Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_০২

” বিয়েটা এখনই হবে আম্মা “

শাহেনূর বেগম ছেলের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। রাত আড়াইটে বাজে, চারপাশ নিঝুম। এই অসময়ে বিয়ের কথা শুনে তিনি অবাক হয়ে কিছুসময় তাকিয়ে রইলেন ছেলের মুখের দিকে। মায়ের চোখের দৃষ্টিতে যতোটা বিস্ময়কর ভাব বিপরীতে ওয়াসিফের চোখ দুটো ততটাই শান্ত। শাহেনূর বলেন।

“এখন বিয়ে? পাগল হয়েছিস নাকি ওয়াসিফ? বিয়ের মতো একটা বিষয় এতো তাড়াতাড়ি হয় নাকি”?

” কেনো হবেনা আম্মা “?

শাহেনূর কয়েক মুহূর্ত ছেলেকে দেখে, চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে।

” জেদ করছিস কেনো ওয়াসিফ “?

” মোটেও জেদ করছিনা। আমাকে দেখো! তোমার মনে হচ্ছে আমি জেদ করছি”

শাহেনূর নিরব দম ফেলে মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে ওঠায়। ওয়াসিফ সঙ্গে সঙ্গে মায়ের হাতদুটো ধরে বলে।

” আম্মা! তুমি ছাড়া আমাকে এইটুকু বয়সে কেউ কখনো ভালো ভাবে বোঝেনি। এবার আমার হাতে সময় খুবই কম আম্মা। তাই আয়োজন করে বিয়ের অনুষ্ঠান পাতার সময়টুকু তোমাদের দিতে পারছিনা। অনুরোধ তোমাকে আম্মা, আমাকে একটু বোঝো”

শাহেনূর ছেলেকে দেখে, মনোযোগ দিয়ে ছেলের অনুরোধ শোনে। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এখন পরযন্ত সবসময় চেষ্টা করে গেছেন ছেলের ভেতর বাহির সবটুকু বুঝে আগলে রাখার। কখনো এই বিষয়ে সফল হয়েছেন কখনো বা হননি।উনার ছেলে ওয়াসিফ, সেই ছোট্ট ওয়াসিফ। মায়ের হাতদুটো ধরে রেখে যখন নরম সুরে অনুরোধ করে বলে। ‘ আম্মা আমাকে একটু বোঝো’ এই অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়া একজন মা হিসাবে তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনা। নিজের মধ্যে বাকি কথা, প্রশ্ন চেপে রেখে বলে।

” বিয়ে যে এখনই করবি শাড়ি গহনা কিছুর বন্দোবস্ত আছে “?

” আছে ” ওয়াসিফ ছোট করে উত্তর দেয়।

এই সামান্য একটা উত্তরে শাহেনূরের বুঝতে বাকি নেই, ছেলে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এসেছে এবার সে বিয়েটা করবেই।

” আচ্ছা, আমি ডেকে ওঠাচ্ছি সবাই কে। তুই ঘরে গিয়ে তৈরি হয়ে আয়। একটা পানজাবি পরিস”

বলেই শাহেনূর প্রথমে দোতলায় ওঠে, লুইপার ঘরে দরজা নক করে বলে যায়, তাড়াতাড়ি ধারাকে ওঠাতে। এরপর যায় দেবর-জায়ের ঘরের দিকে।


অন্যদিকে, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ধারার কপালে ঘাম জমেছে। হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছিল মেয়েটি। হঠাৎ কারো হাতের স্পর্শে ধড়ফড় করে জেগে ওঠে সে। সামনে চাচাতো বোন লুইপাকে দেখে সে অবাক হয়ে শুধালো,

“ কি হয়েছে আপা? এতো রাতে? কিছু হয়েছে?”

লুইপা থম মেরে চেয়ে আছে ধারার দিকে। ওর চোখের ঘুম উড়ে গেছে তখনই যখন জানতে পারলো এই মাঝরাতে তাদের বাড়িতে একজোড়া মানুষের বিয়ে। লুইপা নিজের ঘোর থেকে বেরিয়ে নরম সুরে বলে।

” তোর বিয়ে ধারা”

সঙ্গে সঙ্গে ধারা হাতখানেক সরে গিয়ে বলে।
” এই মাঝরাতে ডেকে তুলে ইয়ার্কি করছো কেনো আপা? আমি এমনিতেই.. “

” ইয়ার্কি না, সত্যি। একটু কানখাড়া করে শোন, বাড়ি শুদ্ধ মানুষ উঠেছে “

ধারা এবার সোজা হয়ে বসে, হ্যা সে শুনতে পাচ্ছে বাড়ির লোকেদের আবছা কথাবার্তার আওয়াজ। চিৎকার করে বলতে চাইল— ‘ ঐ লোক কি শুরু করে দিয়েছে’ কিন্তু তার আগেই দেখলো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই দীর্ঘকায় মানুষটি। গায়ে সাদা রঙের একটা সুতি পানজাবি ছাপিয়েছে। তার ঐ সুঠাম দেহের সৌন্দর্য যেনো ঐ এক সুতি কাপড়ের আস্তারনে একটু বেশিই শোভনীয় লাগছে। ওয়াসিফ গম্ভীর গলায় বলল, “ ওকে এতোকিছু বুঝিয়ে লাভ নেই লুইপা। যা করবি একটু তাড়াতাড়ি “
বলেই ওয়াসিফ দুটো প্যাকেট এনে বিছানায় রেখে বলে।

‘ এগুলো রেখে গেলাম, শাড়ি আর গহনা আছে ‘

ওয়াসিফ চলে যেতে পা বাড়াতেই পেছন থেকে ধারা তেতে উঠে বললো।

‘ বলেছিনা? আপনাকে বিয়ে আমি করবোনা’

সঙ্গে সঙ্গে ওয়াসিফের কদম থামে, ঘাড় ঘুরিয়ে স্থির চোখে তাকায় ফর্সা ছোটখাটো মুখটার দিকে। ধারা তবুও চোখ সরায়না ওয়াসিফের ধারালো দৃষ্টি থেকে। ওয়াসিফ এবার পুরোপুরি ওর দিকে ঘুরে দাড়িয়ে বলে।

” কেনো আমাকে বিয়ে করতে কি সমস্যা? বুড়ো হয়েছি আমি? চুল পেকেছে আমার”?

ধারা এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে। কথা বলেনা।ওয়াসিফ বলে।

” তোর মতো মেয়ের কপালে আমি জুটছি এটাই শোকর কর বারবার, নয়তো টাকলা ভুড়িওয়ালা কেউ জুটলে তখন কেদেও কূল পাবিনা। আফসোস করবি”

ধারার রাগ বাড়ে, মুখ ওভাবে ঘুরিয়ে রেখেই দাঁতে দাঁত চেপে বলে।

” কেনো আমি কি এতেটাই কুৎসিত যে ওরকম পাত্র জুটবে আমার”?

ওয়াসিফ আর কথা বাড়ায়না, যাওয়ার সময় লুইপাকে বলে।

” দ্রুত কাজ শেষ করবি”


ধারা জেদ ধরে বসে থাকে, ও শাড়ি গহনা কিচ্ছু পড়বেনা। ওরপাশে বারেবারে লুইপা অনুনয় বিনয় করে বলছে।

‘ আর ত্যাড়ামি করিসনা ধারা। এবার কিন্তু সত্যি সত্যি ভাইজান এসে তোকে চড়াবে। ‘
সেই তখন থেকে ধারার এক কথা।

‘ আমি কিচ্ছু পরবোনা, আমি তৈরি হবোনা’

মেয়ের এসব জেদ দরজায় দাড়িয়ে থেকে দেখে সামিরা। গটগট করে ভেতরে ঢুকে মেয়েকে শাসায়।

‘ তুই এসব করে কি বোঝাতে চাচ্ছিস আমরা তোকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছি? নাকি ওয়াসিফ তোকে জোর করে বিয়ে করছে? আপন চাচাতো ভাই কে ওসব প্রেম পত্র লেখার সময় ভবিষ্যত চিন্তা করিস নি’?

মায়ের মুখে ঐ কথা শুনে ধারা থ হয়ে যায়, তারমানে ঐ লোক বাড়ির সবাই কে বলেছে ধারাই আগে ওয়াসিফকে…’ ছি:!

মেজাজ নিয়ে সামিরা খাট থেকে মেয়েকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে শাড়ির ভাজ খুলতে খুলতে বলে।

‘ আর তামাশা দেখার সময় নেই, বহুত তামাশা দেখিয়েছো আড়ালে।

দশমিনিটের মাথায় মেয়েকে শাড়িটা পরিয়ে, লুইপাকে বলে।

‘ সাজগোছ যদি করতে চায় করিয়ে জলদি নিচে আয় ওকে নিয়ে ‘

নিচে বসার ঘরে তখন এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। ধারার বাবা হতবাক হয়ে সোফায় বসে আছেন। বড় ভাইয়ের ছেলে হিসেবে ওয়াসিফকে তারা যথেষ্ট ভালোবাসেন, কিন্তু তার এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সারহান ততক্ষণে কাজীকে নিয়ে হাজির হয়েছে। কাজীর চোখেমুখেও ঘুমের রেশ আর কিছুটা আতঙ্ক। বন্দুকধারী মেজরের বিয়ে পড়াতে হবে ভেবে তিনি কিছুটা কাঁপছেন। আর এইভাবে মাঝরাতে বিয়ে তিনি তার ক্যারিয়ার লাইফে এটাই প্রথম পড়াচ্ছেন। যেখানে বিয়েতে পরিবারের মত থাকার পরও বিয়ে দিতে হবে এই শেষ রাতে।

ওয়াসিফ ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াতেই সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল। সে তার চাচার সামনে গিয়ে বিনীত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “চাচা, পরিস্থিতি আর কাজের চাপে আমাকে হুট করেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আপনি এবং চাচি আশা করি কেউই অমত করবেন না।ধারাকে আমি আমার স্ত্রী হিসেবে সাথে নিয়ে যেতে চাই না এখনই, ওকে রেখে যাবো আপনাদের কাছে । বাকি অনুষ্ঠান আমি ফিরে এসে বড় করে করব।”

ধারার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোমার সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার কোনো যুক্তি এই মুহূর্তে আমি দাঁড় করাতে চাইনা বাবা। সেরকম ইচ্ছে আমার নেই। তবে মেয়েটার মতটা তো একবার…”

“ওর মতামতের জন্য বসে থাকলে আমার সময় পুরিয়ে যাবে।” ওয়াসিফের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো সামিরা বেগম। বলেন।

‘ নিজের ডান হাত বাম হাত এখনো ঠিক করে চিনতে শেখেনি আপনার মেয়ে। সেখানে বিয়ে বিষয়ে ও কি সিদ্ধান্ত নেবে?ওর মতামত জানতে গিয়ে ওয়াসিফের সময় নষ্ট করবেন না। মেয়ের বাবা হিসেবে আপনার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ওয়াসিফকে জানান’

ভদ্রলোক বলেন, ‘ আমার সিদ্ধান্ত তোমার জানা’

‘ তাহলে আর অহেতুক কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করবেন না। লুইপা নিয়ে আসছে ধারাকে’

পরনে একটা সাধারণ সুতির থ্রিপিচ। চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে। মুখটাতে নেই কোনো সাজগোছ। তার পেছনে পেছনে লুইপা। বাড়ির বাকি ছোট সদস্য গুলোর মুখে আপাতত কোনো কথা নেই। ওরা শুধু চেয়ে দেখে তাদের বাড়িতে ঘটছে কি?

ওয়াসিফ দেখলো ধারাকে। তার দেওয়া শাড়ি গহনা কিছুই পরেনি, বিয়ের কনে সাজেনি মুমতাহিনা। ওয়াসিফ স্থির চোখে তাকিয়ে শুধু ভাবে মেয়েটার জেদের পরিমান। ঠিক কতটা জেদে পড়লে এমন একটা দিনে মেয়েরা সাজেনা, শাড়ি পরেনা। মেয়েকে চোখে পরতেই সামিরা খেঁকিয়ে ওঠে।

‘ এই তোর শাড়ি কই?’
ধারা থম মেরে থাকে। ওর দৃষ্টি খোদাই করা মেঝেতে আঁটকে রেখেছে। তাকাচ্ছে না কারো দিকে। পাশ থেকে লুইপা বলে।

‘ শাড়িটা খুলে ফেলেছে চাচি আম্মা ‘

সামিরা রাগে কিড়মিড় করে উঠে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওয়াসিফ চাচিকে থামিয়ে বলে ওঠে।

‘ সময় নেই, বাদ দিন। ওর শাড়ি চুরি পরা না পরাতে বিয়ে আঁটকে থাকবেনা’

কাজীর সামনে বসানো হলো দুজনকে। বিয়ের রেজিস্ট্রি খাতাটা সামনে আসতেই ধারার হাত কাঁপতে শুরু করল। ও নিজেকে শান্ত এবং যতোটা সম্ভব শক্ত রাখা যায় চেষ্টা করছে। আগে ওয়াসিফ সই করে কলম রাখতেই কারো থেকে কোনো প্রকার কথা শুনে উঠার আগেই টুপ করে কলমটা হাতে নেয় ধারা।ওয়াসিফ অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে, সেই একই স্থির আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এই এতটুকু সময় মেয়েটি তাকাচ্ছে না কারো দিকে। কলম হাতে নিয়ে মাথা নুইয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকতেই ওয়াসিফ বলে।

“সই কর।”

ধারা দাঁতে দাঁত চেপে সই করে দিলো। কোনো প্রকার ভণিতা সে করলোনা।মনে মনে ভাবল, ‘এই সইটা হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলের দলিল হয়ে থাকবে মেজর শাহেদ ওয়াসিফ’!

চলবে

[ গল্প পড়া শেষে অবশ্যই লাইক কমেন্ট শেয়ার করবেন। আপনাদের রেসপন্স পেলে আমি রেগুলার গল্পটা লিখতে উৎসাহ পাবো। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply