Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭৩


প্রণয়ের_রূপকথা (৭৩)

দেওয়ান বাড়ি পরিষ্কার করা চলছে। পুরো ঝকঝকে তকতকে যাকে বলে। আরেক দিকে চলছে রান্না বান্না। কুহু সকাল থেকে ছুটোছুটি করছে। এটা সেটার তদারকি করছে। এত উচ্ছাস ওর মাঝে, দেখা গেল গ্লাস সেট নিয়ে একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস দীপ্র হাতটা টেনে ধরল।

“ধীরে, কী করছিস তুই?”

কুহু চোখ তুলে মেকি হাসল। বলল,”না মানে, অনেক দিন পর রাত্রিপু আসছে তো।”

বিয়ের পর পুরো একটা মাস রাত্রি ছিল শ্বশুরবাড়িতে। একটা দিনের জন্যও আসতে পারেনি। রাত্রির বেড়ে ওঠা এই বাড়িতেই। কুহুর সাথে ভাব বরাবরই বেশি। সেই জন্যই কি না মেয়েটিকে ছাড়া একটা মাস, কুহুর খুব কষ্টে গেল। অবশ্য আরো কষ্ট লাগত যদি না ওর স্কুল থাকত। দশদিন হয়েছে ও স্কুলের চাকরিটা নিয়েছে। সেটা নিয়েই ব্যস্ততা। তার পাশাপাশি নিজের ক্লাস তো আছেই। আজ অবশ্য ছুটি নিয়ে রেখেছে। দীপ্র কিছু সময় চেয়ে রইল। তারপর বলল,”ঠিক আছে। সাবধানে, আজকাল খুব ছুটোছুটি হচ্ছে।”

“জি, জি।”

বলে মাথা ঝাঁকাল ও। দীপ্র কথা না বাড়ি নিজের পথে ফিরল। কুহু গ্লাস সেট নিয়ে রাখল টেবিল। তারপর গলা ছেড়ে ডাকল,”বড়ো মা, আমি কি গ্লাস গুলো সাজিয়ে ফেলব?”

রান্না ঘরে দুই গিন্নি ও সালমা কাজ করছেন। আবিদা অবশ্য এসবে নেই। সে খুব ভালো ভাবে জানিয়ে দিয়েছে এসব কাজে সে থাকবে না। তাকে কেউ জোর ও করেনি। সে থাকুক তার মতন। জেবা হাত মুছতে মুছতে বললেন,”সাজিয়ে ফেল কুহু। ওরা প্রায় চলেই এসেছে।”

চলে আসার খবর পেয়ে কুহুর মন আরো নেচে উঠল। ও দ্রুত সাজিয়ে গুছিয়ে রাখল টেবিলে। এদিকে কণা সোফা সেটে বসে ফোনের দিকে মনোযোগ দিয়ে আছে। মাঝে মাঝে হাসছে। কুহু ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,”কী হয়েছে রে? ওভাবে হাসছিস কেন?”

“কই কি, এমনি হাসছিলাম।”

বলে পাশ কাটাল কণা। কুহু কয়েক সেকেন্ড থেমে রইল। তারপর বলল,”হাতে হাতে কাজ করলেও তো পারিস। আজকাল বড়ো অকাজের হয়ে গেছিস।”

কণা উঠে এলো ব্যস্ত পায়ে। বলল,”কী করতে হবে?”

“সাথে আয়।”

বলে এগিয়ে গেল কুহু। ওর পেছন পেছন গেল কণাও। তবে বোনকে ফাঁকি দিয়ে, ফোনে নজর দিতেও ভুল হলো না তার।

রাত্রিরা চলে এসেছে। কুহু সবার আগে, প্রায় ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। বোনের পিঠে হাত বুলিয়ে রাত্রি বলল,”আরে পাগল, ছাড়। দম বন্ধ করে মে রে ফেলবি নাকি?”

ওর কথায় হাসল কুহু। পরপরই ভ্রু নাচিয়ে বলল,”বাহ, এখন তো আমি জড়িয়ে ধরলে দম বন্ধ লাগবেই। জড়িয়ে ধরার মানুষ তো এসেই গেছে।”

এ কথায় ঠোঁট টিপে হাসল রাত্রি। নিচু হয়ে বলল,”তা মানছি।”

“বেশ তো। এত খানি কাবু করে ফেলেছে। আমি তো ভেবেছিলাম তুমিই বরং কাবু করবে রাত্রিপু।”

ফের হাসে রাত্রি। বলে,”না রে। আমি কাবু করতে পারিনি। তবে সত্যিই কাবু হয়ে গেছি। মেয়েরা এমনই। কাবু করতে গিয়ে কাবু হয়ে যায়।”

ওদের কথার মাঝেই বাড়ির বড়োরা চলে আসে। সবাইকে সাথে নিয়ে প্রবেশ করে বাড়ির ভেতরে।

কণা গিয়ে নিয়ে এসেছে দাদিজানকে। বৃদ্ধা আজকাল বড়োই শান্ত হয়ে গেছেন। শরীরে শক্তি প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। তিনি অতিথিদের সাথে টুকটাক কথা শুরু করলেন। বাকিরা চলল নাশতা পানির ব্যবস্থা করতে। কুহুও যেতে নিচ্ছিল। রাত্রি এসে হাত টেনে ধরল। বলল,”কোথায় যাস? কত কথা জমে আছে। আয় তো।”

দুই বোন ফের আড্ডায় মজল। ফোনে টুকটাক কথা হোতো তাদের। খুব বেশি না। রাত্রিও নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কুহু ও নিজের জীবন নিয়ে। দেখা যেত টাইম মিলত খুব কম। আহামরি কথা বলার সুযোগই হোতো না। কথায় কথায় রাত্রি বলল,”দীপ্র ভাই আর এসেছিল?”

কথার মানে বুঝল না কুহু। ও চেয়ে রইল ওভাবেই। রাত্রি হতাশ হওয়ার মতন শ্বাস ফেলল। হাত ছুঁয়ে বলল,”বলতে চাচ্ছি, তোরা আর এক সাথে থেকেছিস?”

এ কথায় কুহু পাশ ফিরে গেল। কি এক লজ্জা ওকে ছুঁয়ে গেল। রাত্রি বলল,”লজ্জা পাচ্ছিস কেন? বল, থেকেছিস কি না।”

কুহু মাথা নাড়িয়ে না বোঝাল। রাত্রি বলল,”কেন? আর কত দূরে থাকবি তোরা?”

কুহুর জবাব আসে না। ও বলে,”আমি কি জানি?”

“তুই এই বিষয়ে বলিস নি কিছু?”

“কী বলব?”

“কী বলবি মানে? একসাথে থাকার কথা বলবি।”

কুহুর গলা শুকিয়ে আসে। ও বলবে এ কথা? প্রশ্নই আসে না। ওর চোখ মুখ দেখেই বুঝে যায় রাত্রি। গাল ছুঁয়ে বলে,”আমি বলব?”

“না।”

“কেন? একসাথে থাকতে ইচ্ছে করে না?”

কুহুর নজর নামিয়ে ফেলে। ওর মুখটা তুলে ধরে রাত্রি। হেসে বলে,”চোখ কিন্তু সব বলে দিচ্ছে।”

কুহু লজ্জা পায়। ওর থাকতে ইচ্ছে করে। দীপ্র ভাইকে জড়িয়ে সমস্ত রাত পার করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এ কথা ও কীভাবে বলবে?

দুপুরের খাওয়ার পর, বিকেলে সবাই বসেছিল আড্ডা দিতে। দীপ্র বাহিরে গিয়েছিল। এলো মাত্রই। গলার জোর বাড়িয়ে ডাকল,”কুহু।”

কুহু মাথা তুলে চায়। দেখে দীপ্র ভাইকে। কালো রঙের একটি শার্ট পরে আছে। ফর্সা শরীরে দারুণ মানিয়েছে। এই লোককে কালোয় এত মানায় যে চোখ সরানো মুশকিল হয়। তারপর কুহু ভাবে সাদা রঙের কথা। সাদাতেও তো মানায়। ফের ভাবে অন্য রঙ গুলোর কথা। উফ, সব রঙেই তো মানায়! কি মসিবত। কুহু ভাবতে পারে না আর। দীপ্র ফের বলে,”কফি দিতে পারবি?”

কুহু মাথা দোলায়। পরপরই ওঠে যায় আড্ডা থেকে। কড়া এক কাপ কফি বানিয়ে আসে দীপ্রর ঘরের সামনে। দরজার কাছে আসতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে। পুরো এক মাস ধরে দীপ্র ভাইও ব্যস্ত। কুহুও দশদিন ধরে চাকরি নিয়ে পড়ে আছে। সব মিলিয়ে দেখা হওয়া কমে গেছে। কমে গেছে ঘনিষ্ঠতা। কুহু খেয়াল করে দেখে রাত্রিপুর বিয়ের পর, দীপ্র ভাই একবার ও তাকে জড়িয়ে ধরেনি। একবার ও চুমু খায়নি। একটি বারের জন্যও না। কুহু দরজা ঠেলে প্রবেশ করে। সে শব্দে তাকায় না দীপ্র। সে কাজ করছে। আজকাল একটু বেশিই কাজ করে মানুষটা।

“কফি।”

মনোযোগ পেতে বলল কুহু। দীপ্র না তাকিয়েই বলল,”হুম।”

“কোথায় রাখব?”

“এদিকে নিয়ে আয়।”

দীপ্রর দিকে আগায় কুহু। কফি তুলে নেয় ও। চুমুক বসায়। তারপর বলে,”ভালো হয়েছে।”

“আচ্ছা।”

বলে ও পা বাড়াতেই দীপ্র বলে,”শোন।”

কুহুর পা থামে। দীপ্র কফি কাপ রেখে কুহুর বরাবর এসে দাঁড়ায়। লম্বাটে দীপ্রর বুক বরাবর নজর ঠেকে কুহুর। শার্টের বোতাম কয়েকটা খোলা। যার দরুণ বুকটা দেখা যাচ্ছে। কুহু নজর ফেরায় দ্রুত। দীপ্র নীরবতা ভেঙে বলল,”রাত্রি বলল, তুই নাকি এক সাথে থাকতে চাচ্ছিস।”

এ কথায় আকাশ থেকে পড়ল কুহু। দ্রুত অন্যপাশ ফিরে বলল,”কই, না তো।”

“থাকতে চাচ্ছিস না?”

এবার ও আটকাল। দীপ্র হাত বাড়িয়ে ওকে নিজের দিকে ফেরাল। কুহুর নজর মাটিতে তখনো। দীপ্রই থুতনি ধরে উঁচু করল। তারপর দেখতে লাগল পুরো মুখশ্রী। ওর ব্যস্ততা মেয়েটিকে দেখার সুযোগই দিচ্ছে না। দীপ্রর হতাশ লাগে। ও ক্লান্ত ভাবে বলে,”সত্যিই থাকতে চাস না?”

কুহুর বুকের ভেতরটা কেমন করে। ও কথা বলতে পারে না। দীপ্র ফের বলে,”কুহু।”

মেয়েটির হৃদয় ভেঙে আসে। ও এবার পাল্টা শুধায়,”আপনি কি চান?”

দীপ্র হাসে। এই হাসিতেও খানিকটা ক্লান্তি মিশে। ওর গলাটা মোলায়েম হয়। বলে,”আমি যা চাই, তাই হবে?”

কুহু মিনমিনে ভাবে জবাব দেয়,”বলেন, শুনি আগে।”

দীপ্র জবাব দেয় না। বরং কাছে এগোয়। অনেকটা কাছে এগোয়। যতটা কাছে এলে নিমিষেই বুকে মাথা দেয়া যাবে। কুহু আর সইতে পারে না। মাথাটা নামিয়ে আনে দীপ্রর বুকে। দীপ্রর অধরে হাসি যোগ হয়। আদুরে ভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,”আমরা খুব দ্রুত একসাথে থাকব কুহু। খুব দ্রুত একসাথে থাকব। ঠিক সেদিনটার মতন। অনেক বেশি ভালোবাসব জান। অনেক বেশি ভালোবাসব।”

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply