প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||২৭ ||
ফারজানারহমানসেতু
সকালের আলো পুরো বাড়িকে যেন নতুন করে সাজিয়ে তুলেছে। চারদিকে ব্যস্ততা—কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ গেস্টদের রিসিভ করছে, কেউ আবার রান্নাঘরে দৌড়াচ্ছে। আজ নূরের বিয়ে।
বাড়ির প্রতিটা কোণ যেন আনন্দে ভরে গেছে।
নূর আয়নার সামনে বসে আছে। লাল বেনারসি, গা ভর্তি গহনা, একদম পরীর মতো লাগছে তাকে।
তুবা পাশে বসে হেসে বলল,“বাহ! আমাদের নূর তো একদম কনে না, সিনেমার হিরোইন!”
নূর লজ্জায় মাথা নিচু করল।“চুপ কর না…”
ঠিক তখন অনন্যা এসে নূরের কপালে টিপ ঠিক করে দিল। তার চোখে পানি চিকচিক করছে, কিন্তু ঠোঁটে হাসি রেখে বলল, “খুব সুন্দর লাগছে তোকে…”
নূর তার হাতটা ধরে বলল,“আপু, তুই কাঁদছিস?”
“না রে পাগলি… খুশির দিন আজ, কান্না করবো কেন?”
কিন্তু ভেতরের কষ্টটা কেউ বুঝলো না। হয়তো বুঝবেও না। বাবার সেই স্বপ্ন, মেয়েদেরকে বধূ বেশে দেখবে। কিন্তু তা আর দেখা হলো না। বাবা ছাড়া থাকাটা কতটা কষ্টের তা কেবল বাবাহীন সন্তানই জানে। নূর অনন্যা কে ঝাপটে ধরে বলল, “ আপু আমি তোর আর আম্মুর মতো ওত শক্ত হতে পারি না। বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। “
বলেই কান্না করে দিল। অনন্যা তো চাইলেই কান্না করতে পারে না। সে তো বড় মেয়ে, বড় মেয়েদের কান্না করা মানায় না। নূরকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কান্না থামালো।
**
বিয়ের আসর বসেছে। আলো, ফুল, গানের সুর, সব মিলিয়ে স্বপ্নের মতো পরিবেশ। নূরকে স্টেজে আনা হলো। তার চোখ বারবার এদিকে ওদিকে উকি দিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র আসবে হয়তো এই অপেক্ষা। হঠাৎ চারপাশে গুঞ্জন হলো “বর আসছে!”
সবাই তাকালো দরজার দিকে। সমুদ্র ঢুকছে, মাথায় পাগড়ি, চোখে শান্ত দৃঢ়তা। নূরের চোখ তার উপর আটকে গেল। সময় যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।
রোজা একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়ালো তূর্জান। বলল, “কি দেখছিস?”
রোজা চোখ না সরিয়েই বলল,“ভালোবাসা, পূর্ণতা, আর…”
তূর্জান একটু থমকালো, এই মেয়ে ভালোবাসা বুঝে, তূর্জানের তো মনে হয় না। তূর্জান বলল,
“ভালোবাসা এত সহজ না। আর পূর্ণতা পেতে ভাগ্য লাগে।”
“কিন্তু সুন্দর লাগছে ওদেরকে ।”
তূর্জান এবার রোজার দিকে তাকালো,“সব সুন্দর জিনিস সহজে পাওয়া যায় না।”
রোজা ভ্রু কুচকে তাকাল,“মানে?”
“নাথিং!”
অন্যদিকে সমুদ্র গায়ে শেরওয়ানি পরে বর বেশে স্টেজে বসেছে নূরের পাশে । মিরান এসে কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কি দুলাভাই, নার্ভাস?”
সমুদ্র হেসে বলল,“একটু তো লাগেই…”
“ সমস্যা নেই, নূরকে দেখেন, সব ভুলে যাবেন।”
সমুদ্রের চোখে একরাশ মায়া নিয়ে নূরের দিকে তাকিয়ে বলল,“আমি তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছি…”
বিয়ের কাজ শুরু হলো। কাজি সাহেব পাশে বসলেন। সবাই নিঃশ্বাস আটকে আছে, সমুদ্রকে বলতে বললে,। সমুদ্র এমন ভাবে বললো যেন অনাহারির মুখে খাদ্য দেওয়া হয়েছে। দেরি হলে আর পাবে না।
সমুদ্রের তিনবার বলা শেষে নূরের পালা এলো,
কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,“কবুল…”
চারপাশে কলরব পড়ে গেল। রোজা আনমনেই হাসছিল। একটা সম্পর্কের পূর্ণতা মানে অনেক কিছু। তার চোখ হঠাৎ আটকে গেল তূর্জানের দিকে। তূর্জান তাকিয়ে আছে রোজার দিকেই।
একদম স্থির দৃষ্টি।
রোজা অস্বস্তি নিয়ে বলল,“কি?”
তূর্জান ধীরে বলল, “ নাথিং! “
রোজা থমকে গেল।এই লোকটা এমন আচরণ কেন করছে তা রোজার জানা নেই। তবে মুখ দেখে মনে হচ্ছে খুব আপন কিছু না পেয়েও অন্য কে পাওয়া দেখে হাসছে। তবে কি তূর্জানও কাউকে ভালোবাসতো? পায়নি তাকে? হাজারো কল্পনা করতে করতে নিজেই বিরবির করল, “ পাথরমানব আবার ভালোবাসবেই বা কাকে? ভালোবাসা পাথরমানবের দ্বারা অসম্ভব। “
তবে তূর্জানের ওই ঘোরলাগা দৃষ্টিতে বারংবার আটকে যাচ্ছে রোজা। কেন আটকে যাচ্ছে তা নিজের কাছেই অজানা। তবে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকলে যে রোজা প্রেমে পড়ে যাবে তা নিশ্চিত। রোজা কেন যে কোনো মেয়ে একবার ওই চোখ দেখলে প্রেমে পড়তে বাধ্য। রোজা আর তাকাতে পারল না সেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে। এদিকে ওদিকে তাকাতে লাগল। তবে তাও মনে হচ্ছে তূর্জান তার দিকে তাকিয়ে আছে। রোজা তাকাতেই রোজার বুক ধক করে উঠল। একদম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন নেত্রপল্লব ফেলার কোনো ইচ্ছেই নেই তবে ওই চোখে কিছু না পাওয়ার গন্ধ আছে। রোজা এবার এপাশ থেকে তূর্জানের কাছে গিয়ে দাড়াল, চোখ ঘুরিয়ে বলল, “ আপনার হেডএক হচ্ছে? “
তূর্জান স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিল, “ না। “
“ তাহলে ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? “
“ এমনি। দেখছিলাম কোনো পুষ্পরাগিনী পাথরমানবী কিভাবে হয়ে থাকে!“
রোজার একবার মনে হলো তূর্জান হয়তো অন্য কাউকে দেখছিলো। রোজার পাশে তো অনেক মেয়ে ছিলো। তাই আস্তে করে বলল,“আপনি না একদম পাগল…,”
তূর্জান হালকা হাসল,“হয়তো, কারো বিষাদের কুণ্ঠায় আমার এই অর্ধপতন।”
রোজা এত কঠিন বাংলা বুঝল না। তবে অবাক হলো, কেউ বিদেশে থেকেও এতো কঠিন বাংলা বলতে পারে দেখে।
ওদিকে নূর আর সমুদ্র একসাথে বসে আছে।
চারপাশে সবাই মজা করছে, ছবি তুলছে।
সমুদ্র আস্তে করে বলল,“নূররানী…”
নূর লজ্জায় তাকালো না। সমুদ্র কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল, “আজ থেকে তুমি শুধু আমার…”
নূর ধীরে মাথা নেড়ে বলল,“হুম…”
রোজা সব দেখছে, তার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি
হালকা ভয়, হালকা ভালো লাগা আর হঠাৎ কারো জন্য একটু অজানা টান। যার নাম সে এখনো জানে না। আর ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে—্
তূর্জান নেওয়াজ রোজার সকল মনোচালন ধরতে ব্যস্ত।
অনেক আনন্দ পেরিয়ে নূরের বিবাহ সম্পূর্ণ হয়েছে। নূর আজ থেকে মিসেস সমুদ্র মির্জা। এই তো একটু আগে তিন অক্ষরের শব্দটা তিনবার উচ্চরন করতেই এই বদল ঘঠেছে। নূরের পাশে তুবা রোজাসহ আরও কিছু মেয়ে বসে আছে। ছেলের বাড়ির লোকজন একেএকে এসে তাদের বৌমাকে দেখে যাচ্ছে। পুরো বাড়িতে মানুষের সরাগম। ছেলের বাড়ির লোকজনের জন্য মেয়ের বাড়ি লোকরা ছোটাছুটি করছে। বিয়ে বাড়িতে যেন আনন্দের শেষ নেই। তবুও তো কারো না কারো মনে এই আনন্দ ব্যাথা হয়ে দাড়াচ্ছে। ওইতো নূরের মা বোন উপরে খুশি দেখালেও ভিতরে দুমড়ে যাচ্ছে। তবুও নারী তো, সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। বিয়ে সম্পূর্ণ হতেই খাওয়া দাওয়ার রোল পড়ল। সবাইকে খাইয়ে সেই কষ্টদায়ক মূহর্ত এসে হাজির। নূরের বিদায়ের পালা এসেছে। কান্নার প্রতাপে হেচকি উঠে গেছে নূরের । রোজা তুবা মিলে সামলানোর চেষ্টায় আছে, তবুও থামার নামগান নেই। অনেক প্রতিক্ষার পর সমুদ্রের হাতে তার প্রেয়সীকে অর্পন করে দেওয়া হলো। নিয়ম অনুযায়ী কষ্ট হলেও বাবার ঘর ত্যাগ করে ছুটতে হলো স্বামীর বাড়ি।
সবাই বাড়ি ফিরেছে। যদিও রোজা আর তুবার নূরের সাথে যাওয়ার কথা ছিল তবে, নেওয়াজ পরিবারের যেতে দিতে ইচ্ছে ছিল না। তাই কেউ জোর করে নি ! তবে মিরানের কাছে তূর্জানের মাথা ব্যাথার কথা শুনে সবাই আগেই ফিরেছে। হঠাৎ তূর্জানের ঘনঘন মাথা ব্যাথা কারোর কাছেই স্বাভাবিক নয়। তবে যার মাথা ব্যাথা সে জানে কেন এই হঠাৎ মাথা ব্যাথার মতো যন্ত্রনা পোহাতে হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি ঠিক মতো না ঘুমালে এমনিতেই তার মাথা ব্যাথা হবে, সেখানে রাত জেগে দশ বছর আগের কল্পনা করলে ঠিক কতটা ব্যাথা হতে পারে তা কেবল ওই ব্যক্তিই জানে। রাত অনেকটাই গভীর। নেওয়াজ বাড়ি আজ অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। দিনের কোলাহল, হাসি-ঠাট্টা, গান সবকিছু রেখে এখন ফাকা বাড়িতে যেন এক মুহূর্তে থেমে গেছে।
দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, মাঝে মাঝে বাতাসের শব্দ, এই নীরবতার মাঝেই রাত নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। রোজা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
খোলা চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে। মুখে ক্লান্তি, চোখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। সারাদিন ক্লান্ত থেকেও ঘুমের রেশ চোখে ধরা দিচ্ছে না।
আজকের দিনের কথা বারবার মাথায় ঘুরছে,
তূর্জানের আচরণ, তার কথাগুলো, সেই চোখ… রোজার কোথায় একটা টান লাগছে ওই পাথরমানবের জন্য। কিন্তু কেন? তার সাথে তো আগে পরিচয় ছিলো না। এসেছেও মাত্র কয়দিন। এত তাড়াতাড়ি কেন এতো টান তৈরি হচ্ছে। তারপর তূর্জানের বলা কঠিন বাক্যগুলো।
রোজা ঠোঁট কামড়ে নিচু স্বরে বলল,
“পাগল একটা… একদম পাগল!”
“কাকে বলছিস?”
পেছন থেকে হঠাৎ কণ্ঠস্বরটা শুনে রোজা চমকে উঠল।ঘুরে তাকাতেই দেখল তূর্জান। এতো রাতে ছাদে কেন তূর্জান? চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। রোজা ভ্রু কুচকে বলল,
“আপনি এখানে?”
“এটা আমার বাড়ি।”
“তো?”
“তো, যেখানে ইচ্ছা সেখানে থাকবো।”
রোজা বিরক্ত হয়ে অন্য দিকে তাকাল।“আমার সামনে থাকবেন না।”
তূর্জান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, “কেন? আমি চোখ বন্ধ করে থাকবো? নাকি ভয় পাচ্ছিস?”
রোজা সাথে সাথে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,“আমি ভয় পাই না!”
তূর্জান একদম সামনে এসে থামল। দুজনের মাঝের দূরত্বটা অস্বাভাবিকভাবে কম।“তাহলে দূরে সরে যাচ্ছিস কেন?”
রোজা কিছু বলল না।চোখ সরিয়ে নিল।
তূর্জান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল
“আজকেও এত ভালো মেয়ে হয়ে ছিলি কেন?”
রোজা একটু থেমে বলল,“বলেছি তো… চ্যালেঞ্জ ছিল।”
“ আজকেও চ্যালেঞ্জ?”
রোজা এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,“আর কি হতে পারে?”
তূর্জান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তার চোখে হালকা কষ্টের ছায়া দেখা গেল।বলল,“কিছু না… তবে আমার সাথে চ্যালেঞ্জে নামাটা কি খুব দরকার ছিলো? “
রোজা অবাক হলো। এই মানুষটা হঠাৎ এমন শান্ত কেন হয়ে যাচ্ছে ? কথার ধরন পাল্টে যাচ্ছে। রোজা এবার সত্যিই প্রেমে পড়বে তা নিশ্চিত। এতগুন ভালো লাগছে না।
“বউ?”হঠাৎ এমন ডাকে রোজা ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো। রোজা যেন জমে গেছে পুরোটা।
একদম স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তূর্জানের দিকে।
“কি বললেন?”
তূর্জান এক পা এগিয়ে এলো।“যেটা সত্যি।”
রোজার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন বেড়ে গেল।“আপনি আবার শুরু করলেন? দেখুন কাল বিপদে পরে বলেছেন বলে কিছু বলিনি, কিন্তু আজকে বলছেন কেন? আমার এসব ইয়ার্কি ভালো লাগে না। “
তূর্জান ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকাল, আবার সেই ঘোর লাগা দৃষ্টি রেখে বলল,“শুরু তো অনেক আগেই হয়েছে… তুইই শুধু বুঝিস না।”
“ আমি আপনার এখনকার বলা কথাও বুঝতে পারছি না। “
“ সত্যিই? “
রোজা কিছু বলার আগেই,“রোজা!”
ভেতর থেকে তুবার ডাক আসতেই দুজনই থেমে গেল। রোজা যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো।
তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে বলল,“আমি যাচ্ছি।”
তূর্জান কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল তার প্রেয়সীর চলে যাওয়ার দিকে। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল—
“দেখি… কতদিন না বুঝে থাকিস? তোকে বুঝতে তো এতদিন সময় দিলাম। বুঝলি না। এবার তোকে বোঝানোর দায়িত্ব আর তোর দায়িত্ব পুরোটাই আমি নিলাম।
ইনশাআল্লাহ চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১২