যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_৪
আরযান জোর করে সাঁঝকে গাড়ির ব্যাক সিটে বসিয়ে দরজাটা লক করে দিল। তারপর দ্রুত ড্রাইভিং সিটে গিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট করল। গুলশানে আরযানের নিজস্ব ডুপ্লেক্স বাড়ি আছে। যাকে সাধারণ বাড়ি বললে ভুল হবে। পুরো ঘরটাই কাঁচে ঘেরা। তবে সস্তা কোনো কাঁচ নয়। এমন বিশেষ ধরনের কাঁচ, যার ভেতর থেকে বাইরে সব দেখা যায়, কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই বোঝা যায় না। এই অদ্ভুত বাড়ির নাম আরযান রেখেছে।
“ব্ল্যাক পার্ল।” সাঁঝের কখনো জানা হয়নি এই নামের অর্থ কী। হয়তো কালো মুক্তোর মতোই আরযান ভাইয়ের মনটাও কালো। সেটা সবাইকে বুঝাতেই এমন নাম রাখা। কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই তার।
আবারও সে বিপদে পড়েছে। এই বিপদটাই তার সবচেয়ে উতম সঙ্গী। যাকে সে কখনো চায়নি, অথচ সে কখনো তাকে ছেড়ে যায়নি। গাড়ি গেট পেরোতেই সাঁঝ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “ভাই, সত্যি বলছি! আমি আকাশের নক্ষত্র দেখছিলাম। কাল আমার বিজ্ঞান প্রজেক্ট আছে—অ্যাস্ট্রোলজির ওপর। রিসার্চ করতেই ছাদে উঠেছিলাম!”
আরযান ঠান্ডা গলায় বলল, “ওটা দূরবীন ছিল। নক্ষত্র দেখার দূরবীক্ষণ যন্ত্র নয়।” বলেই সে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। ভয়ে কাঁপা গলায় সাঁঝ আবার বলল,
“এই রাতের বেলায় আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
কোনো উত্তর এলো না। আরযানের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। রাগ চেপে রাখা আগ্নেয়গিরির মতো। সাঁঝের মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে। তার অপরাধটাই বা কী? সে তো এখনো পাশের বাড়ির ছেলেটার নিচের পার্টটা ভালো করে দেখতেই পারেনি! তাই বলে আরযান ভাই এত রাগ করবে কেন ? আর এটা কি তার অফিস থেকে ফেরার সময়? আজ হঠাৎ সে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলো কেন?
ব্ল্যাক পার্লের গেটের পার্কিং প্লেস সরাসরি আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেখানেই আরযান গাড়ি থামাল। ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার আগেই দরজা খুলে সাঁঝকে প্রায় টেনে নামিয়ে আনল সে। মেয়েটা ছটফট করছে। একেবারে সদ্য জন্মানো ছাগলছানার মতো। একে সামলানো তো দূরের কথা, সহ্য করাই দায়। সাঁঝ যেতে অস্বীকার করতেই আরযান আর দেরি করল না। মুহূর্তে তাকে কোলে তুলে নিল, ঢুকে পড়ল তার ব্যক্তিগত লিফটে। যেটা সোজা তার বেডরুমে গিয়ে খোলে। এই লিফটের পাসকোড আরযান ছাড়া আর কেউ জানে না।
দরজা খুলতেই সে সাঁঝকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। কিন্তু সাঁঝ প্রস্তুত ছিল। জানত এমনটাই হবে। তাই কান্নার অভিনয় বাড়িয়ে দিল কয়েক গুণ। তাতে কোনো কাজ হলো না। বরং লোহার মতো শক্ত হাতের এক চড় এসে পড়ল তার গালে। শীতের টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল মুখটা। এবার আর অভিনয় নয় সাঁঝ সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। এমন রাগী আরযান ভাইকে সে কোনোদিন দেখেনি। মনে হচ্ছে আজ বুঝি তাকে সত্যিই শেষ করে দেবে। বুকের ভেতর কলিজা কাঁপছে।
হঠাৎ আরযান নিজের গায়ের ব্লেজার খুলে ফেলল। এসি চালু করে দিল সর্বোচ্চ গতিতে। তারপর ওয়াইন কুলারের দিকে গিয়ে একটা বোতল বের করল।
কর্ক স্ক্রু ঘুরিয়ে ঢাকনা খুলে ধীরে এসে ডিভানে বসলো গা এলিয়ে। সাঁঝ উঠে দাঁড়াতে যেতেই আরযানের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল, “উঠতে বলেছি?”
সাঁঝ ভয় পেয়ে আবার মেঝেতেই বসে পড়ল। অসহায় চোখে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,“উঠলাম কই? পা ব্যথা করছিল তাই একটু নড়ে-চড়ে বসলাম আর কী…”
আরযানের কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু ধারালো। “নড়ার অনুমতিও তো দেইনি।” সাঁঝ মুখ বাঁকাল। আরযান ভাইকে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত লাগছে। মনে হচ্ছে না আজ আর মারবে। সাহস করে বলল, “ভাইয়া… আমার গলা শুকিয়ে গেছে। একটু লাল কোক দেন না।”
“এসব তুই খেতে পারবি না।”
“আমি সব খেতে পারি। কতবার খেয়েছি।”
“কি?”
“মানে… কোক।” আরযানের চোখ হঠাৎ সাঁঝের হাতের ঘড়ির দিকে গেল। সে মদের গ্লাসটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল, “কতখানি সহ্য করতে পারবি?”
“কি?”
“উত্তাপ।”
একটু থেমে ঠান্ডা স্বরে যোগ করল, “মীর বংশের মান-ইজ্জত শেষ করার ব্রত নিয়েছিস নাকি?”
সাঁঝ গলা শক্ত করে বলল, “তাহলে একটা বিয়ে দেন আমাকে।”
“আমি বিয়ে করেছি?”
“তো করেন।”
আরযান ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলাল। “তোর অনুমতি নিয়ে আমাকে বিয়ে করতে হবে?”
বলেই সে এগিয়ে এলো। মুহূর্তে সাঁঝের বাঁ হাতটা মুঠোয় পুরে শক্ত করে চেপে ধরল। তীব্র ব্যথায় সাঁঝ কুঁকড়ে উঠল। “ভাই… আরেকবার ব্যথা দিলে বাড়ির সবার কাছে বিচার দেব।” আরযানের চোখে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কণ্ঠ নিস্পৃহ, “যা মন চায় কর।”
আরযানের শক্ত হাতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে বসে গেছে সাঁঝের কবজিতে। ঘড়িটা প্রায় ঢেবে গেছে চামড়ার ভেতরে। ব্যথাটা তীক্ষ্ণ, জ্বালাময়। কিন্তু শাস্তির বেলায় আরযান কখনোই সহনশীল নয়। সাঁঝের চোখের কোণে জল জমতেই আরযান হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে তার হাত ছেড়ে দিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। কয়েক সেকেন্ড নীরবে বাইরের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। যেন নিজেকে সামলাচ্ছে। তারপর সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে দিল। পরক্ষণেই সে সাঁঝের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে ঝুঁকে বসল। একবার তাকাল।
পরের মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত করে গালে আরেকটা চড় বসিয়ে দিল। “বলেছিলাম না এই বাড়িতে প্রেম নিষিদ্ধ? “তাহলে বারবার নিষিদ্ধের দেয়াল টপকে যাওয়ার দুঃসাহস কোথা থেকে আসে, সাঁঝ? খুব সাহস হয়েছে? বাহ রে! আমিও তোর সাহসের শেষটা দেখতে চাই।”
সে সাঁঝের থুতনি চেপে ধরল। “মন তো চাইছে তোকে জ্যান্ত কবর দিই। কিন্তু মারব না। একেবারে মারব না।”
ঠান্ডা হাসি খেলল ঠোঁটে। “আমি ধীরে ধীরে শাস্তি দিতে ভালোবাসি। তুই মরবিও না আর সহ্যও করতে পারবি না। তুই তোর ভাগ্য নিজে লিখছিস।” হঠাৎ খপ করে আবার তার বাঁ হাতটা চেপে ধরল আরযান। “ওই ছেলে এই হাতটাই ধরেছিল, তাই না?” চোখ সংকীর্ণ হয়ে এল।
“তুই কার সম্পত্তি জানিস? তোর স্বামীর আমানত তুই। অন্য কেউ ছোঁয়া তো দূরে থাক—তোর দিকে তাকানোর অধিকারও নেই কারো।” সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“অন্যের আমানত নষ্ট করেছিস তুই। তোর স্বামীকে বিয়ের পর আমরা কী জবাব দিতাম বল? সব অপবিত্র করে দিলি!” একটু থেমে ভয়ংকর শান্ত স্বরে যোগ করল,“এবার কে বাঁচাবে তোকে, সাঁঝ? চরম খেসারত দিতে হবে। বুঝলি?” বলেই সে লাইটার বের করল।
আগে সাঁঝের কবজি থেকে ঘড়িটা খুলে নিল। একবার তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ওটা পরে দেখব। আগে তো এই ঢেঁড়সটাকে দেখি।” লাইটারের আগুন জ্বলে উঠতেই সাঁঝ ভেতরে ভেতরে ছটফট করে উঠল। কিন্তু আরযানের শক্ত হাতে পুরো শরীর বন্দি। এক বিন্দুও নড়ার সুযোগ নেই। সে বুঝে গেছে তার সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে। ভাঙা গলায় আর্তনাদ বেরিয়ে এলো,
“ভাই… আপনার পা এগিয়ে দেন। পায়ে ধরে ক্ষমা চাইব। তাও যদি ছাড়েন না…” হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
“এইবার পরীক্ষাতেও পাশ করে দেখাব। দয়া করে ছেড়ে দেন… দয়া করে…” তাতে কোনো কাজ হলো না। বরং আরযানের রাগ আরও বেড়ে গেল—মেজাজ পুরোপুরি ছিটকে পড়ল। সে লাইটার জ্বালিয়ে সাঁঝকে শক্ত করে চেপে ধরল, আর নির্দয়ভাবে তার হাত পুড়িয়ে দিল। একফোঁটাও মায়া নয়। আগুনে চামড়া পুড়তে পুড়তে সে উন্মাদের মতো বলতে লাগল, “যন্ত্রণা হচ্ছে?
এর চেয়েও তীব্র যন্ত্রণা আমাকে দিয়েছিস তুই। আমি তো শুধু তোর হাত পুড়িয়েছি আর তুই আমার বুক পুড়িয়েছিস! পোড়া হাত নিয়ে তুই বেঁচে থাকতে পারবি। কিন্তু আমাকে তো তুই মেরে ফেলেছিস, সাঁঝ। আমার কথা অমান্য করে আমায় খুন করেছিস। বুকটা পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিস আমার!”
কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। “তোর ক্ষত সবাইকে দেখাতে পারবি। কিন্তু আমারটা? আমারটা আমি কেমন করে দেখাব বল?” সাঁঝ প্রায় মরার মতো হয়ে গেছে। অসহ্য ব্যথায় সে চিৎকার করছে, ছটফট করছে। মুক্তি পাওয়ার জন্য নড়াচড়া করতেই যেন যন্ত্রণা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। হঠাৎ আরযান তাকে ছেড়ে দিল।
এক মুহূর্তের জন্য সাঁঝ ভেবেছিল এটাই বুঝি মুক্তি।
কিন্তু না।আরযান ড্রয়ার খুলে দুটো টিয়ার গ্যাস বের করল। সাঁঝ চিনতে পারেনি ওগুলো কী। পরক্ষণেই ঘরটা ধোঁয়ায় ভরে গেল। হাতের পোড়া যন্ত্রণার ওপর এখন যোগ হলো শ্বাসরোধ করা আগুনে ধোঁয়া। বুক ধকধক করছে, শ্বাস নিতে পারছে না। চোখ-মুখ জ্বলছে, পানি ঝরছে অবিরাম। এখানে থাকলে সে মরেই যাবে।
আরযান তাকে আগেই ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু ধোঁয়ার ভেতরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হেঁচড়ে হেঁচড়ে সে দরজার দিকে এগোলো। হঠাৎ কারো সঙ্গে ধাক্কা লাগল।
চোখ দিয়ে পানি ঝরতে ঝরতে বুঝতে পারল। সামনেই আরযান ভাই। ভেঙে পড়ে মিনতি করল, “মাফ করুন ভাই… আর কোনোদিন ভুল হবে না। খুব কষ্ট হচ্ছে… শ্বাস নিতে পারছি না। আমাকে এখান থেকে বের করুন…” সে আরযানের পা ধরে ফেলল। বারবার কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করল। কিন্তু সামনে থেকে কোনো উত্তর এলো না। পরক্ষণেই আরযান তাকে নির্মমভাবে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। নিজে বাইরে বেরিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে লক করে দিল।
মেঝের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল, “এটা কেবল শুরু সাঁঝ, আমি আমার ক্ষেত্রে তোকে শাস্তি দেওয়ায় কোনো কম্প্রোমাইজ করব না। কারণ আমি ভাগাভাগি অপছন্দ করি, আর তুই অপছন্দকে পছন্দ করিস।”
চলবে?
(3k রিয়েক্ট না হলে আবার ২০৩০ সালে গল্প দিব।)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
প্রেমতৃষা ৪২ ( শেষ অর্ধেক)
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৩
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৩+৩৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১১+১২
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৬+৭