পিদিমজ্বলারাতে. ৭ ✍️ #রেহানা_পুতুল
দুইভাই মিলে বাবাকে শহরে নিয়ে যাচ্ছে এম্বুল্যান্সে করে। তারা জানে না হাসপাতালে গেলে আরো ভয়ংকর কিছু শুনতে হবে তাদের। উন্মোচিত হবে সেই ট্যাবলেটের পাতার রহস্য!
যেতে যেতে তৌসিফ তার ছোট চাচার মোবাইলে ফোন করল। তার পরিবারে সে ছাড়া আর কারো হাতে মোবাইল নেই। এটা মধ্যবিত্তের জন্য বিলাসিতার নামান্তর। কিন্তু জাবেদ ও তার স্ত্রীর মোবাইল ফোন রয়েছে। তৌসিফ চাচার ফোনে মায়ের সাথে কথা বলল ভারাক্রান্ত মনে। রাবেয়া কেঁদে ফেলল ছোট বাচ্চার ন্যায়।
বিগলিত ও অভিমানী গলায় বলল,
“এইটা কোন কথা? আমি ছাড়া তোরা ঢাকা নিয়া যাইতাছস তোর বাপেরে। তুই তোর চাচার ফোনে আরো আগে জানাইলে সে আমারে নিয়া যাইতো হাসপাতালের সামনে।”
“মা,সেই সিচুয়েশন একদমই ছিল না। হসপিটালের এম্বুল্যান্সে করেই আমরা তড়িঘড়ি করে রওনা দিলাম। তুমি টেনশন করো না। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। এটা তো তুমিই বলো কথা প্রসঙ্গে। নামাজ পড়ে বাবার জন্য দোয়া করো।”
ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। রাবেয়া অযু করে এসে নামাজে দাঁড়িয়ে গেল জায়নামাজ বিছিয়ে। মোনাজাতে স্রস্টার নিকট ফরিয়াদ জানাল স্বামীর সুস্থতার জন্য। ঘরের পরিবেশ অস্বস্তিকর। হযবরল। একদিকে সবার ভিন্ন হওয়ার কথা উঠল। আরেকদিকে জাহেদের সংকটাপন্নবসস্থা। জাহেদকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল হসপিটালে পৌঁছে গেল তার দুই ছেলে। কেবিন বুক করা হয়ে গিয়েছে এই ভিতরেই। ভর্তির বিষয়ে যতটুকু সম্ভব সেগুলো সব নবনী এগিয়ে রেখেছে দৌড়ঝাঁপ করে। সে ঢাকা মেডিক্যালের মেডিসিন বিভাগে কর্মরত রয়েছে।
জাহেদকে ভর্তি করা হলো। তৌসিফের দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও সেখানে উপস্থিত ছিল। নবনীরও তিনজন ডাক্তার বন্ধু ছিল। সব মিলিয়ে চিকিৎসার নূন্যতম দেরী হলো না। ত্রুটি হলো না। পরিক্ষা নিরিক্ষা হলো কিছু রাতে। কিছু পরেরদিন। স্যালাইন চলছে। কেননা জাহেদের শরীর বেশ দুর্বল। রিপোর্ট তুলে তৌসিফ ও তানভির ডাক্তারের কাছে গেল। সাথে নিয়ে গেল জাহেদের আগের সব প্রেসক্রিপশন ও টেস্টের রিপোর্টগুলো। নবনী ব্যস্ত থাকায় সেসময় থাকতে পারেনি। জাহেদেকে চিকিৎসা দেওয়া কর্তব্যরত চিকিৎসক ভালো করে বার কয়েক আগের প্রেসক্রিপশনগুলো দেখ। রাতে প্রথমে দেখেছে অন্য ডাক্তার।
তিনি উদ্বিগ্ন মুখে বললেন,
“উনি হার্ট অ্যাটাক করেনি। টাইমলি চিকিৎসা দিয়েছেন বলে বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছেন। উনার কোষগুলো ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে। বাট খুব স্লোলি। আকস্মিক কোন কারণে শকড হয়েছেন বলে বুকে ব্যথা উঠেছে। মেডিসিন দিয়েছি। সেরে যাবে। প্রেশার ও সুগার নিয়ন্ত্রণে আছে মোটামুটি। এবং উনার মেডিসিনগুলোও ঠিক আছে। তবে প্রশ্ন হলো এই মেডিসিনগুলোর জন্য শরীর এতো দুর্বল হওয়ার কথা নয়। বাকি সমস্যাগুলোও হওয়ার কথা নয়। আপনাদের কথা অনুযায়ী উনি খাওয়া দাওয়া করছেন ঠিকভাবে। তাহলে শরীর নিস্ক্রিয় হয়ে আসার কারণ কী? কোষগুলোও ড্যামেজ হওয়ার কারণ কী? কোষ ড্যামেজ হওয়া রোধ না করলে যে কোনো সময় বড় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। এখানে তো এমন কোনো মেডিসিন আমি দেখতে পেলাম না।”
তৌসিফ ও তানভির নির্বাক হয়ে গেল শুনে। এক ভাই অপর ভাইয়ের মুখপানে দৃষ্টিপাত করল। তৌসিফ তার পকেট হতে সেই ট্যাবলেটের পাতাটি বের করে ডাক্তারের সামনে রাখল। বিনীত গলায় জানতে চাইলো,
“স্যার,এই ট্যাবলেট টা কিসের? এর প্রভাব কী রকম?”
ডাক্তার ট্যাবলেটের পাতাটি ধরে ভালো করে দেখলেন। পাতায় দশটি
ট্যাবলেটের মধ্যে ছয়টি নেই। চারটি অবশিষ্ট আছে। তিনি তৌসিফের দিকে এগিয়ে দিলেন পাতাটি। অবাক চোখে আশাহত গলায় বললেন,
“এটা আপনি কোথায় পেয়েছেন? আপনার বাবা এই ট্যাবলেট খেয়েছে নিঃশ্চয়? কোন ডাক্তার দিয়েছে এটা? উনার কোন প্রেসক্রিপশনে তো এই মেডিসিনটার নাম দেখলাম না। এই ট্যাবলেট ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে এর প্রভাব ভীষণ ক্ষতিকারক! এটি অন্ত্রে বাজে ধরনের ক্ষত তৈরি করে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হতে ভূমিকা রাখে। তাই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বাংলাদেশে তো এই ট্যাবলেট নিষিদ্ধ! কেউ এনে থাকলে বাইরে থেকে এনেছে।”
সত্যিটা ডাক্তারকে বলা যাবে না। তাহলে নবনী জেনে যাবে। পরিবারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তাকে জানানো মানে নিজে ছোট হয়ে যাওয়া তার কাছে। সুতরাং এটা করা যাবে না। তাই তৌসিফ কৌশলে ডাক্তারকে বুঝিয়ে দিল মিথ্যা কিছু বলে। উঠে গেল দুই ভাই। তানভির জিজ্ঞেস করলো বিস্মিত সুরে,
“ভাইয়া বুঝলাম না কিছুই। এই ট্যাবলেটের পাতার রহস্য কী?”
তৌসিফ আড়ালে গিয়ে ভাইকে সব বলল। তানভির বিমূঢ় হয়ে গেল শুনে। বলল,
“আব্বাকে তো ঘরের সবাই সম্মান করে ভালোবাসে। ছোট চাচা তো অনেক সমীহ করে আব্বাকে। কে হতে পারে? আর কীভাবেই বা খাওয়ায় আব্বাকে?”
“সেই রহস্যই এবার বের করতে হবে আমাদের দুই ভাইকে। তবে কিছুতেই মুখ খুলবি না। সাবধান। যা বলার,করার আমিই করব।”
আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল তৌসিফ। তানভির বলল,
“প্রশ্নই আসে না। আগে সেই নিকৃষ্টকে চিহ্নিত করতে হবে আমাদের। কিছুতেই তাকে ছাড়ব না। যতই র* ক্তের হোক আর প্রিয়জন হোক। জানোয়ার কোথাকার!”
এদিকে জাবেদ পরেরদিন চট্টগ্রাম চলে গেল তার কারখানায়। খুকিও চলে গেল। বড় ভাইয়ের জন্য মন পুড়ছে। কিন্তু তৌসিফের উপর ভয়ানক ক্ষুব্ধ সে ও কেউ কেউ। নবনী তৌসিফের বাবার কেবিনে রোজ সকাল, বিকাল,রাতে আসছে। তার সাধ্যনুযায়ী টেইক কেয়ার করছে। নবনী যেহেতু তৌসিফের ক্লাসমেট ছিল,সেই সুবাধে তারা সবাই চিনে তাকে। নবনী তৌসিফের সাথে একান্তই প্রয়োজন না হলে কথা বলছে না। কিন্তু তানভির ও জাহেদের সাথে কথা বলছে। সব খোঁজখবর নিচ্ছে। নবনীর অনুরোধ তার বাবা নাদিম এলো জাহেদকে দেখতে।
কথাপ্রসঙ্গে জাহেদ বলল,
“ভাই, নবনী মা না থাকলে সরকারি হাসপাতালে এত সহজে কেবিন পাওয়া,চিকিৎসা পাওয়া সহজ ছিল না। ভারী লক্ষী মেয়ে আপনার। মাশাল্লাহ! দোয়া রইলো আল্লাহ যেন মেয়েটাকে একজন উত্তম সঙ্গী মিলায়া দেয়।”
নবনীর বাবা অল্প হেসে বলল,
“ভাই, মেয়ের বিয়ে নিয়ে আছি বিপাকে। মেয়ে ডাক্তার হোক আর উকিল হোক,উত্তম ভালো পরিবারে বিয়ে না দিতে পারলে সবই বৃথা। কয়দিন আগে বলল তার একটা ছেলেকে পছন্দ। কিন্তু আমরা রাজী হব না সেখানে বিয়ে দিতে। কি যে বলে কিছুই বুঝি না।”
জাহেদ সৌহার্দপূর্ণ কণ্ঠে বলল,
“ভাই,মেয়ের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়েন। জীবন তার। সুখ শান্তির বিষয়টাও তার। ওর পছন্দ আছে। আমরা অর্থনৈতিকভাবে আপনাদের চেয়ে দুর্বল। নইলে আমিই প্রস্তাব দিতাম তৌসিফের জন্য।”
“ওভারে বলবেন না ভাই। আপনার পছন্দের কথা জানলাম। তৌসিফ ছেলেও দেখতে মাশাল্লাহ। পছন্দসই। শিক্ষিত,মার্জিত ছেলে। ভালো পদে চাকরি করে। মর্যাদা আছে। আমি বাসায় গিয়ে বিষয়টা আলাপ করব আপনার ভাবির সাথে। মাটির নিচে সবার হিসাব এক। মাটির উপরেই আমরা যত উঁচু নিচুর ভেদাভেদ করি। বৈষম্য গড়ে তুলি।”
পাশে থেকে তাদের আলাপচারিতা শুনছে তানভির। সে পিতার উপর বিরক্ত হলো বিয়ের বিষয়টা বলাতে। কোথায় নবনী হলো শহরে থাকা সচ্ছল পরিবারের ডাক্তার মেয়ে। আর তার ভাই হলো গ্রামে বাস করা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে।
চারদিন পর জাহেদের রিলিজ হলো। নবনী নিজে উপস্থিত ছিল তৌসিফ ও তানভিরের সাথে। প্রেসক্রিপশন বুঝে নিল তারা তিনজনই। নবনী জাহেদকে পা ছুঁয়ে সালাম দিল দোয়া চেয়ে। তিনি নবনীর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। নবনী তানভিরের থেকেও বিদায় নিয়ে নিল। তানভির বেরিয়ে গেল ঔষধ কিনতে ও গ্রামে যাওয়ার জন্য প্রাইভেট গাড়ি ঠিক করতে।
নবনী লুকানো চোখে তৌসিফকে দেখল। কালো বেল্টের ঘড়ি হাতে, মেরুন রঙের চেকের শার্ট ও গ্যাবার্ডিন প্যান্টে দারুণ লাগছে চওড়া বুকের তৌসিফকে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো। রুক্ষ। এই কয়দিন সেভ না করাতে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গজিয়েছে। তবুও অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে। তৌসিফের চোখ নবনীর দিকে পড়তেই নবনী দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
তৌসিফ নবনীকে কেবিনের বারান্দায় ডেকে নিল। নবনী আশ্চর্য হয়ে গেল। কারণ তার চেনা ও দেখা তৌসিফের ব্যক্তিত্বের সাথে এটা যায় না। নবনী ও তৌসিফ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালো।
তৌসিফ তাকে জিজ্ঞেস করলো,
“একটা হিসেব মেলাতে পারলাম না নবনী। আব্বার জন্য সবকিছুই করছ আমার ক্লাসফ্রেন্ড হিসেবে। কিন্তু আমার সাথে কথা বলছ না কেন? কী হয়েছে? আমার কোনো ভুল তোমার কাছে?”
“ছেলেদের আবার কোনো ভুল আছে নাকি? সব ভুল তো মেয়েদের। যাই। আংকেল মাইন্ড করবে।”
“আচ্ছা যাও। তবে তোমার স্বরে ও বলায় অভিমান, অনুযোগের গাঢ় প্রলেপ আঁচ করলাম এই প্রথম। আমি পরে যোগাযোগ করব তোমার সাথে। আর বন্ধু হয়ে আমার পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা!”
তৌসিফের উপর নবনীর বেশ রা* গ হলো গোপনে। তবুও নিরব থেকে চলে গেল কেবিন হতে। মনে মনে উচ্চারণ করলো,
“হার্টলেস বয় কোথাকার! পরিবার বুঝে। মা,বাবা,ভাই বুঝে। প্রেম বুঝে না। কারো অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করে না। রাবিশ!”
তৌসিফ ও তানভির জাহেদকে নিয়ে গ্রামে চলে গেলো। তখন সন্ধ্যা প্রায় ছুঁই ছুঁই। মর্জিনা ছুটে এলো উঠানে। ছেলের পিঠের উপর হাত রাখল এক সমুদ্র মমতা নিয়ে। অন্যরাও ছুটে এল। রাবেয়াও এল। সে ক্লান্ত,অবিশ্রান্ত মুখে স্বামীর মুখপানে চাইল। তার আঁখিজোড়া টলমল করছে অশ্রুতে। জাহেদ শান্তনা দিল তাকে। সবাই জাহেদের রুমে আছে তাকে দেখার জন্য। সলিমুল্লাও আছে। তিনি ও অন্যরা জাহেদের বিষয় জানতে চাইলেন। তানভির সবাইকে বিস্তারিত জানাল একটা বিষয় ছাড়া। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল শুনে।
তৌসিফ চোয়াল শক্ত করে দাদার দিকে চেয়ে নিষ্ঠুর গলায় বলল,
“ছোট চাচাকে খবর দেন, সময় করতে পারলে যেন অবশ্যই বাড়িতে আসে। সেদিন ফুফুকেও আসতে হবে। সবার সামনে সবার কাছে আমার কিছু জরুরী প্রশ্ন আছে। সেগুলোর সঠিক উত্তর দিতে হবে আমাকে। ইচ্ছে করে ভুল উত্তর দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ! কথাটা মনে রাখুন সবাই।”
তানভির ছাড়া বাকি সবাই অসহিষ্ণু ও বিষ্ফোরিত চোখে তৌসিফের মুখপানে চাইলো।
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮