প্রেমবসন্ত_২ ।৩৩।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
“ওবাব!এত আগে বিয়ে হয়েছে?কই মাওইমা,আমাদের তো বিয়ের কথা জানালেন না।বংশের প্রথম বিয়ে কেউ এভাবে দেয়?”
রেখা বেগমের বোনের কথায় আতিয়া বেগম আরেক দফায় বিরক্ত হলেন।প্রত্যেকদিন কী এখন সবাইকে বলতে হবে বিয়ের কথা?তিনি এবার বিরক্ত ঝেড়ে বললেন,
“শুনলেই তো বিয়েটা হঠাৎ করে হয়েছে,তাহলে এত বারবার একই প্রশ্ন করছো কেন?”
পাশেই কায়নাত মাথা নিচু করে দাদির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।সামনের ভদ্রমহিলার বকবক তার পছন্দ হচ্ছে না।একবার এসে কায়নাতের চুল দেখছেন,নাক দেখছেন আর পারলে তো জামা কাপড় খুলে পুরো শরীর পর্যবেক্ষণ করছেন।অসহ্য হয়ে মেয়েটা দাদির পেছনে লুকিয়েছে।বাইরে থেকে নুসরাতদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।সে কোনোরকম বের হলো রান্না ঘর থেকে।ড্রয়িংরুমে সকলেই উপস্থিত সেই সময়ে।
অর্ণর পাশে আদি বসে বসে চকলেট খাচ্ছে।অর্ণ যত্ন করে টিস্যু দিয়ে আবার মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে তার।কপাল কুঁচকে ফেলল সে।নিশা ওকে দেখেই হাত উঁচিয়ে বলল,
“ও ভাবি,কাছে এসো।”আশ্চর্য হলো কায়নাত।হতবুদ্ধি মুখে আঁচল চেপে বলল,
“ওসব কী নামে ডাকছ?”
নিশা বলল,
“তুমি আমার বড় ভাইয়ের বউ,সেই ক্ষেত্রে নাম ধরে ডাকা বেয়াদবি হবে।”
“তা হবে কেন?আমি নিজেই বলেছি নাম ধরে ডাকতে।”
“আর আপনার জামাই বলেছে ভাবি বলে ডাকতে।”
কায়নাত চমকে তাকাল অর্ণর দিকে।অর্ণর ভাব-ভঙ্গি স্বাভাবিক।শুধু অস্বাভাবিক কায়নাত।নিশা টেনে নিয়ে গিয়ে অর্ণর পাশে বসাল ওকে।ওরা সবাই সোফায় বসেছে গোল করে।কায়নাত আর আদির মধ্যখানে বসেছিল অর্ণ।কায়নাত নাক ফুলাল।আড়চোখে আদির দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙ্গাল।এত মানুষের সামনে কিছু বলতে পারছে না সে।
এত মানুষের উপস্থিতিতে কায়নাত নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল ঠিকই, কিন্তু তার মনের ভেতরের অস্থিরতা কমছিল না। বিশেষ করে ‘ভাবি’ ডাকটা শোনার পর থেকে তার কানে কেমন একটা ঝিঁঝিঁ শব্দ হচ্ছিল।এত বড় বড় মানুষ তাকে ভাবি বলে ডাকে।সে আড়চোখে অর্ণর দিকে তাকাল; অর্ণ নির্বিকারভাবে আদির দিকে তাকিয়ে আছে। তার এই অতিরিক্ত সাবধানী আর গম্ভীর ভাব কায়নাতকে বেশ রাগিয়ে দিচ্ছিল।
অর্ণর ওপাশে বসা ছয় বছর বয়সী আদি আপন মনে ডেইরি মিল্ক চিবুচ্ছে। চকলেটের সেই লোভনীয় সুবাস কায়নাতের নাকে আসতেই তার অবাধ্য মনটা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। পেটে খিদের চেয়েও বেশি জেদ চেপে বসল তার। অর্ণ যখন অন্য দিকে তাকিয়ে নিশার সাথে কথা বলছিল, সেই সুযোগে কায়নাত একটু ঝুঁকে আদির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“অ্যাই আদি, আমাকে এক টুকরো চকলেট দিবে? লক্ষ্মী সোনা!”
আদি প্রথমে একটু অবাক হয়ে মামির দিকে তাকাল। তারপর নিজের সম্পদের প্রতি চরম মমতা দেখিয়ে চট করে হাতটা সরিয়ে নিল। কায়নাত হার মানার পাত্রী নয়। সে আবার নিচু স্বরে বলল, “একটু দাও না, কেউ দেখবে না।”
আদি এবার গাল ফুলিয়ে আরও দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই অর্ণর কপাল আবার কুঁচকে এলো।কায়নাত চোখ কটমট করে সোজা হয়ে বসল।ফের চোখ রাঙিয়ে তাকাল অর্ণর দিকে।অর্ণ চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে তখন।এমন একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছে ভাবতেও যেন আশ্চর্য হচ্ছে নিজেই।
সেখানে সবাই থাকলেও শেহের উপস্থিত ছিল না।নুসরাতও উঠে গেছে সবে।স্বার্থ আড়চোখে নিশাকে দেখে অর্ণকে বলল,
“তুই না বললি আজ আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলবি?”
নিশা অবাক হয়।অর্ণর কপালের ভাঁজ এবার বিরক্তিতে রূপ নেয়।দাঁত চেপে বলে,
“একটা গে এনে দেব?চলবে তাতে?”
স্বার্থ নাক ছিঁটকে বলল,
“ওসব কেমন কথা সোনা?আশেপাশে এত সুন্দরী মেয়ে থাকতে গে ধরতে যাব কোন দুঃখে?”
“আশেপাশে কে আছে?সবই তো তোর বোন।”
স্বার্থর মুখ ভোঁতা ব্যাঙের মতো চুপসে যায়।শালা মীরজাফর এভাবে পঁচাচ্ছে তাকে?একটাবার যদি বিয়েটা শুধু হয়ে যায়,তাহলে এসবের জ্বালা সে ওঠাবে।স্বার্থ নিশার দিকে তাকায়।ঠোঁট উঁচু করে বলে,
“কবুল বলে ফেল।তোর বাপ-ভাই না মানলেও আমাদের বাচ্চা খুব শীঘ্রই আসবে।”
নিশা হকচকিয়ে তাকায় অর্ণর দিকে।কী বেহায়া লোক!ভাইয়ের সামনে এসব কেমন বেহায়ার মতো কথা।অর্ণ রেগে আছে।তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া রাগে জ্বলজ্বল করছে।স্বার্থ কী আর ওসব তোয়াক্কা করে?সে এক সমানে বলল,
“আজ বিয়ে করলে দুমাস পরেই সবাইকে খুশির সংবাদ দিতে পারব।আর তার বছর খানিক পর আমার একটা ছেলে হবে।তারপর অর্ণর বাচ্চা-কাচ্চার সাথে ওর বিয়ে হবে।”
নিশা অসহায় প্রাণীর মতো ভাইয়ের দিকে ভীতু হয়ে বসে আছে।না কিছু বলতে পারছে,আর না সইতে পারছে।আদির বোধহয় স্বার্থর কথা পছন্দ হলো না।সে রাগী ভাব নিয়ে বলল,
“আমি মামুর মেয়েকে বিয়ে করব।ওকে আমি কাউকে দিব না।”
স্বার্থ কপাল কুঁচকে বলে,
“প্যান্টটা খুলে দেখ কত বড় হয়েছিস।এখনই বিয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছিস?তোর মতো ব্রিটিশের সাথে ওই হিটলার অর্ণ মেয়ে দেবে?”
আদি নাক ফুঁসে বলল,
“তুমি বেশি কথা বলো।”
অর্ণ ধমক দিয়ে বলল,
“যাবি তুই চোখের সামনে থেকে?”
স্বার্থ ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে নিশার এক হাত চেপে ধরে বলল,
“তোর বোনকে দিয়ে দিলে চলে যাব।না দিলে যাব না।”
অর্ণর সহ্যশক্তির বাঁধ এবার বুঝি পুরোপুরি ছিঁড়ে গেল। সে দাঁত কিড়মিড় করে নিজের আসন থেকে প্রায় গর্জে উঠল।
“স্বার্থ! হাত ছাড় ওর।”
স্বার্থ যেন মরণ কামড় দিয়েছে। সে হাত ছাড়ার বদলে নিশার দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপল। নিশা এবার ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। অর্ণর এমন রাগী রূপ দেখে বেচারি কেঁদে ফেলবে ফেলবে ভাব। কায়নাত এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও এবার অর্ণর রাগী চেহারার দিকে তাকিয়ে একটু থমকে গেল। লোকটা যখন রেগে যায়, তখন আসলেও অনেকটা ‘হিটলার’-এর মতোই লাগে।
কায়নাত ফিসফিস করে অর্ণর শার্টের হাতা টেনে ধরল, “আহ্, কী করছেন? ছাড়ুন না উনাকে।উনি তো মজা করছেন।”
অর্ণ এবার কায়নাতের দিকে ফিরল। আগুনের গোলার মতো চোখ জোড়া দেখে কায়নাত ঢোক গিলল। অর্ণ কর্কশ স্বরে বলল,
“তুমি একদম চুপ করে বসে থাকো। এই বাঁদরটার আসকারা বেশি হয়ে গেছে।”
স্বার্থ নাছোড়বান্দা। সে হাসতে হাসতে বলল, “আরে বন্ধু, রাগিস কেন? বিয়ে তো হবেই। এখন না দিলে পরে চুরি করে নিয়ে পালাব। তখন কিন্তু লস তোরই!”
আদি তখন পাশ থেকে চিল্লে উঠল,
“চুরি কেন করবে? আমি তো বলেছি আমি মামুর মেয়েকে বিয়ে করব!”
পুরো ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি অবস্থা তৈরি হলো। একদিকে অর্ণর গরম মেজাজ, অন্যদিকে স্বার্থর চরম বেহায়াপনা আর মাঝখানে নিশার মরি মরি অবস্থা। কায়নাত বুঝতে পারল, পরিস্থিতি সামলাতে না পারলে আজ আসলেই এক কাণ্ড যাবে। সে সাহসী হয়ে আবার অর্ণর হাতটা শক্ত করে ধরল।
“ঘরে চলুন,গোসল করিয়ে দিচ্ছি।”
কায়নাতের এই ছেলেমানুষি কথায় অর্ণর রাগটা যেন একটু থিতিয়ে এলো। সে বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে নিজের কপাল টিপতে লাগল। স্বার্থ এই সুযোগে নিশার হাত ছেড়ে দিয়ে এক দৌঁড়ে সোফার ওপাশে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, “অর্ণ, মনে রাখিস,তোর বোনের জামাই কিন্তু আমিই হব! আর তোর মেয়েকে আমার আদ্দুর সাথে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করে রাখব, দেখে নিস!”
অর্ণ রেগে গিয়ে এক পা এগোতেই স্বার্থ ঘরের বাইরে উধাও। ড্রয়িংরুমে তখন এক ভারী নিস্তব্ধতা। কায়নাত আড়চোখে অর্ণর দিকে তাকাল। লোকটা রেগে থাকলে তার গায়ের রঙ যেন আরও গাঢ় হয়ে যায়। কায়নাত বিড়বিড় করে বলল,
“হিটলারের মতো রেগে থাকার কী আছে বাপু? লোকটা তো মজাই করছিল!”
অর্ণ কায়নাতের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
“তুমি কী বললে এখন?”
কায়নাত চট করে জিভ কেটে অন্যদিকে তাকাল। মনে মনে বলল, ‘বিয়ে করে যে কী ফ্যাসাদে পড়লাম! সারাক্ষণ শুধু ধমক আর ধমক।’
আদি তখন চকোলেট মাখা মুখে নির্বিকারভাবে বলে উঠল,
“মামু, স্বার্থ ভাই কিন্তু পঁচা। আমার বউকে নিয়ে ও কথা বলে কেন?”
অর্ণ আদির মাথায় একটা হালকা চাপড় মারতে গিয়েও থেমে গেল। নিজের কপাল চাপড়ে সে গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। ড্রয়িংরুমে পড়ে রইল এক সপ্তদশী বধূ, এক ভীতু বোন আর এক চকোলেট-খেকো পুঁচকে আদি।সবাই চলে যেতেই নিশা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“এই স্বার্থ ভাইটা মানুষ হলো না।কেমন বেহায়া লোক,দেখেছ?”
কায়নাত মুখ কুঁচকে বলল,
“তবুও তো মানা যায়।তোমার ভাই অমন হিটলার কেন?ভাইয়া যে মজা করেছে,এটা উনি বোঝেননি?”
নিশার মুখ খানা শুকিয়ে এলো এবার।বলল,
“স্বার্থ ভাই মজা করছে না।উনি সত্যিই কাল আমায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।”
নিধির ঘরে একা একা বসেছিল সে।চুপটি করে বসেছিল।রেখা বেগম এলেন খানিকক্ষণ পর।মেয়ে যে দুপুরে খাবার খায়নি,আর কেন খায়নি সেটাও তিনি জানেন।নিধির ঘরের জানালার বাইরে তখন পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণ আলো। রেখা বেগম মেয়ের পাশে বসে তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলেন। নিধি নিরুত্তর, তার চোখের দৃষ্টি মেঝের কার্পেটে স্থির। অভিমান যখন পাহাড় সমান হয়, তখন শব্দরা পথ হারায়।
রেখা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম স্বরে বললেন, “ছেলেটা ভালো। শুনেছি পরিবারও ভীষণ ভালো। তোর দাদার পছন্দ হয়েছে খুব।”
নিধি এবার মুখ তুলল। তার ভেজা চোখে একরাশ প্রশ্ন আর অব্যক্ত যন্ত্রণা। ধরা গলায় বলল,
“ভালো-মন্দ দিয়ে আমার কী হবে মা? আমি কী তোমাদের কাছে খুব বেশি বোঝা হয়ে গেছি যে, এই বয়সেই আমাকে পর করে দেওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হয়ে উঠলে?”
মেয়ের কথা শুনে রেখা বেগমের বুকটা কাপড়ে ধরল। তিনি নিধির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“পাগলী মেয়ে, মা-বাবার কাছে সন্তান কী কখনো বোঝা হয়? কিন্তু মেয়েদের জীবন তো লতার মতো রে মা, একটা সময় তাকে আশ্রয়ের জন্য নতুন কোনো বৃক্ষ খুঁজে নিতেই হয়। এটাই তো জগতের নিয়ম।”
নিধি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল,
“জগতের নিয়মগুলো কী শুধু মেয়েদের জন্যই মা? আমার পড়ার স্বপ্ন, আমার এই চেনা বারান্দা, তোমাদের সাথে কাটানো বিকেলগুলো—সব কী মুহূর্তেই পর হয়ে যাবে? তোমরা যাকে ‘ভালো ছেলে’ বলছো, সে কী আমার এই মনটাকে চিনবে? নাকি আমি শুধু সেই বাড়ির একটা সাজানো পুতুল হয়েই থেকে যাব?”
রেখা বেগম এবার নিরুত্তর হয়ে রইলেন। মেয়ের এই তপ্ত প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর তার জানা নেই। তিনি শুধু নিধিকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন। নিধি মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল।
“মা, যদি পারো বদাদাকে বলো আমার জন্য আর কয়েকটা দিন সময় চাইতে। আমি এখনই এই অপরিচিত গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে চাই না।”
রেখা বেগম চিন্তায় পড়লেন বড্ড।আজগর চৌধুরী এক কথার মানুষ।যেখানে একবার কথা দিয়ে ফেলেছেন,সেই ওয়াদা ভঙ্গ করার মতো সাহস তিনি দেখাবেন না।তবে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে নিধিকে তো জোর করে বিয়েও দেয়া যায় না।সে যতই আকদ করানো হোক।বিয়ের পর তো ছেলে এই বাড়ি নিধির সাথে দেখা করতে আসবে,একই সাথে থাকবে।তিনি শুকনো ঢোক গিললেন কিছু একটা ভেবে।বিচলিত মন শান্ত করতে বললেন,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
নিধি মাথা নাড়ায়।
“তুই কী কাউকে ভালোবাসিস?”
নিধি মায়ের প্রশ্নে ছলছল চোখে তাকায়।ঠোঁট ভেঙে আসে তীব্র কান্নায়।মেয়ের চোখের ভাষা যেন খুব সহজেই বুঝে ফেললেন তিনি।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এলেন ঘর হতে।নাজনীনের ঘর থেকে নাজনীনের চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছে মৃদু স্বরে।উচিত নয় জেনেও তিনি এগিয়ে গেলেন।দরজায় টোকা দিতেই মিনিট খানিক পর দরজা খুলে দিল জয়া।রেখা বেগম চিন্তিত হলেন জয়ার চিপচিপে মুখ দেখে।কেঁদেছে কী মেয়েটা?তিনি চোখ তুলে ঘরের ভেতরে তাকালেন।নাজনীন গম্ভীর হয়ে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে।তিনি ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন।জয়াকে কাছে ডাকলেন।জয়া মাথা নিচু করে গিয়ে বসল শাশুড়ির কাছে।
নাজনীন ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল।রেখা বেগম ছেলের কাণ্ড দেখে বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে।
“ঝগড়া হয়েছে আবার?”
জয়া দুইপাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“উহুম!”
“তাহলে নাজনীন অমন রেগে ছিল কেন?”
জয়া শুকনো ঢোক গিলল।রেখা বেগম জয়ার হাতে হাত রাখতেই মেয়েটা হুহু করে কেঁদে উঠল।চমকে উঠলেন তিনি।
“আরে,কাঁদছিস কেন?”
জয়া রেখা বেগমের হাত মুঠোয় নিয়ে জড়াল গলায় সাফাই দেয়ার মতো করে বলল,
“আমি কোনো ছেলের সাথে কথা বলি না বড় আম্মা।তোমার ছেলে আমায় ভুল বুঝছে।”
“হয়েছে কী?না বললে বুঝব কী করে?”
“আমি যে প্রীতম ভাইয়ের কাছে প্রাইভেট পড়তাম না?বিয়ের পর তো আর পড়তে যাওয়া হয়নি।আজ নাকি আব্বার ফোনে কল করেছিলেন তিনি।আব্বা নাজনীন ভাইয়ের নাম্বার দেয়ার পর উনি কল করেছিলেন।তোমার ছেলে কিসব উল্টো-পাল্টা ভাবছে আমার বিষয়ে।তুমি তো জানো বলো?আমার না বিয়ে হয়েছে?আমি কেন অন্য পুরুষদের সাথে মিশতে যাব?”
রেখা বেগমের ভীষণ মায়া হলো মেয়েটার উপর।মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“কাঁদিস না।ওর সাথে আমি কথা বলব।”
“উনি আমায় মারবে।”
তিনি আশ্চর্য গলায় বললেন,
“নাজনীন তোর গায়ে হাত তোলে?”
জয়া বলল,
“না।কিন্তু রেগে গেলে উনার মাথা ঠিক থাকে না।”
রেখা বেগম জয়ের চিবুক ধরে মুখটা উপরে তুললেন। চোখের জল মুছে দিয়ে অত্যন্ত নরম স্বরে বললেন,
“শোন পাগলি, পুরুষ মানুষের রাগ হলো বৈশাখী ঝড়ের মতো। হুট করে আসে, আবার থিতিয়েও যায়। নাজনীন ছোটবেলা থেকেই একটু একগুঁয়ে আর জেদি। কিন্তু ওর মনে কোনো প্যাঁচ নেই। ও তোকে আগলে রাখতে চায় বলেই হয়তো হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।”
জয়া ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“কিন্তু আগলে রাখা আর অবিশ্বাস করা তো এক নয় বড় আম্মা। উনি যখন আমার দিকে ওইভাবে তাকান, মনে হয় আমি যেন মস্ত বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। প্রীতম ভাই স্রেফ আমার শিক্ষক ছিলেন, তার বেশি কিছু নয়। অথচ নাজনীন ভাই ভাবছেন আমি বুঝি লুকিয়ে ওনার সাথে যোগাযোগ রাখি।”
রেখা বেগম জয়াকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“সংসারটা তো কাঁচের মতো রে মা। একটু টোকা লাগলেই চির ধরে। নাজনীনকে আমি পেটে ধরেছি, আমি জানি ওকে কীভাবে ঠান্ডা করতে হয়। তুই এখন অকারণে চোখের জল ফেলে শরীর খারাপ করিস না। বরং একটু হাত-মুখ ধুয়ে নে। আমি আজ ওর সাথে কড়া করেই কথা বলব। আমার বাড়ির বউয়ের দিকে কেউ আঙুল তুলবে—সে আমার ছেলেই হোক না কেন, আমি তা সহ্য করব না।”
জয়া শাশুড়ির কোল থেকে মাথা তুলে ভেজা চোখে তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল একরাশ অনিশ্চয়তা, “বড় আম্মা, ওনাকে কী বোঝানো যাবে? উনি তো কথাই বলতে চান না।আমার মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়, এই ভুল বোঝাবুঝি কী কোনোদিন শেষ হবে না?”
রেখা বেগম ম্লান হাসলেন। বললেন,
“হবে রে হবে। রাত যত গভীর হয়, ভোরের আলো ততই কাছে আসে। তুই শুধু নিজের উপর বিশ্বাস রাখিস। আয়, আমার সাথে নিচে চল। তোকে নিজ হাতে কিছু খাইয়ে দিই। দুপুরে তো পেটে একটা দানাও পড়েনি।”
জয়া যন্ত্রের মতো শাশুড়ির পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। কিন্তু তার মনের অন্দরে নাজনীনের সেই রুক্ষ কণ্ঠ আর রক্তবর্ণ চোখের চাহনি বারবার ফিরে আসছিল।কেমন করে রেগে গিয়েছিল লোকটা।রেখা বেগম সময় মতো না এলে বোধহয় আজ রেহাই পাওয়া বড্ড কষ্ট হয়ে যেত।
পরেরদিন সকাল সকাল মেহমানদের জন্য আয়োজন শুরু হলো।আজ নিধিকে দেখতে আসবে।রেখা বেগম এখন অব্দি শ্বশুরের সাথে কথা বলেননি।নিচে কাজে ব্যস্ত সকলেই।আজ বাদ নেই জয়া নিজেও।নিশা আর জারা নিধির ঘরে।মেয়েটা কেঁদে-কুটে একাকার।ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।নিশা দরজা খুলতেই প্রেমকে দেখে বলল,
“কিছু বলবে ভাইয়া?”
প্রেম গম্ভীর স্বরে বলল,
“নিধির সাথে আমার একটু কথা আছে।”
নিশা ঠোঁট কামড়ে বলল,
“ঘরে এসো।”
“তোরা বাইরে যা।”
“হু?”
প্রেম ধমকে উঠল এবার।ভয়ে নিশা চোট করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো।জারাও তাই!প্রেম দরজা চাপিয়ে দিয়ে নিধির নিকটে এসেই হঠাৎ মেয়েটার চোয়াল চেপে ধরল।নিধির ঠোঁট ভেঙে এলো কান্নায়।চোখ বুজে এলো তীব্র যন্ত্রণায়।প্রেমের শরীর তখন রাগে থরথর করে কাঁপছে।
“বারণ করতে বলেছিলাম না?”
নিধির শ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে বলে প্রেম ওকে ছেড়ে দিল।নিধি নাক টেনে বলল,
“দাদার মুখের উপর আমি কী করে বারণ করি?”
“কেন পারবি না?ভালোবাসার সময় তো আমার কথা শুনলি না,তাহলে আজ কেন বাধ্য?আল্লাহর নাম নিয়ে বলছি,তোকে আমি কে টে টুক রো টুক রো করব নিধি।”
নিধির রাগ হলো ভীষণ।প্রেমের বুকে দুহাত দিয়ে ধাক্কা দিলেও সুঠাম দেহ খানা নড়াতে পারল না একচুল।কান্নায় ভেঙে এলো গলা।
“আপনি একটা খারাপ লোক।ওসব ভালোবাসা টালোবাসা কিচ্ছু না।উপর উপর দিয়ে অভিনয় করেছেন।”
প্রেমের চোখের মণি যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। নিধির মুখে ‘অভিনয়’ শব্দটা শুনে তার বুকের ভেতরটা অপমানে আর যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে আবার এক পা এগিয়ে এলো, নিধি ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে জানালার গ্রিলটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। প্রেম তার দুপাশে হাত দিয়ে তাকে এক প্রকার দেয়ালবন্দী করে ফেলল।
“অভিনয়? তুই এটাকে অভিনয় বলছিস নিধি?”
প্রেমের কণ্ঠস্বর এবার খাদে নেমে এলো, কিন্তু তাতে ছিল ভয়ের চেয়েও বেশি তীব্রতা।
“এই তিনটে বছর আমি তোর প্রতিটি নিঃশ্বাসের খবর রেখেছি, তোর জন্য সব সময় পাগলের মতো ছুটে এসেছি—সবই কী নাটক ছিল?”
নিধি এবার ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“তবে বারণ করছেন না কেন? কেন আপনি সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারছেন না যে নিধি শুধু আপনার? কেন আমাকে এই জেল খানায় ঠেলে দিচ্ছেন?”
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করবেন।আপনাদের মন্তব্য জানিয়ে যাবেন।)
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৬