বজ্রমেঘ . ❤
পর্বসংখ্যা_২৮ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
নারকীয় কিছু ঘটতে চলেছে। আজ নয়ত কাল।হাতে কোনো সূত্র নেই। অথচ রহস্যের গন্ধ ছড়িয়েছে চারপাশ। রাফান ঘণ্টা তিনেক পরই ফিরে আসে। তার চোখমুখ অস্বাভাবিক শীতল। শোয়েব তাকে টঙ্গীর কাছে নামিয়ে দিয়েছে। সাথে নেয়নি। রীতিমতো যুদ্ধ করেছে সাথে যাবার জন্য। কিন্তু লাভ হয়নি। পার্থ সবকিছু জানা সত্ত্বেও রাফানকে ফের জিজ্ঞেস করে সব শুনল। যেটুকু তথ্য পেল, গাজীপুর থেকে যে ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সে সাধারণ কেউ নয়। রীতিমতো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার বাবা ব্যবসায়ী মানুষ। এক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। তাকে নিখোঁজ করেছে নিজের চেনা লোকেরাই। এখানে তাহমিদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছু করেনি। কিন্তু সেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য যথেষ্ট হেলাফেলা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী! কেন, কী জন্য– রহস্যজনক ভাবে ঢাকা। সেদিন রাতেই ডিউটি সামলে তাহমিদ চিন্তিত মুখে বাড়িয়ে ফেরে। বাড়িতে তারই বিয়ের রমরমা আমেজ শুরু হয়েছে। শুক্রবার জুম্মা ওয়াক্তের পর বরযাত্রী বেশে রওনা। আসরের ঠিক আগমুহুর্তে কবুল পড়িয়ে বধূকে বরণ করে আনা। কিন্তু এই মুহুর্তে তাহমিদ বিয়ের শিহরণ টের পাচ্ছে না। তার মনে আকাশ-পাতাল দুর্ভাবনা, যে দুর্ভাবনার লক্ষবিন্দু তার হেফাজতে রাখা সেই রিপোর্ট। উপরমহলের ব্যক্তিবর্গ জানে তার রিপোর্ট সম্পূর্ণ হয়নি। টিমের প্রত্যেকেই মুখ বন্ধ রাখার প্রতিজ্ঞা করেছে। রাতে নিজের রুমে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় বসেছিল, এমন সময় টুং করে একটি শব্দ হলো। ফোনে নোটিফিকেশন আসার সংকেত। ফোনটা তুলে স্থির হয়ে গেল তাহমিদ! হাত যেন কেঁপে উঠল সহসা! কোনো কথা বলতে পারল না। পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা কনকনে হিমস্রোত বয়ে গেল! চেনা একটি নাম্বার থেকে ম্যাসেজ। সেখানে শাওলিনের একটি ছবি, বোঝা যাচ্ছে, দূর থেকে তোলা। সেখানে ছোট্ট করে কিছু কথা লেখা –
“Saturday. 5PM.
304 Personal suite room.
Bring the official report.
Need your Mrs.
She’s f*** beautiful.
Don’t disappoint me .”
ম্যাসেজটা আর কারো নয়। গোয়েন্দা বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, তাহমিদের ইমিডিয়েট অথরিটি।
.
পরদিন বৃহস্পতিবার। সকালটা শুরু হয় প্রচণ্ড শোর সমাগম দিয়ে। বাড়ির একপাশে গানবাজনা চলছে উচ্চ আওয়াজে। বাজাচ্ছে তাশফিয়া, মারজিয়া, বাড়ির ছোটো ছোটো ছেলেপিলেরা। অন্যদিকে তুমুল ব্যস্ত বড়ো বয়সি মানুষরা। সাজ সরঞ্জাম সবকিছু নিখুঁতভাবে দেখতে তারা যেন বদ্ধপরিকর। বাড়িতে অসুস্থ লোক থাকায় অনেক কিছুই সীমিত পরিসরে করা হচ্ছে। নয়ত মর্তুজাদের একমাত্র ছেলের বিয়ে হতো দেখার মতো একটা। ফাতিমা নাজ ঘুম থেকে উঠেছেন খুব ভোরে। শব্দ, বাজনা, চিৎকার চেঁচামেচি মেয়ে তাহমিনার বাড়িটা গমগম করছে। বৃদ্ধা নিজের অতিথি ঘরে বসে দিবারাত্র অনেক কিছুই ভাবছেন। কিন্তু সে কথাগুলো মুখ ফুটে বলেননি। উনার গর্ভের মেয়ে দুমুখো, মিথ্যুক, স্বার্থপর, এ নিয়ে কিছু উচ্চারণ করেননি। তাহিয়া এ বাড়িতে পা দিতেই আশ্চর্য হয়েছিল। যখন ফুপু শ্বাশুড়ি তাহমিনা হবু বধূর ছবিটা দেখাল, তখন আক্ষরিক অর্থেই নির্বাক হয়ে যায়। মুখে বাক্যস্ফুরণ ঘটে না। কতক্ষণ যে বাকরুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, সে হিসেব আজ কোথাও নেই। তাহমিনা ফুপু যখন হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
- কী? বউ কেমন? দেখতে খাসা আছে না?
ওই মন্তব্য শুনে ঠেলেঠুলে হেসেছিল। কিন্তু প্রত্যুত্তরে তখনো কিছু বলতে পারল না। তাহিয়া দুহাতে শাওলিনের ছবিটি ধরে ছিল। যাকে সে সাক্ষাৎ চোখে দেখেছে, একদিন সেবাযত্নও করেছে, সেই মেয়েটিই কি না . . জীবনে এমন অকল্পনীয় ঘটনাও ঘটে? স্রষ্টার পৃথিবীতে এ কেমন রীতিনীতি? তাহিয়া ছবিটি ফেরত দিয়ে হালকা হেসে বলেছিল,
- জি ফুপু, মেয়ে চমৎকার।
এরপরই বাক্যব্যয় না করে তাহিয়া দাদীর ঘরে ঢোকে। ফাতিমা তখন বই পড়ছিলেন। চোখে সোনালি ফ্রেমের গোল চশমা। দুটো চেইন দুদিক থেকে ঝুলছে। বৃদ্ধা বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞাসু কণ্ঠে শুধান,
- কিছু বলবে নাতবউ? এসো। ভেতরে এসো।
তাহিয়া দরজাটা বন্ধ করে এল। ব্যাপারটা খাপ্পা লাগল না ফাতিমার। তিনি বইটা বন্ধ করে পাশে রেখে বললেন,
- মনে হচ্ছে কিছু আলাপ করবে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
তাহিয়া মর্মাহত চোখে তাকিয়ে ছিল। দাদীর ওই প্রশ্নে মাথা নিচু করে খাটে বসলো। কয়েকটি নীরব মুহুর্ত চুপ থেকে বেশ শান্তসুরে বলল,
- আপনি চুপ আছেন কেন দাদীজান? আপনার মেয়ে এ কেমন মিথ্যাচারটা করল? শোয়েব যদি শোনে, কক্ষনো ফুপুকে মাফ করবে না।
ফাতিমা এবার ঘটনা বুঝে গেলেন। চশমার ওপাশে বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো নিষ্প্রভ দেখাচ্ছে। কিছুক্ষণ শান্ত থেকে বলে উঠলেন,
- যখন কেউ মিথ্যা বলে কিছু পেতে চাইছে, তখন তাকে পেতে দেয়াই উচিত। তুমি আমি চিৎকার করে সত্যিটা বলব, কিন্তু কজন এ সত্যিটা মানতে রাজি? মেয়েটা তো রেবেকার ননদ। রেবেকাই এখন সবকিছু। চাইলে রেবেকার কাছে আরো একবার সবকিছু খুলে বলা যায়। কিন্তু রেবেকাই এ প্রস্তাবে খুশি না।
- তাই বলে মিথ্যা নাটক? কীভাবে অতোগুলো বানোয়াট কথা বলতে পারল? শোয়েব পাত্রীর ছবিটা দেখেনি, কিন্তু তার মানে তো এটা নয় ওরা চাল চেলে এমন কিছু ঘটাবে। আপনি প্রথমে পাত্রীর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন! আপনি প্রথমে বলেছিলেন ওই মেয়েটার কথা! শোয়েবের জন্য তো এমন কাউকেই দরকার ছিল দাদী, যার নিজের দুঃখটাও ওর মতো। দুটো এমন মানুষের মিল হওয়াই কী উচিত ছিল না? কার সঙ্গে কাকে মিলিয়ে দিল?
কথাটা বলতে গিয়ে চোখে অশ্রু ধরা দিল। বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড তোলপাড় চলছে। একটা মানুষ কীভাবে মিথ্যাগুলো বলল? রেবেকার ননদ ছোটো থেকে তাহমিদকে পছন্দ করে? বড়ো হয়ে এ দুজনের বিয়ে ঠিক হবে? কী অবাস্তব মিথ্যা! যদি এমনটা হয়েই থাকতো, তাহলে ওর বন্ধুরা সে আভাস দিতো না? শ্রেষ্ঠার কথাগুলো ভোলেনি তাহিয়া। বুঝে গেছিল এই মেয়েটার বিয়ে ঠিক। কিন্তু বিয়েটা যে এই বাড়িতে ঠিক, তাও চালবাজি করে, এটা তো তাহিয়া জানতো না।
- আপনি শুরুতেই শাওলিনকে চিনতে পেরেছেন। এজন্যই মিটিমিটি হেসেছিলেন দাদী। অধরা সেই রাতে বারবার আপনার হাসির কারণ জানতে চেয়েছিল। আপনি বলেননি।
বৃদ্ধা সুতির একটি শাড়ি পড়ে আছেন। মাথার ধবধবে সাদা চুলগুলো ঘোমটায় ঢাকা। বৃদ্ধ হাতের হালকা কাঁপুনিতে পাশ থেকে বইটা তুলে নিলেন। একটি পাতা খুলে একটি লেখা আঙুল রাখলেন। সেখান থেকে কিছু কথা ভারি নরম গলায় বললেন,
“আপনার জন্য যা নির্ধারণ করা, যদি তা দুই পর্বতের নীচেও থাকে, তবুও তা আপনার কাছে পৌঁছে যাবে। যা আপনার জন্য নির্ধারণ করা হয়নি, তা যদি আপনার দুই ঠোঁটের মাঝেও থাকে, তবুও আপনার কাছে পৌঁছাবে না। ইমাম গাজ্জালি। “
কথাটা উচ্চারণের পর মুচকি হাসলেন ফাতিমা। যেন অবাস্তব কোনো চাওয়া পূরণ হতে চলেছে। এ যেন স্বপ্ন ও সত্যের মাঝে অটল বিশ্বাস। যে বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তার প্রতি, তাঁর হুকুমের প্রতি! তাহিয়া সেই মুহুর্তে আর কিছুই বলতে পারল না। এক অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিল চুপচাপ। কথাগুলোর গভীরতা আমূল নাড়িয়ে দিয়েছে ওকে। অল্প খোলা ঠোঁটদুটো থরথর করে কম্পমান। এই বৃদ্ধা জানেন না কীভাবে উনার চাওয়াটা কবুল হবে। কিন্তু এটুকু জানেন কবুল হবেই! বইটা রেখে গাঢ় স্বরে বললেন ফাতিমা। চোখে মুখে দীপ্তির ছটা,
- তাহিয়া তোমরা এমন আচরণ করো, যেন শাওলিনকে কখনো দেখোনি। কখনো পরিচিত হয়নি। আমি দেখতে চাই, আমার মেয়ে যেটুকু মিথ্যা বলেছে, এটার জন্য ফারশাদ কেমন উত্তরটা পায়।
.
রেবেকার তত্ত্বাবধায়নে আজ শাওলিন সঙ্গপূর্ণ। কলাবাগানের ফ্ল্যাটে চলে এসেছে শ্রেষ্ঠারা। প্রত্যেকেই বাসায় জানানো শেষ বান্ধবির বিয়ে। দুটো দিন ওর বাসাতেই থাকবে। ওদের কথা চিন্তা করে ফ্ল্যাটের বাড়তি বেডরুমটা খুলে দিয়েছে রেবেকা। জোহরা খালেকের মাধ্যমে ঝেড়ে মুছে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। এখন দুপুর বারোটা। প্রায় আধঘণ্টা হলো শাওলিনের রুমে দরজা চাপানো। এই ভঙ্গিটা একেবারেই পছন্দ করে না সে। দরজা চাপানো দেখলে সন্দেহ হয়, আজকালকার ছেলেপিলেদের একটুও ভরসা নেই। কুর্কীতি ঘটাতে রূহ কাঁপে না। ডাইনিং টেবিলে দাঁড়িয়ে আপেল কাটতে কাটতে বন্ধ দরজায় নজর রাখা হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেয়েলি কণ্ঠের হাসি ভেসে আসছে। কিন্তু ক্ষণিকের ভেতর চুপচাপ, সুনশান। রেবেকা রান্নাঘরের দিকে মনোযোগ ছুঁড়ে মৃদু গলায় ডেকে উঠল,
- জোহরা আন্টি? একবার এদিকে আসুন তো। দরকার আছে। দ্রুত!
কথা মাটিতে পড়ার আগেই রান্নাঘরে বাসনকোসনের আওয়াজ থামল। এরপর ট্যাপের পানি পড়ার আওয়াজ। শেষপর্যন্ত দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলেন ভদ্রমহিলা। বেশ ধীরকণ্ঠে সায় জানিয়ে বললেন,
- বলো রেবেকা। আপেল, নাসপাতি আরো কাটতে হবে?
- না আন্টি। আপনি একবার ওই ঘরে দেখে আসুন। চারটা মেয়ে একত্র হয়েছে বোঝেনই তো। দিনকাল সুবিধাজনক নয়। দেখে আসুন কী করছে।
মাথাটা হ্যাঁ সুলভ নাড়িয়ে একটা ট্রে সাজালেন। ঝটপট চারটে পানির গ্লাস, একটা কাঁচের জগ সিরামিকের ট্রেতে গুছিয়ে পথ ধরলেন ওমুখো। দরজায় কোনোপ্রকার নক করলেন না। যেন এসব আদব বেকায়দা উনার আর রেবেকার জন্য মাফ। ঘরের ভেতর হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকতেই কিঞ্চিত চমকে উঠল ওরা। শাওলিন এমনটায় অভ্যস্ত। বাকিরা ওর দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চাহনি ছুঁড়ে ফের আগত জোহরার পানে তাকাল। জোহরা ওদের ভাবভঙ্গি দেখে কিছুটা আঁচ করতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ছড়িয়ে বললেন,
- তোমরা দরজা চাপিয়ে কী করো? বাসায় কী আমরা ছাড়া কেউ আছে? দরজা লাগাবে না। এটা খারাপ দেখায়। পানি নাও। একটু পর হালকা নাশতা কিছু দিয়ে যাচ্ছি।
শ্রেষ্ঠার কাছে ব্যাপারটা ভালো লাগল না। ওর প্রতিবাদী সত্তা বিদ্রোহের মতো ফুসে উঠল। কণ্ঠে তেজ, চোখে বিরক্তি, ঠোঁটে মেকি হাসি প্রস্তুত করে বলল,
- আন্টি, একটু পর তো গিটার তুলে গান ধরব। বান্ধবির বিয়েতে সবাই নাচ করে, কিন্তু আমি গান করব। হাই ভোল্টেজ সাউণ্ডটা যদি দরজার বাইরে যায়, আপনি কী শুনতে পারবেন? জানা বলল আপনাদের সবারই মাইগ্রেন প্রবলেমটা আছে। আপনার মারাত্মক মাথাব্যথা করবে। দরজাটা চাপিয়ে যান।
কথাটা বলেই কোলের কাছে জিদানের গিটারটা টেনে নিল। এমন ভাবভঙ্গি বোঝাল যেন এখুনি গান গেয়ে খুনাখুনি করে ফেলবে। ওর কাণ্ডে সোহানা হেসে দিল। রোজা পানির গ্লাস তুলে নিজেকে বহুকষ্টে আঁটকাচ্ছে। এদিকে জোহরা সারামুখ পাথর করে কিছু বলবে, তার আগেই রেবেকা ফলের ট্রে নিয়ে রণে ভঙ্গ দিল। ট্রেটা ওদের বিছানায় রেখে বলল,
- শ্রেষ্ঠা, নাও। আর শোনো। যেভাবে ভালো হয়, সেভাবেই করো। কোনো অসুবিধে নেই। যদি দরজা চাপালে ভালো হয়, সেটাই করো। তবে এটা তো ফ্ল্যাট, পাশের ফ্ল্যাটে সমস্যা না হলেই ভালো হয়। শাওলিন, ট্রেটা যেন ফাঁকা দেখি! শেষ করবে পুরোটা!
শেষ কথাটা শাওলিনের দিকে ছুঁড়ে রেবেকা পা ঘুরাচ্ছিল, হঠাৎ কী যেন দেখতেই চকিতে মুখ ফিরালো। সবাই তখন আপেল, নাশপাতি তুলে নিচ্ছে, ঠিক এমন সময় পায়ে পায়ে স্টাডিটেবিলটার দিকে এগোচ্ছে রেবেকা। টেবিল জুড়ে ভার্সিটির কিছু অ্যাসাইমেন্ট শিট। তার ওপর একটি ছোট্ট কাগজ। কাগজটা দোমড়ানো মোচড়ানো। তবু টানটান করা। রেবেকা সেই ছোট্ট কাগজটা হাতে তুলে ভ্রুঁ কোঁচকালো। নীল কালিতে কেউ লিখেছে, এ লেখা পুরুষ হাতের! ‘ভয় পাবার কারণ নেই। আমি। আগামী স্টপেজে নামতে পারবে? নামো! দেরি করবে না।’ রেবেকা স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। নিষ্পলক চাহনিতে বারবার লেখাগুলো মাপল। পরক্ষণে মাথা পিছু ঘুরিয়ে এক অদ্ভুত হিমকণ্ঠে বলল,
- শাওলিন? এটা কী!
ওই শীতল কণ্ঠে প্রচণ্ড চমকে ওঠে শাওলিন। মাথা ঘুরিয়ে তৎক্ষণাৎ চাইল বাঁদিকে। রেবেকার হাতের দিকে তাকাতেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল ওর! হাত-পা যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল। শাওলিন ঢোক গিলে একদম শান্ত গলায় বলল,
- ওটা চিরকুট।
- কীসের চিরকুট?
এরপর আর উত্তর নেই। শাওলিন সোজা হয়ে বসেছে। কোলে যে বইটা ছিল, সেই গল্পগুচ্ছকে পাশে রেখে দিল স্থির চোখে। ওর অবস্থা দেখে বাকিরাও চোখ ঘুরিয়ে রেবেকার দিকে তাকাল। একটা ছোট্ট কাগুজে চিরকুট দেখতে পেল। কিন্তু তাতে কী লেখা, স্পষ্ট নয়। শ্রেষ্ঠা ভ্রুঁ কুঁচকে শাওলিনের দিকে শুধিয়ে ওঠে,
- কীসের চিরকুট রে? আমি যেটা লিখেছিলাম ওটা?
হঠাৎ অন্ধকারে আলোর ঢিল দেখতে পেল। শাওলিন দ্রুত মাথাটা নাড়িয়ে দেয়। উত্তরটা হ্যাঁ-বোধক বুঝিয়ে বলল,
- সেদিন দিয়েছিলে! মনে আছে না? ছোটো চিরকুট, নীল কালি!
মিথ্যার গন্ধটা সাথে সাথে পেল শ্রেষ্ঠা। তবু নিজেকে আঁটকে নিল দ্রুতবেগে। পুরো পরিস্থিতি নিজেই একা হাতে সামলে নিতে বলল,
- ওহ, হ্যাঁ! আরে ওই চিরকুট? ওই চিরকুট তুই এখনো রেখে দিয়েছিস? হায় খোদা! কী করছিস তুই!
এবার যেন রেবেকার মুখ শান্ত হতে দেখা হলো। সে চিরকুটটা পূর্বের স্থানে রেখে মিষ্টি হাসি দিল। যেন কিছুই না এটা, খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। শ্রেষ্ঠা ওই কথার সূত্র ধরে এমন সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলতে লাগল, অবশেষে রেবেকা ঘর থেকে প্রস্থান করাটাই সমীচীন অনুভব করে। রেবেকা দরজা টেনে বিদায় হলো। কিন্তু এরপরের ঘটনা তখন সবে শুরু। রেবেকা যেতেই তুফানের বেগে শ্রেষ্ঠা ওটা হাত করল। চিরকুটে নজর বুলাতেই হাঁ করে গেল সে। আশ্চর্যে অবাক হয়ে শাওলিনের দিকে তাকাল শ্রেষ্ঠা। বুঝতে যেন বাকি নেই, শাওলিন সবার কাছ থেকে কী লুকিয়েছে! আর লুকিয়েছে একটা মানুষের আসল পরিচয়! চিরকুটের তথ্য! শ্রেষ্ঠা স্তম্ভিত কণ্ঠে শুধু বলল,
- এটা কী উনি?
.
চাঁদদর্পী রাত। ফিনফিনে রূপোলি রঙে ভেসে যাচ্ছে পুরো তল্লাট। গোল একটি চাঁদ ওই কালো আকাশে। রাত্রির ঘনঘটা এক বিভীষিকা ভয়ের জানান দিচ্ছে। রাফান স্থির হতে পারেনি। সারাদিন লাগাতার কল, ম্যাসেজ, লোকেশন ট্রেস করতেই কাটিয়েছে। কিন্তু ওই মানুষ নিজেকে পুরোপুরি অগোচর বানিয়ে ফেলেছে। নূন্যতম ট্রেস নেই তার! সিমকার্ড পর্যন্ত ফোন থেকে খুলে রাখা। দাঁতে দাঁত চেপে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। নিচে হলুদ সন্ধ্যার প্যাণ্ডেল সাজানো। গানের উচ্চ বিটে ভূমিশুদ্ধো কাঁপছে। কানের পর্দা পর্যন্ত তালা লাগার জোগাড়। একটু পরপর কেউ না কেউ এসে নিচে যাবার পর ডেকে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিবারই রাফান ভদ্রমুখে নাকোচ করে দিচ্ছে। পার্থ বিয়ের আয়োজনে দুহাত লাগাতে তৎপর, চোখ-কান খোলা রেখেছে তাহমিদের দিকে। তাহমিদ আজ কিছুটা খোশমেজাজে আছে। হলুদ পাঞ্জাবীটা একটু আগে খুলে প্যাণ্ডেলে উঠে বসেছে। কাঠের পিঁড়িতে তাকে ঘিরে তুমুল হট্টগোল! দুর্বাঘাসে হলুদ-চন্দন মাখিয়ে সকলের হাসি-ঠাট্টাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে! কিন্তু কোনোকিছুই স্পর্শ করছিল না রাফানকে। প্রায় একদিন পেরোতে চলল, অথচ শোয়েব খোঁজহীন। কেমন অভিযানে গিয়েছে, কীভাবে সামলাচ্ছে, আদৌ উনি অক্ষত আছেন কিনা, সেটিও অজানা! এমন সময় ঠকঠক করে দরজায় করাঘাত হলো। নব মোচড়ে ভেতরে ঢুকল পার্থ। পরনে খয়েরি পাঞ্জাবি, কালো প্যান্ট। দুটো হাতা কনুইয়ের ওপর তুলে রাখা। চোখে-মুখে একপ্রকার চাপা সতর্কতা ফুটিয়ে বলল,
- তাহমিদ ঘরে ঢুকেছে। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক কিছু পাইনি। অল ক্লিয়ার।
রাফান পদচারনা থামিয়ে একঝলক তাকাল। মাথাটা দুদিকে নাড়িয়ে বলল,
- বিয়েটা কাল না থাকলে এক্ষুণি গাড়ি ঘুরাতাম! ওদিকে কী ঘটছে, কিছুই আন্দাজ করা যাচ্ছে না। কোনো ট্রেস নেই! খোঁজ নেই!
পার্থ বাঁ হাত থেকে রিষ্টওয়াচ খুলছিল। সময় রাত সাড়ে আটটা। নিচে কান ফাটানো মিউজিক বক্স চলছে। জানালার কাঁচও স্থির থাকছে না। বিছানার কিনারে বসে হতোদ্যম শ্বাস ছেড়ে বলল,
- চব্বিশ ঘণ্টা পার হলো। সাপোর্ট সিস্টেমকেও জানানো যাবে না। পুলিশ-র্যাব গা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। কর্ণেল গুলজারকে একবার কল করব?
জানালার থেকে রাফান তাকাল। দু সেকেণ্ড ভাবনা-চিন্তা করে মাথাটা ধীরবেগে দুপাশে নাড়াতে লাগল। অর্থাৎ এখুনি না। অন্যদিকে তাহমিদ সদ্য গোসল সেরে বেরিয়েছে। পড়নে কালো ট্রাউজার। গলায় ভেজা টাওয়েল ঝুলছে। আলমারিটা খুলে ভেতর থেকে টিশার্ট বের করছিল, আর মাথায় ঘুরছিল পরশুদিনের পরিকল্পনা। শনিবার, বেলা পাঁচটা, প্রাইভেট সুইট। কী হবে সেদিন, জানা নেই। রিপোর্ট ও সদ্য বিবাহিত বউকে প্রাইভেট সুইটে চেয়েছে এ নিয়ে দ্বিরুক্তি করার কিছু নেই। তাহমিদকে যথাযথ নির্দেশ পালন করতে হবে। আজই একটি হানিমুন প্যাকেজ বুক করতে হবে। নয়ত বাড়িতে এসব কর্মক্ষেত্র লেনদেন বোঝানো যাবে না। সে সৈনিক হলেও ব্যক্তিগত চাহিদা আছে। বাকি সৈনিকদের মতো অতো সংযমী সে নয়। আলমারি থেকে নেভি ব্লু রঙা টিশার্ট নিয়ে সেটা গায়ে গলাচ্ছিল, এমন সময় হঠাৎ দরজায় নক পড়ল। বাইরে থেকে চেনা গলায় ডাকল,
- ভাইয়া? নিচে তোমাকে ডাকছে। একটা লোক এসেছে।
তাশফিয়ার কথা শুনে খানিক অবাক হলো। কিন্তু ব্যাপারটা শুনে তেমন ভ্রুঁক্ষেপ করল না। হতেই পারে অফিস থেকে কোনো সহকর্মী এসেছে। এবার কাউকে ঘটা করে দাওয়াত দেয়নি। তবে রিসেপশনের দিন বিশাল পরিসরে কিছু আয়োজন করা হবে। তাহমিদ ‘তুই যা, আমি আসছি!’ বলে দ্রুত তৈরি হয়ে গেল। হাতের আঙুল মাথার চুল গোছাতে গোছাতে বাইরে বেরোয় সে। করিডোর জুড়ে ছোটো বাচ্চাদের হুড়োহুড়ি, ছোটোছুটি, দৌঁড়ঝাঁপ। তাদের পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচতলায় এল তাহমিদ। সেখানে উপস্থিত ছিল ফাতিমা। বৃদ্ধা নাতীকে দেখে আন্তরিক গলায় বলে উঠেন,
- নানু? তুমি যে কিছু মুখে দিলে না? না খেয়ে ওখান থেকে উঠতে নেই, জানো না?
তাহমিদ হাসি দিল একটা। পকেটে মোবাইল ফোনটা ঢুকিয়ে তাড়া দেখিয়ে বলল,
- নানী, আপনি খেতে থাকেন। আমি বাইরে একটা কাজ দেখে আসছি। একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। আর্জেন্ট দেখা করতে আসছে।
এরপর আর বৃদ্ধা পথরোধ করলেন না। উনার চোখের সামনে দিয়ে তাহমিদ হাঁটা দিল। পথে মা ও চাচীদের প্রশ্নবাণ পেলেও উত্তর দেয়নি। সোজা গেটের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল তাহমিদ। হঠাৎ পকেটে মৃদু ভাইব্রেট অনুভূত হলো। ডানহাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করতেই দেখল একটা নাম্বার। স্ক্রিনজুড়ে Incoming call উঠে আছে। রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল,
- হ্যালো, তাহমিদ স্যার?
তাহমিদ কণ্ঠের মালিককে চিনে ভ্রুঁ কোঁচকাল। একটু অদ্ভুত গলায় কৌতুহল নিয়ে বলল,
- তুমি? তুমি এটা কোন নাম্বার ব্যবহার করছ?
- স্যার, স্যার উত্তর দিকে আসুন! প্লিজ! কলে বলা যাবে না!
- কী হয়েছে?
- স্যার, প্লিজ রিকোয়েস্ট করছি! আপনি উত্তর দিকে চলে আসুন! আমি এখানেই অপেক্ষা করছি! কেউ যেন দেখতে না পায়!
- আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আসছি। কিন্তু তুমি ওদিকে কেন?
তাহমিদ তখনো চোখদুটো সতর্ক ভাবে ঘুরাচ্ছে। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে আশেপাশে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ ফলো করছে তাকে। পা দুটো ক্ষিপ্র বেগে চালিয়ে তাহমিদ উত্তর দিকে চলে এল। জায়গাটা গাছগাছালিতে পূর্ণ। সন্ধ্যার পর বেশ জনশূন্য হয়ে যায়। সপ্তাহখানেক হলো ল্যাম্পপোস্টের আলোটা জ্বলছে না। পায়ে পায়ে তাহমিদ সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছুলে উচাটন ভাবে বলল,
- কোথায় তুমি? হ্যালো? হ্যালো!
তাহমিদ উত্তেজিত ভাবে চিৎকার করে গেল। কিন্তু ফোনের ওপাশে ভোঁ ভোঁ শব্দ। কোনো স্বর আসছে না! রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে তাহমিদ কান থেকে ফোন নামাল, তখনো খেয়াল করেনি কিছু। হঠাৎ কানে খসখস একটা আওয়াজ শুনতে ঝট করে পিছু ঘুরল। আর ঠিক তখুনি বিদ্যুৎ চমকের মতো আঘাত! গগনবিদারী চিৎকার করে উঠছিল তাহমিদ, দুহাতে আঠালো তরল! আর্তনাদ করে উঠেছিল, কিন্তু ভেজা রুমালে চাপা পড়ল কণ্ঠ!
.
নোটবার্তা — লিখতে গিয়ে কাটছাঁট। দেরির জন্য খুবই দুঃখিত।
FABIYAH_MOMO .
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩০
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২০
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৯
-
বজ্রমেঘ গল্পের লিংক
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৫