Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৯


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_১৯

কলমে #নিলুফানাজমিননীলা

★★★
পরদিন দুপুরের দিকে মিতুকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হলো। মিতু এখন পুরোপুরি সুস্থ, তবে শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের ধকলটা এখনো রয়ে গেছে। বড়দের পরামর্শে মিতু আর রোহানকে একটা আলাদা গাড়িতে পাঠানো হলো, যাতে তারা দুজন একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে পারে এবং মনের পুঞ্জীভূত ভুল বোঝাবুঝিগুলো মিটিয়ে নিতে পারে।
​অন্যদিকে, আরিয়ান আর তৃণা অন্য একটি গাড়িতে করে বাড়ির দিকে রওনা দিল। আরিয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, কিন্তু তৃণা খেয়াল করল মনোযোগ শুধু রাস্তার দিকেই নেই, আরিয়ান বারবার আড়চোখে তৃণার দিকে তাকাচ্ছে। আরিয়ানের এই চোর-চোর চাহনি দেখে তৃণা হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল। মুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি নিয়ে বলল,
“কী ব্যাপার রাগী সাহেব? আজ আপনাকে ঠিক তেমন রাগী রাগী লাগছে না কেন?”

​তৃণার কথা শুনে আরিয়ান বেশ হকচকিয়ে গেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে চট করে গম্ভীর হওয়ার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল। মুখে জোর করে কাঠিন্য আনার চেষ্টা করলেও আজ যেন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না,রাগের বদলে এক ধরনের অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠছে তার চোখেমুখে। আরিয়ানের এই দশা দেখে তৃণা খিলখিল করে হেসে উঠল।
​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশের ভান করে বলল, “অহেতুক হেসো না তো, বিরক্ত লাগছে।”

​তৃণা ছাড়ার পাত্রী নয়, সে হাসতে হাসতেই বলল,
“কই? আপনার মুখে তো বিরক্তির ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না!”

​আরিয়ান এবার চুপ করে গেল। তর্কের কোনো যুতসই উত্তর খুঁজে না পেয়ে সে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল। ঠিক তখনই তৃণা গলাটা একটু খানি নামিয়ে, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল,
​“জানেন রাগী সাহেব? গতকাল রাতে যখন করিডোরের ওই শক্ত চেয়ারটায় ঘুমালাম, তখন হঠাৎ বিশাল বড় একটা মশা আমার কপালে কামড় দিয়েছিল। উফ! কী যে এক জ্বালা দিচ্ছিল জায়গাটা!”

​তৃণার এই অদ্ভুত ‘মশা’র গল্প শুনে আরিয়ান হঠাৎ বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা হলো। তার কান দুটো মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল।
তৃণার কথা শুনে আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে গাড়ির স্টিয়ারিং প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিল। আড়ষ্ট হয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকে হাজারটা গালি দিল, ‘হায় খোদা! তার মানে তৃণা কি সব টের পেয়েছে? ও কি জেগে ছিল?’ এই চিন্তায় আরিয়ানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল।

​আরিয়ানকে ওভাবে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে তৃণা হেসে ফেলে বলল,
“আরে সামনে তাকান রাগী সাহেব! ওদিকে তাকিয়ে থাকলে তো এক্সিডেন্ট করে বসবেন!”

​আরিয়ান দ্রুত রাস্তার দিকে চোখ ফেরাল। কিন্তু মনের ভেতরের ছটফটানি কমছে না। সে খুব নিচু আর জড়সড় গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি… তুমি কি তখন জাগ্রত ছিলে?”

​তৃণা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের কপালের এক পাশে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, এই দেখুন না! দেখুন কত বড় একটা লাল দাগ হয়ে আছে!”

​আরিয়ান কৌতূহলী হয়ে তৃণার কপালের দিকে তাকাতেই দেখল, সত্যিই সেখানে একটা মশার কামড়ের লালচে দাগ হয়ে আছে। আরিয়ান যেন ধড়ে প্রাণ পেল। সে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে অবাক হয়ে বলল,
“তার মানে তুমি সত্যিই মশার কথা বলছিলে?”

​তৃণা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আমি তো মশার কথাই বলছি। আপনি আবার কী ভেবেছিলেন?”

​আরিয়ান থতমত খেয়ে বলল,
“না… মানে… আমি তেমন কিছু ভাবিনি।”

​তৃণা এবার সন্দেহী দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! কিছু একটা তো হয়েছেই। নাকি আপনি সুযোগ পেয়ে কোনো অসৎ কাজ করেছেন? কোনটা?”

​আরিয়ান এবার আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে তোতলাতে শুরু করল,
“ছিঃ ছিঃ! আমি ওইরকম ছেলেই না যে সুযোগ বুঝে কাউকে চু…চুমু খাবো!”

​কথাটা মুখ দিয়ে বেরোতেই আরিয়ানের মনে হলো পৃথিবীর মাটি যদি এখন ফাঁক হতো আর সে ভেতরে ঢুকে যেত! তৃণা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সে এক গাল হাসি চেপে ধরে বলল,
“আমি কখন চুমুর কথা বললাম রাগী সাহেব?”

​আরিয়ানের মুখটা তখন দেখার মতো হয়েছে। নিজের মুখ ফসকে আসল কথা বের করে দিয়ে সে এখন লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে সে চটজলদি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল, “অনেক বেলা হয়েছে। চলো, সামনে ওই রেস্টুরেন্টটা থেকে কিছু খেয়ে আসি। ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার।”
​তৃণা আর কথা বাড়াল না। সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
★★★
রোহানের নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স সাথে নেই, তাই ড্রাইভারই গাড়ি চালাচ্ছে। রোহান আর মিতু পেছনের সিটে বসেছে। তবে মিতু ইচ্ছে করেই রোহানের থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে জানালার ধার ঘেঁষে বসেছে। মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা যেন তাদের চার বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদের এক নীরব সাক্ষী।
​মিতু জানালার কাঁচ নামিয়ে গালে হাত দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ-মুখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। হাসপাতালের সেই ধকল কাটিয়ে উঠলেও মনের ভেতর জমে থাকা অভিমানগুলো এখনো পাহাড়ের মতো অটল। মিতু একবারের জন্যও রোহানের দিকে ফিরে তাকায়নি, একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি।

​রোহান অপলক মিতুর দিকে তাকিয়ে আছে। মিতুর চুলগুলো একটা হেয়ারক্লিপ দিয়ে খুব যত্ন করে আটকানো। অথচ রোহান খুব ভালো করে জানে, মিতু আগে কখনো তার সামনে চুল বাঁধত না,সে জানত রোহান তার খোলা চুল পছন্দ করে। রোহান নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে মিতুর একটু কাছে সরে গিয়ে আলতো করে ক্লিপটা খুলে দিল। সাথে সাথে রেশমি কালো চুলগুলো অবাধ্য হয়ে বাতাসে উড়তে শুরু করল এবং রোহানের চোখে-মুখে এসে আছড়ে পড়ল।
​মিতু চমকে নিজের ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে তাকাল রোহানের দিকে। রোহানের চোখে তখন এক চিলতে অপরাধবোধ মাখা হাসি। সে ভেবেছিল মিতু হয়তো আগের মতো দুষ্টুমি করে রেগে যাবে, কিন্তু মিতুর দৃষ্টি আজ বরফের মতো শীতল। সে রোহানের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন কোনো অচেনা মানুষের কর্মকাণ্ড দেখছে।

মিতু কোনো প্রতিবাদ করল না, কোনো প্রশ্নও করল না, শুধু নিস্পৃহ ভঙ্গিতে আবারও বাইরের দিকে ফিরে বসল।
​রোহানের ঠোঁটের কোণের হাসিটা নিমেষেই মিলিয়ে গেল, তবে সে হাল ছাড়ল না। একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, “মিতু, চলো না একটু সামনেই তো তোমার সেই প্রিয় পার্কটা। চলো ওখান থেকে একটু ঘুরে যাই।”

​মিতু কিছুক্ষণ পাথর হয়ে বসে থেকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “বাব্বাহ! আমার পছন্দও দেখি তোমার এখনো মনে আছে?”

​রোহান কোনো উত্তর খুঁজে পেল না, চুপ করে রইল। কয়েক মুহূর্ত পর সে আবারও মিনতিভরা গলায় বলল,
“চলো না মিতু, যাই। প্লিজ!”

​এবার মিতুর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে কিছুটা কঠোর গলায় বলল,
“বললাম তো যাব না! তবুও কেন বারবার আমাকে বিরক্ত করছো?”

​রোহান অসহায় এক হাসলো। সে মাথা নিচু করে নিজের হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে নিজেকেই বলল, ‘এটাই তোর পাওনা রোহান। তুই ওর সাথে যা করেছিস, তাতে এর চেয়ে বেশি ভালোবাসা আর কী আশা করবি? এর চেয়েও বড় শাস্তি পাওয়া উচিত তোর।’
★★★
নুসরাত মেয়েটা একটু অন্য ধাঁচের। হোস্টেলের বাকি চারটি মেয়ে যখন ফোনে তাদের বয়ফ্রেন্ডের সাথে মিষ্টি আলাপে মশগুল কিংবা গালগল্পে মগ্ন, নুসরাত তখন হেঁশেল সামলায় আর একমনে বই পড়ে। পড়াশোনার প্রতি তার টানটা একটু বেশিই। রান্না শেষ করে সে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা নিয়ে নিজের ডেরায় ফিরল। গতকালই মির্জা বাড়ি গিয়েছিল মিতু ভাবিকে দেখতে, আজ সন্ধ্যার আগেই হোস্টেলে ফিরেছে।
​চোখে চশমা, পরনে ভারী শীতের পোশাক আর হাতে গরম চায়ের কাপ নুসরাত গিয়ে দাঁড়াল ব্যালকনিতে। সোডিয়ামের হলদে আলো আর ঘন কুয়াশার মিতালি বাইরে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। হিমেল হাওয়া বইছে ঠিকই, কিন্তু গরম কাপড়ে নিজেকে মুড়িয়ে নেওয়ায় নুসরাতের খুব একটা শীত লাগছে না।

​চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সে আপনমনে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ রাস্তার ওপাশে একটা অবয়ব দেখে নুসরাত থমকে গেল। ভালো করে নজর দিতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, “নির্জন! ও এখানে কী করে?”

​নিচে ল্যাম্পপোস্টের নিচে পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাড়কাঁপানো শীতে থরথর করে কাঁপছে নির্জন। নুসরাত ব্যালকনি থেকে হাত নেড়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল,
“এখানে কী করছেন ?”
​নির্জন ওপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর ইশারায় নুসরাতকে নিচে আসতে বলল। নুসরাত মাথা নেড়ে সোজা না করে দিল। নিচে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না! কিন্তু নির্জনও বড্ড একগুঁয়ে। সে পাশে থাকা ইটের তৈরি একটা বেঞ্চে বসতে গেল, কিন্তু কুয়াশায় ভিজে থাকা সেই বেঞ্চ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। ছ্যাঁত করে ওঠায় সে আবারও লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।

​ওপর থেকে নির্জনের এই কাণ্ড দেখে নুসরাত হাসি চেপে রাখতে পারল না। নির্জন আবারও কাঁচুমাচু মুখে ইশারায় বোঝাল,
“প্লিজ, একটু নিচে আসুন। খুব জরুরি দরকার।”

নুসরাত শেষমেশ নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। এক অদৃশ্য মায়ার শিকল যেন তাকে ব্যালকনি থেকে নিচের গেটের দিকে টেনে নিয়ে গেল। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে গায়ে বাড়তি একটা চাদর ভালো করে জড়িয়ে নিল সে।
​নুসরাত নিচে নামতেই নির্জনের উজ্জ্বল মুখটা চোখে পড়ল। ছেলেটার হাসিটা বড্ড ছোঁয়াচে। নুসরাতকে দেখেই সে এগিয়ে এল এবং তার সেই চিরচেনা ঢঙে ডেকে উঠল, “চশমাওয়ালি ম্যাডাম! কী অবস্থা আপনার? দুই দিন ধরে যে আপনার কোনো পাত্তা নেই!”

​নুসরাত ভ্রু কুঁচকে শাসনের সুরে বলল,
“আমার কথা বাদ দিন। আগে বলুন, এই হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে এখানে কী করছেন আপনি?”

​নুসরাত লক্ষ্য করল, নির্জনের হাঁটু দুটো শীতে কাঁপছে, কিন্তু সে নুসরাতের সামনে নিজেকে খুব শক্ত দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নির্জন একটু হেসে বলল,
“কী করব বলুন ম্যাডাম? মনটা বড্ড উতাল-পাতাল করছিল আপনাকে দেখার জন্য। সন্ধ্যা থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আপনার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছি।”

​নুসরাত কী বলবে ভেবে পেল না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নির্জন লক্ষ্য করল কুয়াশায় নুসরাতের সাদা ফ্রেমের চশমাটা ঝাপসা হয়ে গেছে। সে হুট করেই নুসরাতের চোখ থেকে চশমাটা ছিনিয়ে নিল। নুসরাত অবাক হয়ে বলল, “আরে! কী করছেন কী?”

​নির্জন কোনো কথা না বলে নিজের শার্টের নিচের অংশ দিয়ে খুব যত্ন করে চশমার কাঁচ দুটো মুছে দিল। আনমনেই বিড়বিড় করে বলল,
“ঠিক এভাবেই সারাজীবন আপনাকে আগলে আর যত্নে রাখতে চাই, চশমাওয়ালি ম্যাডাম।থাকবেন তো!”

​নির্ঝরের এমন সহজ আর মিষ্টি কথায় নুসরাত আর গম্ভীর থাকতে পারল না, ফিক করে হেসে ফেলল। নির্জন তড়িঘড়ি করে বুকে হাত রেখে বলল,
“উফ! এভাবে হাসবেন না ম্যাডাম, সরাসরি বুকে গিয়ে লাগে!”

​নুসরাত হাসি থামিয়ে বলল, “অনেক নাটক হয়েছে, এবার কি আমি যেতে পারি?”

নির্জন বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে সায় জানাল,
“হুম, যান।”
​নুসরাত পেছন ফিরে কয়েক কদম যেতেই হঠাৎ কী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছনে তাকিয়ে দেখল নির্জন তখনো এক জায়গায় স্থির হয়ে ওর চলে যাওয়া দেখছে। নুসরাত আবারও ওর কাছে এগিয়ে গেল। তারপর নিজের গা থেকে বাড়তি চাদরটা খুলে নির্জনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “নিজের খেয়াল রাখুন বাদামওয়ালা। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে তো! তখন আপনার বাদামের ব্যবসাটা চলবে কী করে, শুনি?”

​কথাটা শেষ করেই নুসরাত আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে দৌড়ে হোস্টেলের গেট পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল। এদিকে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে নির্জন চাদরটা বুকে জড়িয়ে খুশিতে ছোট বাচ্চাদের মতো লাফাতে শুরু করল।
★★★
তৃণা নিচেই বিছানা করতে ব্যস্ত, কিন্তু আরিয়ান বিছানায় আধশোয়া হয়ে সবটা দেখছিল। বাইরে কনকনে শীত, আর ঘরের মেঝেও পাথরের মতো ঠান্ডা। আরিয়ান থাকতে না পেরে বলেই ফেলল,
“যেভাবে শীত পড়েছে, নিচে শুলে কিন্তু নির্ঘাত ঠান্ডা লাগিয়ে বসবে।”

​তৃণা নিজের কাজ থামাল না। বিছানার চাদর টান টান করতে করতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“নিচে ছাড়া আর শোয়ার জায়গা কোথায় শুনি?”

​আরিয়ান একটু ইতস্তত করে প্রস্তাব দিল,
“তোমার খুব বেশি আপত্তি না থাকলে বিছানায় শুতে পারো। সমস্যা নেই, মাঝখানে বর্ডার হিসেবে কোলবালিশ থাকবে।”

​তৃণা আরিয়ানের দিকে বাঁকা চোখে তাকাল। তার মুখে দুষ্টুমি ভরা হাসি। সে বিড়বিড় করে বলল,
“মশার কামড়ের কথা আমি এখনো ভুলিনি কিন্তু, রাগী সাহেব!”

​আরিয়ান এবার রীতিমতো বিষম খেল। কেশে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু তম্বি করার চেষ্টা করল,
“সারাটা দিন কিসের মশা মশা করছ। দূর! তোমাকে ভালো কথা বললাম, এখন তুমি যদি না শোনো তবে সেটা তোমার ব্যাপার। আমি চললাম ঘুমাতে।”

​আরিয়ান পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। তৃণা গোঁ ধরে নিচেই শুয়ে রইল। কিন্তু মেঝেটা আজ যেন বরফের চাঁই! পাতলা বিছানা ভেদ করে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা তার শরীরে বিঁধছে। অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও ঘুমের দেখা নেই। তৃণার খুব ইচ্ছে করছে উঠে গিয়ে বিছানায় আরাম করে ঘুমাতে, কিন্তু লজ্জা আর দ্বিধা তাকে আটকে রাখছে। মনে মনে ভাবল, ‘সারাজীবনে কোনো পুরুষের সাথে বিছানা শেয়ার করিনি, আর আজ কিনা তার সাথেই শোব যাকে কদিন পর ডিভোর্স দিয়ে দেব?’
​এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে প্রায় আধা ঘণ্টা কেটে গেল। ওপর থেকে আরিয়ানের গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। তৃণা বুঝল, আরিয়ান এবার ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। আর সহ্য করতে না পেরে তৃণা গুটিগুটি পায়ে উঠে বিছানার এক কোণে গিয়ে সাবধানে শুয়ে পড়ল। আহ্! নরম বিছানার ওম পেতেই শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল। কতদিন পর এমন আরামদায়ক বিছানায় পিঠ ঠেকানো! শান্তির আবেশে তৃণার চোখের পাতাগুলো নিমেষেই বুজে এল।

শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ঘুমের ঘোরেই আরিয়ান পাশ ফিরতে গিয়ে ধপাস করে তার একটা হাত তৃণার পেটের ওপর তুলে দিল। তৃণার অবস্থা তখন
‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’!
কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার দম বন্ধ হয়ে এল। সে কাঠ হয়ে সোজা হয়ে শুয়ে রইল। তারপর অতি সাবধানে আরিয়ানের হাতটা সরিয়ে দিতে দিতে মনে মনে গাল দিল, ‘বাপরে! এগুলো মানুষের হাত নাকি হাতির পা? একেকটার ওজন তো নির্ঘাত দশ কেজি!’

​হাত সরিয়ে দিয়ে তৃণা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে মাত্র, অমনি আরিয়ান এবার তার একটা পা তুলে দিল তৃণার গায়ের ওপর। এবার আর তৃণা সহ্য করতে পারল না। সে চিৎকার করে উঠে বসল,
“উফফ! সমস্যা কী আপনার? মারতে চান নাকি আমাকে?”

​আরিয়ান ভড়কে গিয়ে ধরফড়িয়ে উঠে বসল। চোখ কচলাতে কচলাতে যখন দেখল তৃণা তার বিছানায়, সে আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল,
“ছি ছি! তোমার একটুও লজ্জা করে না? একটা পরপুরুষের সম্মান নষ্ট করার জন্য এভাবে বিছানায় উঠে আসলে?”

​তৃণার চোখ তখন চড়কগাছ! এই লোক বলে কী? সে তেড়ে উঠে বলল,
“একদম ফালতু কথা বলবেন না বলে দিচ্ছি! আমি শুধু একটু শান্তিতে ঘুমাতে এসেছিলাম। আর সম্মান তো আপনি নষ্ট করছেন! বারবার আপনার ওই হাতির মতো হাত-পা আমার ওপর ছুঁড়ে মারছেন কেন?”

​আরিয়ান কাঁচুমাচু মুখে পালটা যুক্তি দিল,
“জি না, আমি এসব অকাজ করি না। প্রথমে তো কত করে বললাম শোয়ার জন্য, তখন তো আসলে না। এখন চোরের মতো কেন আসলে?”

​তৃণা চরম বিরক্তি নিয়ে বিছানা থেকে নেমে যেতে নিলে আরিয়ান হঠাৎ নরম সুরে বলল,
“আচ্ছা সরি, সরি! চলো, মাঝখানে কোলবালিশ দিয়ে দিচ্ছি। এবার আর সমস্যা হবে না।”

​বলেই আরিয়ান তড়িঘড়ি করে মাঝখানে কোলবালিশ বসিয়ে দিল এবং নিজে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। ঘরের বাতি নিভে গেছে, শুধু অন্ধকার আর হিমেল রাত। তৃণা কোলবালিশের ওপাশে শুয়ে থাকা আরিয়ানের চওড়া পিঠের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
​‘এতটা ভালো ব্যবহার করবেন না রাগী সাহেব। আমি যে বড্ড ভালোবাসার কাঙাল। কখন জানি আপনার ওপর মায়া পড়ে যায়, কখন জানি এই রাগী মানুষটাকেই ভালোবেসে ফেলি সেই ভয়েই তো আমি তটস্থ হয়ে থাকি!’

চলবে…

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply