যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_১৩
রাত ঠিক ৮টা। সাঁঝের রুমের জানালা দিয়ে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো ঢুকছে। হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো। “এই খোল, বাল! এত কল দিয়েছি, ফোন ধরিসনি কেন?” বাইরে থেকে ঝোনাকির চেনা গলা। দরজা খুলতেই একসাথে ঢুকে পড়ল ঝোনাকি, ডালিয়া আর আরও দুইজন। তাদের মধ্যে একজন রোশানী, অন্যজন তরী। সাঁঝ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে, “ওহহ! পুরো বাহিনী এসেছিস? কী রে, আমাকে ছাড়া জমে না?”
ডালিয়া চারপাশে তাকালো। তারপর বলল, “আগে বল তোর ওই ডেঞ্জারাস আরযান ভাই কই? ওটাকে দেখলেই ভয় লাগে।” পাশ থেকে ঝোনাকি বলল, “আরে ওমন রাগী পুরুষই তো হেব্বি কড়া লাগে আমার। আর তোর ভাইগুলো এক একটা কি সলিট দেখতে রে সাঁঝ। এক বাড়ির সাত ছেলেই এত হ্যান্ডসাম কেমন করে হয়? আল্লাহ একটারে তো হাবলা বানাতে পারত? এই বোন, তুই একটার সাথে সেটিং করিয়ে দে না।”
“আর খেয়ে দেয়ে আমার বুঝি কাজ নেই? নিজের সেটিং নিজে করে নাও তো বাপু। দাঁড়া তোদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে বলি।” সাঁঝ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে ডাকল, “এই শিউলি! এইদিকে আসো তো!”
কাজের মেয়ে দৌড়ে এলো,“জি আপা?”
“এই রুমে নাস্তা পাঠিয়ে দাও। আর কেউ যেন ঢুকতে না পারে, বুঝেছ?”
“জি আপা।” মেয়েটা চলে যেতেই সাঁঝ ধীরে ধীরে গিয়ে খাটের এক কোণায় বসে পড়ল। ওদিকে ঝোনাকি আর বাকিরা একসাথে চেঁচিয়ে উঠল, “কিরে বাল! তোর বাসায় এসেছি জমিয়ে পার্টি করব বলে, আর তুই ধ্যানে বসেছিস? আজকে কিন্তু আমরা এখানেই থাকব। বাসায় সবাই ম্যানেজ করে এসেছি।”
“আর কিছু পেলি না। এই খাটে তো আমারই জায়গা হয়না।”
“কিরে কি বলিস? এই খাটে তো আমার পুরো খানদান একসাথে শুতে পারবে।”
হঠাৎ সাঁঝ কি একটা ভেবে ঝোনাকির দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা বুদ্ধি।”
সবাই একসাথে বলল, “কিরে?”
সাঁঝ হেসে বলল, “এইটাই সুযোগ… আরযান ভাই যদি প্রেমে পড়ে, তাহলে বাড়ির এই কড়া কড়া নিয়মগুলা একটু হলেও ঢিলে হবে। ওই লোকটা যতদিন সিঙ্গেল, ততদিন কারো শান্তি নেই। আগে ওটাকে আমার লাইনে আনতে হবে…” সাঁঝ চোখ তুলে ধীরে ধীরে ঝোনাকির দিকে তাকাল। একটু মেপে, একটু বিচার করে বলল, “মেয়ে হিসেবে ঝোনাকি… উফ! আমার বেশি পছন্দ না। কিন্তু কাজ চালানো যাবে…” সে হঠাৎ উঠে বসল,
“এই ঝোনাকি।”
“হুম?”
“তুই আরযান ভাইয়ের বউ হবি?” এক মুহূর্তে পুরো রুম চুপ হয়ে গেল। তারপর সবাই একসাথে বলে উঠল, “কিহ???”
ঝোনাকি তো হাঁ করে তাকিয়ে আছে, “তুই সিরিয়াস নাকি মজা করছিস?”
সাঁঝ একদম ঠান্ডা গলায় বলল, “আগে প্রেমিকা হ। বউ হওয়ার কথা পরে চিন্তা করবি।”
ডালিয়া হেসে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “এই মেয়ে পাগল হয়েছে!”
সাঁঝ এবার একটু এগিয়ে এসে ঝোনাকির সামনে বসল, “দেখ, আমি তোকে ফুল সাপোর্ট দিব। ভাইকে পটাতে যা যা লাগে। সব শিখাব, সব করাব। কিন্তু প্লিজ… ওইটাকে প্রেমে ফেল।” ঝোনাকি অবাক, কিন্তু আগ্রহী। “মানে… তুই নিজে তোর ভাইয়ের সেটিং করাচ্ছিস?”
সাঁঝ বিরক্ত হয়ে বলল, “এইটা সেটিং না, এইটা আমার মুক্তির আন্দোলন!” সবাই হেসে ওঠে।
সাঁঝ আবার বলে, “উনি যতদিন প্রেম না করে, বিয়া না করে ততদিন এই বাড়িতে কারো শান্তি নেই। সবকিছুতে কন্ট্রোল, কন্ট্রোল আর কন্ট্রোল! আমি আর পারছি না!” ঝোনাকি ঠোঁট কামড়ে হাসল, “আচ্ছা… যদি আমি সিরিয়াসলি ট্রাই করি?”
সাঁঝ সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে দিলো, “ডিল। কর যা মন চায়।”
ঝোনাকি তার হাত ধরল, “ডিল!”
ডালিয়া পাশ থেকে বলল, “এইটা কিন্তু ইতিহাস হতে যাচ্ছে!”
সাঁঝ হেসে বলল, ইতিহাস না রে… এইটা বিপ্লব!”
রুম আবার হাসিতে ফেটে পড়ে।
রুমের ভেতর আবার জমে উঠেছে আড্ডা। সবাই বিছানা, মেঝে যেখানে জায়গা পায় সেখানেই বসে পড়েছে। ডালিয়া হঠাৎ সাঁঝের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “এই, আগে একটা কথা বল। এত কল দিয়েছি, তোর ফোন বন্ধ কেন ছিল?”
ঝোনাকি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল, “হ্যাঁ রে! আমরা তো চিন্তায় পড়ে গেছিলাম। ভাবছিলাম, তোকে কিডন্যাপ-টিডন্যাপ করে নিল নাকি কেউ!”
সাঁঝ ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল, “কিডন্যাপ না, তার চেয়েও খারাপ।”
সবাই একসাথে বলল, “কি??”
সাঁঝ এবার সোজা হয়ে বসল, চোখ ঘুরিয়ে বলল, “আমার ফোন… ওই আরযান ভাই ভেঙে ফেলছেন।”
“কি-ইইই???” সবাই প্রায় চিৎকার করে ওঠে।
ডালিয়া হতবাক, “আইফোনটা? যেটা তোর আব্বু কিনে দিয়েছিল?”
সাঁঝ মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, ওইটাই। একদম গুড়া করে ফেলেছে। আমার মাথাও তখন গরম হয়েছিল, কিন্তু উনার সামনে বেশি কিছু বলা যায়?”
ঝোনাকি দাঁত চেপে, “উফ! এই লোকটা আসলেই ডেঞ্জারাস।”
সাঁঝ তাচ্ছিল্যের হাসি দিল, “ডেঞ্জারাস না, পুরো কন্ট্রোল ফ্রিক! আমার লাইফটা হেল করে রেখেছে।”
একটু চুপচাপ হয়ে যায় সবাই। তারপর হঠাৎ সাঁঝ ভ্রু তুলে তাকাল, “আচ্ছা, হুট করে তোরা আমার বাসায় আসার প্ল্যান করলি কেন?”
ঝোনাকি আর ডালিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ঝোনাকি ঢং করে বলল, “কারণ… আজকের রাতটা স্পেশাল!”
ডালিয়া ব্যাগটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল, “এখন আসল জিনিসটা দেখ।” সে ধীরে ধীরে ব্যাগের চেইন খুলল। সবাই আগ্রহ নিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ল।
এক এক করে বের হতে লাগল কিছু ম্যাগাজিন… তারপর পুরোনো সিডি ক্যাসেট। সাঁঝ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে, “এইগুলা কি রে?”
ঝোনাকি ঠোঁট কামড়ে হাসি দিল, “একটু… অ্যাডাল্ট টাইপ জিনিস। শেখার জন্য এনেছি! আরে শালী ভাব মারাও? সকালেই না বললাম?”
সাঁঝ দুই সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ হেসে উঠল, “ওহ মনে পড়েছে। তোরা একেকটা নির্লজ্জ!”
ডালিয়া হেসে বলল, “লাইফে সব কিছু শেখা দরকার! দয়ালবাবা ঝোনাকি কিন্তু আমাদের টিচার আজকে।”
ঝোনাকি বুক ফুলিয়ে বলল, “হু, আমি তো এক্সপার্ট! কিন্তু এইসব লুকিয়ে করতে হয়, বুঝেছিস? বাইরে কেউ টের পেলে আমরা শেষ!”
ডালিয়া দরজার দিকে তাকিয়ে, “দরজা লক করা আছে। কেউ কিছু বুঝবে না।”
সাঁঝ একটু হেসে মাথা নাড়ল। তার চোখে আবার সেই দুষ্টু ঝিলিক ফিরে এসেছে। “আচ্ছা… দেখা যাক, তোদের এই ‘স্পেশাল নাইট’ কতটা স্পেশাল হয়! আরযান ভাইকে মেজো আব্বু ইমারজেন্সি একটা মিটিং এ অফিসে নিয়ে গেছে। মিটিং থাকলে আরযান ভাই রাতে আর বাসায় ফিরে না। নিজের আরেকটা যে বাড়ি আছে? রাতে ওটায় থাকে। অফিসের সাথেই যে, তাই।”
ডালিয়া বলে উঠল, “তাহলে তো আজকে জব্বর মজা হবে।” ডালিয়ার কথায় রুমটা আবার হইচইয়ে ভরে উঠল৷ ঝোনাকি দ্রুত সিডিটা প্লেয়ারে সেট করার ভান করে বলল, “চুপ! আগে শুরু হোক, তারপর মজা বুঝবি।”
রুমের লাইট একটু ডিম করে দেওয়া হলো। দরজা ভালো করে চেক করে লক করা। সবাই গোল হয়ে বসে পড়ল। কারও হাতে বালিশ, কেউ আবার আগ্রহে সামনে ঝুঁকে। কিছুক্ষণ পরই ভিডিও চালু হলো।
প্রথমে সবাই হাসাহাসি শুরু করে দিলো। “এইটা আবার কী রে!”
“উফ, এত ঢং করিস ক্যান!”
“আরে এগুলা মানুষ দেখে নাকি?” কিন্তু একটু পরেই অস্বস্তি ঢুকে গেল পরিবেশে। ডালিয়া মুখ কুঁচকে,
“ধুর! এত ফেক লাগছে কেন?”
“তোর জামাই আর তোরটা ভিডিও করে দেখিস। আর ফেক লাগবে না।”
“চুপ।”
ঝোনাকি একটু বিরক্ত হলো, “এই! সিরিয়াসলি দেখ না। তোরা কিছুই বুঝিস না! ইমরান হাসমির এই মুভিটার মতো রোমান্টিক মুভিই দুনিয়ায় নেই। জলদি ফোকাস দে। বেশি কথা বললে মনোযোগ নষ্ট হয়।”
সাঁঝ বালিশে হেলান দিয়ে হেসে বলল, “এইগুলা দেখে শেখার কিছু নাই রে। রিয়েল লাইফে সব আলাদা।”
“কেন তোর অভিজ্ঞতা আছে নাকি?”
সাঁঝের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরই ভিডিও বন্ধ। ডালিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “মুডটাই অফ হয়ে গেল।”
ঝোনাকি হঠাৎ বলে উঠল, “একটা কাজ কর। সাঁঝ সিগারেট ম্যানেজ করতে পারিস?”
সবাই চমকে তাকায়, “এই ঘরে?”
ঝোনাকি ফিসফিস করে বলল, “আরে জানালা খুলে দিব। একটু ট্রাই করলে মজা আসবে। আর কেউ বুঝবেও না। আমার না অনেক দিনের ইচ্ছা।”
ডালিয়া দ্রুত বলে, “কিন্তু বাইরে কেউ টের পেলে শেষ!”
সাঁঝ একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। “আমি দেখি।”
সবাই একসাথে বলল, “তুই?”
সাঁঝ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “এই বাড়িতে কে কোথায় কী রাখে। সব আমার জানা। বাড়ির আসল মালিক কে বুঝতে হবে না?”
সে দরজার দিকে এগোয়। বের হওয়ার আগে বলল, “তোরা চুপচাপ থাকিস। কেউ যদি আসে, বলবি গ্রুপ স্টাডি চলছে।”
ঝোনাকি হেসে, “যেন সত্যিই পড়ছি!” সাঁঝ বাইরে বের হয়ে দরজা আস্তে করে বন্ধ করে দেয়।
করিডোরে হালকা আলো। চারপাশ নিস্তব্ধ। প্রথমে সে আব্রাজ ভাইয়ের রুমে যায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ড্রয়ার, টেবিল। সব খোঁজে। “ধুর! কিছুই নাই…” তারপর একে একে অন্য ভাইদের রুম। কোথাও কিছু নেই। শেষে থেমে যায় আরভিদ ভাইয়ের দরজার সামনে। ভেতর থেকে হালকা কথা বলার শব্দ। সাঁঝ মুখ বাঁকায়, “উফ! এখন ঢুকলেই ধরা খাব…”
সে আর এগোয় না। করিডোরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ যায় একটা দরজার দিকে। আরযান ভাইয়ের রুম। একটু থামে সে।
মনে মনে বলে, “এইটাই শেষ অপশন… আর আজকে তো বাসায় নেই…” ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা ঠেলে খুলে ফেলে। রুমে ঢুকতেই অন্যরকম একটা পরিবেশ। আরযান ভাই নোংরা আর অগোছালো কিছুই পছন্দ করে না। তার ঘরের কি কোথায় রাখা তার মাথায় আছে। একটু সেই জিনিস জায়গা পরিবর্তন হলে সে কাজের মেয়েকে কাজ থেকেই বের করে দেয়। তার ছিঁড়া লোক। সাঁঝ চারপাশে তাকায়, যেন কেউ হঠাৎ এসে পড়বে। “এই লোকটা এমন করে সব রাখে…”
সে টেবিলের ড্রয়ার খুলে, আলমারি দেখে। হাত একটু কাঁপছে, কিন্তু মাথা ভর্তি শয়তানি বুদ্ধি। “দেখি তো… ডেঞ্জারাস ভাইয়ের গোপন স্টক কই লুকানো…”
সাঁঝ ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ড্রয়ার খুলতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল।
“এইটা কী?” টেবিলের ওপর রাখা একটা ফোন। সে একটা তুলে নিয়ে চোখ কুঁচকে তাকাল, “ওহহ… মানে একটা রেখে গেছে?” তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে গেল।
“ভালোই তো! নিজে নেই, ফোনটা রেখে গেছেন…
মাথায় হঠাৎই শয়তানি বুদ্ধি ঢুকে গেল। সে দ্রুত ফোনটা অন করল। লক খোলা না। তবে ক্যামেরায় তো ঢুকাই যায়। সাঁঝ সরাসরি ক্যামেরা অন করল। ফ্রন্ট ক্যামেরায় নিজের মুখ ভেসে উঠতেই সে একটু থামল… তারপর ধীরে ধীরে চুলগুলো ঠিক করল, শার্টটা টানটান করল। সে একটু কাছে ঝুঁকে ক্যামেরার দিকে তাকাল, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “হ্যালো গাইচ এটা আমার আরযান ভাইয়ের ফোন, ভাই জানলে রাগ করবে তাই আমি ফোনটা রেখে দিবো না কারণ আমি চাই ভাই আরো রাগ করুক। পরে ফেটে মরুক।” নিজেই নিজের কথায় হেসে ফেলল। তারপর আবার ভঙ্গি পাল্টে একবার গম্ভীর মুখ, একবার চোখ টিপ, একবার চুল কানে গুঁজে পোজ দিলো। “উফ! আমাকে তো হেব্বি লাগছে!”
সে হালকা ঘুরে দাঁড়িয়ে আয়নার মতো ক্যামেরায় নিজেকে দেখে বলল, “এই মেয়ে… তুই একদম পাগল!”
হঠাৎ আবার মাথায় কিছু এলো। সে একটু নিচু গলায় বলল, “এই ভিডিওটা যদি সেভ করে রাখি… আরযান ভাই দেখলে কী রিঅ্যাক্ট দিবে?”
নিজেই উত্তর দিল, “আগে রাগে ফায়ার হবে… তারপর?”
সে চোখ ছোট করে, রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “দেখা যাবে…”
হঠাৎ করিডোরে পায়ের শব্দ। সাঁঝ চমকে উঠল।
“ধুর! কেউ আসছে নাকি?” সে দ্রুত ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দেয়। চারপাশে একবার তাকিয়ে নেয় সব ঠিক আছে কিনা। তারপর সিগারেটের প্যাকেটটা নিজের প্যান্টে ঢুকিয়ে আস্তে করে দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিলো। বাইরে সব শান্ত। সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
“উফ! ধরা খাইলে তো শেষ ছিল…” তারপর দ্রুত পা চালিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। ভেতরে ঢুকতেই ঝোনাকি উঠে আসে, “কিরে? পেলি?”
সাঁঝ দরজা বন্ধ করে হেসে বলে, “পাবো না মানে? আমি হলাম সাঁঝ। এসব কোনো ব্যাপার হলো?
সাঁঝ আসতেই বাকিরা ইমরান হাশমির গান ছাড়ল। সাউন্ড একেবারে কমিয়ে দিলো যাতে বাইরে না যায়।
“এই সাঁঝ, তোর বিয়েতে কিন্তু বাসর রাতে এই গানটাই বাজাবো…” রোশনি বলে উঠল হেসে।
পাশ থেকে তরী ফিসফিস করল, “না রে, ‘’ আদাত দিবো যাতে জামাই সাহেব বুঝে যায় সামনে কি অপেক্ষা করছে!”
সবাই চাপা হাসি হাসল। সাঁঝ চোখ কুঁচকে তাকায়,
“তোদের একেকটা মাথায় শুধু এইসব পচা চিন্তা কেন আসে? আমার মতো নেককার বান্দা হ।”
“এই বয়সে এসব না ভাবলে কবে ভাববো বল?”
“বিয়ে, বাসর, রোমান্স এইটাই তো লাইফ!”
সাঁঝ এবার বালিশ ছুড়ে মারে, “চুপ কর! কেউ শুনে ফেললে?”
ঝোনাকি হেসে বলল, “এই সাঁঝ এখন ঢং করছে না? দেখব তারই সব কিছু আগে হয়ে গেছে। জামাই বাসর রাতে ঢুকার পর সে ঢং করে বলবে দূরে থাকেন তারপর পাঁচ মিনিট পর, ‘এত দূরে কেন?’ সবাই সেই কথায় হেসে একাকার। সাঁঝের ঘর পুরো এলোমেলো। খেয়েছে কম সবাই নোংরা করেছে বেশি। যদিও সাঁঝের ঘর ঠিক এমনিতেও থাকে না। ঝোনাকি প্রথম সিগারেটটা হাতে নেয়।
“দেখিস… আজ আমি ট্রাই করব!”
ডালিয়ার সিগারেট পছন্দ না। সে বলল, “এই পাগলি, কাশি উঠে মরবি কিন্তু!”
ঝোনাকি পাত্তা দেয় না… আগুন ধরায়… এক টান দেয়। তারপরই “খকখকখক…!” করে কেশে উঠে।
ডালিয়া দূরে সরে বসে, “আমি এসব করব না। তোরা যা খুশি কর।” সাঁঝ তখন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
“আমি খাব না… কিন্তু দে তো একটা।”
সবাই একসাথে বলল, “ওহহহ! সাঁঝও লাইনে নেমেছে দেখি! খাব না, আবার একটা দে?”
“এই চুপ! আমি শুধু পোজ দিবো… বুঝছিস?” সাঁঝ সিগারেটটা আঙুলে ধরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়,
চোখ একটু ছোট করে, মাথা কাত করে, “এইভাবে ছবি তুলবি… যেন মনে হয় আমি রেগুলার খাই।”
“উফফ, কি অ্যাটিটিউড! একদম সিনেমার নায়িকা!”
সবাই ফোন রেডি করে… ঠিক তখনই ঝোনাকি হেসে বলে “একটু ওয়েট… ফিলিং আনতে হবে!” সে নিয়ে তাড়াতাড়ি একটা গান প্লে করে স্ক্রিনে হঠাৎ একটা রোমান্টিক সিন… ভেসে ওঠে। নায়ক-নায়িকার ক্লোজ… সবাই হা করে তাকিয়ে, “ওইইইই!” “এই সিনটা দেখ!”
তরী ফিসফিস করল “এইটাই তো আসল বাসর ভাইব…”
রোশনী হেসে বলল, “দেখ, চোখ কেমন করে তাকায়… একদম ডেঞ্জার! এই কারনেই আশিক বানায়া গানটা আমার এক পছন্দের।
সাঁঝ সিগারেটটা ঠোঁটের কাছে তোলে… চোখে সেই পোজ…“এই শটটা নিস… তাড়াতাড়ি!” ঠিক সেই মুহূর্তে
দরজা হঠাৎ খুলে যায়। সাঁঝের খেয়াল নেই। কিন্তু রোশনী আর ডালিয়া দরজার দিকে তাকিয়ে হা হয়ে আছে। ডালিয়া সাঁঝকে বলল, “এইরে সাঁঝ রাখ এসব।”
“তুই মারা খা।” সাঁঝ ফিরেও তাকালো না। না ফিরেই বলল, “সিগারেট হাতে আমাকে কেমন লাগছে?”
“পুরোই সস্তা নেশাখোর।”
“ওই কেডারে।” বলেই সাঁঝ পেছনে ফিরে দেখতে পেল দরজার সামনে আরযান ভাই দাঁড়িয়ে আছে। পড়নে ফর্মাল ড্রেস। ঝোনাকি সিগারেট ফেলে দেয়। ডালিয়া থ হয়ে দাঁড়িয়ে। আর বাকিরা ছিটকে দূরে! সাঁঝের চোখ বড় বড়… সে তাড়াতাড়ি সিগারেটটা পেছনে লুকাতে যায়। ঠিক তখনই চুমুর সিনটা ফুল স্ক্রিনে চলে আসে…
“এই এই বন্ধ কর!” ডালিয়া তাড়াহুড়ো করে রিমোটের বাটন চাপে। কিন্তু বন্ধ করার বদলে পুরা ভলিউম বেড়ে যায়! আরযান ভ্রু তুলে… ধীরে ধীরে চারপাশে তাকায়… তার চোখ এসে থামে সাঁঝের উপর যে এখনো পেছনে হাত লুকিয়ে দাঁড়িয়ে… “হাতে কি আছে?” গভীর গলায় প্রশ্ন।
সাঁঝ তোতলাতে থাকে, “ক-কিছু না…” তার পেছন থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে। আরযান ধীরে ধীরে এক পা এগোয়… “কিছু না…?” বাকিরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। এখন কি হবে…! আর শান্ত গলায় বলে, “আমি কাউন্ট শুরু করার আগেই যেন রুম খালি হয়ে যায়।” সবাই ভয়ে জলদি বের হয়। সাঁঝও বের হতে নেয় কিন্তু আরযান তাকে বলে, “তোকে বলেছি কী?”
“ও আমায় বলেন নি? আচ্ছা…..” মনে মনে একটাই প্রশ্ন। একদিনে একটা মেয়ে তিনবার কেমন করে মারা খেতে পারে? সে ভয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আরযান টিভির দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি ফেলে সাঁঝের দিকে। তারপর জলদি রুমের দরজা লাগিয়ে সাঁঝের দিকে এগিয়ে এসে বলে, ” এবার তুই বলতো, তুই কোন থেরাপি নিতে পারবি? আজকে থেরাপি দিবো আমি, তবে তোর পছন্দ মতো। শুন ব্যথা পেলেও চিল্লাবি না। টিভির সাউন্ড যেমন লো করে রেখেছিলি যাতে কেউ জানতে না পারে ঘরে কি হচ্ছে, তেমনই তোর স্বরও কমিয়ে রাখবি। যাতে আজকে রাতের থেরাপির কথা বাইরে না যায়।”
চলবে?
( কালকে চিত্রাঙ্গনা আসবে ৮:৩০ এ রাত।)
Share On:
TAGS: ইসরাত তন্বী, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৬
-
পরগাছা পর্ব ৪
-
পরগাছা পর্ব ২৫
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪
-
পরগাছা পর্ব ২৩
-
পরগাছা পর্ব ২০
-
পরগাছা পর্ব ২২
-
পরগাছা পর্ব ১
-
পরগাছা পর্ব ১৮
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১০