প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৩০||
ফারজানারহমানসেতু
দোলনাটা আস্তে আস্তে দুলছে।আর সেই দোলনার উপর, তূর্জান একদম নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে রোজার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।যেন বহুদিনের ঘুম তৃষ্ণার্থ ব্যক্তি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর যার কোলে মাথা রেখেছে তার কাছে যেন সে স্রেফ একটা আপনজন থেকেও অন্য কিছু। যার কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে রাত পার করা সম্ভব।
রোজা স্থির। একদম যেন কোনো পাথর বসে আছে এমন অবস্থা। হাত দুটো সেই আগের জায়গাতেই আছে। তূর্জান বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে বললেও যেন কথা কানেই যাচ্ছে না। যেন সময় মাঝ আকাশে থেমে আছে। ছোঁবে কি? না ছোঁবে না?
এমন ভাবনার মাঝেই চোখ বন্ধ রেখেই বলল তূর্জান,“কি হলো? সার্ভিস বন্ধ না-কি? ওমন পাথরের মতো বসে আছিস কেন? ”
রোজা ঠোঁট কামড়ে ধরল। সে কি করে একজন ছেলের মাথা স্পর্শ করবে। দোমনা করে হাত দিতে গেলো মাথায়। আবার ফিরিয়ে নিল হাত। সামান্য মাথায় হাত দিতে গিয়ে এমন কাপাকাপির কি আছে? অদ্ভুত!
রোজা চোখ বন্ধ করে বলল, “আপনি মানুষটা কেমন যেন? “
চোখ না খুলেই হালকা হাসল তূর্জান। তূর্জান বেশ বুঝতে পারছে রোজার অবস্থা। তবে তূর্জান এখন আর এসব কাপাকাপির জন্য রোজাকে একচুল পরিমান ছেড়ে দিবে না। এই মেয়ে অতিরিক্ত স্বাধীনতা পেয়ে তাকে দামই দিচ্ছে না। এদিকে তূর্জান বউয়ের আশায় মরে যাচ্ছে, আর এই মেয়ে কি দিব্যি হেসে খেলে বেড়ায়। তূর্জান একা কেন পুড়বে। যার জন্য তূর্জানের মন পুড়ছে তাকেও পোড়ানো যাক। তূর্জান বলল,“তাই নাকি? জানতাম না তো? তা আমি কেমন? ”
“ জানি না, কেমন কেমন যেন? রহস্য রহস্য গন্ধ আপনার ব্যবহারে। “
“ সত্যিই? “
“ হুমম!”
“আচ্ছা ভালো। এবার চুলে বিলি কেটে দে।”
“ পারবো না। “
“ আমার এতসাধের চুল যে ছোঁয়ার অনুমতি পেয়েছিস এটা তো তোর ভাগ্য!জানিস এই চুলের পিছনে কতটাকা খরচ হয়। আর তুই সেই সুযোগ কে অবহেলা করছিস? “
“ আপনার সাধের চুল ছোঁয়ার ইচ্ছে নেই আমার। আপনার দামী চুল আপনি পকেটে রাখেন। “
“ কিহহ? তোর টাকলা বর পছন্দ? “
রোজা যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে কখন বলল, তার টাকলা বর পছন্দ? আজব! তার বড়বাবা কি জানে তার ছেলে পাগলের খাতায় নাম দিয়েছে? নিশ্চয় জানে না। তবে তা জানানোর দায়িত্ব না হয় রোজা নিজে নিবে। রোজা তড়িৎ গতিতে বলল,
“ আমি তা কখন বললাম? “
“ এইযে বললি!”
“ ঘোড়ার ডিম বলেছি। সরুন তো! আমি ঘুমাবো।”
“ ঘুমিয়ে পড়। তোকে নিষেধ কে করেছে? “
“ আপনি না সরলে কিভাবে রুমে যাবো? “
“ এখানেই ঘুমিয়ে পড়। “
রোজা এবার নিশ্চিত তূর্জান পাগল হয়েছে। নয়তো রোজাকে ছাদে ঘুমাতে বলবে কেন? তাও নিজে রোজার কোলে মাথা রেখে রোজাকে ঘুমাতে বলছে। রোজা তূর্জানকে হাতে ঠেলে নিজের কোল থেকে সরাতে গেলেও পুরুষালি শক্তির কাছে তুচ্ছ। যদিও তূর্জান কোনো শক্তি প্রয়োগ করেনি। তবে রোজার ধাক্কা দেওয়ার সময় যে উঠে বসবে তাও বসেনি। মানে একপ্রকার ছোট বাচ্চাদের মতো অবস্থায় তূর্জান নির্বিকার হয়ে আছে। রোজা তূর্জানের দিকে তাকিয়ে দেখল এখনো চোখ বন্ধ করে নিরীহ প্রাণীর ন্যায় শুয়ে আছে।
“ উঠুন, আমার পা ব্যাথা হয়ে গেলো। আমি তো এখন মনে হচ্ছে সিড়ি দিয়ে নামতেই পারবো না। “
“ অভ্যাস করে নেন ম্যাডাম ! “
রোজাও তূর্জানের মতো বলল, “ সরি স্যার! আপনার কথা রাখতে পারছি না। আপনি অতিরিক্ত ভারি। আমার হাড্ডি সবগুড়া হয়ে গেলো। আমি আর পারছি না। “
“ মন থেকে করেন ম্যাডাম! দেখবেন ধৈর্য আর শক্তি সব এমনিতেই চলে আসবে। “
“ এইই.. এই তূর্জান ভাই। আপনি উঠবেন কি না বলুন তো? আপনার এতসব প্যাচানো কথাবার্তা বুঝতে পারছি না। একে তো রাত অনেক হয়েছে, তার উপর রাতভর পাগলামো করছেন। আর আমাকে ধৈর্য বানাতে বলছেন কেন? আপনার বউ আসলে তাকে বলবেন। “
একটু থেমে আবার বলল, “ এইই.. আপনাকে আবার জ্বিনে টিনে আছর করলো না তো? আপনার মুখ থেকে এত সুন্দর কথা বের হচ্ছে। তবে যাই বলেন,, জ্বিনটা ভালো আছে, আপনি আমার সাথে খ্যাচখ্যাচ করেন তাই আপনাকে দেখাচ্ছে কিভাবে কথা বলতে হয়। “
“ এত কথা কিভাবে বলিস? মুখ ব্যাথা হয়না? “
“ আপনি শুনলেন কেন? আপনাকে বলেছি শুনতে? আমার মুখ, আমার সব আমি কথা বলেছি, আপনার কি?“
“ রেগে গেলি? আচ্ছা বাদ দিলাম। “
বলেই আবার বিরবিরালো,” হুমম, সব তো তোরই। কথা গুলোও তোর হাজবেন্ড ও তোর। ধৈর্য ধরে তোর কথা শুনেও সে। আমার কি? “
“ মাথা ব্যাথা করছে!” তূর্জানের এই এক কথা! রোজা আর দেরি করল না। ধীরে ধীরে হাত রাখল তূর্জানের চুলে…প্রথম ছোঁয়া। তার হাত কেঁপে কেঁপে উঠল। বুকের বা পাশে হঠাৎ বিদ্যুৎ এর ন্যায় শক লাগলো। এত কাছ থেকে এই মানুষটাকে এইভাবে ছোঁয়া, অদ্ভুত এক অনুভূতি।
তূর্জান একটুও নড়ল না। আবার যেন ঘুমিয়ে পড়তে উদ্দত হলো। শুধু নিঃশ্বাসটা যেন একটু ধীর হয়ে গেল আগের চেয়ে । তূর্জানের চুলে জ্বোরে টান অনুভূত হতেই বুঝতে পারল, রোজা তার চুলের সাথে যুদ্ধে নেমেছে। তবে সব থেকে বড় অস্ত্র হলো নিরবতার সহীত কাউকে আপন করে নিজের গন্ডিতে চালানো।
আস্তে বলল তূর্জান ,“এইভাবে না। আস্তে … মাথা ব্যথা করছে। তাকাতে পারছি না । আরও কষ্ট দিতে চাস?”
রোজা এবার মন দিয়ে করতে লাগল নিজের কাজ।আস্তে আস্তে আঙুল চালাতে লাগল তূর্জানের চুলের ভেতর। তূর্জানের চুল যেন স্কিলের সুতার ন্যায় সুক্ষ আর ঝলমলে। রোজা আরেক দফা প্রেমে পড়তে যাচ্ছে। চারপাশ নিস্তব্ধ…হালকা বাতাস বইছে ছাদে।
দূরে কোনো বাসা থেকে ভেসে আসা গানের শব্দ গুলো এই পর্যায়ে মাতাল করার মতোই লাগছে রোজার ন্যায়। চোখ বন্ধ রেখেই ডাকল তূর্জান।
“রোজা…”
“হুম?”
“আজকে কেঁদেছিলি?”
রোজার হাত থেমে গেল। তূর্জান তো সারাদিন বাড়িতে ছিলো না। তাহলে জানলো কি করে? রোজা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,“না…”
“ মিথ্যা বলিস কেন? ”
“আপনি সব জানেন?”
“সব না। কিন্তু তোর কান্না বুঝি, তোর চোখ দুটো কেমন ফুলে আছে…”
এই একটা কথায় বুকের ভেতরটা নরম হয়ে গেল রোজার। সে আবার হাত চালাতে লাগল।এবার কেন জানি আর জোর করে হাত চালালো না চুলে, বরং নিজের মনের ইচ্ছেতে। কিন্তু এবার রোজার চোখে জল চলে এসেছে। ধীরে বলল তূর্জান, “আমি… রাগ করেছিলাম। কিন্তু তোর উপর না… নিজের উপর কেন জানি তখন রাগ হচ্ছিলো। তখন রাগ করার জন্য সরি! বাট তোকে হার্ট করতে চাইনি।”
রোজা ফিসফিস করে বলল, “জানি… আপনি সবাইকে নিয়ে পজেসিভ।”
তূর্জান চোখ খুলল না এবার ও। মনে হচ্ছে চোখ খুললেই রোজা বলবে আপনার মাথা ব্যাথা শেষ। এবার আমি যাই। তবে তূর্জানের ব্যাপারে রোজার সব জানা দরকার। তূর্জানের ভালো দিক যেমন রোজা জানার অধিকার রাখে, তেমনি খারাপ দিকে জানতেও। নয়তো এই পৃথিবীতে তূর্জান নেওয়াজ খোলা বই হবে কার কাছে? ছেলেরা ছোট থাকতে মায়ের কাছে, আর বড় হয়ে নিজের অর্ধাঙ্গিনীর কাছেই একমাত্র খোলা বই হতে পারে। বাকি সবার কাছে কেবল গাম্ভীর্য এক মানব।
তূর্জান বলল, “আমি রেগে গেলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনা, বিশেষ করে নিজের প্রিয় কোনো জিনিস বা মানুষ হারানোর কথা উঠলে।
এটা আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এটা মানিয়ে নিতে পারবি? এটা মানিয়ে নিতে পারলে আমার নিজের জীবনের বিনিময়ে তাকে আমি পৃথিবীর আজন্ম সুখ দিতে প্রস্তুত…”
রোজার হাত থেমে গেল পুরোপুরি। রোজা ধীরে বলল,“আমি? না মানে আমার মানাতে কি এসে যায়?এভাবে কথা বলবেন না…
হালকা হাসল তূর্জান,“কেন?”
“ভয় লাগে…”
“আমাকে?”
“না, আপনার ঘুরিয়ে বলা কথাকে।”
তূর্জান এবার চোখ খুলে তাকাল রোজার দিকে
খুব কাছ থেকে যেন বলল, “আমি তোকে ভয় পাইয়ে দিতে চাই না রোজা…। তাই এই টপিক বাদ।
রোজা কিছু বলল না। হাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেছে।ছাদের নীরবতা, আর দুইটা হৃদয়ের শব্দ
তূর্জান ধীরে উঠে বসল।বলল সে,“চল, একটা কাজ করি…”
“কি?”
“নতুন ফোনটা সেটআপ করি…”
রোজা একটু অবাক হয়ে বলল,“এখন?”
“হুম… এখনই।
“নাহলে তুই আবার সারারাত কাঁদবি… কেঁদে নেওয়াজ বাড়ি ভাসিয়ে ফেললে থাকবো কোথায়? “
“আমি কাঁদি না!”
“ হুমম,আমি জানি। রোজাস্মিতা মেহরোজ কাঁদে না। সে তো শুধু বৃষ্টির ন্যায় চোখ থেকে পানি বের করে। “
রোজা মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকাল। নতুন ফোন, নতুন শুরু অধ্যায়। তূর্জান ফোনটা অন করতেই স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল রোজার চোখ চকচক করে উঠল। রোজার ছবি দেখতে পেল।
দশবছরের কোনো একটা ছবি হবে।যদিও চেনার উপায় নেই। তবুও নিজেকে আবিষ্কার করতে পারল রোজা। একদম নতুন… একদম নিজের…বলল তূর্জান,“পাসওয়ার্ড দে…”
“আমি দিবো?”
“হুম। এটা তোর ফোন…”
রোজা ধীরে ধীরে বলল, “ সমস্যা নেই, আপনিই সেট করেন। “
তূর্জান তাকিয়ে আছে…কিন্তু কিছু বলছে না। রোজা জিজ্ঞেস করল, “কি?”
“কিছু না, তা এত বিশ্বাস করলি কেন?”
রোজা নিশ্চুপ, সত্যিই তো নিজের অজান্তে তূর্জানের উপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে যাচ্ছে।
“ তা এই ফোনে প্রথম কলটা কাকে দিবি?”
রোজা একটু ভেবে বলল,“তুবাকে…”
তূর্জান বেশ অবাকই হলো। এই মেয়ে বলতে তো পারতো আপনি যখন ফোন দিলেন, আপনাকেই প্রথম কলটা দি। না স্বামী ছেড়ে ননদকে বেশি প্রয়োরিটি দিচ্ছে। ভ্রু তুলল তূর্জান।
মুখে বলল,“আমাকে না? না মানে ফোন তো আমিই গিফট করলাম। প্রথম কলটা আমার কাছে যাওয়া উচিত। “
“আপনি তো সামনে আছেন…”
“তাও দিতে পারিস…”
রোজা হালকা হেসে ফেলল। প্রথম কল তূর্জানের নাম্বারেই দিল অবশেষে। তূর্জান একে একে সব সেট করতে লাগল WiFi, অ্যাকাউন্ট, অ্যাপস। “গুগল আইডি মনে আছে?”
রোজা থেমে গেল। সে তো ওসবে কোনোদিন খেয়ালই করে নি। আর ওই ফোনের সেটিংস ও মিরান করেছিল।
“উমম… পাসওয়ার্ডটা ভুলে গেছি।”
বলল তূর্জান,“স্বাভাবিক বাট তোর ভোলার রোগ আছে। তুই তো সবকিছু ভুলে যাস…”
“ ওহ হ্যালো মিস্টার,আমি কিছুই ভুলে যাই না! শুধু শুধু আমাকে খোচাচ্ছেন। আপনার যে ঝগড়ুটে বউ পছন্দ তা ভালো করেই বুঝতে পারছি।
“হয়ে গেছে। “ ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল তূর্জান।
রোজা খুশি হয়ে ফোনটা নিয়ে বলল,“থ্যাঙ্ক ইউ…”
“ওয়েলকাম…”
একটু থেমে তূর্জান বলল,“ আমার পক্ষ থেকে একটা থ্যাঙ্ক ইউ বাকি আছে…”
“কি জন্য?”
“মাথা ম্যাসেজের জন্য…”
রোজা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,“আবার শুরু করবেন না কি?”
তূর্জান হেসে ফেলল। না বোধক মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে বলল,“রোজা…”
“হুম?”
“ কিছু না। “
রোজা ভ্রু কুচকে আবার ঠিক করে ফেলল। সে তো আর পাগল না, যে তূর্জানের সাথে পাগলামি করবে। তাছাড়া তার আবার নিউ ফোন হয়েছে।
রোজার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। ফোনটা নিয়ে দেখতে শুরু করল।
তূর্জান উঠে গিয়ে রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আকাশে তারা হালকা বাতাস, আর মাঝখানে দুইটা মানুষ, যারা ধীরে ধীরে একে অপরের হৃদয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ নিরবতা ভেঙে তূর্জানের ফোনটা বেজে উঠল। রাত প্রায় বারোটা ছুইছুই। এতো রাতে তূর্জানকে ডিসটার্ব করার মতো কেউ নেই। ফোনেই রিং হতে দেখে একপ্রকার বিরক্ত তূর্জান। ফোন বাজার আর টাইম পেল না। যেই বউয়ের কাছে থাকতে পারে, বা একটু থাকতে চায়। সেই কোথা থেকে টর্নেডো এসে হামলা করে মিষ্টি মূহর্তে। ফোনের স্কিনে চোখ পরতেই বিরবির করলো, “ শালার অশুড় মশাই! এমন শশুরের চেয়ে বাড়িতে মিরজাফর পালা অনেক ভালো। অনন্ত শেষ মূহর্তে মিরজাফরী করবে।“
কল রিসিভ হতেই কর্কশ গলা ভেসে এলো, “ আমার মেয়ে কোথায়? “
“ পকেটে নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছি। “
“ তূর্জান ফাজলামো করবে না। রোজা কোথায়?”
“আপনার মাথার উপর, আই মিন,ছাদে আছে। “
“ এতরাতে আমার মেয়েকে ছাদে নিয়ে গেছো কেন? আর ওখানে রেখেছো কেন ? “
“ আপনার মেয়ে তো খুকী, যে কোলে করে ছাদে এনেছি। আপনার ত্যাড়া মেয়ে নিজ ইচ্ছেতে ছাদে এসেছে। আর নিজ ইচ্ছেতে এখানে আছে। “
“ ওর কাছে ফোন দাও। ও ঠিক আছে তো? কি করেছো ওর সাথে? “
“ শশুরমশাই এতরাতে এসব বলতে ফোন করেছেন? আর আমি আপনার মেয়েকে কি করবো? আপনি কি কোনো ভাবে…
বলতেই মোস্তফা নেওয়াজ কেশে উঠলেন। তিনি তো ভুলেই গেছিলো কার সাথে কথা বলছে? তিনি তাই আর কথা বাড়ালেন না। বললেন, “ নিচে আসো তাড়াতাড়ি। অনেক রাত হয়েছে।”
“ এসে নিজ দায়িত্বে নিয়ে যান। আপনার মেয়ে ছাদে থাকতে চাইছে।বলছে পরে যাবে। “
“ তূর্জান, রোজাকে নিয়ে নিচে নামো তাড়াতাড়ি।“
“ কোলে করে? “
“ বেয়াদব ছেলে, কাধে করে নামো।”
বলেই ভদ্রলোক কল কাটলেন। তূর্জান রোজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “ অনেক রাত হয়েছে নিচে চল। “
“ আরেকটু থাকি!”
“ নাহ!আর থাকতে হবে না। ওয়েদার ভালো না, বৃষ্টি আসতে পারে। “
রোজা আর কথা বাড়ালো না। উঠে দাড়াল। এতক্ষন বসে থাকায় পায়ে ঝিঝি অনুভূতি না হলেও উঠে দাড়াতেই যেন মুখ থুবড়ে পড়ল। তবে ছাদের মেঝেতে পড়েনি। পড়েছে তূর্জান নেওয়াজের বলিষ্ঠ বাহুডোরে।তূর্জান কোনো কথা না বলে ঝট করে কোলে তুলে নিল। রোজা আবার পায়ে ঝাকুনি অনুভব করতেই চোখমুখ খিচে বন্ধ করে ফেলল। রোজা না চাইতেও বারবার এই পুরুষের বাহুডোরে পড়ে যাচ্ছে। কেন মস্তিস্কে এই পুরুষ ঢুকে যাচ্ছে। শুধু মস্তিস্কে গিয়ে শান্ত হচ্ছে না।
মস্তিস্কে বিচরণ করতে করতে জায়গা করে নিচ্ছে। “ আমি এমনিতেই যেতে পারতাম। একটু বসলেই পা ঠিক হয়ে যেত। শুধু শুধু কষ্ট করে কোলে না নিলেও চলতো। “
“ নামিয়ে দিবো? না-কি ফেলে দিবো? ছাদ থেকে ফেললে অবশ্য তোর তেমন কোনো ক্ষতি হবে না।”
রোজা ভয়েতেই শেষ। তূর্জান নেওয়াজ সব পারে, যদি সত্যি সত্যিই ফেলে দেয়। ফেলতেও পারে, এর আগে একবার ফেলে দিতে চেয়ে হাত ঢিলা করেছিল। ও বাবা গো, এই বয়সে মাজা ভেঙে ঘরে বসে থাকার ইচ্ছে রোজার নেই। তাই আস্তে করে নিজের হাত দ্বারা তূর্জানের গ্ৰিবাদেশে হাত রাখল। দুহাত দ্বারা আবদ্ধ করলো তূর্জান নেওয়াজের গলা। ফলস্বরূপ বুকের কাছে গিয়ে পড়ল রোজার মুখটা। সেই পারফিউম, পারফিউম বললে ভুল হবে, রোজার জন্য মাতাল এক আসক্তি হয়ে যাচ্ছে এই পারফিউম। রোজা তো ভেবেছে এবার তূর্জানের থেকে এই পারফিউমের নাম শুনে তারপর নিজেও একটা কিনে এনে ঘরে রেখে দেবে। তূর্জান রোজার মাথায় গাট্টা দিতেই কল্পনা থেকে অবসর নিল। তবে কোনো কথা বললো না।
এখন ঝগড়া করার ইচ্ছে নেই। পায়ের রক্ত চলাচল যেন রোজার বোধগম্য হচ্ছে না। সাথে মস্তিস্কের ও। তূর্জান দোলনা হতে রোজার ফোনসহ ব্যগটা নিজের হাতে উঠিয়ে হাটা ধরল সিড়ি দিয়ে। গন্তব্য হয়তো আজ আলাদা হতেও পারে।
অন্যদিকে…ওইদিকে তুবা রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে আছে। মিরানের কথা বারবার মাথায় ঘুরছে।
“ছাদে ভাইয়া আছে।মানে… রোজা আর তূর্জান একসাথে? ইশ! এভাবে যদি তার ভাইয়ের জয় হতো, কত ভালো হতো। তার ভাইয়ার কষ্ট সে খুব ভালো করে জানে। রোজা কবে তার ভাইয়ার অনুভূতি বুঝতে পারবে কে জানে? তার বুকটা কেমন যেন লাগছে। হঠাৎ ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল। একটা অদ্ভুত নাম,
একটু ভেবে কল দিল। ওপাশ থেকে সাথে সাথেই রিসিভ হলো ,“ কি ঘুমপরি? আজ এখনো জেগে আছেন?”
“এই নামে ডাকবেন না! মানলাম ঘুমিয়ে যাই, তাই এভাবে ডাকতে হবে কেন? “
“আচ্ছা আচ্ছা সরি … বলেন, কি হয়েছে? এতরাতে এই অধমকে মনে করার কারণ? “
তুবা চুপ থেকে বলল,“কিছু না…”
“তাহলে কল দিলেন কেন?”
“এমনি…”
ফোনের অপর পাশ থেকে হাসির শব্দ আসলো।বলল,“এমনি এমনি বুঝি কল দেয় কেউ…”
তুবা কিছু বলল না। তার তো এই কণ্ঠটাতেই নেশা ধরে যায়। আস্তে জিজ্ঞেস করল অপর পাশের লোকটা,“ ম্যাডাম ঠিক আছেন, আপনি ?”
তুবা এবার একটু নরম হয়ে গেল, বলল, “হুম…”
“ হঠাৎ ফোন দেওয়ার কারণ জানতে পারি? যদি আপনি বলতে আগ্ৰহী হন তবে!“
“ ফোন দিতে কারণ লাগবে, কিন্তু আমি তো কারণ ছাড়াই কল দিয়েছি। তবে রাখি কারণ নিয়ে তবেই না হয়..
কথা শেষ হওয়ার আগেই অপর পাশের লোকটা বলল, “ কারণ যখন নেই,বলতে তো পারতেন আমাকে মনে পড়ছিল। অন্তত একটা মিথ্যা বলে হলেও তো অধমকে খুশি করতে পারতেন। “
“ আমি মিথ্যা বলতে পারি না। “
অপর পাশের লোকের হাসির শব্দ তুবার হৃৎপিণ্ডে হানা দিল। বলল, “ তা ম্যাডাম একটা সত্যি কথা বলবেন? “
“ হুমম!”
“এতো রাতে ফোন দিয়েছেন… মানে কি আমি একটু স্পেশাল হয়ে গেছি আপনার কাছে ?”
তুবা থমকে গেল। প্রশ্নটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। উত্তরটা কি দেবে সে নিজেও জানে না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,“আপনি নিজেকে স্পেশাল ভাবেছেন কেন?”
“কারণ… কেউ যদি রাতের নীরবতায় আমাকে মনে করে, তাহলে সে মানুষটা আমার কাছে স্পেশাল… আর আমি তার কাছে না হলেও, নিজেকে একটু হলেও ভাবতে ইচ্ছা করে।”
তুবার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। এই লোকটার কথা বলার ভঙ্গিটা অন্যরকম… সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু সবকিছু যেন বুঝিয়ে দেয়।
তুবা নরম স্বরে বলল, “আপনি খুব ঘুরিয়ে কথা বলেন…”
ওপাশ থেকে উত্তর এল, “ আর আপনি খুব সহজে ধরা পড়ে যান ম্যাডাম …”
তুবা আর কিছু বলল না। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে আকাশে চাঁদটা আধো আলো ছড়িয়ে আছে। হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে। মনে হচ্ছে, আজ রাতটা সবার জীবনেই একটু আলাদা।ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল,“চুপ করে গেলেন কেন?”
তুবা ফিসফিস করে বলল,“ভাবছি…”
“আমাকে নিয়ে বুঝি ? তা আমাকে না ভেবে নিজেকে নিয়ে ভাবুন ম্যাডাম । আমি এখনো এতটাও গুরুত্বপূর্ণ না।”
তুবা এবার একটু হেসে ফেলল। হঠাৎ করেই বলে ফেলল তুবা। হয়তো অজান্তেই বলল, “ভুল বললেন… আপনি ভাবার মতোই একজন।আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে…
কথাটা বলেই তুবার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা কেঁপে উঠল। এমন অনুভূতি তার জন্য নতুন। সে জানে না এটা কি—ভালোলাগা, না শুধু একটা মায়া। মায়ায় পরে মানুষ এভাবে নিজের অজান্তে কথা বলে।
কিছুক্ষণ নীরবতায় পার হলো।তারপর ওপাশ থেকে খুব নরম স্বরে—“সত্যিই …”
দুজনেই চুপ। কিন্তু এই চুপটা অস্বস্তির না, বরং একটা অদ্ভুত শান্তির। হঠাৎ কারোর তুবা বলে ডাকায় পিছনে ফিরতেই অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল।
ইনশাআল্লাহ চলমান…
সরি এগেইন। বাট আমার আর গল্প শেষ করা হবে না মনে হচ্ছে। অসুস্থতা পিছনে পড়েছে জোকের ন্যায়।
কে তুবা বলে ডাকলো, আমি ও কিন্তু জানি না। 😁
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২২