প্রেমবসন্ত_২
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
১৬.
শহরটা অনেকটাই নীরব।দূরের রাস্তায় মাঝেমধ্যে দু’একটা গাড়ির টুপটাপ শব্দ ছাড়া আর কিছুই নেই। ছাদের কার্নিশে জমে থাকা হালকা শিশিরে চাঁদের আলো পড়ে রুপালি পর্দার মতো ঝিলমিল করছে।উপরে আকাশে বিশাল গোল চাঁদ, চারপাশে হালকা কুয়াশার ধোঁয়াটে আস্তরণ,যেন চাঁদের চারপাশে এক স্বচ্ছ সাদা ঘোমটা।
ছাদের এক কোণে শুকনো শালের পাতার উপর দিয়ে মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছে। বাতাসে শীতের ঠান্ডা কামড়, তবে সেই ঠান্ডাই আবার অদ্ভুত শান্তি এনে দিয়েছে চারদিকে। পাশের বাড়িগুলোর ছাদে দু’একটা কাপড় দুলছে, কোথাও দূরে কারো জানালা থেকে হলুদ আলো বেরিয়ে এসে জোছনার সাথে মিশে গেছে।রেলিংয়ের কাছে দাঁড়ালে দেখা যায় শহরের উপর ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আলো,তারার মতোই টিমটিম করছে। বিদ্যুতের তারে চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে।
এমন রাতে মনে হয় গোটা শহরটাকে যেন চাঁদ নিজের কোলে তুলে রেখেছে।
হাওয়া এতটাই ঠান্ডা যে নিঃশ্বাস বের হলে ধোঁয়ার মতো লাগে। ছাদের মাঝখানে রাখা দোলনাটা দুলছে ধীরে ধীরে। যে বসবে, তার মনে খানিক নরম আবেগ আর গভীর একাকিত্ব দোলা দিয়ে যাবে।
এমন রাতে কারো মনে পড়ে যায় অনেক কথা।
শহর ঘুমিয়ে পড়লেও ছাদের এই জোছনা,জেগে থাকে,তাকিয়ে থাকে,যেন কারো অপেক্ষায়।
নুসরাত ছাদের এক কোনায় এসে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত শহর দেখছে।এই গোটা শহরে একটা সময় একজন প্রেমিক পুরুষের হাত ধরে ঘুরেছে।আজ যেন সবই স্মৃতি।ছেলেটাকে দেখলে অতীতের দুঃখ গুলো ভুলে যায় সে।বিয়ের পর সংসার হয়েছিল ২বছর।আজও মনে হচ্ছে এইতো সেইদিন লাল শাড়ি পরে বিয়ে করেছিল সে।আদির বাবার হাত শক্ত করে মুঠোয় নিয়ে এই চৌধুরী বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছিল।কে জানত,কয়েকদিন পরই আবার বাবার বাড়ি ফিরে আসতে হবে?সে তো কল্পনাতেও ভাবেনি।হঠাৎ পেছন থেকে কারোর হেঁটে আসার শব্দ শুনতে পেল সে।ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়াতেই অর্ণর মুখো-মুখী হলো সে।
“এত রাতে ছাদে কী করছিস?”
বড় ভাইয়ের প্রশ্নে নুসরাত বলল,
“ঘরে দম বন্ধ লাগছিল ভাইয়া।”
অর্ণ এগিয়ে এলো বোনের নিকটে।ভেজা রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল,
“কী নিয়ে এত চিন্তা হচ্ছে?”
নুসরাত বলল,
“তোমরা থাকতে আমাকে আবার কিছু নিয়ে চিন্তা করতে হয়?”
“তাহলে মন খারাপ কেন?”
“সত্যি বলব?”
অর্ণ সম্মতি দিলে নুসরাত বলে,
“আদিকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।বাচ্চাটা এত দুষ্টু হয়েছে,যে আমার পক্ষে সামলানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
“কী করেছে?”
“স্কুলে প্রিন্সিপালের কাছে বলেছে শেহের ভাই ওর বাবা।শেহের ভাইয়ের ফোন নাম্বার অব্দি দিয়ে এসেছে।ওর দুষ্টুমির জন্য স্যার শেহের ভাইকে কল করেছিলেন কমপ্লেইন করার জন্য।”
অর্ণ শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,
“তুই কী করে জানলি?”
“শেহের ভাই বলেছে।”
“শেহেরের সাথে তোর কথা হয়?”
নুসরাত ভাইয়ের প্রশ্ন বিব্রত হয়ে মাথা নাড়ল।অর্ণ খানিকক্ষণ চুপ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যস্ত শহরে দৃষ্টি রেখে বলল,
“শাওন নক দিয়েছিল আব্বুকে।আদিকে দেখতে চাইছে।”
নুসরাত আতঙ্কে কিছুটা চিৎকার করে উঠল।বলল,
“আমার বাচ্চাকে আমি ওর কাছে দিব না।”
“দিয়ে দিতে বলেছি? শাওন ওর বাবা,দেখার অধিকার তার আছে।”
“কোনো অধিকার নেই।যে লোক তার সন্তানকে অবহেলা করে সেই লোকের আবার অধিকার কিসের?নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকুক,আমি কী বারণ করেছি নাকি তার সংসারে গিয়ে ঝামেলা করছি?আমার ছেলের জীবনে কেন ঢুকতে চাইছে সে?”
অর্ণ নুসরাতকে শান্ত করতে মাথায় হাত রাখল।সেই ছোট বেলার মতো।নুসরাত অল্পতেই হাইপার হয়ে যায়।বড় দুই ভাই আগে আদর করে না মানালে কাজ হতো না।বিয়ের আগ-অব্দি নুসরাত বাচ্চা ছিল।আজ সে আর বাচ্চা নেই,তবে ভাইয়েদের চোখে আজও সে ছোট্ট এক শিশু।
নুসরাতের চোখে পানি দেখে অর্ণ হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“শাওন আদির বাবা,এটা অস্বীকার করতে পারবি?তোদের ডিভোর্স হয়েছে বলে এই নয় শাওন আদির সাথে দেখা করতে পারবে না।”
“যদি ও আদিকে নিয়ে যেতে চায়?”
“আমরা আছি না?”
নুসরাত আর কথা বাড়াল না।অর্ণ বোনকে নিচে পাঠিয়ে দিয়ে একা নীরবে অনেকটা সময় ছাদে দাঁড়িয়ে রইল।ছাদের রেলিংয়ে জমে থাকা শিশিরটাকে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল অর্ণ।চাঁদের আলোতে তার মুখটা আরও বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছে।শহরের আলো দূরে ঝিকিমিকি করছে।
সেইদিন ছিল রবিবার।ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ।কায়নাত চৌধুরী বাড়ি এসেছে অনেক গুলো দিন কেটে গেছে।তার জন্য একটা মেয়ে টিচার ঠিক করা হয়েছে বাড়িতে।প্রত্যেকদিন সন্ধ্যার পর এসে পড়িয়ে যান।আজ তাকে পড়াতে আসবেন না তিনি।কায়নাত সুন্দর করে তৈরি হয়ে বসে আছে অর্ণর গাড়িতে।এখন অর্ণ আসবে,তাকে নিয়ে মার্কেটে যাবে,তারপর তারা ঘুরতে।এটা তার কল্পনা।আসল কথা হচ্ছে বেহরুজ বেগম অর্ণকে বলেছেন কায়নাতকে কিছু কেনা-কাটা করে দেয়ার জন্য।মাশফিক চৌধুরী যখন বলেছিলেন তিনি কিনে দিবেন,তখন কায়নাত ফট করে মুখের উপর বলে দিয়েছিল জামাইয়ের টাকা থাকতে শ্বশুরের টাকা খরচ করবে কেন?যদিও কথা খানা এখনো অর্ণর কান অব্দি যায়নি।
বাড়ির ভেতর থেকে বিচ্ছু আদি দৌঁড়ে বের হলো মামুর সাথে।কায়নাত আদির চিৎকার শুনে কপালে ভাঁজ ফেলে গাড়ির বাইরে তাকাতেই দেখতে পেল,আদি শার্ট-প্যান্ট পরে পুরো তৈরি হয়ে বের হয়েছে।পেছনেই অর্ণ হেঁটে আসছে গম্ভীর মুখে।কায়নাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই আদি গাড়ির পেছনে গিয়ে বসল।অর্ণ ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল।কায়নাত মুখ কালো করে ফেলল নিমিষেই।কই ভেবেছিল জামাইয়ের সাথে একটু একা সময় কাটানো হবে,তা-না এখন মাঝে হাড্ডি হয়েছে এই বিচ্ছু শয়তান।অর্ণ গাড়ি বাড়ির বাইরে বের করার পর আদি পেছন থেকে বলল,
“ও মামু,ভাবির মুখ এমন বিলাইয়ের পুক্কির মতো লাগে কেন?”
কায়নাত দাঁত কটমট করে পিছু ফিরে বলে,
“বাঁদর ছেলে,এসব কে শিখিয়েছে তোমায়?”
আদি গম্ভীর গলায় বলল,
“প্রশংসা করছি তোমার।আমায় বাঁদর বললে কেন?”
“এটা কেমন ধরনের প্রশংসা?”
আদি গাল ফুলিয়ে অর্ণর দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোমার বেয়াদব বউ অনেক বেয়াদব।দেখেছ,আমার সাথে কিভাবে ঝগড়া করে?তুমি কিছু বলবে তোমার পাগল বউকে?”
কায়নাত ফুঁসে উঠল।রাগ দেখিয়ে বলল,
“আদি আমায় পাগল বলছে,আপনি ওকে কিছু বলছেন না কেন?”
অর্ণ বলল,
“পাগলকে পাগল বলেছে ,ঠিকই তো আছে।”
“আপনিও আমায় পাগল বলছেন?”
অর্ণ উত্তর না দিয়ে ড্রাইভ করতে ব্যস্ত।কায়নাত রেগে বুকে হাত গুঁজে বসে রইল।আশ্চর্য!সবাই তাকে এত পাগল পাগল করে কেন?ছোট একটা দুধের বাচ্চাও তাকে পাগল বলে।আর যাইহোক,এসব মানা যায় না।সারাটা রাস্তা আদি কায়নাতকে বিরক্ত করে এলো।কায়নাতকে রাগাতে তার ভালো লাগে।কায়নাত যখন রেগে গাল ফুলিয়ে তাকায় তখন মনে হয় গাল দু’টো টেনে দিতে।বিচ্ছু আদির ফেভারেট মামি।
ওরা শপিং মলে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল।আদি গাড়ি থেকে নেমেই কায়নাতের এক হাত আঁকড়ে ধরেছে।কায়নাত রেগে তাকাল।বলল,
“এখন এত ঢঙ করছো কেন?যাও,তোমার মামুর হাত ধরো গিয়ে।”
আদি চোখের চশমা ঠিক করে বলল,
“তুমি অনেক সুন্দর।তোমার হাত ধরে হাঁটলে মানুষ মনে করবে আমার মা অনেক মিষ্টি।মিষ্টি মায়ের মিষ্টি ছেলে।”
কায়নাত চোখ বড় বড় করে অর্ণর কুঁচকে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে আবার নিচু হয়ে আদির দিকে তাকাল।আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আমি তোমার মা হলাম কবে?আর এইটুকু বয়সে এত পাকা হয়েছো কেন তুমি?”
অর্ণ ওদের রেখেই সামনে হাঁটা শুরু করেছে।দুই পাগল নিয়ে বড্ড জ্বালায় পড়েছে সে।তাকে সামনে চলে যেতে দেখে আদি কায়নাতের হাত ধরে দৌঁড়ে গিয়ে অর্ণর আরেকটা হাত চেপে ধরল।মামা-মামিকে দুইপাশে রেখে ভালো বাচ্চার মতো হাঁটা শুরু করল।কায়নাতের পরীক্ষা সামনেই।সে খুলনা চলে যাবে কিছুদিন পরই।যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সব কিছু আগেই কিনে রাখছে সে।ওরা একটা শাড়ির দোকানে গিয়ে বসল।অর্ণ দোকানদারকে শাড়ি দেখাতে বলে একটু দোকানের বাইরে গেল।আদি দোকানে এসে দোকানদারকেও বিরক্ত করতে ছাড়ছে না।কায়নাত শাড়ি দেখছিল।যে ছেলেটা তাকে শাড়ি বের করে দেখাচ্ছিল সেই ছেলেটা হঠাৎ করেই প্রশ্ন ছুড়ল,
“আপনার ছেলেটা অনেক দুষ্টু।বেশি কথা বলে।”
আদি গাল ভরে হেসে বলল,
“ধন্যবাদ দাদুভাই।”
ছেলেটা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“কীসের দাদু?আমি তোমার বাবার থেকেও ছোট হব হয়তো।ভাইয়া বলে ডাকবে।”
“কীসের ভাই?আপনাকে দেখে তো আমার দাদুর মতোই লাগছে।”
কায়নাত মুখ কুঁচকে চোখ পাকিয়ে বলল,
“এত বেশি কথা বলতে কে বলেছে বাপ?একটু কী শান্ত হয়ে বসা যায় না?”
“শান্ত হয়ে বসার জন্য তোমার সাথে আসিনি আমি।”
“তাহলে কী করতে এসেছ?”
“মেয়ে পছন্দ করতে।”
কায়নাত এবার ভীষণ বিরক্ত হলো।বাচ্চাটা বয়সের তুলনায় একটু বেশি পেকে গেছে।আদি আদির বকবক করছে।কায়নাত কয়েকটা শাড়ি পছন্দ করল।এই জীবনে সালোয়ার-কামিজ খুব কম পরা হয়েছে তার।ঢাকায় আসার পর থেকে শাড়ি তেমন একটা পরা হয়নি।সে কয়েকটা শাড়ি পছন্দ করে একটা কালো খয়েরী রঙের কাতান শাড়ি বের করল।
“আপনি এখানে?” অপরিচিত পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনে কায়নাত পাশে তাকায়।মাথার হিজাব ঠিক করে কপাল কুঁচকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা লোকটাকে দেখে বলে,
“আমাকে বলছেন?”
“জি,আপনাকেই বলছি।আমায় চিনতে পারছেন না?”
“মুখে মাস্ক পরা থাকলে চিনব কী করে?”
মুখের মাস্কটা খুলতেই কায়নাতের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।ঠোঁট শুকিয়ে এলো মুহূর্তে। সামনের জনকে দেখে যেন শরীরটা কেঁপে উঠল তার। লম্বা, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের সেই যুবকটা ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“এখন চিনতে পারছেন?”
কায়নাত ঢোক গিলতে না গিলতেই মাথার ভেতর ঝটকা খেয়ে উঠল অনেক পুরনো স্মৃতি।
জিল্লুর স্যার!সোহেল মির্জার চাচাতো ভাই জিল্লুর স্যারের ছেলে ধ্রুব হক।
বয়সে অর্ণর চেয়ে ছোট, কিন্তু দেখতে সবসময়ই অন্যরকম।শান্ত,চোখদুটো হরিণের মতো,আর অদ্ভুত ভদ্রতা।গ্রামে থাকা অবস্থায় দু’একদিন কায়নাতের বাবার কাছে কাজে এসেছিল,সেখানেই কায়নাতের সাথে তার দেখা হয়েছিল।
সেই ছেলেটা আজ যেন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
কায়নাত মাথা নাড়ল,ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে গেল বিস্ময়ে।
“আপনি ধ্রুব?”
ছেলেটা মাথা নত করে একটু হাসল।
“জি, ধ্রুব।আপনাকে দেখে চিনতেই পারিনি।অনেক বদলে গেছেন।”
কায়নাত আবারও চমকে তাকাল।
লোকটার কণ্ঠে ভীষণ ভদ্রতা, চোখদুটোয় যেন পুরনো পরিচয়ের উষ্ণতা।
“ভেবেছিলাম আমাকে হয়তো ভুলে গেছেন।”
কায়নাত বিব্রত হয়ে বলল,
“না…মানে,হঠাৎ দেখলাম তাই!”
“বেশ তো!আচ্ছা আপনি ঢাকায় কী করছেন?সুরঞ্জনাদের বাসায় এসেছেন বুঝি?”
কায়নাত বলদের মতো মাথা নাড়ল।ধ্রুব মুচকি হাসল।ফোন সময় দেখে বলল,
“আপনি কী এখানেই থাকবেন নাকি আবার গ্রামে ফিরে যাবেন?”
কায়নাত বলল,
“গ্রামে আর যাচ্ছি না।তবে পরীক্ষা দিতে যাব।”
“ভালো হয়েছে।আমাদের তাহলে আবার দেখা হবে।আমি একটু ব্যস্ত আজ।পরে একদিন অবশ্যই বসে কথা হবে।”
ওই মুহূর্তেই দোকানের বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকে এলো অর্ণর গম্ভীর মুখটা।দৃষ্টি প্রথমে কায়নাতের উপর,তারপর চোখ সোজা গিয়ে আঁটকে গেল অপরিচিত ছেলেটার দিকে।
অর্ণর ভ্রু কুঁচকে উঠল। তার গম্ভীর দৃষ্টিটা ছু’রির মতো ধারালো।ধ্রুব ভদ্রভাবে মাথা নত করল,
আর কায়নাত বুকের ভেতর অকারণে চাপা ধড়ফড় অনুভব করল।ধ্রুব ব্যস্ত পায়ে প্রস্থান করতেই আদি পাশ থেকে অর্ণকে নালিশ করে বলল,
“তোমার বেয়াদব বউ এতক্ষণ প্রেম করছিল ওই লোকটার সাথে জানো?”
কায়নাত আতঙ্কে অর্ণর দিকে তাকিয়ে ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আমি প্রেম করেছিলাম নাতো।”
আদি বলে,
“লজ্জা পাচ্ছ কেন ভাবি?ছেলেটা কিন্তু খুব সুন্দর।”
অর্ণর ঠোঁটের কোণ সামান্য শক্ত হয়ে উঠল।রাগ?হতাশা?অস্থিরতা?নাকি ঈর্ষা?কোনোটাই স্পষ্ট বোঝা গেল না।তার মুখটা এতটাই স্থির,এতটাই কাঠের মতো গম্ভীর যে কায়নাত বুঝতেই পারল না ঠিক কী ভাবছে সে।অর্ণ কায়নাত বা আদির দিকে একবারও না তাকিয়ে বিল পে করতে চলে গেল।
দোকানের দোকানদার বিল প্রিন্ট করতে করতে বারবার কায়নাতের দিকে তাকাচ্ছে।কেন জানি মনে হচ্ছে, আজ এই দোকানের বাতাসও ভারী হয়ে গেছে।কায়নাত দাঁত চেপে আদির হাতে চিমটি কাটল।আদি মুখ বিকৃত করে বলল,
“আহ্হ্ ভাবি,ব্যথা লাগল!”
কায়নাত চোখ পাকিয়ে বলল।
“চুপ করো।এত ফাজিল কেন তুমি?তোমার মামুকে মিথ্যে কথা বললে কেন?”
“ভুল কী বলেছি?আমি তো দেখলাম তুমি প্রেম করছিলে।”
কায়নাত রাগে,দুঃখে চুপ করে রইল।অর্ণ টাকা তুলে কাউন্টারে দিল।তার হাতের আঙুলে হালকা কাঁপুনি,কিন্তু চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
একটুও না।দোকানদার বলল,
“স্যার,ব্যাগটা নিন?”
অর্ণ শুধু মাথা নাড়ল।ব্যাগ নিল,কিন্তু কায়নাতের দিকে তাকাল না একবারও।আদি ফিসফিস করে বলল,
“আমার মামু মনে হয় রাগ করেছে।”
কায়নাত বিরক্ত হয়ে ধমক দিল,
“চুপ!”
অর্ণ দোকান থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
পেছনে কায়নাত আর আদি ছোট দৌঁড় অনুসরণ করছে।তার হাঁটার গতি আজ যেন বেশি।
জুতোর শব্দটা শপিং মলের টাইলসের উপর ঠকঠক করে কাঁপছে।
“আপনি রাগ করেছেন নাকি?”
কায়নাত খুব আস্তে গলায় জিজ্ঞেস করল।
তার কণ্ঠে চাপা ভয়।অর্ণ থামল না।হাঁটতে হাঁটতেই বলল,
“আমি কেন রাগ করব?”
“আমি যে ওই লোকটার সাথে কথা বললাম?”
“তো?”
কায়নাতের নিজেরই এবার রাগ হলো।অর্ণ রেগে কেন যাচ্ছে না?রেগে গিয়ে কায়নাতের সাথে একটু রাগা-রাগী করবে।কায়নাত কান্নার ভান করলে অর্ণ আদর করে বলবে,
“আচ্ছা,আর রাগ করব না।”
অথচ লোকটা রোবটের ন্যায় হেঁটেই যাচ্ছে সামনে।কায়নাতের প্রয়োজনীয় সব কিছুই কেনা হলো।শেষে আদির জন্যও কিছু শীতের জামা-কাপড় নেয়া হলো।যদিও এখন তেমন শীত নেই।
ওদের বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হলো।কায়নাত গাড়িতেই ঘুমিয়ে গেছে।আদি বাড়ি ফিরতেই দৌঁড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেছে।অর্ণ ঠোঁট চেপে গম্ভীর চোখে কায়নাতের ঘুমন্ত মুখশ্রী দেখল।বিড়াল ছানার মতো সিটের মধ্যে গুটিয়ে শুয়ে আছে পা উঠিয়ে।অর্ণ গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দারোয়ান হিনানকে বলল গাড়ি থেকে সব জিনিস নিয়ে বাড়িতে যেতে।অর্ণ ঘুরে এসে কায়নাতের পাশের দরজা খুলে হালকা ঝুঁকে এসে ডাকল মেয়েটাকে।উঠল না সে।চাঁদের আলো গাড়ির কাঁচ ভেদ করে গিয়ে তার গাল দু’টোতে পড়ছে।সেই আলোয় কায়নাতের চোখের পাপড়ি আরও লম্বা,আরও নরম দেখাচ্ছে।ঠোঁট হালকা খোলা,নিঃশ্বাস টেনে ঘুমোচ্ছে শিশুর মতো।
একটু দ্বিধা! অর্ণ ধীরে হাত বাড়িয়ে কায়নাতের কাঁধ ছুঁলো।কোনো সাড়া নেই।কায়নাত আরও গভীর ঘুমে ডুবে গেছে।হঠাৎ ঠাণ্ডা বাতাসের হালকা ঝাপটায় তার মাথাটা ডান দিকে হেলে গেল,অর্ণর কাঁধের দিকে।অর্ণ থমকে গেল।হাত বাড়িয়ে মাথাটা সোজা করে দিতে গিয়েও থেমে গেল আবার।
কেন যেন বুকের ভেতর আজ অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে,যেন পানির নীচে ডুবে থাকা কোনো ভারী জিনিস ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে।
মেয়েটা তার স্ত্রী!কত সহজে তাকে অস্থির করে দিতে পারে।একটু শ্বাস নিয়ে অর্ণ এবার কায়নাতকে আস্তে করে দুই বাহু দিয়ে তুলে নিল।বোরকার গন্ধ, গায়ের কোমল সুবাস,আর মুখের গরম নিঃশ্বাস সব মিলিয়ে অর্ণর বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে উঠল।
কায়নাতের মাথা অর্ণর কাঁধের কাছে জড়িয়ে এলো।হালকা মৃদু গুঙুনি দিয়ে আবার ঘুমে ডুবে গেল।
দো’তলায় উঠতেই বেহরুজ বেগম দূর থেকে দেখলেন।অর্ণ স্ত্রীর হাত-পা ঠিক করে কোলে তুলে নিয়ে আসছে।এ দৃশ্যটা বেহরুজ বেগমকে ভীষণ অবাক করলেন।তিনি দূর থেকে ধীরে বললেন,
“এভাবে তুলেছ কেন? জাগাতে পারতে।”
অর্ণ গম্ভীর দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাল,তারপর বলল,
“ঘুমাচ্ছে।”
কায়নাতের রুমে ঢুকে বিছানার উপর আলতো করে শুইয়ে দিল সে।হিজাব খুলে মুখের উপর চলে এসেছে।অর্ণ হাত বাড়িয়ে তা ঠিক করে দিল।
মেয়েটার মুখে এখনো একটু ক্লান্তি,চোখের নিচে হালকা লালচেভাব,সারা দিনের ক্লান্তি,আদি আর শপিংয়ের ঝামেলা।অর্ণ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ সপ্তদশীর দিকে।কয়েকদিন পর সে অষ্টাদশী হবে।কিশোরীর বয়স প্রায় শেষ।বাচ্চা একটা মেয়ে।অর্ণর সাথে যখন কায়নাতের বিয়ে হয়েছিল,তখন কায়নাতের বয়স খুবই কম।কুটুর কুটুর চঞ্চল চোখ তখন চারপাশ জুড়ে পর্যবেক্ষণ করত।অর্ণকে পর্যবেক্ষণ করত।গভীর ভাবে।
সে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও থেমে গেল।কায়নাত ঘুমের মধ্যে হাত বাড়িয়ে তার শার্টের কফ ধরে ফেলেছে।
মনেও নেই তার,অচেতন অর্ধনিদ্রায়।
পিছনে তাকিয়ে আবার দেখল তাকে।একটা ছোট নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট দিয়ে।
“বাচ্চা মেয়ে।বেয়াদব মহিলা!”
আস্তে করে কায়নাতের আঙুলগুলো খুলিয়ে দিল।
তারপর লাইট বন্ধ রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
ছোট্ট কায়নাত তখন দশ বছর বয়সী কন্যা।গায়ে ছিল মায়ের দেয়া গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি।ছোট কুঁচি হাতার ব্লাউজ।হাতে কাঁচের চুড়ি গুলো শব্দ করছিল ঝনঝন করছে।মেয়েটা বোধহয় তখন নুপুর পরত।রূপার নুপুর।অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ছিল সেই কন্যার আননে।মেয়েটার চুলের প্রতি মিলি বেগমের যত্ন ছিল ছোট থেকেই।কোমর ছুঁয়েছিল চুল গুলো।খোলা অর্ধভেজা চুলে বাড়ি জুড়ে দৌঁড়াচ্ছিল জয়াদের সাথে।খিলখিলিয়ে সেই হাসির শব্দটা যেন আজও কানে এসে বারি খায়।আর ফিসফিস করে বলা সেই কথা, “আপনি বুঝি শহরের বাবু?আমার লাটসাহেব?”
জুলাই মাস শেষের দিকে।ভরপুর গরমে অতিষ্ট গ্রাম।শহর থেকে খবর এলো মাশফিক চৌধুরীর বড় ছেলে আসবে গ্রামে।বাড়িতে সেই যে শুরু হলো এলাহি কাণ্ড।ছোট্ট কায়নাত তখন এত কিছু বোঝে না।গুটি গুটি পায়ে রান্না ঘরে গিয়ে দেখল দাদি নারকেল পাকাচ্ছেন নাড়ু বানানোর জন্য।
(আআআআআআ বাইরে গিয়েছিলাম।আরও বড় পর্ব দিতে চেয়েছিলাম গাইস।সরি পারলাম না। কায়নাত আমার অনেক আদরের।অর্ণ এবং কায়নাতকে ছাড়া #প্রেমবসন্ত গল্প কল্পনাও করা সম্ভব নয়।এই সিজনে হয়তো তাদের পার্সোনালিটি কিছুটা অন্যরকম তাই বলে তাদের আমি সাইড জুটি বানিয়ে দিতে পারি না।তারা আগেও মেইন জুটি ছিল এবারও থাকবে।সাথে নাজনীন-জয়ার সাথে সব জুটিই থাকবে ইনশাআল্লাহ।)
যারা আমার পার্সোনাল ফেসবুক আইডির সাথে এড হতে চেয়েছিলেন তারা একটিভ থাকবেন।নাহলে আমি আনফ্রেন্ড করতে বাধ্য হব।নিচে আমার আইডির লিংক দিয়ে দিচ্ছি।
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ গল্পের লিংক
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৭