Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৬


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৩৬||

ফারজানারহমানসেতু

সন্ধ্যায় পর থেকে পুরো বাড়িটা যেন আলো আর কোলাহলে ভরে গেছে। বেলুন, ফেইরি লাইট, কেকের টেবিল সবকিছু একদম পারফেক্ট। সবাই ব্যস্ত, হাসাহাসি, গল্প করছে। কিন্তু রোজার মনটা কেমন যেন অন্য কোথাও আটকে আছে। রোজা আজকে গোল্ডেন ও হালকা গোলাপি কম্বিনেশনের জরজেটের শাড়ি পড়েছে।

তুবাও পড়েছে। তবে একটু ভিন্ন রঙের। তাজারুল নেওয়াজ পড়তে বলেছে। হয়তো আজকে তাজারুল নেওয়াজের বন্ধু আসবে এইজন্য। তাছাড়া বাড়ির সব মেয়েরা আজকে শাড়ি পড়বে এটাই ঠিক করা হয়েছে।

সিঁড়ি দিয়ে একসাথে আরাজ তুবা আর রোজা একসাথে নামছে। তুবা মুখে হাসি বিলীন হয়ে গেছে। ইশ! যেই মেয়েটা আগে হাসিখুশি থাকতো, সেই আজকে চুপ করে আছে। নামতে নামতে রোজা একবার পিছনে তাকাল তূর্জান আসছে কি না। না আসছে না। তাহলে কি সরি একসেপ্ট করেনি।

রাফিয়া এসে কোলে করে নিয়ে গেল আরাজকে।যাওয়ার সময় বললো,“এই তুবা তাড়াতাড়ি আয়, কেকটা ঠিক করে রাখ।”

”হ্যাঁ… আসছি।”

রোজা শাড়ি সহ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। শাড়ি পড়লেও সামলানো সহজে হয়ে ওঠে না। তুবা নেমে গেছে সিড়ি থেকে। কিন্তু রোজা সিড়িতে দাঁড়িয়েই শাড়ি ঠিক করতে ব্যাস্ত, এই সাইডে মূলত লোক নেই জন্যই সিড়িতে শাড়ি ঠিক করছে। পার্টি গার্ডেনে হবে। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল তূর্জান।

সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট…সাদা শার্টটা নিখুঁতভাবে গায়ে লেগে আছে, চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা, তবুও কিছু অবাধ্য অগোছালো চুল কপালের ওপর এসে পড়ে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি করেছে। পায়ে কালো, ব্যান্ডের জুতো, হাতে চকচকে রোলেক্সের ঘড়ি—সব মিলিয়ে একেবারে পরিপাটি, অথচ অপ্রচলিত এক সৌন্দর্যের মোহ, যা প্রথম দেখাতে সহজে কাটবে না। ফোন স্ক্রল করতে করতে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে সে, যেন নিজের অজান্তেই চারপাশের সময় থামিয়ে দিয়েছে। চোখ তুলে একবার তাকালেই মনে হবে—এই মানুষটার ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে হাজার গল্প, হাজার রহস্য… আর তাকে প্রথম দেখাতেই কেউ না কেউ নিঃশব্দে নিজের হৃদয়টা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু চোখ দুটো,সোজা এসে আটকে গেল রোজার ওপর।

রোজা এখনো শাড়িতেই মশগুল, পিছনে যে তূর্জান নেওয়াজ দন্ডায়মান হয়ে আছে তা খেয়ালই করে নি। না তাকিয়েই শাড়ি ঠিক করে নামতে গেলে শাড়ির আচলে টান অনুভব করল। পিছনে তড়িৎ বেগে তাকাতেই আরেকদফা ক্রাশ খেল। এই লোক মারাত্মক সুন্দর হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। এমনিতেই সুন্দর আবার এত সুন্দর পরিপাটি হওয়ার কি আছে? রোজা সকালের কথা ভাবলো, বউয়ের কথা বলেছিল তূর্জান,মানে বউয়ের ভালোবাসা পেয়ে এমন সুন্দর হচ্ছে।

রোজাকে এভাবে তাকাতে দেখে ভ্রু বাকালো। তারপর কথা না বলে ফোন পকেটে রেখে, রোজার সামনে এসে প্রপোজ করার ভঙ্গিতে হাটুমুড়ে বসে পড়ল। সযত্নে নিজের হাতে রোজার শাড়ির কুচি ঠিক করে দিল। রোজা আহম্বক এ লোক সব পারে না কি? রোজা শাড়ির কুচিতে তাকিয়ে দেখল, আগের থেকে সুন্দর হয়ে পড়ে আছে কুচিগুলো। কিছু বলার আগেই তূর্জান উঠে দাড়াল, বিরবির করলো, “ যে মেয়ে শাড়ি সামলাতে পারে না, সে সংসার কিভাবে সামলাবে? “

তবে সুচাক্ষু কর্ণপাতে সেটা পৌঁছাতেই রোজা বলল, “ আমি বলেছি আমি শাড়ি সামলাতে পারি না? যাস্ট শাড়িটাকে আরো একটু এটে নিচ্ছিলাম যেন কম্ফেটেবল ফিল হয়। আর সংসারের কথা বললেন, ওটা আমি ঠিক সামলে নেব। এই শাড়ির মতোই! যতোটা এটেই থাকুক না কেন সংসার, তার থেকে দ্বিগুন এটে সংসার করবো। “

তূর্জান শুনলো, তবে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চলে গেল। তার হাবভাব বোঝা দায়। রোজাও বিরবির করতে করতে গেলো পার্টির স্থানে। সবাই উচ্ছাসিত হয়ে গেল। নেওয়াজ পরিবারের বার্থডে পার্টি বলে কথা,, বড় বড় সব বিসনেসম্যানদের আমন্ত্রণ এই পার্টিতে। সব মিলিয়ে পুরো জাকজমকপূর্ণ পার্টি। ততক্ষনে সমুদ্র আর নূর, অনন্যা এসে গেছে। তুবা আর রোজা গিয়ে তাদেরকে ভিতরে নিয়ে এলো। কুশল বিনিময় করে বসতে বলল।

কিছুক্ষনের মধ্যেই তাজারুল নেওয়াজের বন্ধু এবং তার পরিবার ও আসলো পার্টিতে। তাজারুল নেওয়াজের ফ্রেন্ডের ছেলে আরিয়ান মির্জা।
বাবার বিসনেসকে আজ এই পর্যন্ত এগিয়ে এনেছে। যার কারণে তাদের এখন বাইরের দেশেও নামডাক আছে। তাদের কথা শুনেই তুবার হাসফাস বেড়ে গেল। এখন সেই অচেনা লোকটাকে না পাওয়ার তীব্র ভয় হচ্ছে। সত্যিই যদি মির্জা পরিবারের তুবাকে পছন্দ হয়ে যায়! তাহলে,, তাহলে কি তুবা সত্যিই তার সেই অচেনা লোককে হারিয়ে ফেলবে।

তাকে দেখার তীব্র ইচ্ছা,, ইচ্ছাই রয়ে যাবে। ভাবনার মাঝেই তাজারুল নেওয়াজ বললেন, সবাইকে সালাম দিয়ে ভিতরে নিয়ে আসতে। তুবার যদিও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তবুও রোজা টেনে নিয়ে গেল। তুবা কোনোমতে মুখে হাসি রেখে, সবাইকে সালাম দিয়ে ভিতরে আসতে বললো। তবে চোখ আটকালো, আরিয়ানের দিকে। কেমন তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে জীবনে মেয়ে দেখেনি।

তুবা রোজাকে খোচাতে লাগল, অন্যদিকে যাওয়ার জন্য। এই দৃষ্টি তার ভালো লাগছে না। এমন তুবার দিকে হ্যাবলার মতো তাকানোর কি আছে? অদ্ভুত! অবশেষে আরিয়ান হয়তো তুবার অসস্তি বুঝতে পেরে নিজেই অন্যদিকে চলে গেল। তুবা এবার কম্ফোটেবল ফিল করছে কিছুটা। তবে হারানোর আশংঙ্খা নিয়ে আর কতোটা ভালো ফিল করা যায়?

“এই সাবধানে!” — তানিয়া নেওয়াজ তুবাকে বলল। তুবা হাটতে গিয়ে এক্ষুনি কারেন্টের তারের সাথে বেধে যাচ্ছিলো। তবে কোনো একজন পিছন থেকে হাত টেনে ধরায় পরেনি। কে ধরল তা দেখতে গিয়ে পিছনে তাকালো। আরিয়ান। তুবা অগ্নিদৃষ্টিতে ধরা হাতের দিকে রইলো। আরিয়ান হাত ছেড়ে দিতেই সোজা হয়ে দাড়াল তুবা। আরিয়ান বলল, “ একটু দেখে হাটতে পারো না? এক্ষুনি তো পড়ে যাচ্ছিলে!”

“ পড়ে গেলে যেতাম। বাট হাত না ধরলেই বেশি খুশি হতাম। “

“ এতো লোকের মাঝে পড়ে যাওয়াই উত্তম মনে হলো? “

“ হুমম হলো! কারণ অপরিচিত, সরি পরপুরুষের ছোয়া লাগার চেয়ে পড়ে যাওয়াই উত্তম মনে হলো। আর আপনার ও উচিত পরনারীর দিকে এভাবে না তাকানো।“

তুবা আর কিছু বলল না। শুধু এক ঝলক তাকাল… আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে নিজের গন্তব্যে চলে গেল। পিছনে আরিয়ান বিরবির করলো, “ ওহ গড, একে নিয়ে সারাজীবন সংসার করবো কিভাবে? না জানি কবে, নাক, মুখ ফাটিয়ে দিবে আমার। এমন মুখ করে রেখেছে যেন শখের জিনিস হারিয়ে ফেলেছে বাচ্চা মেয়ে। তবে যাই হোক, হাজবেন্ডের প্রতি যথেষ্ট লয়াল হবে তুমি, আমার তো তোমাকেই চাই। “


“আরাজ আসছে! সবাই রেডি তো? “
একসাথে সবাই বলল, “ হুমম !”সবার গলায় উচ্ছ্বাস। সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল,
“হ্যাপি বার্থডে!!!”

আরাজ রাফিয়ার সাথে হেটে আসছে। দুজন গার্ডেনে ঢুকতেই হৈচৈ পড়ে গেল। হাসাহাসি, ছবি তোলা,সবকিছু শুরু হয়ে গেল।
রোজা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। হালকা হাসি মুখে… কিন্তু চোখ বারবার খুঁজছে একজনকেই।
তূর্জান। হঠাৎই একটা ছেলে এসে দাঁড়াল রোজার পাশে।

“হাই, তুমি রোজা, তাই না?”

রোজা তাকিয়ে বলল, “জি?”

“আমি নাহিয়ান। মিরানের ফ্রেন্ড। তোমাকে আগেও দেখেছি… কিন্তু কথা বলা হয়নি।”

রোজা ভদ্রভাবে হেসে বলল, “ওহ… আচ্ছা।”

“তুমি ডেকোরেশন করেছো? খুব সুন্দর হয়েছে।”

“না ভাইয়া, … সবাই মিলে করেছে।”

নাহিয়ান হেসে বলল, “তবুও… তোমার টাচ আছে বোঝা যায়।”

রোজা একটু অস্বস্তি পেল। কে এসে এভাবে জ্বালাচ্ছে? বিরক্ত! ভাইয়ার ফ্রেন্ড ভাইয়ার সাথে যা খুশি বলুক। এখানে ফ্রেন্ডের বোনের কাছে কি? রোজা ইতস্তত করে বলল, “ধন্যবাদ ভাইয়া। আর কিছু বলবেন?”

ওই দৃশ্যটা দূর থেকে দেখছিল তূর্জান। তার চোখ হঠাৎই ঠান্ডা হয়ে গেল। হাসি-ঠাট্টার মাঝেও সে শুধু তাকিয়ে আছে,রোজা আর ওই ছেলেটার দিকে। নাহিয়ান একটু কাছে ঝুঁকে কিছু বলল।
রোজা হালকা হেসে উত্তর দিল।এইটুকুই যথেষ্ট ছিল লাভাকে, ম্যাগমায় রুপান্তর করতে । তূর্জানের ভেতরে আগুন জ্বলে উঠল।
হঠাৎই সে এগিয়ে এল। সোজা গিয়ে দাঁড়াল রোজার পাশে।তার কণ্ঠটা আগের থেকে অনেকটা গম্ভীর হয়ে গেছে, “রোজা।”

রোজা চমকে না তাকিয়েই বলল, “ হুমম!”

“ এদিকে তাকা। “

রোজা তাকাতেই লাভাময় চোখের দেখা পেল।
“ ক,,কি ? কিছু বলবেন? “

তূর্জান একবার নাহিয়ানের দিকে তাকাল। মন তো চাচ্ছে নাহিয়ানের চোখ মুখ ফাটাতে। তবে ইচ্ছাকে এখন দমিয়ে রাখল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,“চল, একটু দরকার আছে।”

“এখন?”

“হ্যাঁ, এখনই।”

নাহিয়ান কিছু বলার আগেই তূর্জান রোজার হাতটা ধরে ফেলল।রোজার চোখ বড় হয়ে গেল।
“এই… কি করছেন? লোকজন দেখছে।”

“ তো কি? আমি কি এমন করছি তোর সাথে যে লোকজন দেখছে বলে তোর সমস্যা হচ্ছে?চল।”

বলেই রোজার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসলো। একটা কোনায় দাড়িয়ে বলল, “ আরাজের গিফট আমার রুমে আছে, যা নিয়ে আয় সেটা। “

“ অর্ডার করলেন আমাকে ? “

“ তোর যা মনে হয়!”

“ আমি কারোর অর্ডার মানি না। “

“ তো ভালোবাসা দিয়ে বলবো? “

বলেই একপা করে রোজার দিকে এগোতে থাকলো। রোজা শাড়ি না পড়ে থাকলে এতক্ষনে দৌড় লাগাতো। তবে এই শাড়ির বাচ্চা শাড়িই তো ঝামেলা বাধিয়ে দিল। তূর্জান একটা সাদা গোলাপির মিক্সড গোলাপ নিয়ে নিল একটা ভেস থেকে। তারপর রোজার সাথে একটু দুরুত্ব রেখে দাড়ালো। রোজার নিশ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম। চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে। তূর্জান মুখে হালকা ফু দিয়ে বলল, “ নিশ্বাস নে গাধী, দম আটকে গেলো। “

“ আপনি সরুন। “

“ তূর্জান সরলো না, বরং মাঝে যথেষ্ট জায়গা দুরুত্ব রেখে দাড়িয়ে রোজার চুলে গোলাপটা লাগিয়ে দিল। এবার যেন রোজার সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে। তূর্জান আবার ও রোজার মুখে ফু দিয়ে বলল, “ নাও পারফেক্ট। এবার নিশ্বাস নে, নয়তো আমার জীবন চলে যাবে। রুম থেকে গিফট বক্স নিয়ে আয়। “

বলেই চলে গেল। রোজা যেন হাপ ছেড়ে বাচল। আলতো করে চুলে গোজা গোলাপ টাতে হাত ছোয়ালো, তারপর মুচকি হেসে পা বাড়ালো তূর্জানের রুমে।


নেওয়াজ পরিবার সবাইকে নিয়ে কেক কাটতে ব্যাস্ত হলো । তানিয়া নেওয়াজ, রেহেনা নেওয়াজ অতিথিদের আ্যপায়নে ব্যাস্ত। রাহেলা নেওয়াজ একপাশে বসে আছেন। তিনি এখন আগের মতো ওত চলাফেরা করতে পারেন না। তাজারুল নেওয়াজ বন্ধুদের সাথে আছেন। এই বয়সেও যে বন্ধুদের দেখা পাবেন এটা ভাবতেই পারেননি। বিসনেস পারপাসে বন্ধুদের সাথে দেখা হয়ে গেল। মোস্তফা নেওয়াজ একটু পরপর রোজার খোজ নিচ্ছে। অতিরিক্ত লোকজনের ভিতরে রোজা থাকতে পারে না।

রোজা এখনো দিধা নিয়ে দাড়িয়ে আছে । কারণটা অবশ্য পাশে ওই নাহিয়ান দাড়িয়ে আছে। সরার ফুসরত টুকু নেই। হঠাৎ নাকে সেই Roja Perfums Haute Luax এর তীব্র গন্ধ এসে আটকালো। তড়িৎ গতিতে পাশে তাকাতেই দেখল, তার আর ওই ছেলেটার মাঝে তূর্জান নেওয়াজ দাড়িয়ে আছে নির্বিকার ভঙ্গিতে। মনে হচ্ছে সে কিছুই জানে না। আরাজের দুপাশে রোজা আর তুবা দাড়িয়েছে। আর পিছনে রাফেজ আর রাফিয়া দাড়িয়ে। মিরান বর্তমানে ক্যামেরাম্যানের দায়িত্বে আছে।

তুবার থেকে একটু দুরুত্বে আরিয়ান দাড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার তুবাতে নিবদ্ধ। আর রোজার হিটলার, তার দৃষ্টি, ব্যবহার, মন কোনো কিছুই বোঝার সামর্থ কারোর নেই। সে তো নির্বিকার অথচ রোজাকে প্রটেক্ট করতে তার পাশে দাড়িয়ে আছে। তুবা আর রোজা আরাজকে হাত ধরে কেক কাটায় সামিল হতে বলল।ছোট্ট আরাজও ফুফিদের সাথে হেসে কেক কাটলো। পাশ থেকে প্রতিধ্বনিত হলো,

হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!
হ্যাপি বার্থডে ডেয়ার আরাজ।
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!

একেএকে কেক কাটা শেষ হতেই বড়দের ডিনারের জন্য বলা হলো। ছোটরা বাদে সবাই ডিনারে চলে গেল। এই সুযোগেই যেন ছিল মিরান, রাফিয়া আর রাফেজ। হঠাৎ মিরান
স্টেজে এনাউসমেন্ট করল বিখ্যাত বল নাচের। যা কাপল ডান্স হিসেবেও পরিচিত। রোজা পাশে একটা সোফায় বসে আছে। কাপল ডান্স সে কি করবে? তার তো পার্টনার নেই। রোজার পাশে তুবাও এসে বসে পড়ল। সে কিছুতেই খুশি হতে পারছে না। তাদের কিছু দূরে তূর্জান বসে ফোন স্কল করছে।

হঠাৎ তুবার সামনে আরিয়ান হাত বাড়ালো। তুবা তাকাতেই বলল, “ তুমি রাজি থাকলে আমরা ডান্স পার্টনার হতেই পারি। এতে আমাদের মধ্যে কথা বলাও হয়ে যাবে, লাইফ পার্টনার হওয়ার জন্য। “

লাইফ পার্টনার, কথাটা শুনতেই তুবার বুকটা ধক করে উঠল। সে তো এই ভয়টাই পাচ্ছে। আবার এই ছেলে এসেও ভয় দেখাচ্ছে। তবে পাশ থেকে রোজা তুবাকে খোচা দিল, একটা মানুষ এসে হাত পেতে রেখেছে। আর তুবা নির্বিকার হয়ে বসে আছে। তবে আজকে তুবা বেশ অবাক হলো, যেই মেয়ে ছেলেদের পাশ ঘেষে না। সে আজ তুবাকে একটা ছেলের হাত ধরে গিয়ে ডান্স পার্টনার হতে বলছে। তুবার আর কি করার একটা মানুষকে তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তাই ইতস্তত করে হাত ধরে এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে।

তূর্জানে সামনে একটা মেয়ে এসে হাত বাড়িয়ে নাচের পার্টনার হতে বলল। তূর্জান মেয়েটার দিকে
তাকানোর প্রয়োজনই মনে করলো না। মেয়েটা হেসে বলল, “ আমি মিথিলা। মিথিলা মির্জা। আরিয়ান ভাইয়ার কাজিন,আমরা চাইলে ডান্স পার্টনার হতেই পারি। আপনিও সিঙ্গেল, আমিও। “

মেয়েটার মনে উচ্ছাসের ঝড়। তার ধারণা ডান্স পার্টনার হলে লাইফ পার্টনার হতে কত দেরি? আর আজ পুরো পার্টিতে যে কজন মেয়ে এসেছে তাদের বেশিরভাগেরই চোখ আটকেছে এই পুরুষে। কিন্তু ব্যর্থতা, এই পুরুষকে কোনো মেয়ের দিকে তাকানো দেখা গেল না। পার্টিতে তো কম সুন্দর মেয়ে আসেনি। তাহলে?

তূর্জান ফোনের দিকে একধানে তাকিয়ে আছে। মিথিলা দেখতে চাইলো এত মনোযোগ দিয়ে কি দেখছে, তাকাতেই দেখল। একটা মেয়ের হাস্যজ্জ্বল ছবি। সামনে তাকাতেই মিথিলা অবাক। এই মেয়েটা তো সামনেই বসে আছে। তাহলে এর ছবি ফোনে রেখে এতো দেখার কি আছে? মেয়েটা হয়তো কিছু বলতে যাবে, এর আগেই তূর্জান রোজার ছবি দেখিয়ে বলল,

“ সি ইজ মাই ওয়াইফ। আই মিন মিসেস তূর্জান নেওয়াজ। সো আপনি যে চিন্তা মাথায় এনেছেন ওটা ঝেড়ে ফেলুন আপু। আপনাকে কিন্তু যে সে আপু বলিনি, একেবারে মায়ের পেটের বোন বলেছি। আমি বাবার সম্পত্তি ভাগ দিতে পারবো, কিন্তু আমাকে না। আমি তূর্জান নেওয়াজ, অনেক বছর আগেই মিসেস নেওয়াজে আসক্ত হয়ে গেছি। “

বলেই আবার ফোনে মনোযোগী হলো। কি ভেবে রোজার দিকে তাকিয়ে দেখল। রোজা তূর্জানের দিকে তাকিয়ে আছে। তাকাতেই চোখাচোখি হলো। সামনে ওই নাহিয়ান নামের ছেরেটা দাড়িয়ে। রোজা বোঝাতে চাইলো সে ডান্স করবে না। তূর্জান চোখ দিয়ে ইশারা করে বোঝাল ডান্স ফ্লোরে যেতে।তবে ওই ছেলের গায়ে স্পর্শ যেন না করে। রোজা বাধ্য হয়ে ডান্স ফ্লোরে গেলো। তবে নাহিয়ানের হাত ধরল না একাই গেল।

তূর্জানও ডান্স ফ্লোরে গেল পিছু পিছু মিথিলা আসলো। মিথিলার মনে আনন্দের প্রহর। যাক লাইফ পার্টনার না পেলেও তো একবারের জন্য ডান্স পার্টনার হিসেবে তূর্জান নেওয়াজকে পাওয়া গেল। কিন্তু ব্যর্থতা একটাই, গার্লফ্রেন্ড হতে এসে যে, মায়ের পেটের বোন হয়ে যাবে সেটা ভাবেনি। আবার কি বলে, বাবার সম্পত্তি দিতে রাজি।

যে যে তার পার্টনার নিয়ে রেডি হলো। রাফিয়া আর রাফেজ। নূর আর সমুদ্র। তুবা আর আরিয়ান, অনন্যা আর মিরান। যদিও অনন্যা কে একপ্রকার জোর করেই রাজি করিয়েছে রাফিয়া।

শুধু রোজা নাহিয়ানের হাত ধরছে না। এমনকি অধিক দুরুত্ব বজায় রেখেছে, যতটা দুরুত্ব থাকলে ডান্স করাও সম্ভব না। তূর্জান রোজার পাশের স্থান নিল। লাইট অফ হয়ে হালকা মৃদু আলো জ্বললো। অন্ধকারে হালকা আলোতে সবকিছু ঝাপসা।কাছের ব্যক্তি ছাড়া কাউকে চেনার উপায় নেই।

গান বাজতেই নাহিয়ান যেই রোজার হাত ধরতে যাবে ওমনি তূর্জান মিথিলাকে ঘুরিয়ে নাহিয়ানের কাছে ফেলল। আর রোজাকে একটানে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। রোজার মুখ তূর্জানের বুকে গেথে আছে। হ্যাচকা টানে রোজার কোমড়ের কাপড় কিছুটা সড়ে গেছে। তূর্জান একহাতে রোজার উন্মুক্ত কোমড় ধরে অন্য হাতে আগে কাপড় দিয়ে পেট ঢেকে দিল। রোজার আঙুলের ভাজে দিয়ে দিল নিজের আঙুল ।

রোজা হঠাৎ আকস্মিক টানে চোখ বন্ধ করে নিল। হঠাৎ সেই চেনা Roja Perfums Haute Luax পারফিউমের গন্ধে আর উন্মুক্ত কোমড়ে শীতল হাতের ছোয়া পেতে তড়িৎ গতিতে চোখ খুলল। তূর্জান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে রোজার চোখের দিকে। গানের সূর ভেসে আসছে।

Hai ya nasha (এটা কি নেশা )
Ya hai zeha (নাকি বিষ )
Iss pyar ko hum (এই ভালোবাসাকে আমরা )
Kya naam dein ( কি নাম দেব)
Kab se adhuri hai (অনেক দিন ধরে )
Ik daastaan ( অসম্পূর্ণ এক গল্প )
Aja usey aaj ( চলো আজ তার )
Anjaam dein ( শেষটুকু্ করে দিই )

গানের তালে তূর্জান রোজাকে ঘুরাচ্ছে। রোজা কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল,

“আপনি এমন কেন?”

“কেমন?”

“কেমন রহস্যে ঘেরা মানব, যাকে দেখলে কখনো খারাপ কখনো ভালো আবার কখনো অচেনা লাগে। আপনাকে পড়া সবার দাড়া সম্ভব না।”

“তো আমার “মনোপাঠিকা”, আপনি কিভাবে পড়লেন আমাকে?

“পড়িনি, ভাবছি আপনাকে পড়ে মনরহস্য বের করব। “

“মনরহস্য বের করতে গিয়ে যদি আটকে পড়েন, ওই মনোরহস্যের বেড়াজালে।”

তূর্জানের চাহনি যেন আজ বড্ডো নেশালো।সাথে কণ্ঠে কেমন মাদকতা। এতদিনে রোজা হালকা খেয়াল করলেও আজ ঠিকই তূর্জানের ওই স্বচ্ছ চোখ গভীরতা রোজার চোখে পড়ল। কেমন মায়া জরানো ওই নেশাতুর চোখে যেন প্রথম দেখাতেই যে কেউ প্রেমে পড়বে। রোজার যেন তূর্জানে চোখ থেকে চোখ সরাতেই ইচ্ছে করছে না। তবে নিরবতা ভেঙে তূর্জান বলল,

“তা আমার “মনোপাঠিকা”, মনের প্রশ্ন গুলোকে দিয়ে রহস্য ভেদ করতে গেলে আপনাকে কিন্তু অনেক কিছু সহ্য করতে হবে, পারবেন? “

রোজা অবুঝের মতো মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল।

“হুম, সবকিছু সহ্য করতে রাজি তবে ওই চোখের রহস্য ভেদ করবোই। “

“আবারো সাবধান করছি, আটকে পড়বেন রহস্যে বেড়াজালে ভীষণ ভয়ঙ্করভাবে।”

“ তাও ওই চোখের রহস্য ভেদ করব।”

“ যদি না পারেন? “

“ চ্যালেঞ্জ করলেন? “

“ বলতে পারেন, চ্যালেঞ্জই। “

“ আমাকে চ্যালেঞ্জ করলেন তো! হারার জন্য রেডি হোন।”

“ ওকে। “


ওদিকে তুবা যেন ঠেকা পড়ে ডান্স করছে। তার ইচ্ছে মোটেও নেই। যাস্ট একটু তাল মেলাচ্ছে। আরিয়ানই বলল, “ তোমার র সাথে কিছু কথা ছিলো। “

“ হুমম, বলুন। “

“ আমাদের বিয়েতে তুমি রাজি। “

এ বিয়ে আনলো কোথা থেকে। তুবা তো ঠিক করেছে আজকে তাজারুল নেওয়াজ কে সত্যিটা বলে দেবে। যা হওয়ার হবে। তবে ওই অচেনা লোককে ছাড়তে পারবে না। তুবা যে তার মায়ায় আটকে গেছে। তবে বাইরের মানুষের কাছে এসব বলা ঠিক হবে না। তাই বলল, “ পরিবারের খুশিতে আমি খুশি। তারা নিশ্চই আমার ভালো চাইবে। “

“ কাউকে ভালোবাসো? “

তুবার নিশ্চুপতা দেখে আরিয়ান মৃদু হাসলো। তারপর নিজেই বললো, “ কাউকে ভালোবাসলে বলতে পারো…

কথা শেষ হওয়ার আগেই তুবা বলল, “ এই বিয়েটা ভেঙে দিতে পারবেন?”

“ তুমি তো কাউকে ভালোবাসো না। তাহলে বিয়ে ভেঙে কি করবে? সারাজীবন আনম্যারিড থাকার শখ? “

আরিয়ানের দুষ্টামি কথা তুবার একটুও ভালো লাগলো না। তুবা এবার সরাসরি বলল, “ আমি এই বিয়েটা করতে চাই না। “

“ কেন? আমাকে পছন্দ নয়? না-কি..

“ আমি একজনকে ভালোবাসি। “

“ তাহলে আগে তোমার বাবাকে বলোনি কেন? তোমার বাবা তো আমার বাবাকে কথা দিয়ে দিয়েছে। “

“ আমি তখন ভয় পেয়েছিলাম।”

“ এখন পাচ্ছো না? “

“ না। “

“ কেন? “

“ এখন মনে হচ্ছে ভয় পেলে , আমি তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবো। আমি ওই বেইমানকে হারাতে চাই না। “

“ বেঈমান? “

“ তো কি? হঠাৎ উধাও হলে তাকে কি বলে? যার সাথে কথা না বলে আমি থাকতে পারছি না। সে উধাও হলো, একবার কল দিয়ে আমার খোজ পর্যন্ত করল না, আমি কেমন আছি। তাকে কি বলে? “

“ তাকে বেঈমান বলাই উচিত ম্যাডাম। কিন্তু তার সামনে তার এইরকম প্রশংসা ঠিক সহ্য হলো না। যদি সে আপনাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে বিদেশ থেকে ফিরে আসতে পারে । তবে সারপ্রাইজ পাওয়ার জন্য এতটুকু সহ্য করা কি আপনার জন্য বেশি হয়ে যায় ম্যাডাম ? “

বলেই মিটিমিটি হাসলো। এই ম্যাডাম কথাটা শুনতেই তুবা আরিয়ানের দিকে তাকালো। আরিয়ান সাথে সাথে বললো, “ উহু, চোখ নিচে নামান, পরপুরুষের দিকে ওমন নজর দেওয়া উচিত না। আর আমার ম্যাডাম কিন্তু পরনারীর দিকে তাকাতে নিষেধ করেছে জন্যই আমি আপনার দিকে তাকাচ্ছি না। আপনিও নিজের নজর সংযত করুন,, ম্যাাা..ডাম। “

নাচের শেষ পর্যায়ে তূর্জান রোজার কোমড়ের কাছে দুহাত দিয়ে বন্ধনী বানিয়ে একেবারে নিজের কাছে টেনে নিল। চারিদিকে আলো জ্বলে আলোকিত হলো। রোজা এতক্ষন তূর্জানের সাথে কথা বললেও আলো জ্বলাতে ভীষণ লজ্জা পেল। তূর্জান তখনো রোজার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। রোজা তূর্জানের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে এক কোণায় গিয়ে বসল। বসতেই তুবার হাস্যজ্জ্বল মুখ চোখে পড়ল।

এদিকে রাফিয়া রাফেজের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো। তা দেখে রাফেজ বলল, “ আমার বউয়ের বুদ্ধি বেশি তা মানতেই হয়। নয়তো এক ঢিলে তিনজোড়া পাখি একসাথে করলো কিভাবে? দেখতে হবে তো বউ কার? ইউ আর জিনিয়াস মিসেস রাফেজ নেওয়াজ। “

ইনশাআল্লাহ চলমান…

🫣🫣 #মনোপাঠিকা নামটা কেমন লেগেছে। তূর্জানের মনোপাঠিকারা। 😁 #বড় পর্ব মানে বড় করে মন্তব্য। ভুল যেন না হয়⛏️🤕

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply