ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৭৬(অন্তিম পর্বের শেষাংশ)
তাজরীন ফাতিহা
নিশাতের শরীরটা প্রচণ্ড দুর্বল। তার সকালটা কাটে প্রচণ্ড অনিহায়। কয়েকদিন ইনামকে নিয়ে ভালোই কেটেছিল। বাচ্চাটা একটা আস্ত আদর। মানহার ছেলে পুরোই মানহার মতো আদুরে হয়েছে। শুধু আদর খোঁজে। প্রতিদিনের ন্যায় আজও ফজর পড়ে একটু শুয়েছিল। ইদানিং কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করেনা, খেতে ইচ্ছে করেনা। রুচি কিংবা স্বাদ কোনোটাই জিহ্বায় অনুভূত হয়না। দেহের ভাঁজে ভাঁজে আলসেমি ঝেঁকে বসেছে। তবুও আলসেমি ঝেড়ে রুগ্ন শরীরটা নিয়ে উঠে বসল। নাহওয়ান গভীর নিদ্রায় মগ্ন। ছেলের ঘুমন্ত মুখে ছোট ছোট চুমু খেল নিশাত। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দোয়া পড়ে ফুঁ দিল। ঠোঁট ফুলিয়ে কিভাবে ঘুমিয়ে আছে। তার বড় আদরের ধন এই বাচ্চাটা। ছেলের পাশে অনেকক্ষণ বসে থেকে আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গেল। মুখ ধুয়ে ধীরে পায়ে ডায়নিং রুমে আসতেই টেবিলে উল্টো দিকে ফিরে কাউকে খেতে দেখল। নিশাতের বুক কেঁপে উঠল। ওটা কে? পিছনের অংশ খুব পরিচিত কারোর সাথে সাদৃশ্যমান।
মায়মুনা বেগম রান্নাঘর থেকে বাটিতে করে তরকারি আনার পথে নিশাতকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন। নিশাত মায়মুনা বেগমকে দেখতে পেতেই বলল,
“উনি কে আম্মা?”
মায়মুনা বেগম আঁচলে চোখের পানি মুছে বললেন,
“দেখো তো চিনতে পারো কিনা।”
নিশাত দুরুদুরু বুকে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে প্রত্যুত্তর করল,
“চিনতে পারছি না।”
এতক্ষণ টেবিলে বসা ব্যক্তিটি খাওয়া থামিয়ে নড়েচড়ে বসল। মায়মুনা বেগম বললেন,
“আজাদ।”
নিশাত আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তার হাত পা অস্বাভাবিক রকম কাঁপছে। নিশাতকে নিচে বসে যেতে দেখে মায়মুনা বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে চিল্লিয়ে উঠলেন। এতক্ষণ টেবিলে বসা ব্যক্তিটি সবই শুনছিল। সে উঠে বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে ধীর পায়ে নিশাতের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। প্রায় পাঁচ মাস পর চোখের সামনে আবারও সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত মুখটি দেখতে পেল নিশাত। সেই চিরচেনা গাম্ভীর্যপূর্ণ দৃঢ় মুখাবয়ব। কপালে কাটা দাগ। পার্থক্য শুধু চুল, দাড়িতে। রুক্ষ শুষ্ক কোকড়ানো চুল, চোয়ালে ঘন দাড়ি। চোখাচোখি হলো দুজোড়া অক্ষির। মারওয়ান নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে একবার নিশাতের চোখের দিকে চাইল। এরপর কোলে তুলে রুমে নিয়ে এল।
নিশাত একবারের জন্যেও এই পাষণ্ড পুরুষটির দিক থেকে চোখ সরালো না। তার সমস্ত কথা গলায় আটকে গেছে। মায়মুনা বেগম তেল নিয়ে এসেছেন মাথায় মালিশ করবেন বলে। মারওয়ান নিশাতকে বিছানায় নামিয়ে চলে যেতে নিলে খেয়াল করল নিশাত মুঠোতে শক্ত করে তার শার্ট চেপে ধরে আছে। অগত্যা তাকে পাশে বসতেই হলো। মায়মুনা বেগম সবকিছু বুঝতে পেরে তেলের বোতল রেখে চলে গেলেন।
নিশাত একটা কথাও এখন পর্যন্ত মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেনি কেবল ছলছল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চেয়ে আছে। মারওয়ান অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। নিশাত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“এদিকে ফিরুন। চোরের মতো মুখ ঘুরিয়ে আছেন কেন? আমাকে বাজে দেখাচ্ছে? এই মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে না?”
মারওয়ান নিশাতের দিকে ঘুরে ঠান্ডা দৃষ্টি ফেলল। নিশাত মারওয়ানের চোখে চোখ রেখে বলল,
“গতরাতে তাহলে সত্যি সত্যিই আপনি ছিলেন? আপনি কি ঠিক করে রেখেছেন আমাকে কোনোদিন শান্তি দেবেন না?”
মারওয়ানের জবাব নেই কোনো। নিশাত নিজেকে কিছুতেই আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল। খানিকপর বুকে হাপরের মতো ওঠানামা শুরু করলে শুয়ে পড়ল। মারওয়ান এগিয়ে এসে ধরতে চাইলে নিশাত ছিটকে হাত সরিয়ে উল্টো ফিরে পড়ে রইল। কাঁদতে কাঁদতে তার হেঁচকি উঠে গেছে তবুও থামার নাম গন্ধ নেই। মারওয়ান এগিয়ে এসে নিশাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই নিশাত সেই হাতও সরিয়ে দিল। যতবার মারওয়ান ধরতে চাইল ততবার হাত সরিয়ে দিল। এরপর পেটে হাত দিতেই নিশাত পেট থেকে হাত সরাতে চাইলে মারওয়ান হাতে জোর দিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“তোমাকে ধরেছি?”
নিশাত কান্না থামিয়ে চোখ কঠিন করে বলল,
“তো কাকে ধরেছেন?”
মারওয়ান পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“আমার অংশকে।”
“ও আপনার অংশ না।”
“তাহলে কার অংশ?”
“শুধু আমার। “
মারওয়ান ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“তোমার দাবি করো কোন যুক্তিতে? নিজে নিজে একটা ছাও এনে দেখাও তো। আমি তো দুটো দিয়েছি, তুমি একটা এনে দেখাও।”
“এতকিছু জানি না। আপনি আমার পেটে হাত দেবেন না। ও শুধু ওর মায়ের, আপনি সেখানে নাথিং।”
মারওয়ান ঠোঁট বেকিয়ে বলল,
“নাথিং? আমি ছাড়া তুমি মা হতে কিভাবে?”
নিশাত কটমট দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“উল্টাপাল্টা কথা খবরদার বলবেন না। আপনিই বা নিজের দাবি করেন কোন যুক্তিতে? এতদিন পর পিতৃত্ব উতলিয়ে পড়ছে?”
“নিজের দাবি করলাম কখন? তোমাকে ধরলে কারেন্টের শক লাগে তাই আমার অংশকে ধরেছি। নিজের অংশকে ধরতে তো কোনো শক নাই, গুনাহ নাই বরং সওয়াব আর আরাম।”
“আপনি কি ঝগড়া করার জন্য আজকে বাসায় এসেছেন? যেখানে ছিলেন সেখান থেকে বুঝি লাথি দিয়ে বের করে দিয়েছে?”
মারওয়ান আবারও গম্ভীর হয়ে গেল। দৃঢ় গলায় বলে উঠল,
“কখনো কি শুনেছ মালিকের আনুগত্য করার জন্য মালিক তার গোলামকে লাথি মেরে বের করে দিয়েছে?”
নিশাত বুঝতে পারল না। অদ্ভুত দৃষ্টিতে মারওয়ানের দিকে চেয়ে বলল,
“মানে? আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?”
“যদি বলি তোমার তীব্র খুশি হওয়ার মতোন দারুন একটা কাজে গিয়েছিলাম বিশ্বাস করবে?”
“আমার খুশির তোয়াক্কা আপনি করেন?”
“তোমার কি মনে হয়?”
নিশাত শোয়া থেকে উঠে বসল। মারওয়ানের চোখে চোখ রেখে বলল,
“কি কাজ শুনি?”
মারওয়ান নিশাতের মুখোমুখি বসে শান্ত গলায় বলল,
“গেস করো তো।”
নিশাত মারওয়ানকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। চেহারায় একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার খুশি হওয়ার মতো কি এমন কাজে প্রায় পাঁচ ছয়মাস হুট করে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল এই লোক? নিশাতকে অস্থির হয়ে যেতে দেখে মারওয়ান বলল,
“আমি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এসেছি নিশাত।”
নিশাত অস্থির গলায় বলল,
“হজে গিয়েছিলেন?”
“উহু এমন এক জায়গায় ছিলাম যেখানে আমি আল্লাহকে চিনেছি, জেনেছি, বুঝেছি, অনুভব করেছি। আমার জীবনের এতগুলো বছর আমি গোমরাহে লিপ্ত ছিলাম, আল্লাহর অবাধ্য ছিলাম কিন্তু এবার থেকে আমি তার ভীষণ বাধ্যগত বান্দা হবো। শুধু আমার রবের প্রতিই নিজেকে উজাড় করে দেব।”
নিশাতের চোখ মুখে প্রশান্তি খেলে গেল যেন। মারওয়ানের মুখে আল্লাহর সম্মন্ধে যত কথা শুনছিল নিশাতের পুরো শরীর জুড়ে আলাদা শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল। বলল,
“সবকিছু খোলাশা করে বলুন তো।”
মারওয়ান ক্ষীণ হেসে বলল,
“লন্ডনে আসার পর থেকে আমি প্রচণ্ড মানসিক কষ্টে ভুগতাম। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করতো। চোরের মতো দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে চলে আসাটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। নিজের আদর্শের পরাজয়, দেশের মানুষের ভোগান্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষ এসব আমাকে প্রচণ্ড মানসিক পীড়া দিতো। রাতে ঘুমাতে পারতাম না, পুরো দুনিয়া যেন চোখের সম্মুখে কেঁপে উঠতো। দিনের পর দিন নিজের মস্তিষ্কের সাথে লড়াই করতে করতে আমি বিধ্বস্ত আর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ করেই বোধোদয় হলো আমি দুনিয়ার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিলেও দুনিয়া আমাকে সামান্যতম এফোর্টও দেয়নি। এতগুলো বছর দুনিয়ার পিছনে অপচয় করলাম কোনো ফায়দা তো হলো না। তাই আত্মযন্ত্রণা কমাতে মসজিদে গিয়ে নিজেকে হালকা করতে চাইতাম। একদিন হঠাৎ শুনি তাবলীগ জামাতের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে লোক এসেছে। তাদের সাথে গেলে আল্লাহর জন্য নির্জনে একাকী সময় দেয়া যায়, এই দুনিয়ায় আসার আসল লক্ষ্য জানা যায়। তাই হুজুগেই বলতে পারো আমি নিজের মানসিক শান্তি ও আত্মশুদ্ধির জন্য সেই জামাতের সফরসঙ্গী হই। আর সেখানে গিয়েই আমি আমার জীবনের আসল উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারি।”
মারওয়ান থেমে নিশাতের দিকে চাইতেই দেখল তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। তা দেখে বলল,
“কাঁদছো কেন? তুমি খুশি হওনি?”
“এই কথাটা আমাকে বলে যাওয়া যেতো না? আমাকে এতদিন মানসিক যন্ত্রণায় কেন ভুগিয়েছেন?”
মারওয়ান মাথা নিচু করে বলল,
“বললাম না হুজুগের বশে চলে গিয়েছিলাম। তখন অত ভাবার মতো মস্তিষ্ক আমার ছিল না, কতদিন থাকতে হবে তাও জানতাম না। এই মানবজাতি, লোকারণ্য থেকে বাঁচতে আমি মুখিয়ে ছিলাম তাই ওনাদের সফরসঙ্গী হতে বিনাবাক্যে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে এতটা শান্তি পেলাম বলে বোঝাতে পারব না। মনে হতো আজীবন আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে দেই। আল্লাহর সামনে মাথা নত করায় কি যে শান্তি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। তোমাকে মানসিক যন্ত্রণা দেয়ার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। পরবর্তীতে আমার দ্বারা আর তোমাকে কষ্ট পেতে হবে না, ওয়াদা করলাম।”
নিশাত মারওয়ানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ আজকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী। এমন একটা দিনের অপেক্ষা আমি সাতটা বছর ধরে করেছি। শুধু চাইতাম আমার আল্লাহ আমাকে নেককার স্বামী, সন্তান দিয়ে মানসিক কষ্টটা ভুলিয়ে দিক। মহান রব যে আমার দোয়া এত দ্রুত কবুল করে নেবেন তা বুঝিনি।”
মারওয়ান নিশাতকে জড়িয়ে ধরতেই নিশাতের কান্নার বেগ আরও বাড়ল। মারওয়ান নিশাতের কম্পনরত দেহটা আগলে নিয়ে বলল,
“ফাইয়াজের মায়ের রাগ কমেছে?”
নিশাত স্বামীর বুকে মিশে গিয়ে বলল,
“ফাইয়াজের বাবার সাথে ফাইয়াজের মা কখনো রাগ করেনা। তার জন্য আমার প্রচুর অভিমান জমা আছে।”
মারওয়ান মুচকি হেসে বলল,
“তোমার এখন আমার উপরে রাগ অভিমান কিছুই নেই।”
“কিভাবে বুঝলেন?”
“যখন তুমি আমাকে ফাইয়াজের বাবা ডাকো ঠিক তখনই বুঝি।”
নিশাত এতদিন পর স্বামীর বুকে প্রশান্তি খুঁজে পেল।
“ঠিক বলেছেন আপনার প্রতি আমার আর বিন্দু পরিমাণ রাগ, অভিমান অবশিষ্ট নেই ফাইয়াজের বাবা। এখন থেকে আমি সুখী রমণী। যতদিন আপনি আমার সাথে আছেন আমার আর কোনো চিন্তা নেই।”
নিশাত একটু শ্বাস নিয়ে স্বামীর বক্ষে মুখ গুজে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আবার বলতে লাগল,
“জানেন আমি কি ভেবেছিলাম?”
“কী?”
“ভেবেছিলাম আপনাকে বোধহয় আবারও গুম করে ফেলেছে। বাংলাদেশ থেকে আপনাকে মেরে ফেলতে আবারও লোক পাঠিয়েছে। এগারো মাস আগের সেই কুৎসিত স্মৃতি মানসপটে বারবার উঁকি দিতো। আমার বুকটা খালি হয়ে গিয়েছিল জানেন? ফোনও নিয়ে যাননি, কোনো যোগাযোগ নেই পাঁচটা মাস। ভেবেছি আপনাকে আমি আর দেখতে পাব না। সেই গভীর রক্তাক্ত জখম, হাসপাতালের দিনগুলো সবকিছু চোখের সামনে ভেসে উঠতো। রাতে ঘুমোতে পারতাম না সেসব ভেবে। অস্থির অস্থির লাগতো। আল্লাহর কাছে আপনাকে ভিক্ষা চাইতাম। প্রতিদিন আমি আর নাহওয়ান আপনার অপেক্ষায় পথের দিকে চেয়ে থাকতাম কিন্তু আপনার টিকিও খুঁজে পাওয়া যেতো না। কিভাবে নিজেকে সামলেছি আমি আর আমার আল্লাহ জানেন। আমাকে ছেড়ে কখনো আর যাবেন না। মনে রাখবেন, ফাইয়াজের মা ফাইয়াজের বাবাকে ছাড়া থাকতে পারেনা।”
মারওয়ান নিশাতের মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“মনে রাখলাম।”
নাহওয়ান মোড়ামুড়ি করতে করতে ঘুম থেকে উঠল। চোখ কচলে আশেপাশে চাইল। মারওয়ান ছেলেকে উঠতে দেখে বলল,
“তুই কি আর বড়সড় হবি না লিলিপুটের বাচ্চা?এখনো আগের মতোন ট্যাবলেটই আছিস।
ঘুম ভাঙতেই বহুদিন পরে কানে পরিচিত সেই কণ্ঠ শুনে তড়িৎ সেদিকে চাইল। চোখের সামনে বাবাকে দেখে নাহওয়ান ‘বাবা’ বলে ডেকে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মারওয়ান ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“এত বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছিস কেন পটলের বাচ্চা?”
নাহওয়ান বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“বাবা আমার বাবা।”
মারওয়ানের চোখেও পানি এসে যাচ্ছে। শুধুমাত্র নিজের নির্লিপ্ত আচরণের কারণে তার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। সন্তানকে এতদিন পর ছুঁয়ে দেয়ার মতো শান্তি আর একটাও নেই। তাই ছেলেকে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলতে চাইল। পাঁচটা মাস এত মনে পড়তো তার পটলের বাচ্চা, কবুতরের ছাওকে। মনে হতো, কত বছর তার সন্তানকে দেখেনা। যেখানে গিয়েছিল সেখানে ফোন ব্যবহার করা যায়না, কারো সাথে যোগাযোগ করা যায়না। শুধুমাত্র রবের সাথে কথা বলা যেতো। তাই সে নির্দ্বিধায় আল্লাহর কাছেই তার স্ত্রী, সন্তান, পরিবারের দায়িত্ব সোপর্দ করে দিয়েছিল। নাহওয়ান বাবাকে আঁকড়ে ধরে বলল,
“আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবে না বাবা। তুমি না থাকলে আমাকে কেউ আদর করেনা।”
ছেলের কথায় মারওয়ানের বুকটা কেঁপে উঠল। বলল,
“কেন তোর দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা, ফুপি ওনারা আদর করেনা?”
নাহওয়ান হেঁচকি তুলে বলল,
“তোমার মতো করেনা।”
“আমি কিভাবে আদর করি।”
“তুমি বাবার মতো আদর করো। বাবার গন্ধ আসে, বাকিদের গায়ে বাবার গন্ধ নেই।”
মারওয়ান ছেলেকে বুক থেকে উঠিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমার এই রুক্ষ ও কটমট সম্বোধনে তুই আদর খুঁজে পাস?”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
“তোর মা আদর করেনা?”
“করে, বেশি বেশি আদর করে। কিন্তু মায়ের গায়ে মা মা গন্ধ পাই, বাবার গন্ধ তো পাইনা।”
মারওয়ান তোতাপাখির মতো কথা বলতে থাকা ছেলেকে মন ভরে দেখল। তার ফাইয়াজ বড় হয়ে গেছে। কবে এত বড় হলো? সেদিন না এইটুকু ছিল। ছোট ছোট শরীরটা নিয়ে পুরো ঘর দৌঁড়ে বেড়াতো, ঘর মাতিয়ে রাখতো। এখন কি শান্ত হয়ে গেছে! মারওয়ানের অস্থির লাগতে শুরু করল। বলল,
“মুখ ধুয়ে আয়, আজকে পার্কে গিয়ে দুই বাপ, বেটা ফুটবল খেলব।”
নাহওয়ান খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল। কতদিন পর আবারও বাবার সাথে খেলতে পারবে। সে নিজের গোলগাল শরীরটা নিয়ে খুশি হয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বিছানা থেকে নামলো। বাবার হাত টেনে নামালো। মারওয়ান ছেলের পিছুপিছু যেতে লাগল। নাহওয়ান নিজের বল, ব্যাট, সাইকেল সব এক এক করে বাবাকে দেখাতে লাগল। মারওয়ান সেসব দেখে বলল,
“এগুলো কে কিনে দিয়েছে?”
“দাদা, চাচা, চুমু ফুপা সবাই কিনে দিয়েছে।”
মারওয়ান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“তোর নানা কিছু কিনে দেয়নি?”
নাহওয়ান কিছুক্ষণ ভেবে একটা গাছের টব দেখিয়ে বলল,
“নানা গাছ কিনে দিয়েছে।”
মারওয়ান মুখ কুঁচকে বলল,
“আমার ছাওটাকে ছোট পেয়ে যাতা কিনে দিয়েছে। গাছ দিয়ে আমার ছাও কি করবে? অদ্ভুত!”
নাহওয়ান একটা খেলনা তলোয়ার বের করে বলল,
“এটাও নানা কিনে দিয়েছে।”
মারওয়ান চোখ কপালে তুলে বলল,
“কি সাংঘাতিক! এটা দিয়ে তুই কী করবি?”
“মা বলেছে এটা দিয়ে আমি যুদ্ধ করব।”
“এই খেলনা তলোয়ার দিয়ে? তোর মা আর নানা তোকে আন্ডা পেয়ে বোকা বানিয়েছে রে। দুঃখজনক!”
নিশাত মারওয়ানের জন্য নাস্তা রেডি করে এনেছে। সেসময় তার জন্য ঠিক করে খেতে পারেনি লোকটা। মারওয়ান অবশ্য এই অসুস্থ শরীরে উঠতে নিষেধ করেছিল কিন্তু তার মন মানছিল না। তাই নিজেই উঠে রুটি ভেজে, ডিম পোঁচ করে এনেছে। সাথে রান্না করা গরুর গোশত ফ্রিজে ছিল সেটা নামিয়ে গরম করে নিয়ে এসেছে। রুমে ঢুকেই চোখ কপালে উঠে গেল। পুরো বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্যাট, বল, খেলনা ইত্যাদি আরও জিনিসপত্র। নাহওয়ান আলমারি থেকে একটা একটা জিনিস বের করে বাবাকে দেখাচ্ছে আর কথা বলছে। নিশাত গম্ভীর মুখে বলল,
“এসব কি নাহওয়ান? তুমি পুরো ঘরে এসব ছড়াচ্ছ কেন?”
নাহওয়ান মাকে দেখতে পেয়ে দৌঁড়ে বাবার কোলে মুখ লুকিয়ে বলল,
“বাবাকে দেখাই।”
নিশাত নাস্তার প্লেট টেবিলে রেখে বলল,
“বাবাকে কি এমনি দেখানো যেতো না? সবকিছু বের করে দেখাতে হয়?”
“স্যরি মা।”
মারওয়ান এতক্ষণ সব পর্যবেক্ষণ করছিল। বলল,
“তুমি আমার ছাওকে এভাবে শাসন করো? আমি ছিলাম না তুমিও যদি এমন করো ও কষ্ট পাবে না?”
নিশাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে ছয় মাসের উঁচু পেটটা নিয়ে বসে বলল,
“জানি না আমার কি হয়েছে? ইদানিং সবকিছু বিরক্ত লাগে। আর মাঝেমধ্যে শাসন না করলে বাচ্চারা বিগড়ে যায়।”
মারওয়ান বুঝল প্রেগন্যান্সির কারণে নিশাতের মুড সুয়িং হচ্ছে। এটা প্রত্যেকটা গর্ভবতী মায়েরই হয়। সে আর ঘাটল না। ছেলেকে পাশে বসিয়ে সবকিছু গুছিয়ে রাখল। এরপর নাহওয়ানকে ব্রাশ করিয়ে এনে বিছানায় বসল। নিশাত টেবিল থেকে নাস্তা এনে বিছানায় সাজিয়ে ফেলেছে। নাহওয়ানকে উরুর উপরে বসিয়ে রুটি ছিঁড়ে গোশতের ঝোলে ভিজিয়ে মুখে দিল। নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে খেতে লাগল। বহুদিন পর আবারও স্বামী সন্তানকে একসাথে খেতে দেখে নিশাতের আনন্দ বুক ভরে উঠল। সে পলকহীন সেদিকে চেয়ে রইল।
মুখের সামনে রুটি দেখে নিশাতের ভাবনার সমাপ্তি ঘটল। মারওয়ান তার দিকে খাবার বাড়িয়ে ধরেছে। নিশাতের কি যে কান্না পেল! সে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মারওয়ানের হাত ধরে খাবারটা বেশ যত্ন নিয়ে খেল। মারওয়ানের ঝোলে ভরা আঙুলগুলো মুখে ঢুকিয়ে চেটে খেল। তা দেখে মারওয়ান বলল,
“আঙুলও খেয়ে ফেলবে নাকি?”
নিশাত মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“হুম, মজা।”
“কি বলো? মানুষের আঙুল মজা লাগছে? এটা তো ভালো লক্ষণ না।”
“মানুষের নয় শুধু আপনার। আপনাকে আমার খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে ফাইয়াজের বাবা।”
মারওয়ান বড় বড় চোখে নিশাতের দিকে চেয়ে রইল। এদিকে বাবার দেখাদেখি নাহওয়ানও রুটি ছিঁড়ে মায়ের মুখের সামনে ধরল। নিশাত স্বামীর হাত ছেড়ে ছেলের হাতেও খেল। নাহওয়ান তা দেখে বলল,
“আমার আঙুলও খাও।”
নিশাত একটু থতমত খেয়ে গেলেও পরবর্তীতে হেসে ছেলের আঙুলও চেটেপুটে খেল।”
মাহাবুব আলম একটা বই পড়ছিলেন। এরমধ্যে দরজায় টোকা পড়তেই ঢোকার পারমিশন দিলেন। মারওয়ান ধীর পায়ে হেঁটে বাবার পাশে বসল। ছেলের সাথে রাতেই দেখা হয়েছে তার। হুট করে পাঁচ, ছয় মাসের জন্য গায়েব হয়ে যাওয়ার জন্য তিনি মারওয়ানের উপরে ভীষণ নারাজ। কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। মারওয়ান বলল,
“রেগে আছ এখনো?”
মাহাবুব আলম প্রতিউত্তর করলেন না। এই ছেলেটা তাকে এত যন্ত্রণা দিয়েছে যে তার বাকিসব সন্তানরা মিলেও এর সিকিভাগ দেয়নি। মারওয়ান বাবার সাথে যতই কথা বলতে চাইল মাহাবুব আলম একটা শব্দও বড় পুত্রের সঙ্গে বললেন না। মারওয়ান লম্বা শ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই মায়মুনা বেগম বললেন,
“কিরে এত তাড়াতাড়ি বেরোলি? কথা হয়েছে?”
“আম্মা তোমার জোরাজুরির কারণে এসেছি। আমি জানতাম আব্বার রাগ এত দ্রুত ভাঙবে না। ভাঙা সম্ভবও না। আফটার অল আমি রাগার মতো কাজই করেছি। কয়েকদিন যাক এমনিতেই ভেঙে যাবে।”
বলেই মারওয়ান চলে গেল। মায়মুনা বেগম চোখের পানি মুছে রুমে ঢুকে বললেন,
“আজাদের বাপ?”
মাহাবুব আলম কঠোর গলায় বললেন,
“শোনো মাহদীর মা, ছেলের হয়ে সাফাই গাইতে এসো না। তোমার কারণে তোমার বড় পুত্র এতটা বিগড়েছে। ছোট থেকে যদি শাসন করতে এতটা বাড়তো না। বাকি সন্তানদের যেভাবে শাসন করেছ তার অর্ধেকও বড় ছেলেকে করোনি। এখন ভোগো। বউটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলেছে।”
মায়মুনা বেগম বুঝলেন মাহাবুব আলম বেজায় রেগে আছেন। বড় ছেলের উপর রেগে গেলেই তাকে মাহদীর মা সম্বোধন করেন। ঢোক গিলে বললেন,
“আপনি আজাদকে ঠিক করে চিনতেই পারেননি। ও একটু ত্যাড়া হলেও মনটা বেশ ভালো।
“তুমি এখান থেকে যাও মাহদীর মা। একটা কথাও আমি শুনতে ইচ্ছুক নই।”
মায়মুনা বেগম আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলেন। মাহবুব আলম বই বন্ধ করে চশমা খুলে শুয়ে পড়লেন। বুকে ভীষণ ব্যথা করছে।”
_
নাসির উদ্দিন মুখ কঠিন করে মারওয়ানকে পর্যবেক্ষণ করছে। মারওয়ানের অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই সে ব্যস্ত রোস্ট খাওয়ায়। দুপুরে শ্বশুর বাড়িতে দাওয়াত পড়েছে তার। শ্বশুর বাড়ি এত নিকটে ভাবলেই কেমন লাগে। এক তলা নিচে নেমে জামাই আদর খাও। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। মারওয়ান অবশ্য আসতে চাচ্ছিল না নিশাতই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসেছে তাকে। এসেই এই হালুম মার্কা লোকটার সামনে পড়তে হয়েছে তাকে। গত এক ঘন্টা তার দিকে গরম চোখে চেয়ে আছে। একটুও চোখ সরাচ্ছে না। এখন কি তার খাবার খাওয়ানো থামিয়ে দেয়া উচিৎ? মারওয়ান কামড়ানো লেগ পিস নাসির উদ্দিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“খাবেন?”
“তুমি কি কোনোদিন মানুষ হবেনা?”
“অমানুষ কবে ছিলাম?”
“ছিলাম আবার কি? তুমি তো এখনো অমানুষ আছ।”
“কিসের ভিত্তিতে বললেন? আপনার ভাগের ঠ্যাং খেয়ে ফেলছি সেজন্য?”
“কিসের ভিত্তিতে মানে? এখনো বোঝোনি? অমানুষ নাহলে গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে কে পাঁচ মাসের জন্য গায়েব হয়ে যায়?”
“আমি হই। আর তাছাড়া আমি তো জানতাম না সে গর্ভবতী ছিল জানলে পরে যেতাম।”
“কথাবার্তা তো একবিন্দুও চেঞ্জ হয়নি তুমি নাকি আবার তাবলীগ জামাতে ছিলে? এই তার নমুনা?”
“নমুনার এখানে কি দেখলেন? আমি তো কিছুই বলছি না। খোঁচাচ্ছেন তো আপনি, আমি কি আপনাকে খুঁচিয়েছি?”
নাসির উদ্দিন আর একটা কথাও বললেন না। উঠে চলে গেলেন। এখানে থাকলে তার মাথা গরম হয়ে যাবে। উল্টাপাল্টা কথা বলে বসতে পারেন তখন নিশাত কষ্ট পাবে। শুধুমাত্র মেয়েটার কারণে এই ত্যাদড়টাকে তিনি সহ্য করছেন নাহলে তার মেয়েকে কষ্ট দেয়ার অপরাধে কল্লাটা কেটে ফেলতেও দুবার ভাবতেন না তিনি।
নিশাত খাসির রেজালা এনে দেখল নাসির উদ্দিন নেই। মারওয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল,
“শ্বশুর আব্বার লেগ পিস খেয়ে ফেলেছি দেখে তিনি গোস্সা করে চলে গেছেন। বলেছি পেটের থেকে বের করে দেব অমনি হুটপাট করতে করতে চলে গেছেন।”
“আপনি বাবার সাথে আবারও লেগেছেন?”
“আমি একটুও লাগিনি। তিনিই লেগেটেগে চলে গেছেন।”
“লেগেটেগে চলে গেছে আর আপনি চলে যেতে দিয়েছেন? একটু শ্রদ্ধার সহিত খাওয়াতে পারলেন না? শ্বশুর জামাইয়ের সম্পর্ক কি এমন হয় ফাইয়াজের বাবা?
নিশাত নাসির উদ্দিনের রুমে এসে বলল,
“বাবা তুমি নাকি লেগ পিসের জন্য ঝগড়াঝাঁটি করেছ?”
নাসির উদ্দিন হতবাক গলায় বললেন,
“কে বলেছে? ইতরটা?”
“বাবা প্লিজ, তোমরা একটু থামবে? সারাক্ষণ কেন দুজন দুজনের পিছনে লেগে থাকো? তোমার মেয়ে জামাই হিসেবে অন্তত একটু যত্ন করো। তার অসম্মান মানে আমার অসম্মান এইটুকু বোঝো। ভালো হতে চাচ্ছে ভালো হতে দাও। সবাই ঘাড়ত্যাড়া, ত্যাড়া বলে দূরে সরিয়ে দিলে লোকটা যাবে কোথায়? আব্বা কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন এখন আবার তুমি শুরু করেছ। সেও একটা মানুষ এই জিনিসটা বোঝো অন্তত। আর তাছাড়া তোমার সাথে তো সে কখনো আগ বাড়িয়ে লাগেনা। তবুও কেন তোমরা এমন করো? স্বামী তো আমার। তার সাথে সুখী, অসুখী যাই হই তাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ এটা তো জানো; তাইনা?”
“আমার ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করে দিন।”
নিশাত বিধ্বস্ত কণ্ঠে বলল,
“বাবা প্লিজ!”
নাসির উদ্দিন মারওয়ানের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন। মারওয়ান একটু অবাক হলো। একটু আগে রাগারাগি করে এখন আবার অ্যাপায়ন করছে। অদ্ভুত তো! প্লেটে খাবার দিতে নিষেধ করল। পেট ভরে গেছে আর খাওয়া পসিবল না। মারওয়ান নাহওয়ানকেও খাইয়ে দিয়েছে এখন সে মাহদী, মাহফুজের সাথে নিচে গেছে। মারওয়ান পাতে তাকিয়ে শান্ত গলায় স্যরি বলতেই ওপাশ থেকেও স্যরি শোনা গেল। একসাথে স্যরি বলায় শ্বশুর জামাই দুজনই হতভম্ব হয়ে গেল। একটুপর দুজনের হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল।
_
মাহদী, মাহফুজ উভয়ই একটা নতুন রেস্তোরাঁ খুলেছে। নাম ‘হালাল বাঙালিয়ানা’। ইতোমধ্যে রেস্তোরাঁটি বেশ নাম কামিয়েছে। হালাল বাঙালি খাবারের বিভিন্ন আইটেম সব পাওয়া যায় এখানে। লন্ডনে এসে প্রথম প্রথম দুই ভাই হিমশিম খেয়ে গিয়েছিল। একটা অপরিচিত জায়গায় ফ্যামিলি নিয়ে থাকাটা ভীষণ কষ্টসাধ্য। মারওয়ান আর ইহাবকে তো লন্ডনের উন্নত চিকিৎসায় বেশ কয়েকদিন থাকতে হয়েছিল। ইহাব কোমায় ছিল একমাস। মানহা অবশ্য দেশে থাকতেই কয়েকদিন আইসিইউতে থেকে মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছিল। ডেলিভারির ঘা না শুকাতেই তেইশদিনের মাথায় সপরিবারে লন্ডনে চলে আসতে হলো। ফ্লাফি ও বিড়ালগুলোকে রেখে আসতে হলো বাংলাদেশে। বেশ কষ্ট হয়েছিল সবকিছু ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখতে।
মারওয়ানের মাথা, ঘাড়, হাত ও পায়ে ফ্র্যাকচারের কারণে তিনমাস বেড রেস্টে ছিল। গোসল, ওয়াশরুম সব ক্রাচে ভর দিয়ে করতে হতো। নিশাত একা হাতে তখন মারওয়ানকে সামলেছে। পরিবারের অন্যান্যরাও সাহায্য করেছিল তবে স্ত্রী হিসেবে সেবাযত্নে কোনো ত্রুটি রাখেনি সে। বেশ খরচা হয়ে গিয়েছিল সেসময়। টাকা পয়সায় টানাটানি লেগে গিয়েছিল। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া, উজান ভুঁইয়া তখন বেশ সাহায্য করেছিলেন। এখন অবশ্য আল্লাহর রহমতে সেসব কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।
__
দরজা খুলে মারওয়ানকে দেখতে পেতেই ইহাব দোয়া দুরুদ পড়ে উল্টোফিরে দৌঁড় দিতে নিয়েছিল। ঠিক তখনই মারওয়ান পিছন থেকে ডাকল,
“হাব?”
কতদিন পর হাব ডাক? ইহাব থমকে গেল। আশপাশ দুলে উঠলো কি? ইহাবের চোখমুখ প্রশান্তিতে জুড়িয়ে গেল। সে ঘুরে মারওয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুই সত্যিই নম্বর ওয়ান? আবার হাব ডাক তো?”
মারওয়ান ডাকল। ইহাব ঝাপটে ধরে মারওয়ানকে বুকে ঢুকিয়ে ফেলতে চাইল।
“কোথায় ছিলি ভাই? আমাদের কষ্ট দিতে তোর এত ভালো লাগে?”
মারওয়ান জবাব দিল না। ইহাব মারওয়ানকে ঘরে ঢুকিয়ে মানহাকে ডাকতেই মানহা ইনামকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে এসে বলল,
“কি হয়েছে?”
পাশেই বড় ভাইকে দেখে মানহা তব্দা খেল। কতদিন পর বড় ভাইকে দেখছে। সে দ্রুত এগিয়ে এসে ইনামকে নিয়েই বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরল। মারওয়ান হাত বুলিয়ে দিল বোনের মাথায়। ইনাম দুজনের মাঝে চ্যাপ্টা হয়ে চিল্লিয়ে উঠল। মানহা চোখের পানি মুছে সরে আসতেই ইহাব ইনামকে নিয়ে রুমে চলে গেল। মানহা ভাইকে টেনে সোফায় বসালো। মারওয়ান বলল,
“সেদিনের পুচকি দেখি পুরোদস্তর মা হয়ে গেছে।”
মানহা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,
“আমি কি আর পুচকি আছি?”
“হ্যাঁ পুচকির ঘরে আরেকটা পুচকি হয়েছে।”
মানহা চোখের পানি মুছে বলল,
“আমরা কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছি তাইনা ভাইয়া?”
“হ্যাঁ, সেদিনের আন্ডাবাচ্চা আরেকটা আন্ডার মাও হয়ে গেছে।”
মানহা ভাইয়ের কথায় ফিক করে হেসে বলল,
“তুমিও তো আবার বাবা হবে।”
মারওয়ান আফসোসের গলায় বলল,
“কি অদ্ভুত আমি দুটো বাচ্চার বাপ হয়ে যাচ্ছি। ভেরি স্যাড। আমাকে বয়স্ক লাগছে নাকি?”
“আলহামদুলিল্লাহ, আমার ভাইয়াকে যথেষ্ট হ্যান্ডসাম লাগছে।”
ইহাব এসে মারওয়ানের পাশে বসে বললো,
“আবারও বাপ হচ্ছিস এখন মিষ্টি খাওয়া। তুমি বাছা সবসময় পালিয়ে বাঁচো। এবার কোনো ছাড় হবেনা।”
“হাতে নাই টাকা, কেমনে খাওয়াবো মাঠা?”
ইহাব সুর দিয়ে বলল,
“মাঠায় নাই মিষ্টি
পকেটে আমার দৃষ্টি
দৃষ্টিতে তোমার টাকা
এখন বলো হাত ফাঁকা?”
এরমধ্যে কলিংবেল বেজে উঠল। ইহাব উঠে দরজা খুলে দিতেই দেখল মাহদী, মাহফুজে দাঁড়িয়ে। তাদের সাথে নাহওয়ানও আছে। হাতে ছোট্ট একটা দইয়ের বাটি। যেটা সে চামচ দিয়ে তুলে তুলে খাচ্ছে। তাকে দেখতে পেতেই ইহাব কোলে তুলে বলল,
“এই রসগোল্লা একা একা খাওয়া হচ্ছে? আমারটা কই?”
নাহওয়ান মোড়ামুড়ি করে বলল,
“ওখানে অনেক আছে। চুমু দিও না।”
নাহওয়ান মুখ লুকাতেই ইহাব মাহদী, মাহফুজের হাতের দিকে ভালোভাবে চাইল। দেখল হাত ভর্তি মিষ্টির প্যাকেটসহ আরও অনেক কিছু। এতকিছু দেখে চোখ কপালে তুলে বলল,
“কি অবস্থা? এসব কী?”
“মিষ্টি, প্যাটিস, কেক, দই।”
“এতকিছু?”
পিছন থেকে মারওয়ান বলল,
“মিষ্টির খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিলি এখন আবার নাটক করছিস কেন?”
“তুই আনতে বলেছিস?”
মারওয়ান জবাব দিল না।
মারওয়ান মানহার রুমে ঢুকেই দেখল ইনাম দোলনায় হাত, পা ছড়িয়ে বিভিন্ন শব্দ করছে। সে এগিয়ে এসে দোলনার সামনে দাঁড়াল। বাচ্চাটা তাকে দেখতে পেতেই ফিচফিচ করে হেসে বিভিন্ন শব্দ করতে লাগল। যেন কতকালের চেনা সে। মারওয়ান একটু নুয়ে বলল,
“মামা?”
ইনাম হেসে গড়াগড়ি খেল। মারওয়ান ইমামের দিকে চেয়ে বলল,
“এই বেটা, বড় হয়ে যাচ্ছিস?”
ইনাম শব্দ করে হাত বাড়িয়ে দিল। যেন বোঝাতে চাইল আমাকে কোলে নাও। মারওয়ান গম্ভীর মুখে বলল,
“এখন কোলে নেয়ার মুড নেই। নিজের পায়ে হেঁটে যেদিন আমার বাসায় যাবি সেদিন কোলে নেব।”
বলেই উল্টো ঘুরে চলে যেতে নিতেই ইনাম জোরে কেঁদে উঠল। মারওয়ান হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইনাম আরও জোরে কাঁদতে শুরু করলে মারওয়ান না চাইতেও ইনামকে দোলনা থেকে উঠিয়ে কোলে নিল। কোলে নিতেই বাচ্চাটা একদম শান্ত হয়ে তার ঘাড়ে মাথা ফেলে রাখল। মারওয়ান বিড়বিড় করে বলল,
“কি ব্যাপার বাচ্চাকাচ্চা আমার কোলে ওঠার জন্য এমন লাফায় কেন? আমার গায়ে কি চকলেট লাগানো আছে নাকি? অদ্ভুত!”
__
এশার আযান দিয়েছে। মারওয়ান ঘরের সবাইকে ওযু করে আসতে বলল। সকলে ওযু করে আসলেও মাহাবুব আলম ওযু করে মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরোতে নিলে মারওয়ান পথ আগলে বলল,
“সবসময় তো ইমামের পিছনে নামাজ পড়লে আজ এই ঘাড়ত্যাড়া ছেলের পিছনে নামাজ পড়তে আপত্তি আছে?”
মাহাবুব আলম ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলেন। সত্যিই কি এটা তার বড় ছেলে? তাকে বাবা ডাক শোনানো বড় আদরের প্রথম সন্তান? এই কথাটা শোনার জন্য সে কত বছর প্রতীক্ষায় ছিল। আল্লাহ সত্যিই তার দোয়া কবুল করেছেন? তিনি শান্ত হয়ে ছেলের পিছনে নামাজে দাঁড়ালেন। প্রথম সারিতে মাহাবুব আলম, মাহদী, মাহফুজ দাঁড়াতেই দ্বিতীয় সারিতে মায়মুনা বেগম আর নিশাত আপাদমস্তক ঢেকে এসে দাঁড়ালো। নামাজের ইকামত শুরু হতেই সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মারওয়ানের উচ্চারণ শুনল। কতটা শুদ্ধ সাবলীলভাবে ইকামত থেকে শুরু করে সূরা তেলওয়াত করেছে মারওয়ান আজাদ। এই মারওয়ান আজাদ যাকে বলে কয়েও মসজিদে পাঠানো যেতো না আর সেই ব্যক্তি আজ তাদের সকলের ইমামের দায়িত্ব পালন করেছে ব্যাপারটা অদ্ভুত সুন্দর না?
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের জন্য শিক্ষা। আজ যে অবস্থান বা পর্যায়ে সে আছে এটাই তার ভবিতব্য নয়। কিছু মানুষ জন্ম থেকেই আদর্শ নিয়ে জন্মায় আবার কেউ কেউ জঘন্যরকম খারাপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ায় কিন্তু হেদায়েত যদি একবার পেয়ে যায় সেই জঘন্য মানুষটাও হয়ে উঠতে পারে আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা। মহান রব এতই দয়ালু যে মৃত্যুর আগ অবধি তার বান্দার জন্য ক্ষমার দরজা খুলে রাখেন। ক্ষণস্থায়ী এই সময়ের মধ্যে বান্দার সমস্ত পাপ তিনি নির্দ্বিধায় ক্ষমা করে দেন যদি বান্দা অনুতপ্ত হয়ে তার নিকট ফিরে আসে। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রচলিত একটা রীতি আছে যে, যৌবনে যত পাপ করার করো বৃদ্ধ বয়সে নামাজ, হজ করলে যৌবনের গুনাহ নিমিষেই মাফ হয়ে যায়। অথচ আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় ইবাদত হলো যৌবনের ইবাদত কিন্তু সমাজ প্রচার করে উল্টোটা। আফসোস সমাজের মানুষ যদি কবর, আখিরাত, হাশর চিনতো তাহলে তারা এতটা নির্দ্বিধায় আল্লাহর অবাধ্য হতে পারতো না। বেনামাজী, বেপর্দা, উগ্র, উশৃঙ্খল, গায়ক, নর্তকী, জুয়াড়ি, নেশাখোর, ঘুষখোর, খুনি, সন্ত্রাসী, প্রতারক সবাইকেই কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সুযোগ দেন তার দিকে ফিরে আসার জন্য কিন্তু হেদায়েত পেয়ে ফিরে আসতে পারে কয়জন? হেদায়েত বড্ড অমুল্য এক জিনিস। যে পায় সে ভাগ্যবান আর যে পায়না সে হলো সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যক্তি।
কখনো কি ভেবে দেখেছি আল্লাহ তায়ালার এতটা অবাধ্যতায় প্রতিনিয়ত ডুবে থাকার পরেও আল্লাহ তায়ালা বান্দার রিযিক বন্ধ করে দেন না, পাপাচার ও অন্যায়ের নিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পরেও তিনি তাদের ধ্বংস করেও দেন না। কারণ তিনি আল্লাহ। তিনি কথায় কথায় রাগ করেন না, শাস্তি দেন না, রিযিক বন্ধ করেন না। তিনি বারবার, শতবার, লক্ষবার সুযোগ দেন তাঁর নিকট ফিরে আসার জন্য। তবুও মনুষ্যকূল অবাধ্যতা করেই যায় আর তিনি বারংবার সুযোগ দিয়েই যান। এই সুযোগ দেয়ার কারণেই চরম নিকৃষ্ট ব্যক্তিরাও হেদায়েতের আলোয় হয়ে ওঠেন যুগের শ্রেষ্ঠ মানব।
মারওয়ান আজাদ একটা অদ্ভুত চরিত্রর নাম। যে ছিল ভবঘুরে, ছন্নছাড়া, উদাসীন। যার মধ্যে দ্বীনের কোনো বুঝ ছিল না। এই সমরাঙ্গনে যে লড়ে গেছে শতবার। কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবার কখনো নিজের নফসের বিরুদ্ধে। যাকে আল্লাহ তায়ালা হেদায়েতের অমিয় সুধা পান করার তৌফিক দান করেছেন। সবাই হেদায়েত পায়না, অনেকে পেয়েও হারায় কিন্তু যারা পায় এবং মৃত্যুর আগ অবধি তা ধরে রাখতে পারে তারাই দুনিয়ার সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি।
পরিশিষ্ট
একটা আতঙ্কিত সন্ধ্যা। নিশাতের ডেলিভারি পেইন ওঠায় মারওয়ান তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। সারা রাস্তায় দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তে এসেছে। নিশাতকে অপারেশন রুমে নিয়ে গেল। তার একেকটা চিৎকারে পুরো হাসপাতাল যেন কেঁপে উঠছে। অপারেশন রুম থেকে একজন নার্স বের হয়ে এসে ইংরেজিতে বলল,
“আপনি চাইলে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে ভেতরে থাকতে পারেন। তাকে সাহস দিতে পারেন।”
মারওয়ান একটু অবাক হলো। বাংলাদেশে তো অপারেশন রুমে কাউকে ঢুকতে দেয়ার অনুমতি ছিল না। এইদেশে কি অনুমতি আছে? সে যন্ত্রের মতো রুমে ঢুকে দেখল নিশাতের চিৎকার বেড়ে গেছে। ডাক্তার মহিলাটি ইংরেজিতে বারবার পুশ করতে বলছে। নিশাত মারওয়ানকে দেখতে পেতেই কেঁদে উঠে বলল,
“ফাইয়াজের বাবা, আমি বোধহয় মারা যাচ্ছি।”
মারওয়ান এগিয়ে এসে তার শিয়রে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আল্লাহ ভরসা। একটু ধৈর্য ধরো।”
নিশাত কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। ব্যথায় শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে তার। নরমাল ডেলিভারিতে যন্ত্রণা অত্যাধিক হলেও তা সাময়িক। তবে কষ্টটা কতগুলো হাড় ভেঙে ফেলার মতো। কিছুতেই সে সহ্য করতে পারছে না এই যন্ত্রণা। নিশাতের চিৎকার বেড়ে যেতেই মারওয়ান বলল,
“আমার দিকে তাকাও।”
নিশাত চাইল মারওয়ানের দিকে। ঘামে চিকচিক করছে তার মুখমন্ডল। মারওয়ান নিশাতের হাত শক্ত করে চেপে ধীরে ধীরে বলল,
“আমাকে যেসময় তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেসময়ের কথা মনে আছে? কারেন্টের শক থেকে শুরু করে লোহার রড দিয়ে বারি দেয়া কোনোটাই বাদ রাখেনি। হাত, পায়ের আঙুলের উপরে কয়েকজন একসাথে দাঁড়িয়ে উল্লাস করতো আর বুট জুতো দিয়ে পিষতো। পায়ে রডের বারি যখন পড়তো ব্যথায় চিৎকার করতে করতে গলা বসিয়ে ফেলেছিলাম। যখন নখ উপড়ে ফেলার অর্ডার আসলো ভেবেছিলাম আমার জীবন আজই শেষ কিন্তু আল্লাহর রহমতে তিনি আমাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন। নখ উপড়ে ফেলার আগেই সেখান থেকে তিনি আমাকে মুক্ত করেছেন। জানি আমার কষ্টটা তোমার তুলনায় অনেক সীমিত তবে তুমি একজন মা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। মায়েদের এত দ্রুত হার মানলে চলে?”
নিশাতের কি হলো জানা নেই এই শব্দগুলোতে সে আবার নতুন উদ্যম খুঁজে পেল। মারওয়ানের হাত খামচে নিজেকে শক্ত করল। চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল বিরামহীন। নিজের যন্ত্রণায় না বরং এই লোকটা কতটা যন্ত্রণা সহ্য করেছে তা ভেবেই অশ্রুর এই সমাবেশ। আজকের আগে ঘুণাক্ষরেও কাউকে জানায়নি তার সেই কষ্টদায়ক টর্চারের কথা। সে নিজের ব্যথা ভুলে মারওয়ানের কষ্টে কাতর হয়ে উঠল। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে চিৎকার করতে করতে ধরিত্রীতে আগমণ ঘটল ফৌজিয়া নিশাত ও মারওয়ানের আজাদ দম্পত্তির একমাত্র কন্যা ও ফাইয়াজ নাহওয়ানের একমাত্র বোনের।
লাল টুকটুকে তুলতুলে একটা শিশুকে মারওয়ানের হাতে তুলে দিতেই তার এতক্ষণের বুক দরফরানি কমে এল। ইশ বাচ্চা প্রসব করা কত কষ্টের! এজন্যই বাবার থেকে একজন মায়ের সম্মান ইসলামে সর্বাধিক। কতটা যন্ত্রণা সহ্য করে একজন নারী পুরুষদের বাবা ডাক শোনায়। প্রত্যেকটা পুরুষের এই একটা কারণেই তো প্রত্যেকটা নারীকে মাথার তাজ বানিয়ে রাখা উচিত। মারওয়ানের কোল থেকে শিশুটিকে নিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিশাতের বুকের উপর দিল। চিল্লাতে চিল্লাতে নিশাতের গলা ভেঙে গেছে। মারওয়ান স্ত্রী, কন্যার পাশে বসে উভয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ।”
এরপর কন্যার কানে আজান দিল উচ্চস্বরে।
নিশাতকে একটা কেবিনে শিফট করতেই পরিবারের সকলে দেখা করল তার সাথে। ফাইয়াজ তো বাবুকে পেয়ে মহাখুশি। তাদের পরিবারে একটা ছোট্ট বাবু এসেছে। সেও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানালো। বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করার দিন এসে গেছে। বাবার কোলে থাকা ছোট বাচ্চাটার মাথায় চুমু খেতেই বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। ফাইয়াজ বলল,
“কাদছ কেন? ভাইয়ু আদর করেছি তো? ওয়েলকাম প্রিন্সেস।”
নিশাত ক্লান্ত হয়ে বেড়ে শুয়ে আছে। মারওয়ান কন্যা সন্তান হওয়ার খুশিতে, মা এবং শিশু উভয়ের সুস্থতার কারণে শুকরিয়া নামাজ পড়ে এসেছে। কেবিন থেকে সকলে চলে যেতেই মারওয়ান বিধ্বস্ত নিশাতের মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“দিনশেষে আল্লাহ তায়ালা আমাদের সুখী করেছেন তাইনা ফৌজিয়া নিশাত?”
নিশাতের বিগত দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আল্লাহর কাছে সে দ্বীনদার স্বামী চেয়েছিল, স্বামীর মুখে তেলওয়াত শুনতে শুনতে ঘুমোতে চেয়েছিল, স্বামীর পিছনে নামাজ আদায় করতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাকে কোনোটা থেকেই বঞ্চিত করেননি। বরং এর থেকেও বেশি দিয়েছেন। জীবনে বহু পরীক্ষায় ফেললেও বান্দার চোখের সেই পানির মূল্য তিনি দিয়েছেন। কতই না মহান আমাদের সেই রব! মানুষ কিভাবে পারে সেই মহানুভব রহমানুর রহিমের অবাধ্য হতে? সুবহানআল্লাহ!
“উপন্যাসের পৃষ্ঠাগুলো সব ধূসর অঙ্গন,
হাসি কান্না মিলিয়ে তারই নাম ভবঘুরে সমরাঙ্গন।”
সমাপ্ত
( দীর্ঘ একবছরের জার্নির সমাপ্তি ঘটল। আনাড়ি, অগোছালো লেখার এখানেই সমাপ্তি। একটা দীর্ঘ উপন্যাসের শেষ। ভবঘুরে সমরাঙ্গন উপন্যাসের সমাপ্তি। কতটা লিখতে পেরেছি জানি না তবে চেষ্টা করেছি এইটুকু বলতে পারব। পরিশেষে এতদিন এই অগোছালো লেখার সাথে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য সবাইকে ভালোবাসা অবিরাম। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৩+৫৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৫+১৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৫+৩৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (৫৯.১+৫৯.২+৫৯.৩)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১১+১২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)