প্রণয়ের_রূপকথা (৫৩)
ছুটে আসায় কুহুকে বড়োই ক্লান্ত দেখাল। ওর পরনে সুন্দর একখানা কামিজ। সাধারণ হলেও, মেয়েটিকে বেশ মানিয়েছে পোশাকে। হালকা সাজগোজও দেখা যাচ্ছে। দীপ্র ওর দিকে চেয়ে খানিকটা বিস্ময় হয়ে পড়েছিল। এবার তা কাটিয়ে বলল,”কুহু।”
বিভ্রান্ত, ভয়ার্ত মেয়েটির মুখশ্রী। এগিয়ে এল পুরুষটা। হাত খানা বাড়িয়ে দিয়েও দিল না। কুহুর দুটো চোখ প্রায় ছলছল।
“কাঁদছিস কেন?”
“রাত্রিপুকে পাচ্ছি না।”
ফোঁস করে দম ফেলল দীপ্র। ওর এমন মুখশ্রী দেখে অনেকটা ভয় পেয়েছিল সে। এবার হেসে বলল,”এ ব্যাপার। পেয়ে যাবি। এর জন্য কান্নাকাটি করতে হবে?”
“না। কোথাও পাচ্ছি না।”
“তুই শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিস। তখনকার মতন। আছে কোথাও।”
কুহু কি আসলেই ভয় পাচ্ছে? ওর মন মানছে না। ওর হৃদয়ে ভীষণ ভয় এসে চেপে ধরেছে। বারবার মনটা কেমন করছে। রাত্রিপুকে আজকাল ভীষণ অস্বাভাবিক লাগে। তাই আবারো না খুঁজে পেয়ে, বুকটা কেমন করে ওঠেছে। সেই জন্যই কি না কোনো কিছু না ভেবেই ছুটে এল। দীপ্রর কাছে কেন ছুটে এসেছে এই ব্যাখাটা কুহু নিজেও জানে না। তবে মনে হয়, মনে হয় সব সমস্যার সমাধান দীপ্র ভাইয়ের কাছেই আছে। দীপ্র এবার হাত খানা বাড়িয়ে দিল। কুহু চাইল। ইশারায় দীপ্র ওর হাত খানা ছুঁতে বলল। কুহু ও ভদ্র মেয়ের মতন দীপ্র ভাইয়ের হাত খানা স্পর্শ করল। মানুষটার স্পর্শে, আলাদা শক্তি আছে। কুহু কেমন বোধ ফিরে পেল।
“তাকা আমার দিকে।”
ও তাকাল। তাকাল দীপ্রর চোখ দুটোয়। গভীর এই দুটো চোখ, আজকাল কুহুকে মুগ্ধ করে। টানে কাছাকাছি। তবে, তবে একটা বাঁধা ও খেয়াল হয়। ও নজর ফেরাল। দীপ্র বোধহয় বিরক্ত হলো। মুখ দিয়ে উহু উচ্চারণ করতেই আবারো চাইল কুহু।
“গুড।”
কুহু কিছু বলল না। তবে অনুভব করল দীপ্রর হাতের বাঁধন গাঢ় হচ্ছে। যেন ভরসা দিচ্ছে।
“একটা কথা মনে রাখবি। যাই হয়ে যাক, নিজেকে শক্ত রাখতে হবে।”
কুহু আসলেই বুঝল না কী হবে। কী হওয়া উচিত আসলে। দীপ্র ভাই কি কোনো ইঙ্গিত দিল? ও জানল না। বুঝল না। ওকে সাথে নিয়ে নিচে নেমে এল দীপ্র। মিউজিকের আওয়াজ তখন বাড়িটাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। কোনো এক ব্র্যান্ড ও এসেছে। আশেপাশের অনেক বাচ্চারাই ছুটে এসেছে। এসেছে বিনা দাওয়াতেই। তবে তাদের প্রতি স্বাভাবিক আচরণই করছে দেওয়ানরা। এটাই তাদের ঐতিহ্য। কুহু আর দীপ্রকে এক সঙ্গে নামতে দেখেই আবিদার মনটা কেমন করে ওঠল। তিনি স্বামীর পানে চাইলেন। ভদ্রলোক নিজেও গম্ভীর হলেন।
“দীপ্র, আয়, আয়।”
অতি উল্লাস নিয়ে দীপ্রর দিকে আগালেন আনোয়ার। দীপ্র চাচার আচরণ খেয়াল করল। তবে মুখের স্বাভাবিকতা ধরেই রাখল।
“তোর জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম।”
দবীর ও উপস্থিত ছিলেন। ভাইয়ের আচরণ তার মনের ভেতর একটা দাবানল তৈরি করেছে। তিনি আঁচ করেছিলেন আজ কোনো এক ঘটনা ঘটবে। এরই মধ্যে রাত্রির শ্বশুরবাড়ি থেকে লোকজন এসে গেল। তাই ভাবনা আর বাড়ল না। কর্তারা সব ছুটলেন তাদের দিকে। দীপ্র আড়চোখে দেখল কুহুকে কেমন নেতিয়ে পড়া ফুল লাগছে।তবু ফুল তো সুন্দর সব সময়। নেতিয়ে পড়লেও ফুল সুন্দর। কুহুকেও তেমনই সুন্দর লাগছে।
“কণা, শোন।”
কণা ছিল ভীষণ আমোদে। সারাদিন মন খারাপ থাকলেও এখন সে বাচ্চাদের নিয়ে হৈ হৈ করছিল। বোনের কথায় ছুটে এল।
“হ্যাঁ আপু, বল।”
“মা কোথায় রে?”
“ঘরে।”
“ঘরে কেন? আসবে না?”
কণার মনটা বিষণ্ন দেখাল। কুহু তখনই ছুটল মায়ের ঘরে। সেখানে মা বাবার ছবি নিয়ে বসে আছেন। তার মন খারাপ। সেই সাথে চোখে জল।
“মা।”
চট করেই চোখ দুটো মুছলেন ববিতা। আজ তার হোটেলের ছুটি। বাড়িতেও কাজ নেই। তাই ঘরে বসেছিলেন একাকি ভাবে। কুহু এসে মায়ের পাশে বসতেই তিনি হাসার চেষ্টা করলেন।
“যাবে না তুমি?”
“যাব তো। তুই আবার আসতে গেলি যে। এখনই যেতাম।”
“মিথ্যে। তুমি আসতে না মা।”
আসলেই আসতেন না ববিতা। তার ভালো লাগছে না। ভালো লাগবেই বা কেমন করে? শেষবার, এই বাড়িতে বিশাল আয়োজন করে যে অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেই অনুষ্ঠানে এই সব মানুষের সাথে তার স্বামীও ছিল। আজ সে নেই। তার না থাকাটা ববিতাকে রোজ একটু একটু করে যন্ত্রণা দেয়। কুহুর ভেতরটা মায়ের মন খারাপ বুঝতে পারে। ওর দু চোখে জল নামে। ও হালকা ভাবে মায়ের বাহুতে মাথা এলায়।
“আমার ও যেতে ইচ্ছে করছে না মা। আমরা না গেলে খুব কি ক্ষতি হবে বলো? হবে না। আমরা না গেলে চাচা-চাচি হয়তো খোঁজও করবেন না। আমরা না যাই মা?”
ববিতার দুটো চোখ এবার ফোয়ারা নামাল। তিনি মেয়ের গাল ছুঁয়ে বললেন,”ঠিক আছে। আমরা না যাই। এখানেই থাকি। তোর বাবার সাথে।”
রাগীব অনেকক্ষণ ধরেই রাত্রিকে খুঁজছিল। অথচ মেয়েটিকে দেখাই যাচ্ছে না। কয়েকবার কল করেও পাওয়া গেল না। এই মেয়েটি ফোনের প্রতি এত অবহেলা। কখনোই তাকে কল করে পাওয়া যায় না। বিষয়টি রাগীবকে প্রায় হতাশ করে। তবে মানিয়ে নিয়েছে ও। কিন্তু এখন কি উপায়? মেয়েটিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। অথচ তার টিকিটি ও দেখা যাচ্ছে না। লাজ লজ্জা ভুলে বড়োদের বলবে কি না সেটা ভাবতেই ভাবতেই চোখে পড়ল কণাকে। ও বাচ্চাদের মাঝে হা হি, হি হা করছে। মেয়েটি আসলেই যে বাচ্চা, তা খুব ভালো ভাবে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না। রাগীব ওদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কণা তখন কুঞ্জকে চেপে ধরে বসে আছে। বেচারার পেট নিয়ে মজা উড়াচ্ছে। আর কুঞ্জ মুখটা আলু করে রেখেছে। এবার কুঞ্জর ভারী রাগ হলো। ও ভেঙ্চি কেটে বলল,”কণাপু তোমার বিয়ে হবে না।”
এ কথায় কণা বড়ো বড়ো চোখ করে চাইল। কুঞ্জ আবারো বলল,”যদিও হয়, তবে তোমার বরের পেট হবে ইয়া বড়ো। আমার থেকেও বেশি।”
“এই, এই। এটা কেমন হলো। আমার বরের পেট এত বড়ো হবে বলে অভিশাপ দিচ্ছিস! তুই তো ভারী দুষ্টু।”
“তুমিও দুষ্টু।”
বলে আবারো ভেঙ্চি কাটল কুঞ্জ। ভেঙাল কণাও। ওদের মাঝে আবারো হা হি, হি হা চলতে লাগল। এবার রাগীব হালকা ভাবে কাশার মতন ভঙ্গি করল। কণা বিরক্তি নিয়ে পেছনে চাইতেই মানুষটাকে দেখে কেমন একটা ভরকে গেল। বুকে থু থু দিতেই রাগীব দাঁত বের করে হাসল।
“আজব মানুষ তো ভাই। বলা নেই কওয়া নেই এভাবে কাশার কি মানে! পেছনে দাঁড়ানোর ই কি মানে?”
“পরেরবার বলে কাশব। ঠিক আছে? আপাতত একটা কাজ করে দাও।”
“পারব না।”
রাগীব জানত এই মেয়ে এ কথাই বলব। তাই হেসে ওর পাশে বসল। কণা ছিটকে গেল অদূরে।
“কুঞ্জ, ভাইয়া কেমন আছ তুমি?”
“আমি আমি তো সব সময় ভালো থাকি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?”
“আমিও ভালো আছি ভাইয়া।”
বলে কুঞ্জর চুল গুলো নাড়িয়ে দিল রাগীব। কণার বিরক্ত লাগছে। এই লোকটা আসেই তাকে জ্বালাতে। ওর নিজের ওপর রাগ হচ্ছে। কোন বোধে যে এই লোকটার সাথে মজা নিতে গিয়েছিল।
“কণা, শোনো কথাটা।”
“শুনতে পারব না।”
“বুঝেছি, তুমি শুনছো।”
ভেঙাল কণা। রাগীব হেসে বলল,”রাত্রিকে ডেকে দাও।”
“আমাকে কি পেয়েছেন বলেন তো।”
“শালিকা, শালিকা পেয়েছি। কিউট শালিকা। যে আমাকে জান ডেকেছিল। আর আর….
এবার কণার কেমন একটা লাগল। ও চটপট সোফা থেকে ওঠে দাঁড়াল। মিনমিন সুরে বলল,”যাচ্ছি।”
ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রাগীব হাসল। মেয়েটাকে দিয়ে ভালোই কাজ করিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।
কুহু অনেকক্ষণ হলো উপরে গিয়েছে। এখনো আসেনি। এটা খেয়াল করেছে দীপ্র। ও কুহুকে ডাকার জন্য উপরে যেতে নিচ্ছিল তখনই অদূর থেকে ছুটে এসে হাতখানা চেপে ধরল আয়ানা। দীপ্র চোখ দুটো বন্ধ করে মুড সামাল দিল।
“কোথায় যাচ্ছ? এখনই তো কেক কাটব। আসো, আসো।”
“কুহু নেই। ওকে আনতে যাচ্ছি।”
“ওকে অন্য কেউ আনবে। তুমি আসো তো।”
বলে হাতখানা ধরে জোর প্রয়োগ করতেই এক ঝটকায় হাতখানা সরিয়ে নিল দীপ্র। আয়ানা বোধহয় আহতই হলো। তবে নিজেকে সামলে নিল মুহুর্তেই।
“আমি কুহুকে ডেকে আনছি।”
দীপ্র নিজেও সামান্য বিব্রত হয়েছে। আয়ানা ছোট বোন হয় কি না। তার সাথে এহেন আচরণ করতে ইচ্ছে হয় না। তবে মাঝে মাঝে বোধ থাকে না। ও চলে যেতেই আয়ানা ঠোঁট কামড়ে ধরল। মনে মনে কুহুকে গালিগালাজ করতে করতে সামনের দিকে এগোল।
আয়ানা সব প্ল্যান করে রেখেছে। দীপ্র উপর থেকে নামা মাত্রই ব্র্যান্ড রোমান্টিক একটা গান ধরবে। আর তখুনি নাচ শুরু হবে। সেই সুযোগে দীপ্রকেও নিজের সাথে নাচাবে ও। আর নাচের মাঝেই ভালোবাসার কথাটা প্রকাশ করবে। আর দীপ্র ভাইকেও মেনে নিতে হবে। মেনে নিতে হবে আয়ানার ভালোবাসা। কিন্তু যদি না মানে? তখন, তখন কী হবে? এমন একটা ভয় আয়ানার মাঝে সব সময় কাজ করে। তবে ও পজেটিভ থাকতে চায়। পজেটিভ রাখে মনকে। দীপ্র ভাই মানবে। তাকে মানতেই হবে। না মানার কোনো কারণই নেই। কুহুর প্রতি কেবল দয়া দেখানো হচ্ছে। শুধুই দয়া। এসব ভাবতে ভাবতে আয়ানার মনটা আবারো ফুরফুরে হলো। ওর প্ল্যান মতনই সব এগোচ্ছে। ভালো লাগছে। ও হাসি খুশি ভাবে সব দেখে নিয়ে যেই না পেছন ঘুরল তখুনি আর্তনাদের মতন ডেকে ওঠল কণা। চ্যাঁচিয়ে ডাকতে থাকল ফুপিকে। সালমা বেয়াই বাড়ির লোকদের আপ্যায়ন করছিলেন। কণার ডাকে ফিরে চাইলেন। ছোট মেয়েটার ভেতরে ভয়। ভীষণ আর্তনাদ। ও ভয়ের মধ্যে, কোনো কিছু না ভেবেই এক গাদা লোকের মাঝে বলে ওঠল,”ফুপি, ফুপি রাত্রিপু তো পালিয়েছে।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৯
-
প্রণয়ের রূপকথা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭০