মেজর_ওয়াসিফ
লেখনীতেঐশীরহমান
পর্ব_১৪
[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]
এক, দুই, তিন….
এভাবে পাক্কা দশ মিনিট পার হয়ে যাওয়ার পরও ধারা আর ওয়াশরুম থেকে ফেরেনি। ওয়াসিফ এদিকে ওদিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকে।
” মুমতাহিনা “!
” এ্যাই মুমতাহিনা “!
ধারার কোনো সাড়াশব্দ এলোনা। ওয়াসিফ ফোঁস করে দম ছেড়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওর বোঝা হয়ে গেছে এই মেয়ের কোনো ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। বুদ্ধি খাটিয়ে পালিয়েছে পড়াচোর মেয়ে একটা। বিষয়টা ওয়াসিফের আগেই ধরা উচিত ছিলো।
কয়েকবার ডেকেও যখন ধারাকে পাওয়া গেলোনা ওয়াসিফ ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে যায় নিজের ঘরে।
বিচক্ষণ মানুষটিকে বোকা বানাতে পেরে কুটিল হাসে ধারা। ওর এখন ধুম তা না না.. নাচতে ইচ্ছে করছে। ওয়াশরুম দাড়িয়ে তো আর সেই নাচ নাচা যায়না, জায়গা সিমীত। নাচতে গেলে পিছলে পড়ে কোমর ভাঙবে। ও যখন টের পেলো পায়ের শব্দ, তখন বুঝলো ওয়াসিফ ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে দরজা খুলে আগে মাথা একটু বের করে চোখ বুলালো পুরো ঘরে। সত্যি ই যে ওয়াসিফ চলে গেছে নিজ চোখে দেখতেই খুশি ষোলো আনা এসে ওর উপর ভর করলো। পাখির ডানার ন্যায় দুই ডানা মেলে তিড়িং বিড়িং করতে করতে গলা ছেড়ে গাইলো গান।
‘ ধুম তা-না -না, তা-না-না, জীবনটাকে হয়নি জানা, হাসবো,খেলবো,ঘুরবো…’
চুপসে যাওয়া ফুটবলের মতো করে আচমকা চুপসে গিয়ে তটস্থ হয়ে, নাচানাচি করা হাত পা থামিয়ে দাড়িয়ে রইলো ধারা। চোখ মুখ লটকে মাছের মতো ফটকে গিয়েছে দরজায় ওয়াসিফকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে। ওর চোখে মুখে যতটা ভীতসন্ত্রস্ত এসে ভর করলো বিপরীতে ওয়াসিফের চাহনি ততটাই তীক্ষ্ণ আর গম্ভীর।
মিনিট কেটে গেলো, ধারা ছোট চোখ করে বারবার তাকাচ্ছে ওয়াসিফের দিকে, বেশি সময় তাকিয়ে থাকছেনা। এদিকে, ওদিকে চোখ ঘোরায়। তবে ওয়াসিফ ওর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। কতক্ষণ পর ধারা মিনমিন করে বলে।
‘ আপনি না এই মাত্র বেরিয়ে গেলেন?’
‘ হু’
‘ তাহলে আবার এলেন কেনো’?
ওয়াসিফ ওর দিকে ওভাবে স্থির চোখে তাকিয়ে থেকেই বলে।
‘ দেখতে, তুই কিভাবে হাসছিস,খেলছিস আর ঘুরছিস’
ধারা কিছু বলেনা, দাড়িয়ে থেকে ওড়নার মাথা ধরে খোঁটাখুঁটি করে। ওয়াসিফ ফের বলে।
‘ হয়েছে তোর হাসা,খেলা আর ঘোরাঘুরি ‘?
বলেই ওয়াসিফ হেঁটে বসে চেয়ারে, বই তুলে হাতে নিয়ে বলে।
‘ বহুত সেয়ানা তুই, বোস এখানে ‘
শেষ কথাটা ওয়াসিফ মৃদু ধমকে বলে। ধারা মাথা তুলে তাকায় ওয়াসিফের দিকে। কেউ না জানুক, ও তো ভালো করে জানে এই বইয়ের যেখান থেকে ধরবে ও কিচ্ছু পারবেনা। উল্টো শুনতে হবে কতগুলো কথা, হজম করতে হবে অপমান। আজ যে ও ঘুম থেকে উঠে কার মুখ দেখেছিলো কে জানে? হঠাৎ ই মনে পড়লো। আজ ঘুম ভাঙতে নিজের মুখ নিজে দেখেছিলো আয়নায়। ও যখন এসব আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে পুনরায় ওয়াসিফ ধমকে ওঠে।
‘ এ্যাই তোকে বসতে বলেছি আমি’
টেবিলের কোণায় খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলে।
‘এই সূত্রের ব্যাখ্যা করে দে, একখুনি দিবি’
ধারা পিপড়ার গতিতে গিয়ে বসলো চেয়ারটাতে। ডান হাতে ওয়াসিফের বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে কলমটা নিতে নিতে আড়চোখে খাতায় দেখে প্রশ্নটা। আরেকহাতে খাতাটা টেনে নিয়ে কলম তোলে সেখানে।
কি লিখবে? ওর মাথা আর সামনে বসে থাকা মানুষের মুন্ডু? ওতো পারেনা এই সূত্রের ব্যাখ্যা। যেই সাবজেক্টটির প্রতি ওর কোনো ফিলিং নেই সেই সাবজেক্টের ক্লাসেও থাকে অন্যমনস্ক। স্যার কি বুঝিয়ে যান, কি পড়ে যান ওসব কিছু ই ঢোকেনা মাথায়। ধারা খাতায় কলম আর কি চালাবে। শক্ত করে কলম ধরে ও আড়চোখে তাকায় ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ তখন বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টায়, ওর দিকে আপাতত তাকিয়ে নেই।
ধারা কি লিখবে বুঝতে পারে না, এমন পরিস্থিতি কতটা চাপ বাড়ায় একমাত্র সেই ছাত্র বা ছাত্রী ই বুঝবে, যখন আপনি পরীক্ষার হলে বসেন বা কোনো কড়া স্যারের কাছে পড়তে বসেন, সে আপনাকে কিছু একটা লিখতে দিলো অথচ আপনি তা পারেন না। তবুও মুখ ফুটে বলতেও পারছেন না কারণ আপনি জানেন বললেই শুনতে হবে অযাচিত বকাবকি। এই সময়টুকু সেই স্টুডেন্টের কাছে দম আটকে রাখার মতো। ধারার অবস্থাটাও হুবহু তাই হয়েছে আজ। ও মনে মনে কত যে আল্লাহ কে ডাকছে। এমনকি কারেন্ট চলে যাওয়ার জন্য দোয়াও করছে, বা ওয়াসিফের ফোনটা ধুম করে বেজে উঠুক, লোকটা একবার বেরিয়ে গেলে আজ সারারাতেও এঘরের দরজা খুলবপ না। আবার মনে মনে নিজেই নিজেকে কথা দেয়। এরপর থেকে ভালো করে পড়বে, ভালো করে বুঝবে সবকিছু, একটুও ফাঁকিবাজি করবেনা।
এরমধ্যেই আচমকা টেবিলে থাবা বসিয়ে ওয়াসিফ জিজ্ঞেস করে।
‘ লেখা শেষ ‘?
ধারা ওর দিকে তাকিয়ে দুই পাশে মাথা নাড়ায়, যার অর্থ ‘ না’
‘ দ্রুত শেষ কর’
ধারা নিজ মনে নিজে বকবক করে, যা ওয়াসিফ শোনেনা।
‘ কি কচু লিখবো আমি? এই ছাতার মাথার আমি পারিনা।’
ওয়াসিফ সরু চোখে তাকিয়ে আছে ধারার দিকে, দেখে ধারার লটকানো মুখটা। ওদিকে চেয়ে থেকেই হুট করেই ফিচলে হাসে ওয়াসিফ। কারণ ওর ধারণা হিসেবে ও এই পাঁচ ফুট উচ্চতার মেয়েটিকে আগাগোড়া ভালো করেই চিনে। যার জনম জনমের দুশমন এই পড়াশোনা তার কাছে আর্কিমিডিসের সূত্রের ব্যাখ্যা চাওয়া আর কানা লোকের কাছে পথের ঠিকানা চাওয়া দুটোই একই রকম।
ওয়াসিফ একটানে ওর থেকে খাতাটা টেনে নিয়ে বন্ধ করে ফেলে। ওভাবে টেনে নেওয়াতে ধারা চমকে তাকায় ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ ভারি গলায় বলে ওঠে।
” তোর হাতে দুটো অপশন, এখান থেকে যেকোনো একটা চুজ করার দায়িত্ব তোর, অপশন এক. পড়াশোনায় গাফিলতির কারনে গুনে গুনে একশোবার কান ধরে উঠবস করবি, এখনি আমার সামনে। অপশন ২. কোনো রকম গাইগুই না করে সোজা শিফট হবি আমার ঘরে। রাইট নাউ, ঝটপট জবাব দে অপশন এক না অপশন দুই “?
ধারা নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে তাকিয়ে থাকে ওয়াসিফের দিকে। এই মুহূর্তে একশোবার কান ধরে উঠবস করা তা ও আবার এই লোকের সামনে, এটা করলে মান সম্মান যতটুকু আছে তা আজকে পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। যদি বাঁচতেই হয় তবে একটা রাত দম আটকে ও ঘরে যাওয়া ই যায়। তারপর যা হবে ঐ লোকের সঙ্গে চুলোচুলি হয়েই যাক। তবুও কান ধরে উঠবস করা একদমই যাবেনা। কথাটা ভেবেই ধারা চোখের সামনে কল্পনা করে দেখলো।
ইশ! ও একের পর এক কান ধরে উঠবস করছে আর ঐ লোক তা চোখ দিয়ে গিলছে। ছিঃ! সঙ্গে সঙ্গে ধারা মাথা ঝাকিয়ে বলে ওঠে।
” দুই, দুই, দুই, অপশন দুই”
ধারার বলতে দেরি হলেও ওয়াসিফের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বলতে দেরি হলোনা।
” চল তাহলে “?
” ক..কোথায় “?
ওয়াসিফ এক হাতে গায়ের টিশার্টের ভাজ ঠিক করতে করতে বলে।
” তোর শামীর বুকে, আচ্ছা আয় ঘরে আয় আপাতত “
বলেই ওয়াসিফ সামনে হাটে, পেছনে ধারাকে না পেয়ে আবার কদম থামিয়ে পেছনে ঘোরে।
” কি হলো আয়”?
ধারা মিনমিন করে বলে।
” একটু পরে আসি”?
ওয়াসিফ ঘোর বিপত্তি জানিয়ে বলে।
” উহু, এতো সময় তো আমি দিতে পারবো না, উঠে আয়”
” আপনি যান, আসছি আমি”
” যদি না যাস, তবে!”
” যাবো, যাবো, আমার মুখ যা দলিল তাই। কথা দিয়ে কথা রাখি”
” আচ্ছা “
ওয়াসিফ আর কথা বাড়ায়না, চলে যায় ঘর থেকে। ধারা ওর যাওয়ার পান থেকে চোখ ফিরিয়ে লম্বা দম ফেলে। কি আশ্চর্য লোক রে বাবা! ঠিক ই ছলেবলে কৌশলে ধারাকে দিয়ে কাজ হাসিল করে নিচ্ছে। এর সঙ্গে ধারা আদৌও পেরে উঠবে কোনোদিন?
চলবে
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৭
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১১
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৫
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১২[ ২য় অংশ]
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১