Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৭


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_১৭

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


ঘড়ির কাটায় সকাল নয়টা বাজে। আধো আধো দৃষ্টিতে গুনগুন চোখ মেলে দেখে ঘরটা খুব শান্ত। আলো নেই রুমে। জানালার পর্দা টেনে দেওয়া। গুনগুন হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে ফোন নিয়ে সময় দেখল। এরপর হাই তুলে উঠে বসে রইল কিছুক্ষণ। ঘুম ঘুম ভাবটা কাটার পর গুনগুন আবার ফোন হাতে নিয়ে দেখল, হোয়াটসএপে প্রণয় মেসেজ পাঠিয়ে রেখেছে।

“আমি টিউশনিতে যাচ্ছি। সকালের নাস্তা বানিয়ে রেখেছি। তুমি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিও। কোনো কাজ করতে হবে না। আর ইম্পোর্ট্যান্ট কোনো ক্লাস না থাকলে ভার্সিটিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। রেস্ট নাও। আমি দুপুরের মধ্যে চলে আসব। ভালোবাসি।”

গুনগুন মেসেজটা পড়ে মৃদু হাসল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই রুমটা আলোয় আলোকিত হয়ে গেল। খেয়াল করে দেখল পড়ার টেবিলের ওপর খাবার ঢেকে রাখা। ঢাকনা সরিয়ে দেখতে পেল পাউরুটি ডিম দিয়ে ভেজেছে, আলাদা ডিম সেদ্ধ। প্লেটের পাশেই আপেল, কমলা কেটে রাখা। আর গ্লাসে দুধ। দুধ অবশ্য এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেছে।

গুনগুন গোসল করে এসে আগে খেয়ে নিল। শরীর খুব দুর্বল লাগছে। দুধ গরম করার মতোও এনার্জি নেই। এই সময়ে প্রথম দুদিন তার অবস্থা খুবই নাজেহাল থাকে। তবুও সে টিউশনি করাত, ক্লাস করত। নিজের কাজগুলো নিজেই করত। আজ ক্লাস আছে। যাবে কিনা বুঝতে পারছে না। পরে মনে হলো, আজ থাক। কাল থেকে ক্লাসে যাবে।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে গুনগুন চুপ করে বসে আছে। সময়ও কাটছে না। ফোন দেখতেও ভালো লাগছে না। একা বাড়িতে আরো বেশি একা একা লাগছে। প্রণয়ের অনুপস্থিতি তার ভালো লাগছে না। গুটিসুটি হয়ে বালিশে মাথা রাখতেই প্রণয়ের কল এলো। রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রণয় বলল,

“সরি।”

গুনগুন ভ্রু কুঁচকাল। জিজ্ঞেস করল,

“সরি কেন?”

“কথা রাখতে না পারার জন্য।”

“কোন কথা?”

“এইযে বলেছিলাম, তিনবেলাই তোমাকে খাইয়ে দেবো। কিন্তু সকালে তুমি এত আরাম করে ঘুমাচ্ছিলে যে আমার ডেকে তুলতে ইচ্ছে করেনি। তার ওপর তোমার শরীরটাও ভালো না। তাই আর ডাকিনি।”

গুনগুন নিচু স্বরে বলল,

“সমস্যা নেই।”

“কী করছ?”

“শুয়ে আছি। আপনি?”

“আমি টিউশন শেষ করে বের হলাম। এখন আরেকটা টিউশনে যাচ্ছি। তুমি ক্লাসে যাবে না?”

“না।”

“শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?”

“না। একা একা বোরিং লাগছে।”

“মিস করছ নাকি আমায়?”

“মোটেও না!”

“বুঝি বুঝি। মুখে স্বীকার না করলেও সব বুঝি।”

“দুই লাইন বেশিই বোঝেন মনে হচ্ছে।”

প্রণয় হেসে বলল,

“বউয়ের থেকে অবশ্য বেশি বুঝি না। আচ্ছা শোনো, আমি বাড়ির সামনে চলে এসেছি। রাখছি এখন। তুমি বিশ্রাম নাও।”

“ঠিক আছে।”

“লাভ ইউ।”

“হেইট ইউ।”

প্রণয় হেসে বলল,

“চলবে।”

প্রণয় কল কেটে দিয়ে সাদা রঙের বিল্ডিংটার দুই তলায় গেল। কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলেন হাসিনা বেগম। প্রণয়কে দেখে হেসে জিজ্ঞেস করলেন,

“আরে, এতদিন পর কোত্থেকে এলে?”

প্রণয় বলল,

“সরি, আন্টি। একটু ব্যস্ত ছিলাম। তাই কিছুদিন আসতে পারিনি। সমস্যা নেই, আমি অফডে তে পড়িয়ে দেব।”

“ঠিক আছে, যাও। হিয়া রুমেই আছে।”

প্রণয় যে দুটো টিউশন করায় দুটোই তার এলাকার বাইরে। কারণ নিজের এলাকাতে সে বখাটে, গুণ্ডা নামে পরিচিত। ফুডকোর্ট চালাতে পারলেও কেউ তাকে অন্তত টিউশনি দেবে না। তাই সে টিউশনি করার জন্য দূরের এলাকা বেছে নিয়েছে। এখানে যারাই তাকে চেনে শান্ত, ভদ্র হিসেবেই চেনে।

প্রণয়ের দুটো টিউশনের স্টুডেন্ট দুটোই মেয়ে। একটা ক্লাস ফাইভে পড়ে, যাকে প্রণয় সকালে পড়ায়। আরেকটা ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। ওকে পড়ায় দুপুরের আগ দিয়ে। নাম হিয়া। খুব চঞ্চল ধরনের। আর এক নাম্বার ফাঁকিবাজ। প্রণয় ওকে ইংলিশ আর আইসিটি পড়ায়। মাসে দশ হাজার পায় এখানে। টাকার অংক বেশি বলে ধৈর্য ধরে হিয়াকে পড়ায় সে।

প্রণয়কে দেখেই হিয়া খুশি হয়ে গেল। আনন্দিত কণ্ঠে বলল,

“আসসালামু আলাইকুম, স্যার। কেমন আছেন?”

প্রণয় হিয়ার সাথে মেপে মেপে কথা বলে। যতটা সম্ভব দূরত্ব মেইনটেইন করে। পড়ার বাইরে কোনো কথাও বলে না। কিন্তু হিয়ার পড়তে ভালো লাগে না। ওর আউট টপিক নিয়ে কথা বলতেই বেশি ভালো লাগে। বিশেষ করে প্রণয়কে নিয়ে ওর অনেক বেশি কৌতুহল।

প্রণয় গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“ওয়া আলাইকুমুস-সালাম। বই বের করো।”

“আসতে না আসতেই বই বের করো! আপনি এমন কেন?”

হিয়া নিয়মিত ক্লাস করে না। এজন্যই মূলত ওকে দুপুরের সময় পড়াতে পারে প্রণয়। হিয়াকে এমন উতলা হতে দেখে প্রণয় বলল,

“এরমধ্যে আর ক্লাসে গিয়েছিলে?”

“হুম। একদিন।”

“নোট নিয়েছ?”

“ছবি তুলে এনেছি।”

“শুধু ফোনে ছবি তুলে রাখলে হবে? খাতায় লিখোনি কেন?”

“লিখব পরে। আগে আপনি বলেন, এই কয়দিন আসেননি কেন?”

“ব্যস্ত ছিলাম।”

“কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন?”

প্রণয় ধমক দিয়ে বলল,

“তোমার এত কিছু কেন জানতে হবে? চুপচাপ বই বের করো।”

হিয়ার মুখের রং বদলে গেছে। চুপসে যাওয়া মুখটা নত করে সে বই-খাতা বের করছে। প্রণয় বলল,

“যেগুলো ছবি তুলে এনেছ সেগুলো আজকে রাতের মধ্যে লিখে ফেলবে।”

হিয়ার চোখ টলমল করছে। প্রণয়ের দিকে তাকাচ্ছে না। রুদ্ধশ্বাসে বলল,

“আচ্ছা।”

গলা ধরে এসেছে হিয়ার। প্রণয় ওকে আইসিটির ম্যাথ বুঝাচ্ছিল। হিয়ার চোখ থেকে টুপ করে তখন দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল সাদা খাতার ওপর। প্রণয় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কাঁদছ কেন তুমি?”

হিয়া এবার কান্না করতে করতে বলল,

“আপনি সবসময় আমার সাথে এরকম খারাপ আচরণ করেন কেন?”

প্রণয়ের মেজাজ খারাপ হচ্ছে। কিন্তু মেজাজ দেখাল না সে। রাগ কন্ট্রোল করে বলল,

“আমার কাজ তোমাকে পড়ানো। পড়িয়ে চলে যাব। তোমাকে পড়াতেই আসি। গল্প করতে না।”

“একটু গল্প করলে কী হয়?”

প্রণয় বিরক্ত হয়ে বলল,

“দেখো হিয়া, তুমি যদি এরকম বাচ্চামো করো সবসময় তাহলে কিন্তু আমি আর তোমাকে পড়াব না।”

হিয়া চোখের পানি মুছে বলল,

“সরি।”

পুরো দুই ঘন্টা ভয়ে হিয়া আর কোনো বাড়তি প্রশ্ন করেনি। চুপচাপ পড়েছে। হাসিনা বেগম এর মাঝে একবার এসে নাস্তা দিয়ে গিয়েছেন। প্রণয় অবশ্য খায়নি। গুনগুন কী খেয়েছে না খেয়েছে তা তো সে জানে না। পড়ানো শেষ করে প্রণয় উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে বলল,

“নোটগুলো খাতায় তুলে রেখো।”

হিয়া ব্যস্ত হয়ে বলল,

“স্যার, নাস্তা করলেন না?”

“না। তুমি খেয়ে ফেলো।”

“বসেন। একসাথে খাই আর একটু গল্প করি। এখন তো পড়ানো শেষ। গল্প করলে কি সমস্যা আছে?”

“ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে। তোমাকে দেখে প্রবাদটা মনে পড়ে গেল।”

হিয়া হেসে বলল,

“স্যার, এই কয়দিন কেন আসেননি?”

“বিয়ে করেছি তাই। আর কিছু?”

“আপনি ম্যারিড?”

“হ্যাঁ। যাচ্ছি।”

প্রণয় চলে যাওয়ার পর হিয়া বিড়বিড় করে বলল,

“মিথ্যুক!”

.
.

কলিংবেলের শব্দ শুনে দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল গুনগুন। এতক্ষণ বাসায় একা থেকে সে হাঁপিয়ে গিয়েছিল। এত তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেওয়ার জন্য প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এতক্ষণ দরজা ধরেই দাঁড়িয়ে ছিলে নাকি?”

গুনগুন মুখ গোমড়া করে বলল,

“না। কেন?”

“যেভাবে সাথে সাথে দরজা খুলে দিলে! নিশ্চয়ই উড়ে উড়ে এসেছ?”

“বাজে কথা না বললে পেটের ভাত হজম হয় না আপনার?”

“ভাত তো খাইনি এখনো। হজম হবে কীভাবে? বাহির থেকে নিয়ে এসেছি দুপুরের খাবার। অবশ্য ভাত না। বিরিয়ানি এনেছি।”

রুমে যেতে যেতে গুনগুন বলল,

“এত বাইরের খাবার খেলে চলবে? অনেক টাকা নষ্ট করেছেন এরমধ্যে। ঘরে বাজার নেই দেখলাম। বাজার করেন না কেন?”

প্রণয় চোখ পাকিয়ে বলল,

“তুমি এই অবস্থায় রান্না করতে গিয়েছিলে নাকি?”

“এই অবস্থায় মানে কী? আমি প্রেগন্যান্ট না। পিরিয়ড হয়েছে। প্রতি মাসেই হয়। খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা।”

প্রণয় বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,

“তোমাকে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় দেখার ভাগ্য মনে হয় না আমার আছে।”

“ভালো কোনো কথা আপনার মুখে আসে না?”

“আসে। কিন্তু তোমার সাথে খারাপ কথা বলতেই আমার বেশি ভালো লাগে।”

গুনগুন বিরক্ত হয়ে চুপ করে রইল। প্রণয় হাসছে। ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার নিয়ে এলো প্লেটে করে। গুনগুনকে খাইয়ে দিতে দিতে বলল,

“কী করলে সারাদিন?”

মুখের খাবারটুকু চিবিয়ে গুনগুন বলল,

“কী আর করব? বসে বসে বোরিং হয়েছি।”

“তোমাকে কিছু বই কিনে দেবো।”

“কেন?”

“যখন বাসায় একা থাকবে তখন পড়বে। তোমার তো উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে।”

“আপনি কী করে জানেন?”

“তোমার রুমে বই ভরতি বুকশেলফ দেখেছিলাম।”

“আপনি কতকিছু নোটিশ করেছেন?”

“সব।”

গুনগুন পানি পান করে বলল,

“আর খাব না।”

“আর একটু খাও।”

“না, পেট ভরে গেছে। শুনুন, বিকেলে আজ দোকানে যাবেন না?”

“হ্যাঁ। বেচারা মাসুদের ওপর অনেক চাপ পড়ে যাচ্ছে।”

“বাজার করতে হবে না?”

“হবে।”

“আমিও আপনার সাথে বাজারে যাব।”

“কেন?”

“বাজার করতে। একটু হাঁটতেও পারব। সারাদিন এভাবে বাসায় থাকলে দম আটকে ম’রে যাব আমি। কাল থেকে ক্লাসেও যাব ভাবছি।”

“ঠিক আছে।”

“আর বাসায় রান্নাও করব।”

“না। আগে সুস্থ হও।”

“আমি তো সুস্থই।”

“উঁহুম! পুরোপুরি সুস্থ হও আগে।”

গুনগুন কয়েক সেকেন্ড নিরব থেকে বলল,

“আপনার কি এখন আমাকে ঘেন্না লাগছে?”

প্রণয় বিস্ময় নিয়ে বলল,

“পাগল তুমি? ঘেন্না আর তোমায়? লিসেন গুনগুন, আমি তোমার পায়ের পাতায় চুমুও খেতে পারব। আর তুমি যেই বিষয় নিয়ে কথাটা বললে সেটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তুমি, আমি দুনিয়ায় আসতে পেরেছি এইজন্যই। মেয়েদের আমি আলাদা রেসপেক্ট করি এজন্যই যে, ওরা সারাজীবন কতটা কষ্ট করে! সেখানে তুমি তো আমার বউ।”

গুনগুন কিছু বলল না। কিন্তু প্রণয়ের কথাগুলো তার ভীষণ ভালো লেগেছে। সে আড়চোখে প্রণয়কে দেখছিল বারবার। প্লেট ধুয়ে রেখে এসে, প্রণয় টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে বলল,

“খুব টায়ার্ড লাগছে।”

“রেস্ট নিন। ঠিক হয়ে যাবে।”

“বালিশটা মনে হচ্ছে খুব শক্ত। তাই না গুনগুন?”

“কোথায়? দুইটা বালিশই তো খুব নরম।”

“তাই? তাহলে আমার মাথা বোধ হয় বালিশের সাথে এডজাস্ট করতে পারছে না। তোমার কোল চাচ্ছে। আমি কি তোমার কোলে একটু মাথা রাখতে পারি?”

ইদানীং গুনগুনের কী যে হয়েছে! আগের মতো আর রাগ করতে পারে না। উলটো প্রণয় কাছে এলে, রোমান্টিক কিংবা দুষ্টু কোনো কথা বললে সে লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়। মুখে তখন আর কিছুই বলতে পারে না। এইযে এখনো বলতে পারছে না। গুনগুনকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রণয় বলল,

“তোমার নিরবতাকেই কি সম্মতির লক্ষণ ধরে নেব?”

গুনগুন লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়াল। কিছুটা বিব্রতবোধও করছে সে। প্রণয় এগিয়ে এসে গুনগুনের কোলে মাথা রাখল। চোখ বন্ধ করে বলল,

“আহ্! কী শান্তি! মায়ের পরে বউয়ের কোলেই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি শান্তি লাগে।”

গুনগুন কিছু বলল না। প্রণয় ঘুমিয়ে পড়েছে। গুনগুনের চোখে ঘুম নেই। সে ফোন চাপছে। ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করছে। হঠাৎ করে তখন তার দৃষ্টি যায় ঘুমন্ত প্রণয়ের মুখের দিকে। কী আরাম করে, শান্তিতে গুনগুনের কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। গুনগুন মৃদু হাসল। ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে কী মনে করে যেন প্রণয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।


ঘুম থেকে উঠে বিকেলে দুজনে বাজারে এসেছে। বাড়ির জন্য আর দোকানের জন্য বাজার করতে। কাচা শাক-সবজি কিনে প্রণয় গুনগুনকে বলল,

“তুমি বাইরেই দাঁড়াও। আমি মাছ আর মাংস কিনে আনি।”

গুনগুন বলল,

“আমিও আসি?”

“না। মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারবে না। আর পচা পানি তোমার পায়ে লাগবে। তুমি এখানেই থাকো।”

“ঠিক আছে। বাজারগুলো আমার কাছে দিয়ে যান।”

প্রণয় বাজারের ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে আশেপাশে তাকাচ্ছে। কিছু খুঁজছে সে। গুনগুন জিজ্ঞেস করল,

“কী খুঁজছেন?”

প্রণয় জবাব না দিয়ে একটা খালি ভ্যান ডেকে থামাল। জিজ্ঞেস করল,

“মামা, ভ্যানে যাত্রী নেন?”

ভ্যানচালক হেসে বললেন,

“নেই মামা। কিন্তু এহন তো কেউ আর ভ্যানে উডে না।”

“আচ্ছা আমার বউ আপনার ভ্যানে বসে থাকবে কিছুক্ষণ। আমি মাছ, মাংস কিনে আনব। সময় অনুযায়ী আপনাকে ভাড়া দিয়ে দেবো।”

“আইচ্ছা।”

গুনগুন ফিসফিস করে বলল,

“এসবের আবার কী দরকার?”

“দরকার আছে। এমনিই তুমি অসুস্থ। পেইন হচ্ছে পেটে? বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে যদি অসুস্থ হয়ে যাও?”

“আরে কিছু হবে না।”

“চুপ করে বসো।”

বলে প্রণয় নিজেই গুনগুনকে ভ্যানের ওপর বসিয়ে দিল। বাজারের ব্যাগগুলোও রেখে সে দোকানে গিয়ে পানির বোতল আর চিপস কিনে আনল। গুনগুনের হাতে দিয়ে বলল,

“খাও বসে বসে।”

ভ্যানচালককে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বলল,

“চাচা, আপনি চা খান বসে। আর আমার বউকে দেখে রাইখেন। আমি এসে ভাড়া দেবো।”

“আইচ্ছা মামা।”

প্রণয় চলে যাওয়ার পর ভ্যানচালক হেসে বললেন,

“মামা মনে হয় আপনেরে খুব ভালোবাসে তাই না, আম্মা?”

গুনগুন জবাবে মুচকি হাসল।

“চা খাইবেন আম্মা?”

“না, চাচা। আমি চা খাই না। আপনি খেয়ে আসুন। আমি আছি এখানেই।”

“আইচ্ছা। আমি তাইলে আইতাছি চা খাইয়া।”

গুনগুন মাথা নাড়াল। বাজারে কত মানুষ! কেউ কেউ গুনগুনকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। আবার কেউ কেউ তাদের মতো বাজার করতে ব্যস্ত। গুনগুন যেখানে ভ্যানের ওপর বসা তার পেছনেই একটা ক্যারাম বোর্ডের দোকান। অনেক উঠতি বয়সের ছেলেপেলেরা ওখানে বসে সিগারেট খাচ্ছে, ক্যারাম খেলছে। গুনগুনকে দেখে ওরা উলটা-পালটা মন্তব্যও করছে। রাগে-জিদ্দে গুনগুনের শরীর জ্বলছিল।

ভ্যানচালক ততক্ষণে চা খেয়ে ফিরে এসেছে। গুনগুন বলল,

“চাচা, ভ্যানটা ঐ সাইডে নিয়ে যান তো।”

“ঐদিকে তো রোদ।”

“সমস্যা নেই। আপনি যান।”

এখান থেকে সরে যাওয়ার পর ছেলেগুলোর হাসাহাসি বাড়তে থাকে। দারুণ মজা পাচ্ছে ওরা। গুনগুনকে নিশ্চুপ দেখে ওরা কয়েকজন সাহস দেখিয়ে এগিয়ে এলো। পাশের একটা সবজির দোকানে দাঁড়িয়ে দোকানদারকে বলল,

“কাকা, লেবু, শসা আছেনি?”

গুনগুন স্পষ্ট বুঝতে পারছে, ওকে জ্বালাতেই ওরা এসেছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বসে আছে গুনগুন। পাশ থেকে তখন আরেকটা ছেলে গুনগুনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মামা, শরীলডা দেখছস? মোম একটা।”

আরেকজন বলল,

“আমরা তাইলে আ’গু’ন। চাইলে গলাইয়া দিতে পারি।”

গা ঘিনঘিন করছে গুনগুনের। ভ্যানচালকও বুঝতে পারছেন যে, ছেলেগুলো গুনগুনকে উত্যক্ত করছে। তাই তিনি ধমক দিয়ে বললেন,

“ঐ ফাউল পোলাপাইন, মাইয়্যা মানুষ দেখলেই উলটা-পালটা কথা কইতে মন চায়?”

ছেলেগুলো ক্ষেপে তেড়ে এলো। ভ্যানচালকের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

“ঐ কী বললি তুই? কী হইছে তোর? জ্ব’লে ক্যা তোর?”

গুনগুন আর রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে, ভ্যান থেকে নেমে ছেলেটার কলার ধরে ঠাঁটিয়ে থা’প্প’ড় বসিয়ে দিল গালে। আশেপাশে যারা ছিল তারা সবাই আহম্মক হয়ে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা রাগে-ক্ষো’ভে গালে হাত দিয়ে গুনগুনের দিকে তাকিয়ে আছে। গুনগুন অ’গ্নি’মূ’র্তি ধারণা করে বলল,

“জা’নোয়ারের বাচ্চাগুলা! রাস্তায় জন্ম নিছিস নাকি প’তি’তালয়ে? ভালো ঘরের সন্তান হলে তো একটা মেয়েকে নিয়ে এসব আজেবাজে কথা বলতে পারতি না। বাবার বয়সী কারো গায়ে হাতও তুলতে পারতি না।”

ছেলেটা ক্ষেপে বি’শ্রি একটা গালি দিল গুনগুনকে। গুনগুনের কাছে এগিয়ে আসার সময় প্রণয় সেখানে চলে আসে। পাশে এক লোক আখের রস বিক্রি করছিল। বাজারগুলো ফেলে প্রণয় ভ্যানগাড়ি থেকে দুইটা আখ একসাথে নিয়ে এলোপাথাড়ি ছেলেটাকে পি’টা’তে লাগল। পাশের ছেলেগুলো এগিয়ে এলে ওদেরও ইচ্ছেমতো পে’টা’ল। আশেপাশের লোকজনও তখন সাহস পেয়ে ছেলেগুলোকে বেধড়ক পে’টা’তে থাকে। যেই ছেলেটা গুনগুনকে গা’লি দিয়েছিল ওকে ভিড়ের মধ্যে থেকে টেনে এনে, মুখে ইচ্ছে মতো ঘু’ষি দিতে দিতে প্রণয় বলল,

“কু’ত্তা’র বাচ্চা, বা’স্টা’র্ড এই মুখ দিয়ে আমার বউকে তুই গা’লি দিছিস না? তোর এই মুখটাই আজ আমি ভে’ঙে ফেলব। আয়নায় নিজেকে যতবার দেখবি, তুই নিজেই ভয় পাবি।”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply