প্রেমবসন্ত_২ ।৩১.২।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
আজকের জুম্মাবারটা যেন অন্য সব দিনের চেয়ে একটু বেশিই ঝলমলে। মধ্যগগনে থাকা সূর্যটা চৌধুরী বাড়ির বিশাল বাগানে আগুনের ফুলকি নয়, বরং গলানো সোনার রঙ ঢেলে দিচ্ছে।শীতের শেষের এই তপ্ত অথচ মোলায়েম রোদটা যেন চৌধুরী বাড়ির আভিজাত্যের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের তেজ জানান দিচ্ছে। বাড়ির সদর মহলে মিলাদ পড়ানো হচ্ছে। সদর দরজার ওপার থেকে ভেসে আসছে গম্ভীর অথচ সুরম্য দুরুদ পাঠের ধ্বনি। সেই পবিত্র স্বরের রেশ বাড়ির প্রতিটি ইটের খাঁজে খাঁজে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসের সাথে মিশে থাকা চন্দন আর আগরবাতির সুবাস কেবল নাসারন্ধ্র নয়, যেন আত্মাকেও এক নির্মল পবিত্রতায় সিক্ত করে যাচ্ছে।
চৌধুরী বাড়ির নকশা করা বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিশাল বাগান। সেখানে পাতা হয়েছে নকশা করা শীতল পাটি আর সাদা চাদর। প্রবীণ মুরুব্বিরা ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর আতরের সুবাস মেখে গোল হয়ে বসে আছেন। তাদের হাতের তসবিহ ঘোরার শব্দ আর মিলাদের স্বর মিলেমিশে এক আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করেছে। বাগানের এক কোণে থাকা শতবর্ষী আম গাছটার পাতাগুলো রোদে চিকচিক করছে, আর তার ফাঁক গলে আসা চিলতে রোদ্দুর মেঝেতে এক মায়াবী আলপনা এঁকে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে পাশের প্রাচীন দালানের কার্নিশ থেকে কবুতরের বাকবাকুম শব্দ ভেসে আসছে, যা মিলাদের এই গম্ভীর স্বরের সাথে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করছে।
অন্দরমহলের দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। ভারী কাঠের জানালার ঝিলিমিলি পর্দা সরিয়ে দুপুরের কড়া রোদ এসে পড়ছে বারান্দার মেঝেতে। বাড়ির মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে মিলাদ শেষে তবারক বিতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বড় বড় ডেকচিতে জর্দা আর শিরনির যে মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে, তা ক্ষুধার উদ্রেক করার চেয়েও এক ধরণের তৃপ্তি নিয়ে আসছে মনে। জানালার পর্দার আড়ালে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে হলুদ কিংবা বাসন্তী শাড়ির আঁচল, যা দুপুরের এই কড়া রোদে চৌধুরী বাড়ির অন্দরের প্রাণচঞ্চলতাকে ফুটিয়ে তুলছে। জানালার কাঁচগুলোতে সূর্যের আলো পড়ে এমন এক বিচ্ছুরণ তৈরি করছে যে মনে হচ্ছে যেন পুরো বাড়িটা আলোর চাদরে ঢাকা পড়েছে।
বাইরের জগতের কোলাহল আজ এই বাড়ির সীমানায় এসে থমকে গেছে। মিলাদের প্রতিটি ধ্বনি যেন আকাশ চিরে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। দুপুরের এই ঝলমলে সময়টায় চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণা যেন এক ভক্তি আর আভিজাত্যের গল্প বলছে।বাগানের এক কোণে রাখা মাটির কলস থেকে চুইয়ে পড়া জলের ছিটেফোঁটা তপ্ত মেঝেতে পড়ে মুহূর্তে বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।
গ্রামের মানুষরা যখন শান্ত মনে মিলাদে মশগুল, তখন প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানও যেন এক নিস্তব্ধ প্রার্থনায় লিপ্ত হয়েছে। আজ এই দুপুরটা কেবল সময়ের হিসাব নয়; বরং এটি চৌধুরী বাড়ির ঐতিহ্য, শ্রদ্ধা আর শুদ্ধতার এক জীবন্ত কাব্যগ্রন্থ, যা যুগ যুগ ধরে এই গ্রামের বুকে নিজের অস্তিত্বকে মহিমান্বিত করে রেখেছে। রোদ যখন হেলে পড়তে শুরু করেছে বিকেলের দিকে, মিলাদের স্বর তখন এক অন্য উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে, যা শুনলে মনে হয় আকাশ থেকে এক পশলা শান্তি বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে এই পুণ্যময় ভূমিতে।
জয়া কোমরে আঁচল গুঁজে নখ কামড়াচ্ছে কাজ দেখে।খানিকক্ষণ আগে নাজনীন শাসিয়েছে তাকে।কান চেপে ধরে আদেশ করেছে সবার সাথে হাতে হাতে কাজ করতে।সে কী কাজটা করবে শুনি?খাওয়া-দাওয়া ছাড়া আর কিছু পারে এই মেয়ে?রেখা বেগম অবশ্য একটু অন্যরকম।তিনি জয়াকে ছেলের বউ কম—নিজের মেয়ে বেশি মনে করেন।জয়া কাজ করতে চাইলেও তিনি করতে দেননি।তা-ছাড়া জয়া কাজের চেয়ে কাজ নষ্ট করে বেশি।সাহস পাননি জয়াকে কোনো কাজ দেয়ার।আর এই কথাটা জয়া খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে।তার দৃষ্টি কায়নাতের দিকে।কায়নাত তার চেয়ে এক থেকে দেড় বছরের মতো বড় হবে।কায়নাতের কাজ দেখে সে হতবাক।সকালেও এই মেয়ের হাত কেটেছে অনেকটা।অথচ এখন এমন ভাবে কাজ করছে যেন কিছুই হয়নি হাতে।
মিলাদ শেষে খাবারের বিশাল ব্যবস্থা করা হলো বাগানেই।পুরো বাগান ভর্তি সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা পুরুষদের ভিড়।আদাল,প্রেম,অর্ণ,হাসান কিংবা নাজনীন কেউই বাকি নেই সেখানে।সবাই একত্রিত হয়ে কাজ করছে।স্বার্থ আর শেহের এসেছে খানিকক্ষণ আগে।হয়তো আগামী পরশু তারা রওনা হবে সিলেট।ছোট্ট আদি আজ মামুর মতো সাদা পাঞ্জাবি পরেছে।সে হাত দিয়ে ভালো করে খেতে পারে না বলে আজও শেহেরকে জ্বালাতে তার কাছে বসেছে।আদি খাবার মুখে নিয়ে মুখ খানা একটু করে শেহেরের বুকে গুটিয়ে আসছে বারবার।খাওয়া দাওয়া শেষ হলো বেশ বেলা করে।বাড়িতে অনেক মহিলাই এখনও না খেয়ে আছেন।
খাওয়া শেষ হতেই বাগানের কোলাহল একটু একটু করে স্তিমিত হয়ে এলো।পুরুষদের সারি ভেঙে গেল, কেউ পান খেতে বসেছে, কেউ ছাঁয়ার দিকে সরে গেছে।মিলাদের সেই গম্ভীর আবহ ধীরে ধীরে রূপ নিল ঘরোয়া ব্যস্ততায়।এখন অন্দরমহলের পালা।
বড় ডেকচিগুলো একে একে ভেতরে আনা হলো।শিরনি আর জর্দার ঘ্রাণে অন্দরমহল ভরে উঠল।মেয়েরা সারি করে বসছে—কেউ পিঁড়িতে, কেউ মাদুরে।ইতোমধ্যে অনেকেই বিদায় নিয়েছেন ফারিহাকে দোয়া দিয়ে।নুসরাত জারার সাথে ছাদে এসেছিল বাড়ি ভর্তি মানুষ দেখে।
গ্রামের সন্ধ্যাবেলা মানেই এক শান্ত স্নিগ্ধতা আর ধীরলয়ে দিনান্তের বিদায়বেলা। চৌধুরী বাড়ির সেই ঝলমলে দুপুরের রেশ কাটতে না কাটতেই যখন সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখন প্রকৃতির রঙ পাল্টে যায় এক মায়াবী আবহে।
সূর্যটা যখন দিগন্তের ওপারে মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়, তখনই গ্রামের আকাশজুড়ে শুরু হয় রঙের খেলা। তপ্ত সোনারঙা আকাশটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে কখনও কমলা, কখনওবা গাঢ় নীল আভা ধারণ করে। বিকেলের সেই ঝলমলে রোদ যখন বিলের জলে শেষ চুমুক দিয়ে বিদায় নেয়, তখন চারপাশের গাছপালাগুলো এক গভীর মৌনতায় ডুবে যায়। চৌধুরী বাড়ির পুকুরপাড়ে থাকা বাঁশঝাড়ের মাথাগুলো হাওয়ায় দুলে দুলে যেন একে অপরকে রাতের আগমনী বার্তা জানায়।
পাখিরা তখন কিচিরমিচির শব্দে আপন নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে। গ্রামের মেঠো পথে তখন ধুলো উড়ছে, আর সেই ধুলোর উপর দিয়ে ক্লান্ত পায়ে ঘরে ফিরছে দিনমজুরের দল। অন্দরমহলে তখন গৃহিণীদের ব্যস্ততা শুরু হয়।জারা গ্রামের পরিবেশ দেখে মুগ্ধ।কখনও গ্রামে আসা হয়নি তার।ঢাকায় পুরো বংশ বলে গ্রামের নামও মুখে আনা হয়নি কোনোদিন।হঠাৎ দরজার কাছ থেকে আদির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।নুসরাত পিছু ফিরে তাকাতেই শেহেরের সাথে চোখা-চোখী হলো এক পলক।নিজেকে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় মুড়িয়েছে শেহের।নুসরাত নিচু স্বরে বলল,
“ভালো আছো?”
শেহের মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“আল্লাহ রেখেছে ভালো।তোমার খবর কী?”
“আছি!”
জারা ভাবল,তার এই মুহূর্তে এখানে থাকা ঠিক নয়।সে শেহেরের সাথে টুকটাক কথা বলে প্রস্থান করল সেখান থেকে।নুসরাত আদির গম্ভীর মুখখানা দেখে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল।ছেলেটা দিন দিন বড্ড বেপরোয়া হচ্ছে।শেহের কাঠের চেয়ারে আরাম করে বসল।এখন থেকে প্রায় অর্ধেক গ্রামটা দেখা যাচ্ছে।সে দূর পথে দৃষ্টি রেখে বলল,
“বসো।”
ছাদের উপর পাশাপাশি দুটো পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে আছে শেহের আর নুসরাত। শেহেরের ঠিক কোল ঘেঁষে বসে আছে ছয় বছরের ছোট আদি। শেহের পরম মমতায় আদি’র চুলে আঙুল চালিয়ে দিচ্ছে। শেহেরের হাত দুটো আজ খালি, কোনো তামাকের ধোঁয়া নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত স্থিরতা।
নুসরাত রেলিংয়ের ওপাশে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। গত কয়েক বছরে তার জীবনে বয়ে যাওয়া ঝড়গুলো তাকে বড্ড বেশি শান্ত আর কঠোর করে তুলেছে। শেহের জানে, এই দীর্ঘ সময় ধরে নুসরাত নিজের চারপাশে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে রেখেছে। এক বিষাদময় অতীতের বোঝা কাঁধে বয়ে চলা একজন মা।
“আদিকে কেন মেরেছিলে সেদিন?” শেহেরের শান্ত গম্ভীর কণ্ঠস্বর সন্ধ্যার স্তব্ধতা ভেঙে দিল।
নুসরাত একবারও ফিরে তাকাল না। তার চোখের নিচে ক্লান্তির কালি। সে শুকনো গলায় বলল,
“ও বড্ড দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে।মা হিসেবে শাসন করার অধিকার আমার আছে। তুমি এসব থেকে দূরে থাকো।ওকে এভাবে মাথায় তোলা তোমার ঠিক হচ্ছে না।”
শেহের আদিকে আরও একটু নিজের কাছে টেনে নিল। আত্তির কোমল চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“শাসন করো নুসরাত, কিন্তু মারবে না। এই ছেলেটার মনে এমনিতেই অনেক না পাওয়ার ক্ষত। ও তো তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চেনে না। আমি চাই না ওর শৈশবটা ভয়ের মধ্য দিয়ে কাটুক। ওকে শাসন করার সময় তুমি হয়তো ভুলে যাও, ওর বাবা নেই বলে ওর সবটুকু আবদার আর আশ্রয় তোমার কাছেই। আমি যখন ওর চোখে পানি দেখি, তখন আমার নিজের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়।”
নুসরাত এবার একটু রুক্ষ স্বরে বলল,
“তুমি কেন ওর এত দায়িত্ব নিচ্ছ শেহের ভাই? ও আমার ছেলে। তুমি আমার ভাইয়ের বন্ধু, মেহমান হয়ে এই বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য এসেছ,মেহমান হয়েই থাকো না কেন? আমাদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণার ব্যাপারে তোমার এত মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আদি আর আমার থেকে তুমি যত দূরে থাকবে, আমাদের জন্য ততই ভালো।”
শেহের পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। নুসরাতের এই ক্রমাগত অবহেলা আর হিমশীতল উপেক্ষা তার রক্তে বিষের মতো মিশে গেছে অনেক আগেই, তবুও সে সয়ে নেয়। নুসরাত কী সত্যিই নির্বোধ? না, সে সব বোঝে!শেহের কেন দিনভর আদিকে ছাঁয়ার মতো আগলে রাখে, কেন আদির অতি ক্ষুদ্র আবদারগুলো পূরণে শেহেরের পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়—এই সবকিছুর অর্থ নুসরাতের অজানা নয়। কিন্তু নুসরাত নিজেকে এক ভাঙা আয়নার মতো মনে করে; যে আয়নায় সে কেবল নিজের পরাজয় আর ক্ষতগুলোকেই বড় করে দেখে। সেই হীনম্মন্যতার দেয়াল টপকে সে শেহেরের আলোর কাছে আসতে ভয় পায়।
নিস্তব্ধতা ভেঙে নুসরাত আবার বিষাক্ত স্বরে বলে উঠল,
“শোনো শেহের ভাই, এই নিষ্ঠুর সমাজ কাউকেই রেহাই দেয় না। তোমার সামনে পড়ে আছে এক দীর্ঘ উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, আর আমি? আমি তো এক পরিত্যক্ত নারী, যার আঁচলে বাঁধা আছে ছয় বছরের এক দীর্ঘশ্বাস। মানুষ আড়ালে আমাদের নিয়ে নোংরা গল্প ফাঁদছে। দয়া করে এই মায়ার ছলনা বন্ধ করো। এই মিথ্যে আবেগ আমাদের কোনো উপকারে আসবে না, বরং যা অবশিষ্ট আছে তাও ছাই করে দেবে।”
শেহেরের বুকের পাঁজরগুলো যেন এক তীব্র হাহাকারে দুমড়ে মুচড়ে গেল। সে বিদ্যুৎবেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং এক নিমিষেই নুসরাতকেও টেনে দাঁড় করাল। তার চোখেমুখে তখন এক আগ্নেয়গিরির দহন, যা গোধূলির এই শেষ আলোতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। নুসরাতের এই অবাধ্যতা আর নিজেকে বারবার ছোট করার হীনম্মন্যতা শেহেরের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। নুসরাত যখন চূড়ান্ত রাগে তাকে ‘পর’ বলে আবারও অন্ধকারের ওপারে ঠেলে দিতে চাইল, তখন শেহেরের কণ্ঠ থেকে এক বজ্রকঠিন ধমক আছড়ে পড়ল।
সে এক মুহূর্তের অবকাশ না দিয়ে নুসরাতের মুখটা নিজের তপ্ত দুই হাতের শক্ত মুঠোয় তুলে নিল। নুসরাত চমকে গিয়ে কথা হারিয়ে ফেলল, তার চোখের মণি দুটো এক অদ্ভুত আতঙ্কে আর বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। ছাদের উপর নামা গাঢ় সন্ধ্যার সেই নির্জনতায় শেহের তার চোখের গভীরে চোখ রেখে কাঁপা গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“ভালোবাসি তোমায়! সব বুঝেও কেন এই অকাল অন্ধ সেজে থাকো তুমি? এই যে প্রতিদিন নিজের অস্তিত্ব পুড়িয়ে তোমার আর আদির ছাঁয়ার পেছনে এক যাযাবরের মতো ঘুরি, এটা কি তোমার কাছে নিছক ‘কর্তব্য’ মনে হয় নুসরাত? তোমার ওই ছয় বছরের ছেলেকে আমি কেবল ভালোই বাসি না, আমি ওকে আমার রক্ত আর নাম দিতে চাই। আমি চাই না দুনিয়ার কেউ ওকে ‘অনাথ’ বলে খোটা দেওয়ার সাহস পাক। তুমি নিজেকে যতবার আড়ালে লুকাবে, আমি ততবার সূর্য হয়ে তোমাকে সামনে টেনে আনব। কেন এই আত্মঘাতী জেদ নুসরাত? আমাদের এই দূরত্বের শেষ কোথায়?”
শেহেরের হাতের উষ্ণতা আর চোখের সেই অবাধ্য ভালোবাসা নুসরাতের পাষাণ হয়ে যাওয়া মনটা যেন হুহু করে কেঁদে উঠল।কী করে এই মুহূর্তের মোকাবেলা করবে মেয়েটা?এত দহন শেষে শেহেরের এক পৃথিবী সমান ভালোবাসাটা কী করে প্রত্যাখ্যান করবে? নুসরাত এক ঝটকায় শেহেরের তপ্ত হাতের মুঠি থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ওর বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে, আর দুচোখ ছাপিয়ে নামছে নোনা জলের ধারা। গোধূলির শেষ আলোটুকু ততক্ষণে মুছে গিয়ে চারপাশ এক বিষণ্ণ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। নুসরাত আর্তনাদ করে উঠল,
“না শেহের ভাই! আমাকে ভালোবেসো না। আমাকে ভালোবাসা এক ভয়ংকর পাপ। আমি এক অভিশপ্ত মরুভূমি, সেখানে বসন্তের স্বপ্ন দেখা কেবল নিজেকেই দহন করা। তুমি কেন বোঝো না, আমি নিজে পুড়ে ছাই হয়ে গেছি, তোমাকে সেই আগুনের ভাগ দিতে চাই না আমি।”
শেহেরের কণ্ঠস্বর এবার অভিমানে আর কাতরতায় ভেঙে এলো। সে এক পা এগিয়ে নুসরাতের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ওর চোখের মণি দুটো তখন এক অতল হাহাকারে টলমল করছে। অতি করুণ আর ভেজা গলায় শেহের ফিসফিস করে বলল, “শুধু একটাবার ভালোবেসে দেখোই না রাতপাখি! দুনিয়ার সব নিয়ম, সব লোকলজ্জার পাহাড় টপকে শুধু একটাবার আমার পাঁজরে মাথা রেখে দেখো। আমার এই বুকের ভেতরটা যে কেবল তোমারই আশ্রয়ের অপেক্ষায় এক প্রাচীন ভাঙা বাড়ির মতো নিস্তব্ধ হয়ে আছে।”
শেহেরের সেই কাতর আকুতি নুসরাতের ভেতরের দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা পাথরটাকে যেন এক নিমিষেই চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। কিন্তু এক অজানা আতঙ্ক আর হীনম্মন্যতা ওকে আবারও আচ্ছন্ন করে ফেলল। ও আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে পারল না। হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে, এক বুক তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে নুসরাত ডুকরে কেঁদে উঠল এবং দৌঁড়ে ছাদ থেকে নেমে গেল। সিঁড়িতে ওর পায়ের শব্দ ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল রাতের নিস্তব্ধতায়।
শেহের স্তব্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর দুচোখ বেয়ে তখন নীরবে অশ্রু ঝরছে। ঠিক তখনই ছোট আদি, যে এতক্ষণ কোণে বসে বড়দের এই বিচিত্র দহন দেখছিল, সে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো। আছন্ন শেহেরের পা জড়িয়ে ধরে সে তার ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে শেহেরের কোমর জাপটে ধরল। আদি কিছুই বোঝে না, শুধু জানে এই মানুষটার কাছে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা আছে। শেহের টলমলে চোখে নিচে তাকিয়ে আদিকে কোলে তুলে নিল এবং ওর কপালে এক দীর্ঘ চুমু খেল। চৌধুরী বাড়ির সেই অন্ধকার ছাদে তখন জোনাকিরা উড়ছিল, আর শেহেরের কানে কেবল প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—‘রাতপাখি, তুমি কি ফিরবে না কোনোদিন?’
ভালোবাসা এক বিচিত্র অনুভূতি, যার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটি কখনও বসন্তের প্রথম বৃষ্টির মতো শীতল, আবার কখনও মরুভূমির তপ্ত বালুর মতো দহনকারী। ভালোবাসা মানে শুধুই প্রাপ্তি নয়, বরং বিসর্জনের এক দীর্ঘ উপাখ্যান।
ভালোবাসার এক পিঠে আছে অসীম সুখ,যেখানে প্রিয় মানুষের একটুখানি হাসি কিংবা এক চিলতে চাহনিতেই সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায়। সেই সুখে কোনো স্বার্থ নেই, আছে কেবল একে অপরের সান্নিধ্যে মিলেমিশে যাওয়ার এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা। কিন্তু এই সুখের মুদ্রার উল্টো পিঠেই বাস করে ‘দহন’। এই দহন আগুনের মতো পুড়িয়ে ছাই করে না, বরং হৃদয়ের গহীনে এক নীল দহনের জন্ম দেয়। প্রিয় মানুষের অবহেলা, না পাওয়ার হাহাকার কিংবা দূরত্বের শূন্যতা যখন বুকের বাম পাশে চিনচিনে ব্যথা হয়ে জেঁকে বসে, তখনই শুরু হয় ভালোবাসার আসল দহন।
আবার ভালোবাসায় দুঃখও আছে, তবে সেই দুঃখ বড় মায়াবী। সেই দুঃখে চোখের জল ঝরে ঠিকই, কিন্তু তাতেও এক ধরণের তৃপ্তি থাকে। কারণ মানুষ কেবল তার জন্যই কাঁদে, যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি স্থান দেয়। বিরহ বা দুঃখের এই মেঘগুলো যখন ভালোবাসার আকাশে জমা হয়, তখন হৃদয়ের গভীরতা আরও বেড়ে যায়।
আসলে ভালোবাসা হলো সুখ, দুঃখ আর দহনের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। যেখানে দহন আছে বলেই সুখের গুরুত্ব এত বেশি, আর দুঃখ আছে বলেই ভালোবাসা এত গভীর। এটি এমন এক মায়া, যা মানুষকে এক মুহূর্তেই রাজা বানিয়ে দেয়, আবার পরক্ষণেই করে তোলে নিঃস্ব এক যাযাবর।
“ভালোবাসা কোনো সামাজিক সমীকরণ মানে না; সে শুধু জানে দীর্ঘ এক তপ্ত মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার পর এক পশলা শান্তির বৃষ্টির নাম।”
চৌধুরী বাড়ির সেই ঝলমলে দুপুরের মিলাদ আর লোকজনের শোরগোল এখন এক গভীর নিস্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে। সারাটা দিন আগুনের মতো ছুটে বেড়াতে হয়েছে কায়নাতকে। দাদা শ্বশুরের বড় বোন রাহেলা বানু মানুষটি যেন পাথরের তৈরি; কায়নাতকে এক দণ্ড জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসতটুকুও দেননি তিনি। মেহমানদারি, তবারক গোছানো আর রাহেলা বানুর হাজারও হুকুম তামিল করতে করতে কায়নাতের শরীরের প্রতিটা হাড় যেন আজ বিদ্রোহ ঘোষণা করছে।রাত তখন অনেক। কায়নাত অর্ণর ঘরে ঢুকে দরজাটা ভিজিয়ে দিল। শরীর আর চলছে না, ফ্রেশ হওয়ার মতো শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই ওর ভেতর। পরনের ভারী শাড়িটা নিয়েই সে ধপাস করে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। চোখের পাতা দুটো ঘুমে আর ক্লান্তিতে এমনিতেই বুজে আসছিল, বিছানার নরম ছোঁয়া পেতেই সে অতল ঘুমে তলিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরেই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল অর্ণ। পরনে ধবধবে সাদা পায়জামা আর পাঞ্জাবি, যা দুপুরে মিলাদের সময় পরেছিল। পাঞ্জাবির হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। ঘরে ঢুকেই অর্ণ আড়চোখে বিছানার দিকে তাকাল। কায়নাতকে ওভাবে অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে ওর চোয়ালটা কিছুটা শক্ত হয়ে এলো, দৃষ্টিতে ফুটে উঠল একরাশ গাম্ভীর্য। অর্ণ শব্দ না করে গায়ের পাঞ্জাবিটা ঝাড়তে ঝাড়তে ওয়াশরুমে চলে গেল।
দশ মিনিট পর যখন সে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো, দেখল কায়নাত আগের মতোই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওর ক্লান্ত মুখটা চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। অর্ণ ধীরপায়ে বিছানার একদম নিকটে এসে দাঁড়াল। কায়নাতের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ওর ভেতরের গাম্ভীর্যটা যেন মুহূর্তেই এক অদ্ভুত মায়ায় পরিণত হলো।
অর্ণ পাঞ্জাবির পকেট থেকে খুব সন্তর্পণে একটা ছোট্ট সোনালি রঙের চিকন পায়েল বের করল। তপ্ত রোদেলা দুপুরে যখন বাড়ির সবাই মিলাদে ব্যস্ত ছিল, তখন অর্ণ শেহেরদের আনতে গিয়েছিল স্ট্যান্ডে।একটা ছোট্ট বাচ্চা রাস্তায় বসে এসব বিক্রি করছিল। সে আলতো করে বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসল। কায়নাতের শাড়ির নিচের অংশটুকু খুব সাবধানে একটুখানি উঁচু করল সে, যাতে ওর পায়ের গোড়ালিটা স্পষ্ট হয়।
অর্ণ যেই না পায়েলটা কায়নাতের পায়ে পরিয়ে দিতে গেল, ঠিক তখনই শীতল ধাতুর স্পর্শে কায়নাতের তন্দ্রা ভেঙে গেল। সে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। আবছা আলোয় দেখল অর্ণ ওর পায়ের কাছে নিচু হয়ে বসে আছে। কায়নাতের তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে বিস্ময় আর ঘোর নেমে এলো। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
“আরে? আপনি এখানে! আমার পায়ে কী করছেন?”
অর্ণ মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, ওর হাতের মুঠোয় তখনও সেই সোনালি পায়েলটা চিকচিক করছে।
অর্ণ কোনো উত্তর দিল না। কায়ানাতের বিস্ময়ভরা চাউনিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে অত্যন্ত দৃঢ় অথচ কোমল হাতে ওর ডান পা-টা টেনে নিয়ে নিজের কোলের উপর রাখল। কায়ানাত যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার শরীরের ভেতর দিয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। অর্ণ চৌধুরী—যাকে সবাই চেনে এক গম্ভীর, রাশভারী আর আবেগহীন মানুষ হিসেবে, সেই মানুষটি আজ মধ্যরাতে এভাবে নতজানু হয়ে তার পায়েল পরিয়ে দিচ্ছে!
কায়ানাত স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল অর্ণের নিচু হয়ে থাকা মুখটার দিকে। সাদা পাঞ্জাবিতে অর্ণকে আজ বড্ড মায়াবী দেখাচ্ছে। সে আলতো করে পা-টা সরিয়ে নেয়ার একটা ক্ষীণ চেষ্টা করতেই অর্ণ আরও শক্ত করে ওর গোড়ালিটা চেপে ধরল। অর্ণের এই নীরব কর্তৃত্বের কাছে কায়ানাত হার মানতে বাধ্য হলো। ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা আবছা নীলচে আলোয় সেই সোনালি পায়েলটা অর্ণের আঙুলের ছোঁয়ায় চিকচিক করে উঠল।
সোনালি ধাতুর সেই চিকন পায়েলটা যখন কায়ানাতের তপ্ত ত্বকে ঘষা খেল, তখন কায়ানাত অনুভব করল অর্ণর দীর্ঘ আঙুলের শীতল স্পর্শ। পায়েলটা পরানো শেষ হলে অর্ণ পা-টা ছেড়ে না দিয়ে সেখানে তার তপ্ত হাতের তালুটা একবার বুলিয়ে নিল। সারা দিনের ক্লান্তি যেন ওই এক চিলতে স্পর্শে কর্পূরের মতো উবে গেল কায়ানাতের।
অর্ণ এবার কায়ানাতের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার সেই গভীর কালো চোখে আজ গাম্ভীর্যের বদলে ছিল এক শান্ত সমুদ্রের মতো ভালোবাসা। কায়ানাত ফিসফিস করে বলল,
“হাত টা সরান।”
অর্ণর চোখদুটো আগের চেয়েও বেশি গম্ভীর আর সতর্ক হয়ে উঠল। পায়েলটা পরানো শেষ করে সে কায়ানাতের পায়ের উপর থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল এবং এক মুহূর্তের জন্যও দৃষ্টি না সরিয়ে ওকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কায়ানাত ওর চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাউনিতে আরও আড়ষ্ট হলো।
অর্ণ ধীরপায়ে উঠে গিয়ে নিজের বালিশটা টেনে নিয়ে মাথা রাখল। ওর প্রতিটি নড়াচড়ায় এক ধরণের গাম্ভীর্য। কায়ানাত তখনও অস্ফুট বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে দেখে অর্ণ ওর দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনেকটা ধমকের স্বরেই বলে উঠল,
“বেয়াদব মহিলা! খুব জ্বালাচ্ছ আমায়।চুপচাপ আমার বুকের বা পাশে এসে শুয়ে পড়ো।”
কায়ানাত ঘাবড়ে গিয়ে কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই অর্ণ এক ঝটকায় কায়ানাতকে নিজের কাছে টেনে নিল। কায়ানাত প্রতিবাদ করার ভাষা হারিয়ে ফেলল। অর্ণ ওর মাথাটা নিজের শক্ত প্রশস্ত বুকের উপর চেপে ধরল। ওর পাঞ্জাবির হাতা থেকে আসা মিলাদের আগরবাতি আর চন্দন মিশ্রিত আতরের সুবাস কায়ানাতের নাসারন্ধ্রে এক অদ্ভুত নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে।অর্ণ ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবারও সেই গম্ভীর গম্ভীর স্বরে হুকুম দিল,
“চুপচাপ ঘুমাও আমার বুকের এই বাম পাশে। অনেক হয়েছে আজ, আর একটা কথাও যেন তোমার মুখ থেকে না বের হয়।”
কায়ানাত অর্ণের হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে পেল। কী অদ্ভুত! মানুষটার গলার স্বরে ধমক থাকলেও বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা যেন অন্য এক প্রেমের গল্প বলছে। কায়ানাত সব ক্লান্তি ভুলে অর্ণর বুকের উষ্ণতায় চোখ বুজল। চৌধুরী বাড়ির সেই নিস্তব্ধ রাতে বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে কেবল অর্ণের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।যেন কায়নাতের কানের কাছে বাগানের রঙিন প্রজাপ্রতিররা এসে ফিসফিস করে বলছিল,
“শোনো লাজবধূ,তোমার স্বামী তোমার প্রেমে পড়েছে।”
কড়া শাসনের আড়ালে যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, তার গভীরতা কেবল প্রিয়জনের হৃদস্পন্দন শুনলেই অনুভব করা যায়।
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করবেন।আজকে বিশাল বড় পর্ব দিয়েছি।আগামীকাল #কিশোরী_কন্যা আসবে।)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৪.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩১.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫