প্রেম আসবে এভাবে
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_৬
অনুজার এমন অকস্মাৎ জড়িয়ে ধরা দেখে নাভিদও তাকে বুকে আগলে নেয়। মুহূর্তেই নাভিদের বুঝতে দেরি হলো না অনুজার এই ভয়ের কারণ কী। সে হেসে বলল, “আরে দেখো, তোমার চিৎকারের আওয়াজ শুনে বেচারা প্রজাপতিটাই দৌড়ে পালিয়েছে। আর এই বোকা মেয়ে, কেউ এত সুন্দর প্রজাপতি দেখে ভয় পায় নাকি?”
অনুজা একটু গোমড়া মুখে বলল, “না মানে, দূর থেকে দেখতে তো ভালোই লাগে। কিন্তু যদি কামড় দেয়? তাই ওদের সাথে আমি খাতির করি না বাবা।”
“বাবা?” ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল নাভিদ।
“আরে ভাই, কথার কথা! ” হালকা হেসে বলল অনুজা।
“তোমার ভাই কই? আশেপাশে তো কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না।” এই কথা বলে নাভিদ এক গাল হেসে ফেলল। আর অনুজার গাল দু’টো তখন লজ্জায় পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। সে কিছু না বলে কফির কাপ হাতে রুমের দিকে চলে গেল, যেখানে এখনো রুশদা আর প্রীতুল বসে মুভি দেখছে। সবটা দেখে অনুজার মনে হিংসার একটা ঢেউ উঠল। মনে মনে সে বিড়বিড় করে বলল, “কি লুচু মেয়েরে বাবা! আর আমিও কাকে পছন্দ করি… এমনিতে নাকি মেয়েরা তার এলার্জি, আর এখন দেখো কেমন গা ঘেঁষে বসে আছে। মনে হয় পানি আর মাছ, কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচতেই পারবে না।”
অনুজা সেইঘরে আসতেই রুশদা তাকে দেখে বলল, “কি হলো, কফি কি দিবে ?” রুশদার এমন কথায় অনুর গা এবার আরও জ্বলে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
“আরে আপু, কফি কেন? বিষ চাইলে সেটাও এনে দেব!
এই বলে অনু মুচকি একটা হাসি দিল। অনুর কথার ভেতরের লজিক বুঝে প্রীতুলও না হেসে পারল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে নাভিদ এসে অনুর কানের কাছে নিচু স্বরে বলল, “কি, কষ্ট হচ্ছে? এর থেকেও ভয়ানক কষ্ট আমি পাই। “
কিছুক্ষণ পর মুভি শেষ হলে সবাই যে যার রুমের দিকে চলে যেতে লাগল। সবাই চলে গেলে অনু তার সিক্রেট ডায়েরিটা বের করল। সে তাতে কিছু লিখল। এ কাজটা সে প্রায়ই করে। রাত অনেক হয়ে গেছে, তবু তার ঘুম আসছে না। একটা চিন্তা তাকে বারবার গ্রাস করছে। কিন্তু সেই চিন্তাটা কী? তার এই অস্থিরতার কারণ কি নাভিদ, না প্রীতুল? অনেক চেষ্টা করেও ঘুম না আসায় অনু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই পাশের অন্ধকার বারান্দায় তাকাতেই চোখে পড়ল। একটা জ্বলন্ত সিগারেট।
“ওই? ঘুমাননি কেন? ওমা, আপনি দেখি এসব কুখাদ্যও খান! তো মশাই, টেনশনটা কী আপনার শুনি।”
“আমার কথা বাদ দাও। তুমি কী করছ?”
“তেমন কিছু না… ভাবছিলাম, কী সুন্দর করে রুশদা আপু আপনাকে ধরে রেখেছিল।”
“খোঁচা মেরো না, প্লিজ।”
“ইশ ঢং।” একটু থেমে প্রিতুল বলল, “এই, কাল আমার সাথে বাইরে যাবে?”
“ওমা গো! আপনার রুশদা ম্যাডাম এসব শুনলে আমাকে মেরেই ফেলবে।”
“আরে, কেউ কিছু করবে না।”
“কিন্তু আপনি আমাকে কেন নিয়ে যেতে চাইছেন?”
“কি করার মতো… বোনের মতো তুমি আমার।” এই কথা শুনে অনুর মুখটা হঠাৎ কালো হয়ে গেল। “এত বোনপ্রেমী হলে প্রিয়াকে নিয়ে ঘুরে আসেন।”
“ইশ! খালি রাগ করে মেয়েটা। এত রাগ কোথা থেকে আসে তোমার?”
“চুপ! কথা বলবেন না। পাথর মারব কিন্তু।”
“থাইল্যান্ডের পাথর?” এই বলে দুজনেই হেসে উঠল।
“অনুজা জবাবের অপেক্ষায় থাকলাম।”
অনুজার আর কিছু না বলে বিছানার দিকে ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। বিছানায় শুয়ে আরও খানিকক্ষণ নানা কিছু ভাবল। তারপর হঠাৎ করেই, কোনো এক অজানা ক্লান্তিতে, ঘুমিয়ে পড়ল সে।
–
সকালে অফিসে যাওয়ার আগে প্রিতুল আবারও অনুজার কাছে একই কথার উত্তর জানতে চায়। অনুজা তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ। ” না… আজ শরীরটা কেমন জানি লাগছে।” সে নরম করে বলে। ” অন্যদিন আপনার সঙ্গে যাব প্রমিস।”
প্রিতুলের মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে যায়। তবু সে সেটা ঢেকে রাখে। কিছু না বলে অনুজার কপালে আলতো করে হাত রেখে শান্ত গলায় বলে, ” ঠিক আছে, রেস্ট নাও। আমি যাই।”
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা অনুজার কানে বাজে। সে চোখ নামিয়ে নেয়।
–
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। অনুজা প্রিয়ার কাছ থেকে একটা সাদা, কাজ করা শাড়ি আনে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো ছেড়ে দেয়, খুব সাধারণ করে নিজেকে সাজায়। মুখে কোনো অতিরিক্ত রঙ নেই তবু সে আলাদা লাগছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে
“আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
প্রিতুলকে আমি মিথ্যে বলেছি। কিন্তু কী আর করার ছিল? নাভিদকে যে কথা দিয়েছি, সেটা তো সে জানে না। জানলে হয়তো ভুল বুঝত… তাই না বলেই বেরোচ্ছি।” কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা।
নাভিদ দাঁড়িয়ে। অনুজা দরজা খুলতেই একটু থমকে যায়। নাভিদকে দেখে সে নিজেই অবাক। মাশাআল্লাহ… ছেলেটার মধ্যে সত্যিই এক অদ্ভুত মায়া আছে। তবে সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নেয়। না না, এই মায়ায় জড়ানো যাবে না। সে মিষ্টি করে হাসে। “ওমা! বেশ লাগছে কিন্তু তোমাকে।”নাভিদ খোলা হাসিতে বলে।
“আপনাকেও, নাভিদ।” অনুজা খিলখিল করে হেসে ওঠে।
নাভিদ চোখ টিপে বলল, ” বারবার হাসছো যে? দাঁতগুলো সুন্দর, সেটাই বুঝাতে চাও বুঝি?”
অনুজা মজা করে জবাব দেয়, ” হুম। হারপিক দিয়ে মাজেছি তো!”
” এই! হয়েছে, চল।”
“সাদা পাঞ্জাবিতে আপনাকে বেশ মানিয়েছে।” অনুজা প্রশংসা করে বলে।
“নজর দিয়ো না।” নাভিদ হাসতে হাসতে বলে। এরপর অনুজা প্রিয়ার কাছে গিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা জানায়। প্রিয়া কোনো আপত্তি করে না, শুধু তাকিয়ে হালকা হাসে। নিচে নেমে নাভিদের গাড়ির দিকে এগোতেই অনুজা হঠাৎ হাত তুলে বাধা দেয়।
” ইস্! একদিন তো আমার মতো বেঁচে দেখেন।” সে মজা-অভিমান মিশিয়ে বলে। ” একদিন সাধারণ মানুষের মতো লাইফটা এনজয় করেন। লাইফ এনজয় করতে সবসময় অনেক টাকা লাগে না।”
নাভিদ একটু ভেবে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। চল, রিকশায় যাই।”
রিকশায় চেপে তারা একটা ছোট ক্যাফেতে যায়। সেখানে বসে আড্ডা দেয়। হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। নাভিদ চিন্তিত গলায় বলে, ” অনুজা, বাড়ি যেতে হবে না? বৃষ্টি পড়বে মনে হচ্ছে। আর গাড়িটাও আনতে দিলে না…”
অনুজা হাত নেড়ে বলল, ” আহ্! এসব বাদ দেন তো। চলেন আজ হেঁটেই বাড়ি যাই।” এই বলে সে নাভিদের হাত ধরে টেনে বাইরে বের করে আনে। দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে। ঠান্ডা বাতাস, কালো মেঘের নিচে তাদের একসাথে ভীষণ সুন্দর লাগছে। হঠাৎ অনুজা থেমে যায়। ” এই খোলা চুলে একটা সমস্যা হচ্ছে। বাতাসে সামলাতে পারছি না। প্লিজ একটু দাঁড়ান। বেনি করি।”
” বাঁধবে কী দিয়ে?” নাভিদ জিজ্ঞেস করে।
” চুল দিয়েই।”
“হ্যাঁ সুন্দরী, তুমি চুল খুলে রেখো না, তোমার খোলা চুল এমনিতেও আমার বুকের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দেয়।”
অনুজা লজ্জায় হাসল। চোখের পলকে সে নিজের চুল বেঁধে ফেলল। ঠিক তখনই একটা ছোট বাচ্চা এসে বলল, “ভাইয়া, বেলী ফুল কিনবেন ? আপুর লাইগা। খুশি হইবো সে।”
নাভিদ কিছু না বলে একটা ফুলের মালা কিনে অনুজার হাতে দেয়। অনুজা একটু চমকে তাকায়, তারপর মৃদু হাসে। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়। ” আরে আসেন! আমার সাথে দৌড় দেন!”অনুজা হেসে বলে।
দু’জন দৌড়ে আশ্রয় নেয় একটা চায়ের টং দোকানে।
” চা খাবেন, স্যার?” দোকানি জিজ্ঞেস করে।
নাভিদ মাথা নাড়ে, ” না।”
অনুজা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “হুম, খাবো। দু’কাপ বানান।”
” এগুলো কেন খাবে? চল ক্যাফেতে যাই।”
“আরে, খেয়েই দেখেন না এখানকারটা।” চা শেষ হতে হতে বৃষ্টিও থেমে যায়। আজ সারাদিন নাভিদ সত্যিই অনেক এনজয় করেছে। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ৮:৩০। নাভিদের গা শুকিয়ে গেছে, কিন্তু অনুজার শাড়ির আঁচল এখনও ভেঁজা। তাড়াতাড়ি করে তারা বাসায় ঢোকে। নাভিদ সোজা নিজের রুমে চলে যায়।
অনুজা নিজের ঘরে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই সে এমন একটা জিনিস দেখে যা দেখে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। সে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। চোখে চিন্তার ছায়া ঘন হয়ে আসে তার।
চলবে?
( এই গল্প পোস্ট করার দিনই এটার পেছনের কাহিনি বলছি। তাই বার বার কাঁচা হাতের গল্প, এটা তো জেরিন আপুর লেখা না এইসব বলে বিরক্ত করবেন না। আমি এটা আপনাদের পড়ার জন্য দেইনি। পেইজে গল্পটা ছিল না। তাই পেইজে রাখার জন্য পোস্ট দেওয়া।)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, প্রেম আসবে এভাবে
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৩+৩৪
-
প্রেমতৃষা গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৯+সারপ্রাইজ পর্ব
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩১+৩২
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৬(শেষ অংশ)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৬(১ম অর্ধেক)