ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৭০.২
তাজরীন ফাতিহা
আসমান আজ লাল শামিয়ানা টেনেছে। রক্তিম গোধূলি কোলাহলপূর্ণ মৃদুমন্দ বাতাসে মিশে গেছে। নিশাতের কাছে মনে হচ্ছে চারিপাশ অদ্ভুত নিস্তব্ধে থম মেরে আছে। এমনটা মনে হওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই তবে তার কেন এমন মনে হচ্ছে? আকাশ এমন টকটকে রঙে সেজেছে কেন? মনে হচ্ছে রক্ত সব শুষে নিয়েছে অদূরের আকাশটা। মাগরিবের আজান পড়তেই ওযু করে নামাজ আদায় করল সে। নাহওয়ানও এখন তার সঙ্গে নামাজ পড়ে। সূরা ফাতিহা অর্ধেক পারে। ওটুকুই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তে থাকে। নিশাতের ইচ্ছে ছেলেকে আরবী শিখাতে শিক্ষক রাখবে। মারওয়ানকে বলে দেখতে হবে। নিশাত জানে লোকটা না করবে না। উপরে উপরে কঠিন হয়ে থাকলেও ভেতরটা একদম তুলোর মতো নরম। কদিন যাবত তার সাথে মোলায়েমভাবে কথা বলেছে। বিষয়টা নিশাতকে আনন্দ দিলেও খটকা লেগেছে প্রচুর। হঠাৎ এমন আচরণের কারণ খুঁজে পায়নি সে। হয়তবা সংসারে মনোযোগী হচ্ছে।
নিশাত রাতের রান্না করার জন্য সবজি কাটতে বসল। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে হুট করে আঙুলের মাথা কেটে গেল। রক্ত টপটপ করে ফ্লোরে পড়তে লাগল। নিশাত ব্যথায় মুখ কুঁচকে আঙুল চেপে ধরে আছে। নিশাতের আঙুল থেকে রক্ত পড়তে দেখে নাহওয়ান এগিয়ে এসে বলল,
“মা রক্ত?”
নিশাত জবাব না দিয়ে রক্ত বন্ধ করতে চাইল। যখন দেখল রক্ত পড়া কোনোভাবেই থামছে না তখন ছেলেকে বলল,
“বাবা আলনার নিচে একটা পুরাতন ওড়না আছে। নিয়ে আসো তো।”
নাহওয়ান মাথা দুলিয়ে দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসল। নিশাত ঝটপট একটু চা পাতি, সরিষার তেল দিয়ে বাম হাতের বুড়ো আঙুলে ওড়নার কিছু অংশ ছিঁড়ে পেঁচিয়ে বাঁধল। ব্যথায় জ্বলছে জায়গাটা। আজকে হাত, পাও অস্বাভাবিক রকম কাঁপছে। কি যে হয়েছে তার কিছুই বুঝতে পারছে না। বুকটা কেমন যেন করছে। হঠাৎ এমন অদ্ভুত লাগার কারণ কি? সে দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করল সব যেন ঠিকঠাক থাকে। দোয়া, দুরুদ শেষে আবার কাজে মনোযোগী হলো।
জরুরী ভিত্তিতে মাহাবুব আলমের পরিবার স্কয়ার হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছে। চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসতে ঘণ্টা চার লেগেছে। সেই বিকেল নাগাদ খবর পেয়েছিল এখন বাজে রাত সাড়ে নয়টা। তখন মাহাবুব আলম ফোন করে জেনেছেন, আহত ব্যক্তির ফোন থেকে এই নাম্বার পেয়ে কল দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই কাছের কেউ হবে দেখেই ফোনে নাম্বার ছিল। মাহবুব আলম আর একমুহুর্ত না দাঁড়িয়ে রওনা হয়েছেন। তবে মানহাকে আনার কোনো ইচ্ছে তাদের ছিল না। মেয়েটা এত অস্থির আর অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল না এনে উপায় ছিল না। এই অবস্থায় বেশি চাপে রাখাও উচিত না। না নিয়ে গেলে চিল্লাচিল্লি করছিল। উত্তেজিত হয়ে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলছিল। তাই নিরুপায় হয়ে সঙ্গে আনতে হয়েছে।
মাহাবুব আলম হাসপাতালে এসে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাদেরকে একটা কেবিনে নিয়ে আসা হলো। কেবিনে ঢুকে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। ইহাবের মুখে অক্সিজেন মাস্ক দেয়া। হাত, পায়ে ব্যান্ডেজ। মানহা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। শরীর ভেঙে আসতে চাইছে তার। পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়া শুরু করেছে। মানহার সেদিকে খেয়াল নেই ইহাবের কাছে আসতে নিলে মায়মুনা বেগম বাধা দিয়ে মাহাবুব আলমকে আতঙ্কিত গলায় বললেন,
“শুনছেন, রক্ত পড়ছে দেখুন।”
একজন নার্স চিৎকার করে বললেন,
“আশ্চর্য আপনারা প্রেগনেন্ট মাকে কেন এখানে এনেছেন?”
মাহদী রাগারাগি করা শুরু করল। দ্রুত ডাক্তার ডেকে আনতে বলল। নার্স ইমিডিয়েটলি মা ও শিশু স্বাস্থ্য ইউনিটে যোগাযোগ করলেন। মানহা ইহাবের দিকে চেয়েই রইল। নিজের ব্যথা থেকে ওই বেডে শুয়ে থাকা পাষণ্ড পুরুষটির অবস্থা তাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করছে। তাকে কিছু না বলে কিভাবে শুয়ে আছে দেখ? একটুও মায়া দয়া লাগেনি স্ত্রী আর অনাগত সন্তানের প্রতি? কিভাবে পারল তিন তিনটা দিন ফোন বন্ধ করে দূরে থাকতে? মানুষ এতটা স্বার্থপর কি করে হতে পারে? এখন কিভাবে পাষণ্ডের মতো শুয়ে আছে দেখ? মানহাকে দুজন নার্স ধরে স্ট্রেচারে শুইয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মানহা ডেলিভারি পেইনের অসহ্য যন্ত্রণায় নাকি মনের তীব্র বেদনায় চিৎকার করে বলে উঠল,
“বাবা ঐ লোককে বইলো আমি মরে গেলে যেন আমার কবরের ত্রিসীমানায় না আসে। আমি কোনো পাষণ্ডের মুখ দেখতে চাইনা। আমার সন্তানকে যেন সে না ছোঁয়। স্বার্থপর, পাষণ্ড, অভদ্র লোক! তাকে জিজ্ঞেস কইরো কেন আমার মনে আঘাত দিয়েছে? কে পারমিশন দিয়েছে তাকে? তাকে বলিনি আমার কাছে সহিসালামতে ফিরে আসতে? কেন আসেনি জিজ্ঞেস কইরো।”
নার্সরা তাকে থামতে বললেও মানহাকে থামানো গেল না। সে উন্মাদ হয়ে গেছে। ছটফট করতে করতে পেট চেপে ধরল। দ্রুত মানহাকে ডেলিভারি রুমে শিফট করলেন। মানহা কেবিনে ঢোকার আগে বাবার হাত শক্ত করে চেপে ধরে অশ্রু ফেলতে ফেলতে বলল,
“আব্বা, উনি ফিরবে তো?”
মাহাবুব আলমের চোখ ছলছল করছে। একটু আগে কত কথা বলল এখন আবার স্বামীর খোঁজ করছে। তিনি নিজেকে শক্ত করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ফিরবে। তুমি তোমার সন্তান নিয়ে সুস্থভাবে ফিরলেই সে ফিরবে। চিন্তা করে না আম্মা, আল্লাহকে ডাকো।”
মানহা সীমাহীন ব্যথায় ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করা শুরু করেছে। গাইনী ডাক্তার এসে দ্রুত ডেলিভারি রুমে ঢুকলেন। মাহাবুব আলম, মায়মুনা বেগম, মাহদী সকলে চিন্তায় দম আটকে রেখেছে। মাহাবুব আলম হঠাৎ মনে করার ভঙ্গিতে ইমতিয়াজ ভুঁইয়াকে ইহাবের কথা জানালেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া পুত্র ও পুত্রবধূর অবস্থা শুনে আর এক মুহুর্ত দেরি না করে রওনা হয়েছেন।
__
নিশাত নাহওয়ানকে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। নাহওয়ান মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে খাচ্ছে। নিশাত ছেলেকে খাবার খাওয়ার আদব, দোয়া সব শিখাচ্ছে। নাহওয়ান মনোযোগী হয়ে মায়ের কথা শুনছে। নিশাত মুখে এক লোকমা দিয়ে বলল,
“খাবার খেতে হয় দস্তরখানা বিছিয়ে আদবের সহিত। বিসমিল্লাহ বলে খাবার মুখে তুলতে হয় এরপর আলহামদুলিল্লাহ বলে খাবার শেষ করতে হয়।”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। সেও এখন বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে খাবারের আদব রক্ষা করে। আজকে বাচ্চাটা প্রথমে খেতে চাচ্ছিল না মারওয়ানের সাথে খাবে বলে। কিন্তু রাত বেশি হবে বলে ছেলেকে আগে ভাগেই খাইয়ে দিচ্ছে নিশাত। সে মারওয়ানের পছন্দের গরুর গোশত কষা করেছে। লোকটা গরুর গোশত কষা খেতে চাচ্ছিল অনেকদিন থেকে। ছেলের মুখে লোকমা তুলে দেয়ার সময় ফোন বেজে উঠল তার। নিশাত উঠে দেখল মাহাবুব আলম ফোন করেছেন। নিশাত ফোন রিসিভ করে সালাম দিতে না দিতেই ওপাশ হতে মাহাবুব আলম উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
“মা, আজাদ কি বাসায়?”
নিশাত বলল,
“নাতো আব্বা, কেন?”
“ফোন দিচ্ছি ধরছে না। বিকেলে ফোন দিলাম বেজেছে ঠিকই কিন্তু ধরেনি। সন্ধ্যার সময় দিয়ে দেখি ফোন বন্ধ। এখনো দিলাম ফোন বন্ধই বলছে।”
নিশাত অবাক হলো। মারওয়ান আগে ফোন বন্ধ রাখলেও ইদানিং রাখেনা। ফোন দিলেই পাওয়া যায় তাহলে ফোন বন্ধ বলছে কেন? সে বলল,
“আচ্ছা আব্বা আমি ফোন দিয়ে দেখি। টেনশন করবেন না।”
“শোন, আমরা ঢাকায়। জামাই এক্সিডেন্ট করেছে এজন্য এসেছি। আবার মানহার পেইনও শুরু হয়েছে। একটু আগে ডেলিভারি রুমে নেওয়া হয়েছে ওকে।”
“কি বলেন! আমাদের জানাননি কেন?”
“সেটাই তো জানাতে চাচ্ছিলাম, আজাদ ফোন ধরেনা তো।”
“আমি দেখছি আব্বা।”
নিশাত কল কেটে দ্রুত মারওয়ানের নাম্বারে ফোন দিল। ওপাশ থেকে সুরেলা গলায় কেউ একজন বলল,
“আপনার নাম্বারটি এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সংযোগ হচ্ছে না, অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন।”
নিশাত ফোন কেটে আবারও ডায়াল করল। একই রেজাল্ট। তার বেশ চিন্তা হচ্ছে। ঘড়ির কাটা দশটা বেজে চল্লিশ মিনিটে। প্রায় এগারোটার পথে ঘড়ির কাটা। এখনো লোকটা বাসায়ও আসছে না আবার ফোনও বন্ধ বলছে। তার কেমন যেন অস্থির লাগছে। চিন্তিত হয়ে ছেলেকে ভাত খাইয়ে আবারও ফোনে ট্রাই করল কিন্তু ফলাফল শূন্যই। কি করবে বুঝতে না পেরে আবার জায়নামাজ বিছাতে লাগল। এশার নামাজ আগেই পড়েছে এখন আল্লাহর কাছে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া করবে মানহা, ইহাব আর মারওয়ানের জন্য। কারো যেন খারাপ সংবাদ শুনতে না হয়। প্রত্যেকেই যেন সহিসালামতে থাকে।
_
ওদিকে ঠিক রাত এগারোটার সময় ধরণীর বুকে আগমণ ঘটলো চেয়ারম্যান বাড়ির উত্তরসূরির। আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে জানান দিল তার আগমন ঘটেছে। সদ্য জন্মানো শিশুটি জানতেও পারল না তার পিতা, মাতা উভয়ই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রহর গুনছে। মানহার অতিরিক্ত ব্লিডিংয়ের কারণে তাকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ তে ভর্তি করা হয়েছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া পুত্রবধূকে আইসিইউতে ভর্তি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা না করলেও চলবে। তিনি ছেলে ও ছেলের বউয়ের হাসপাতালে ভর্তির সমস্ত খরচসহ যাবতীয় সবকিছু বহন করছেন।
মায়ের কিছু জটিলতার জন্য সন্তানকেও NICU তে শিফট করেছেন গাইনি ডাক্তার। শিশুটিকেও এক্সট্রা কেয়ারে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেহেতু ডেলিভারি ডেটের আগেই বাচ্চা পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়ে গেছে তাই কিছু এক্সট্রা কেয়ারে বেবিকে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাচ্চার শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
একজন নার্স এসে জানালেন পুত্র সন্তান হওয়ার সুসংবাদ। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া, উর্মি ভুঁইয়া, মাহাবুব আলম, মায়মুনা বেগম, মাহদী সকল একযোগে আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন। নার্স এও বললেন বাচ্চাকে দুইদিন অবজারবেশনে রাখার জন্য NICU তে রাখা হয়েছে। মাহাবুব আলম উদ্বিগ্ন গলায় মেয়ের কথা জানতে চাইতেই নার্স জানালো মায়ের কন্ডিশন ভালো নয়। অতিরিক্ত রক্তপাত (Postpartum hemorrhage, PPH) এর কারণে তাকে ICU তে নেয়া হয়েছে। প্রার্থনা করতে বলে সে চলে গেল। মায়মুনা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মাহদী মাকে আগলে নিল। বোনটার জন্য বুকটা তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। ভগ্নি, ভগ্নিপতি উভয়ের অবস্থাই শোচনীয়।
দিনটা ১৭ই আগস্ট, ২০২৩ অর্থাৎ ২ ভাদ্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ। দীর্ঘ সাড়ে নয়মাসের তীব্র অপেক্ষার পর ইহাব ভুঁইয়া ও মানহা আফরিন দম্পত্তির কোল আলো করে ছোট্ট ভুঁইয়ার আগমন ঘটলেও কেউ তার আগমনে খুশি হতে পারল না। সন্তানের আগমনের প্রহর গোনা সেই হতভাগ্য পিতা, মাতা তাকে একবার ছুঁয়েও দেখতে পারল না।
__
নিশাত আজকে অনেকক্ষণ মোনাজাত করল। কোনো খারাপ সংবাদ যেন না আসে এজন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ জানালো। মোনাজাত শেষ হতে না হতেই ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই মাহবুব আলম মানহার পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলেন কিন্তু মানহার অবস্থা শোচনীয় জানালেন। নিশাত কোনোদিন মাহাবুব আলমকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখেনি। মেয়ে ও মেয়ে জামাইয়ের এই অবস্থায় তিনি বেশ ভেঙে পড়েছেন। কন্ঠনালী কাঁপছে তার। নিশাতেরও কান্না এসে গেল। আজকের দিনটা কেমন যেন শোকের লাগছে তার কাছে। চারপাশ থেকে শুধু খারাপ সংবাদই আসছে। তার উপর মারওয়ান ফোন ধরছে না। কতগুলো টেনশনে নিশাত অস্থির হয়ে আছে।
ফোন রাখতে না রাখতেই হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। নিশাত মারওয়ান ভেবে তড়িঘড়ি করে এল দরজা খুলতে। পিপহোলে চোখ রাখতেই মুখ চুপসে গেল তার। অচেনা দুজন লোক দাঁড়িয়ে। আবারও দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হতে নিশাত পুরোদস্তর খিমারে আবৃত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কে?”
“জি এটা সাইফার সাহেবের বাসা না?”
“আপনি কে?”
“আমি সাইফার সাহেবের কলিগ। এজেন্ট নেওয়াজ শাবীর আর আমার সাথে আছেন এজেন্ট জিনান আদহাম। দয়া করে দরজাটা একটু খুলুন।”
নিশাত চিন্তিত হয়ে বলল,
“উনি তো বাসায় নেই।”
“জি আমরা তার বিষয়ে কথা বলার জন্যই এসেছিলাম।”
নিশাত দুরুদুরু বুকে খিমার দিয়ে মুখ ঢেকে দরজা খুলতেই দুজন লোক ঢুকে দরজা আটকে দিল। নিশাত যথাসম্ভব দুরত্বে দাঁড়িয়ে রইল তার বেশ ভয় করছে। এই বারোটার সময় এরা এখানে কেন এসেছে? দুজনের মধ্যে একজন বলল,
“ম্যাম আপনি ভয় পাবেন না। প্লিজ রিল্যাক্স থাকুন। আমি নেওয়াজ। সাইফার সাহেবকে কিছু লোক ধরে নিয়ে গেছেন। যতদূর আমরা খবর পেয়েছি তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর লোক।”
নিশাত উত্তেজিত হয়ে বলল,
“কি বলছেন এসব? তাকে কেন ধরে গেছে?”
“সে আর মুনতাজির সাহেব উভয়ই অনেকদিন ধরে সেই মন্ত্রীর গোপন তথ্য জোগাড় করেছিল। সেদিন ঐ মন্ত্রীর সকল অনৈতিকতা সংবাদপত্রে ছাপানো হলে সাইফার এবং মুনতাজির সাহেবকে তারা টার্গেট করে। আমাদের ধারণা মুনতাজির সাহেবকে এক্সিডেন্ট করানোর পেছনে সেই মন্ত্রীর হাত আছে। সাইফার সাহেবকে আজকে অফিসে সিভিল ড্রেসে এসে ইমারজেন্সি কথা বলে তুলে নিয়ে যায়। তাকে এত সহজে তারা ছাড়বে না। বারংবার সরকার পক্ষ থেকে নিষেধ করার পরেও সাইফার সাহেব সীমালংঘন করে তাদেরকে পাগলা কুকুর বানিয়ে দিয়েছে। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের পক্ষে ছিল আজারাক সাইফার। সরকারি লোক হয়েও তার স্পর্ধায় উপর মহল ক্ষিপ্ত ছিল। এতদিন ধরে এই দিনটার অপেক্ষাই তারা করছিল।”
নিশাত আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দাঁড়ানো থেকে বসে গেল। মুখ দিয়ে কোনো টুশব্দ বের হচ্ছে না তার। কথায় আছে, ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’। নিশাতের দশাও ঠিক তাই হয়েছে। জিনান এপর্যায়ে মুখ খুলল,
“প্লিজ ম্যাম শান্ত হন। আমরা দেখছি।”
দরজায় আবারও কড়া নাড়ার শব্দে জিনান গেট খুলে দিতেই দুজন মহিলা প্রবেশ করল। একজন ইনাবা আরেকজন ইরা। নিশাতকে এভাবে বসে থাকতে দেখে দুজন দ্রুত এসে তাকে ধরল। জিনান বলল,
“ইরা, রুবানা ম্যামকে দেখো। “
তারা মাথা নাড়াতেই জিনান এবং নেওয়াজ দ্রুত বেরিয়ে গেল। নিশাত একটা পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। আশেপাশের কোনো শব্দ তার শ্রবণেন্দ্রিয়ে ঢুকছে না। বুকের পাঁজর ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবে কি সেদিনের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথে? ইস্তেখারা সত্য হওয়ার দিন এসে পড়েছে? আচমকা নিশাত বাঁধনহারা কান্নায় ভেঙে পড়ল। ইরা তো তার এমন দশা দেখে কেঁদেই দিল। ইনাবা যতই শক্ত থাকতে চাইছে পারছে না। শুধুমাত্র প্রফেশনের জন্য নিজেকে শক্ত রাখছে। ভাই, ভাবির শোচনীয় অবস্থার কথাও জেনেছে। কিন্তু কাজ ফেলে যেতে পারেনি একবারও দেখতে। তার উপর সাইফার স্যারও নিখোঁজ। তারও বুক ভেঙে কান্নারা বেরিয়ে আসতে চাইছে। হঠাৎ নিশাত গগনবিদারী এক চিৎকার দিয়ে ‘আল্লাহ’ বলে ডেকে উঠল। যেন সেই আওয়াজ আরশে আজিম পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৭+৪৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪১+৪২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৭+৩৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৯
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৪