বজ্রমেঘ . ❤
পর্বসংখ্যা_৩০ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
শ্রেষ্ঠা যেন আকাশ থেকে পড়ল! উনারা এখানে কী করছে? কী হচ্ছে এই বাড়িতে? প্রথমে রাফানের অগ্নিদীপ্ত ধমক, তারপর খাগড়াছড়ির সেই মানুষটা, যে নিজেও সাংঘাতিক আহত! ঘটনার কুলকিনারা কিছুতেই খাপে মিলছে না। বিস্ফোরিত চোখে রোজা আর সোহানার দিকে তাকাতেই ওরাও ভ্যাবাচ্যাকা চাহনিটা ফেরত দিল। সবাই যেন একসাথে কোনো অচেনা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে, যেখানে শুধু প্রশ্ন, প্রশ্ন আর প্রশ্ন! এদিকে তাহিয়া ব্যগ্র পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছে। হাতে প্রাথমিক চিকিৎসা বাক্স, পরিষ্কার একটি তোয়ালে। পেছনে দুটি চাকর, দু জোড়া হাতে গরম পানির বোল ধরে উঠছে। শ্রেষ্ঠা কয়েক পা এগিয়ে শাওলিনের সামনে দাঁড়াল। এক সেকেণ্ড অপেক্ষা করে শক্ত গলায় বলল,
- জানা, সব সত্য বলবি। কী হচ্ছে এখানে? উনি এদিকে কেন? শোয়েব স্যার এ বাড়িতে কেন, প্লিজ আল্লাহর ওয়াস্তে বল!
শেষ কথাটা প্রায় চিৎকার হয়ে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল শ্রেষ্ঠা। এদিকে শাওলিন তখনো পাথর। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চোখদুটো নিথর, নিষ্প্রাণ, ঘোলাটে দেখাচ্ছে। যেন এত বড় ধাক্কায় ওর ছোট্ট বুকের ভেতরে সবকিছু জমাট বেঁধে গেছে। ও কোনো কথাই বলছে না। পরিস্থিতি বুঝে অধরা নিজেই শ্রেষ্ঠাকে আলাদা কোণে ডেকে নিল। রোজা আর সোহানাও পিছু পিছু গিয়ে উপস্থিত। অধরা ওদের প্রত্যেকের মুখের দিকে একপলক চেয়ে শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল,
- এখানে পরিস্থিতি ভালো না শ্রেষ্ঠা। ওকে ওভাবে জোরজুরি কোরো না। একদিকে তাহমিদ হঠাৎ নিখোঁজ। পুরো বাড়ি ভয়ে অস্থির। অন্যদিকে শাওলিন, যেখানে ওর কোনো দোষ নেই; অথচ সবকিছু ওকেই সহ্য করতে হচ্ছে। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ আমরা এখানে কেন? কীভাবে জড়িত তাই না?
সোহানা আর অপেক্ষা করতে পারল না। ঝটিতি বেগে জিজ্ঞাসা করে উঠল,
- জি অধরা আপু, দয়াকরে বলুন! আপনারা কী হন এদের? কীভাবে সম্পর্কযুক্ত?
অধরা গভীর একবুক শ্বাস টেনে নিচ্ছে। যেন এক নিশ্বাসে অনেক দিনের অজানা ইতিহাস বলতে হবে তাকে। নিজেকে পুরোদস্তুর স্বাভাবিক বানিয়ে স্থির গলায় বলল,
- তাহমিদের মা আমার ফুপু শ্বাশুড়ি হন। আমার শ্বশুরের একমাত্র বোন। ফাতিমা দাদীর তিন ছেলে, এক মেয়ে। সেই মেয়েটাই হচ্ছে তাহমিদের মা।
রোজা এ কথায় মারাত্মক আঁতকে উঠল। আতঙ্কের গলায় চ্যাঁচিয়ে বলল,
- ওহ মাই গড! আল্লাহ! আল্লাহ! তার মানে . . আপনারা . . আপনারা শুরু থেকেই জানার রিলেটিভ?
অধরা ধীরে ধীরে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। তা দেখে রোজার মুখ বিরাট হা হয়ে যায়। ডানহাতে সে মুখটা চাপা দিতে লাগল বেচারি। অধরা খানিক থেমে ফের কথাটা বলে উঠল,
- কিছুটা এমন বলতে পারো রোজা। কিন্তু আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। তোমরা আমাদের চিনেছ ফরেস্ট অফিসারের ভাবী হিসেবে। আর আমরা তোমাদের ভেবেছি ট্যুরিস্ট দল।
এবার সোহানার গলা শুকিয়ে আসে। প্রচণ্ড বিস্মিত গলায় হতবাক সুরে বলল,
- তার মানে, শোয়েব. . শোয়েব স্যার . . উনি জানার . .
জিভে কথাটা আঁটকে পড়ল সোহানার। ওর চোখেমুখে অথৈ বিস্ময়ের ঢল! এক মুহূর্ত নীরবতা চললে শ্রেষ্ঠা নিজেই কথাটা সম্পূর্ণ করে বলল,
- উনি জানার হবু ভাসুর হন। তাহমিদের আপন মামাতো ভাই। অথচ আমরা . . আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না, জানতাম না। কী অদ্ভুত ধরণের কাণ্ড!
অবিশ্বাস্যে ঠাসা এক গুমোট পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। যেখানে কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। সেই আকাঙ্ক্ষিত খাগড়াছড়ি ভ্রমণের কেন্দ্রবিন্দু তবে এটার সূত্র ছিল? সেই খাগড়াছড়ি, যেখানে নৈসর্গিক সৌন্দর্য সাজেক ভ্যালির অবস্থান! সেই খাগড়াছড়ি, যেখানকার বনবিভাগের কর্মরত অফিসার শোয়েব ফারশাদ? ভাগ্য কী কোনোভাবে এই দুই দলকে সাক্ষাৎ করাতেই ব্রত ছিল? একের পর এক বিপদ যে সামনে আসলো, সেগুলোর পেছনে মূলৎপাটন কী তবে এই কাহিনী? শ্রেষ্ঠা নিজের চোখের সমুখে ভাগ্যের চরম লীলাখেলাটা দেখতে পাচ্ছির। আর রোজা এখানে আতঙ্কিত হচ্ছিল ঘটনার আদ্যোপান্ত সমস্তটা জেনে। সোহানা চরম বিস্ময়ে কিছুক্ষণ হতভম্ব থাকলে সে-ই কথার সূত্রপাত করে বলে ওঠে,
- কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এমন ঘটনা কেন ঘটল? কীসের ভিত্তিতে ঘটল? কী কারণে এই পরিস্থিতির সূচনা দোস্ত? কেন শুরু থেকেই আমরা কিছু বুঝলাম না? আমরা তো উনার বাড়িতে ছিলাম। স্যার আমাদের এতো কাছে ছিল, কেউই কিছু বুঝিনি? কেন! আর কেন আজকেই এতো বড়ো বোমাটা ফাটলো!
সোহানার অন্যমনষ্ক কথার সুঁতো টেনে অধরা নিজেই জোড়া লাগিয়ে বলল,
- কারণ যে মিথ্যেটা এখান থেকে শুরু, ভাগ্য সেখানেই সত্যটা উন্মোচন করছে। এটাই সেই মর্তুজা বাড়ির আখড়া, যেখানে পদে পদে শুধু মিথ্যা গল্প বলা হয়েছে। যেটা তোমরা কেউ জানো না।
অধরার রহস্যপূর্ণ কণ্ঠে চকিতে সংবিৎ ফিরল সবার। অধরা কী বলতে চাইছে? কীসের মিথ্যা? কীসের আখড়া? ওরা শুধু জানে যে রেবেকার বাবার বাড়ি এটা। এখান থেকে একটি প্রস্তাব আসায় রেবেকা নেওয়াজ নাচতে নাচতে ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছে, শাওলিনের মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তার কথাটা না ভেবেই! প্রশ্নের দোলাচলে নাস্তানাবুদ হয়ে সোহানা বলেই ফেলল,
- অধরা আপু, হাতজোড় করছি। আপনি যদি কিছু জেনে থাকলে বলুন। আমরা আর টেনশন নিতে পারছি না। আর কিছুতেই ধাক্কাগুলো সহ্য করা যাচ্ছে না! এখানে কীসের মিথ্যা? কী করেছে এনারা?
সোহানার পাংশুটে মুখের দিকে চেয়ে একপলক ভাবল অধরা। কথাগুলো বলবে কী বলবে না সেই দোলাচলে ভুগছে। ওরা হয়ত এখনো বোঝেনি সৃষ্টিকর্তার অমোঘ চালে গল্পটা যেখানে শুরু, যে মিথ্যাগুলোর সূচনা, ঠিক সেখানেই ওদের প্রত্যেক চরিত্রকে হাজির করেছে মঞ্চস্থে। তাহমিনা মর্তুজা ছিল সেই নারী, যিনি আপনজন হয়েও দূরের-জনের মতো হিংসার আগুনে বিদগ্ধ। সেই হিংসায় ছোবল দিয়েছেন আপন বড়ো ভাইটার শেষ চিহ্নে। সেই বড়ো ভাই; যাকে শ্বশুরবাড়ির অভাব অনটনের দিনে তাহমিনা দুহাত ভরে সাহায্য পেয়েছিল। সেই ফারদিন বড়ো ভাই, যিনি নিজের বাবাকে বুঝিয়ে মেয়ের অপরাধকে ভুলে যেতে বলেছিল। তাহমিনা পালিয়ে বিয়ে করেছে, কিন্তু তাই বলে কী ত্যাজ্য করা লাগবে? একটাই তো মেয়ে উনার, একটাই তো বোন ফারদিনের। সেই বোনের দুরাবস্থার দিনে সে কীভাবে হাত গুটিয়ে থাকে? এমন অন্যায় স্রষ্টা সহ্য করবেন? সম্পূর্ণ অতীত ইতিহাস একমনে চুপচাপ স্মরণ করে গেল অধরা। এসব কিছুই শুনেছে দাদীজানের মন ভারাক্রান্তের দিনে। দাদীজান ভীষণ কট্টর মানুষ, কিন্তু সময়ে-অসময়ে তিনিই তো হাসিখুশি প্রবীণা! অধরা যেই কিছু বলতে নিবে ঠিক তখুনি ভৃত্য শ্রেণির একজন হাঁপাতে হাঁপাতে উপস্থিত হলো। অনবরত শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল,
- ছোটো ভাবী! ছোটো ভাবী! একটু জলদি উপরে চলেন। বড়োভাই ডাকে। খুব জরুরি দরকার!
অধরা শুনতে দেরি, তাৎক্ষণিক গলায় প্রত্যুত্তর করল,
- শোয়েবের অবস্থা কেমন? একজন ডাক্তার ডাকা দরকার না? তোমরা কেউ খবর দিয়েছ?
ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখে তাকাল। নিঃশ্বাস ঠিক হয়েছে। বিব্রত ভাবে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
- কিন্তু ছোটো ভাবী, বড়োভাই যে বলেছে ডাক্তার লাগবে না। উনি নিজেই নাকি ডাক্তারের কাজ সেরে নেবে।
- কী আশ্চর্য! এসব আজেবাজে কথা তোমাকে বলেছে? কেমন অমানুষ দেখো তো ভাই! সেলাইয়ের দরকার পড়লে কোথা থেকে বিদ্যাটা ফলাবে? না সিরাজ, শীঘ্র একজন ডাক্তার ডাকো। এমন হতচ্ছাড়া কাহিনি করলে তার কপালে আজ শনি আছে!
অধরাকে রাগারাগি করতে দেখে শ্রেষ্ঠা নিজেই ফোন বের করে। ওর বাবা চাইলে এক্ষুণি একজন ডাক্তার ধানমন্ডিতে পাঠাতে পারে। তাই সে দেরি করল না। কলটা রিসিভ হতেই শ্রেষ্ঠা চকিতে বলে বসল,
- হ্যালো বাবা! বাবা আমি নূপুর বলছি! এটা সোহানার নাম্বার। তুমি টেনশন কোরো না। বাবা তুমি কী একটু হেল্প করতে পারবে? ধানমণ্ডির দিকে একজন ডাক্তার পাঠাবে? আর্জেন্ট বাবা! ঠিকানাটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি!
.
থমথমে কঠোর মুখে দাঁড়িয়ে আছে রেবেকা। দুকানে কথাটা বিশ্বাস করতে পারল না। আরো একবার সেই অপাত্রের জন্য সুপাত্রী ননদের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। যে প্রস্তাবকে সে জেঠির কথা শুনে ফিরিয়ে দিয়েছে বহু আগে। রেবেকা ঠাণ্ডা মাথায় ভীষণ স্থির হয়ে বলল,
- আপনি কী বুঝতে পারছেন কী বলছেন?
ফাতিমা নাজ বেশ গম্ভীর। চোখদুটো স্থিরমণির মতো বিদ্ধ করা সামনে। তিনি প্রত্যুত্তরে জানালেন,
- হুম। ভেবে চিন্তেই বলেছি।
- আপনি আমাকে খারাপ ভাববেন না নানী। কিন্তু শোয়েবের সঙ্গে শাওলিনের মিলে না। ওদের ভেতরে কিছুরই মিল নেই। একজন নাস্তিকদের পরিবেশে বেড়ে ওঠেছে, অন্যজন সম্পূর্ণ আদব শিষ্টাচারে। দুই মেরুকে এক দিকে করলে পরিণাম খারাপই হবে। আগেও বলেছি।
দমে গেলেন না ফাতিমা। তিনি শান্তিপূর্ণ মানুষ। অন্যের ঝুট ঝামেলায় গলা ছেড়ে ঝগড়া করেন না। বরং চুপ করে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে যান। তবে এই মুহুর্তে পরিস্থিতি ভিন্ন। গভীর একবুক দম ফেলে শান্ত স্বরে বললেন,
- দেখো রেবেকা চাইলে অনেক কিছুই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। মানুষের ভুল নিয়ে বসলে কেউ ফেরেশতা বেরোবে না। আল্লাহ দুনিয়ায় সবকিছু পাপ-পূণ্যে শামিল। কিন্তু তুমি যেটা মেনে নিয়ে বসে আছ, সেটাকে পরিবর্তন করতে তোমারও এগিয়ে আসা দরকার। চোখ খুলে দেখো তারপর বলতে এসো। শুধু শুধু দূর থেকে অযথা মন্তব্য ছুঁড়বে না।
ভদ্রভাবে কথার বাক্যে বুঝিয়ে দিলেন তিনি। এরপরও যদি এই মেয়ের মগজে না ঢোকে, এখনো যদি শোয়েবের ব্যাপারে অন্যের কথায় দাঁত কামড়ে থাকে, সেক্ষেত্রে এর বয়সটাই বেড়েছে বিবেকটা বাড়েনি। রেবেকা কয়েক মুহুর্ত নিশ্চলরূপে নিরুত্তর রইল। কোনো জবাব দিল না। সোফায় বসা অবস্থায় ওভাবে উত্তরহীন দেখে ফাতিমা ফের বলে উঠলেন,
- তোমার কাছে এ প্রস্তাবটা বহু আগেই এসেছে। এবারই নতুন নয়। তুমি কী কারণে ফিরিয়ে দিয়েছ এটা তোমার ব্যাপার। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে। আজ যদি সেই একই গোঁ ধরে বসে থাকো, তবে তোমার জন্যে একটা নিষ্পাপ মেয়ে অপদস্থ হবে। কথা মনে রেখো।
রেবেকা চোখ তুলে তাকাল। মুখোমুখি বসা এই বৃদ্ধার চোখে চোখ রাখাটা দুষ্কর। বৃদ্ধার বয়স বাড়লেও চোখের জ্যোতি কমেনি। বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি দুটো ক্ষুরের ন্যায় ধার। রেবেকা পলক ঝাপটে দৃষ্টি নিচু করে বলল,
- আপনি আমার নানীর মতোন। আপনাকে অসম্মান করে কথা বলব না। কিন্তু শোয়েবের ব্যাপারে এমন কিছু জেনেছিলাম যেটা মুখে আনা যাবে না। আপনি সেগুলো বুঝে নিলে ভালো হয়। আর রইল প্রস্তাবের প্রসঙ্গ, সেখানে এখন —
আচমকা কথার স্রোত থামিয়ে দিলেন বৃদ্ধা। সরাসরি ধার বসানো কথা ছুঁড়ে বললেন তিনি,
- শোয়েবের ব্যাপারে কী শুনেছ তুমি? কী এমন কথা, যা মুখে আনলে মুখই অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
এবার দৃঢ়তাপূর্ণ চাহনি তুলল রেবেকা। একমুহুর্ত স্থির তাকিয়ে থেকে নির্লিপ্ত সুরে বলল,
- আপনি শুধু এটা বলুন, ও কী এখনো সেসব দিকে ঝুঁকোনো? নাকি শুধরে নিয়েছে?
ফাতিমা নাজ নিষ্কপট সুরে জানালেন,
- তোমার কী মনে হয়? এই সাড়ে চার বছরে সেসব কিছু শুনেছ? নাকি শুধরেছে মনে হচ্ছে?
- শুধরেছে মনে হচ্ছে। আবার নাও হতে পারে। মিথ্যে বলতে চাই না। কিন্তু এখন শাওলিনকে নিয়ে যদি নিরাপত্তার বিষয় আসে, তাহলে আমি ভেবে দেখব।
- ভাবাভাবিটা আজই শেষ করো। এই প্রসঙ্গ আর তোলা হবে না। অন্তত শোয়েব বেঁচে থাকতে এটা আজই শেষ বুঝে নিয়ো। ভেবো না যে তোমার ননদের জন্য ও বারবার বিরক্ত করবে। এবারই ইস্তফা বলেছে।
কাঠের দরজায় আড়ি পেতে শুনছে সব তাহিয়া। সবই শুনছে বাইরে থেকে। দাদীর কথাটা শুনে মনে মনে দ্ব্যর্থ হেসে বলল,
- আর বিরক্ত করবে? এই রেবেকাকে? জীবনেও না দাদী। লিখে রাখুন, এবার না হলে আর কখনোই না। ওর ননদকে দরকার পরলে তুলেই নিয়ে যাবে। তারপর দেখব এর অহংকারটা কোথায় টিকে!
কথাটা আনমনে বলছিল ঠিকই, কিন্তু তাহিয়া এ কথা জানে রেবেকা প্রচণ্ড চালাক। এই দম্ভপূর্ণ চালাকির জন্যই আজ মেয়েটার এমন পরিণতি। শাওলিন কী জানে না ওর ভাবী কেমন স্বার্থপর কীট? যে তাকে মাথায় তোলে, সে তাকেই নিজের দলে টানে? নিজের ইচ্ছেমতো না হলে এমন আচরণ করবে যা কল্পনাতীত! যদি প্রস্তাবটা ভুলেও প্রত্যাখান করে, তাহলে আরেক প্রলয়কাণ্ড আজই ঘটতে চলেছে! রেবেকার গলা শুনতে পেল প্রত্যুত্তরে, ভীষণ রোষপূর্ণ স্বরে বলছে,
- আপনাকে একটাই কথা বলব। যে দিকগুলো আমি শুনেছি সেগুলো মানুষের কাজ না। আমার চিন্তাটা এদিকেই। আজ যদি তাহমিদ নিখোঁজ না হতো, আর সোসাইটির এতোগুলো মানুষের সামনে লজ্জিত ঘটনা না ঘটতো, তাহলে আমি অবশ্যই বিয়ের দিন আরেক পাত্র নিয়ে ভাবতাম না।
- কিন্তু পরিস্থিতি এখন অনুকূলে না। তুমি নিজেও জানো বাড়ির বাইরে পা দেয়ামাত্র একটা শোরগোল পড়ে যাবে। অমুক থেকে তমুক কথা ছড়িয়ে বিশ্রী ভাবে আলোচনা চলবে। তুমি এটা চাও না অবশ্যই?
রেবেকা কিছু বলল না সাথে সাথে। বৃদ্ধার সামনে চড়াও হয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। আজ যেভাবে জেঠা মুখের ওপর ‘ফেরত নিয়ে যাও’ বলল, এরপর আর কোনোদিকে ভরসা পাচ্ছে না। ফাতিমা শেষবারের মতো রেবেকাকে আশ্বস্ত করতে এগোলেন। মৃদুস্বরে কোমলভাবে বললেন,
- যে দিকগুলো নিয়ে ভয় পাচ্ছ, সেসব কিছু নেই। বনবিভাগে নিজের মতো চাকরি করছে। চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারো। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রায়ই ওকে দেশের বাইরে যেতে হয়। দেশের বাইরে যাওয়াটাকে ওই অর্থে অন্যকিছু ভেবো না। শাওলিন ওর কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদ। মেয়েটা যোগ্য ব্যক্তির কাছেই থাকবে। দয়াকরে আর ব্যাঘাত ঘটিয়ো না রেবা। আমি খালিহাতে শুধু শাওলিনকে চাচ্ছি, আর কিচ্ছু না।
এরপর আর কোনো কথা থাকে না। রেবেকা ভীষণভাবে চাচ্ছিলেন কিছুটা সময় নিতে। কিছু দিন বা সপ্তাহ ওর ঝুলিতে আসুক। কিন্তু সময় যেন আঁটঘাঁট বেঁধেই মাঠে নেমেছে। আজ কোনোভাবেই ভাগ্য আকাশে তারা ফুটবে না। যদি এখানে সম্মতি দিয়ে দেয়, তাহলে ব্যাপারটা মেনে নিবে শাওলিন? বিয়ের দিনই যে বর বদল হলো, এই ভয়ংকর ব্যাপারটা ও মেনে নিবে কী? রেবেকা অনিশ্চিত চোখে তাকিয়ে রইল। বুঝতে পারল না পরিস্থিতি।
.
তাপমাত্রা নিম্নতর। গুগল বলছে ২৫° সেলসিয়াস। বাইরে দাপুটে বৃষ্টির তোড়। ঝড়ের উত্তাল বাতাসে গাছের মাথা বেঁকে যাচ্ছে। সুউচ্চ তাল ও নারকেল গাছের ডালপালা একে অন্যের গায়ে আছাড় দিয়ে লুটিয়ে পড়ছে। গা শিরশির করা ভয় জাগানো দৃশ্য! শাওলিন কাঁচের জানালা ভেদ করে রূঢ়মূর্তির সেই আকাশপটকেই দেখছিল। ওর গা জুড়ে লোহার মতো ভারি অনুভব করা শাড়ি। তখনো মাথা ও মুখ দীর্ঘ দোপাট্টায় আবৃত। দুহাত ভর্তি লাল চুড়ির রিনঝিন, চুড়িতে স্বর্ণরঙা জরির ঝিকিমিকি স্ফুরণ। খসখসে অমসৃণ কাঁচের চুড়িগুলো ওর হাতের ত্বকে বিষদাঁত বসাচ্ছে। মেহেদির গাঢ় রঙের দরুন সেই চামড়ার লাল ভাব, চিড়ে যাওয়া, কিছু ফুলে ফুলে যাওয়া অবস্থাটা অগোচর। একটু আগে খবর এসেছে আছরের নামাজের পর প্রস্তুত হতে। বাইরে থেকে কাঙ্ক্ষিত একটি ডাক আসবে ওকে নিয়ে যেতে। এই মুহুর্তে ঘোলাটে দৃষ্টিজুড়ে শুধুই নির্লিপ্ততা। কোনো পুলক ছাপ ওই দুচোখেতে নেই। তাহমিদের হারিয়ে যাবার সংবাদে যতটা না স্বস্তি টের পেয়েছে, তার বহুগুণ পাথর হয়ে গেছে একটি মহিলার কথা শুনে।
হ্যাঁ মহিলা। মায়ের বয়সি মহিলা। মায়ের জাত তারা, অথচ মায়েরা এমন হিংস্র কুভাষী হয়? তার ছেলে নিখোঁজ, প্রচণ্ড ভয়ে কুঁকড়ে আছে মাতৃমন, তাই বলে অন্যের সন্তানের ওপর হিংস্র আক্রমণ? দোষ-দায় সব চাপানো? শাওলিন কী নিজের ভাগ্যটা নিজে লিখেছে নাকি যে তাহমিদের এমন পরিণতি হোক, সেটা গল্পের পর্বভিত্তিকের মতো সেঁটে দিয়েছে? এ কেমন নির্দয় আচরণ? নীরব ঘরটায় ঠকঠক শব্দ ছড়ালো। কেউ একজন নব মোচড়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
- জানা, কাজি এসে গেছে। শেষ মুহুর্তে যদি টাচআপ করতে চাস, নিয়ে ফেল। পরে আর সময় পাবি না।
প্রত্যুত্তরে নির্নিমেষ তাকাল শাওলিন। দুটো নিঃশব্দ প্রহর খরচ করল সোহানার দিকে চেয়ে। সোহানা একটা খুশি মাখানো হাসি দিয়ে ঘরে ঢুকেছিল, হাসিটা ওর ম্লান মুখটায় তাকিয়ে কর্পূরের মতো উবে গেল। দরজাটা বন্ধ করে পায়ে পায়ে শাওলিনের কাছে এলো সোহানা। ওর পায়ের কাছে কার্পেট বিছানো মেঝেটায় বসে পড়ল পা মুড়িয়ে। মুখ তুলে তাকাল বান্ধবির ঘোমটায় ঢাকা মুখটুকুতে। ফিচেল এক টুকরো হাসি দিয়ে বলল,
- ভয় পাচ্ছিস? ভয় পাস না দোস্ত। মনে করবি আজকের দিনটা আল্লাহ এমন করেই সাজিয়েছেন। যেখানে তোর ইচ্ছেটা ঘুরেফিরে তোর কাছেই চোরাপথে এসে গেছে। তুই মুখ ফুটে বলিসনি কিন্তু অনেক কিছু গত দু-তিনদিনের ঘটনায় বুঝতে পেরেছি। নাযীফকে যখন প্রথমবার বুঝতে শিখেছিলাম, তখনি বুঝেছি কিছু বিষয় মানুষকে বলে বোঝানো দুষ্কর। যে বোঝে, সে বুঝতে নিতে জানে। অন্যের বুঝটা পড়ে ফেলতে পারে। চিরকুটের লেখাগুলো উনার ছিল তাই না? তারপর তোর ফোনের ওই টেক্সট, যেখানে ইংরেজিতে চার বাক্য, তোর মতো রসকসহীন মেয়ে বই নিয়ে বসে আছে, যে জীবনে বই উপন্যাসের নামও ঠিকঠাক বলতে পারে না। গল্পগুচ্ছর প্রথম পাতায় স্বপ্নদর্শী… এসব তো তুই জানতিস।
এটুকু বলে থেমে যায় সোহানা। ওর কোলের ওপর থেকে একখানা ছোট্ট হাত নিজের মুঠোয় তুলে নেয়। নিজের দুটি হাত দিয়ে সেই হাতকে ঢাকা দিয়ে বলে,
- যেকোনো বিপদ হোক, যেকোনো সমস্যা, একবার শুধু কল দিবি। আর কারো নাম্বারে কল দিস না বা দিস, আমাকে যদি তোর বিশ্বাসী মনেহয় শুধু একটাবার কল দিস। দেখবি আমি একাই চলে এসেছি। খাগড়াছড়িতে ওরা তোকে একা ছেড়ে গিয়েছিল, সেই দুঃখ আমি কখনোই ভুলিনি। ওদের আমি এখনো মাফ করিনি। . . ওরা সত্যিই স্বার্থপর। যতই মাফ চেয়ে তোর কাছে মিলে থাকুক, আমি তো ঘটনাটা ভুলতে পারি না। এতোগুলো মানুষ আমরা হেসে-খেলে গেলাম। বিপদ মুখ বাড়াতেই শুধু একজনকে ফেলে এলাম।
কথাটা বলতে গিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল সোহানা। কখন যে ওর কণ্ঠের সঙ্গে মাসুম মনটা দ্রবীভূত হয়ে গেছে, সোহানা নিজেও তা টের পায়নি। আজ বড় কষ্ট হচ্ছে! এক অদ্ভুত চাপা কষ্ট। এই কষ্টের দেখা বা প্রকাশটা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। শুধু মুখের বুলিতে যেটুকু তিলভাগ অস্ফুটে উচ্চারণ হয়। শাওলিন আস্তে করে অপর হাতটা সোহানার মাথায় রেখে দিল। নরম চুলগুলোতে ওর সরু আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলল,
- নাযীফ ভাই ভীষণ ভালো মানুষ। মানুষটাকে কখনো একা ছেড়ো না। সে তোমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। হয়ত সেভাবে কথার আদরে প্রকাশ করতে পারে না।
সোহানা নত মুখ উপরে তুলে তাকাল। চোখজুড়ে অবাধ অশ্রুর ঢল। একসঙ্গে পড়াশোনা করেনি, এক শ্রেণিতেও বসেনি, স্নাতক থেকে স্নাতকোত্তরের ফারাক, তবু শুধু পরিচয় ‘বন্ধু’। এই বন্ধুত্বের বয়স বেশিদিন পুরোনো নয়, তবু আত্মিক মনোনয়ন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘদিনের। সোহানার অশ্রুমাখা চোখদুটো দেখে শাওলিন আঙুলে আঙুলে পানিটুকু মুছে দিল। কোলে যে টিস্যুটা ছিল, সেটা দিয়ে সাবধানে চোখের সাজ বাঁচিয়ে শুষ্ক করে দিল। সোহানা বিরাট একটা রসপূর্ণ হাসি হেসে বলল,
- আমার বিয়েতে তোর একমাস থাকা চাই। একমাস কীভাবে ম্যানেজ করবি জানি না। বিয়ের তারিখ ফেললে কোনো এক ঈদের পরপরই ফেলব। একমাস ছুটিতে আসবি রাজি?
শাওলিন দোপাট্টার ওপাশে ওর চোখদুটো দিয়ে হাসলো। ঠোঁটদুটো নিশ্চল। চোখের ভাষায় ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,
- মঞ্জুর। আমি রাজি।
- এবার উঠে পড়। তোর আসল বর নেমে এসেছে। এতো করে বাড়ির মানুষ বলল, বিয়ের শেরওয়ানি পরতে। তাহমিদেরটাই কিন্তু! ইনট্যাক্ট প্রোডাক্ট! তাও সেটা ছুঁয়েও দেখল না। কী জেদ!
এ কথার প্রত্যুত্তরে কী বলা যায় শাওলিন তা জানে না। যে লোক শার্ট স্যূট প্যান্ট ছাড়া কিছুই পরে না, সে কী হঠাৎ মত বদলি করে বাঙালি পোশাক পরবে? মনে হয় না। শাওলিন কখনো তাকে ভিন্নধর্মী পোশাকে দেখেনি। ঘরোয়াভাবেও টিশার্ট প্যান্ট ট্রাউজার ছাড়া অন্যকিছুতে না।
.
বাদ আসর পরবর্তী মুহুর্ত। বিরাট হলঘরে শান্ত, সুনিবিড় পরিবেশ। জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ফরসা স্থির আলো। অথচ বাইরে আষাঢ়ের মতো কালো ঘুটঘুটে আকাশ, মেঘে মেঘে চলছে দুর্বিনীত ফাটল। বজ্রপাতের গর্জন তখনো কমেনি। সোফার দুদিকে দুটি পক্ষ। মাঝখানে সেন্টার টেবিলটি। টেবিলকে মাঝ বরাবর অদৃশ্য ভাগ করে একটি লাল শামিয়ানা ধরা হলো। যার ডানপাশে কণে, বাঁপাশে বর। দুপক্ষের ঠিক মধ্যবর্তী সোফায় বসে আছেন কাজি। বৃদ্ধ দেহ, মুখে নুরানী ঔজ্জ্বল্য, মাথায় টুপি, গালজুড়ে মেহেদি রাঙা দাড়ি। পরনে সফেদ পরিচ্ছন্ন পাঞ্জাবি পাজামা। গা থেকে যে আতরের খুশবুটা আসছে তা মন শান্ত করা। কাজি উভয়পক্ষের সবদিক শুনে বিয়ে পড়ানো শুরু করেন। ঘরের ভেতর চাপা একটি অস্থিরতা বাতাসের মতো ঘুর ঘুর করল। প্রথমে কণের কাছে কবুল বলানো হলো। স্বরটা মাত্রাতিরিক্ত নিচু। নত করা মাথাটা কেউ একজন তুলে ধরল কিঞ্চিত, ফের আরেকজন ঠেলা দিয়ে বলল,
- জোরে বলো। কাজি শুনতে পাচ্ছেন না।
কণে ঠোঁট দুটো কাঁপিয়ে উচ্চারণ করল। কেবল শুনতে পেল কাজি সাহেব। তিনি কণের নামের পাশে দুটো মরহুম শব্দ দেখে হোঁচট খেয়ে গেলেন। অভিভাবক হিসেবে নাম দেখলেন ভাবীর। নিশ্চুপ হয়ে গেলেন বৃদ্ধ। কোনো অজানা কারণে প্রচণ্ড দুঃখ হলো। কবুল বলার পর স্নেহের হাতটা বুলিয়ে দিলেন ওর মাথায়। দোয়া করলেন মনে মনে। দিল খুলে। বরের কাছ থেকে দৃঢ়চিত্তে তিনবারই কবুল শুনতে পেলেন। স্পষ্ট, অবিচল, বিচক্ষণ স্বর। অবশেষে যখন বিয়ে সম্পণ্ণ হলো, তখন দেখা গেল এক ঘোর বিপত্তি। বাইরে যে ঘোর আঁধার, মুষলধারার বৃষ্টি, এতে যান চলাচল সম্পূর্ণই বিঘ্নিত। প্রধান সড়কগুলোতে হাঁটুজল একাকার। শোয়েব আকাশ পর্যবেক্ষণ করে হাতঘড়িতে তাকিয়ে বলল,
- রাফান দেরি করা চলবে না। গাড়ি বের করো। তুমি আর পার্থ কালোটা নিয়ে এগোও। রাস্তার অবস্থা কেমন দেখো। দেরি করে লাভ নেই।
- জি স্যার। কিন্তু আপনি বাকিদের নিয়ে একা আসবেন? আপনার জন্য লং ড্রাইভ করাটা ঠিক হবে? হাতটা তো..
- সেসব ভেবো না। পারব। ঢাকা ছাড়াটা জরুরি। তাহমিদের ডিপার্টমেন্ট থেকে কোনো খবর এসেছে?
- না স্যার। এখনো না। তবে আশঙ্কা করছি ডিজিএফআই কোনো সাহায্য করবে না। কিছু একটা অঘটন হচ্ছে। বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়াটা ওদের কাজ ছাড়া আর কাদের হবে? ওরাই নিজেদের কর্মীকে তুলে নিয়ে একটা মিথ্যা অপহরণের নাটক সাজালো।
সদর দরজার বাইরে ওরা দাঁড়িয়ে ছিল। রাফান পোশাক বদলে এসেছে। পরনে কালচে শ্যাওলা রঙা শার্ট, কালো প্যান্ট, কানে ব্লুটুথ কালো ডিভাইস। দমকা বাতাসে মাথার ঝরঝরে চুল উড়ছে, কপালে আছড়ে পড়ছে চুলের ঝাপটা। কানে নীল আলোটা জ্বলছে অনবরত। শোয়েব কিছুটা সময় খামোশ থেকে প্যান্টের পকেট থেকে হাতদুটো বের করল। গম্ভীর শ্বাস ফেলে ভরাট-দীপ্ত স্বরে বলল,
- আজকাল তোমাদের নিয়ে ভয় হয় রাফান। তোমাদের দুজনকে নিয়ে। পার্থ তো নিজের পরিবার ছেড়ে নিঃশর্তে চলে এসেছে। আর তুমি পরিবারের মোহ কাটিয়ে আমার সঙ্গে। এভাবে আর কতদিন চলবে?
হঠাৎ এমন কথার সুরে রাফান চটকা মেরে ডানপাশে তাকাল। চোখটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে শোয়েবের মুখের ওপর বিদ্ধ করে শুধাল,
- এভাবে কেন বলছেন স্যার? কোনো ভুল হয়েছে? তাহমিদের ওপর যথাযথ নজর দিইনি বলে অসন্তুষ্ট?
মৃদু হেসে আকাশ থেকে মুখটা ফিরিয়ে তাকাল বাঁয়ে। চশমাধারী চোখদুটো হাসিতে প্রোজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ঠোঁটের কোণে তেরছা এক টুকরো মিটমিটে হাসি। লালচে দুটো পুরুষালি ঠোঁটে হাসিটা জিইয়ে রেখে শোয়েব মৃদু ইঙ্গিতে বলল,
- রাফান তোমার দায়িত্ব আরো বাড়ল। এতোদিন একা ছিলাম, এখন দোকা হলাম। দায়িত্ব কী দ্বিগুণ না? সামনে কততম হব জানা নেই তো! তোমারও তো এখন দ্বিগুণ হওয়াটা দরকার। কবে হচ্ছ? কথা কী আগাব একটু?
রাফান চোরা ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি গা বাঁচাতে চাইল। ‘ স্যার, এক মিনিট!’ বলে দ্রুত ব্লুটুথে ‘হ্যালো? হ্যাঁ?’ বলে কেটে পড়ল সে। ওর লালচে মুখখানা দেখে হো হো করে হেসে ফেলেছে শোয়েব। হাসির স্বর শুনে দূর থেকে দাদি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। চোখের তারায় উনারও খুশির উপচানো ঢল। হাতে লাগেজের কালো হ্যাণ্ডেল। পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসছেন সদর দ্বারে। পেছন থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে রণে ভঙ্গ দিলেন বৃদ্ধা,
- বউ নেমে আসছে। ওকে গাড়িতে ওঠাও দাদু।
.
ঝুম বৃষ্টির ভেতরে দুটো গাড়ি সবেগে ছুটল। মর্তুজা মেনশনের গেট পেরিয়ে কুমিল্লা রোডে উঠল। সামনেই এসে যাচ্ছে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক। কিছুটা স্বস্তিকর দেখাল শোয়েবকে। ড্রাইভের গ্রিপ ইতোমধ্যে শিথিল করেছে। বুকের কাছ থেকে খুলে নিল শার্টের টপ বাটন। স্যূটটা বহু আগেই খুলে রেখেছে। সমুখের কাঁচ দুটো দুরন্ত ওয়াইপার দ্বারা বৃষ্টির স্রোত সরাতে তৎপর। ফ্রন্ট আলোর কল্যাণে রাস্তাটাও এখন অন্ধকারে স্পষ্ট। গাড়ির আভ্যন্তরীণ পরিবেশ এসির হাওয়ায় ঠাণ্ডা। সবাই ক্লান্তি ও জার্নিতে ঘুমে ডোবা। কেবল একজোড়া চোখ তখনো অতন্দ্র তাকিয়ে আছে। ঘুমোয়নি গোটা পথ। ব্যাপারটা স্বস্তি দিচ্ছিল না শোয়েবকে।স্পিডটা আরেকধাপ বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ চোখ আঁটকাল সমুখে। লুকিং মিররে তাকিয়ে আছে দুটো চোখ। ফুটে ওঠেছে পেছনে বসা একটি মুখায়ব। শোয়েব কী বুঝল কে জানে, স্পিডটা যেটুকু বাড়িয়েছিল সেটুকুও কমিয়ে দিল। চকিতে তাকিয়ে দেখল, আয়নায় সেই মুখ স্বস্তির শ্বাস ফেলছে। ইচ্ছে করছিল মাথা পিছু ঘুরে একবার জিজ্ঞেস করতে, কেন সে ঘুমাচ্ছে না? গাড়িতে কী কোনো অসুবিধে হচ্ছে? সিটটায় কোনো সমস্যা? কিন্তু অজ্ঞাত কারণে শোয়েব কিছুই জিজ্ঞেস করল না।
অন্যদিকে ভারি শাড়িটা আর সহ্য করতে পারছিল না। দম আঁটকে আসছে ওর। মাথা প্রচণ্ড ভার ভার। হাতদুটো ছিলে গেলে যেভাবে জ্বলে, ঠিক সেভাবেই জ্বলছে। শরীর অসাড়, বিহ্বল, খুব একটা সুস্থ অনুভূতি দিচ্ছে না। ঘুমোনোর জন্য বহুবার চেষ্টা করল, কিন্তু গলার কাছে কী যেন একটা আঁটকে আছে, নিঃশ্বাস থেকে ঢোক সবটাই ওখানে বিঁধে যাচ্ছে। ওর অবস্থাটা বোধহয় অন্য কেউ টের পেয়ে গেছিল। হঠাৎ নিজের হাঁটুর কাছে দুবার টোকার মতো অনুভূত হল। নত দৃষ্টিটা চট করে তুললে একটা বলিষ্ঠ হাতকে দেখতে পেল শাওলিন। কবজিতে মেরুন শার্টের হাতাটা কাফড লিংকে আঁটকানো। চকচক করছে দুটো রূপোলি কাফড লিংক। ওই হাতে একটি দামি রিষ্টওয়াচ। ওকে স্তব্ধ দেখে ফের ওই হাতটা ওর হাঁটুতে টোকা দিল। সমস্ত দেহ যেন ওই স্পর্শে কেঁপে উঠল ওর। হঠাৎ কী হলো কে জানে। শাওলিন দেখল বদ্ধ মুঠোটা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। বিরাট থাবার মতো হাতে ছোটো ছোটো প্যাকেটে বার্মিজের আচার। শুকনো বরই, ঝাল মরিচে মাখা চার পাঁচটি প্যাকেট। শাওলিন উজবুক হয়ে সামনের আয়নাটা চোখ ফেরালো। সেখানে একপলক নজর বুলিয়েই ড্রাইভে মনোযোগ দিল শোয়েব। ওর কোলের ওপর প্যাকেটগুলো রেখে হাতটা ফিরিয়ে নিল সে। শাওলিন হতবাক, বিস্মিত, বিমূঢ়! দৃশ্যটা হয়ত কিছুই না, কিন্তু ওর কাছে অনেক কিছু! একটু পর ছোটো একটি পানির বোতল একইভাবে ওর কোলে রাখল লোকটা। হাতটাও একইভাবে ফিরিয়ে নিল সেই শক্ত স্টিয়ারিংয়ে। শাওলিন অনুভব করতে পারছে পুরো গাড়ির ভেতর একমাত্র তার চোখদুটো ওকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তার চাহনিযুগল ওকে খেয়াল রাখছে। প্রতি মুহুর্তে বুঝে নিচ্ছে ওর অব্যক্ত কথন। শাওলিন দুহাতের ভেতর দৃঢ় করে ওগুলো ধরে রইল। একটাও ছিঁড়ে খেল না। চোখ থেকে এইবার অশ্রু বেরিয়ে আসছে। যে অশ্রু বিদায়ের সময়ও বেরোল না!
.
রাত গভীর। পাহাড়ি রাস্তা শুরু হয়ে গেছে। সেই পাহাড়! যেখানে এসেছিল শেহজানা আলম! এই সেই বন ঘনানো প্রকৃতি, যেখানে চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে দম টেনেছিল! রাতের আঁধার, মাথার ওপর উঁচু উঁচু গাছ, দুধারে ঘন জঙ্গল, বাতাসে পাহাড়ি হিম গন্ধ। সবুজ পাতার সুমিষ্ট ঘ্রাণে শাওলিন হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। মাথাটা ডানে ঘুরিয়ে আগ্রহ নিয়ে পথ চলতি দৃশ্যটা দেখল। সেই মুগ্ধ করা চাহনির দৃশ্যটা দেখল বন কর্মী মানুষটাও। তার অবাধ বিচরণ যে পাহাড়ে, অঞ্চলে, সেই জায়গাটাকে তার সদ্য বিবাহিতা ব্যাকুল নয়নে দেখছে! উশখুশ করছে ওই ঘোমটা আবৃত চোখদুটো। টলটলে দেখাচ্ছে চোখের তারা। ইচ্ছে করছে ওকে বলতে,
” খোশ আমদেদ শাওলিন। খাগড়াছড়িতে স্বাগতম! মুক্ত প্রকৃতির রাজ্যে স্বাগতম। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে স্বাগতম। তোমার রিনরিনে সুরটা শোনার জন্যে স্বাগতম।”
শোয়েব কিছুই বলল না। তার ঠোঁট দুটো আজও বাঁধন ছাড়া হলো না। শোঁ শোঁ মুক্ত বাতাসে প্রাণ জুড়ে আসছে খুব। জানালাটা খুলে দিয়েছে, এসিটাও করা হয়েছে বন্ধ। সবাই জেগে উঠেছে গাড়িতে। প্রত্যেকেই দেখছে রাতের সুনিবিড় শান্তি ছাওয়া দৃশ্যপট। এখানে বৃষ্টি নেই। তবে আকাশ মেঘে ঢাকা। প্রকৃতিতে এক অদ্ভুত শীতল ভাব। চারধারে ফিনফিনে কুয়াশার আস্তর। কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে কুহকী মায়াজাল সৃষ্টি করেছে। গাড়িটা কিছু চেকপোস্ট সম্পণ্ণ করে আরো ভেতরে ঢুকে গেছে। গায়ে শিরশির করে কাঁটা দিচ্ছে ওর। বুকের ভেতর এক অদম্য শিহরণ। কানের কাছে ঝিমঝিম করা আগুনে স্পর্শ। খাগড়াছড়িতে ঢোকার পরপরই সমুখে আয়নাটায় তাকানো যাচ্ছে না। দুটো অন্তর্ভেদী চক্ষু ওকে দেখে চলেছে দুর্বিনীত ভাবে। যেন আর একপ্রহরও ধৈর্য মানছে না তার স্নায়ু। একমুহুর্তও দূরত্ব মানছে না তার চাহনি। কানের লতি উত্তপ্ত উনুন। বুকে ঢিপঢিপ করছে ঝড়ো গতিতে। এমন সময় লক্ষ করল, গাড়িটা সেই চিরচেনা গেটে ঢুকে পড়েছে। সেই সুউচ্চ, বিশাল, প্রস্তরীভূত দ্বার দুটো। গাড়ি আরো ভেতরে ঢুকে একদম বাড়ি সংলগ্ন সীমানা ঘেঁষে থামাল। দুরুদুরু বুকের কাঁপন নিয়েই চোখটা সমুখে ঘুরাল শাওলিন। হলদে বাতির আলোয় সেই কাঙ্ক্ষিত দরজাখানা! সেই একই নামফলক, সেই বজ্রমেঘ খোদিত নাম, সেই ভুবন বিস্মৃত বাংলোর খণ্ড টুকরো স্মৃতি, সঙ্গে জড়িত ভাগ্যের অলিখিত পরিণাম।
রাত তখন কটা বাজে জানা নেই। শোয়েব গাড়িটাকে জায়গামতো রেখে রেঞ্জারের খোঁজ নিয়ে অবশেষে বাংলোয় ঢুকল। নিচতলায় একমাত্র দাদী ছাড়া আর কেউ নেই। ভাবীরা যার যার ঘরে ঘুমোতে চলে গিয়েছেন। পার্থ ফিরে গেছে কোয়ার্টারে। রাফান চেকপোস্টের সেখানে ব্যস্ত। ফাতিমা নিজেও হাসিমুখে কুশলী পরামর্শ দিয়ে ফিরে গেছেন ঘরে। সদর দরজা আঁটকে পায়ে পায়ে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠছিল শোয়েব। দোতলা শুধুই তার রাজত্ব। পুরো বাংলোটা হিমাগারের মতো নিস্তব্ধ। তার দীপ্ত পদশব্দ দুপ দুপ করে প্রতিধ্বনি তুলছে। এমন অখণ্ড পিনপতন নীরবতায় নিজের ব্যক্তিগত ঘরের সামনে থামে সে। ভেতরে সাড়াশব্দ নেই। দুহাত দরজায় রেখে জোরে ঠেলে পা বাড়াল। ধাম করে একটা অস্ফুট আওয়াজ ফুটে ভেতরের মানুষটিকে সজাগ করে দিল। শোয়েব দেখল তার বিছানায় গুটিশুটি পাকিয়ে মানবীটি বসা। তার গায়ের আভরণ বৈদ্যুতিক বাতিতে জ্বলজ্বল করছিল। তার একান্ত বিছানায় নিশ্চুপ বধূটি জড়সড়। কাঠের দরজাটি ভেতর থেকে আঁটকানো হলো। টাস করে শব্দ হতেই নিভল ঘরের আলো। শব্দটা ধক করে বুকে আঘাত করল! গুম গুম করে যেন নিংড়ে এল অন্তঃকোণ! পায়ে পায়ে যে মানুষটি নিকটবর্তী হচ্ছে, তার কড়া পারফিউমের মাদক মাদক ঘ্রাণে চঞ্চল হচ্ছিল অন্তর। বিছানার চর্তুদিক ঘেরা ফিনফিন করা পর্দায় কারো হাত পড়ল, মুঠোটা পাকিয়ে উঠল আচমকা, এরপরই ঝটিতি পর্দাটা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল দীর্ঘদেহটি। ঘুটঘুটে আঁধারে তার অস্তিত্বের উষ্ণতা শাওলিনকে ছুঁয়ে গেল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। রক্তে টের পেল দাপুটে নাচন! কানের পাশ ছুঁয়ে হিম জাগানো গলাটা কেমন ভরাট স্বরে বলল,
- শাড়িটা খুব ভারি?
বুকটা ধড়ফড় করে কাঁপছে। এমন স্বরে কথাটা ফুটেছে, যেন ওর হৃৎপিণ্ড কাবু করে ফেলেছে। শাওলিন দুহাতে হাঁটুজোড়া খামচে খুব আস্তে বলল,
- হ্যাঁ।
- পালটাতে চাও?
এবারও চোখ বন্ধ করে অস্ফুটে স্বর ফোটাল,
- জ্বি।
- তাহলে উঠে আসো। বাড়তি পোশাক রাখা আছে। ফ্রেশ হয়ে পালটে নাও।
এরপর আর কিচ্ছু বলল না। যেভাবে গুমোটপূর্ণ আবহাওয়ার মতো এসেছিল, সেভাবেই বিছানাটা থেকে শাওলিনকে জায়গা করে দিল। অন্ধকারটা খুব একটা বিপাকে ফেলল না। বরং চোখের ওই বিদ্যুৎ চাহনিটা থেকে রক্ষা করল ওকে। নয়ত আজ কেন ওই চোখে তাকাতে পারছে না? কেন বুকের ভেতরটা বড্ড ধুকপুক করছে? পায়ে পায়ে ভারসাম্য রেখে শাওলিন হাতমুখ ধুতে চলে গেল। যখন শাওলিন পোশাক বদলে ঘরে পা দিল, তখন এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল কেউ একজন। আলো জ্বাললেও চোখ সয়ানো আঁধারে সম্পূর্ণই ওকে দেখতে পাচ্ছিল শোয়েব। এবার যেন সম্মোহিতের মতো ডিভান থেকে উঠে রুমের আলোটা জ্বালাল আচমকাই! চমকে ওঠে সুইচবোর্ডের কাছে চাইল শাওলিন। লোকটার গায়ে শুধুই মেরুন শার্ট। কোমর থেকে বেল্টটা খুলে ফেলা। শার্টের স্লিভদুটো গুটিয়ে গুটিয়ে কনুইয়ের কাছে মোটা ভাঁজ করা। চুলে বোধহয় আর জেল নেই। এবার ঝরঝর করছে কপাল জুড়ে, তার ভ্রুঁ দুটোর ওপর দুরন্তপণায় খেলছে দুষ্টু চুলগুলো। সুইচবোর্ড থেকে হাত নামিয়ে ওর দিকে আপাদমস্তক চোখদুটো ঘুরিয়ে আনল শোয়েব। ধীরে ধীরে ওর অবয়বটুকুর ওপর বুলিয়ে আনল তার অন্তর্ভেদী চাহনি। কী ছিল ওই চাহনিতে? একটা শিরশিরে কাঁটা দেয়া অনুভূতি ওকে হিম করে দিল! চোখদুটো নত করে ফেলল শাওলিন। ঠিক তখুনি কানে শুনতে পেল,
- ওযু করতে পারো?
মাথাটা হ্যাঁ বোধক দোলাল। পরক্ষণে আবার শুনল,
- তবে ওযু করে এসো। আলমারির প্রথম তাকে জায়নামাজ রাখা। দুটো জায়নামাজ ফ্লোরে বিছিয়ে দিবে।
কথামতো সেভাবেই ওযু করে আলমারিটা খুলল শাওলিন। দুটো জায়নামাজ নিল তাক থেকে। কাঠের মেঝেতে দুখানা জায়নামাজ বিছালে পেছন থেকে দৃঢ় পায়ে এসে গেছে শোয়েব। একটায় শাওলিনকে দাঁড়াতে বলে, অপরটায় দাঁড়িয়ে গেল সে নিজেই। শাওলিন দেখল ওর ঠিক দু কদম সামনে দাঁড়িয়েছে শোয়েব। মাথায় সাদা রুমাল দিয়ে বাঁধা। লম্বা মানুষটির পেছনে চুপচাপ দাঁড়ালে তার দেখাদেখি দু রাকাত সালাত আদায় করল শাওলিন। ওর বুঝতে বাকি নেই এটা বিবাহ সংক্রান্ত সালাত। এই মুহূর্তে ওর কেমন অনুভূতি হচ্ছে তা স্রষ্টা ব্যতীত আর কেউ জানেন না। আজকের রাতটি নিয়ে আকাশকুসুম ভাবনা ছিল। কিন্তু এমন অপ্রত্যাশিত কিছুকে চিন্তাও করতে পারছিল না। যদি শাওলিন জানতো, তার ভাবী এই পুরুষটিকেই নাস্তিক বলে ভাবতো, তবে আজ এ ঘটনা কেমন দৃশ্যপটে থাকতো? দুহাত তুলে যখন দুজনই মোনাজাত করছিল, তখন একজন দীপ্ত স্বরে চোখ বন্ধ করে বলছিল,
- হে রব, যাকে বিয়ে করেছি, তাকে আজন্ম রক্ষা করবার তৌফিক দিন। আমার মৃত্যু ব্যতীত বিচ্ছেদ যেন না হোক। পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত এই ফরমান আমার কবুল হোক। আমার পরবর্তী বংশধর আপনার হাওলায়। আপনি মালিক, আমি পাপী। দুনিয়ার কাউকে আমি পরাক্রম মানি না। যেখানে আপনি শক্তিশালী। যেখানে আমার নিঃশ্বাসের ভার, আমি সেই আরশের কাছে আমার স্ত্রীর জন্য হেফাজত চাইলাম। কবুলের মালিক আপনি। রাতের শেষ প্রহরে শুনেছি দোয়া কবুল হয়। অটল বিশ্বাস রাখছি আজ এই দোয়া কবুল হলো। ইয়া আরশিল আযীম, আমীন।
মোনাজাত শেষ হতেই মাথা থেকে রুমাল টেনে খুলল শোয়েব। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু তাকাল সদ্য বিবাহিতা মেয়েটির দিকে। ওর ছোট্ট হাতদুটো কোলের ওপর রাখা। চোখ দুটি বন্ধ। অস্বাভাবিক ভাবে চোখের পাতা দুটো নড়ছে। আঙুলগুলো কেমন যেন স্থির নয়। শোয়েব একটু ওর দিকে ঘুরে ওই আঙুলগুলো ছুঁতে চাইল। কিন্তু সে ঘুরে বসতেই তৎক্ষণাৎ একটা ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে গেল! শোয়েব চমকে উঠল আচমকা! “শাওলিন” বলে চ্যাঁচাতে যাচ্ছিল সে! কিন্তু থমকে গেছে পরিস্থিতির কাছে! শরীরী ভারসাম্য হারিয়ে বসেছে শাওলিন। এতোক্ষণের প্রাণশক্তি সবটুকু হারিয়ে ফেলল। দেহ যেন অসাড়, নিষ্প্রাণ! ঠিক তখুনি ওর দেহটা দুটো সাড়াশির মতো হাত তৎক্ষণাৎ আগলে নিল। প্রবল আক্রোশে টেনে আনল সুকঠোর বুকের ভেতর। মাথাটা চেপে ধরল নিজের দেহে। কিন্তু ততক্ষণে শোয়েব নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেছে! চোখদুটোতে নির্বাক বিস্ফোরণ! তার বুকের ভেতর এ কী? এ যেন তপ্ত আগুনের স্ফুরণ! পুড়ে যাচ্ছে তার শাওলিনের দেহটা। গোটা পথজুড়ে না ঘুমানোর কারণ — ভেতরে ভেতরে হিংস্র জ্বর! চোয়ালের একপাশ ভয়ংকর ভাবে কাঁপতে লাগল শোয়েবের, দুহাতের দূর্গে ওকে জাপটে ধরল প্রবলভাবে! একবার যদি মুখ ফুটে বলতো শরীর খারাপ, শুধু একবার! তাহলে কক্ষণো শোয়েব গাড়ি ঘুরাতো না।
.
FABIYAH_MOMO .
নোটবার্তা — বানান, যেকোনো ভুলত্রুটি মাফ করবেন। গতকাল রাত ২:৩০ এর পর শেষ হয়েছে। অথচ আজ ফের এডিটে বসে আরেকদফা দেরি হলো। দুঃখিত, দুঃখিত। ভালোবাসা সবাইকে! আনন্দে সম্মোহন হোন!! ❤
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১০
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৮
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৫
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৯
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৩
-
বজ্রমেঘ গল্পের লিংক
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৯(৯.১+৯.২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৮