প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৫
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_৫
লোকটি অনুজাকে টেনে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। চিৎকার তো দূরের কথা, নিজের শরীরের ওপরও যেন তার আর কোনো অধিকার রইল না। কিন্তু ঠিক তখনই লোকটি অনুজার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল, “এত ভীতু তুমি, জানতাম না অনুজা।”
অনুজা চোখের সামনে প্রিতুলকে দেখে বলল, “হঠাৎ করে কেউ এমন করলে ভয় তো লাগবেই, প্রিতুল ভাইয়া।”
“তুমি এখানে কেন দাঁড়িয়ে ছিলে?” প্রিতুল জিজ্ঞেস করল।
“পানি আনতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনি?”
“নাভিদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে এসেছি। কফি বানানোর জন্য নিচে নামা।”
“ওহ! আপনি বুঝি কফিও বানাতে পারেন! তাহলে আমাকেও একটু দিন না। ট্রাই করে দেখি, আদৌও খাওয়ার যোগ্য হয় কিনা।”
“তুমি কফি বানাবে নাকি?”
“না না, আমি তো আপনাদের বানানো কফি খেয়ে টেস্ট করার কথা বলছিলাম।”
“ইশ, নিজেরটা নিজেই বানিয়ে খাও।”
অনুজা মুখ ভেংচি কাটল। তা দেখে প্রিতুল তাকে বলল, “আচ্ছা, দেব। তবে আমার রুমে আসতে হবে।”
“কেউ আছে সেখানে?”
“আরে না রে বাবা।”
“ওকে, ভাইয়া।”
“ছিঃ! ভাই বলে ডাকবে না, প্লিজ।”
“তাহলে খালু?”
“হোয়াট!”
দু’জন কথা বলতে বলতে রুমে ঢুকল। কিন্তু রুমের ভেতর পা দিতেই অনুজা থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে নাভিদ। দৃশ্যটি চোখে পড়তেই সে অবচেতনে প্রিতুলের দিকে তাকাল। কিন্তু প্রিতুল এমন ভাব করল, যেন কিছুই জানে না। নাভিদ অনুজাকে দেখা মাত্রই বলল, “হাই, অনুজা… ভেতরে এসো।” অনুজা যেই ভয়টা পেল তাই হলো। এখন সত্যি কিছু না কিছু একটা করতেই হবে। অনুজার প্রিতুলের ওপর রাগ হলো। সব কিছু বলার ওপর, জানার পরও অনুজাকে সে কোন বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, একবার ভেবে দেখেছে? তাই সে প্রিতুলকে বলল, প্রিতুল, আমি একটু নাভিদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চাই।”
“ওকে। আমি নিচেই থাকছি। কথা শেষ হলে জানিও।”
এই বলে প্রিতুল বেরিয়ে গেল। অনুজার কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ আর আতঙ্ক একসঙ্গে ফেটে পড়ল। ফাঁকা রুমে সে নাভিদকে উদ্দেশ্য করে বলল, “কি সমস্যা আপনার? এখানে কেন এসেছেন?”
“অনুজা, আমার সঙ্গে এমন করছ কেন? একটা সুযোগ দাও আমাকে। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
“খুনি আপনি! বিয়ের রাতে যদি আমাকে মেরে ফেলতেন, তখন?”
“ছিঃ! আমাকে নিয়ে এমন ভাবো? এখন পর্যন্ত কি তোমার কোনো ক্ষতি করেছি আমি? তাহলে কেন আমাকে এমন করে দূরে ঠেলে দিচ্ছ? সেদিন তুমি পালিয়ে না গেলে আজ তুমি আমার স্ত্রী হতে।”
“থামুন। চুপ করুন। ভালো লাগছে না। আর আমি ওই বাড়িতে ফিরতে চাই না। আমার সৎ মাকে আপনি চেনেন না—কতটা অত্যাচার করেছে আমার ওপর।”
“আর কয়দিন এখানে থাকবে? কী অধিকার নিয়ে অন্যের বাড়িতে পড়ে থাকবে?”
“বললামই তো প্রিতুলের সাথে আমার বিয়ে হবে।”এই কথাটুকু বলেই অনুজার চোখ ভিজে উঠল। কান্না আর অসহায়ত্ব একসঙ্গে তার ভেতর ভেঙে পড়ল। নাভিদ এগিয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। “আমার খোঁজ আপনি কীভাবে পেলেন?”
“এইসব আমার জন্য কিছুই না। এখন এসব ভাবার সময় নয়। চলো আমার সঙ্গে। বাড়ি যাবে। তোমার বাবা, বোন—সবাই অপেক্ষা করছে। আর এসব নাটক বন্ধ করো। অন্তত নাভিদের সমানে এত মিথ্যা বলে কেউ পার পায়নি।”
“সম্ভব না।”
“কেন?”
“কারণ… আমি প্রিতুলকে ভালোবেসে ফেলেছি।” এই একটিমাত্র বাক্য নাভিদের বুকে প্রচণ্ড আঘাত করল। শেষ পর্যন্ত কি না, নিজের বন্ধুর সঙ্গেই তাকে ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে লড়াই করতে হবে! “এসব মিথ্যে। আমি জানি। তুমি আমাকে ভালোবাসো। কেন বুঝতে চাইছ না?”
“প্লিজ… আমি একা থাকতে চাই।”
“অনুজা, যেয়ো না… প্লিজ।” তার কণ্ঠে তখন অনুনয়, অথচ অনুজার চোখে শুধু ক্লান্তি আর একরাশ অনির্বচনীয় যন্ত্রণা। অনুজা কান্না করতে করতে নিজের রুমে চলে যায়। বাইরে বসে থাকা প্রিতুল কিছুই বুঝতে পারছিলো না। কি এমন কথা হয়েছিল তাদের দুজনের মাঝে, যে অনুজা এভাবে ভেঙে পড়েছে। এটা তার কাছে অজানা। তাড়াহুড়ো করে রুমে ঢুকতেই চোখে পড়ে নাভিদের এক অদ্ভুত অবস্থা। ভেতর থেকে সে যেন ভেঙে পড়ছে, কিন্তু কাউকে কিছু বোঝাতে দিচ্ছে না।
“কিরে, কি হয়েছে?”
“কিছু না… রুমে যাচ্ছি আমি।” নাভিদ চলে যায়। প্রিতুল মাথা ঘামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কিছুই বোঝার উপায় নেই।
পরদিন সকালেই প্রিতুল জরুরি কাজে অফিস চলে যায়। কয়েকদিন ধরে সে ব্যস্ত ছিল। আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো ঝড়ের মত। পরিবেশটা অনুজার ভালো লাগছিল। কিন্তু মনটা শান্ত ছিল না। তার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল জীবনের পথচলা সঙ্গী হিসেবে কাকে বেছে নেওয়া উচিত? যাকে সে ভালোবাসে নাকি যে তাকে ভালোবাসে? একদিকে প্রিতুল, যার চোখে অনুজা কখনো ভালোবাসার আলো দেখেনি অন্যদিকে নাভিদ, যে তার জন্য মরিয়া। কিছু দিন এইভাবে কেটে গেল। কেউ কাউকে স্পষ্টভাবে কিছু বলল না। অনুজা এখন নিজেকে ঘরবন্দি করে রাখে। প্রেমের দ্বিধায় দিনগুলি অতিবাহিত হচ্ছে। হঠাৎই সে সিদ্ধান্ত নেয় নাভিদের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে। ছেলেটা তার সাথে কোনো অন্যায় করেনি। নিজের ঘরবাড়ি, সব কিছু ছেড়ে এখানে এসেছে শুধুমাত্র তার জন্য। পাওয়ার পরও তার সঙ্গে বাজে কিছু হয়নি। অন্যদিকে প্রিতুল তো ব্যস্ত থাকে সারা দিন। তাই অনুজা মনে করে এবার নাভিদের কাছে গিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করবে। কোনো কথা না বলে তাড়াহুড়ো করে সে রুমে যায়। কিন্তু নাভিদ রুমে নেই। সার্ভেন্টকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারে সে ছাদে। অনুজা তখন ছাদে চলে যায়। উপরের দিকে তাকালে আকাশ আজ অনেক মেঘলা, বৃষ্টি হতে চলেছে। তবুও নাভিদ ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে শীতল বাতাসের ছোঁয়া অনুভব করছে। তার দৃষ্টি দূরের সীমানায় আটকে আছে।
“নাভিদ! কি করছেন?”
“আরে তুমি! আসো।”
“এখানে হঠাৎ?”
“বৃষ্টি ভালো লাগে… আর এমন মেঘময় পরিবেশ। তাই ছাদে এসেছি।”
“আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।”
“আমি সব সময়ই তোমার কথা শুনতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি তো আমার সঙ্গে কথাও বলতে চাওনি।”
“আর লজ্জা দিয়েন না… সরি, আপনাকে আমি ভুল বুঝেছি।”
“আমাকে বুঝলেই হবে। সরি চাইবার দরকার নেই। আমি তোমার জন্য সব করতে পারি। তুমি শুধু আমাকে বুঝলেই হবে। একদিন সত্যি বুঝবে, জানো, নাভিদ তোমাকে কতটা ভালোবাসত। কিন্তু তখন আর সময়কে পেছনে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। অনেক আফসোস করতে হবে।” অনুজা কিছুই বলে না। শুধু নিচের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়।
“অনুজা, নিচে চলো। বৃষ্টি পড়ছে।”
“না… অনেক ভিজতে ইচ্ছে করছে। হয়তো পাপগুলো ধুয়ে যাবে।”
“পাগলি! তুমি কতটা নিষ্পাপ, নিজেও জানো না। এবার চলো নিচে। পরে ঠান্ডা লাগবে, তখন বুঝবে।”
“তুমি ভিজবেন প্লিজ…” অনুজা নাভিদের হাত ধরে আটকে দেয়। নাভিদ হতবাক হয়ে অনুজার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটি কি মায়াবি! বৃষ্টি দেখে পুরো শিশুর মতো আনন্দিত। এই মুখটা কি দেখার সৌভাগ্য তার সারাজীবন হবে, আল্লাহ? এমন প্রশ্নের খই যেন ফেটে পড়ে তার মস্তিষ্কে।
দু’জনেই বৃষ্টিতে ভিজে। কে জানে—প্রকৃতি কি তাদের একে অপরের কাছে টেনে আনতে চাইছিল, নাকি আরও নির্মমভাবে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কোনো নীরব পরিকল্পনা করছিল! আকাশের অঝোর ধারার মতোই তাদের ভেতরের অনুভূতিগুলোও তখন অস্পষ্ট, দ্বিধাগ্রস্ত। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে আসে। আকাশের গম্ভীরতা ধীরে ধীরে হালকা হয়।
“চলো, এবার নিচে চলো।”
“হুম।”
“শুনো… কাল আমার সঙ্গে একটু বাইরে যাবে?”
“কোথায়?”
“কাঠগোলাপের বাগানে। যাবে?”
“আল্লাহ! ওটা তো আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুল।”
“তাহলে তো ভালোই হলো।”
রাতের দিকে প্রিতুল অনুজার রুমে আসে। অনেকদিন পর তাদের মুখোমুখি দেখা। কথাবার্তাও প্রায় বন্ধ ছিল এই ক’দিন। “কেমন আছো?”
“ভালো… তবে কারো মতো এত ব্যস্ত না।”
“খোঁচা দিচ্ছ নাকি?”
“কাকে? আর কেনই বা?”
“আচ্ছা, হয়েছে। সরি। রাগ কোরো না। মুভি দেখবে?”
“কেন নয়। তবে একটা কাজ করুন—নাভিদকেও ডেকে আনুন। সবাই মিলে একসাথে দেখব।”
“ও আবার কেন? ওকে নিয়ে তো তোমার কত কাহিনি! বাড়ির সবার সামনে কত কী বলে দিলে না বুঝেই।”
“কাহিনি জানার পরও তো সেদিন ওর মুখোমুখি আমাকে দাঁড় করিয়েছিলেন আপনি মনে নেই?”
“আচ্ছা, হয়েছে। ডেকে আনছি।” প্রিতুল বেরিয়ে যায়। অনুজা একা বসে থাকে। ঘরের আলো নরম, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা আরও ঘনীভূত। কিছু সম্পর্ক শব্দে ভাঙে না, কিছু দ্বিধা প্রশ্নে মেটে না—শুধু সময়ের অপেক্ষায় থাকে, ঠিক বৃষ্টিভেজা মাটির মতো।
কিছুক্ষণ পর নাভিদও চলে আসে। ওদিকে রুশদা যখন প্রিতুলের ঘরে প্রবেশ করে, হঠাৎই নাভিদকে দেখে অবাক হয়ে যায়। “কই, যাওয়া হচ্ছে?”
“প্রিতুল আর অনু ডেকেছে। মুভি দেখবে বলল।”
“কই? আমাকে তো কেও কিছু বলেনি।”
“কি জানি।”
“ঠিক আছে, তোমরা একা কেন? আমিও মুভি দেখব। ঘুমও আসছে না। চলো।”
নাভিদ কোনো কথা না বলে সরাসরি নূরের রুমে চলে আসে। তার পিছু পিছু রুশদাও সেখানে আসে। তাকে চোখে পড়তেই প্রিতুলের মুখ কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তাই তাকে ওয়েলকাম করার বদলে প্রশ্ন করে,
“তুমি এখানে কি করছ? এখনো ঘুমাওনি?”
“ওমা! ডিস্টার্ব করলাম বুঝি?”
অনুজা তাকে বলল, “আরে না! ডিস্টার্ব করবে কেন? এখানে আসো। মুভি দেখব। একটু পরে শুরু হবে।”
সবাই ধীরে ধীরে বসে পড়ল। রুশদার এক পাশে প্রিতুল, তার পাশে অনুজা, আর তার পাশে নাভিদ।
মুভির একটি মুহূর্তে, রোমান্টিক সিন চলে আসে। হঠাৎ অনুজার চোখ পড়ল রুশদা প্রিতুলের হাত সুন্দরভাবে ধরেছে। একপ্রকার ইচ্ছে করেই। কিন্তু প্রিতুলের মুখ দেখে বোঝা যায়, সে অনেকটাই অস্বস্তিতে আছে। নাভিদ এই দৃশ্য দেখে এক অদ্ভুত জটিল অনুভূতিতে ভুগতে থাকে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সে হঠাৎ বলে,
“দোস্ত, আমি কফি বানিয়ে আনি।”
এটা শুনে অনুজা বলেই উঠে, “আমিও যাব।”
কিন্তু প্রিতুল তাকে বাধা দেয়। কেন জানি, নাভিদের সঙ্গে অনুজার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা তার পছন্দ নয়। কিন্তু রুশদার কারণে বাধা দিয়েও লাভ হয় না—অনুজা দেরি না করে চলে যায়। কিচেনে পৌঁছানোর পর অনেকক্ষণ পার হয়। তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না। হঠাৎ অনুজা চোখ রাখল নাভিদের গায়ের দিকে। এমন কিছু দেখল যা দেখে তার বুক ঠেসে যায়। সে চিৎকার করে নাভিদকে জড়িয়ে ধরে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে নাভিদ…
চলবে?
( এখন থেকে এই গল্প সকালেই দিবো)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, প্রেম আসবে এভাবে
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কমান্ডার তনয় জেইদি গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৭+১৮
-
প্রেমতৃষা ৪২ (প্রথম অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
প্রেম আসবে এভাবে গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২+৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৫+১৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৬+৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৬(১ম অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব