প্রেমবসন্ত_২ ।৩৮।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
রাতে রিসোর্টের ছাদে পার্টির আয়োজন করা হয়েছে।চারদিকে ঝলমল করছে আলোর রশনি গুলো।বাহারি ফুলে মজেছে পুরো ছাদ।মধ্যখানে তুলোর তৈরি নরম গদির উপর সাজানো হয়েছে খাবার।স্বার্থ দরজার সামনে থেকে উকি মারল।দেখল এখনও কেউ আসেনি।ছাদে উপস্থিত ছিল আদাল,নিশা,জারা আর প্রেম।প্রেম স্বার্থর হাতের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে ফেলল নিমিষেই।দাঁত চিবিয়ে বলল,
“ম’দ খাবে তোমরা?”
স্বার্থ হাতের বোতল দুটো একপাশে লুকিয়ে পিছু ঘুরে দাঁড়াল।বুক টানটান করে ভারী গোলায় বলল,
“জীবনে খাসনি মানে হচ্ছে?”
বোনদের সামনে প্রেম কিছু বলতে না চাইলেও বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলল,
“তাই বলে এখানে?সবাই আছে জানো না?”
“সবাইকে নিয়ে খেতে বলেছি?চুপ থাক প্রেমার বাচ্চা।”
নিশা চোখ ছোট ছোট করে গুটি গুটি পায়ে ছোট্ট শরীর নিয়ে এগিয়ে এলো।স্বার্থর সামনে দাঁড়িয়ে পেছনে উকি মেরে বোতল দুটো দেখে ঘাড় উঁচিয়ে বলল,
“তুমি এসব খাও স্বার্থ ভাই?”
স্বার্থ ঠোঁট টিপে হেসে ডান হাত দিয়ে নিশার চুল কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে বলল,
“খুব কম।”
“কেন খাও?এসব তো ভালো নয়।”
স্বার্থ ফিসফিস করে বলল,
“তোকে মনে পড়লে খাই।দহনে যখন হৃদয় পোড়ে,মনে হয় তোকে আমার খুব দরকার—তখন খাই।”
নিশার নাজুক মুখ খানা তুলে ধরে স্বার্থ।লজ্জা পায় মেয়েটা।দূর থেকে প্রেম আর আদাল নাক ছিঁটকে দাঁড়িয়ে আছে।ওদের প্রেমটা বোধহয় সহ্য হলো না ওদের।প্রেম গলা উঁচিয়ে বলল,
“তোমাদের নাটক বন্ধ করো।এত প্রেম পেলে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেই তো পারো বাপু।আমার বোনটার মাথা খাচ্ছ কেন অমন করে?”
স্বার্থ দাঁত চিবিয়ে তাকাল।এই প্রেম তার প্রেম কিছুতেই হতে দিচ্ছে না।গতকাল রাতেও তাকে বিরক্ত করেছে।মনটা চাচ্ছে তুলে এক আছাড় মারতে।মারত,কিন্তু ছোট্ট হবু বউটার কথা ভেবে শালাকে ক্যালানি দিতে পারে না।পরে দেখা গেল দজ্জাল শালার সাথে অর্ণর মতো একটা হিটলার শ্বশুর জুটবে কপালে।
নিশা বাঁকা চোখে দুই ভাইয়ের দিকে তাকাল।তার এখন কায়নাতের মতো প্রেমকে নিজের সতীন মনে হচ্ছে।যখনই স্বার্থ তার কাছে আসে তখনই প্রেম এসে সব বিগড়ে দেয়।নিশার চঞ্চল স্বভাব আর ধরে রাখা গেল না।গড়গড় করে নাক ফুলিয়ে বলল,
“আমার সুখ কী তোমাদের সহ্য হয় না?স্বার্থ ভাই কাছে আসলেই তোমাদের চিপকে থাকতে হয়?”
প্রেম হতভম্ব হয়ে আদালের দিকে তাকাল।ছোট্ট বোনের মুখে এমন কথা জীবনেও কল্পনা করেনি।স্বার্থ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।প্রেম বলল,
“তুমি আমার ছোট্ট বোনের মাথাটাও বিগড়ে দিয়েছ।তোমার মতো বেহায়া হচ্ছে দেখেছ?”
স্বার্থ নিশার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলল,
“জামাই-বউ এক না হলে খেলা জমবে কী করে?”
রাত তখন ১১:২৩ মিনিট।ছাদের মধ্যখানে সবাই বসে আছে গোল হয়ে।সেখানে সবাই উপস্থিত থাকলেও উপস্থিত নেই জয়া এবং নাজনীন।নাজনীন এসব পছন্দ করে না বলে জয়াকেও আসতে দেয়নি।অর্ণ কায়নাতের পাশে বসে আছে শক্ত শরীরটা নিয়ে।কায়নাত আড়চোখে তাকাল।খানিকক্ষণ আগেই লোকটা গোসল করেছে।ছোট্ট আদির জন্য এখনও তার মেজাজ খারাপ।কিছু বলতে গেলেই খেঁকখেঁক করছে।কায়নাত শুকনো ঢোক গিলে দৃষ্টি সরাল।অস্থির লাগছে আজ।অর্ণর করা কাজ গুলো বড্ড জ্বালাচ্ছে তাকে।
নুসরাত অস্থির হয়ে সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতেই প্রেম বলল,
“কী হলো?উঠলি কেন?”
নুসরাত বলল,
“আমার ভালো লাগছে না ভাইয়া।আমি একটু নিচে যাই?”
“এই সময়ে একা নিচে গিয়ে কী করবি?”
আদি দুই হাতের মুঠোয় নিচে রাখা ছোট কেক তুলে নিয়ে বলল,
“আমি যাব মায়ের সাথে।”
নুসরাত এতে খুহিই হলো।শেহের গম্ভীর চোখে খানিকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“যেতে দে ওদের।”
আদি ছুটল মায়ের পিছু পিছু।কিছু সময় পর ছেলেরা আর মেয়েরা আলাদা হয়ে বসল।ছাদের দক্ষিণ পাশে সব ছেলেরা ছোট্ট টেবিল ঘিরে বসে আছে তখন।চাঁদের আলোয় চিকচিক করছিল পুরো ছাদ।কায়নাত লাজুক মুখশ্রী ঘুরিয়ে দূরে তাকিয়ে দেখল অর্ণ চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে একা একা বসে আছে ভাইদের রেখে।হালকা নীল রঙের শার্টের সামনের তিনটে বোতাম খুলে দেয়া।স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অর্ণর বুক উকি দিচ্ছে তার দিকে।কায়নাত হাঁসফাস করে উঠে দাঁড়াল।শরীরে ভালো করে আঁচল প্যাঁচিয়ে ভাবল অর্ণর কাছে এগিয়ে যাবে।কিন্তু বড্ড ভয় হচ্ছে।তবু মনে সাহস নিয়ে গুটি গুটি পায়ে অর্ণর দিকে পা বাড়াল।অর্ণ সবার থেকে বেশ খানিকটু দূরে বসেছিল।ঘাড়টা আকাশ পানে তাক করা।কায়নাত এগিয়ে গিয়ে দেখল টেবিলের উপর ছোট্ট একটা কৌটাতে এত গুলো সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে।কপাল কুঁচকে এলো ওর।অর্ণ তো কখনও এত স্মোক করে না।তাহলে আজ হলো কী?শুষ্ক ঢোক গিলে অর্ণর পাশের চেয়ারে নিঃশব্দে বসে নিভু গলায় বলে,
“আপনার কী খারাপ লাগছে?”
অর্ণ কোনো জবাব দেয় না।কায়নাত অস্থির হয়ে কপালে হাত রেখে বলে,
“শরীর খারাপ লাগছে?”
তৎক্ষণাৎ অর্ণ ফট করে চোখ মেলে তাকায়।কায়নাত ভয়ে চমকে ওঠে।অর্ণর চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে।নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইলে অর্ণ কায়নাতের হাত চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
“জ্বালাচ্ছ কেন?”
কায়নাত হাত মোচড় দিয়ে ব্যথাতুর কণ্ঠে বলে,
“হাতে ব্যথা পাচ্ছি।”
অর্ণ কায়নাতের চেয়ার কাছে টেনে এনে দাঁত চিবিয়ে বলে,
“আমি কাছে এলেই ব্যথা লাগে?”
কায়নাত অর্ণর গম্ভীর রাগী গলায় খানিক ভয় পেল।ভীতু চোখে একবার সবার দিকে তাকিয়ে দেখল সবাই আড্ডায় ব্যস্ত।কেউ এই হালকা অন্ধকারের দিকে তাকাচ্ছে না।টেবিলের উপর একটা কাঁচের গ্লাস ছিল।ভয়ে কম্পিত হাত বাড়িয়ে সেই গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে পুরো গ্লাস খালি করে ফেলল।বাজে এক গন্ধে শরীর ঝাঁকিয়ে উঠল ওর।অর্ণ হতভম্ব হয়ে ওর চোয়াল চেপে ধরল।
“এই ইডিয়ট,কী করলে এটা?”
কায়নাত নাক কুঁচকে বলল,
“এটা কী ছিল?গন্ধ!”
অর্ণ দাঁতে দাঁত পিষল।মৃদু স্বরে ধমক দিয়ে উঠল।
“বেয়াদব মহিলা,এটা অ্যালকোহল ছিল।”
অর্ণর ধমক খেয়ে কায়ানাত প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গেল, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড যেতেই ওর মাথার ভেতরটা কেমন যেন হালকা হতে শুরু করল। গ্লাসের ওই তরলটুকু পেটে গিয়েই নিজের খেল দেখানো শুরু করেছে। কায়নাত নাক কুঁচকে আবার বলল, “অ্যালকোহল? আপনি পঁচা জিনিস খান কেন?নেশাখোর লোক একটা।”
অর্ণ হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। যে মেয়ে কিছুক্ষণ আগে ভয়ে কাঁপছিল, সে এখন তাকেই ধমকাচ্ছে! অর্ণ কায়নাতের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“চুপ করো কায়ানাত! সবাই শুনতে পাবে। পাগল হয়ে গেছ?”
কায়নাত ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে টলমল পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ওর চোখের পাতা এখন ভারী হয়ে আসছে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অদ্ভুত হাসি। অর্ণ কায়নাতের অবস্থা দেখে দাঁতে দাঁত পিষল। সে বুঝতে পারছে, আজ সারাদিন কায়নাত ঠিকমতো কিছুই খায়নি। এই খালি পেটে এক গ্লাস কড়া অ্যালকোহল বিষের মতো কাজ করেছে। পাকস্থলী ফাঁকা থাকায় পানীয়টি মুহূর্তেই রক্তে মিশে সরাসরি ওর মগজে গিয়ে হানা দিয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত নেশাটা ওর মাথায় চড়ে বসেছে। খালি পেটে অ্যালকোহল পানের প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা অর্ণ ভালো করেই জানে।
কায়নাত অর্ণর শার্টের খোলা বোতামের দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“আপনার শার্টের বোতাম খোলা কেন? অসভ্য লোক! আর এতগুলো সিগারেট কেন খেয়েছেন? আপনি কী জানেন আপনার লিভার পঁচে যাবে? তখন কে দেখবে আপনাকে? আমি দেখব না কিন্তু!”
অর্ণ এবার সত্যিই রেগে যাচ্ছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে কায়নাতকে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিল। দাঁত চিবিয়ে বলল,
“বললাম না চুপ থাকতে? তোমার কী একদম আক্কেল-জ্ঞান নেই?”
কায়ানত এবার কান্নাভেজা গলায় চেঁচিয়ে ওঠল,
“আপনি আমাকে বকলেন? আপনি নিজে পঁচা পানি খান, আবার আমাকে বকেন?”
অর্ণর হার্টবিট যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। দূরে তাকিয়ে দেখল আড্ডায় মশগুল ভাইবোনরা ওদের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার আগেই অর্ণ কোনো উপায় না দেখে কায়নাতের মুখ নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরল। কায়ানাত ওর হাতের তালুর ভেতরেই কিছু একটা বিড়বিড় করছে আর শাসন করার চেষ্টা করছে।
নেশার ঘোরে কায়নাত এখন পুরোপুরি মাতাল। ওর শরীরটা ছেড়ে দিয়েছে সে। অর্ণ বুঝল, এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা নিরাপদ নয়। সে কায়নাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে চরম সতর্কতায় বলল, “একদম শব্দ করবে না। আমি তোমাকে নিচে নিয়ে যাচ্ছি।”
কায়নাত চোখ বন্ধ করে অর্ণর ঘাড় জড়িয়ে ধরল। নেশার ঘোরে অস্ফুট স্বরে বলল,
“কোলে নিন…হাঁটতে পারছি না। আর ওই পঁচা গন্ধটা সরাবেন, ওটা একদম ভালো না।”
অর্ণর মেজাজ সাত আসমানে থাকলেও এই মুহূর্তে কিছু করার নেই। সে আড়চোখে দেখল সবাই নিজেদের গল্পে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে অর্ণ চট করে কায়নাতকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। কায়ানাত ওর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে আবার বিড়বিড় করল,
“আপনি বড্ড রাগী,কিন্তু কোলটা বেশ আরামের।”
অর্ণ কথা না বাড়িয়ে অতি সাবধানে অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। নিজের রুমের সামনে এসে অর্ণ দ্রুত হাতে কার্ড পাঞ্চ করে ভেতরে ঢুকল এবং পা দিয়ে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল।
অর্ণ কায়নাতকে বিছানায় শোয়াতে চাইলেও পারল না। কায়নাত তার শার্টের কলারটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে অর্ণকেও ওর শরীরের উপর ঝুঁকতে হলো। কায়নাতের দুচোখে এখন নেশার গাঢ় ঘোর, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। সেই আধবোজা চোখে অর্ণর দিকে তাকিয়ে হুট করে বলে উঠল,
“কাছে আসুন।”
অর্ণর নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে কর্কশ গলায় বলল,
“ছাড়ো বেয়াদব মহিলা!কী বলছ এসব?নেশাটা চড়েছে তোমার।”
কায়নাত ছাড়ল না, বরং নিজের হাত অর্ণর ঘাড়ের পেছনে পেঁচিয়ে দিয়ে ওকে আরও কাছে টেনে নিল। কায়নাতের তপ্ত নিঃশ্বাস অর্ণর ঠোঁটের খুব কাছে আছড়ে পড়ছে। সে ঘোরের মাথায় বিড়বিড় করে বলল,
“আমি জানি আমি কী বলছি। আপনি সারাক্ষণ আমাকে দূরে ঠেলে রাখেন কেন? আজ একটু কাছে থাকলে কী হয়?”
অর্ণর ধৈর্য এবার বাঁধ মানল না। কায়নাতের এই অবাধ্যতা আর শরীরের সান্নিধ্য অর্ণর ভেতরে এক তীব্র আগুনের জন্ম দিচ্ছে। সে কায়নাতের দুই হাত চেপে বিছানায় পিষে ধরল। কায়নাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে দাঁত চিবিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“কায়নাত, নিজের সীমা অতিক্রম করো না। আমি আমার রাগ আর শরীরের জেদ আঁটকে রেখেছি। কিন্তু তুমি যদি এমন করো,আজ তোমায় ধরলে এই রাত জাহান্নাম বানিয়ে ছাড়ব। কাল সকালে কিন্তু আফসোস করে কুল পাবে না।”
অর্ণর গলায় ছিল চরম হুঁশিয়ারি আর রুক্ষতা। কিন্তু নেশার চরম পর্যায়ে থাকা কায়নাতের কানে সেসব কথা পৌঁছালই না। সে পাত্তা না দিয়ে অর্ণর গালের উপর নিজের মুখ ঘষল। ওর এই বেপরোয়া আচরণ অর্ণকে দিশেহারা করে তুলল।
অর্ণ বুঝল, আর এক মুহূর্ত এখানে থাকলে সে নিজেকে সামলাতে পারবে না। সে কায়নাতের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়াল। ওর নিজের নিঃশ্বাসও এখন ভারী হয়ে আসছে। অস্থির হয়ে সে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। কায়নাত পেছন থেকে অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলল, কিন্তু অর্ণ তখন ওয়াশরুমে ঢুকে সশব্দে দরজা আঁটকে দিয়েছে।
কল ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে অর্ণ নিজের উত্তাপ কমানোর চেষ্টা করল। বাইরে কায়নাত তখন বিছানায় শুয়ে নেশার ঘোরে নিজের মতো বকবক করছে।
ওয়াশরুমের ঠান্ডা পানির ঝাপটায় অর্ণ নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা করল বেশ কিছুক্ষণ। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। কিন্তু বিছানার দিকে তাকাতেই ওর কপালে ভাঁজ পড়ল। বিছানা ফাঁকা!
“কায়নাত?” অর্ণর গলায় চাপা উদ্বেগ।
পুরো ঘরে ওকে না পেয়ে অর্ণর নজর গেল খোলা বারান্দার দিকে। বাইরে গিয়ে দেখল, কায়নাত বারান্দার এক কোণে থাকা নরম সোফাটায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। চাঁদের আলো ওর মুখে পড়ে এক মায়াবী আভা তৈরি করেছে, কিন্তু ওর চোখমুখের অবস্থা মোটেও স্বাভাবিক নয়।
অর্ণর মেজাজ আবার বিগড়ে গেল। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে কড়া গলায় ধমক দিয়ে উঠল,
“এখানে কী করছ তুমি? বলেছি না চুপচাপ শুয়ে থাকতে? নিজের উপর কী একদম নিয়ন্ত্রণ নেই?”
অর্ণর এই আচমকা,রুক্ষ ধমক খেয়ে কায়নাতের নেশাতুর মনটা যেন ভেঙে চুরমার হলো। সে ফ্যালফ্যাল করে অর্ণর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর হঠাৎ করেই একদম বাচ্চাদের মতো শব্দ করে কেঁদে উঠল। ওর কান্নায় সারা বারান্দা যেন ভারী হয়ে উঠল।
কায়নাতের কান্নার আওয়াজ শুনে অর্ণ থমথমে খেয়ে গেল। সে আসলে এতটাও কড়া হতে চায়নি। নিজের উপর বিরক্ত হয়ে সে লম্বা শ্বাস নিল। নিজেকে শান্ত করে নরম স্বরে বলল,
“ঠিক আছে, হয়েছে। আর বকা দিব না। ওঠো এখান থেকে।”
অর্ণ কায়নাতের হাত ধরে টেনে তুলে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর নিয়ে এলো। ওকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে অর্ণ যখনই একটু সরে যেতে চাইল, তখনই কায়ানাত ওর হাত টেনে ধরল। কান্নার তোড়ে ওর কথা আঁটকে আসছিল, তবুও সে হেঁচকি তুলে বলল,
“আপনি খুব খারাপ! সারাক্ষণ বকেন,আমি আপনার কাছে যেতে চাইলেই আপনি পালিয়ে যান।”
অর্ণ কিছু বলতে যাবে, তার আগেই কায়নাত হঠাৎ টেনে অর্ণকে বিছানায় বসাল এবং সময় না দিয়ে ছিঁটকে এসে অর্ণর কোলে উঠে বসল। অর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল যাতে ও পড়ে না যায়। কায়নাত ওর গলার কাছে মুখ লুকিয়ে কান্নারত গলায় বলতে লাগল,
“আজ আর কোথাও যেতে দেব না আপনাকে। আপনি এখানেই বসে থাকবেন।”
অর্ণর মনে হলো সে পাথরের মতো জমে যাচ্ছে। কায়নাতের চুলের সুবাস আর ওর শরীরের তপ্ত স্পর্শ অর্ণর মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় কাঁপন ধরাচ্ছে। অর্ণর দুহাত তখন কায়নাতের কোমরে শক্ত হয়ে চেপে বসেছে। সে শান্ত,গভীর গলায় বলল,
“কায়নাত, তুমি এখন যা করছ, সেটার ফল কিন্তু মোটেও ভালো হবে না। নেমে যাও কোল থেকে।”
অর্ণর কোলে জাঁকিয়ে বসে কায়নাত ওর গলাটা দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কান্নার রেশ কাটেনি ঠিকই, কিন্তু নেশার ঘোরে এখন ওর আবদারের পাল্লা ভারী হচ্ছে। সে অর্ণর নাকের ডগায় নিজের নাক ঘষে আদুরে গলায় বলল,
“উমম… আমায় একটা গান শোনান না? খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।”
অর্ণর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম। সে দাঁত চেপে ধরে কড়া গলায় ধমক দিল,
“পাগলামি ছাড়ো কায়নাত! নেশার ঘোরে নাটক শুরু করেছ। চুপচাপ ঘুমানোর চেষ্টা করো।”
অর্ণর ধমক খেয়ে কায়নাত মোটেও দমল না। উল্টো অর্ণর ঠোঁটের উপর একটা আঙুল রেখে বলল,
“শশশ…আপনি পারবেন না জানি। আপনি তো শুধু ধমকাতেই পারেন। দাঁড়ান, আমি গেয়ে শোনাচ্ছি।”
কায়নাত অর্ণর চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে খুব নিচু আর নেশাতুর স্বরে দুটো লাইন গাইল,
~ তিলক চন্দনে,বাহু বন্ধনে
তোমার প্রেমে পুরে হব ছাই..... !!
নিস্তব্ধ ঘরে কায়নাতের সেই ভাঙা ভাঙা স্বর আর ভেজা গলার গানটা এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করল। খালি পেটে অ্যালকোহলের প্রভাবে ওর কণ্ঠস্বর এখন অনেক বেশি গম্ভীর আর আবেদনময়ী শোনাচ্ছে। গান গাইতে গাইতে সে অর্ণর শার্টের খোলা বুকটায় নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল।
অর্ণ এতক্ষণ নিজেকে লোহার মতো শক্ত করে ধরে রেখেছিল, কিন্তু এই মুহূর্তটা তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিল। কায়নাতের চুলের ঘ্রাণ, ওর শরীরের উষ্ণতা আর এই মায়াবী কণ্ঠস্বর—অর্ণর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।
সে কায়নাতের গান থামিয়ে দিয়ে ওর চোয়াল চেপে ধরল। অর্ণর দুচোখ এখন লাল টকটকে, সেখানে রাগের বদলে কামনার গাঢ় ছায়া। সে ফিসফিস করে বলল,
“অনেক হয়েছে। আমি তোমাকে বারবার সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু তুমি শোনোনি।তুমি নিজেই আগুন নিয়ে খেলতে এসেছ, এখন সেই আগুনের লেলিহান শিখা তোমার এই শরীরটাকে কীভাবে ছাই করে দেয়, সেটা শুধু অনুভব করো। আজ রাতটা হবে শুধু আমার।”
কায়নাত কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই অর্ণ নিজের ঠোঁট দিয়ে কায়নাতের সব কথা থামিয়ে দিল। অর্ণর ছোঁয়া এখন আর আগের মতো রুক্ষ নয়, বরং নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এক পাগলামি।
বাইরে চাঁদের আলো তখন ম্লান হয়ে আসছে, কিন্তু রিসোর্টের সেই চার দেয়ালের ভেতরে ভালোবাসার উত্তাপ তখন চরমে। যে রাতটাকে অর্ণ জাহান্নাম বানাতে চেয়েছিল, কায়নাতের মায়াবী ছোঁয়ায় তা যেন এক অপার্থিব স্বর্গে পরিণত হয়েছে।
(দিয়েই দিলাম বাসর।২.৫k রিঅ্যাক্ট চাই আজ😒
আগামী পর্বে আরও একটা ধামাকা থাকছে🥹🫶)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩১.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৭