Golpo থ্রিলার গল্প বজ্রমেঘ

বজ্রমেঘ পর্ব ২৭


বজ্রমেঘ .

পর্বসংখ্যা_২৭ .

ফাবিয়াহ্_মমো .

শোয়েব আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইল। রাফান তখনো মিটিমিটি হাসছে। তার হাসিটা গায়ে জ্বালা ধরানো! তবু সেটা অগ্রাহ্য করে শোয়েব ডানদিকের জানালায় তাকাচ্ছে। গাড়িটা মিরপুরের পথ ধরেছে। সামনে থেকে রাফান দু সেকেণ্ড বিরতি দিয়ে মৃদু কাশিতে বলল,

  • মাঝে মাঝে সঠিক সময়ে জায়গা বোঝাতে হয় স্যার। নয়ত অযোগ্যরা যোগ্যদের মতো সিনা ফোলায়। আপনি আমি যে সত্যিটা জানি, মানুষ সে সত্যিটা জানে না। বিশ্বাস করুন, একমাত্র আপনি চুপ থাকতে বলেছেন বলে ঠাণ্ডা আছি। নয়ত এমন শিক্ষা দিতাম ওদের বাবারও ক্ষমতা নেই টু আওয়াজ করবে। মিথ্যাবাদীগুলোকে আমার চরম অপছন্দ।
  • আর আমার মুখোশধারীকে।

গলা শীতল রেখে উত্তরটা জানাল শোয়েব। ওই এক বাক্যেই রাফান চুপ হয়ে গেছে। গাড়ির সামনে ফন্ট মিররে নজর বুলিয়ে পেছনে বসা মানুষটিকে দেখল রাফান। শোয়েব নির্বিকার, চাহনিও শান্ত। অথচ কণ্ঠের ভেতর যেন আগুনের উত্তাপ লুকোনো। রাফান নিম্ন স্বরে বলল,

  • আপনি কেন চুপ আছেন? কীসের জন্য? যেখানে জানেন, আপনার সঙ্গে একটা চরম ধোঁকা হয়েছে। তারা আপনাকে সাফ সাফ মিথ্যাটাই বলেছে। সেখানে আপনি চুপ? এটা কী মানা সম্ভব?
  • প্রসঙ্গ মানামানির না। এখন সবকিছু পর্যবেক্ষণের সময়। একটা মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, এটাই দেখব। আমি চুপ আছি একটা কারণে। আমার জন্য যেন ওই নির্দোষ মেয়েটাকে অপদস্থ না হতে হয়। মানুষ যখন পাগলা কুকুর হয়ে যায়, তখন নির্দোষের গলাতেও ছুরি চালায়। ভণ্ডদের মুখোশ খুলে দিলে সাপ হয়ে যায়। ওই সাপ তখন ছটফটিয়ে আক্রমণ করতে আসে। সেই সাপ মারতে এখন লাঠি তুলব? সেই মুহূর্তটা না আসুক। আমি চাই না নির্দোষ কেউ অপদস্থ হোক।
  • কিন্তু আপনার ফুপু পার পেয়ে গেলেন। উনার মতো ভণ্ডকে ছেড়ে দিবেন? কত বড়ো বাটপারিটা করেছেন, কিন্তু চোখে-মুখে সামান্যতম লজ্জাবোধ নেই।
  • শোনো রাফান। শ্রদ্ধেয় ফুপু যদি ভণ্ড হয়, রেবেকা ভণ্ডদের গুরু। ওই গুরুমা সাজা মহিলাকে আমি ছাড় দিব না।

চট করে পুরোনো কথার স্মৃতি মনে পড়ল রাফানের। মেজাজ যেন ভয়ংকর ভাবে বিগড়ে উঠল। স্টিয়ারিং হুইলটাকে এমন শক্তিকে মুষ্টিবদ্ধ করল যেন আঙুল প্রতিটি সাদা, রক্তশূন্য ও ভয়ংকর দেখাচ্ছে। সামনের লোকাল বাসটাকে পাশ কাটিয়ে উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,

  • স্যার, ওস্তাদ বলেছিল। মানুষ চেনার চার আলামত। আমানত করলেই খিয়ানত। কথা বললেই মিথ্যা। চুক্তি করলে বিশ্বাসঘাতক। ঝগড়ায় অশ্রদ্ধা। সবগুলোই মিলছে স্যার। কিন্তু আপনি কিছু করতে দিচ্ছেন না।
  • কিছু করতে দেবও না। এই মুহুর্তে কোনো উলটাপালটা না। চুপ মানে চুপ। যে সিনেমা চলছে। চুপ করে দেখো।

এমন সময় রাফানের পরবর্তী কথা আঁটকে ফোন বেজে উঠল। একহাতে স্টিয়ারিং সামলে কলটা ব্লুটুথ ডিভাইসে কানেক্ট করল। জানালা থেকে মুখ না ঘুরিয়েও ওকে দেখছিল শোয়েব। আড়চোখে চোখদুটো সচল তার। কলের ওপাশ থেকে কিছু বলার পূর্বেই রাফান ভারিকণ্ঠে বলে উঠে,

  • হ্যালো। রাফান সিদ্দিকী হিয়ার।

ওপাশ থেকে কী বলা হলো, বোঝা গেল না। কয়েক সেকেণ্ড পূর্ণ বিরতি চলল। শোয়েব ব্যাকসিটে পিঠ হেলিয়ে সজাগ। দুহাত বুকের ওপর দৃঢ়তাপূর্ণে আবদ্ধ। আড়চোখে খেয়াল করল, রাফানের চোখমুখ ভয়ানক শক্ত হয়ে উঠছে। হাতের গ্রিপ শিথিল। দুই ঠোঁট হালকা হয়ে গেল। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে থমথমে গলায় চ্যাঁচিয়ে বলল,

  • কখন? কীভাবে? এখন এই কথা জানানো হচ্ছে!

রাফানের দিকে মুখ ফিরিয়েছে শোয়েব। চোখদুটো এবার খাটো। রাফান ঢোক গিলে নীরব হয়ে গেছে। গাড়িটা সাবধানে নিজের আয়ত্তে রেখে ফের বলল,

  • মিসিং রিপোর্ট? লাভ হয়নি? লোকেশন কোথায় বলছে? সর্বনাশ, ওটা ফাঁদ! একা যাবেন না। এই মুহুর্তে একা যাওয়াটাই বিপদ! ওকে, আমি দেখছি। প্লিজ সাবধানে থাকুন।

কলটা কেটে যেতেই রাফান উত্তেজিত মুখে সবকিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই শোয়েব বাঁধা দেয় ওকে। চোখের ইশারাতেই যেন থমকে গেছে রাফান। শোয়েব প্রচণ্ড শান্ত গলায় বলে উঠল,

  • যা বলবে, তাড়াহুড়ো করবে না। শুরু থেকে শুরু। কে নিখোঁজ? কী জানিয়েছে? সমস্যা কেমন?

সামনের চৌকো আয়নাটায় নজর রেখেছে রাফান। উত্তরগুলো গুছিয়ে নেয় করে অল্প। সমুখের রাস্তার দিকে দৃষ্টি ফেলে চিন্তিত স্বরে বলে উঠল,

  • একজন নিখোঁজ। যার নাম আপনাকে সকালে বলেছিলাম, সে-ই নিখোঁজ হয়েছে। প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টা ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি মারাত্মক!
  • তাহমিদদের ওই লিষ্টেড নামের একজন?
  • জি স্যার। কিন্তু রিপোর্ট তো জমা পড়েনি। তাহমিদের টিম ওটা নিজেদের কাছেই রেখেছে। কিন্তু —
  • তোমাকে এখন কী বলল?
  • মেরে ফেলার জন্য গুম। পেছনে সূত্র রাখা হয়নি। লাষ্ট লোকেশন কোনোভাবে গাজিপুর বলেছে। এরপর থেকে আউট অফ সিগন্যাল।

কথাগুলো শুনে বিস্মিত হয়ে যায় শোয়েব। বুকের হাতদুটো আলগা হয়ে যায় তার। রিপোর্ট পড়েনি তো কে অপহরণ করল? এটা একপ্রকার অপহরণের মতো গুম। রাফানের দিকে তীক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্র সুরে বলল,

  • গাজীপুর কোথায়?

রাফান সমুখের আয়নায় ঝটিতি চোখ ফেলে তাকাল। লক্ষণটা সুবিধের লাগছে না। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলে উঠল,

  • শুক্রবারে আপনার থাকাটা জরুরি।
  • কীসের জরুরি? কোনো দরকার নেই! ওইদিন যা হবার হবে। তুমি একটু আগে যে কথাটা উচ্চারণ করেছ, আর বলবে না।
  • আপনি কিছু —
  • গাড়ি ঘুরাও!
  • স্যার আপনার দাদী সহ পুরো —

শোয়েব গলার শির ফুলিয়ে তীব্র হুঙ্কার দিয়ে উঠল,

  • রাফান, গাড়ি ঘুরাও বলছি! না মানলে গাড়ি পার্ক করো। আমি একাই যাব!

সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে চমকে উঠেছে রাফান। একটা কথাও মুখ ফুটে বেরোল না। গতি খানিক ধীর করেছিল, হঠাৎ সেই হুঙ্কারের তেজে এক্সিলেটরে চাপ, গতি প্রচণ্ড তুঙ্গে উঠতে লাগল।

.

বাসা থেকে নাশতা সেরে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় শাওলিন। পুরোটা পথ নির্লিপ্তে কাটায়। স্টপেজে যখন নামল তখনো ভাবান্তর ঘটেনি। কাল আবারও কোনো এক অনুষ্ঠান হয়েছে, আজ ছুটির ঘোষণা। ক্লাস নেই, চাপ নেই, সবকিছু ঠাণ্ডা। তবু নিরিবিলি ক্যাম্পাসটার ভেতর কিছুটা সময় নিরবচ্ছিন্ন কাটাতে ঢুকল। সামনেই আকাশছোঁয়া সুউচ্চ শহীদ মিনার, তার ইট বাঁধানো পাটাতনে জনাকয়েক মানুষ বসা, এরা বহিরাভূত লোকজন, দেখেই বোঝা যায়। সকালের এই প্রহরটায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যার যার হলে ঘুমোচ্ছে। গতকাল উৎসবের জোয়ারে গভীর রাত অবধি জেগে থাকাটা অত্যাশ্চর্য কিছু নয়। শহীদ মিনারের ডানদিকের পথটি ধরল, যেটি পদার্থবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টকে পাশ কাটিয়ে সিইসি, ভূতত্ত্ব, পরিবেশবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টকে রেখে বঙ্গবন্ধু হলের নিকটবর্তী। উদ্দেশ্য বটতলার দিকে যাবে। মাটির ভাঁড়ে গরম চা খাবার তেষ্টা হচ্ছে। আজ চর্তুদিকে দামাল হাওয়ার জোর। চোখের কাছে হাত ঢাকা দিয়ে বটতলায় যখন পৌঁছুল, তখনো শাওলিন খেয়াল করেনি ওর ঠিক কিছু দূরে কারা উপস্থিত ছিল। শাওলিন একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে ফাঁকা টেবিল পেয়ে বসল। টোটব্যাগটা যখন টেবিলে রাখতে নিবে ঠিক তখনি সেই টেবিলে কয়েকটি ছায়া পড়ল। মনুষ্য ছায়া। শাওলিন চোখ তুলে বাঁয়ে তাকাতেই হঠাৎ বসা থেকে উঠে গেল। চোখে প্রবল বিস্ময়ের ছাপ ফুটিয়ে হতবাক কণ্ঠে বলল,

  • তোমরা?
  • হ্যাঁ আমরা। তুই কোথায় ছিলি বলবি?

উত্তরটা চটান গলায় দিয়ে উঠে শ্রেষ্ঠা। ভ্রুঁ কুঞ্চিত চাহনি, নাক পাতা ফুলকোর মতো ফোলা। পড়নে হাঁটু সমান নেভি ব্লু রঙা কূর্তি। নিচে জিন্স কাপড়ের ফ্লেয়ার প্যান্ট। কাঁধে কালো ক্রোসেট ঝুলছে। চুলগুলো সদা ভঙ্গিতে খোপায় বাঁধা, এলোমেলো হয়ে কিছু চুল ওর কানের দুদিকে ঝুলছে। শাওলিনকে নিরুত্তর দেখে আবার খেকিয়ে উঠে শ্রেষ্ঠা,

  • তুই কী কথা শুনতে পাসনি? কোথায় ছিলি গত দুদিন? কাউকে না বলে মাইক ফেলে কোথায় ছুটে গিয়েছিলি?

এমন তেজবর্ধক সুরে কথাগুলো বলছিল, শ্রেষ্ঠার সারামুখে তার গাঢ় রক্তিম আভা পড়ছিল। শাওলিন নিজের মতো বসে পড়ে শান্ত গলায় বলল,

  • কিছু দরকার পড়েছিল। না বলে বেরোতে হয়েছে। কাউকে জানাতে পারিনি, এর জন্য ভীষণ দুঃখিত।
  • তোর দুঃখিত বললেই ঘটনা শেষ? তুই একটাবার জানিয়েছিস শ্রেষ্ঠা এই সমস্যা? আমরা কী মানুষ না? তোর জন্য কী চিন্তা হয় না? কেমন নির্দয় মানুষ তুই জানা! ফোনটা পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছিস! ভেবে দেখেছিস আমি কেমন টেনশনে ছিলাম? তোর ভাবীটা ঢাকায় না থাকলে আমি সেদিন রাতেই তোর বাসায় হামলা দিতাম!

অপরাধ বোধে মুখ চুন হল শাওলিনের। পাল্টা উত্তরে কোনো যুক্তি দেখাতে পারল না। একদিক দিয়ে এটা প্রচণ্ড খারাপ ও কাউকে জানিয়ে বেরোয়নি। অপরদিকে যার গাড়িতে সামান্য বিশ্বাস করে চড়ল, সেই ব্যক্তিও বিশ্বাসের নিকুচি করেছে। শাওলিন ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে যেতেই বেশ স্থির গলায় বলল,

  • আমি আবারও দুঃখিত। বিগত কিছু দিনের পরিস্থিতি কেমন ছিল এটা এখন ভাবতে পারছি না। আমি আজ ক্যাম্পাসে আসতাম না। শুধু বিশ্রী ঘোরটা থেকে বেরোতে চাচ্ছিলাম, তাই তোমরা এখানে দেখতে পাচ্ছ।

এবার ওর কণ্ঠ ও চেহারায় দৃকপাত করল ওরা। সোহানা নিজেও রণমূর্তি চেহারায় ক্রুদ্ধ ছিল, রোজা বুকে হাত ভাঁজ করে ভ্রুঁ কোঁচকানো। দুজনই ওর করা শুনে একে অন্যের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে কৌতুহলী হল। সোহানা মাঝ থেকে দু পা এগিয়ে শাওলিনের পাশে বসে বলল,

  • দ্যাখ, রাগ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তুই সেদিন না বলে বেরিয়েছিস এটা যেমন দোষ, তুই সেদিন ওই প্রথমবার দৌড়ে গেট দিয়ে বেরিয়েছিস এটাও তেমনি আশ্চর্যকর! তুই কেন প্রান্তিক দিয়ে যাবি? ওই গেট আমাদের মেয়েদের হল থেকে কাছে, কিন্তু অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে তো প্রচণ্ড দূরে। তার উপর তুই শাড়ি পরা ছিলি। কীভাবে দৌড়ে যাস বল তো? আমি ক্লাস সিক্স থেকে শাড়ি পরি, তবু তো দৌড়ে যাবার আগে দশবার ভাবব।

সোহানার শান্ত পরিমিত কথায় শাওলিন হতোশ্বাস ছাড়ল। ওদিকে শাওলিনের মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে টেবিলটায় আসন গ্রহণ করল শ্রেষ্ঠা। ওর দেখাদেখি রোবটের ভঙ্গিতে রোজাও একটা চেয়ার দখল করল। চারজন মাথা এক টেবিলে ঘিরে বসতে শাওলিনই আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে বলতে শুরু করল। গাড়িতে চড়া থেকে ধানমণ্ডিতে আংটি পরা, বিয়ের দিন-তারিখ ধার্য, হবু শ্বশুরের শারীরিক অসুস্থতা, তাহমিদের কীর্তি, সবকিছু নিয়েই শাওলিন জানিয়ে গেল। শুধু গোটা ঘটনা থেকে একটা বিরাট অংশ লোপাট করে বলল। যে অংশের মূলে সেই পার্বত্যাঞ্চল ফের অদ্ভুত ভাবে জুড়েছে। সবটা শুনে রোজা নাক কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বলল,

  • তোকে দেখলে মানুষ কেন বুদ্ধিমান বলে জানি না। তোর মধ্যে আমি বুদ্ধির ছিঁটেফোঁটাও পাই না। এই জেনারেশনে বসে তুই গার্ডিয়ানের মতামত মানিস? গার্ডিয়ান যা বলে, সোসাইটি কী ভাবে, এটা করলে ওটা হবে, এসব আজাইরা জিনিস ভাবিস তুই? কোন যুগে বাস করিস রে ভাই জানা? পড়ালেখা শিখে তুই শিখলিটা কী?

রোজার বিদ্রুপাত্মক কথায় ঝাঁঝিয়ে উঠতে যাচ্ছিল শ্রেষ্ঠা, কিন্তু ওর ডানহাতে হাত মুঠো করে ধরে ফেলল শাওলিন। মৃদু চাপে থামতে ইশারা করে শাওলিন নিজেই প্রত্যুত্তরটা করল,

  • মানুষ বুদ্ধিমানকে বুদ্ধিমানই বলে, আর দুমুখোকে দুমুখো। পড়ালেখা বস্তুটা এই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে ‘ আমি কোন শ্রেণিটা হব’। এটাও শেখায় কীভাবে কোথায় কথাবার্তার আদব জানতে হয়। প্রাচীনকালে কাউকে কিছু বলার আগে মানুষ ক’বার ভেবে, তারপর বলতো। এখন পশ্চিমা ফলো করা কালচারে অনেকেই ভাবাভাবিতে নেই। উলটো আক্রমণ করে কথা বলাটা ঠিক শিখেছে।

ভদ্র ভাষায় রোজাকে যে উত্তরখানা দিল, তাতে হয়ত রোজা কিছুই বুঝল না। কিন্তু সাময়িক উগ্রতা থেকে আচানক থতমত খেয়ে গেল। মাঝখান থেকে সোহানা পরিবেশ সুস্থির করতে বলে উঠল,

  • বাদ দে তো জানা। কথা বলা লাভ নেই। তুই বল, তাহমিদকে কী শিক্ষাটা দিবি? যদি বলিস আমি নাযীফকে জানাব। তোর থাকা-খাওয়া নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। জাহানারা ইমাম হলে তোর সিট আছে। দরকার পড়লে তুই আজ থেকে শ্রেষ্ঠার বোনকে পড়াবি। টিউশনি নিয়ে কোনো মাথা ঘামাবি না। আমার স্টুডেন্টের মাকে ফোন দিব। বেতন যা দেবে, এনাফ।

এতোক্ষণ শ্রেষ্ঠা শাওলিনের ইশারায় চুপ ছিল। সোহানার কথা শেষ হতেই কথার ঝাঁপি খুলে দিল,

  • তুই পড়াবি জানা? পড়ালে আমি আব্বুকে এক্ষুণি ফোন করব। টিউশনির বেতন নিয়ে ভাববি না। তুই শুধু ভাবীকে স্পষ্ট করে জানিয়ে বল তুই বিয়েটা ওই শয়তানটার সাথে করতে চাচ্ছিস না। তোর অন্য জায়গায় মত আছে। কমিটমেন্ট আছে। দরকার পড়লে তোর জন্য ভাড়া করা প্রেমিক এনে দেব। নে ফোন দে। ব্যাগ খোল।

টোটব্যাগটা টেনে শাওলিনের কোলে রেখে দিল শ্রেষ্ঠা। ইশারাটা স্পষ্ট, ব্যাগ থেকে ফোন বের করে রেবেকাকে কল দিতে বলা। শাওলিন প্রত্যেকের চেহারায় শান্ত দৃষ্টি বুলিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মাথাটা দুপাশে মৃদুভাবে নাড়িয়ে ‘না’ বোধক ইঙ্গিতে বলে উঠল,

  • তোমরা কেউ আমার পরিস্থিতি বোঝনি। আমি সমঝোতা নয়, একটা সমাধান চাইছি। আমার পরিবার বলতে ওই একটা মানুষ ছাড়া কেউ নেই। দাদা বেঁচে থাকলে চিন্তা ছিল না। দাদাকে যদি বলতাম আমি বিয়ে করতে রাজি নই, এই মুহুর্তে বিয়েটাই আমার জন্য ভয়, দাদা তক্ষুণি সবটা গুটিয়ে দিতো। এতদূর পর্যন্ত পানি গড়াতো না। কিন্তু মণি প্রচণ্ড একগুঁয়ে। এককথার মানুষ। উনার কাছে কথার মূল্য ভয়ানক। যদি বলি উনার ভাইয়ের ভেতর এই এই সমস্যা, এই দিক, গতকাল রাতে এমন একটা বিচ্ছিরি কাজ করেছে, উনি সবটা শোনার পর আমার দিকেই ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে থাকবেন। উনার দৃঢ় বিশ্বাস হবে, আমি বিয়েটা থেকে পালানোর জন্য সর্বোচ্চ সীমাটা ছাড়াব। এই সীমার ভেতর যদি খুন টুন করাও হয়, তবু উনি বলবেন আমিই পালাতে চাইছি, ছুঁতো দিচ্ছি। তাই নিখুঁতভাবে অজুহাত বানাচ্ছি। এমন অবস্থায় আমি আর কীভাবে সত্যিটা বলব? যেখানে আমি এটা জানিই, তাহমিদ নিজেকে ভালো ছেলে খেতাব দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছে। ওই খেতাবের নিচে কত বড়ো বদমায়েশি লুকানো আছে, সেটা তো ভুক্তভোগী ছাড়া দ্বিতীয় কেউ টের পাবে না। ওই লোকটা এতোটাই ধূর্ত পর্যায়ে সজাগ, আমার সেখানে কিচ্ছু করার নেই।

শ্রেষ্ঠা মেজাজ খারাপ করে মুখ বিকৃত করে বলল,

  • শূ– বাচ্চা টাকে রাস্তায় ফেলে —

কথা আর শেষ হলো না, চর্তুদিক থেকে চিৎকার ছাপিয়ে উঠল। অমন হুঁশিয়ারি ধমকে দমিয়ে দিল। শ্রেষ্ঠার কথা! সোহানা বড়ো বড়ো চক্ষু মেলে খেপাটে সুরে বলল,

  • শোন মুখ খারাপ করবি না! তোর মুখ একবার খুললে বন্ধ করা বিপদ।

টেবিলে একটা ঘুষি দিয়ে ছদ্ম রাগ দেখাল রোজা,

  • তুই গালি দিয়ে পাপ কামাচ্ছিস? এই দোষ কী জানার না? জানা কেন বদমাশটার কানে কপালে থাপ্পড়ালো না? আর ওই মহিলাকে ওর কীসের অতো শ্রদ্ধা? আমার কাছে দাম্ভিক একটা মহিলা মনে হয়। জীবনে কী শিখেছে জানি না, মানুষ কন্ট্রোল করে বশ করাটা ভালোই শিখেছে।

রোজার কথা শুনে সোহানা ঝট করে মুখ ঘুরায়। কিছু বলতে নেবে তার আগেই শাওলিন বিরক্ত হয়ে কথা সামলে দেয়,

  • রোজা, চুপ। সোহা, তুমিও প্লিজ শান্ত হও। কিছু বোলা না। জানি মেজাজ সবারই খারাপ। কিন্তু সমালোচনার জন্য ক্যাম্পাসে আসিনি। এখন একটু চা খাব। মাথাটা কালরাত থেকে ভার হয়ে আছে। ঘুমটাও ঠিকঠাক হয়নি। মামা হয়েছে?

প্রশ্নটা করতেই চারটে মাটির ভাঁড় ওদের সমুখে এসে যায়। গরম ধোঁয়া ওঠা কুণ্ডলী পাক খেয়ে খেয়ে হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে। চা ওয়ালা মামা দিলদরিয়া আন্তরিক মানুষ। ওদের বেশ ভালোমতো চেনেন। কিছু বলার আগেই চারটে বনরুটি ওদের টেবিলে রেখে বললেন,

  • আপারা আজকে তাড়াতাড়ি আইছেন? কাইল তো ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠান হইল। ভাইয়েরা তো এহনো আহে নাই। আপনেরা ঘুমান নাই সকালে?

শাওলিন একটা বনরুটি চুপচাপ টেনে নিল। ক্যাম্পাসে পরপর কিছু অনুষ্ঠান চলছে। চর্তুদিক উৎসবের ছাপ। প্রশ্নের উত্তরটা সদা সর্বদার মতো সোহানা দিল। মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিয়ে বলল,

  • মামা, আপনার চা না খেলে দিন শুরু হয়? এই দূর্দান্ত চা না খেলে মাথা ঠাণ্ডা হয় না। আমার আম্মুও এতো চমৎকার করে চাপাতি, দুধ, লিকার নিয়ে ভাবতে পারে না। আমার কাপ কোনটা বলেন দেখি? এটা নাকি?

একটা ভাঁড়ে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল সোহানা। তার প্রত্যুত্তরে চটপট বললেন তিনি,

  • জি আপা, ওইটাই। চিনি দেইনাই আপনেরটায়।

উত্তরে চোখমুখ উজ্জ্বল করে হাসলো সোহানা। এদিকে চা ওয়ালা মামা চলে যেতেই শ্রেষ্ঠা বিশাল একটা কামড়ে রুটির অর্ধেকটাই মুখে পুড়ে নিল। দুগাল ভয়ংকর ভাবে ফুলিয়ে ওই ভঙ্গিতেই চিবোতে চিবোতে লাগল,

  • তোদের একটা কথা বলার আছে। কথা শুনে ঘাবড়াবি না।

শাওলিন পাশ থেকে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,

  • কী কথা যে সতর্ক করছ? বলো।

মুখের রুটিটা দ্রুত চিবোতে চিবোতে শ্রেষ্ঠা এক চুমুক চা পান করল। গলাটা শান্ত করে বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল,

  • সেইদিন একটা ঘটনা ঘটেছে। কথাটা তোদের দুজনকে বলিনি। কিন্তু না বললেও বিপদ আছে। এখন নাযীফ আসার আগেই তোদের বলছি।

কথা শুনে প্রত্যেকের খাওয়াটা মন্থর হলো। তিনটি কৌতুহলী চক্ষু তীরের মতো বিদ্ধ করেছে শ্রেষ্ঠাকে। রোজা একটা অজানা শঙ্কা টের পাচ্ছিল বুকে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না। শ্রেষ্ঠা দুহাতের মধ্যে চায়ের ভাঁড় আঁটকে বলল,

  • সেদিন শোয়েব স্যারের আসার কথা ছিল। কিন্তু কাজের প্রেশারে তিনি আসতে পারেননি। রোজার বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল নাকি। কিন্তু শেষপর্যন্ত এমুখো এলেন না। তিনি নাকি ঢাকায়!

রোজার চেহারা মুহুর্তেই রক্তাভ হয়ে লাল। কানদুটো যেন আগুনের ছেঁকা খেয়েছে। হাতদুটো যখন ঝিমঝিম করে কাঁপতে যাচ্ছে, ঠিক তখুনি শাওলিন পাথরের মতো নির্বাক! ওর পিঠ বেয়ে যেন শিরশির করে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল! স্তব্ধ দেখাল ওর চাহনি দুটো। চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে ধরেছিল, কিন্তু ভাঁড়ে আর চুমুক দিতে পারল না। সোহানা বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠতেই হড়বড় করে বলল,

  • কী? খাগড়াছড়ির বন কর্মকর্তা? মানে আমাদের ঢাকায় এসেছেন? ঢাকায় আসলে যোগাযোগ করলেন না কেন? নাযীফ তো আমায় কিছু বলেনি! কী আশ্চর্য শ্রেষ্ঠা!

শ্রেষ্ঠা কথাটা বলার সময় দুদিকে নজর ঘুরাচ্ছিল। রোজার চেহারা, শাওলিনের চাহনি। দুজনই তীব্ররূপে হোঁচট খেয়েছে যেন। রোজা থতমত চেহারায় নিজের কিছু একটা চাপা দিচ্ছিল। শাওলিন যেন পুরো নিজেকেই নিভৃত বানিয়ে ফেলল। সোহানার প্রশ্নে শ্রেষ্ঠা চায়ে চুমুক দিয়ে বিজ্ঞ গলায় বলল,

  • স্যারকে যতটা চিনেছি, আগাগোড়া ব্যস্ত লোক। ঢাকায় তো আর এমনি এমনি আসবেন না। এসেছেন যখন, গুরুত্বপূর্ণ কিছুর জন্যই এসেছেন। কিন্তু সেদিন যে সময়টায় আসার কথা ছিল, ওই সময়টায় জানা মিসিং। ওর হঠাৎই চলে যেতে হলো। এরপর তো মর্তুজা মেনশন।

মাথাটা কিঞ্চিত নত করতে দেখল শাওলিনকে। ভঙ্গিটা এমন যেন টোটব্যাগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজছে। কিন্তু শ্রেষ্ঠা জানে, এটা স্রেফ বাহানা।নিজের ভেতরটাকে লুকিয়ে নিচ্ছে ও। শাওলিন সেই মঞ্চের দিন দুপুরে স্বাভাবিক ছিল, ওর ফোনটাও ছিল রূপন্তির হাতে। রূপন্তির সাথে কথা বলে জানতে পেরেছে ওর নম্বরে একটা আননোন কল আসে। নামধাম কিছু সেভ নেই। সেই কলটার কথা শুনেই শাওলিনের চেহারা বদলে গেছিল, যেটার সুক্ষ্ম নজর রূপন্তির চোখ থেকে এড়ায়নি। এরপরই মাইক একজনকে বুঝিয়ে শাওলিন হঠাৎ চলে যায়। একদম কাউকে টু শব্দটি না জানিয়ে। অথচ এমন নজির আজপর্যন্ত দেখেনি শাওলিনকে চেনার পর। শ্রেষ্ঠা চায়ে ছোট্ট করে চুমুক দিচ্ছিল, কিন্তু ওর সম্পূর্ণ নজর শাওলিনের ওপর বিদ্ধ। এদিকে সোহানা আপনমনে কতকিছু বলে যাচ্ছে সেদিকে ওর ভ্রুঁক্ষেপটুকু নেই। নিজের ওপর কেউ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে তা বোঝা যায়। কীভাবে যেন অবচেতন মস্তিষ্ক ব্যাপারটাকে ধরিয়ে দেয়। শাওলিন তেমনিভাবে বুঝতে পারছিল শ্রেষ্ঠার চোখ নিষ্পলক! তাকিয়ে আছে একদম দূরবীক্ষণের মতো চাহনি মেলে। হালকা ঢোক গিলে নিজের অস্থির স্নায়ুটাকে ঠাণ্ডা করল ও। মাথাটা উপরে উঠিয়ে টোটব্যাগের চেইন আঁটকে বলল,

  • শ্রেষ্ঠা ওভাবে তাকিয়ে আছ কেন? কারণটা জানতে পারি?

বিষম খাওয়ার ভঙ্গিতে সামান্য কাঁপল শ্রেষ্ঠা। ঠোঁটে ফিচেল হাসির আবির্ভাব এনে বলল,

  • তোর বিয়ে খাব। দাওয়াতও ডান। তোর ভাবী আমাদের সবাইকে তল্পিতল্পা গুছিয়ে রেডি হতে বলেছে। তুইও কটাদিন পর বিবাহিত হতে চলেছিস। ব্যাচেলার রমণী থেকে স্বামীর হৃৎপিণ্ডের অধিবাসী। বোঝার চেষ্টা করছি তাহমিদ তোর জন্য কতটা উপযোগী? জানা সময় আছে, রেবেকা মণিকে বল। ইচ্ছেমতো বলে দিয়ে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে আয়। তোর জন্য সব উন্মুক্ত। নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা আরো ভালোভাবে শিখবি। বাবা-মার পর ওসব গার্ডিয়ান সবাই বনে যেতে পারে। কিন্তু নিষ্ঠুর কথা এটাই, কেউ দায়িত্বটা বাবা-মায়ের মতো নিঃস্বার্থ পালন করতে পারে না। আজ যদি রেবেকা মণিকে নিজের জেদটা দেখাস, তাহলেই দেখবি তোর ভাবীটা নিজের ভদ্রতার চেহারা খুলে ফেলেছে।

কিছুক্ষণ চুপ রইল শাওলিন। চায়ের খালি ভাঁড়টা সামান্য সরিয়ে রাখল দূরে। রোজা ও সোহানা একে অন্যের দিকে উদ্বিগ্ন চোখে চাওয়াচাওয়ি করছে। কিন্তু পরমুহুর্তেই শ্রেষ্ঠার দিকে দৃপ্তস্বরে উত্তরটা রাখল শাওলিন। কোনোরূপ জড়তা নেই কণ্ঠেই, একদম সজাগ,

  • মাথার ওপর হাত আর ছাদ না থাকলে, বাবা-মা বিহীন হলে আমার দায়বদ্ধতা বুঝবে। এই দেশ এতো মর্ডান হয়ে যায়নি বাবা-মা ছাড়া সভ্য সমাজে একা বাস করা যাবে। পদে পদে যেখানে টিটকারি ও সমালোচনা, সেখানে আমি আপন বলতে আর কাকে ভাবব? ভাবী আমাকে দাদার পর সবচেয়ে বেশি সামলেছেন। আজ তুমি আমাকে এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেখছ, এখানেও তার যথেষ্ট ভূমিকা। আমার ওপর উনার নেক দাবি আছে। তিনি যা চাইছেন, যেমনটা চাইবেন, তা আমারও ভেবে দেখতে হবে। এতে তুমি যদি মনে করো আমি গলায় পাথর বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছি, তবে তাই-ই সই। মানুষ একদিন দেখবে, দুদিন দেখবে, তৃতীয়দিন ভুলেই যাবে, এটাই আসল নিয়ম শ্রেষ্ঠা। আমি আমার জীবনে এতো সহজে কিছু পাইনি। যা পেয়েছি, তার পেছনে অনেক সহ্য ছিল, অনেক কষ্ট ছিল, আমি ধৈর্যের কাছে চুরমার হয়েছি, কিন্তু তবু একটা জায়গায় এসে স্থির থেকেছি। নিজের কাছে নিজে শক্ত হওয়াটা শিখেছি। আমি যে ইয়াতীম, আমার বাবা, আমার মা কেউই বেঁচে নেই। এই সত্যটাই আমার উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করে না শ্রেষ্ঠা। মানুষ সহানুভূতির নামে প্রচণ্ড কষ্ট দিতে আসে। সেই কষ্ট আমি নিতে চাই না! সেখানে তুমি শুধাচ্ছ বিয়েতে মত কেন? সোসাইটির নারী সংস্থায় তুমি কাজ করো, এখনো জানো না মেয়েদের দায়বদ্ধতা কোথায়?

চোখের কোলে বিষণ্ণতার আঁধার জমল। শ্রেষ্ঠা একটু আগের জোশকে হারিয়ে ফেলল আচমকা। কেমন যেন থমকে গেল জবান, শব্দ, বাক্য। এই মুহুর্তে কী বলা দরকার, কিছুই খুঁজে পেল না। চায়ের টেবিলে এক অদ্ভুত বাস্তবতার আঘাত পড়েছে। যেখানে চুপ হয়ে গেল ফুরফুরে উচ্ছ্বাসটা।

.

একটা সাদা বোর্ডের কাছে দণ্ডায়মান অ্যান্টনি। আজ সেই দ্বিতীয় দিন। পরিত্যক্ত সেই ভবনের ভেতর জমায়েত সবাই। বাকিরা চেয়ারে বসে আছে। রুমে একটি কম পাওয়ারের আলো, যেটি সরাসরি সাদা বোর্ডটিকে ফোকাস করছিল। দুদিকে দুটো মোটা শিরোনাম কালো মার্কার পেন দিয়ে লেখা।

TRACKDOWN – CRACKDOWN

খুঁজে বের করা – নির্মূল করা
জেরা – নিধন
নজরদারি – সরাসরি আঘাত

আপাতচোখে রিপোর্টটি অপারেশন ট্র‍্যাকডাউন ছিল। যেখানে পাঁচটি নাম সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেডমার্ক করা। কিন্তু এই পাঁচটি নামের তথ্য পাঠানোর পরপরই ভয়ংকর একটা পরিণাম ঘটতে চলেছে। যার আক্ষরিক অর্থ পৃথিবী থেকেই নিশ্চিহ্ন করা! দলের কেউ চাচ্ছে না এই রিপোর্ট উপরওয়ালাদের হাতে যাক। কিন্তু এখন মুখ বন্ধ রাখলে ওদের দেশদ্রোহী ভাবা হবে। মুখ খুললে অনেকগুলো নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাবে। অথচ এই রিপোর্টের মানুষগুলোর দোষ, তারা দাসত্ব স্বীকার করেনি। করবেও না। তাদের করানোর জন্য প্রচণ্ড লোভ, টোপ, সুবিধা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে, সবই ব্যর্থ। এই লোকগুলো কখনো ‘হ্যাঁ’ তে ‘হ্যাঁ’ বলবেই না, বরং বেঁচে থাকলে চরম ক্ষতি করবে। তাহমিদ রিপোর্টটা নিয়ে ডিপার্টমেন্টের কাছে সময় চেয়েছে। কিন্তু এখন সে নিজেও জানে সময় খুব কম। যদি ভুল করেও এই টিমের কেউ খবরটা ফাঁস করে দেয়, তাহলে আর জিন্দা রক্ষে নেই। সবকটাকে চাকরিচ্যুত করে ভয়ানক শাস্তির আওতায় আনা হবে। মিটিংয়ের মাঝখানে খুব সতর্ক গলায় তাহমিদ বলল,

  • রিপোর্টের নাম ট্র‍্যাক না ক্র‍্যাক। এ তথ্য জোগাড় করেছে রাশেদ। অ্যান্টনি হোয়াইট বোর্ডে যা দেখাল, তা যেন এই রুম অবধিই থাকে। যে পর্যন্ত ফাইল রানের জন্য কমাণ্ড না দিব, কেউ হাত দেবে না। তোমাদের কথা মেনে শনিবার পর্যন্ত সময় চেয়েছি। কিন্তু আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। যদি বাকি পাঁচটা নাম জোগাড় করা যায়, তাহলে এই পাঁচ নামকে বদল করা সম্ভব। কারণ আমরা জানি বাকি পাঁচ নামের ব্যক্তি আইন হাতে তুলেছে। এটা এমনিতেও অপরাধ। কথা ক্লিয়ার সবাই?

প্রত্যেকে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর ওদের কাজ এখন রিপোর্টটাকে হেফাজত করা। যেকোনো মূল্যেই হোক এটাকে বাইরে পাঠানো যাবে না। রিপোর্ট জমা পড়লে রাষ্ট্রীয় অভিযান শুরু হবে। এই অপারেশন আদতে “ক্লিন-আপ”। কিছু “গুরুত্বপূর্ণ মানুষ” কে মুছে ফেলা, যারা এমন কিছু জানে যা প্রকাশ হলে বড়ো মাথারা ধরা পড়বে। সবাই যখন আজকের মতো বিদায় নিচ্ছে, তখনো কেউ জানতো না ওদের জন্য কী অপেক্ষা করছে সামনে। যে ভবন ও রুমকে কঠোরভাবে নিরাপত্তায় বেঁধেছিল, সেই ভবনের দেয়ালে গোপন সার্ভেইল্যান্স ক্যামেরা। সেই রুমের দেয়ালে অডিয়ো বাগ পুরোদমে চলছে। কেউ বুঝতে পারেনি বন্ধ ফোনটাও ওদের মৃত্যু পরোয়ানা টেনে আনছে। উন্নত প্রযুক্তির এই যুগে অনেক কিছুই সীমা ছাড়িয়ে ট্রেস করে যাচ্ছে। কিন্তু তাহমিদ ও টিমের কেউ কিছুই জানতো না।

.

একটি উবার প্রাইভেট কার ধানমণ্ডিতে নামাল। লোকটির সঙ্গে কুশল শেষে বেরিয়ে এল পার্থ। চোখে সানগ্লাস। পড়নে জলপাই রঙা টিশার্ট। কালো ডেজার্ট প্যান্ট। হাতঘড়িতে সময় দেখে বুঝল বিকেল সাড়ে ছয়টা বাজে। ঢাকার জ্যাম ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। রাফানের সঙ্গে কথা বলার পর অনেকটা সময় কেটেছে। অথচ পৌঁছুনোর কথা ছিল বিকেলে। চোখ থেকে সানগ্লাসের ডান ডাঁটটা ধরে খুলতেই মর্তুজা মেনশনে পা বাড়াল। বাড়িতে হাসি, চিৎকার, চ্যাঁচামেচিতে সরগরম। একটু খুঁজতেই মারজিয়াকে সিঁড়ির দিকে পেল। ওকে পেছন থেকে মার্জিত গলায় ডাকল,

  • হ্যালো মিস, আমি পার্থ। শোয়েব স্যারের সহকারী। উনার ঘরটা কোনদিকে বলা যাবে?

পা থমকে পিছু ফিরল মারজিয়া। ভ্রুঁ দুটো কিঞ্চিত কৌতুহলে কুঁচকে বলল,

  • আপনি পার্থ ভাইয়া? আসুন আসুন। আপনার জন্য নানী আর ভাবীরা এই নিয়ে কতবার জিজ্ঞেস করে ফেলেছে। আপনার আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?

পার্থ মৃদু হেসে মারজিয়ার পাশে পাশে চলল। সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই উত্তরটা জানাল,

  • জ্যাম নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। রাস্তাঘাটের বিষয়। বাকিরা কোথায়? সবাই উপরে?
  • জ্বি ভাইয়া। আপনি চলুন আপনাকে দেখিয়ে দিচ্ছি। বড়ো ভাইয়া বাড়ি নেই। সে রাফান ভাইয়ার সঙ্গে সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে। কোথায় গিয়েছে বলে যায়নি।

পার্থ এবার কিঞ্চিত বিস্মিত হলো। তড়িৎ বেগে প্রশ্নটা করল,

  • এখনো ফেরেনি?
  • না ভাইয়া, এখনো ফেরেনি। আপনি উপরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিন। আমি নানীকে খবরটা দিয়ে আসছি।

পার্থকে একটি ঘর দেখিয়ে দিতেই মারজিয়া প্রস্থান করল। এদিকে পার্থ ঘরের চর্তুদিক নজর বুলিয়ে নিচ্ছে। রাফানের ভাষ্যমতে স্যারের ফুপাতো ভাই এই শুক্রবারে বিয়ে করছেন। বেশ ত্রস্তগতিতে সাজানো হচ্ছে আয়োজন। আজ মঙ্গলবার হলে হাতে বেশি সময় নেই। পার্থ সঙ্গে আনা লাগেজ ব্যাগটা খাটের কাছে রাখতেই হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। বিছানার কিনারায় বসে ফোনটা বের করল পার্থ। মোশাররফের কল। রিসিভ করে কানে চাপতেই ওপাশ থেকে বুলেটের গতিতে কিছু এল। মোশাররফ প্রচণ্ড উত্তেজিত গলায় বলল,

  • সিগন্যাল অরেঞ্জ।

কপাল কুঁচকে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল পার্থ,

  • কী হয়েছে?

ওপাশের কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে জানাল,

  • ফাইল রিজেক্ট।

পার্থর বুকটা ধক করে উঠল। ওই ফাইলই ছিল পার্বত্যাঞ্চলের গোপন বিষয়।

  • স্যার কোথায়?
  • লোকেশন হারিয়ে ফেলেছি।

স্তব্ধ হয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠল পার্থ,

  • রাফান কোথায়?
  • ফেরত আসছে।

প্রায় গর্জন করে উঠল পার্থ। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে তার,

  • উনি একা গেছেন?
  • জি। সাপোর্ট ছাড়াই।

কথা হারিয়ে ফেলল পার্থ। কান থেকে ফোনটা নামাল। হাতের তালু ঘেমে গেছে। তার সামনে খোলা জানালা। সেখানে পশ্চিমের আকাশে রক্তিম সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply