শুনতেই তৃণা চটজলদি আরিয়ানের দিকে ফিরল। সে আতঙ্কিতভাবে মাথা নাড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “প্লিজ না… আমি ডাক্তারের কাছে যাব না।”

​তৃণার চোখের মণি দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ার ফলে গাল দুটো ভিজে একাকার। সেই ভেজা গালে রিনির হাতের চার আঙুলের কালো দাগ স্পষ্ট বসে গেছে। তৃণার গালের ওই দাগ আর পিঠের পোড়া ক্ষত দেখে আরিয়ানের মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে রিনি আর রৌশনারা বেগমের প্রতি তার ঘৃণা কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

​তৃণা বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও আরিয়ান তার কথা মানল না। সে জানে এই ক্ষত কতটা বিষিয়ে উঠতে পারে।
কাছেই একটা লোকাল চিকিৎসকের চেম্বার ছিল, আরিয়ান দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে সেখানেই তৃণাকে নিয়ে এল। ডক্টর খুব মন দিয়ে তৃণার পিঠের ক্ষতটা পর্যবেক্ষণ করলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন,
“খুবই নিষ্ঠুর কাজ। তবে ভাগ্য ভালো যে ক্ষতটা খুব গভীরে পৌঁছায়নি, ওপরের পাতলা চামড়াটাই বেশি পুড়ে গেছে।”

​তৃণাকে একটি চেয়ারে বসানো হলো, আরিয়ান ছায়ার মতো তার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। ডক্টর বললেন,
“জায়গাটা ড্রেসিং করে ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে, নাহলে ইনফেকশন হয়ে যাবে। তারপর আমরা পেইনকিলার দিয়ে দিচ্ছি।”

​পরিষ্কার করার কথা শুনেই তৃণা আঁতকে উঠল। সে প্রচণ্ড ভয়ে আরিয়ানের হাতটা খামচে ধরল। তার কাঁপাকাঁপা ঠোঁট আর জলভরা চোখে মিনতি ঝরে পড়ল,
“প্লিজ আরিয়ান, না! আমি সহ্য করতে পারব না। চলুন না ফিরে যাই, আমি আর ডাক্তার দেখাব না।”

​ডক্টর মৃদু হেসে অভয় দিলেন,
“ভয় পেও না মা। আমরা তোমার পিঠের ওই জায়গাটা অবশ করে নিয়ে তারপর পরিষ্কার করব। এখন পরিষ্কার না করলে পরে আবহাওয়া ঠাণ্ডা হওয়ার কারণে এটা পঁচে গিয়ে তোমাকে আরও বেশি ভোগাবে।”

​আরিয়ান তৃণার হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। তৃণার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কোমল স্বরে আশ্বস্ত করল, “ভয় পেও না তৃণা, একদম চিন্তা নেই। আমি তো আছি তোমার পাশেই।”

​একজন নারী নার্স এসে তৃণার পিঠে লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া পুশ করলেন। কিছুক্ষণ পর ডক্টর যখন স্পিরিট ভেজানো তুলা নিয়ে ক্ষত জায়গায় প্রথম ছোঁয়া দিলেন, অমনি তৃণা এক বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল। ব্যথার তীব্রতায় সে আরিয়ানের হাত পিষে ফেলার মতো করে চেপে ধরল। আরিয়ান ডক্টরের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
“আপনি না বললেন অবশ করে নেবেন? তবে ও ব্যথা পাচ্ছে কেন?”

​ডক্টর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নার্সের দিকে তাকালেন, “ঠিকমতো দিয়েছিলেন তো ইনজেকশনটা?”

নার্স মাথা নিচু করে বলল, “জি স্যার, দিয়েছি।”

ডক্টর এবার আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “আসলে কখনো কখনো ইনজেকশন ঠিকঠাক কাজ করে না, একটু ব্যথা সইতেই হবে।”

​ডক্টর তৃণার সেই বুকফাটা আর্তনাদকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজে মন দিলেন। তৃণা বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠছে। প্রকৃতপক্ষে ওই ইনজেকশনটা তৃণার ক্ষতবিক্ষত শরীরে বিন্দুমাত্র কাজ করেনি। আরিয়ানের এখন নিজের ওপর চরম ঘৃণা হচ্ছে,কেন সে এমন একটা সাধারণ ক্লিনিকে তৃণাকে নিয়ে এল!
​সহ্য করতে না পেরে আরিয়ান তৃণার মাথাটা নিজের বুকের ওপর টেনে নিল। নিজের দুহাত দিয়ে তাকে আগলে ধরে বারবার কানে কানে বলতে লাগল, “আর একটু সহ্য করো তৃণা।”

​কিন্তু তৃণা তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ব্যথার ঝটকায় সে আরিয়ানের হাতের চামড়া নখ দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরল। তার তীক্ষ্ণ নখগুলো আরিয়ানের মাংস ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল, কিন্তু আরিয়ানের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে অস্থির হয়ে বারবার ডক্টরকে বলছে, “আরে আস্তে করুন! দেখছেন না ও ব্যথা পাচ্ছে?”

​আরিয়ান স্পষ্ট অনুভব করতে পারল, তৃণার প্রতিটি আর্তনাদে তার নিজের হৃৎপিণ্ডটা যেন কেউ ছিঁড়ে ফেলছে। তৃণার কষ্টের ভাগ নিতে গিয়ে অজান্তেই আরিয়ানের পাথরের মতো চোখ দুটো ভিজে উঠল। তার গাল বেয়ে দুই ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তৃণার চুলে। কয়েক মিনিটের সেই নরকযন্ত্রণা শেষে যখন ড্রেসিং শেষ হলো, তৃণা তখন পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে আরিয়ানের বুকেই এলিয়ে পড়ল।
★★★
উমর হাওলাদার বাড়ির ভেতর ঢুকেই এক গগনবিদারী চিৎকার দিলেন। তার সেই বজ্রকণ্ঠে পুরো বাড়ি যেন কেঁপে উঠল। তিনি উন্মত্তের মতো রৌশনারা বেগম আর রিনিকে ডাকতে লাগলেন। তার চিৎকারে রৌশনারা বেগম অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ড্রয়িংরুমে এগিয়ে এলেন, যেন কিছুই হয়নি। অবজ্ঞার সুরে বললেন,
“হয়েছেটা কী? এভাবে চিৎকার করছ কেন?”

​উমর হাওলাদার রক্তবর্ণ চোখে রৌশনারা বেগমের দিকে তাকালেন। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে রাগে। তিনি দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
“কেন করলে এটা? আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে আর কত কষ্ট দেবে তোমরা? তোমাদের কি বুকটা একটুও কাঁপল না ওর ওরকম জ্যান্ত শরীরটা পুড়িয়ে দিতে?”

​রৌশনারা বেগম একটুও বিচলিত না হয়ে বাঁকা হাসলেন। নির্লিপ্ত গলায় বললেন,
“মুখে মুখে তর্ক করলে তো এমনই করব। যা করেছি বেশ করেছি।”
হঠাৎ উমর হাওলাদারের হাতের এক প্রচণ্ড চড় গিয়ে পড়ল রৌশনারা বেগমের গালে। আকস্মিক এই আঘাতে রৌশনারা ছিটকে গিয়ে সোফায় পড়লেন। তিনি অপমানে জ্বলে উঠে আঙুল উঁচিয়ে কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু উমর হাওলাদার তাকে সুযোগ দিলেন না। দ্বিতীয় থাপ্পড়টা তার আগের চেয়েও জোরে গিয়ে পড়ল।
​রিনি দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তার সাহসে কুলাল না বাবার সামনে এসে দাঁড়ানোর। এমনিতেই আরিয়ানের হাতের পাঁচ আঙুলের দাগ তার গালে দাউদাউ করে জ্বলছে, এখন বাবার রুদ্রমূর্তি দেখে তার বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

​উমর হাওলাদার এবার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন। চিৎকার করে বললেন,
“তোমরা দুই মা-মেয়ে এই মুহূর্তে এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাও! তোমাদের মতো বিষাক্ত মানুষদের ছায়া আমি আর এই বাড়িতে দেখতে চাই না।”

​রৌশনারা বেগম অবাক চোখে তাকালেন। রিনি কাঁপাকাঁপা গলায় দূর থেকেই বলল, “ড্যাডি! এসব কী বলছ? আমরা কোথায় যাব?”

​“জাহান্নামে যাও! যেখানে খুশি যাও, কিন্তু এই বাড়িতে যেন তোমাদের মুখ আর কোনোদিন না দেখি।” উমর হাওলাদারের কণ্ঠে ছিল পাহাড়সম দৃঢ়তা।

​রৌশনারা বেগম এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গাল চেপে ধরে বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন,
“যা বলছ ভেবে বলছ তো উমর? ভুলে যেও না, যখন তুমি আমাকে বিয়ে করেছিলে, তখন তুমি সেই চুক্তিপত্রে সই করেছিলে যে তুমি চাইলেই আমাকে সহজে ছেড়ে দিতে পারবে না।”

​উমর হাওলাদার এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। সেই হাসিতে ছিল ঘৃণা আর জয়ের আভা। তিনি বললেন, “এতগুলো বছর কেবল ওই কাগজের টুকরোর ভয়ে তোমাদের এই পৈশাচিকতা সহ্য করে গেছি।কী করতে পারবে? কোর্টে যাবে? যাও! দেখি তোমরা কোন পর্যন্ত যেতে পারো আর আমি উমর হাওলাদার তোমাদের পিঠের চামড়া তুলতে কতদূর যেতে পারি।”

উমর হাওলাদারের এমন কঠোর অবস্থান দেখে রৌশনারা বেগমের আত্মবিশ্বাস মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, আজ আর কোনো আইনি হুমকি বা পুরোনো দোহাই কাজে আসবে না। উমর হাওলাদার এবার দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে সিকিউরিটিদের ডাকলেন।
​“এই মুহূর্তে এদের দুজনকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ির বাইরে বের করে দাও! আর মনে রেখো, আজকের পর এই দুই জন যদি গেটের আশেপাশেও ঘেঁষার চেষ্টা করে, তবে সোজা পুলিশের হাতে তুলে দেবে।”

​সিকিউরিটিরা উমর হাওলাদারের আদেশ অমান্য করার সাহস পেল না। রৌশনারা বেগম আর রিনিকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে বাড়ির বাইরে বের করে দেওয়া হলো। তাদের চিৎকার আর গালিগালাজ তখন গেটের ওপার থেকে অস্পষ্ট হয়ে ভেসে আসছিল, কিন্তু উমর হাওলাদারের কানে সেসব আর পৌঁছাল না।

​উমর হাওলাদার টলমল পায়ে নিজের শোবার রুমে ফিরে এলেন। তার শরীর কাঁপছে, দীর্ঘদিনের জমে থাকা দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেলেও বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে আলমারির ভেতর থেকে একটি ছোট চাবি বের করলেন। তালাবদ্ধ ড্রয়ারটি খুলে অতি যত্নে রাখা একটি পুরোনো ফ্রেমবন্দি ছবি বের করে আনলেন।
​ছবিটির দিকে তাকাতেই তার দুচোখ ছাপিয়ে জল নামল। তিনি ধপ করে বিছানায় বসে পড়লেন। মেহেরজান তৃণার মা। ছবিতে থাকা হাসিখুশি মুখটির ওপর হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। অবরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন,
​“মেহেরজান… তোমার স্বামী একজন চরম ব্যর্থ পুরুষ। তোমাকে যেমন অকালে হারিয়েছি, তেমনি তোমার স্মৃতিটুকুও আগলে রাখতে পারিনি। নিজের মেয়েটাকেও কখনো ওই ডাইনীদের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে সক্ষম হইনি। আজ ওর ওই দগ্ধ শরীরটা দেখে মনে হলো আমার নিজের কলিজাটা কেউ ছিঁড়ে ফেলেছে।”

​উমর হাওলাদারের চোখের জল টপটপ করে ছবির কাঁচের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। তিনি অস্ফুট স্বরে আরও বললেন, “জানো মেহেরজান, মাঝে মাঝে আমার খুব মরে যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু তৃণার কথা ভেবে হাত-পা থমকে যায়। মেয়েটার পাশে তো এখন আর কেউ নেই। তুমি কি ওপর থেকে আমায় মাফ করে দেবে না মেহেরজান?”
​পুরো ঘরটা এখন নিস্তব্ধ।
★★★
আরিয়ান আর তৃণা যখন বাড়ির ভেতর ঢুকল, ড্রয়িংরুমে তখন পারিবারিক আড্ডার আমেজ। সবাই মিলে হাসাহাসি করছে। তৃণা আগেই আরিয়ানকে শক্ত করে বারণ করে দিয়েছে এই নিয়ে যেন কাউকে কিছু না বলা হয়। সে নিজের শাড়ির আঁচলটা খুব সাবধানে টেনে পিঠের ক্ষত আড়াল করে রেখেছে।
​তৃণাকে দেখে মরিয়ম বেগম বরাবরের মতোই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃণা সবার সামনে স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু তার মুখ থেকে কিছুতেই হাসি বের হচ্ছে না। মিতু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“এত দেরি কেন হলো তৃণা?”

​তৃণা কাঁপা গলায় উত্তর দিল, “ওই তো… বাবার সাথে অনেক দিন পর দেখা হলো তো, গল্প করতে করতে সময় চলে গেল।”

​মিতু তৃণার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,
“তুমি ঠিক আছো তো? মুখটা কেন জানি একদম ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।”

​এরই মাঝে সোফা থেকে হাসোজ্জ্বল মুখে নৌশি লাফিয়ে এল। নৌশির সাথে তৃণার বন্ধুত্বটা খুব গভীর। সে কোনো কিছু না বুঝেই আনন্দের আতিশয্যে তৃণাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নৌশি তার কলেজের কোনো একটা মজার কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার হাতের চাপটা গিয়ে পড়ল তৃণার সেই তাজা পোড়া পিঠে।

​তৃণা আর্তনাদ করে উঠল “আহ্!”
​তৃণার সেই চিৎকারে পুরো ড্রয়িংরুম মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নৌশি ভয় পেয়ে ছিটকে সরে দাঁড়াল। আরিয়ান দ্রুত এসে তৃণাকে আগলে ধরল। সোফায় বসে থাকা মায়মুনা বেগম বিরক্তির স্বরে বলে উঠলেন,
“তুমি তো দেখছি মেমসাহেব! মেয়েটা একটু জড়িয়ে ধরেছে বলেই ওভাবে চিৎকারের কী আছে? খুব তো অভিনয় শিখছ ইদানীং।”

​তৃণা তখন যন্ত্রণায় থরথর করে কাঁপছে, তার হাত থেকে শাড়ির আঁচলটা খসে পড়ে গেছে। রাহি বেগম পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হঠাৎ তার নজর গেল তৃণার পিঠের দিকে। ক্ষতের বীভৎসতা দেখে তিনি আঁতকে উঠে চিৎকার করে বললেন,
“ওমা! একী সর্বনাশ! মেয়েটার পিঠ ওভাবে পুড়ে গেল কী করে?”

​তৃণা এই পরিস্থিতির ভয়ই পাচ্ছিল। তার বাবার বাড়ির অশান্তি আর সৎ মায়ের নিচতা সবার সামনে চলে আসবে ভেবে তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। সে মাথা নিচু করে কাঁদতে শুরু করল। ক্ষতটা দেখে উপস্থিত সবারই পিলে চমকে গেল। মরিয়ম বেগম পর্যন্ত নিজের ঘৃণা ভুলে হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

​আরিয়ান আর গোপন রাখতে পারল না। সে সব সত্যি খুলে বলল কীভাবে রৌশনারা বেগম গরম খুন্তি দিয়ে ওকে পুড়িয়েছে। কথাগুলো শুনে ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মিতু আর নৌশি ধরাধরি করে তৃণাকে উপরে রুমে নিয়ে গেল।

​সবাই ধীরে ধীরে যার যার জায়গায় ফিরে গেলেও মরিয়ম বেগম ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মনে বিচিত্র এক তোলপাড় চলছে। তিনি কি এতদিন ভুল ছিলেন? কোনো মানুষ সৎ মা হলেও এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে?
​মায়মুনা বেগমের মাথায়ও যেন বাজ পড়ল। তিনি ভাবতে লাগলেন, যদি আজকের ঘটনা সত্যি হয়, তবে ওইদিন তার কানে তৃণা সম্পর্কে যেসব কুৎসা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো কি সবই সাজানো ছিল?
​রাহি বেগম মায়মুনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “কী হলো? ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

মায়মুনা বেগম সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ছোট করে বললেন, “না, কিছু না।”
​বলেই তিনি গুমোট মন নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন।
★★★
তৃণা কতক্ষণ ধরে জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার হিসেব নেই। মেয়েটার চোখের জল শুকিয়ে গালের ওপর নোনা দাগ পড়ে গেছে। বারবার তার চোখের সামনে রৌশনারা বেগমের সেই মেকি মায়ার মুখটা ভেসে উঠছে। কী অদ্ভুত! তৃণা এক মুহূর্তের জন্য হলেও বিশ্বাস করেছিল যে তারা হয়তো তাকে আপন করে নিয়েছে। কিন্তু সে জানত না, কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না মানুষের ভেতরের বিষাক্ত স্বভাব এত সহজে মরে না।

​পেছন থেকে আরিয়ানের কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
“এভাবে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থেকো না তৃণা, ঠাণ্ডা লেগে যাবে।”

​তৃণা কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরপায়ে আলমারির কাছে গিয়ে নিচে বিছানা পাতার জন্য কম্বল বের করতে শুরু করল। কিন্তু হঠাৎ আরিয়ান এগিয়ে এসে তার হাতটা খুব কোমলভাবে ধরল। তৃণা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ান শাসনের সুরে বলল,
“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? পিঠের এই অবস্থা নিয়ে তুমি নিচে শক্ত মেঝেতে শোয়ার চিন্তা করছ কী করে? চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শোও।”

​তৃণা আর তর্কে গেল না। নিঃশব্দে গিয়ে বিছানার এক কোণে বসল। আরিয়ানও তার পাশে খানিকটা দূরত্ব রেখে বসল। তার চোখে এখন তৃণার জন্য গভীর উদ্বেগ। আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
“কেন এভাবে সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করো তৃণা? একবার প্রতিবাদ করে দেখো, দেখবে পরের বার কেউ আর এসব করার সাহস পাবে না। কেন নিজেকে এভাবে সঁপে দাও অন্যদের অন্যায়ের কাছে?”

​তৃণা আরিয়ানের দিকে ঝাপসা চোখে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে আসছিল,
“আচ্ছা আপনি কি বলতে পারেন আমাকে কেউ কেন ভালোবাসে না? সবাই কেন আমার ওপর এতটা নিষ্ঠুর হয়? আমি কি খুব খারাপ, নাকি আমার স্বভাব খুব মন্দ? জানেন, মাঝে মাঝে আমার খুব কষ্ট হয়, মনে হয় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু যাওয়া তো এত সহজ না। খোদা আমার কপালে এত কষ্ট কেন লিখেছেন আমি জানি না।”

​তৃণা থামল না, তার বুকচাপা দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন আজ বাঁধ ভেঙে বের হতে চাইছে। সে বলতে লাগল,
“জানেন, একবার রিনি আমাকে নোংরা পুকুরের পানির নিচে চেপে ধরেছিল। সেদিন দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার, আমি মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। কিন্তু আমার কপালটা দেখুন, মরণ এত কাছে এসেও আমাকে ছুঁয়ে যায় না। আমাকে বেঁচে থাকতে হয় এই অসহ্য যন্ত্রণাগুলো সহ্য করার জন্য।”

​কথাগুলো বলতে বলতে তৃণার চোখ বেয়ে হুড়হুড় করে জল গড়িয়ে পড়ল। আরিয়ান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আলতো করে এগিয়ে এসে তৃণাকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। এই মুহূর্তে তৃণার মাথার ওপর সান্ত্বনার হাত রাখা ছাড়া আর কোনো ভাষা আরিয়ানের জানা নেই। তৃণা যেন এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল, সে আরিয়ানের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ছোট বাচ্চার মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। তার সেই কান্নার শব্দে বাইরের নিস্তব্ধ রাতটাও যেন ভারী হয়ে উঠল।

চলবে…

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply