প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_৩১
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
আজকের আবহাওয়া বেশ নরম। শীতল বাতাস। রোদের তীব্রতাও কম। প্রণয় রেস্টুরেন্টে বসে ছিল। সকাল দশটা নাগাদ বেশ কিছু লোকজন এসে উপস্থিত হলো সেখানে। সবাইকে দেখে বেশ গণ্যমান্য ব্যক্তি মনে হচ্ছে। একজনকে একটু চেনা চেনাও লাগছিল কিছুটা। সাদা পাঞ্জাবি পরা অল্পবয়সী এক তরুণ জিজ্ঞেস করল,
“আপনিই তো প্রণয়?”
প্রণয় মাথা নাড়াল।
“জি।”
“আপনার সাথে আমাদের কিছু কথা আছে।”
প্রণয়ের বুঝে আসছে না অচেনা লোকগুলোর ওর সাথে কী কথা থাকতে পারে? তবে সে তৎক্ষণাৎ কোনো প্রশ্ন কিংবা পরিচয় জানতে চাইল না। কণ্ঠস্বর নরম করে একটা ফাঁকা টেবিল দেখিয়ে বলল,
“বসুন আপনারা।”
এরপর মাসুদকে খাবার দিতে বলে প্রণয়ও তাদের সবার সঙ্গে গিয়ে বসল। ওয়েটার এসে সবার জন্য খাবার দিয়ে গেল।
প্রণয়ের সামনে মোট ছয়জন লোক বসে আছে। একজনকে ওর বেশ ভারিক্কি ও বুদ্ধিদীপ্ত বলে মনে হলো। মাথার চুল কাচাপাকা। কম কথা বলা ও স্বাস্থ্য সচেতন লোক বলেই মনে হচ্ছিল। এই লোকটাকে কোথাও দেখেছে হয়তো!
“তোমার বিজনেস কেমন চলছে?”
লোকটার কণ্ঠস্বরও ভীষণ গম্ভীর। প্রণয় বলল,
“ভালো। কিন্তু আপনাদের তো চিনলাম না।”
“আমি রাশেদ তালুকদার। ১১ নং আসনের প্রাক্তন এমপি।”
প্রণয় বেশ অবাক হলো এবার। ওর থেকে কিছুটা দূরে মাসুদ দাঁড়িয়ে ছিল। সে রাজনীতি অত বোঝে না। কখনো এসবে আগ্রহও ছিল না। তাই রাশেদ তালুকদারকে চিনতেও পারেনি। কিন্তু এখন পরিচয় পেয়ে অবাক না হয়ে আর পারল না।
“আমার কাছে কী জন্য এসেছেন?” জানতে চাইল প্রণয়।
রাশেদ তালুকদার দীর্ঘশ্বাস নিলেন। একটু নড়েচড়ে বসে বললেন,
“কোনো কারণ ছাড়া তো আসিনি। কারণ নিয়েই এসেছি।”
“কারণটা কী?”
“তোমাকে টিভিতে দেখেছি। বেশ সাহসী এবং বুদ্ধিমান। আমার মেয়ে তো তোমার ভীষণ ভক্ত। অনেকের আইডলও তুমি এখন।”
হঠাৎ করে প্রণয়ের কাছে আসার আসল উদ্দেশ্য এখনো পরিষ্কার নয়। লোকটা কি কোনো ভনিতা করছে? প্রণয় কোনো প্রশ্ন করল না আর। নিরব থেকেই রাশেদ তালুকদারকে বলার সুযোগ দিল।
রাশেদ তালুকদার মেপে হাসলেন। বললেন,
“তোমার এই সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছে। এজন্যই তোমার কাছে এসেছি।”
“আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”
“ইলেকশনে দাঁড়িয়ে।”
মাসুদের চোঁয়াল ঝুলে যাওয়ার উপক্রম। প্রণয় অস্ফুটস্বরে বলল,
“মানে!”
“তোমাকে সবটা বুঝিয়ে বলছি। আমার পরিচয় তো তোমাকে প্রথমেই দিলাম। ১১ নং আসনে পরপর তিনবার এমপি হয়েছিলাম আমি। কিন্তু গত দুবার ইলেকশনে হেরে যাচ্ছি। তাসেরঘর পালটে গেছে। আমার প্রতিপক্ষ ইখতিয়ার উদ্দিন আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, উলটা-পালটা নিউজ বের করে জনগণের কাছে খারাপ করেছে। তারা এখন আর আমাকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এদিকে ইখতিয়ার উদ্দিনের আসল চেহারাও আমি সবার সামনে আনতে পারছি না। রাজনীতি আমার প্রাণ। আর জনগণও আমার প্রাণের একাংশ। তাদের ওপর ইখতিয়ার উদ্দিন যা জুলুম করছে, আমি সেসব সহ্য করতে পারছি না। মেনে নিতে পারছি না। এদিকে প্রমাণের অভাবে কিছু করতেও পারছি না। তাই আমি চাচ্ছি, ১১ নং আসনের হয়ে আসন্ন ইলেকশনে তুমি দাঁড়াও। প্রটোকল, টাকা-পয়সা, যত সাহায্য লাগে আমি করব। আমি থাকব তোমার পেছনে। তুমি শুধু ধ্বংস থেকে জনগণকে বাঁচাও।”
প্রণয় বিস্ময় নিয়ে বলল,
“কিন্তু আমিই কেন? আপনি অন্য কাউকে ইলেকশনে দাঁড় করান।”
“তোমার মতো সাহসী, বুদ্ধিমান এখনো পর্যন্ত আমি কাউকেই পাইনি। ইখতিয়ার উদ্দিনের প্রতিপক্ষ সবাই হতে পারবে না। কিন্তু তুমি পারবে। তোমার মধ্যে সেই দম আছে। তাছাড়া তুমি অনেকের প্রিয় মুখ, পছন্দের মানুষ। তাই তোমার জন্য ইলেকশন জেতা অনেক সহজ হয়ে যাবে।”
“কিন্তু রাজনীতি সম্পর্কে আমার যথেষ্ট আইডিয়া নেই।”
“সেসব তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও। আমি সব সামলে নেব।”
প্রণয় চুপ করে আছে। রাশেদ তালুকদার কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বললেন,
“এখনো হাতে অনেক সময় আছে। তুমি ভাবো। ভেবে তোমার সিদ্ধান্ত জানাও। কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। কিন্তু আমি আশা রাখব, তুমি আমার কথাগুলো একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখবে। আজ তাহলে উঠছি।”
রাশেদ তালুকদার তার লোকজন নিয়ে চলে যেতেই মাসুদ হুমড়ি খেয়ে পড়ল প্রণয়ের ওপর। উত্তেজিত হয়ে বলল,
“দোস্ত, তোর তো কপাল পুরা খুইলা গেছে। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পাইয়া গেছস।”
প্রণয় নিশ্চুপ। মাসুদ বলল,
“এত কী ভাবতেছস?”
“অনেক প্রশ্নই মাথায় আসছে।”
“মাথার ওপর এত প্রেশার না দিয়া রাজি হইয়া যা। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার এত বড়ো সুযোগ হাতছাড়া করিস না।”
প্রণয় ‘চ’ সূচক শব্দ করে বলল,
“তোর কাছে কি কোনো কিছু গণ্ডগোল মনে হচ্ছে না, মাসুদ?”
“কীয়ের গণ্ডগোল? সবকিছু ঠিক আছে। তুই যদি এই সুযোগ পায়ে ঠেলে অবহেলা করস তাইলে তুই একটা পাগল। এত না ভাইবা রাজি হইয়া যা।”
প্রণয় উঠে দাঁড়াল। প্যান্টের পকেটে দুহাত পুরে বলল,
“দেখি! গুনগুনকে বলি আগে।”
মাসুদও দাঁড়িয়ে বলল,
“তোর কি মনে হয় গুনগুন রাজি হইব?”
“জানিনা।”
“আমি জানি। আমি তোরে কইতাছি, ওয় জীবনেও রাজি হইব না। আর তোরে অনুমতিও দিব না। শুনতে তোর খারাপ লাগলেও সত্যি হইল যে, গুনগুন কোনোদিন চাইব না তুই ওর থেকে ওপরে থাকস। ওয় তোরে বিয়াই করছে এইজন্য যে, ওয় যেন তোরে আঙুলের ইশারায় নাচাইতে পারে। এইযে তুই ওরে বিদেশ যাইতে দিতাছস, তুই মিলাইয়া নিস ওয় তোরে নিয়া যাইব না। আর নিজেও কোনোদিন দেশে ফিরে আসব না। তাই তোর ভালোর জন্যই বলতেছি, গুনগুনরে নিজের করে রাখার জন্য হইলেও রাশেদ তালুকদারের প্রস্তাবে রাজি হইয়া যা। তুই এমপি হইয়া গেলে তখন গুনগুন আর তোরে ছাড়ব না। ক্ষমতার মোহ কার না থাকে বল?”
.
.
মরিচ ভর্তা, ডালের চচ্চরি, বেগুন ও ইলিশ মাছ ভেজেছে আজ গুনগুন। সাথে গোরুর মাংসের কালাভুনা। এগুলো সব প্রণয়ের পছন্দের খাবার। হাত-মুখ ধুয়ে এসে প্রণয় খেতে বসল। এতসব আয়োজন দেখে খুশি হয়ে বলল,
“এতকিছু আজ?”
“হু। আপনার জন্য।”
“মরিচ ভর্তা পাটায় বানিয়েছ?”
“হ্যাঁ। ব্লেন্ডারের ভর্তা মজা লাগে না।”
“তাহলে ভর্তা বানানোর কী দরকার ছিল? হাত জ্বলবে না?”
“না! গ্লাভস পরে নিয়েছিলাম।”
প্রণয় মুচকি হাসল। গুনগুনের হাত ধরে পাশের চেয়ারে বসিয়ে বলল,
“কিন্তু আজ এত আয়োজন কেন? বিশেষ কিছু?”
“উঁহু! আগামী সপ্তাহে আইইএলটিসের এক্সাম দেবো। অনেক অনেক দু’আ দরকার আমার। তাই একটু স্বামীর সেবাযত্ন করছি আরকি! বেশি বেশি দু’আ করবেন কিন্তু।”
প্রণয় জোরপূর্বক হাসল। বলল,
“প্রিপারেশন ডান?”
“হুম। দুই মাস যথেষ্ট সময়। অনেক পরিশ্রম করেছি এই দুইটা মাস। এবার সবকিছু ভালোই ভালো হয়ে গেলে আলহামদুলিল্লাহ্।”
প্রণয় ছোটো করে বলল,
“হুম।”
ভাত মেখে গুনগুনকে খাইয়ে দিতে দিতে নিজেও খাচ্ছিল। মাথায় ঘুরছিল মাসুদের বলা কথাগুলো। রাশেদ তালুকদারের বিষয়টা গুনগুনকে ডিরেক্ট বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না।
“কিছু ভাবছেন আপনি?” মুখের ভাতটুকু গিলে জিজ্ঞেস করল গুনগুন।
প্রণয় সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলল,
“হু? না! ভাবছি যে, অবশেষে তাহলে তোমার স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে?”
“কাইন্ড অব! এখনো তো অনেক কাজ বাকি। একটু ভয়ও লাগছে। শেষে গিয়ে কোনো গড়মিল না হলেই হয়। অবশ্য আমার কনফিডেন্স আছে, আমি পারব ইন-শা-আল্লাহ্। তাছাড়া আপনি তো আমার সাথে আছেন, পাশে আছেন। তাই না?”
প্রণয় নিশ্চুপ। এখনো সে রাশেদ তালুকদারের কথা ভাবছে। গুনগুন বলল,
“কী হলো? আছেন তো আমার পাশে?”
প্রণয় ম্লান হেসে বলল,
“হু, হু। অবশ্যই।”
একটু থেমে বলল,
“গুনগুন, তুমি রাজনীতি বোঝো?”
“কিছুটা। কেন?”
“এমনিই। অনেকের তো রাজনীতি নিয়ে অনেক আগ্রহ থাকে। তোমার নেই?”
গুনগুন চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,
“আই হেইট পলিটিক্স! বিশেষ করে বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতিকে আমি খুবই অপছন্দ করি।”
“রাজনীতি যারা করে তাদেরকেও অপছন্দ করো?”
“আমার তো আর কারো সাথে ব্যক্তি-দ্বন্দ্ব নেই। তাছাড়া সবাই যেমন ভালো না, তেমনই সবাই তো খারাপও না। ভালো কেউ না কেউ তো অবশ্যই আছে। তাই এভাবে আসলে বলা যায় না যে, আমি সবাইকে অপছন্দ করি। তাছাড়া আমার পছন্দ কিংবা অপছন্দে কী-ই বা আসে যায়? আমি তো শুধু আমার স্বামী ইফতেখার প্রণয় রেহমানকে পছন্দ করি।”
প্রণয় ম্লান হেসে গুনগুনের আনন্দে ঝলমল করা মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর হাসিমাখা মুখ দেখে রাশেদ তালুকদারের বিষয়টিও প্রণয় চেপে গেল গুনগুনের থেকে।
চলবে…
[বিঃদ্রঃ গল্প দিতে এত লেইট কেন, জিজ্ঞেস করিয়েন না। আপনাদের রেসপন্স দেখে আমি হতাশ! আগেই বলেছিলাম, আপনারা যেমন রেসপন্স করবেন লেখকের কলমও তেমনই চলবে। তবে যা-ই হোক, যারা নিয়মিত রেসপন্স করেন তাদের জন্য হলেও আমি অবশ্যই গল্পটা শেষ করব। হয়তো সময় লাগবে, কী আর করার! এবং ০৯-১৫ তারিখ পর্যন্ত আমার মিডটার্ম পরীক্ষা। এই কয়েকদিন গল্প পাওয়ার সম্ভাবনা একদম ক্ষীণ।]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১১
-
তুষারিণী পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (১ম অংশ)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১২
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক