প্রেমবসন্ত_২ ।৪৫।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
ঈশা তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করল। অর্ণ হাত ঝেড়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে রাস্তার ওপাশে তাকাল। কায়নাত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। অর্ণ রাস্তা পার হয়ে নিকটে আসতেই নিশা বলল,
“তোমরা এখানে মিটিং-এ এসেছিলে ভাইয়া?”
অর্ণ মাথা নাড়ল। নিশা বলল,
“ওই মেয়েটা কে?”
অর্ণ উত্তর দিল না। ঝুঁকে কায়নাতের ছোট্ট হাত মুঠোয় নিতেই কায়নাত শরীর শক্ত করল। হাত মুচড়ে ছাড়াতে চাইল অর্ণর হাত। পারল না ওর শক্তির সাথে। অর্ণ বলল,
“এই রাত করে বাইরে এসেছিস কেন?”
“জারা আপু বলছিল এই মার্কেটে বেশ ভালো প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। তাই ভাবলাম আজ শেষ দিন একটু কেনা-কাটা করে আসি। ভালোই হলো তোমাদের সাথে দেখা হয়ে।”
স্বার্থ গম্ভীর হয়ে নিশাকে পর্যবেক্ষণ করল। নিশা তার দিকে তাকাচ্ছে না। অর্ণ কায়নাতকে বলল,
“আরও কিছু কেনার আছে তোমাদের?”
কায়নাত উত্তর দিল না। স্বার্থ ওদের একা ছেড়ে দিতে নিশার হাত খোঁপ করে ধরে বলল,
“আমরা মার্কেটের ভেতরে যাই তোরা আয়।”
এই বলে টেনে হিচড়ে নিশাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। শেহের আর জারাও গেল পিছু পিছু। শেহের ভাবল নুসরাত আর আদির জন্য কয়েকটা ড্রেস নিবে। আদি তার সন্তান, তার দায়িত্ব। নিজের সন্তান হিসেবে ভালোবেসে এই প্রথম কিছু দিবে সে। আগেই হয়তো দেয়া উচিত ছিল। নুসরাত কী তার দেয়া জিনিস ব্যবহার করবে? নাও করতে পারে!
কায়নাত জোর করে অর্ণর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলল,
“রাস্তা-ঘাটে এসব জড়াজড়ি ভালো লাগছে না।”
অর্ণ অবাক হলো। কিছুটা ধমকের স্বরে বলল,
“বউ হও তুমি আমার। আমি আমার বউয়ের হাত ধরব নাতো কার হাত ধরব?”
“সে আমি কী করে জানব? আপনার হাত আপনার ইচ্ছা।”
“এভাবে কেন কথা বলছো?”
“কিভাবে কথা বলছি?”
অর্ণ শ্বাস ফেলল। জোর করেই কায়নাতের হাত মুঠোয় নিয়ে মার্কেটের ভেতরে পা বাড়াল। তিন নাম্বার ফ্লোরে শাড়ির দোকান আছে অনেক গুলো। সেখানে গিয়ে থামল ওরা। অর্ণ চেয়ার টেনে দিল কায়নাতকে বসার জন্য। দোকানদার তাদের দেখে বললেন,
“কেমন কাপড় দেখতে চাচ্ছেন স্যার?”
অর্ণ খানিকক্ষণ ভাবুক হয়ে বলল,
“আমার লাল টুকটুকে বউয়ের জন্য কিছু জামদানি শাড়ি বের করুন।”
দোকানদার মুচকি হেসে কাপড় বের করতে করতে বললেন,
“স্যার কী নতুন বিয়ে করেছেন?”
অর্ণ আড়চোখে কায়নাতকে দেখে বলল,
“৭ বছর আগে বিয়ে করেছি।”
কায়নাতের কোনো সাড়া শব্দ নেই। সে চুপচাপ অর্ণর কাণ্ড দেখছে। লোকটা পাগলের মতো পুরো দোকানের সব শাড়ি প্যাকেট করে ফেলেছে। বিল এসেছে বেশ মোটা অঙ্কের। কায়নাত অর্ণর দিকে তাকাল। টাকা কী গাছে ধরে? এমন করে টাকা অপচয় করার মানে সে খুঁজে পেল না। নাজনীনের বিয়ের পর থেকে সে কম হলেও ষাট’টার বেশি শাড়ি উপহার পেয়েছে সবার থেকে। ওগুলো থেকে হাতে গোনা কয়েকটা পরেছে সে,বাকি গুলো আলমারিতে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। আর এখন যতগুলো শাড়ি নেয়া হয়েছে তার হিসেব করে উঠতে পারল না কায়নাত। ওরা রিসোর্টে ফিরল বেশ রাত করে। বাইরে যেহেতু খাওয়া দাওয়া হয়েছে তাই আর কষ্ট করে ওদের নিচে নামতে হলো না। কায়নাত বিছানা ঠিক করে সবে বালিশে মাথা রেখেছিল, অর্ণ বিছানার পাশে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। কায়নাতের এমন ব্যবহার তার পছন্দ হলো না।
“কী নাটক শুরু করেছ কায়নাত? সমস্যা কী তোমার?”
কায়নাত ছোট্ট করে জবাবে বলে,
“কিছু না।”
অর্ণ কথা বলার চেষ্টা করেও কায়নাতের জেদের সাথে পারল না। লোকটার ইগো আছে নাক সমান। তার কী দায়িত্ব নয় বউয়ের রাগ ভাঙানোর? তাহলে কেন সে নিজেও জেদ ধরে শুয়ে পড়ল? কেন কায়নাতকে জড়িয়ে ধরে ভুল স্বীকার করল না?
রাত বাড়ছে। কাল ভোর হতেই বেরিয়ে পড়বে সবাই। নিধি যেহেতু জারার সাথে রুম শেয়ার করছে তাই জারার সাথে ইদানীং তার ভালো বন্ডিং হয়েছে। ইতোমধ্যে জারা জানতে পেরেছে সোহান তাকে কল করে কথা বলার জন্য। প্রেম এই বিষয়ে কিছু জানে না। জানলে নিশ্চিত মেরে মাটিতে পুঁতে রাখবে। সকাল হলো। ভোরের পরই ওরা সবাই রওনা হলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। নাজনীন আর জয়া গেছে খুলনা। ওদের ঢাকায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমে মাশফিক চৌধুরীর কোলে আদি বসে আছে। ঝাঁপটে নানার গলা জড়িয়ে ধরে সিলেটে কাটানো দিন গুলোর কথা আঙুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলছে। ইতোমধ্যে সবাই পরিষ্কার হয়ে নিয়েছে। আদাল, আয়মান আর প্রেম নিজেদের ঘরে গিয়েই দরজা লাগিয়েছে। বেহরুজ বেগম ডাইনিং টেবিল থেকে কায়নাতকে ডেকে বললেন,
“তোমার বাবা কল করেছিল।”
কায়নাত শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো। নরম গলায় বলল,
“উনি কেন কল করেছিলেন?”
“জিজ্ঞাসা করেছিলেন তোমাদের কথা। বললেন তোমার জন্য টিচার ঠিক করতে।”
“সে তো ঠিক করাই আছে।”
“আমি নিশার ভার্সিটির সামনে একটা কোচিং চেন্টারে কথা বলেছিলাম। যদি সমস্যা না হয় তাহলে আগামীকাল থেকেই পড়া শুরু করো। বিকেল ৫টা থেকে ৭টা অব্দি পড়াবে। প্রত্যেকদিন আদাল কিংবা আয়মান গিয়ে নিয়ে আসবে।”
“কিন্তু উনি যে বাড়িতে টিচার ঠিক করলেন?”
“সেটাও পড়বে। তিনি সকালে আসবেন।”
কায়নাত মাথা নাড়ল। মনটা খুশিতে ভরে এলো। আবার সে পড়াশোনায় মন দিতে পারবে। এইচএসসি দিয়ে একটা ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি হতে হবে। কায়নাত ভাবল আজ মিলি বেগমকে ফোন দিবে। মায়ের পেটটা বোধহয় বেশ বড় হয়েছে। আসার আগে একটাবার মায়ের সাথে দেখা করে আসা উচিত ছিল।
সোফায় তখন নুসরাত বাবার পাশে বসেছিল। নিশা আর আদি বকবক করে মাশফিক চৌধুরীকে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ নুসরাতের ফোনে মেসেজের শব্দ আসতেই সে ফোন চোখের সামনে ধরল। হোয়াটস অ্যাপে শেহের মেসেজ করেছে তাকে। ছোট্ট করে লেখা, “রাত, ছাদে আসো কিছুক্ষণের জন্য।”
নুসরাত শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেহরুজ বেগম বললেন,
“কোথায় যাচ্ছিস?”
নুসরাত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“একটু ছাদ থেকে ঘুরি আসি মা। গরম লাগছে।”
“যাস না। আজ আকাশের অবস্থা ভালো না। বৃষ্টি হতে পারে।”
নুসরাত শুনল না মায়ের কথা। গুটি গুটি পায়ে ছাদে প্রবেশ করতেই ভারী ঠান্ডা বাতাস তার সর্বাঙ্গে ধাক্কা মারল। ওইযে দূরে দেখা যাচ্ছে শেহেরের হাতে জ্বলজ্বল করছে জ্বলন্ত সিগারেট। লোকটা আজ-কাল একটু বেশি ধূমপান শুরু করেছে বলে মনে হলো নুসরাতের। কপালে ভাঁজ ফেলে এগিয়ে গেল সেদিকে। শেহের উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ নুসরাতের কণ্ঠে পিছু ফিরে তাকাল।
“তুমি নাকি একটু পরই বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হবে?”
শেহের তাড়াতাড়ি হাতের সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিয়ে বলল,
“মা বারবার কল করছেন, যেতে হবে।”
নুসরাত চুপ করে রইল। কী বলবে সে এখন? শেহের শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে আড়চোখে নুসরাতকে দেখে বলল,
“কিছু ভেবেছ?”
নুসরাত বলল,
“কোন বিষয়ে?”
“আমাদের বিয়ে।”
নুসরাত চুপ রইল। শেহের রেলিং এর সাথে হ্যালান দিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকাল। ঘন কালো মেঘে ঢেকে আছে পুরো জগৎ। খানিকক্ষণ পর পর গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হচ্ছে আকাশ ভেদ করে। এই বুঝি বৃষ্টির কোণা গুলো টুপটুপ করে তাদের সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দেবে। শেহের চোখ ফিরিয়ে নুসরাতের দিকে তাকাল। মেয়েটা সব সময় এমন নীরব থাকতেই পছন্দ করে? এই সময়ে চুপ থাকা কী খুব বেশি দরকার? শেহের তবু সময় দিল ওকে। নুসরাত হয়তো বুঝল সেটা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলে উঠল,
“তোমাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি?”
“নিঃসন্দেহে।”
“আমি অনেক ভেবেছি। আমার জন্য না হলেও আদির জন্য শক্ত একটা হাত দরকার। তাই বলে ভেবো না তোমাকে আমি হাসব্যান্ডের অধিকার দিব।”
শেহেরের ঠোঁটের কোনায় তখন বিরাট বড় হাসি। ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝুঁকিয়েছে। নুসরাত চোরা চোখে ওকে দেখল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”
শেহের মাথা তুলে বলল,
“কী শর্ত?”
“এই মুখ নিয়ে আমি কাউকে বলতে পারব না আমাদের বিয়ে হয়েছে। তুমি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসো।”
শেহের যেন আকাশ থেকে পড়ল এমন আবদারে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে নুসরাতের মুখে এমন কথা। এই মেয়ে কাল অব্দি বিয়ে মানি না বলে চিৎকার করছিল। নুসরাত পায়ের নিচে ফ্লোরে পা ঠুকিয়ে বলল,
“আমাকে আবার বিয়ে করো।”
শেহের ঘোরের মধ্যে থেকেই বলল,
“করব।”
“আচ্ছা। আমার আরও শর্ত আছে।”
শেহের চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন চুপ থেকে বলে দিচ্ছে, “একটা কেন, হাজারটা শর্ত মানতে রাজি আছি।”
নুসরাত বলল,
“আমাকে কোনো কিছু নিয়ে জোর করতে পারবে না তুমি। বিয়েটা তো আমি জোর করে করছি না তাই না? বরং তুমিই আমাকে জোর করে বিয়ে করেছ।”
শেহের ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝাঁকাল। নুসরাত যে কথা গুলিয়ে ফেলছে সেটা খুব করে বুঝতে পারছে সে। নুসরাত বলল,
“আদিকে আমাদের সাথে রাখব। আজ বিয়ে করে তোমার ঘরে গেলে কাল ওকে নিয়ে তোমার সমস্যা হলে এই সম্পর্ক ভাঙতে আমি দুবার ভাববো না।”
শেহের এই পর্যায় বিরক্ত হলো ওর কথা শুনে। মাথা মোটা মেয়ে চোখের সামনে এতদিন কী দেখেছে? আদির ওর বিরক্তির কারণ হবে? আদৌ এটা বিশ্বাসযোগ্য? আকাশের গুড়ুম গুড়ুম ভাব তীব্র হলো। নুসরাত শেহেরের উত্তরের আশায় ঠাই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। শেহের দু’পা এগিয়ে এলো। নুসরাত পিছিয়ে যেতে গিয়েও গেল না।
“তোমাকে একবার জড়িয়ে ধরি রাতপাখি? শুধু একবার।”
নুসরাত কিছু বলবে,সেই সময় টুকুও শেহের দিল না। ঝাঁপটে বুকে আগলে নিল ওকে। এখন তো এই স্পর্শ হারাম নয়। অনুমতি নেয়ার দরকার ছিল বলেই বলেছে। নুসরাত শক্ত হয়ে এলো। মন শক্ত হলেও সর্বাঙ্গ ছেড়ে দিল শেহেরের বুকে। শেহের লম্বা করে শ্বাস টেনে শক্ত করে বুকে চেপে ধরল ওকে।
“আপনার জন্য মরতেও রাজি আছি মিসেস সৈয়দ। আপনি চাইলে আপনার স্বামী পুরো দুনিয়া এক করতে রাজি আছে।”
নুসরাত মিনমিন করে বলল,
“ছাড়ো আমাকে। কেউ চলে এলে খারাপ ভাববে।”
শেহের ঘড়িতে সময় দেখে তাড়াতাড়ি নুসরাতকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“বাসায় ফিরতে হবে আমার।”
বলতে বলতে নুসরাতের চিবুক চেপে ধরে কপালে গাঢ় চুমু এঁকে হনহন করে সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল। নুসরাত হতবুদ্ধির ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে পা বাড়াল নিচে। রাত তখন কত হবে? এই ১২টার ঘরে হয়তো। কায়নাতের আজ মন খারাপ। অর্ণর সাথে কাল রাত থেকে একটা কথাও সে বলেনি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে খানিকক্ষণ আগে। কায়নাত রেলিং ঘেঁষে চৌধুরী বাড়ির গেটের দিকে তাকাল। হুট করেই কেঁপে উঠল খানিক। এই মাত্রই মনে হচ্ছিল কেউ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এদিকে তাকিয়ে ছিল। অথচ এখন কোথাও কেউ নেই। কায়নাত চাতক পাখির মতো খুঁজল, পেল না। ঘাড়ে কারোর হাতের স্পর্শ পেতেই চিৎকার করে উঠল ও। অর্ণ ধমক দিয়ে বলল,
“তুলে এক আছাড় মারব, বেয়াদব মহিলা। এই রাত করে কোন সাহসে একা একা ছাদে এসেছ?”
কায়নাত চমকে উঠল। অর্ণকে এই সময় সে মোটেও আশা করেনি। শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,
“এমনি এসেছিলাম।”
“এই রাত করেই কেন? তাও আবার বাইরে হচ্ছে বৃষ্টি।”
কায়নাত পাশ কেটে চলে যেতে চাইলে অর্ণ ওর হাত চেপে ধরল। দাঁত পিষে বলল,
“হচ্ছে কী এসব? কথা কেন বলছো না?”
কায়নাত হাত মুচড়ে বলল,
“আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই। হাত ছাড়ুন আমার।”
অর্ণ টেনে নিজের দিকে নিয়ে এলো। মেয়েটার অভিমানী মুখ ফুলে উঠেছে রাগে। ততক্ষণে প্রায় ভিজে একাকার দুজনে। বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে খানিক। অর্ণ কায়নাতের ভেজা চিবুক উচিয়ে ধরল। বউয়ের অভিমানী দৃষ্টি জোড়ায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
“আমাকে আপনি ভয় পান না মিসেস?”
“পাই না।”
অর্ণ কখন যে কায়নাতকে রেলিং-এর শেষ প্রান্তে এনেছে সেটা কায়নাত ঠাওর করতে পারল না। পেছন দিকে আর একটু ঝুঁকলেই ঠাস করে পড়ে যাবে নিচে। শুকনো ঢোক গিলল বেচারি।
কম্পিত গলায় বলল,
“আমাকে নামান এখান থেকে।”
অর্ণর পুরুষালী স্বর কেমন ভারী হয়ে এলো।
“ফেলে দিই? এত জ্বালাতন সহ্য হচ্ছে না আমার।”
কায়নাত ডুকরে উঠল। শক্ত করে অর্ণর শার্টের কলার ধরে জড়াল গলায় বলল,
“আপনাকে আমি খু ন করব। নামান বলছি!”
অর্ণ ঠোঁট টিপে ঠাই দাঁড়িয়ে রইল। কায়নাত ভীতু চোখে অর্ণর গম্ভীর মুখশ্রী দেখে বলল,
“আর রাগ করব না, এবার নামান না!”
অর্ণর চোখ সরু হলো।
“কানে ধরো।”
“কান ধরলে ছাদ থেকে পড়ে যাব।”
“তাহলে মিষ্টি করে একটা চুমু দাও আমায়।”
“পারব না।”
“তাহলে ফেলে দেব।”
“আপনি খুব খারাপ। এখন কিন্তু চিৎকার করব বলে দিলাম।”
অর্ণ সিরিয়াস হয়ে কায়নাতকে পেছন দিকে ঠেলে দিতেই কায়নাত চিৎকার করে উঠল।
“দিচ্ছি দিচ্ছি! খবিশ লোক, আপনার পিন্ডি চটকে খাব আমি।”
অর্ণ বাঁকা হেসে কায়নাতের কোমর ধরে টেনে আনল কাছে। গাল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি করো, নাহলে তোমার পিণ্ডি চটকাব আমি।”
কায়নাত ছলছল চোখ মুছে অর্ণর গলা জড়িয়ে ধরে গালে ছোট্ট একটা চুমু খেল। সুযোগ বুঝে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়েই শরীরের শক্তি দিয়ে কামড় বসাল একটা। অর্ণ ব্যথায় দাঁত চেপে কায়নাতের ছোট্ট শরীর চেপে ধরল। কায়নাত মুখ উঠিয়ে কাতর চোখে অর্ণর লাল হয়ে আসা মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার হাত অন্য কেউ কেন ধরবে? আপনি কেন ওই মেয়েকে কিছু বললেন না?”
অর্ণ ওকে প্যাঁচিয়ে ধরে অন্যহাত দিয়ে ঘাড়ে হাত রেখে দেখল রক্ত বের হচ্ছে। ও কায়নাতের উত্তর না দিয়ে কায়নাতের চিবুক চেপে ধরে ওর দাঁত বের করল। দাঁতে আঙুল ঘষে বলল,
“বেয়াদব মহিলা, এগুলো দাঁত নাকি ধারাল ছুরি? কামড়া-কামড়ি শিখেছ কোত্থেকে?”
কায়নাত গাল ফুলিয়ে বলল,
“আপনার থেকেই। এখন দয়া করে বলবেন না আপনি কখন কামড়ালেন!”
অর্ণ খানিকক্ষণ রেগে তাকিয়ে থেকে কেঁশে উঠল। থমথমে গলায় বলল,
“দ্বিতীয় বার এমন করলে মার খাবে। ঘরে চলো।”
“কোলে নিন।”
অর্ণ ওর ছোট্ট শরীরটা কোলে তুলে নিল। ভেজা কাপড় পাল্টে এসে কায়নাত কাঁথা মুরি দিয়ে শুলো বিছানায়। অর্ণ ঘরের বারান্দার দরজা বন্ধ করে বিছানার নিকট এগিয়ে আসতে চাইলে কায়নাত গম্ভীর গলায় বলল,
“কাছে আসবেন না। ওই মেয়ের কাছে চলে যান।”
অর্ণ বিরক্ত হয়েও চুপ করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। রাশভারী গোলায় বলল,
“আর একটা কথা বললে তুলে আছাড় মারব, বেয়াদব মহিলা। চুপচাপ ঘুমাও। কাল থেকে না তোমার টিচার পড়াতে আসবে?”
কায়নাত নাক কুঁচকে বলল,
“একটা সুন্দর ছেলে দেখে তার সাথে পালিয়ে যাব দেখে নিয়েন। তখন হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদলেও আমায় পাবেন না, মিস্টার চৌধুরী সাহেব।”
অর্ণ রেগে তাকাল। দাঁত চেপে বলল,
“কোনোদিন এমন হলে তোমার সাথে সাথে ওই ছেলেরও বুক চিরে কলিজা ছিঁ ড়ে বের করব আমি। এমন দুঃসাহস দেখানোর আগে কম হলেও হাজারবার ভাববে। আমি যেমন যত্ন করে বুকে আগলে নিতে পারি, ঠিক তেমন প্রয়োজনে গলা টিপে মে রে ফেলতেও পারি।”
কায়নাত অর্ণর খড়খড়ে গলায় ঠান্ডা হুমকি শুনে শুকনো ঢোক গিলে উল্টো ফিরে শুলো। লোকটা ভয়ানক। মুখের কথা শুনে মনে হচ্ছে না ফাজলামো করছে।
বৃষ্টির সকাল গুলো যেন একটু বেশিই মিষ্টি হয়। আজ বৃহস্পতিবার। সকাল সকাল বাড়িতে ব্যস্ততা পড়েছে সকালের নাস্তার জন্য। কায়নাত শাশুড়ির সাথে লক্ষী মেয়ের মতো হাতে হাতে কাজ করছে। বেহরুজ বেগম কাজের ফাঁকে একবার কায়নাতের দিকে তাকালেন। পুরো গিন্নি সেজে সংসারের কাজ করছে মেয়েটা। তিনি ব্যস্ত হাতে কাজ সামলে বললেন,
“শোনো কায়নাত, তোমার শ্বশুর বলেছেন সংসারের কাজ রেখে পড়াশোনায় মন দিতে। বাড়ির বউ, সেই হিসেবে মাঝে মধ্যে টুকটাক কাজ করতেই পারো, কিন্তু শুধু সংসারে ডুবে থেকো না।”
কায়নাত হঠাৎ শাশুড়ির মুখে এমন কথা শুনে বলল,
“আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে আম্মু।”
“না হোক। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো।”
কায়নাত মাথা নেড়ে দুতলায় উঠল কাজ সেরে। ভাবল নিশাকে পরে ডাকবে, আগে বাড়ির বাঁদর গুলোকে ডাকতে হবে। বেহরুজ বেগম বলেছেন আজ চার ভাইকে ডেকে নিয়ে আসতে। যদি না আসতে চায় তাহলে কানে ধরে টেনে আনতে। কায়নাত তিন তলায় এলো। অর্ণকে ডাকার সাহস হলো না ওর। এখন ডাকতে গেলে তুলে ছুড়ে মারবে বাড়ির বাইরে। তাই হেলে দুলে এলো আদালের ঘরের সামনে। দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
“ও ভাইয়া, শুনছেন?”
বেশ কয়েকবার ডাকার পর ভেতর থেকে আদাল দরজা খুলে বিরক্ত ভরা চোখে কায়নাতকে দেখে বলল,
“কী হয়েছে ভাবি? সকাল সকাল চিৎকার করছেন কেন?”
কায়নাত বলল,
“ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন। আম্মু সবাইকে ডাকছে।”
“পরে যাব আমি।”
“আম্মু বলেছে আমার সাথে নিচে না নামলে আপনার কান টেনে নিয়ে যেতে।”
আদাল হতভম্ব হয়ে কায়নাতের দিকে তাকাল। হতবুদ্ধি হয়ে বলল,
“আম্মু এসব বলেছে?”
“শুধু কী তাই? আরও বলেছে আমার কথা না শুনলে বাড়ি শুদ্ধ মানুষের সামনে চার ভাইকে কানে ধরে ওঠবোস করাবে।”
আদাল খানিকক্ষণ পিটপিট করে কায়নাতকে দেখে মুচকি হেসে বলল,
“আমি ৫ মিনিটের মধ্যে নিচে আসছি ভাবি। আপনি বরং ভাইয়াদের গিয়ে ডাকুন।”
এই বলে মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিল। কায়নাত প্রথমে ভয় পেলেও পরে ঠোঁট টিপে হাসল। দেবর গুলো বেশ ভয় পায় তাকে। চোখ তুলে কিংবা গলা তুলে কথা বলার মতো মানুষ অন্তত এই বাড়িতে নেই। একমাত্র তার গম্ভীর বরটা ছাড়া বাকি সবাই ঠিক আছে। জামাইটা বড্ড ঘাড়ত্যাড়া। একটা কথা বললে দশটা শুনিয়ে দেয়। কায়নাত তিন দেবরকে ডেকে অর্ণর ঘরে এলো। অর্ণ তখন কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। কায়নাত ফ্লোরে বসে খানিকক্ষণ ওকে দেখল দুচোখ ভরে। শাড়ির আঁচলের এক কোণ মুড়িয়ে অর্ণর কপাল ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শুনছেন, লাটসাহেব?”
অর্ণ বাচ্চাদের মতো চোখ কুঁচকে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমঘুম গলায় বলল,
“বিরক্ত করে না সোনা।”
“বেলা হলো কত দেখেছেন?”
“আর একটু ঘুমাব।”
“আমার খিদে পেয়েছে।”
অর্ণ পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। কায়নাতের দুষ্টু মাখা মুখ খানা দেখে হাত বাড়িয়ে কপালের চুল গুছিয়ে দিয়ে ভরাট গলায় বলল,
“আমাকে খাও।”
(হাই সিঙ্গেল পিপল। রেসপন্স করুন। আগের থেকে রেসপন্স কমে গেছে😭)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৮