বেলতুলি – [২৩]
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
–“কী হচ্ছে এখানে?”
মৌনো বিমূঢ় হয়ে গেল পরিচিত, পুরুষালি ভরাট কণ্ঠস্বর শুনে। সে তৎক্ষনাৎ পিছে ফিরে তাকাল। মুহূর্তেই টুপ করে মৌনোর চোখের এক ফোটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়াল। অবিশ্বাস্য চোখে দেখল। নিবিড়!? নিবিড়ের চোয়াল শক্ত। সে স্থির নজরে মৌনোর লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখল। পরপর শক্ত চোখে তাকাল ছেলেটার দিকে। ছেলেটা আমতা আমতা করল,
–“আসলে আমি ওনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
–“কথা বলতে চাচ্ছিলেন কেন অচেনা অজানা মেয়ের সাথে? কমনসেন্স কিংবা ম্যানারস নেই? কোন সাহসে আমাদের বাড়ির মেয়ের হাত ধরে টান দিয়েছেন আপনি? হাতটা ভেঙে দিলে বুঝি ব্রেইন খুলবে??”
ছেলেটা নিজের পক্ষে কৈফিয়ত দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। এতে বিশেষ লাভ হলো না। নিবিড়ের ঝাঁঝাল, রুক্ষ কণ্ঠের সাথে সে পেরে উঠল না। একেই হয়তো বলে, পুরুষে পুরুষে তফাৎ, ভেদাভেদ। কেউ সুপুরুষ, আর কেউ-বা কাপুরুষ! ঝামেলা বেঁধে যেতেও খুব একটা সময় লাগল না। শীতল পরিবেশ গরম হয়ে গেল নিবিড়ের চেঁচামেচিতে। সেই মুহূর্তে ঘটনা দেখতে ধীরে ধীরে বড়োরা জড়ো হলো। এই পরিস্থিতি দেখে মৌনোর মুখ ছোটো হয়ে গেল। সে নিবিড়কে থামাতে চাইল। নিবিড় তাকে চোখ রাঙাল,
–“কিপ কোয়াইট, মৌনো। তোকে এর মাঝে বাম হাত ঢোকাতে বলিনি।”
মৌনো নিভে গেল, সরে দাঁড়াল। ইয়ামিন এসে নিবিড়কে প্রশ্ন করল কী হয়েছে। নিবিড় কোনো কিছুর লাগাম ছাড়াই বলে উঠল,
–“এই রাস্কেলটা মৌনোর সাথে খারাপ আচরণ করার চেষ্টা করছিল। আমি না দেখলে কি হতো?”
বাড়ির মেয়ের ওপর খারাপ নজর পড়েছে, এ কী আর চারটে খানেক কথা? স্বভাবতই ইয়ামিন এবং ইয়াসীনেরও ক্ষেপে যেতে সময় লাগল না। ইয়াসিন তখনই কনের বাবাকে কল লাগাল। ভদ্রলোক কল রিসিভ করতেই নরম সুরের বদলে ইয়াসীন গলা উঁচিয়ে বলল,
–“আপনাদের ছেলে সাকিব যে একটা চরিত্রহীন তা কী আপনারা জানেন?”
সাকিব নামের ছেলেটি সম্পর্কে কনের চাচাতো ভাই হয়। ইয়াসিনকে ক্ষেপে গিয়ে উলোট পালোট বলতে দেখে বড়ো মামা কল কেড়ে নিলেন। তিনি নিজে গলা শক্ত রেখেই ভদ্রভাবে কথা বলতে লাগলেন। একটা সামান্য হাত ধরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিয়ে বন্ধের উপক্রম। ইয়ামিন বলছে এমন বাড়ির সাথে সে সম্পর্ক জুড়বে না।
কনের বাবা বড়ো মামার মুখে ঘটনা শুনে ভীষণ লজ্জিত হলেন এবং তখনই বাকিদের নির্দেশ দিলেন সাকিবকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে। এরপর তারা নিজেদের মতো করে বিচার করবেন। বড়ো মামা এক বাক্যে মেনে নিলেও ইয়ামিন, ইয়াসিন এই সিদ্ধান্তে নাকচ করেন। তারা পা-হাত না ভেঙে এই ছেলেকে ছাড়বে না। সাথে মানহানির মামলাও দিবে। বড়ো মামার পুলিশে পরিচিত বন্ধু আছে, উচ্চ পদে। এমনকি নিবিড়ের রিটায়ার্ড বাবাও আছে। লেজ গুটিয়ে পালাবে কোথায়? কত বড়ো সাহস, তাদের ঘরের মেয়ের সাথে অসভ্যতামির চেষ্টা করা হয়! তাদের যেমন নামডাক আছে, তেমনই ঘরের মেয়েরা তাদের জন্য একেকজন সোনার টুকরো। সামান্য আঁচড় লাগলেও তারা অস্থির হয়ে পড়েন।
সাকিব এদের মধ্যে পড়ে তার মুখ প্রায় রক্তশূন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য হাতই ধরেছিল মেয়ের। সেখানে এত বড়ো গণ্ডগোল বেঁধে গেছে। ছাড় পাওয়ার বদলে হাত-পা ভাঙার কথা উঠছে। সে তার সাথে আসা কাজিনদের খপ্পরে পড়ে ক্ষমা চাইলো তার কাজের জন্য। তাতে কোনো লাভ হলো না। মৌনো একপাশে কাঁপছে। সবচেয়ে অস্থির এবং বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। রিমঝিম তাকে শক্ত করে আগলে রেখেছে বুকে। এক ইঞ্চিও ছাড়ছে না। অবশেষে সব মিটমাট হলো। ইয়াসিন মামারা সাকিবকে সাবধান করলেন তারা যেন তাকে এই বাড়ির ত্রি-সীমানাতেও না দেখেন। সাকিব মেনে নিল। যাওয়ার সময়ে নিবিড় তাকে পিছুডাক দিল। পরপর সাকিবের গালে তার হাতের শক্ত চটকনা পড়ল। পরপর দুটো। সাকিবের মনে হলো তার মাড়ির দাঁত খুলে পড়ার উপক্রম, অবশ হয়ে গেছে ব্যথায়।
নিবিড় কপালের রগ ফুলিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“সামনে থেকে কোনো মেয়ের দিকে তাকানোর আগে এই চড়গুলোর কথা মনে করবি। তাও যদি মনে না থাকে, নিবিড়কে মনে রাখিস।”
সাকিবরা চলে গেল। এত বিপত্তির মাঝে প্রতিবারের মতো মৌনো আবারও নিজেকে দোষারোপে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে বরাবরই নিজের এই অতিরিক্ত রূপ নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগে, ঝামেলা লাগলেই সে নিজেকে দোষারোপ করে, নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এটা তার মস্তিষ্কে বিরাট প্রভাব ফেলেছে বহু আগেই। সে বারবার এই সৌন্দর্যকে অভিশাপ দাবী করে। এই অভিশাপে আজ তার ছোটো মামার বিয়েটাও ভাঙার উপক্রম। ওরা কী ভাববে? মৌনো বোঝা, তাকে দাওয়াত করাটা ভুল হয়েছে? নাকি তার সাজগোছ করা ঠিক হয়নি? নাকি এই মুহূর্তে মেহমানদের সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা তার উচিত হয়নি? সে তার কোন দিকটার খুঁত ধরবে? সে কীভাবে তাদের কাছে ক্ষমা চাইবে? মৌনো অনুভব করল তার প্যানিক উঠছে, তার কম্পন আগের থেকে একটু বেশিই অনুভব করল রিমঝিম। রিমঝিম বেশি না জানলেও মোটামুটি মৌনোর এই ট্রমা সম্পর্কে অবগত। আগে থেকেই কোনো সমস্যা হলে সেই মৌনোকে সামলে রাখে। এখনো সে মৌনোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদু স্বরে বলল,
–“এখানে তোর দোষ নেই। শান্ত হ, বোন আমার। প্যানিক করিস না।”
মৌনো নীরব রইলো। তার চোখের পানি যাতে কেউ না দেখে ফেলে তার জন্য রিমঝিমের কাঁধে চোখ ডুবাল। কেউ লক্ষ্য না করলেও নিবিড় মৌনোকে দেখল। মৌনোর হাতের দিকে তাকাল সে। সে বারবার হাত মুঠিবদ্ধ করছে, নাড়াচ্ছে। যেমনটা সে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করার সময়ে করে থাকে। বাকিরা একে একে চলে গেল। মৌনো বহু কষ্টে নিজেকে সামনে একপাশে চুপ করে বসে রইলো। রিমঝিম তখন ছুটেছে বাবা-মাকে দেখতে। তারাও মৌনোর ব্যাপারে যে চিন্তিত, সেটা ধারণা করা যাচ্ছে। মৌনোর একাকি সময়ে সে পাথর চোখে হাতের সাদা চুড়ি গুলো দেখতে লাগল। গুণে দেখেছে ডজন চুড়ির তিনটে চুড়ি নেই। কী ভেবে সে ভাঙা চুড়িগুলো আবারও খুঁজতে গেল একই জায়গায়। সে ভাবতে চায় না তার প্রিয় চুড়িগুলোকে কেউ পায়ের নিচে পিষেছে। এটা তার পছন্দের জন্য চরম অসম্মানের। ভালোবাসার জিনিসের চরম অসম্মানটা হোক, তা সে চায় না।
চুড়ি খোঁজার মুখে নিবিড়ের মুখোমুখি পড়ল সে। মৌনো দুই ধাপ পিছিয়ে যায়, যা নিবিড়ের ঈগল চোখ এড়াল না।
–“প্রোগ্রামে না থেকে ছন্নছাড়ার মতো এখানে কী করছিস?”
মৌনো আমতা আমতা করল। চট করেই কথা গোছাতে পারল না। সে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ল,
–“আপনি এখানে কী করছেন?”
–“ইয়ামিন মামা টেনে আনল, সে কীভাবে যেন আমার কলোনির আশেপাশে দেখে ফেললেন।”
মৌনো বুঝল নিবিড় আজ অবসর আছে, তাই তো এখানে চলে এসেছে।
–“কথা ঘুরাস না, এখানে কী করছিস?”
মৌনো কিছুটা দমে গেল। গলা নামিয়ে বলল,
–“ভালো লাগছিল না তাই হাঁটাহাঁটি করছি।”
–“তুই জানিস তুই মিথ্যে বলতে পারিস না?”
মৌনো চুপ করে গেল। মুখ বন্ধ থাকলেও চোখের বিরতি নিল না। আবছা আলোয় ঘাসের ওপর ভাঙা চুড়িগুলো নীরবে খুঁজে যাচ্ছে। নিবিড় তার নজর উপলব্ধি করতে পারল না। সে দুই ধাপ এগিয়ে এলো। শক্ত গলায় কিছুটা নমনীয়তা ঢেলে বলল,
–“মৌনো, লুক এট মি।”
মৌনো মাথা তুলে তাকাল। মুহূর্তেই তাদের চোখে চোখ পড়ল। মৌনোর বুকের বা পাশে কম্পন হলো, যা প্রতিটি প্রেমিকা মনেরই হয়।
নিবিড় ধীরে-সুস্থে বলল,
–“এখানে সবাই তোর আপন।”
মৌনোর নিবিড়ের এই কথাটুকু বুঝতে বেগ পেতে হলো না। সে নিবিড়ের ইশারা, ইঙ্গিত কথার মাঝে ঢের বুঝতে পারে। নিবিড় কথা বলে অল্প, তবে তার কথার গভীরতা অনেক। নিবিড় তাকে স্পষ্ট বোঝাতে চাচ্ছে, এই ঘটনার জন্য সে দায়ী নয়। বরং তার বিপদে সবাই তার পাশে দাঁড়িয়েছে, সামনেও দাঁড়াবে। আপনরাই তো একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, একে অপরকে সঙ্গ দেয়। মৌনো অনুভব করল আবারও তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সে বারবার পলক ফেলে সেই ঝাপসা অশ্রুগুলো আটকাল। প্রিয় পুরুষের এই চারটে শব্দতে সে এতটা আহ্লাদ অনুভব করছে কেন? কই, নিবিড়ের কথাতে তো সে আগে কখনো আহ্লাদী হয়ে পড়েনি। এখনই কেন? প্রেমে পড়েছে বলে?
নিবিড় থেমে আবারও শক্ত গলায় বলল,
–“এতে তোর দোষ নেই। খবরদার উলটো পালটা কিছু মাথায় আনবি না। যা ছোটো ব্রেইন তোর, দেখা যাবে কু(১)ত্তা এসে তোর গায়ে ঘেউঘেউ করে গেলেও নিজের দোষ খুঁজবি। স্টুপিড একটা।”
মৌনো ঠোঁট চেপে হাসল, বুঝতে দিল না সে হাসছে। সে মৃদু গলায় বলল,
–“চিন্তা করবেন না।”
–“আমার এত অবসর সময় নেই যে তোর জন্য বসে চিন্তা করতে হবে।”
শেষ কথাটা শুনে মনে হলো নিবিড় আগের মতোই আছে। যাক, এই ঘাড়ত্যাড়া নিবিড়ই তার আপন লাগে। মিষ্টি কথা বললে ঠিক হজম হয় না, কেমন অদ্ভুত আর অচেনা লাগে। যার তার পেটে কি ঘি জমে?
নিবিড় তার সামনে দাঁড়াল না। সে ইয়ামিনের ডাকে অন্য দিকে চলে গেছে। মৌনোও এক ফাঁকে ভাঙা চুড়িগুলো উঠিয়ে সরিয়ে নিয়েছে। এর মাঝে হঠাৎ সবাই মিলে এপাশটার চেয়ার টেবিল সরাতে শুরু করল। মৌনো অবাক হলো, হঠাৎ এই কাজের কারণ বুঝল না। মৌনো শিহাবকে জিজ্ঞেস করল, সে জবাব দিল না। নিবিড়কেও সে দেখল বাকিদের সাহায্য করছে। আশেপাশে মেয়েরাও নেই। এই হম্বিতম্বি তার মাথার ওপর দিয়ে গেল। এর মাঝে জুনায়েদ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
–“কিরে আপা, তুমি শাড়ি বদলাতে যাওনি?”
মৌনো হতভম্ভ হয়ে গেল জুনায়েদের প্রশ্নে। মানে? সে শাড়ি বদলাতে যাবে কেন? অনুষ্ঠান তো এখনো চলছে।
–“কী বলছিস? শাড়ি বদলাব কেন? মাথা ঠিক আছে?”
–“আরে, বাকি সবাই তো ভেতরে গেছে বদলাতে। তুমিও দ্রুত যাও, আমরা ছেলেরা মাঠ পরিষ্কার করি।”
মৌনো বিমুঢ়,
–“সে কী, কেন?”
এর মাঝে ইয়ামিন এলো। মৌনোর নরম গাল টেনে বলল,
–“বোকা মেয়ে। আমার বিয়েতে তুই মুখ ভার করে থাকবি তা কেমন করে হয়? যা শাড়ি বদলে আয়। জুতাচোর খেলবি তোরা।”
মৌনোর আকাশ থেকে জমিনে ধপ করে পড়ার মতো অনুভব হলো। ইয়ামিনের গায়ে হলুদের রাতে জুতাচোর খেলবে ওরা? অবিশ্বাস্য কর্মকাণ্ড।
–“মানে কি মামা? কিসের জুতা চোর?”
ইয়ামিন মৌনোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“আমরা জানি, তুই এখনো আজেবাজে ভেবে যাচ্ছিস। তাই তোকে খুশি করতে আমাদের এই ছোট্ট আয়োজন। খেলাধুলা করলে মন ভালো হয়। যা এবার ভেতরে। তোকে খুশি দেখলেই আমরা সার্থক।”
মৌনোর নরম মনে সরল আঘাত হানল এই কথাগুলো। সবাই তার মন খারাপের কত গুরুত্ব দিচ্ছে, সে না বলা সত্ত্বেও। মৌনো ঝাপসা চোখে অদূরে নিবিড়কে দেখল। সে তিন চারটে চেয়ার অনায়াসেই তুলে নিয়ে যাচ্ছে। মৌনোর মন যেন চিৎকার করে বলল,
–“তার আশেপাশের সবাই এত ভালো কেন? কেন সবাই তার মনের এত খেয়াল রাখে? কেন সবাই তাকে এতটা বিশেষ অনুভব করায়?”
মৌনো তাদের আর নাকচ করার সাহস পেল না। সবাই তাকে খুশি করার জন্য কতকিছু করছে, সে স্বার্থপরের মতো মুখের ওপর না ছুঁড়ে দিতে পারে না। খুবই বিশ্রী দেখায় ব্যাপারটা। তাই তো সে দেরী না করে ভেতরে চলে গেল। একটু হলেও ধারণা করেছিল মেয়েদের মধ্যে কারো মন বিষিয়ে থাকবে। কিন্তু ভেতরে এসে তার ধারণা পালটে গেল। সবাই বেশ আনন্দিত এবং উত্তেজিত জুতাচোর খেলা নিয়ে। বাপের জন্মে শোনেনি কারো গায়ে হলুদের রাতে জুতাচোর খেলা যায়। এ যে তাদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা হতে চলেছে। মৌনো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েরা মৌনোকে এখনো শাড়িতে দেখে চেঁচাল,
–“এই গর্ধব! দ্রুত শাড়ি বদলে আয়। এত দেরী কেন? দ্রুত কর। সময় পেরিয়ে গেলে যদি বড়োদের মত বদলে যায়?”
মৌনো হাসল। এই ধমকও তার কানে কেমন মধুর শোনাচ্ছে। সেও জলদি হাতে শাড়ি বদলে নিল। বুশরা এর মাঝে ঘোষণা করল সবাই আজ তাদের নিজস্ব হিল বা গর্জিয়াছ জুতো নিয়ে যাবে। আজ দামী জুতো দিয়ে খেলা হবে। সবাই আগ্রহ পেল এতে। স্যান্ডেল দিয়ে আর কতদিন, এই হলুদের রাতে বিশেষ কিছু তো করাই যায়। তৈরি হওয়ার সময় মৌনোর বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে বেলতুলির জুতাচোর খেলার কথা। সেবার নিবিড়ের গায়ে জুতো মেরে সে কি লজ্জাজনক ঘটনাই না ঘটেছিল। নিবিড়ের সে কি রাগারাগি, চেঁচামেঁচি। লোকটা তাকে দিয়ে শার্ট ধুঁইয়ে ছেড়েছে। কী জঘন্য! এবার মৌনো আর বোকামি করবে না বলে ঠিক করেছে। সৌভাগ্যবশত আজ তাদের খেলা বিগড়ে দেওয়ার জন্য এশা নেই। এশাকে ধরে-বেঁধে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন রাজিয়া শেখ। কিন্তু আফসোস একটাই, আজকের খেলাতেও নিবিড় উপস্থিত থাকছে।
নিবিড় চলে যেতে চেয়েছিল, ইয়ামিন মামা আটকে রেখেছেন। মূলত পরিকল্পনা হয়েছে ওদের খেলা শেষ হলেই গরম গরম খিঁচুড়ি খাওয়া হবে। এরপর বিদায়। অগত্যা, ইয়ামিন মামার পাতানো ফাঁদ থেকে নিবিড় আর উঠতে পারল না, থেকে গেল।
ঠিক রাত সাড়ে দশটা নাগাদ খেলা শুরু হলো। শুরুর দিকে ইয়ামিন মামাও জুতো সমেত খেলায় যুক্ত হলেন। গ্রুপ ভাগ হলো। জুনায়েদ, শিহাব আরও কয়েকজন ছোটো-বড়ো কাজিনরাও আছে এই খেলায়। নিবিড় ওদের খেলার থেকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে। তারও অদ্ভুত ভাবে মৌনোর সেই জুতো মারার স্মৃতি চোখে ভাসছে। এবার সে সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাছে যদি আবার জুতো ছুঁড়াছুঁড়ি হয়? খেলার তালে গানও বাজছে সাউন্ডবক্সে। তাই বলা বাহুল্য, পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত। বড়োরা অনেকটা দূরত্বে থেকে ছোটোদের খেলা উপভোগ করছেন। তারা মূলত যেদিকে বাবুর্চি রাঁধছে তার কাছাকাছিই চেয়ার নিয়ে গোল হয়ে বসেছেন। তারা সাংসারিকসহ বিভিন্ন বয়োজ্যেষ্ঠ আলাপ-আলোচনায় মশগুল।
খেলতে গিয়ে সবাই বেশ হাসি-উচ্ছ্বাসে আছে। আজ রিমঝিমও খেলছে। সে যেন এক মুহূর্তের জন্য তরুণী বয়সে চলে গিয়েছে। সেও আজ বাচ্চাদের মতো হাসছে আর ছুটছে। এক পর্যায়ে ইয়ামিন মামা পারলেন না ভাগনে – ভাইঝি- ভাইপোদের সাথে। তিনি পড়ে গেলেন। কোমর ভাঙার নাটক করে খেলা থেকে বেরিয়ে গেলেন। বুশরা বলল,
–“মামা এটা কিন্তু চিটিং! তোমাকে না হারিয়ে কিন্তু ছাড়ছি না।”
ইয়ামিন নাক-মুখ কুঁচকে বললেন,
–“দেখিস না, কোমর ভেঙে যাচ্ছে। আরেকটু খেললে কাল আমার বদলে শিহাবকে বর হিসেবে পাঠাতে হবে।”
শিহাব এতে চেতে গেল।
–“মামা, তোমার মুখে কী কিছুই আটকায় না? তোমার বউকে আমি বিয়ে করতে যাব কেন? বারবার আমার লেজ ধরেই তোমার টান দেওয়া লাগবে?”
–“বউ বলছিস কাকে তুই? সালমাকে কী আমি আগেভাগে বিয়ে করেছি বলতে চাচ্ছিস?”
শিহাবকে বেশ অসহায় দেখাল। সে কখনোই ইয়ামিনের সাথে কথায় পারে না। অগত্যা, ওদের মামাকে ছাড়াই খেলা আবার শুরু করা লাগল। তবে বিপত্তি ঘটল আবারও। জুনায়েদের সাথে মৌনোর কী নিয়ে ঝগড়া লাগল, মৌনো মেজাজ হারিয়ে জুনায়েদের দিকে জুতো ছুঁড়ে মারল। তাও এদিকের সবথেকে হিল জুতোটা। কিন্তু সেই জুতো জুনায়েদের গায়ে লাগার আগেই সে সরে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সেই জুতো নিবিড়ের দিকে তেড়ে গেল। মৌনোর গা তখন অবশ হয়ে যায় এই ঘটনা দেখে। আবারও সেই একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, মৌনো চিৎকার দিয়ে নিজেও সেই জুতোর পেছনে ছুটল। সৌভাগ্যক্রমে আজকের জুতোটা নিবিড়ের গায়ে লাগেনি, তার ঠিক পায়ের কাছে গিয়ে জুতোটা পড়েছে। মৌনোর মুখটা দেখার মতো হয়েছে। নিবিড় শক্ত চোখে মৌনোর দিকে তাকিয়ে। যেন সেই চোখ দিয়েই তাকে ভষ্ম করে দিবে। মৌনো শুকনো ঢোক গিলল। দ্রুত জুতোটা নিয়ে নিল। মানুষটা ভয়াবহ রেগে আছে। আজ আবারও তার গায়ে জুতোটা লাগলে নির্ঘাত সাকিবের মতোই শক্ত চড় তার গালে জন্মদাগ বসিয়ে দিত। তার এখনো মনে আছে, ছোটোবেলায় কীভাবে নিবিড় তাকে চড় দিয়েছিল। সেই চড়ের কথা ভাবলে এখনো তার ডান পাশের দাঁত নড়ে ওঠে।
নিবিড় দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
–“তোর কি আমার সাথে পার্সোনাল কোনো শত্রুতা আছে? বারবার আমাকেই কেন তোর জুতোপেটা করার ইচ্ছে হয়?”
–“আমি কী ইচ্ছে করে ফেলেছি নাকি?”
–“প্রথমবারে বিশ্বাস করেছিলাম। এবার তোকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কাছে আয়!”
মৌনো দুই ধাপ পিছিয়ে বলল,
–“না, আমি ইচ্ছে করে ফেলিনি।”
–“তো কী উড়ে এসেছে এটা? গর্ধব!” নিবিড়ের উঁচু ধমক। মৌনোর গায়ে ভয়ের শিহরণ তুলল। আশেপাশে বড়ো কেউ নেই এসব শোনার, তাই হয়তো নিবিড় এভাবে তাকে ধমকাচ্ছে। মানুষটা এত চালু, আশেপাশে কে কোথায় আছে সব খেয়ালে আছে তার।
মৌনো ক্ষমা চাইল,
–“আচ্ছা সরি, আর হবে না।”
–“সরি বললেই কী সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? আমাকে বেইজ্জতি করতে বুঝি তোর খুব ভালো লাগে?”
মৌনোকে হতাশ দেখাল। সে আর কতভাবে নিজের পক্ষে কৈফিয়ত দিবে তা আর ভেবে পেল না। ইয়ামিন মামা এসে পরিস্থিতি শান্ত করলেন। সবাইকে জানিয়ে দিল খাবার তৈরি, খেলা যেন শেষ করা হয়। ভাগ্যক্রমে মৌনো আজ বেঁচে গেল। খাবারের সময়ে আজ সবাই ঘাসের ওপরই বসল, আর চেয়ার টানাটানির প্রয়োজন হলো না। মৌনোর খুব পছন্দ খোলা আকাশের নিচে খাবার খাওয়া। সে খেতে খেতে ছেলেদের সারিতে নিবিড়কে দেখল। আফসোস অনুভব করল। নিবিড়কে রাগিয়ে না দিলে হয়তো তারা কাছাকাছি বসে খেতে পারত। মৌনো তাকে হাত বাড়িয়ে দেখাত আজ কোন তারাগুলো বেশি জ্বলজ্বল করছে, তা। কিন্তু তা আর হওয়ার বদলে মৌনোকে উলটো নিবিড়ের থেকে দূরে দূরে থাকা লাগছে। শুধুমাত্র ধমক শোনার ভয়ে। নিবিড়ের লাগামহীন ধমক কাজিনদের মধ্যে কেউ শুনলে কী আর মান-সম্মান থাকবে?
পরেরদিন বরযাত্রীতে মৌনো যেতে চাইল না। এতে ইয়ামিনসহ সবাই তার সাথে রাগারাগি করল। সকলের ধমকা-ধমকির চক্করে তাকে বাধ্য হয়েই যেতে হলো সেখানে। রিমঝিম তাকে আশ্বাস দেয়,
–“সবসময় খারাপ কিছু হবে ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নিবি কেন? মন খুলে হাসবি, মন খুলে সবকিছু অনুভব করবি। এই পৃথিবীতে বাকিদের মতো তোরও নিঃশ্বাস নেওয়ার, বেঁচে থাকার অধিকার আছে। চিন্তা করিস না, এসব সাকিব টাকিব তোর ধার ঘেঁষার দুঃসাহস করবে না।”
রিমঝিমের আশ্বাসে মৌনো সাময়িক স্বস্তি পেল। রিমঝিম তার সাথে ছায়ার মতো করে থাকল। এশা আসেনি। সে অনেক কান্নাকাটি করেছে, তবে রাজিয়া শেখ তাকে জোর করে বেঁধে রেখেছেন। এত মানুষের মাঝে এশাকে আলাদা করে দেখভাল করার সুযোগ কোথায়? সে এমনিতেও প্রচুর জ্বালাতন করবে, সেই ভেবেই ধরে রাখা। নয়তো সবাই কী কম বলেছিল তাকে? কিন্তু রাজিয়া শেখও তার সিদ্ধান্তে অনড়, ছোটো মেয়েকে দিবেন না তিনি।
এত মানুষের ভীড়েও মৌনোর কেমন শূন্যতা অনুভব হচ্ছে। সেই শূন্যতার নাম ‘নিবিড়’। মানুষটা গতকাল অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে থাকলেও আজ নেই। সম্ভবত উনি এখন ট্রেনিং-য়ে ব্যস্ত। নিবিড় বদরাগী হোক, তাকে ধমকাক, মন্দ কথা বলুক আর যাই হোক.. মৌনো তো তাকে সব মেনে নিয়েই ভালোবেসেছে। কোনো মানুষই একশো শতাংশ পার্ফেক্ট হয় না, এটা সে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে। নিবিড়ের রাগ-গাম্ভীর্যের বিপরীতেও অনেক ভালো গুণ আছে। তার মাঝে অন্যতম হলো মানুষটা আশেপাশে থাকলে তার ভয় দূর হয়ে যায়। পাখির মতো উড়তে পারে, কেউ তাকে বেঁধে রাখতে পারে না। এমন কি তার জন্য কেউ হুমকিও হতে পারে না। নিবিড় সবসময় বটবৃক্ষের মতো তাকে সুরক্ষা দেয়। তারও স্বস্তি অনুভব হয়। অথচ গতকালই নিবিড় তাকে কী পরিমাণ বকাঝকা করল। আর আজ এসে সে মানুষটার শূন্যতা অনুভব করছে। ভালোবাসা ব্যাপারটাই কী অদ্ভুত?
রিমঝিমের আশ্বাস সত্যিই সাময়িক ছিল। ঠিক বিয়ের পরপরই কোত্থেকে সাকিবের মা এলেন। ভদ্রমহিলা কোনোদিক থেকে এসে মৌনোর বাবা অর্থাৎ রিয়াজ সাহেবকে ধরলেন। ছেলের জন্য মৌনোর হাত চাইলেন। দূর থেকে সাকিব মাকে মৌনোকে দেখিয়েছে। মৌনো সব দিক থেকেই চোখে লাগার মতো। তাই ভদ্রমহিলারও পছন্দ হতে বেশি সময় লাগল না। এমন রূপসী পুত্রবঁধু ছেলের ঘর আলো করে আসলে তাকে আর পায় কে? প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যাবেন তিনি। তাই পাত্রী হাতছাড়া হওয়ার আগেই এই কাজটা করে বসলেন। বড়ো মামা রিয়াজ সাহেবের পাশেই ছিলেন। সঙ্গে ইয়াসিনও।
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~
[আজকের পর্বটাও অনেক বড়ো। যারা পড়বেন অবশ্যই রেসপন্স করবেন, যেন অন্যান্য পাঠকদের ফিডেও গল্প পৌঁছায়। পেজের রিচ ইদানীং অনেক কমে গেছে। আর মন্তব্য পাব তো?]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর নজরে দেখবেন। সত্যি বলতে আমার বড়ো পর্ব লেখার অভ্যেস নেই। আমার বেশিরভাগ পর্বগুলো ১০০০-১৫০০+ এর মধ্যে হয়ে থাকে। মাঝেমধ্যেই বড়ো পর্ব দেওয়া হতো। তাই বলা যায় বড়ো পর্ব দিতে আমি অনেকটা কাঁচা। তবে আমি ইদানীং চেষ্টা করছি যেন আপনারা পর্বগুলো পড়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারেন। এখন অভ্যেস হতেও সময়ের প্রয়োজন। আশা রাখছি এভাবে লিখতে লিখতে অভ্যেস হয়ে যাবে। আজকের পর্বটা বড়ো হওয়ার কারণ হয়তো আপনারাই। আপনাদের আগের পর্বের মন্তব্যগুলো অনেক অনুপ্রেরণা দিয়েছে আমাকে। তাই এই বড়ো পর্ব লিখতে চাওয়াটা আমার ‘সুখের চেষ্টা’। আশা রাখছি আপনারা ঝিমিয়ে যাবেন না।
রিচেক ধীরে-সুস্থে করব। বানান ভুল গুলো এড়িয়ে যাওয়ার অনুরোধ।❤️
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ১৪
-
বেলতুলি পর্ব ১৫
-
বেলতুলি পর্ব ১২
-
বেলতুলি পর্ব ৬
-
বেলতুলি পর্ব ১০
-
বেলতুলি পর্ব ১৬
-
বেলতুলি পর্ব ২
-
বেলতুলি পর্ব ৪
-
বেলতুলি পর্ব ২১
-
বেলতুলি পর্ব ১১