প্রণয়ের_রূপকথা (৪৯)
বিয়ের ডেট পরেছে। কেনাকাটা চলমান। এক বিয়ে নিয়েই হিমশিম খেতে হয়। সেখানে তো দুটো বিয়ের আয়োজন। ও বাড়ি থেকে আগে ভাগেই রাত্রির জন্য শাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। একদম টুকটুকে লাল শাড়ি। সবাই বসার ঘরেই। কণা বলল,”রাত্রিপুকে শাড়িটা গায়ে দিয়ে দেখো তো। দেখি কেমন লাগে আমার বউ আপুকে।”
এমনিতেই রাত্রির ভেতর থেকে কোনো অনুভূতি আসছে না। আর সেই সময়েই দোতলা থেকে নেমে এল অরণ্য। রাত্রির শরীরে তখন লাল শাড়ি জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মেয়েটাকে দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছে। অরণ্য চোখ ঘুরিয়ে ফেলে। রাত্রিও চোখ নামিয়ে ফেলে। ওর পেছন পেছন আসছিল দীপ্র। ঘটনাটা চোখে পড়েছে। ও ফোঁস করে দম ফেলে। বন্ধুর পিঠে হাত রেখে বলে,”সময় থাকতে মূল্য দিতে হয়। এখন খারাপ লাগছে তো?”
অরণ্য হাসে। মুখটা অন্যপাশে ফিরিয়ে বলে,”ধুর। তুই কি বলিস এসব। আমার কোনো খারাপ লাগছে না।”
“খারাপ না লাগলেই ভালো। পছন্দের মানুষকে হারানোটা ভীষণ যন্ত্রণার।”
কথাটা বলতে বলতেই আয়ানার দিকে চোখ যায় দীপ্র’র। ওর খুবই হতাশ লাগে। এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ ওর আপন। আয়ানাও তো স্নেহের। মেয়েটিকে কীভাবে কী বোঝাবে ও বুঝতে পারে না। অথচ ওর কাছে উপায় নেই। একটা না একটা কোন্দল অতি শীঘ্রই আসতে চলেছে। সেসবের জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। কিন্তু সবশেষে কুহু, কুহু একটা বিশাল প্রশ্নের বিষয়। এই মেয়েটির মস্তিষ্ক কোন মতলব চলছে?
অরণ্যর আসলেই খারাপ লাগছে। রাত্রিকে ওভাবে লাল শাড়িতে দেখে মনটা তখন থেকে কেমন লাগছে। ও চাচ্ছে নিজেকে বোঝাতে, তবে খুব একটা পারছে না। মনটা বিপরীত সুর গাইতে চাইছে। আকাশের দিকে চেয়ে অরণ্য বিড়বিড় করল,’সব ঠিক আছে অরণ্য। সব ঠিক আছে। তুমি একা কেন সব সময় নিচু হবে? রাত্রি তো মজায় মজায় বিয়ে করে নিচ্ছে। ও তো চাচ্ছে বিয়েটা হোক। তুমি তবে কেন মানতে পারছো না, বোকা?”
নিজের ওপর রাগ ওঠে যায় অরণ্যর। সেই রাগ নিয়েই বাড়ি থেকে বের হয়। ছাদে দাঁড়িয়ে অরণ্যকে যেতে দেখে রাত্রি। ওর কান্না পায়। অভিমান হয়। অরণ্য একটি বারের জন্য এই বিয়েটা নিয়ে কথা বলল না। একটিবার ও বলল না রাত্রি বিয়েটা কোরো না। একটিবার ও না!
বিয়ে নিয়ে সবথেকে বেশি খুশি বাড়ির দুই ছোট সদস্য। কণা আর কুঞ্জ। দুজনের বয়স কাছাকাছি নয়। তবে সম্পর্কের মধুরতা অন্যদের তুলনায় বেশি। দুজন মিলে প্ল্যান করছিল কীভাবে কী করবে। কুহু এসে ওদের মাঝে যোগ দিল। কুঞ্জ আহ্লাদের সাথে বোনের কাছে ঘেঁষল।
“আরে বাহ, এখন কনাপু কেউ না?”
“হুম কেউ না।”
বলে ভেঙাল কুঞ্জ। কণা নাক ফুলানোর মতন ঢং করল। কুহু হেসে বলল,”কীসের প্ল্যান চলছে?”
“বিয়ের প্ল্যান। আমরা বরের জুতো চুরি করব কুহুপু।”
“তাই নাকি? আমাকে ভাগ দিবি কিন্তু।”
“দেব, দেব। তুমি হেল্প করে দিও?”
“ঠিক আছে। দেব।”
বলে কুঞ্জর চুল গুলো নাড়িয়ে দিল কুহু। কুঞ্জ পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,”বিয়ের প্ল্যান করতে করতে ক্ষুধা পেয়ে গেছে। খেয়ে আসি।”
কথা শেষ করতে না করতেই এক ছুট কুঞ্জর। বাচ্চাটা আসলেই খায় বেশি। আয়ানার রাগের কারণটা নেহাতই ফেলনা নয়। তবে ও যেভাবে কথা শোনায়, সেভাবে না বলে একটু আদর করে বোঝালেই পারে। আয়ানার কথা ভাবতে ভাবতে কুহুর এবার দীপ্র ভাইয়ের কথা স্মরণ হয়। ও কী করবে? কীভাবে কী সামাল দেবে? সামনের দিন গুলো মোটেও সুখকর মনে হচ্ছে না। একটা ঝড় তো আসবেই। সেই ঝড়ে কুহু কি উড়ে যাবে? নাকি কোনো এক শক্ত পোক্ত বাঁধন তাকে বাঁচিয়ে নেবে। কুহু জানে না। জানে না ও। ওর শুধু কান্না পায়। রাগ হয় নিজের ওপর। একটা ভুল সিদ্ধান্তের ফলে জীবন তাকে কোথায় নিয়ে এল। এখন যে আর কোনো পথ নেই। একদমই নেই।
দবীর মানুষ হিসেবে অন্য রকম। লোকটার মাঝে একটা বিষয় আছে। দীপ্র এসব জানে, বুঝে। মনে মনে এটা নিয়ে তার গর্বও আছে। ও এসেছে বাবার কাছে। মা তখন পাশেই ছিলেন।
“দীপ্র, এদিকে আয় বাবা।”
মায়ের কাছে গিয়ে বসল দীপ্র। মা ছেলের গাল ছুঁয়ে বললেন,”কাজ কেমন হচ্ছে বাবা?”
“ভালো মা। আমার একটা প্ল্যান আছে। আবিরের তো বিদেশের প্রতি ঝোঁক আছে। ওকে সাথে নিতে চাচ্ছি।”
এ কথায় মুখ তুলে চাইলেন দবীর। জেবা আলোচনায় থাকতে চাইলেন না। এসব ব্যাপারে বাপ বেটাই ভালো বুঝে। তার কাজ নেই। সে তাই ওঠে গেলেন চা বানাতে। মা চলে যেতেই দীপ্র বাবার নিকট গিয়ে বসল। দবীর পেপার রেখে ছেলের পানে চাইলেন।
“অন্য কিছু বলতে এসেছ?”
দীপ্রর চোখ মুখ দেখেই যেন সবট বুঝে নিলেন ভদ্রলোক। দীপ্র চোখ মুখ শক্ত রেখে বলল,”জি, বাবা।”
“বলো। শুনছি আমি।”
“আয়ানাকে কষ্ট দিতে চাচ্ছি না বাবা।”
এ কথায় ভ্রু কুঞ্চিত করলেন দবীর। বললেন,”আয়ানাকে বিয়ে করতে চাও?”
“না। কখনোই না।”
“তবে?”
“ও তো আমার বোন বাবা। রাত্রি, কণার মতো আয়ানা আমার আদরের।”
“আর কুহু?”
এ কথার বিপরীতে ভণিতা ছাড়াই দীপ্র বলে,”কুহু, কুহুতো সবটা জুড়ে।”
কুহুর বিষয়ে ছেলের এমন লাগামছাড়া আচরণই আশা করেন দবীর। তিনি জানেন তার ছেলে লাজুক ধাঁচের নয়। তবু কুহুর বিষয়ে একটু বেশিই লাগামছাড়া, লজ্জাহীন। তিনি দম ফেলেন।
“তবে তো কথা শেষই হলো। কুহুর প্রায়োরেটি বেশি। তাই না?”
দীপ্র বাবার পানে চাইল। ওর চোখের দৃষ্টিতে অসহায়ত্ত্বের ছোঁয়া।
“আয়ানাকে কীভাবে ম্যানেজ করব। ওকে বলতে গিয়েও আমি পারছি না বাবা।”
এই বিষয়টি নিয়ে দবীর নিজেও ভেবেছেন। তবে সেভাবে সুরাহা মিলেনি। তিনি ছেলের পিঠে হাত রাখলেন।
“সব কিছু যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলতে দাও দীপ্র। তবে….
“তবে কী বাবা?”
“কুহুকে ম্যানেজ করো। ও না চাইলে, কিছু’ই কিন্তু হবে না। আর একটা বিষয়, আমি চাই না আমাদের কারো সম্পর্ক এতটা ভাঙুক যাতে সবাই আলাদা হয়ে যাই। একটা সময় আমি ভুল করেছি। এবার করতে চাচ্ছি না। অন্তত মা থাকাকালীন এই ভুল আর নয়।”
দীপ্র বাবার কথার মানে বুঝল। তবে বিশেষ কিছু বলল না। দবীরই বললেন,”এত চিন্তা কোরো না। যা হবে ভালোই হবে।”
এ কথার বিপরীতে মিনমিন সুরে দীপ্র বলল,”সেই ভালোটা কুহুকে নিয়ে হলেই হলো, বাবা।”
ওদিকে আয়ানার প্রায় সব কিছু তৈরি। ও ঠিক করেছে নিজের জন্মদিনে দীপ্রকে প্রপোজ করবে। ওর বিশেষ দিনে দীপ্র নাকোচ করতে পারবে না। পারবে না নাকোচ করতে। সেই দিনের কথা ভেবে ভেবেই আয়ানার ছটফট লাগছে। ও ফোন থেকে দীপ্রর ছবি বের করল। তাতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,”তোমাকে কীভাবে এত ভালোবেসে ফেললাম দীপ্র? কীভাবে ভালোবেসে ফেললাম।”
বলতে বলতে ফোন খানা বুকে চেপে ধরল ও। চোখ বন্ধ করল। ডুবে গেল দীপ্রকে নিয়ে এক সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে।
চলবে…
কলমে ~ ফাতেমা তুজ নৌশি ফাতেমা তুজ নৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১