Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_০৩

শেষরাতের হিমেল হাওয়ায় নিস্তব্ধতা ভেঙে উঠোনের জিপ গাড়ির কর্কশ হর্ন শোনা গেল। পুব আকাশে তখনও আলোর রেখা ফোটেনি, কালচে মেঘের আড়ালে ভোরের আলো লুকোচুরি খেলছে। এইমাত্র কাজীকে বিদায় দিতে গেট অব্ধি গেছে সারহান। ড্রয়িংরুমের সোফায় তখনও শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে ওয়াসিফ। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সামনে সোফায় জড়সড় হয়ে বসে থাকা ওই রমনীর ওপর—মুমতাহিনা ধারা। মাত্র দশ মিনিট আগে যাকে সে নিজের নামে কবুল বলে নিয়েছে।

ধারার ভেতরটা এই মুহূর্তে অস্থিরতায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। এই দমবন্ধ করা নীরবতা আর ওয়াসিফের তপ্ত দৃষ্টির সামনে বসে থাকাটা ওর কাছে নরকবাসের মতো মনে হচ্ছে। না পারছে মাথা তুলে তাকাতে, না পারছে এখান থেকে ছুটেপালিয়ে যেতে। গায়ের সুতি থ্রিপিচের ওড়নার এক কোণা আঙুলে পেঁচিয়ে ওভাবেই কাঠের পুতুলের মতো বসে রইলো সে।

বাইরের বড় রান্নাঘরে তখন ব্যস্ততা। শাহেনূর আর সামিরা বেগম তড়িঘড়ি করে নাস্তা বানাচ্ছেন। লুইপাও হাত লাগিয়েছে। একটু পরেই ওয়াসিফ রওনা হবে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের আগে এ যেন এক বিষাদময় তাড়াহুড়ো।

সারহান ঘরে ঢুকেই গম্ভীর স্বরে জানালো, “ভাই, গাড়ি এসে গেছে।”

ওয়াসিফের চোখজোড়া তখনও ধারার দিক থেকে সরেনি। সে নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল, “টের পেয়েছি।”

সারহান এসে ওয়াসিফের পাশের সোফায় বসলো। ধারা অস্বস্তিতে একটু মাথা তুলতেই সারহান অমায়িক হেসে আন্তরিকতার সাথে বলে উঠলো, “আসসালামু আলাইকুম, ভাবি।”

ধারার গলায় যেন স্বর ফুটছিল না। পাঁচ সেকেন্ডের এক দীর্ঘ বিরতি নিয়ে মৃদু স্বরে জবাব দিল, “ওয়ালাইকুম আসসালাম।”

এরপরই সারহান আর ওয়াসিফ তাদের অফিশিয়াল বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করে দিল। ঠিক এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল ধারা। দুজনের কথার ফাঁকে সে হুট করে সোফা ছেড়ে উঠে প্রায় দৌড়ে পালাবার ভঙ্গিতে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। সারহান বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও ওয়াসিফের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে মাঝপথেই সারহানকে থামিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

“গল্প করার পর্যাপ্ত সময় নেই এখন সারহান। সকালের নাস্তা এখান থেকে করে যাবি, আমি রেডি হয়ে আসছি।”

যাওয়ার আগে দরাজ গলায় লুইপাকে ডেকে দিয়ে গেল, “সারহানকে চা দিয়ে যা।”

ওয়াসিফ যখন ধারার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো, ধারা তখন বিছানায় বসে ছিলো। দরজায় ছায়া দেখে সে চমকে ওঠে। দেখল, ওয়াসিফ পুরোপুরি তৈরি। ইউনিফর্মে তাকে অন্যদিনের চেয়েও বেশি কঠোর আর ব্যক্তিত্ববান দেখাচ্ছে। লোকটা যে চলে যাবে তা স্পষ্ট, কিন্তু তার এই ঘরে আসার কারন ধারা বুঝতে পারল না।

ওয়াসিফ কোনো অনুমতি না নিয়েই ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বিছানার মুখোমুখি বসল। ধারা তড়িৎগতিতে চোখ সরিয়ে জানালার দিকে ফিরিয়ে নিল। তার এই ঠুনকো অভিমান দেখে ওয়াসিফের ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

সে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলতে শুরু করল, “শোন, আজ সকাল এগারোটা নাগাদ চাচার অ্যাকাউন্টে তোর কাবিনের তিন লাখ টাকা চলে যাবে। ওটা উঠিয়ে নিজের নামে নতুন অ্যাকাউন্ট করে নিবি। তোর টাকা, যা খুশি করিস—আমি কোনো কৈফিয়ত নেব না।”

ধারা কথা বলেনা, শুনছে সব, কিন্তু কথার কোনো জবাব দিচ্ছে না। ওয়াসিফ বলে।

‘ কতদিন আর লুইপার সঙ্গে ঠ্যালাঠয়ালি করে এ ঘরে থাকবি? তোর আলাদা ঘর নেই এই নিয়ে কত অভিযোগ তোর।আমার ঘরটা খালি পরে থাকে ওখানে গিয়ে থাকবি আজ থেকে। ও তুই তো আবার একা ঘুমাতে পারিসনা, লোপাকে নিয়ে থাকিস’

একথারও কোনো জবাব ধারা দেয়না। ওয়াসিফ আবার ও বলে।

‘ কলেজে যাওয়া আসা করবি ভদ্র সভ্য ভাবে, কলেজ আসা যাওয়ার পথে এবাড়ির পেয়ারা গাছ ধরে ঝুলে পড়া, ও বাড়ির ফুল তুলে নিয়ে দৌড় দেওয়া এগুলো যেনো না শুনি। রাস্তাঘাটে চলার সময় গায়ে মাথায় কাপড় রেখে ভদ্র হয়ে চলবি। কলেজ আসা যাওয়ার পথে উচ্চ শব্দে হেসে গড়াগড়ি খেয়েছিস এমন কথা আমার কানে গেলে তুলে ধরে একটা আছাড় মেরে রেখে দেবো এর বেশি প্রয়োজন হবেনা’

একটু থেমে ওয়াসিফ আবার বলে।

‘ সকালে ঘুম থেকে উঠে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পরযন্ত দিনে দশবার করে মনে মনে পড়বি।’

‘ আমি মুমতাহিনা ধারা এখন বিবাহিত, আমার ধীর বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে চলতে হবে। দূরন্তপনা কমিয়ে নিজেকে স্থির রাখতে হবে’ ক্লিয়ার?

এবারও ধারা কথা বলেনা। রাগে দম ধরে বাইরের জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। এতো জ্ঞান ও আর শুনে পারছেনা। রাগে, দুঃখে ভেতরে ভেতরে কিড়মিড় করতে থাকা ধারা ঠিক সেই মুহূর্তেই সে টের পেল তার ডান গালে একটা অদ্ভুত উষ্ণ আর নরম পরশ। মস্তিষ্ক কিছু বুঝে ওঠার আগেই পর পর দুটো গভীর চুমু তার গাল স্পর্শ করল। মাত্র চার সেকেন্ডের ব্যবধান, অথচ ধারার মনে হলো সময় থেমে গেছে।

অনেকটা বিস্ময়, লজ্জা, আর রাগ নিয়ে সে ঘুরে তাকাতেই ওয়াসিফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত খেলা। সে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, “বাম গালের চুমুটা তোলা থাকল। ফিরে এসে সুদে-আসলে দিয়ে দেব।”

মুহূর্তের স্তব্ধতা কাটিয়ে ধারা রাগে কাঁপতে শুরু করল। গায়ের সুতি ওড়নাটা টেনে নিয়ে সে ক্ষ্যাপার মতো গাল ডলতে শুরু করল। যেন ওয়াসিফের ছোঁয়া সে এখনই মুছে ফেলবে। ডলতে ডলতে ফর্সা গালটা লাল করে ফেলেছে।

শান্ত মেজাজের ওয়াসিফ ঘর থেকে প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু ধারার এমন অবজ্ঞা দেখে তার রাগ চড়ে গেল। ওয়াসিফ বিদ্যুৎবেগে ফিরে এসে ধারার দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “এতটুকু একটা শরীর, অথচ জেদ পাহাড় সমান! এতো তেজ কই থাকে তোর?”

ধারা মোচড়ামুচড়ি করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শক্ত হাতের বজ্র আঁটুনি থেকে পালানো তার মতো চুনোপুঁটির সাধ্য নয়। ওয়াসিফ ফের দারাজ গলায় ধমকে ওঠে।

‘ এই তুই তেজ দেখাস কাকে?’

“ছাড়ুন আমাকে! একদম ছুঁবেন না!” আর্তনাদ করে উঠল ধারা।

ওয়াসিফ কতক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে রইল সেই রাগী চোখের দিকে। ধারা তখনও হাঁসফাঁস করছে। হুট করেই হাত দুটো ঝাড়া মেরে ছেড়ে দিয়ে ওয়াসিফ স্থির কণ্ঠে বলল, “তোর ভাগ্য খুব ভালো যে আমাকে এখনই বেরোতে হচ্ছে। নয়তো আজ আমিও দেখতাম তোর জেদ আর তেজের পাল্লা কতটুকু ভারী হয়েছে”

একটু থেমে ফের ওয়াসিফ বলে।

” বেয়াদবি একটার পর একটা গতকাল থেকে একাধারে করেই চলেছিস, সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছি কিছুই বলছিনা তারমানে এইনা যে তোর মতো চুনোপুঁটি ধরে আছাড় মারতে পারবোনা। ঠাণ্ডা মাথায় যেতে চাচ্ছি বাড়ি থেকে, বেয়াদবি কম করবি, বিশেষ করে আমার সামনে “

ওয়াসিফ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। বুটের শব্দ তুলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ধারা কপাল কুঁচকে চেয়ে দেখলো একবার। রাগে দুঃখে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বললো।

” বেয়াদবির এখনো কিছুই দেখেননি, ফিরে আসুন তারপর দেখাবো বাকিটা”

ওয়াসিফ শুনলোনা সে কথা, তার কান অব্ধি পৌছায়নি ধারার সে কথা। যদি পৌছাতো তবে শাহেদ ওয়াসিফ হয়তো তার মূল্যবান সময় থেকে আরো কিছু সময় নষ্ট করে হলেও সদ্য বিয়ে করা বৌয়ের বেয়াদবি দেখার জন্য দাঁড়াতো।

হঠাৎ জিপের পরবর্তী হর্ন কানে যেতেই ধারার ধ্যান ভাঙ্গে। ও ভাবলেশহীন হেলেদুলে হেঁটে গিয়ে দোতালার খোলা বারান্দায় বড়ো ফুল গাছের টপের ধারে দাঁড়ালো। এখান থেকেই স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে নিচে দাড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে। মা-চাচি, বাবা, চাচা, আপা, ছোট ভাইবোনেরা তাদের বাড়ির ছেলেকে বিদায় দিচ্ছে। ধারা দেখে, চুপচাপ আড়ালে দাড়িয়ে থেকে দেখতে থাকে লোকটা কি সুন্দর হাসি হাসি মুখে বড়োদের সঙ্গে কি যেনো বলছে। এই মানুষটা কখনোই উচ্চ শব্দে হাসেনা, আবার ওতোটা গাল মেলেও হাসেনা, তবে উনি যখন কারো সঙ্গে ভীষণ আন্তরিক হয়ে কথা বলেন উনার মুখে আলাদা রকম একটা হাসি থাকে। এই মানুষটার সবকিছুই যেনো কেমন কেমন যা অন্য সবার থেকে তাকে আলাদা করে রাখে।

এদিকে সময় বাড়ে, রাতের অন্ধকার কেটে চারিদিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে। ধারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল কুয়াশার বুক চিরে জিপটা মিলিয়ে যাচ্ছে। ওর চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতেই ও ঘুরে দাঁড়ায়, কি মনে করে আবার ফিরে তাকায়, কিছুই দেখা যায়না এবার। ঐ কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই বলে।

” খুব তাড়াতাড়ি ফিরবেন কিন্তু, আপনাকে এখনো অনেক বেয়াদবি দেখানো বাকি আছে “

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply