Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৪


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_৩৪

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাস স্ট্যান্ডে এসে বসে আছে গুনগুন, প্রণয়, মাসুদ, কুলসুম ও শিহাব। ওসমান গণি টিকিট কাটতে গিয়েছেন। সবাই মিলে আজ গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। আগামীকাল গ্রামে থেকে পরেরদিন আবার চলে আসবে। কারণ এরপর হাতে থাকবে আর একদিন। এরপরই গুনগুনের ফ্লাইট।

বাবার বাসায় দাওয়াতে যাওয়ার পর ওসমান গণি গুনগুনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,

“দেশের বাইরে তো চলে যাবি। আমার কাছে কী চাস তুই বল? তা-ই দেবো।”

গুনগুন বলেছিল,

“গ্রামে যেতে চাই। ছোটোবেলার সেই সময়গুলো তো আর ফিরে পাব না। তবে ওরকম একটা দিন কাটাতে চাই তোমার সাথে, আব্বু।”

এ কথা শুনে ওসমান গণির চোখে পানি চলে এসেছিল। গুনগুনের মা মা’রার যাওয়ার পর আর কখনো গ্রামে যাওয়া হয়নি। মূলত সুমনা বেগমই কখনো চাইতেন না, তিনি গ্রামে যাক। সুমনা বেগম বউ হয়ে আসার পর সবকিছু থেকে, সবার থেকে ওসমান গণি আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন। গুনগুন এরপর একবার গিয়েছিল শুধু। সবাই কেমন যেন করুণার চোখে দেখত ওকে। হা-হুতাশ করত খুব। তবে চাচা-চাচি সবাই যে গুনগুনকে ভীষণ ভালোবাসতো এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তবুও এত ভালোবাসা ঝাপিয়েও গুনগুনের চোখে ভাসত সবার করুণা। সে নিজেকে কখনো এতটা ছোটো দেখতে পারত না তখন থেকেই। এরপর থেকে গুনগুনও আর গ্রামে আসেনি। দাদা-দাদিও ছিল না, যে যাদের টানে অন্তত গ্রামে যাওয়া হবে।

এতদিন বাদে গ্রামে কাটানো সেই সোনালি দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গিয়েছে গুনগুনের। দেশ ছাড়ার আগে অন্তত একটাবার সে গ্রামের মাটিতে খালি পায়ে বাবার হাত ধরে হাঁটতে চায়। প্রিয় ও কাছের মানুষগুলোর সাথে একটিবার সুন্দর কিছু মুহূর্ত তৈরি করতে চায়। ওসমান গণি বিনাবাক্য ব্যয়ে রাজি হয়ে গিয়েছেন। তাই রাত পোহাতেই ছেলে, মেয়ে ও জামাইকে নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছেন গ্রামের উদ্দেশে। সুমনা বেগমকে আসার জন্য তিনি জিজ্ঞেস করেননি কিছু। জিজ্ঞেস করলেও হয়তো আসতেন না। আর সত্যি বলতে, ওসমান গণি নিজেও চাচ্ছিলেন না সুমনা বেগম আসুক। কারণ তিনি চান, তার মেয়েটা এই অল্প সময়টুকু শুধু আনন্দেই থাকুক। ওর চারপাশে শুধু সেসব মানুষগুলোই থাকুক, যারা ওকে ভালোবাসে।

প্রণয় শুরুতে আসতে চায়নি। ও চাচ্ছিল বাবা-মেয়ে নিজেরা সুন্দর সময় কাটাক। কিন্তু গুনগুনের জোর করার জন্য প্রণয়কে আসতে হলো। গুনগুনের এক কথা ছিল,

“আমার আব্বুকে লাগবে, আপনাকেও লাগবে। আপনি ছাড়া আমার আবার কীসের ভালো সময়? আপনি বিহীন আমার সমস্ত আনন্দই দুঃখের সমান।”

এ কথার পর তো আর কোনো কথা থাকতেই পারে না। প্রণয়ের যেন একটুও একা একা না লাগে এজন্য মাসুদ আর কুলসুমকেও সাথে করে নিয়ে এসেছে গুনগুন। এই দুটো মানুষও তো গুনগুনের খুব কাছের ও ভালোবাসার। বিপ্লব ছুটির অভাবে আসতে পারছে না এখনো। তবে কথা দিয়েছে, গুনগুনকে এয়ারপোর্টে সী অফ করতে আসবে।

বাসে উঠে প্রণয় উশখুশ করে বলল,

“আমার না খুব লজ্জা লাগছে।”

গুনগুন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কেন?”

“এইযে এভাবে তো জামাই হয়ে আগে কোথাও যাইনি।”

গুনগুন চোখ ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে আছে। আইলানার, কাজল ও মাশকারা দিয়ে খুব সুন্দর করে চোখ দুটো সাজানো। চোখ ছোটো করায় দেখতে আরো সুন্দর লাগছে। ভ্রুজোড়া কিঞ্চিত কুঁচকে আছে, ঠোঁট সামান্য বাঁকানো। দাঁতে দাঁত পিষে গুনগুন বলল,

“জামাই হয়ে আগে কোথাও যাওয়া হয়নি মানে কী? আপনি কি আগেও বিয়ে করেছিলেন নাকি?”

প্রণয় দাঁত দিয়ে জিভে কামড় দিল। হাত দিয়ে গালে হালকা চাপড় দিয়ে বলল,

“তওবা, তওবা! আমার মতো খারাপ ছেলেকে বিয়ে করত কোন মেয়ে? সবাই কি তোমার মতো বোকা নাকি?”

“ইশ! আমি বোকা?”

“নও?”

গুনগুন প্রণয়ের হাত জড়িয়ে ধরে বলল,

“মোটেও না। আমি বোকা নই, আমি ভাগ্যবতী। ভাগ্য করেই আপনাকে পেয়েছি। আমি তো বলব আপনার মতো খারাপ ছেলে প্রতিটা মেয়ের ভাগ্যে জুটুক; যাতে মেয়েগুলো তাদের স্বামীদের নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে, সবসময় ভালোবাসায় থাকতে পারে। এক নারীতে আসক্ত পুরুষ প্রতিটা মেয়ের স্বপ্ন।”

প্রণয় লজ্জা পাওয়ার ভান ধরে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,

“ইশ! লজ্জা পেয়ে গেলাম।”

গুনগুন তখন শব্দ করে হেসে ফেলল।

ঢাকা থেকে গুনগুনদের গ্রাম খুব বেশি দূরে নয়। পদ্মা নদী পার হলেই শরীয়তপুর। যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে উঠে একদম ডিরেক্ট জাজিরা বাজারে নেমেছে ওরা। বাস থেকে নেমে প্রণয় আশেপাশে মিষ্টির দোকান খুঁজছিল।

ওসমান গণি জিজ্ঞেস করলেন,

“কিছু খুঁজছ? লাগবে কিছু?”

প্রণয় লাজুক হাসি দিয়ে বলল,

“মিষ্টির দোকান খুঁজছি।”

“কেন? মিষ্টি কিনবে নাকি? না, না এসবের কোনো দরকার নেই।”

“তা বললে হয় নাকি? প্রথমবার আসলাম। খালি হাতে যেতে পারব না। আপনারা একটু দাঁড়ান, আমি আসছি এখনই।”

“তুমি চিনবে না। আমি আসছি দাঁড়াও।”

ওসমান গণি ও মাসুদকে সাথে নিয়ে প্রণয় ছয় কেজি মিষ্টি কিনল। গুনগুনের কাছে শুনেছিল ওর তিন চাচ্চু। প্রথমে দশ কেজি মিষ্টি নিতে চাইলে ওসমান গণি অবাক হয়ে বলেছিলেন,

“পাগল নাকি? এত মিষ্টি কে খাবে? রাখো, রাখো। দুই, তিন কেজি নিলেই হবে।”

এত কম মিষ্টিও নেবে না প্রণয়। অবশেষে দশ কেজি থেকে ছয় কেজিতে এসেছে। মিষ্টি কেনা শেষ করে অনেকগুলো ফলমূল কিনে নিয়েছে। ওসমান গণি নিষেধ করা সত্ত্বেও কোনো বারণ শোনেনি প্রণয়।

শিহাব গুনগুন ও কুলসুমের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। এত খাবার নিয়ে ওদের আসতে দেখে বলল,

“আল্লাহ্! আপু, দেখো ভাইয়া তো পুরা দোকান তুলে নিয়ে এসেছে মনে হচ্ছে।”

গুনগুন তাকিয়ে হাসল। বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই তিন চাচ্চু, চাচি ও কাজিনরা দৌঁড়ে এলো। সবাই পারছে না যেন ওকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। সবার চোখই টলমল করছিল। কত বছর পর মেয়েটাকে দেখল সবাই! প্রণয়, কুলসুম, মাসুদকে আপ্যায়ন করে নিয়ে বাড়ির ভেতর বসাল। প্রণয়কে দেখে সবার খুব পছন্দ হয়েছে। সবার মুখেই ওকে নিয়ে প্রশংসার বুলি।

গুনগুনের যে বিয়ে হয়েছে এতদিন এটা কেউই জানত না। গতকাল রাতে ওসমান গণি যখন বাসায় ফোন করে আসার কথা জানিয়েছিল, তখনই গুনগুনের বিয়ের কথাও জানিয়েছেন তিনি। প্রথমে চাচারা ভীষণ অভিমান করেছিলেন, একটু কষ্টও পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রণয়কে দেখার পর সব রাগ-অভিমান গলে পানি হয়ে গিয়েছে। একদম যেন একটা রাজপুত্র পেয়েছে মেয়েটা।

গুনগুনের সমবয়সী সব কাজিনের বিয়ে হয়েছে আরো আগেই। প্রতিবারই ওদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে ফোন করে। কিন্তু ওরা কখনোই কারো বিয়েতে আসতো না। আজ এসে দেখল, একেকটার একটা, দুটো করে বাচ্চাও আছে এখন। সবাই কত বড়ো হয়ে গেছে!

গুনগুন বাচ্চাদের আদর করছিল। বড়ো চাচি তখন বললেন,

“আগে সবাইকে নিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়, মা। তারপর ক্যাসেটগুলোকে আদর করিস যা।”

মাসুদ ও প্রণয়কে বড়ো চাচ্চুর ছেলেদের রুমে ফ্রেশ হতে নিয়ে গেল বড়ো চাচি। কুলসুম ও গুনগুনকে ছোটো চাচির রুমে ফ্রেশ হতে নিয়ে গিয়েছে।

সবাই ফ্রেশ হয়ে একসাথে খেতে বসেছে। বাসায় ডাইনিং টেবিল আছে। কিন্তু আজ কেউ টেবিলে বসেনি। বড়ো বড়ো দুটো পাটি বিছিয়ে সবাই মেঝেতে খেতে বসেছে। যদিও প্রথমে প্রণয়, মাসুদ ও কুলসুমকে টেবিলে খেতে দেওয়া হয়েছিল; তথাপি ওরাও সবার সাথে নিচে বসে খাবে বলে আরজি করেছে।

খাবারের আইটেম দেখে মাসুদের চোখ ছানাবড়া। ও বসেছে প্রণয়ের একপাশে। ফিসফিস করে বলল,

“এতডি খাওন সব বাসায় রানছে নাকি বাইরে থেইকা আনছে?”

প্রণয় মুখে কিছু বলল না। হাসতে হাসতে আড়ালে চোখ রাঙাল। খাবারের আইটেম একটার পর একটা আসছেই। পোলাও, গরুর মাংস ভুনা, মুরগির রোস্ট, রুই মাছ ভুনা, সাদা ভাত, সরিষা ইলিশ, কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছের তরকারি, চিংড়ি দিয়ে করলা ভাজি, পাতলা ডাল, কালিজিরা ভর্তা, রসুন ভর্তা ও সালাদ।

সত্যি বলতে প্রণয়েরও মাথা ঘুরাচ্ছিল। ছোটো চাচি বললেন,

“গুনগুন, তোমার পছন্দের খাবার খুঁজে পেয়েছ?”

কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছের তরকারি, চিংড়ি দিয়ে করলা ভাজি আর রসুন ভর্তা গুনগুনের খুব পছন্দের খাবার। সে খুশিতে বাকবাকুম করছে। ওর প্লেটে সাদা ভাত। কারণ ও খাবে চিংড়ি আর ভর্তা আইটেম। প্রণয়ের প্লেটে সব জাঁকজমক খাবার-দাবার। ও গুনগুনকে খাইয়ে দিতে চাইলে গুনগুন বাঁধা দিয়ে বলল,

“উঁহু। আমি ভাত খাব। আপনি খান।”

প্রণয় তৎক্ষণাৎ কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ মন খারাপ করল। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে ওদেরকে রেস্ট নিতে বললেন চাচ্চু।

প্রণয় ও গুনগুনকে আলাদা রুম দেওয়া হয়েছিল। কুলসুম একা একা বোরিং ফিল করবে ভেবে গুনগুন মাসুদকে বলল,

“আপনি প্রণয়ের সাথে ঐ রুমে যান। আমি কুলসুম আপুর সাথে আছি।”

এ কথায় প্রণয়ের আরো রাগ হলো। কুলসুম আপুর জন্য খুব টান! দরদ একদম উতলে উতলে পড়ছে। এদিকে বরের জন্য মনে একটু দয়ামায়া, ভালোবাসা নেই। নিষ্ঠুর বউ!

বিকেলে কুলসুমের সাথে শুয়ে শুয়ে গল্প করছিল গুনগুন। তখন ওর কাজিন শালুক এলো ঘরে। সেজো চাচ্চুর মেয়ে সে। গুনগুনের এক বছরের ছোটো। কিন্তু বিয়ে হয়েছে আরো আগেই। পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে এখন ওর।

শালুককে দেখেই গুনগুন শোয়া থেকে উঠে বসল। বলল,

“আরে আমার শালু, বোস বোস। কতক্ষণ ধরে তোদের আশায় বসে আছি। কেউ তো এলি না একটাবার রুমে।”

এত বছর পর পুনরায় গুনগুনের কণ্ঠে ‘শালু’ ডাক শুনে শালুক একটু লজ্জা পেল। ছোটোবেলাতেও গুনগুন এভাবেই ওকে ‘আমার শালু’ বলে ডাকত। আজও গুনগুনের মনে আছে এটা! লজ্জাটুকু ঢাকতে পারল না শালুক। গুনগুন তখন ওর হাত ধরে বলল,

“কীরে তুই দেখি লজ্জা পাচ্ছিস!”

“বুবু! এতক্ষণ কেউ আসি নাই তুমি যদি বিরক্ত হও তাই।”

“বিরক্ত হবো কেন?”

“না মানে অনেক বছর পর আসলা গ্রামে। এখন তুমি কেমন আমরা তো জানি না। তাই ভয় পাইতেছিলাম।”

“বাকিরাও কি ভয়ে আসতেছে না?”

“হ। ভয়, লজ্জা দুইটাই।”

“হায় সর্বনাশ! শুনলে কুলসুম আপু? আমাকে কি এতটাই বাজে, ভয়ংকর লাগে?”

কুলসুম হাসছে। শালুক তড়িঘড়ি করে বলল,

“অ্যাই না, না বুবু! তুমি ভুল বুঝতাছ। তুমি আগের মতোই সুন্দর আছো। একদম পরির মতো।”

“হয়েছে, এখন আর তেল দিতে হবে না। বাকিদেরও ডাক।”

“তেল না। সত্যি বললাম। ওরা পরে আসব।
বুবু, তোমার কি ছোটোবেলায় সমেদ চাচার বাসার আম, পেয়ারা যে চুরি করতাম আমরা। মনে আছে?”

“অবশ্যই। তা আর বলতে? তাদের জাম্বুরা গাছটা নাই এখন?”

“আছে। কিন্তু জাম্বুরা এখনো কাচা। আম বড়ো হইছে। পেয়ারাও। চলো যাই আজ চুরি করি?”

গুনগুনের চোখ চকচক করে উঠল। হেসে বলল,

“ঠিক আছে। বাকিদের বলছিস?”

“হ, সবাই রাজি। ওরা তোমারে বলতে ভয় পাচ্ছিল। যদি তুমি রাজি না হয়ে উলটো ধমক দাও তাই। আমি তোমার এক বছরের ছোটো, প্রায় সমবয়সী তাই আমাকে পাঠিয়েছে তোমায় বলতে।”

“ধুর বোকা! বকব কেন? আর তোরা তো আমার ছোটো হয়েও বড়ো হয়ে গেছিস এখন। আমার আগেই বিয়েশাদি করে বাচ্চার মা হয়ে গেছিস সবাই।”

শালুক লজ্জা পেল কিছুটা। বলল,

“আব্বা গতকাল যখন ফোন দিয়ে বলল তুমি দেশে আসবা কী যে খুশি হইছি তখন! শ্বশুরবাড়ি হইল গৃহস্থ বাড়ি। এমন হুটহাট তো চলে আসা যায় না। বাবুর বাপেরে কত কষ্ট করে রাজি করাইছি জানো না। আমার মতো সবগুলা এরকম ছলচাতুরী করে আসছে তোমারে দেখব বইলা।”

গুনগুনের চোখদুটো আর্দ্র হয়ে উঠল। বুকে শীতল হাওয়া বইছে। সবাই ওকে কত ভালোবাসে। কিন্তু সবাইকে এতগুলো বছর দূরে ঠেলে রেখেছিল। ভেতরে ভেতরে আজ খুব অনুশোচনা হচ্ছে গুনগুনের।


সমেদ ভুঁইয়াদের বাড়ি নদীর দিকে। সবাই তাদের ডাকে ভুয়া সমেদ। এসব নিয়ে আগে সমেদ বাড়ির লোকজনদের সাথে কম ঝগড়া-ঝাটি হয়নি গ্রামের মানুষদের। কিন্তু এত বছরেও কিছুই পরিবর্তন হয়নি। এখনো সবাই ঐ বাড়িকে ভুয়া সমেদের বাড়িই বলে।

গুনগুনের দাদার বাড়ি থেকে ছয়, সাত মিনিটের পথ। নদীর পাড়ে যাওয়ার জন্য মেঠোপথ ধরে যেতে হয়। সোজাসাপ্টা যেতে চাইলে ধানখেত, গম খেতের আইল ধরে যেতে হয়। গুনগুন সোজা পথটাই বেছে নিয়েছে। চারদিকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর ঘ্রাণ। গুনগুন বুক ভরে শ্বাস নেয়। কতগুলো বছর পর আবার সব কাজিনরা একসাথে হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে এক লাফে দপ করে সবার বয়স কমে গিয়েছে।

টুম্পা বলল,

“বুবু, আগে যে আমরা গাঙপারে কলসি নিয়া কত ডুব দিতাম মনে আছে?”

গুনগুন হেসে বলল,

“হ্যাঁ, সাঁতার পারতাম না তো তখন আমরা।”

“এখন পারো?”

“না রে। তোরা পারিস?”

“হ। আমরা তো গ্রামেই থাকি তাই সাঁতার শিখে গেছিলাম।”

ওদের সাথে প্রণয়, মাসুদ আর কুলসুমও গ্রাম ঘুরতে বের হয়েছে। কিন্তু কুলসুম ছাড়া ওরা দুজন এটা জানে না যে ওরা আসলে আম চুরি করতে যাচ্ছে।

আমগাছের নিচে এসে গুনগুন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এখান থেকেই বাড়ির উঠানটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একবার ইচ্ছে করল গিয়ে দেখা করবে আসবে। পরে মনে পড়ল এভাবে খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না। আগামীকালও তো গ্রামেই আছে। কাল যাবে প্রণয়কে সাথে নিয়ে। আর কিছু মিষ্টি নিয়ে।

শালুক গুনগুনের কাঁধে হাত রেখে বলল,

“কী হইছে বুবু?”

গুনগুন সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলল,

“কিছু না।”

চম্পা বলল,

“তাইলে চলো শুরু করি।”

প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কী শুরু করার কথা বলছেন আপনারা?”

টুম্পা ও চম্পা জমজ বোন। ছোটো চাচ্চুর মেয়ে। ওরাও বিবাহিত। ওরা মুখ টিপে হাসছে। চম্পা বলল,

“দুলাভাই, আমরা এখন আম আর পেয়ারা চুরি করব।”

প্রণয়ের চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। মাসুদ মুখ হা করে তাকিয়ে আছে। শেষমেশ কিনা চুরির সাক্ষী হতে এসেছে ওরা! নিজেকে সামলে নিয়ে প্রণয় বলল,

“না, না। একদম না। এসব চুরি করা ভালো কাজ না। আপনাদের পেয়ারা, আম খেতে ইচ্ছে করছে? সমস্যা নেই। আমি বাজার থেকে কিনে দেবো।”

গুনগুন বলল,

“ধুর! কিনে খাওয়া আর চুরি করে খাওয়ার মধ্যে কি কোনো আনন্দ আছে নাকি? আর আমরা যদি এই বাড়িতে গিয়ে এখন বলি যে, আম খাব। ওনারা কিছুই বলবেন না।”

“তাহলে বলেই নাও।”

“ধ্যাত! তাহলে আর আনন্দ রইল কোথায়?”

“গুনগুন…”

“চুপ! আর কোনো কথা নয়। চুপচাপ দুজনে দুইগাছে উঠে পড়ুন।”

মাসুদ ঢোক গিলে বলল,

“দুইজন মানে?”

“আপনি আর প্রণয়। আপনি পেয়ারা গাছে উঠেন। আর প্রণয় আমগাছে।”

দুজনই একসাথে বলল,

“অসম্ভব!”

গুনগুন ইমোশোনাল ব্ল্যা’কমেইল করে বলল,

“আমার কথা রাখবেন না আপনারা? দুদিন পর তো চলেই যাব। এটুকু আবদারও ফেলে দেবেন?”

দুজনই এবার গলে গেল। মাসুদ বলল,

“হইছে। থাউক, কাইন্দো না। উঠতাছি গাছে।”

দুজনে দুই গাছে ওঠার পর বাকিরা ওড়না পেতে নিচে দাঁড়িয়ে রইল। শিমলা ও রুমি বড়ো চাচ্চুর মেয়ে। ওরা হেসে কুটিকুটি হয়ে বলল,

“খুব নাটক জানিস দেখছি।”

গুনগুন হাসল। বলল,

“তোমরা যে আসবা ভাবিনি কিন্তু। স্বাধীন ভাইয়া, হাসান, রবিন ওরা আগের মতো ছোটো থাকলে ওদেরও নিয়ে এসে গাছে উঠিয়ে দিতাম।”

সবার একযোগে হাসির শব্দ শুনে মনে হচ্ছে একদল কিশোরী অনেকদিন বাদে মন খুলে হাসছে। প্রণয় গাছে উঠছে আর ভাবছে, এভাবে দিন-দুপুরেও কেউ চুরি করে?

অনেকগুলো আম, পেয়ারা নেওয়ার পর হঠাৎ করে বাড়ির উঠান থেকে হাকডাক শোনা গেল,

“কে? কেডা ঐহানে? আমগাছে কেডা রে?”

বয়স্ক কণ্ঠস্বর শুনেই আম, পেয়ারা নিয়ে গুনগুন, কুলসুম, শালুক, টুম্পা, চম্পা, শিমলা ও রুমি ভোঁ দৌঁড় দিয়েছে। অসহায়ের মতো গাছে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয় ও মাসুদ।

সমেদ ভুঁইয়ার এখন বয়স হয়েছে। হাঁটতে পারেন না ভালোমতো। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়। বারান্দায় বসে থেকে তিনি ও তার স্ত্রী সুরমা বেগম সবই দেখেছেন। কিন্তু কিছু বলেননি। ওরা ছোটো থাকতে খুব বকতেন। অতিষ্ঠ হয়ে যেতেন ওদের অত্যাচারে। গুনগুন এত বছর পর গ্রামে এসেছে এই খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। খবরটা তাদের কানেও এসেছে। দূর থেকে গুনগুনকে দেখে চিনতে না পারলেও টুম্পা, চম্পা ওদেরকে চিনতে পেরেছিলেন। আর এটাও বুঝেছিলেন যে সাথে নিশ্চয়ই গুনগুনও আছে। ছোটোবেলায় ওদের লিডার গুনগুনই ছিল। মেয়েটা চলে যাওয়ার পর আম চুরির অত্যাচারও কমে গিয়েছিল। এরপর একে একে সবার বিয়ে হওয়ার পর ওরাও আর আসতো না। আজ এত বছর বাদে যখন হামলা করেছে তখন নিশ্চয়ই সাথে গুনগুন আছে।

তারা স্বামী-স্ত্রী বারান্দায় বসে হাসছিলেন আর দেখছিলেন ওদের কাণ্ডকারখানা। অনেক সময় পর প্রণয় ও মাসুদকে নামতে দেখে মিছেমিছি তাড়া দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,

“কে, কেডা ঐহানে?….”

ওমনি সবাই মাসুদ ও প্রণয়কে রেখে ভোঁ দৌঁড় দিয়েছে। ওরা দুজন তখনো গাছে ছিল। এদিকে সুরমা বেগমও চলে এসেছেন। ওপরে তাকিয়ে হেসে বললেন,

“নামো, নামো সমস্যা নাই।”

ওরা ভয়ে ভয়ে নামল। তিনি বললেন,

“তোমরা কারা? ওসমান গো বাসায় আইছ?”

প্রণয় ফাঁকা ঢোক গিলল। শ্বশুরবাড়ির মান-সম্মান বুঝি আজ খেল সে। বলল,

“জি।”

“তোমগো মধ্যে গুনগুনের জামাই কেডা?”

মাসুদ প্রণয়রে দেখিয়ে বলল

“ও।”

তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,

“মাশ-আল্লাহ্। আহো ভেতরে আহো। ডরাইও না। আমি আগেই দেখছি তোমাগো।”

প্রণয় একটু বিস্মিত হলো। জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে কিছু বললেন না যে?”

“কী কমু? বাচ্চা মানুষ তোমরা। আহো।”

মাসুদ প্রণয়কে খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বলল,

“দোস্ত বাড়িতে নিয়া আবার বাইন্ধা রাখব নাকি? আমি যামু না!”

সুরমা বেগম পেছনে ফিরে তাকাতেই প্রণয় হেসে মাসুদের হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল।


সবাই দৌঁড়ে একদম নদীর পাড়ে অনেকদূর পর্যন্ত চলে এসেছে। বিকেলে অনেকে গোসল করতে এসেছে। দুই, একটা নৌকা যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ ট্রলারও দেখা যাচ্ছে। সেদিকে দৃষ্টিপাত করে হাঁপাতে হাঁপাতে নরম সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়ল গুনগুন। ওর দেখাদেখি বাকিরাও পাশে বসল। নিজেকে স্থির করে গুনগুন উদাস হয়ে বলল,

“তোরা এভাবে আমার বরটাকে রেখে পালিয়ে এলি?”

“ইশ! সবার আগে তো তুমি পালাইছ বুবু।” বলল টুম্পা।

গুনগুন হকচকিয়ে বলল,

“তাই নাকি? তাহলে তো সর্বনাশ!”

“ক্যান? সর্বনাশ কীসের? দুলাভাই কি তোমারে বকব?” জানতে চাইল শালুক।

গুনগুন লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

“না রে! আমার সতিনের সাথে ঝগড়া লাগবে।”

সবার চক্ষু চড়কগাছ। রুমি বলল,

“সতিন মানে?”

কুলসুম তখন হেসে বলল,

“মাসুদের কথা বলতেছে। মাসুদ ওকে সতিন ডাকে।”

সবাই এখন খিলখিল করে হাসছে। গুনগুনের ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠল তখন। প্রণয় মেসেজ করেছে,

“ওগো আমার চোর বউ, কোথায় তুমি? প্রথমে করলে আমার মন চুরি। এখন আবার আমাকে দিয়েই করালে আম চুরি। শুনেছি, চোরে চোরে নাকি মাসতুতো ভাই হয়। কিন্তু আমরা তো হয়ে গেলাম চোরে চোরে স্বামী-স্ত্রী। দ্রুত বলো কোথায় আছো। নয়তো তোমাকে খুঁজতে এখন হারিকেনও চুরি করতে হবে।”

মেসেজ পড়ে গুনগুন শব্দ করেই হেসে ফেলল।

চলবে…

[ইদের ছুটি কাটিয়ে অনেকদিন পর গল্প নিয়ে এলাম। কেমন আছেন সবাই? সবার ইদ কেমন কাটল? অনেক অপেক্ষা করিয়েছি জানি। তবে অপেক্ষা আর বেশি দিন না। আর অল্প কয়েকটা পর্বেই গল্প শেষ হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ্। সবাই রেসপন্স করিয়েন।]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply