প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_১৬
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি ঠিক করছিল গুনগুন। প্রণয় তখন রুমে এসে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি রেডি? চলো তাহলে বের হই আমরা।”
“হুম, রেডি। কিন্তু কোথায় যাব আমরা?”
“যেদিকে দুচোখ যায়।”
“না। চলুন আম্মুর কাছে যাই।”
“আম্মুর কাছে কেন?”
“দেখা করব।”
“দেখা করার জন্য ঐ বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আম্মুকে বললে আম্মুই আসবে।”
“আমি ঐ বাড়ির সবার সাথেই দেখা করব। আপনার বাবার সাথেও।”
“দরকার নেই গুনগুন। উনি কথা বলবেন না তোমার সাথে।”
“কেন?”
“আমার সাথেই তো কথা বলে না।”
“আপনি কখনো বলার চেষ্টা করেছেন?”
প্রণয় কিছুক্ষণ নিরব থেকে বলল,
“না।”
“কেন?”
“উনি আমাকে পছন্দ করেন না। তাই ওনাকেও আমার পছন্দ না।”
“আচ্ছা দেখি,আমাকে পছন্দ করে কিনা।”
“তুমি শুধু শুধু জেদ করছ কেন?”
“জেদ না। আবদার করছি। রাখবেন না?”
প্রণয় রাগ করতে গিয়েও পারে না। গুনগুনের সাথে রাগ দেখালে সে নিজেই পরে কষ্ট পাবে। এদিকে গুনগুনও নাছোড়বান্দা। প্রণয় দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। চলো। তবে আবার বলতেছি, শুধু আম্মুর সাথে কথা বলে আমরা চলে আসব। ঐ লোকের সাথে কথা বলার দরকার নেই।”
“হুম। ওকে।”
ঐ বাড়িতে যাওয়ার আগে মিষ্টি আর কিছু ফলমূল কিনে নেয় দুজনে। যাওয়ার আগে পমিলা বেগমকে কোনো খবরও জানাতে দেয়নি গুনগুন। তাই দুজনে যখন কোনো বলা-কওয়া ছাড়াই বাড়িতে উপস্থিত হলো, তখন পমিলা বেগমের চক্ষু চড়কগাছ। তিনি খুশি হয়েছেন এবং কিছুটা অস্বস্তিবোধও করছেন। তার স্বামী শোয়েব শিকদার বাড়িতে। গুনগুন যদি কোনোভাবে অপদস্থ হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি খারাপ তার-ই লাগবে।
পমিলা বেগম অস্বস্তিবোধ লুকিয়ে গুনগুনকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“তোমরা আসবে আমাকে আগে বলোনি কেন? তাহলে তো একসাথেই আসতে পারতাম। বিপ্লব আমাকে কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে দিয়ে গিয়েছে।”
গুনগুন হেসে বলল,
“বলে দিলে কি আর সারপ্রাইজ থাকত?”
“হুম, তাও ঠিক। এসো ভেতরে এসো।”
শোয়েব শিকদার ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছিলেন এবং পত্রিকা পড়ছিলেন। গুনগুনকে তিনি চিনেন না। তবে প্রণয়ের সাথে দেখে আন্দাজ করতে পারলেন যে, এটা প্রণয়ের বউ। ওর বিয়ের কথা পমিলা বেগমের কাছেই শুনেছিলেন। নিজে যাননি, তবে পমিলা বেগমকেও যেতে নিষেধ করেননি।
পমিলা বেগম অস্বস্তি ও ভয় নিয়ে স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন,
“উনি আমার স্বামী, প্রণয়ের বাবা।”
শোয়েব শিকদার ভ্রু কুঁচকালেন। মুখটা গম্ভীর করে বললেন,
“আমি প্রণয়ের বাবা নই। সায়েম ও প্রীতমের বাবা।”
প্রণয় হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁত কিড়মিড় করছে তার। পমিলা বেগম অস্বস্তিতে গাট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একমাত্র গুনগুনই স্বাভাবিক আছে। সে হাসিমুখে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, সায়েম ও প্রীতমের বাবা। আমি গুনগুন। প্রণয়ের বউ।”
সম্বোধন শুনে বিরক্ত হলেন শোয়েব শিকদার। চোখে-মুখে সেই বিরক্তিভাব ফুটিয়ে বললেন,
“এসব কী ধরনের বেয়াদবি?”
“বেয়াদবি? আপনিই তো বললেন আপনি সায়েম, প্রীতমের বাবা। প্রণয়ের বাবা যেহেতু নন, সেহেতু আপনাকে তো বাবা ডাকার অধিকারও নেই আমার।”
শোয়েব শিকদার উঠে দাঁড়ালেন। তিনি স্বল্পভাষী কিন্তু মেজাজি মানুষ। রেগে গেলে রাগ কন্ট্রোল করতে পারেন না। এখনো পারছেন না। কিন্তু গুনগুনকেও তিনি কিছু বলতে পারছেন না। তাই রাগে গজগজ করতে করতে রুমে চলে গেলেন।
প্রণয় গুনগুনকে বলল,
“চলো। চলে যাই।”
পমিলা বেগম বললেন,
“কেন? দুপুরে খেয়ে-দেয়ে তারপর যাবি।”
প্রণয় ‘না’ বলার আগেই গুনগুন বলল,
“হ্যাঁ। খেয়ে যাব। আজ আমি রান্না করব।”
“এসবের কোনো দরকার নেই গুনগুন। আম্মুকে নিয়ে গিয়ে আমাদের বাসায় রান্না করে খেও।”
“না, আমি এখানেই রান্না করব। আপনি চুপ করে বসে থাকুন।”
পমিলা বেগম বললেন,
“তোমার রান্না করতে হবে না, মা। রান্না করার লোক আছে।”
“থাকুক। একটা দিন রান্না না হয় আমি করি?”
“শুধু শুধু কষ্ট…”
“কষ্ট না। আমি ভালোবেসেই রান্না করব।”
“আচ্ছা চলো, আমি তোমাকে সাহায্য করছি।”
প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“আমি একা একা কী করব?”
“তুই টিভি দেখ।” বললেন পমিলা বেগম।
বউ-শাশুড়ি মিলে রান্নাঘরে গিয়ে কাজে লেগে গিয়েছে। পমিলা বেগম কাটাকাটিতে সাহায্য করছেন। তখন গুনগুন জিজ্ঞেস করল,
“আম্মু, সায়েম ও প্রীতম ভাইয়া সম্পর্কে তো প্রণয় আমাকে কিছু বলেনি।”
“বলেনি? সায়েম তোমার বড়ো, তোমার আব্বুর প্রথম স্ত্রীর ছেলে। প্রীতম তোমার ছোটো হবে। ও আমার পেটে হয়েছে।”
“দেখলাম না তো কাউকেই।”
“সায়েম ঘুমাচ্ছে এখনো। প্রীতম হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে।”
“ওহ আচ্ছা।”
“গুনগুন।”
“হুম?”
“তুমি ওনার ব্যবহারে কষ্ট পেও না। উনি এমনই বদরাগি। ছোটোবেলা থেকে মা ছাড়া বড়ো হয়েছে তো। নমনীয়তা শেখেনি। আমার শ্বশুরও অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ছেলেকে তেমন সময় দিতে পারতেন না।”
গুনগুন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“আমরা সব দুর্ভাগা কীভাবে যে একসাথে হয়ে গেলাম!”
“এভাবে বোলো না। তুমি নিঃসন্দেহে ভাগ্যবতী।”
“হ্যাঁ, এখন হয়েছি। প্রণয়ের মতো স্বামী পেয়েছি, আপনার মতো মা পেয়েছি, কুলসুম আপুর মতো বড়ো বোন, বিপ্লব ভাইয়ার মতো বড়ো ভাই,মাসুদ ভাইয়ার মতো শ’ত্রু পেয়েছি ভাগ্য সহায় না হয়ে কোথায় যাবে বলেন?”
পমিলা বেগম হাসলেন। গুনগুন বলল,
“দেখি এখন সায়েম ভাই ও প্রীতমের বাবাকে বাবার মতো পাই কিনা!”
তিনি হেসে বললেন,
“দেখা যাক!”
রান্নাবান্না শেষ করে গুনগুন শোয়েব শিকদারকে ডাকতে গেল। দরজায় নক করে বলল,
“আসব?”
শোয়েব শিকদার দরজার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,
“না।”
গুনগুন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“ধন্যবাদ।”
“আমি তোমাকে ভেতরে আসতে নিষেধ করেছি। তুমি আসলে কেন?”
“ছোটোবেলায় আব্বু ডানে যেতে বললে, আমি বামে যেতাম। বামে বললে, ডানে। যা বলত তার উলটো করতাম। এখনো তা-ই করি।”
“আমি তোমার আব্বু নই।”
“সেটাই। এজন্যই তো মেয়ের কদর বোঝেন না। ভেবেছিলাম, আপনার মেয়ে হবো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মা হতে হবে।”
শোয়েব শিকদার একটু থমকালেন। মায়ের কথা উঠলে তিনি নিশ্চুপ হয়ে যান। আবেগি হয়ে পড়েন। কথা বলতে পারেন না। এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছে গুনগুন। এতক্ষণ সে এই বাড়ির সবার সম্পর্কে জেনে নিয়েছে পমিলা বেগমের থেকে।
“চলুন, খাবেন।” বলল গুনগুন।
তিনি মুখ ভার করে বললেন,
“না। তুমি যাও।”
“আপনার মা রান্না করেছে, খাবেন না?”
তিনি এবার গুনগুনের মুখের দিকে তাকালেন। কী মিষ্টি মুখ! তার অনেক ইচ্ছে ছিল একটা মেয়ের। সায়েম হওয়ার পর তার প্রথম স্ত্রী আবার কনসিভ করেছিল। সেইবার মেয়ে এসেছিল পেটে। তিনি ভীষণ খুশি ছিলেন। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় ছিল না। ডেলিভারির সময় মা-মেয়ে দুজনই মা’রা যায়। সেই শোক-ও তিনি আজ পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অনেক বছর পর দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। পমিলা বেগমও ছেলে জন্ম দিলেন। শোয়েব শিকদার আশা ছেড়ে দিলেন। রুষ্ট হয়ে গেলেন নিজের জীবন নিয়ে। কিন্তু ছেলেদের সাথে তার সম্পর্ক সবসময়ই ভালো। কারো সামনে তিনি এই আক্ষেপ প্রকাশ করেন না। কিন্তু হঠাৎ করে এই মেয়েটা এসে সব ক্ষ’ত জাগিয়ে তুলছে।
শোয়েব শিকদারকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে গুনগুন কোমরে হাত গুঁজে বলল,
“উঠছেন না কেন?”
শোয়েব শিকদার এবার হেসে ফেললেন। ছোটোবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে গিয়েছে। একবার সে বৃষ্টির মধ্যে কাদামাটি মাখিয়ে খেলছিল মাঠে। তখন তার মা ছাতা নিয়ে তাকে আনতে গিয়েছিল। তিনি ভয়ে কাছে আসেননি, পাছে মা আবার তাকে মা’রে! বারবার ডাকার পরও যখন তিনি কাছে বাসায় যেতে রাজি হচ্ছিলেন না, তখন তার মা-ও ঠিক এভাবেই কোমরে হাত গুজে বলেছিল, ‘আসছিস না কেন? আসবি না তুই?’ পুরনো সোনালি স্মৃতি চোখের দৃশ্যপটে ভেসে উঠতেই তিনি আবেগি হয়ে উঠলেন। চোখজোড়া টলমল করছে, কিন্তু ঠোঁটে স্মিত হাসি।
গুনগুন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। হকচকিয়ে বলল,
“হাসছেন কেন?”
হুঁশ ফিরতেই হাসি সংযত করলেন শোয়েব শিকদার। মুখটা ফের গম্ভীর করে বললেন,
“ক্ষুধা নেই আমার। তুমি যাও।”
“আপনি না গেলে আমিও যাব না। এখানেই বসে থাকব।”
“দেখো আমার এত কথা বলতে ভালো লাগে না। বিরক্ত হচ্ছি আমাকে।”
“আমিও আপনাকে বিরক্ত করতে বিরক্ত হচ্ছি। খেয়ে এসে তারপর পত্রিকা পড়ুন।”
একটু থেমে ফের বলল,
“ঠিক আছে। আমি চলে যাচ্ছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে যদি আপনি না আসেন তাহলে ধরে নেব, আপনার মাকে আপনি ভালোবাসেন না।”
গুনগুন চলে যাওয়ার পর হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন তিনি।
ডাইনিং টেবিলে প্রণয়ে, সায়েম ও পমিলা বেগম বসে আছে। পমিলা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“আসলো না?”
গুনগুন হতাশ হয়ে বলল,
“না!”
“থাক মন খারাপ কোরো না। বাদ দাও।”
এরপর সায়েমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও গুনগুন, প্রণয়ের বউ। আর সায়েম হলো আমার বড়ো ছেলে।”
গুনগুন সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুমু, ভাইয়া।”
সায়েম মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ওয়া আলাইকুমুস-সালাম।”
ডাইনিং রুমে সবাই এখন চুপচাপ। পমিলা বেগম গুনগুনকে খাইয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ শোয়েব শিকদার এলেন। তবে পাঁচ মিনিটের মধ্যে নয়। পাঁচ মিনিট পরেই। এসে চুপচাপ চেয়ার টেনে বসলেন। গুনগুন মুখ টিপে হাসছে। বাকিরা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
“কী দেখছ সবাই এভাবে? খেতে দাও।” গম্ভীর হয়ে বললেন শোয়েব শিকদার।
পমিলা বেগম ভাত, গরুর মাংস তুলে দিলেন স্বামীর প্লেটে। মাংসর তরকারিতে লবণটা বেশি হয়েছে। গুনগুন জানে, এই ভুলটা অবশ্যই অবশ্যই ধরবেন তিনি। তবুও জিজ্ঞেস করল,
“রান্না কেমন হয়েছে?”
শোয়েব শিকদার এক শব্দে বললেন,
“ভালো!”
নিরব স্বীকারোক্তি। কোনো অভিযোগ নেই। পমিলা বেগম একটু অবাকই হলেন। খাওয়ার টেবিলে আর কোনো কথা হয়নি কারো সাথে।
প্রণয় ও গুনগুন বিদায় নেওয়ার সময় শোয়েব শিকদারের থেকে বিদায় নিতে গেল। প্রণয় যায়নি। ও ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে আছে। গুনগুন পমিলা বেগমের সাথে রুমে গেল।
গুনগুন দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনাকে আজ বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। যাচ্ছি আমি।”
“দাঁড়াও।”
শোয়েব শিকদার উঠে এলেন। বালিশের নিচ থেকে এক হাজার টাকার দশটা নোট বের করে আনলেন তিনি। রুমে এসেই আলমারি থেকে বের করে রেখেছিলেন। গুনগুনের হাতে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“রাখো। আমার তরফ থেকে গিফ্ট। কিছু কিনে নিও।”
গুনগুন খুশি হলেও কিছু বলল না। শ্বশুরের মন যে কিছুটা গলেছে বুঝতে পেরেছে সে। গুনগুন পিঞ্চ মেরে বলল,
“এই টাকা আমি নেব না। আপনি তো আর প্রণয়ের বাবা না।”
“কারো বাবা হয়ে দেইনি। কে যেন বলেছিল, আমার মা হতে চায়। তার ছেলে হয়ে দিয়েছি।”
গুনগুন বিস্ময়ে হতবাক। পমিলা বেগম তো কেঁদেই ফেললেন। গুনগুনের কান্না পেলেও সে কাঁদল না। কান্না গিলে বলল,
“এই মায়ের বাসায় ছেলের দাওয়াত রইল। আসছি।”
ফিরে আসার পথে রিকশায় বসে গুনগুন এসব গল্প করছিল। প্রণয় গম্ভীর হয়ে শুনছিল প্রথমে। পরে বলল,
“তুমি কি মায়ার জাদু জানো?”
“মানে?”
“এইযে কীভাবে যেন সবাইকে মায়ার টানে বেঁধে ফেলো।”
গুনগুন জবাব দিল না। হাসল শুধু।
.
.
প্রণয় কিছুদিন গুনগুনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে বলে মাসুদের ওপর দায়িত্ব পড়েছে ফুডকোর্ট চালানোর। ওর অবশ্য মন্দ লাগছে না। রান্নাবান্না করাও একটা আর্ট। এই কয়দিনে মাসুদও সেই আর্ট শিখে ফেলেছে।
রাতে কুলসুমের বাসায় ডিনারের দাওয়াত ছিল। তাই প্রণয় আর গুনগুনকে রান্না করতে হয়নি। রাতে খেয়ে-দেয়ে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে গুনগুনরা নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে আসে। রাত হলেই গুনগুনের ভয় করে। গতকালের ভয়টা আবার এসে উদয় হয়েছে। গতকাল না হয় ঘুমের অজুহাত দিয়েছিল। কিন্তু আজ? কী বলবে সে?
গুনগুন পেটে হাত দিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। হঠাৎ করে বিকেল থেকেই পেটটা কেমন যেন ব্যথা করছে। প্রণয় ফ্রেশ হয়ে এসে গুনগুনকে অন্যমনস্ক দেখে জিজ্ঞেস করল,
“কী ভাবছ?”
গুনগুন হকচকিয়ে বলল,
“কই? কিছু না তো।”
“মুখটা এরকম শুকনো লাগছে কেন? কী হয়েছে?”
“কিছু না। পেট ব্যথা করছে হঠাৎ।”
“খুব বেশি? মেডিসিন নিয়ে আসব?”
“না, ঠিক হয়ে যাবে।”
“আচ্ছা। লাইট নেভাব?”
গুনগুন ফাঁকা ঢোক গিলে বলল,
“ইচ্ছে।”
“নিভিয়ে দিলাম। লাইট থাকলে আমার ঘুম হয় না।”
গুনগুন বিড়বিড় করে বলল,
“শা’লা ঘুমানোর ধান্দা নাকি অন্যকিছুর ধান্দা বুঝি তো আমি।”
প্রণয় লাইট নিভিয়ে এসে বলল,
“কিছু বললে?”
গুনগুন কাটকাট গলায় বলল,
“না।”
প্রণয় বালিশ ঠিক করে মাথা রাখল। গুনগুন তখনো বসে থাকে। প্রণয় বলল,
“এখনো পেট ব্যথা করছে?”
“একটু একটু।”
“হাত বুলিয়ে দেবো?”
গুনগুন হকচকিয়ে বলল,
“কী!”
প্রণয় নিজেও ভড়কে গেল নিজের বোকা বোকা প্রশ্ন শুনে। আমতা আমতা করছে এখন। কোনো কথা বলতে পারছে না। গুনগুন চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“পেট ব্যথা করলে পেটে হাত বুলিয়ে দেয় কে?”
প্রণয় থতমত খেয়ে বলল,
“সরি। ভুলে বলে ফেলছি। তুমি শুয়ে পড়ো। ঠিক হয়ে যাবে। আর না হলে বলো মেডিসিন নিয়ে আসি।”
“না, লাগবে না।” বলে গুনগুন পাশে শুয়ে পড়ল।
ভয়ে কাঠ হয়ে শুয়ে আছে গুনগুন। প্রণয়ের ঘুম আসছে না। বারবার এপাশ-ওপাশ করছে। গুনগুন বুঝতে পেরেও কোনো কথা বলছে না। মুখ খুললেই বিপদ। এর থেকে ভালো মুখে কুলুপ এঁটে শুয়ে থাকা।
নিরবতা কাটিয়ে প্রণয় বলল,
“বউ, একটু ধরি?”
গুনগুন এবার শুধু অবাকই হলো না, ভয়ে লাফিয়ে উঠে বসল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
“কীহ্!”
“ইয়ে মানে…তোমার হাতটা একটু ধরি?”
“আপনার এত কুমতলব কেন বলুন তো? একটু আগে পেট ধরার বাহানা খুঁজছিলেন। এখন আবার হাত ধরতে চাচ্ছেন। আপনার মতলবটা কী হ্যাঁ? আর কত নিচে নামবেন আপনি?”
প্রণয়ও উঠে বসল। মাথা চুলকে বিড়বিড় করে বলল,
“বেশি নিচে না!”
গুনগুন ধমক দিয়ে বলল,
“বিড়বিড় করছেন কেন? জোরে কথা বলুন।”
“কী বলব? বউকে একটু ধরতে চাইলে সেটা কুমতলব হয় কীভাবে? তুমি আমার কবুল বলা হালাল বউ। আমাদের সম্পর্ক হালাল। তোমাকে যদি স্পর্শ করি সেটাও হালাল স্পর্শ-ই হবে।”
“আপনার হালাল স্পর্শ আপনার কোলে নিয়ে ঘুমান।”
“কোলে নিলে তোমাকেই নেব।”
“রাত-বিরাতে মেজাজ খারাপ করবেন না।”
“তুমি এমন করো কেন?”
“কারণ আমি এমনই। এখন ঘুমাব। একদম জ্বালাবেন না।”
গুনগুন শুয়ে পড়ার পর প্রণয়ও মন খারাপ করে শুয়ে পড়ল। গুনগুন চায় না ওর সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করতে। কিন্তু সে নিজেই বা কী করবে? কোনো সম্পর্ক তো হুট করেই তৈরি করা যায় না। হতে পারে দুজনে কাগজে-কলমে স্বামী-স্ত্রী। দুজনের বৈধ সম্পর্ক আছে। প্রণয়ের অধিকার আছে ওর ওপর। কিন্তু গুনগুন তো অসহায়। মনের কানেকশন ব্যতীত একটা মানুষের সাথে ইন্টিমেট হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার একটু সময়ের প্রয়োজন। শরীরের থেকেও মনের মিল হওয়াটা বেশিই প্রয়োজন তার কাছে।
গুনগুন যখন এত শত ভাবছিল প্রণয় তখন গুনগুনকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“সরি। দূরে থাকতে পারছি না।”
গুনগুনের পুরো শরীর যেন বরফ হয়ে গেল মুহূর্তেই। শরীর শিরশির করছে। সে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। গুনগুন এবার প্রণয়ের হাতে জোরে খাঁমচি দিল। প্রণয় প্রথমে কিছু বলল না। মিনিট খানেক পর হঠাৎ করে গুনগুনের ওপর শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কৈ মাছের মতো লাফাচ্ছ কেন মেয়ে? আমার শক্তির সাথে পারবে তুমি?”
গুনগুনের সকল জারিজুরি শেষ। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। অন্ধকারের মধ্যে প্রণয়ের মুখটা আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। সেই চোখে-মুখে প্রচণ্ড তেজ। গুনগুন ঘাবড়ে যায়। প্রণয় গুনগুনের ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে বলল,
“গতকাল ঘুমের ভান ধরে ছিলে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছ, লা’ত্থি দিয়েছ সব বুঝেও কিছুই বলিনি। আজ অন্তত বাঁধা দিও না।”
গুনগুনের ছোট্ট শরীরটা থরথর করে কাঁপছে।তিরতির করে কাঁপছে তার কোমল ঠোঁটজোড়া। ফাঁকা ঢোক গিলে কাঁপান্বিত কণ্ঠে বলল,
“ওয়াশ…ওয়াশরুমে যাব।”
প্রণয় মুখ তুলে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী?”
গুনগুন ফের ঢোক গিলে, কণ্ঠে জোর এনে বলল,
“ওয়াশরুমে যাব একটু।”
প্রণয় সরে গিয়ে বলল,
“যাও।”
গুনগুন উঠে এক দৌঁড়ে ওয়াশরুমে চলে এলো। যেই ভয়টা পেয়েছিল, তা-ই হয়েছে। তবে গুনগুন এজন্য ভীষণ খুশি। সবসময় পিরিয়ড হলে সে বিরক্ত হতো। কিন্তু আজ খুশি লাগছে। মনে মনে বলল,
“বাঁচলাম! অন্তত কিছুদিন কোনো যু’দ্ধ করা লাগবে না।”
মনে মনে খুশি হলেও চেহারায় তা প্রকাশ পেতে দিল না। মুখটা কাচুমুচু করে রুমে এসে লাইট জ্বালাল। প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“লাইট জ্বালালে কেন?”
গুনগুন কাচুমুচু হয়ে বলল,
“একটু ফার্মেসিতে যান।”
প্রণয় উঠে বসল। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“পেট বেশি ব্যথা করছে?”
“উঁহু! পিরিয়ড হয়েছে। প্যাড লাগবে।”
প্রণয় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
“অ্যাঁ! সত্যিই?”
গুনগুন এবার রাগি চোখে তাকাল। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“তা নয়ত কি মিথ্যে বলছি?”
“হতে পারে এটা তোমার কোনো নতুন নাটক।”
“আশ্চর্য! এখন কি আপনাকে প্রমাণ দিতে হবে?”
প্রণয় জিভে কা’ম’ড় দিয়ে বলল,
“না। তার প্রয়োজন নেই। তোমার মুখের কথাই আমার বিশ্বাস করার জন্য যথেষ্ট।”
এরপর বিছানা থেকে উঠে গায়ে শার্ট জড়িয়ে প্রণয় নিচে নামল ফার্মেসিতে যাওয়ার জন্য। স্বগতোক্তি করে বলল,
“বেচারা প্রণয়, তুই উপোষ-ই থাক। তোর বউ-ভাগ্য খারাপ। না বউয়ের আদর নিতে পারবি, আর না বউকে আদর করতে পারবি। সারা জীবন উপোষ করেই কাটাতে হবে। পো’ড়া কপাল!”
চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১০
-
তুষারিণী পর্ব ৭
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (১ম অংশ)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬