Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৮


প্রণয়ের_রূপকথা (৫৮)

দীপ্রর হাত খানা ব্যান্ডেজ করে দিল রাত্রি। বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে। ওর খুব হতাশ লাগে।
“তুমি যে কী করো দীপ্র ভাই।”

“বেশি লাগেনি। চিন্তা করিস না।”

“ব‍েশি লাগেনি? এটা বলো কেমন করে। আমি স্পষ্ট দেখলাম কত গভীর আঘাত।”

ওর কথা খানা হজম করে নিল দীপ্র। প্রসঙ্গ বদল ঘটল অরণ্যর আগমনে। কাজের জন্য বাহিরে ছিল। খবর পেয়ে চলে এসেছে।

“কীরে? মাথা খারাপ নাকি? হাতে আঘাত করতে গেলি কেন?”

“ছাড় এ কথা। তোদের বিষয় বল। কী সিদ্ধান্ত নিলি?”

রাত্রি আর অরণ্য দুজনেই চুপসে গেল কেমন। দীপ্র হতাশ হয়ে বলল,”এখনো যদি সিদ্ধান্ত নিতে পারিস আই সয়ার তোদের মাঝে আমি আর থাকব না।”

“দীপ্র শোন।”

“কী শুনব অরণ্য? এত কিছুর পর ও…

দীপ্র থেমে গেল। এই দুটো মানুষকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ও। তবে ও চায়নি বিয়ের পর কোনো ঝামেলা হোক। তাই এদের সিদ্ধান্ত নিতে না পারার সময় টুকুতেই রাত্রিকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসে। কিন্তু বিপদ ঘটে দুজন দুজনের মুখোমুখি হয়ে ফের ঝগড়া করে। একে অপরকে দোষ দেয়। একদিক থেকে ভালো হয়েছে দুজনেই মনের যত রাগ ছিল তা প্রকাশ করে ফেলেছে। তারপর এই সময়টুকু দুজনকে দেওয়া হলো এক‍দম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে। অরণ্য রাত্রির দিকে চাইল। রাত্রির রাগ ও নেমে গিয়েছে। ও মৃদু ভাবে বলল,”আমার সমস্যা নেই।”

একটা চমৎকার হাসির উদয় ঘটল অরণ্যর ঠোঁটে। চোখের ইশারায় চুমু বোঝাতেই রাত্রি দাঁত কামড়ে চাইল। এতে অরণ্য পাত্তা দিল না। ও দীপ্রর পাশে বসে বলল,”আমরা বিয়ে করব এটাই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত।”

দীপ্র বড়ো করে নিশ্বাস ফেলল। বলল,”ফাইনালি একটা ঠিকঠাক সিদ্ধান্ধে এলি তোরা। তোদের দুজনকে নিয়ে কুহু আমাকে এত প্রশ্ন করেছ। এত চিন্তা করেছ ও।”

কুহুর কথা আসতেই অরণ্য বলে উঠল,”ভালো কথা। এটা কী হলো ভাই? তুই তো সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বিয়ে করে নিলি। এর কী মানে হলো? আমাদের জানাতে পারতি।”

“পাগল নাকি? তোদের জানাব। আর তোরা দুজন এসে আবার ঝগড়া শুরু করিস আর আমার বিয়ের বারোটা বাজুক।”

এ কথায় একটা মেকি হাসল অরণ্য। দীপ্রই বলল,”তাছাড়া তোদের দেখলে কুহু তোদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেত। তখন আরেক সমস্যা হতো। এতদিনে একটা দিক ঠিক ঠাক করতে পারলাম বলে মনে হচ্ছে। আমি যে কি উল্টোপাল্টা করে চলেছি এতদিন। আমার নিজেরই বুঝ আসে না।”

দীপ্রকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাল। রাত্রি এবার বলল,”আয়ানার রিয়্যাকশন কেমন?”

“ভালো না রে। আমি চাইনি ওদের কাউকে কষ্ট দিতে। হাজার হোক, আমার তো আপন জন। কিন্তু….

বলে থামল দীপ্র। বড়ো হতাশা নিয়ে বলল,”ওরা ঠিক হবে না। বরং আরো মেজাজ দেখাবে ভবিষ্যতে। এটা নিয়েই ভয়। কুহুকে তো জানিস। মাঝে মাঝে এত বোকামি করে।”

রাত্রি বুঝল কথার মানে। কুহুটা আসলেই বোকা। অবশ্য পরিস্থিতি ভেদে প্রতিটা মানুষই বোকা। সে নিজেও।

“সব তো হলো। কিন্তু এবার রাত্রির বাসায়…

অরণ্যর কথার মাঝে রাত্রি মিনমিনে সুরে বলল,”বাড়ির সবাইকে খুব অপমানিত হতে হয়েছে তাই না?”

রাত্রির বোধহয় কান্না পেল। এই ইগো। এই ভুল সিদ্ধান্ত আজ তাকে এতটা কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে। দীপ্র বলল,”হয়েছে একটু। তবে তোর জীবনের কাছে সেটা কিছুই না।”

রাত্রির খুব অসহায় লাগছে। একই সাথে কৃতজ্ঞতায় মাথাটা নুয়ে আসছে। কেউ না বুঝলেও দীপ্র ভাই বুঝেছিল রাত্রি শেষমেশ এই বিয়েটা মেনে নিতে পারছিল না। তবে পালাবে কিংবা বিয়ে ভাঙবে এই সিদ্ধান্তও নিতে পারছিল না। পরিবারের কথা ভেবে, নিজের ভুলের জন্য নিজেকে বলি দিতে চাইছিল। কিন্তু দীপ্র ভাই সেটা হতে দেয়নি। দুজনকে বুঝিয়ে সেই রাতে বাড়ি থেকে বের করিয়ে আনে। অবশ্য ওরা চাইলেই অন্য ভাবে বিয়েটা ভাঙতে পারত। কিন্তু তখন আবার আশঙ্কা ছিল, পরিবারের মানুষেরা ইমোশনাল কথাবার্তা বলে, নিজেদের সম্মান বাঁচানোর কথা বলে, রাত্রিকে বলি হতে না বাধ্য করে। তাই দীপ্র আর রিস্ক নেয়নি। একেবারে ওদের বের করে এনেছে। এতে পরিবারের সম্মান কিছুটা নষ্ট হয়েছে। তবে রাত্রির, জীবন তো বেঁচেছে। দীপ্র ক্লান্ত ভাবে চোখ বন্ধ করল। রাত্রি চা বানানোর কথা বলে রান্না ঘরে যেতেই ওর পেছন পেছন এল অরণ্য। চায়ের পানি বসিয়ে পেছন ঘোরা মাত্রই অরণ্যর বিশাল বুকটা ভেসে এল। খানিকটা ভয় পেয়ে অদূরে যেতেই এক হাতে মেয়েটিকে কাছে টেনে নিল অরণ্য। মাথাটা নুইয়ে রাত্রির খুব কাছে গিয়ে বলল,”আই অ্যাম সরি মাই লাভ। ভালোবাসায় ইগো রাখতে নেই। এই উপলব্ধি হতে গিয়ে দেরি করে ফেললাম। তবে কথা দিলাম, অরণ্য জোয়ার্দার আজ থেকে তোমার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। ভুল আমার হোক কিংবা তোমার, সরি সবসময়ই আমি বলব। একদম আর্দশ স্বামী হয়ে চলব।”

শেষ কথায় রাত্রি বলল,”এই, কি বললে,স্বামী? কে কার স্বামী? এখনো স্বামী হওনি মিস্টার। তাই দূরে থাকো।”

কথা শেষ হওয়া মাত্রই অরণ্যকে ধাক্কিয়ে সরিয়ে দিল রাত্রি। ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। কি সুন্দর একটা ইমোশনাল পার্ট চলছিল। ও ভেবেছিল সুযোগ বুঝে চুমুটুমু্ও পাওয়া হবে। কিন্তু না, এ তো উল্টো দূরে সরিয়ে দিল!

বাড়িতে আবারো ঝড় আসবে। তার আগমনী বার্তা চারপাশে বিরাজ করছে। সবাই এইটুকু বুঝেছে রাত্রি যার সাথেই পালাক না কেন, তাতে দীপ্রর সংযোগ রয়েছে। দীপ্র নিজেও বুঝতে পারছে, তার ওপর বেশ ভালোই আক্রমণ আসবে। তবে এসবে এখন পাত্তা দেওয়া যাবে না। বাড়িতে এসেই দীপ্র এল কুহুর কাছে। রাত তখন খুব গভীর। তবে মেয়েটি নিজের ঘরে এসে শুয়েছে। এটা দীপ্রর পছন্দ হয়নি একদমই। নিশ্চয়ই না খেয়েই শুয়েছে। ও যদিও এসেছিল উঠিয়ে খাইয়ে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে, তবে ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখে সেটা ইচ্ছে হলো না। অগত্যা কুহুকে রেখেই নিজের ঘরে পৌঁছাল দীপ্র। সমস্ত রাত এদিক সেদিক করে পার হলো। হয়তো ইতিহাসে এটাই প্রথম কোনো বিয়ের রাত, যে রাতে বউ এক ঘরে, আর বর অন্য ঘরে ঘুমাল। হায় দীপ্র হায়। এ কেমন ভাগ্য তোমার? চাচাতো বোনকে বিয়ে করেও, আনরোমান্টিক ভাবে রাত গেল। একেই কি তবে বলে কপালে না থাকিলে ঘি, ঠকঠকালে হবে কী?

কুহুর ঘুম ভাঙল ফোন কলে। ও নিভু নিভু চোখে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কণ্ঠটা বেজে উঠল।
“কুহু! কী হয়েছে তোর? কোনো ভাবেই তোকে রিচ করতে পারছি না। তুই ভার্সিটি আসবি কখন? আজ যে কোর্স নেওয়ার লাস্ট ডেট।”

কুহুর হৃদয় লাফিয়ে উঠল। এমনিতেই পড়াশোনার বারোটা বেজে গিয়েছে। ওর খেয়ালই নেই কোর্স নেয়ার কথা। অনলাইনের সুযোগটিও মিস করেছে। কুহুর হতাশ লাগছে।

“একদমই মনে ছিল না। কি যে হচ্ছে।”

“তুই দ্রুত আয়।”

“হুম আসছি।”

বলে কল রাখল কুহু। সকাল আটটা বাজে। খাওয়ার সময় নেই। ইচ্ছে ও নেই। কুহু কোনো মতে তৈরি হলো। একবার ভাবল মায়ের ঘরে যাবে। দরজার কাছে গিয়ে নক করতে গিয়েও আর সাহস হলো না। শেষমেশ মায়ের সাথে না দেখা করেই বের হতে হলো।

কোর্স নেওয়া কমপ্লিট করে হাফ ছেড়ে বাঁচল কুহু। মনটা ভীষণ ভয় ভয় করছিল। আজ এত মানুষ ভার্সিটিতে। কোথাও একটু দম ফেলার জায়গাও যেন ন‍েই। পেটে এবার ক্ষুধাটাও জেগে উঠল। ও খেয়াল করল দীর্ঘ সময় খাওয়া হয়নি। এদিকে ক্যান্টিনে বিশাল লাইন। ইচ্ছে করছে না দাঁড়াতে। তাই ওরা এল ভার্সিটির পাশে থাকা পিজ্জা শপে। কুহু অর্ডার দেবে ভাবতেই, সায়ের কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল। এত এত খাবার নিয়ে হাজির হয়েছে সে। যেন আগে থেকেই সব তৈরি ছিল।

“কুহু, তোর ক্ষিধে পেয়েছে তাই না? খা।”

কুহু মানা করতে গিয়েও আটকাল। মন মানছে না। ক্ষুধা জিনিসটা বড়ো খারাপ। তবে ও হ্যাঁ বলতে গিয়েও বলতে পারল না। তার আগেই দেখা গেল একটি লম্বা, বলিষ্ঠ দেহের ব্যক্তির আগমন হয়েছে। তাকে দেখেই লাবিবার চোয়াল নেমে এল। ও ভেবে পায় না, এমন মানুষকে কুহু কীভাবে না করতে পেরেছে। লাবিবা খেয়াল করে দেখল, ভার্সিটির অন্যান্য মেয়েরাও যারা এই শপে এসেছে, তারা সবাই দীপ্রর দিকে তাকিয়ে। দারুণ স্মার্ট, সুন্দর হওয়াতে সবারই চোখে পড়েছে। কুহু নড়েচড়ে উঠল। সায়ের বলল,”কী রে। খাওয়া শুরু কর।”

কুহু কথা বলতে পারল না। দীপ্র এগিয়ে এসে লাবিবাকে হাই জানাল। তারপর সায়েরের জন্য বসার যে স্থানটি ছিল সেখানে বসল। সায়ের ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকাল।

“আরেহ, এত খাবার। কারো ট্রিট নাকি?”

সায়ের কিংবা কুহু কোনো কথাই বলল না। লাবিবা হেসে উত্তর দিল।
“ভাইয়া, সায়ের খাওয়াচ্ছে।”

“ও হো। তুমি, তুমি সায়ের?”

সায়েরের মুখটা একদম আঁধারে মিশে গেছে। ও জাস্ট মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝাল। দীপ্র দারুণ ভাবে হাসল। তারপর ওয়েটারকে ডেকে বলল,”বিল কত এসেছে?”

ওয়েটটার এমাউন্ট জানাতেই দীপ্র বিল মিটিয়ে দিল। সায়ের বিরোধ করে বলল,”আপনি দিচ্ছেন কেন? খাবার তো আমি এনেছি।”

“হুম। তুমি এনেছ। তবে, কী বলো তো সায়ের, কুহুটা একদম বোকা। বিয়ের পরের দিন কেউ অন্যের থেকে ট্রিট নেয়? ওর উচিত ট্রিট দেয়া। আর ওর হাজবেন্ড হিসেবে, সেই দায়িত্ব তো আমার পালন করা উচিত। তাই এগুলো কুহুর তরফ থেকে তোমাদের ট্রিট।”

দীপ্রর কথার মানে লাবিবা কিংবা সায়ের কিছুই বুঝল না। বোঝার সুযোগ ও দেয়া হলো না। দীপ্র তার আগেই কুহুকে বসা থেকে উঠিয়ে নিল। এক হাতে বাহুতে চেপে নিজের কাছে ঘেঁষাতেই লজ্জায় মিইয়ে গেল কুহু। চারপাশে এত মানুষ। সবাই দেখে চলেছে। কিছু কিছু মেয়ে কপাল ও কুঁচকে আছে। যেন এই দৃশ্যখানা তাদের চোখের বি ষ।
দীপ্র এবার গলার স্বর উঁচু করল। সবার নজর ফিরল এদিকে।

“হ্যালো আই অ্যাম দীপ্র দেওয়ান। আই হ্যাভ ব্রট আ লিটল গিফট ফর এভরিওয়ান। অন দ্য হ্যাপিনেস অব আওয়ার ওয়েডিং, পিজ্জা ট্রিট ফর এভরিবডি। প্লিজ টেক ইট অ্যান্ড এনজয়। আই উইল পে দ্য বিল।”

সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে করতালি ভেসে এল। সবাই নিজেদের ভাগের পিজ্জা আনার জন্য শপের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কুহুর এবার ভীষণ লজ্জা লাগছে। এতটাই লজ্জা লাগছে যে, একটু আগের ক্ষিধেটাও লেজ গুটিয়ে পালাল।

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply