বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২২
২২
দাদাবাড়িতে বিয়ের আয়োজন করার প্রস্তাবটা বাবার খুবই পছন্দ হলো। সেই দিনই আমরা গ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম।
ব্যস্ততা বাঁধলো বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে। বাবরি চুলওয়ালা মার্কেটে যেতে পারবে না। তাই আমি আর মা বিয়ের সমস্ত কেনাকাটা করতে চলে এলাম। মার্কেটে ঘুরে ঘুরে নিজের বিয়ের শাড়ি পছন্দ করেছি। একটা ডার্ক মেরুন রঙের শাড়ি। শাড়িটা গায়ে জড়াতেই বুকের ভেতর অন্যরকম অনুভূতিরা এসে ভীড় করলো।
বাবরি চুলওয়ালার জন্য কিনলাম অফ হোয়াইট পাঞ্জাবি। সে শেরওয়ানি পরতে চায় না। বলেছে পাঞ্জাবি পরবে। গয়না, কসমেটিকস সহ টুকিটাকি আরও যা যা লাগে, সবকিছু কিনে বাসায় ফিরলাম।
বিকেলবেলা একটা কাজে আম্মু বাইরে গেলেন। বাসায় আমি একা। বেশ কিছুক্ষণ নিজেকে রুমে আটকে রাখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। গুটি গুটি পায়ে এসে দাঁড়ালাম বাবরি চুলের দরজায়।
দরজা সামান্য ধাক্কা দিয়ে সরাতেই দেখলাম উনি ঘুমাচ্ছে। এত মায়া লাগছে দেখতে! কাছে এসে দাঁড়ালাম আমি। তার লম্বা লম্বা বাবরি চুলগুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে আছে। ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকানো, যেন ঘুমের মধ্যেও কিছু ভাবছে। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, এই মানুষটার সঙ্গে আমার পুরো জীবন বাঁধা পড়তে যাচ্ছে!
হাত বাড়িয়ে চুলগুলো ঠিক করে দিতে ইচ্ছে করছিলো। কিন্তু সাহস পেলাম না। বড্ড আনন্দ হচ্ছে আমার। এই মানুষটাকে আগে এক নজর দেখার জন্য আমার ভেতর কী যে ঝড় বইতো! অথচ দেখা করার পথগুলো ছিলো রুদ্ধ। এখন চাইলেই তাকে দেখতে পারি যখন খুশি, যতক্ষণ খুশি..
জানালার পর্দা ভেদ করে বিকেলের সোনালী আলো এসে ঘরটাকে উজ্জ্বল করে দিয়েছে। আমার ডার্ক মেরুন রঙের শাড়ির মতো জীবনের প্রতিটা বস্তুই গাঢ় রঙিন হয়ে উঠছে ধীরেধীরে!
হঠাৎ তার ভ্রু দুটো আরও কুঁচকে গেলো। চমকে উঠে চোখ মেললো সে। যেন ঘুমের ভেতরেই আমার উপস্থিতি টের পাচ্ছিলো!
আমাকে দেখে মিষ্টি করে হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো। যেন হাত বাড়ালেই তাকে ধরে ফেলবো আমি। সংকোচে আমি মরে যাচ্ছি। সে বললো, ‘কখন এলে?’
‘এইতো এখনই।’
‘আমার চোখটা মাত্র লেগে এসেছিলো। তোমার ঘ্রাণ পেয়ে ভাবছিলাম স্বপ্নেও মানুষ ঘ্রাণ পায়! এটা কিভাবে সম্ভব? এখন বুঝলাম এটা স্বপ্ন না।’
আমি ধীরেধীরে তার কাছাকাছি এসে দাঁড়াই। তার নাগালের কাছেই। চাইলেই হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলা যাবে আমাকে। তবুও সে নিজেকে সংযত রাখলো।
‘মীরা, আন্টি আসেনি এখনো?’
‘না।’
‘আমার রুমে কি করতে এসেছো শুনি?’
‘কি করতে মানে! এমনিই..’
‘বাসায় কেউ নেই। তুমি এমনিতে আসার মানুষ নও। একটা কিছু তো অবশ্যই মাথায় ঘুরছে তোমার। কি বলো তো?’
‘আরে কিচ্ছু না। বাসায় কেউ নেই, ভাল্লাগছে। শুধু আপনি আর আমিই বাসায়, এই জিনিসটাই মজা লাগছে আমার।’
সে ম্লান হেসে বললো, ‘একবার ছিলাম তো, তুমি আর আমি। ওইযে তনয়ের বাইক নিয়ে এসেছিলাম। বাইকটা বাসায় রেখে তোমাকে নিয়ে সিএনজি করে গেলাম। ওইদিনও কি এমন আনন্দ হয়েছিলো?’
‘হুম।’
‘সত্যি!’
‘হুম।’
‘তোমার মনে শুরু থেকেই আমার জন্য ফিলিংস ছিলো নাকি মীরা? হুমমম?’
আমি লাজুক হেসে বললাম, ‘কেন? আমি বাসায় একা। এই জিনিসটা আপনাকে আনন্দ দেয় নি?’
‘না। একা হওয়াটা তো ভয়ের, রিস্কি। মোটেও আনন্দের না।’
‘ওহ আচ্ছা। আপনি বুঝি আমাকে ভয় পেতেন?’
‘উহু। আমিই যদি তোমার ভয়ের কারণ হয়ে যাই। তাই সাবধান থাকতে হতো।’
‘আপনি ছেলে মানুষ হিসেবে ভালোই। লুইচ্চা না মোটেও।’
‘হা হা হা।’
সে হাসলো। তারপর বললো, বাসায় কেউ নেই। আমাকে একটু হাঁটাহাঁটি করতে হেল্প করবে প্লিজ?
আমি খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেলাম। সে চেষ্টা করলো উঠে দাঁড়ানোর। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে তার হাতটা ধরলাম। আমার গায়ে সামান্য ভর দিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো।
এক পা, দুই পা করে হাঁটতে চেষ্টা করলো। রুমের ভেতর কিছুক্ষণ একসঙ্গে হাঁটার পর আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। সে এরপর নিজে নিজেই হাঁটলো খানিকক্ষণ। তারপর বললো, ‘তোমার বর বিয়ের দিন যদি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে, তোমার তো কষ্ট হবে তাইনা?’
‘মোটেও না। আমার বর জীবনে আর কোনোদিন হাঁটতে না পারলেও আমার অসুবিধা নেই।’
বাবরি চুলওয়ালা অবাক হয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এটা কি সত্যি বললে? আমি যদি আর হাঁটতে নাও পারি তাতেও তোমার আমাকে বিয়ে করতে আপত্তি নেই?’
‘না নেই। আপনি পঙ্গু হয়ে গেলেও মীরা আপনাকে ছেড়ে যেতো না।’
তার দুচোখখ বোধহয় ভীষণ আশ্চর্য হয়ে উঠলো। একইসাথে চোখে ফুটে উঠলো কৃতজ্ঞতা। এমন কথা শোনার জন্য সে প্রস্তুত ছিলোনা হয়তো।
‘মীরা..’
‘হুম। সত্যিই বলেছি। বিশ্বাস হচ্ছেনা?’
‘তুমি সব অবস্থাতেই আমার পাশে থেকে যেতে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন মীরা!’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে সামান্য হাসলাম। জানিনা এই হাসির অর্থ সে বুঝবে কিনা। কিন্তু এর কোনো কারণ আমার জানা নেই। আমি এই মানুষটাকে চাই, সব অবস্থাতেই চাই। সে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও আমার তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। এই সুন্দর কথাটা তার কেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে!
সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। চোখের দিকে তাকাতে গেলে আমাকে মুখ উঁচু করে তাকাতে হয়। আমি তার সেই চোখে খুঁজে পেলাম আমার প্রতি অসম্ভব মায়া!
সে বললো, ‘এক জীবনে কি এমন ভালো কাজ করেছি জানিনা। তোমাকে, তোমার ভালোবাসাকে কীভাবে পেয়ে গেলাম আমি? এই অধমের কি এত যোগ্যতা আছে!’
আমার খুব ইচ্ছে করলো তাকে একবার জড়িয়ে ধরি। ইচ্ছে করছে ভীষণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে চুপ করে থাকি দীর্ঘক্ষণ। একবার জড়িয়ে ধরে দিয়ে দেই তার সকল প্রশ্নের উত্তর।
আমি পারলাম না!
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তবে খুব ব্যকুল হৃদয়ে চাইতে থাকি, সে যদি একবার আমাকে বুকে টেনে নিতো!
না, সেও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
কয়েক সেকেন্ড পরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, ‘আমি একটু রুমের বাইরে যেতে চাই মীরা।’
আমিও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। দু’জনেই দুজনকে এত করে চাইবার পরেও কীসের যেন অদৃশ্য দেয়াল আমাদের মাঝখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
আমি তাকে বাইরে আসতে সহযোগিতা করলাম। সে বেশ খানিক দূর হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়লো। পায়ের অবস্থাটা এখন আগের চাইতে ভালো। লালচে ভাবটাও খানিক কমেছে।
দুজনে বাসার বাইরে চেয়ার পেতে বসে গল্প জুড়ে দিলাম। এক ফাঁকে দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে চা বানালাম। পিরিচে করে বিস্কুট ও চা নিয়ে বাইরে এসে দুজনে একসাথে বসে আড্ডা দিলাম। সে আমার হাতের চা খেয়ে খুব প্রশংসাও করলো।
পরদিন সকালেই আমরা দাদাবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাবা একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে এনেছেন। বাবাকে বাসায় রেখে আমি, মা ও বাবরি চুলওয়ালা চলে এলাম গ্রামে।
বাড়ির সবাই আমাদেরকে সাদরে গ্রহণ করলেন। চাচা, চাচী, দাদুভাই, চাচাতো ভাই বোনেরা। অসুস্থ বাবরি চুলওয়ালাকে দেখে সবার কেমন প্রতিক্রিয়া হবে, তা নিয়ে সারা রাত আমি ভাবনায় ব্যকুল ছিলাম। অথচ সবাই বেশ আন্তরিকতার সাথে ওকে বুকে টেনে নিলো।
বড় চাচা বললেন, আমার মেয়ের বিয়েতে মুনযির একাই সব দায়িত্ব সামলেছে। ওর বিয়েতে আমি আমার কলিজা দিয়ে দিবো।
করলেনও তাই! রাজকীয় খানাদানার ব্যবস্থা করেছেন বড় চাচা। চাচীর মুখে শুনলাম, চাচা নাকি সবাইকে বলে দিয়েছেন মুনযিরকে জামাই আদর করতে হবে। এবার ও কোনো সাধারণ ছেলে হিসেবে আসছে না। ওকে কেউ বাড়ির ছেলের মতো দেখবে না। ওকে দেখবে রাজার ছেলের মতো। খাবার দাবার, সেবাযত্ন সবকিছুই যেন রাজপুত্রের মতো হয়।
ভরপেট খেয়েদেয়ে আমরা ভাই বোনরা মিলে আড্ডা দিতে বসলাম। কিছুক্ষণ পর যোগ দিলেন চাচীরা। বিয়ের আয়োজন নিয়ে নানান কথা। আমার বিয়ের সাজসজ্জার প্যাকেট খুলে সবাইকে দেখানো হলো।
গল্পের আসরেই কথা বলতে বলতে ঘরোয়া বিয়ের আয়োজন রূপ নিলো মহা ধুমধামে। মেজো চাচা এসে ঘোষণা দিলেন, ফুফুদের বাড়ির সকলে আসবে। সবাইকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। এরপর তাতে যুক্ত হলো গ্রামের পাড়া প্রতিবেশীরাও। কথায় কথায় আমাদের অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদেরও দাওয়াত দেয়ার আলোচনা চলে আসলো। এবং একসময়, আমার আর মুনযিরের সকল কথা চাপা পড়ে গেলো বড়দের কথার নিচে। বড়রা যা বলবেন, তাই হবে।
বড় চাচী ও মেজো চাচী বিকেলবেলা বাচ্চাকাচ্চা সবাইকে নিয়ে মহা সমারোহে কেনাকাটা করতে চলে গেলেন। ওদিকে মুনযিরের বাড়ি থেকে ভাইয়া, ভাবী ও ভাতিজা ভাতিজিও রওনা দিয়েছে।
আমি এক ফাঁকে বাবরি চুলওয়ালার সামনে এসে দাঁড়াই। সে হাসতে হাসতে বললো, ‘কোথা থেকে কী হয়ে গেলো মীরা? ‘
আমি ঠোঁট উলটে বললাম, ‘কিছুই করার নেই। বিয়ে জীবনে একবারই হয়। এনজয় করুন।’
ভেবেছিলাম তার মন খারাপ হবে। কিন্তু না, সে হো হো করে হেসে উঠলো।
আমার ইচ্ছে ছিলো খুব সাদামাটা সাজবো, গয়নাও কিনেছি খুব সামান্য। কিন্তু দাদুভাই আর চাচাদের আদেশের কাছে সব পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গেলো। বড় চাচা উপহার দিলেন একটা স্বর্ণের নেকলেস, ছোট চাচা দিলেন এক জোড়া বালা। এসবের কোনো কিছু আমার বাবা এখনো জানেন না। বাবা এসে এই মহা সমারোহ দেখে কী ভাববেন কে জানে!
সন্ধ্যা নামতে নামতেই দাদুবাড়িটা জাঁকজমক বিয়েবাড়িতে পরিণত হলো। দাদুভাই ডেকোরেটরের লোকজন সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। ভ্যান থেকে নামানো হচ্ছে প্যাস্টেল রঙের চেয়ার, প্যান্ডেলের কাপড় আর মরিচবাতি! আমি সবকিছু মুগ্ধ হয়ে দেখে যাচ্ছি।
একদিন শখ হয়েছিলো দাদুবাড়িতে আমার বিয়ের অনুষ্ঠান করবো। আমার অজান্তেই আমার সেই সাধ পূর্ণ হয়ে গেলো। এই বাড়িটাকে দেখলে কেউ বলতেই পারবে না যে, এতকিছু একদিনের মধ্যে করা হয়েছে! মনে হচ্ছে যেন এক মাস আগ থেকে ধীরেধীরে আয়োজন করে সাজানো হয়েছে আজকের এই বিয়েবাড়ি!
রাত নামলো।
বাবা সঙ্গে নিয়ে আসলেন আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে আসা লোকজনদের। সবাইকে সালাম জানিয়ে আমি লজ্জাবতী নতুন বধূর মতো মুখ নিচু করে বসে রইলাম। মুনযিরের প্রতি বাড়ির সবার আন্তরিকতা দেখে ওর ভাই, ভাবীরা ভীষণ অবাক হয়েছেন।
সব মেয়েরা আমাকে ঘিরে বসে রইলো। ছোট্ট সাউন্ড বক্সে ধুমধাড়াক্কা গান ছেড়ে দিয়ে কেউ কেউ নাচানাচি করছে। লজ্জা পাবার বদলে আমি হেসেই কুটিকুটি। আমাকে সবাই শিখিয়ে দেয় কিভাবে লাজুক বউ হতে দেয়। অথচ একটু পরপর আমি হেসেই গড়াগড়ি খাচ্ছি।
রাতের খাবারের পরিবেশন দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। ডেকোরেটর থেকে আনা টেবিল চেয়ার দিয়ে উঠানে বিশাল বড় ডাইনিং সাজানো হলো। তারপর বাড়ির সবাই মিলে একসাথে খেতে বসলাম। যতটা না খাওয়াদাওয়া, তারচেয়ে বেশি আমোদ। শ্বশুরবাড়ির লোকজন থাকায় আমি খানিকটা বিব্রত। তবুও এতে অট্টহাসির আমেজ এতটুকুও কমলো না।
আমার ছোট চাচার স্ট্যান্ড আপ কমেডি করার গুণ আছে। তিনি মাঝেমাঝে কমেডি করে আমাদেরকে হাসাচ্ছেন। হাসি, আড্ডা আর মজার মজার খানাদানা, সবমিলিয়ে সময়টা হয়ে উঠলো স্বপ্নের মতো সুন্দর।
খাওয়া শেষে আমি খানিকটা বিশ্রাম নেয়ার জন্য বিছানায় এসে বসলাম। ওদিকে চাচাতো বোনরা মিলে মেহেন্দি উৎসব করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চাচী এসে আমার জন্য বিছানার ওপর একটা শাড়ি, ব্লাউজ রেখে গেলো। বললো, ‘জলদি রেডি হ মীরা। মেহেদি লাগাতে সময় লাগবে।’
সবার আনন্দ দেখে আমি ভেতরে ভেতরে আতংকিত হয়ে পড়ছি। এত আনন্দ, এত আয়োজন, শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক হবে তো! প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকালে আমার মনে ভয় জেগে ওঠে। আমি তো এতকিছু চাইনি। শুধু আমার বাবরি চুলওয়ালাকেই চেয়েছি আপন করে। এতকিছুর ভীড়ে আমার বাবরি চুলওয়ালা আমার থেকে হারিয়ে যাবে না তো!
যখন বসে বসে এসব ভাবছি, ফোনটা ভাইব্রেট হলো। হাতে নিয়ে দেখি বাবরি চুলওয়ালার মেসেজ, ‘কতক্ষণ দেখিনা!’
আমি মুচকি হেসে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। রুম থেকে বের হয়ে দেখি উঠানের একদিকে পাতা চৌকিতে কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছে। বাবরি চুল সেখানেই বসা। দূর থেকে আমাকে দেখে সে মুচকি হাসলো।
ভেবেছিলাম খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো। চাচী এসে তাগাদা দিলেন দ্রুত শাড়ি পরে তৈরি হওয়ার জন্য। মেহেদি আর্টিস্ট নাকি চলে এসেছে। আমি রুমে ঢুকতে ঢুকতে বারবার আড়চোখে বাবরি চুলওয়ালাকে দেখছিলাম।
শাড়ি পরে রেডি হতে ঘন্টাখানেক লেগে গেলো। একদিকে উচ্চস্বরে ছেলেমেয়েরা গান বাজনা নিয়ে ব্যস্ত। আমি বের হওয়ামাত্রই ওরা বাবরি চুলকে ধাক্কা দিয়ে আমার পাশে দাঁড় করিয়ে দিলো। তারপর প্রত্যেকের ফোনে ফটাফট ক্যামেরায় ক্লিক করার শব্দ।
রোহান বললো, ভাইয়া আপু তোমরা একে অপরের দিকে তাকাও। তাকিয়ে সুন্দর করে পোজ দাও।
আমি কেন জানি একটুও লজ্জা পাচ্ছিনা। চট করে ঘুড়ে দাঁড়ালাম তার দিকে। বাবরি চুলওয়ালার মুখে লাজুক হাসি। সে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। অথচ এতক্ষণ ধরে আমি বোধহয় এই সুযোগটুকুই খুঁজছিলাম।
আমরা দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে ছবির জন্য পোজ দিচ্ছি। বাবরি চুলওয়ালা মৃদু স্বরে বললো, ‘আই উইশ ওরা এক ঘন্টা ধরে এভাবে ছবি তুলুক।’
‘কেন!’
‘যাতে এক ঘন্টা ধরে এভাবে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি আর কেউ কিছুই না মনে করে।’
আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘তাকিয়ে থাকতে কেউ কি বারণ করেছে?’
‘উহু। সামাজিকতা।’
‘আপনার তো কপাল ভালো যে বিয়ের আগের দিনও বউকে এভাবে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্য ছেলেরা তো বিয়ের দিন বরযাত্রী হয়ে আসার আগে বউয়ের চাঁদমুখ খানা দেখার সৌভাগ্যও হয় না।’
সে মুচকি হেসে কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় কেউ একজন বলে উঠলো, ‘হয়েছে হয়েছে। এবার অন্যদিকে ঘোরো। এক পোজে আর কত ছবি তুলবা?’
বাবরি চুলওয়ালা বললো, ‘এভাবে এক হাজার কপি ছবি তোলো। এরচেয়ে সুন্দর পোজ দুনিয়াতে আর নাই।’
সবাই উচ্চস্বরে হইহই করে উঠলো। হাসির শব্দের রেশ অনেক্ষণ ধরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো আমার কানে। বাড়িভর্তি আত্মীয় স্বজন, সবার মনে আনন্দ। আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে সবচেয়ে আকাঙ্খিত মানুষটি। এ কি স্বপ্ন! স্বপ্নও কি এত সুন্দর হয়?
চলবে..
Share On:
TAGS: বাবরি চুলওয়ালা, মিশু মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৫
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৮
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৩
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১৫
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৩
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৭
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৪
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৯
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৬