পিদিমজ্বলারাতে. ২৩✍️ #রেহানা_পুতুল
হাসানুল কণ্ঠে উষ্মা ঢেলে বলল,
“আপনাদের দু’জনের মধ্যে কে মূল অপরাধী, তা এতক্ষণে পুলিশ বুঝে গিয়েছে।”
জাবেদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে। মুখে কোনো রা নেই। মনের ভিতরে তার যুদ্ধ চলছে। তুমুল যুদ্ধ! নিজের সাথে নিজের। কিন্তু কোনো থই খুঁজে পাচ্ছেনা সে। গোটা রুমজুড়ে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে। ভেন্টিলেটরের ফাঁকে চুপটি করে বসে থাকা চড়ুই পাখিটিও যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেল। কিন্তু রাবেয়ার মাঝে নেই কোনো নিস্তব্ধতা! রাবেয়া সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের ন্যায় ফুলে ফেঁপে আছে৷ পারলেই আছড়ে পড়ে,হামলে পড়ে জাবেদের উপরে। তার ক্লান্তিকর আঁখিজোড়ায় জল জমে আছে, কিন্তু গড়িয়ে পড়ছে না। ঠিক লন্ঠনের আলোর ন্যায়। নিভু নিভু অথচ তেজী!
হাসানুল চেয়ারটি টেনে নিয়ে একটু পিছনে গিয়ে বসল। একইভাবে রকিবও বসে আছে। তারা দুজন চুপ করে আছে গম্ভীর মুখে। তারা রাবেয়া ও জাবেদের অভিব্যক্তি পরখ করে দেখছে তীক্ষ্ণ চোখে। রাবেয়া তার তর্জনী আঙুলটি নেড়ে নেড়ে আক্রমনাত্মক স্বরে জাবেদকে বলল,
“একজন মুমিন হইয়া আরেকজন মুমিনের নামে বেহুদা কথা রটাইলে আল্লার আরশ কাঁইপা উঠব। আমার স্বামী শারীরিক ভাবে অক্ষম হইলে আমার দুই ছেলে ক্যামনে হইল? গায়েবীভাবে? চামড়ার মুখ দিয়া কথা আইলো আর বইলা ফালাইলে হইলো? চামার! পাষণ্ড! তুই তো আমার কাছে স্বীকার যাইবি না জানি। পুলিশই তোরে রিমান্ডে দিয়া সত্য বাইর করবো। সত্যের জয় হইবই একদিন। আর একটা কথা, একজন নিরপরাধ মায়েরে যদি তার এত বড় দুই ছেলের কাছে আচমকা ছোট কইরা দেস,কসম আমার চাইতে ভয়ংকর কেউ হইব না। মনে রাখিস তুই! লম্পট! লুইচ্চা! গুন্ডা পুরুষ কোথাকার!”
জাবেদ পাথর চোখে রাবেয়াকে দেখল। পরক্ষণেই রাবেয়ার মুখের দিকে দৃষ্টি তাক করে নোয়ানো স্বরে বলল,
“তোমার উপর আমার কোনো আক্রোশ নেই। অভিযোগ নেই।”
“তাইলে কার উপর? আমার নামে এতবড় অপবাদ দিলি ক্যান? আমি আমার স্বামীরে ওই ক্ষতিকারক ট্যাবলেট খাওয়াইছি?”
“রোজ দুপুরে ভাইরে ভাত কে নিয়ে দেয়? তুমি। ভাতের হাঁড়ি থেকে ভাত প্লেটে কে নেয়? তুমি? ভাইয়ের খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত তদারকি কে করে? তুমি? ভাইয়ের ঔষধগুলো তারে কে খাওয়ায়? তুমি। হ্যাঁ, ভাই নিজেও কখনো কখনো নিয়ে খায়।”
গড়গড় করে তরল গলায় কথাগুলো বলল জাবেদ।
“আইচ্ছা মানলাম। তাইলে ট্যাবলেটের পাতা তোর ড্রেসিংটেবিলের পাল্লার ভিতরে আমি রাখুম কোন দুঃখে? আমাদের রুমে কী এইটা রাখনের জায়গার আকাল পড়ছে?”
জাবেদ নিঃশ্চুপ! হাসানুল এবার নড়ে চড়ে বসল। মুখ খুলল। তার গলার স্বর আগের চেয়ে ঠান্ডা কিন্তু ধারালো। তিনি রাবেয়াকে নির্দেশ দিয়ে বললেন,
“আপনার কাজ শেষ। আপনি বাড়িতে চলে যান। বাইরে আপনার ছেলে অপেক্ষা করছে।”
“স্যার আমার একলা কিছু কথা আছে আপনাদের সাথে। দয়া করে আমার কথাগুলো শুনেন।”
রাবেয়ার কণ্ঠে অনুনয়,মিনতি!
“নাহ। আপনার কোনো কথা শোনার প্রয়োজন মনে করি না আমি। আপনি চলে যান।”
নির্দয় সুরে জবাব দিয়ে বলল হাসানুল।
রাবেয়া দুঃখী দুঃখী মুখ করে রুম হতে বেরিয়ে গেল। পুলিশ রাবেয়ার কথাকে কোনো গুরুত্ব দিল না। গ্রাহ্য করল না। তা দেখে জাবেদের মনে কিঞ্চিৎ হালকা অনুভব হলো। নয়তো রাবেয়া কি-না কী বলে পুলিশের মন গলিয়ে ফেলে ঠিক নাই। নারীর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো তার অশ্রু! এই কাজটাতে নারীরা দক্ষ মাঝির মতো। জিজ্ঞাসাবাদ রুমের বাইরে তালা দিয়ে হাসানুল ও রকিব থানার বাইরে চলে গেল। দু’জনেই সিগারেট জ্বালিয়ে নিল। সাংকেতিক ভাষায় তারা কিছু কথা বলল।
রাবেয়াকে নিয়ে তানভির বেরিয়ে যায়। মাকে কিছু জিজ্ঞেস করল না সে। কিন্তু রিকশায় বসে আড়চোখে বারবার মায়ের মুখশ্রীর দিকে তাকাচ্ছে। রাবেয়া উঠানে নেমেই খোলা আকাশপানে তাকাল। উঠোন ভরা হলদে রোদ্দুরের প্রখরতা। মাথার উপর বয়ে যাচ্ছে মৃদু বাতাস। রাবেয়ার কাছে আজকের বাতাসটা অনেক ভারী মনে হচ্ছে। থেমে থেমে তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। তানভির ঘরে চলে গেল। ছেলের পিছন দিয়ে রাবেয়াও অচল পায়ে তাদের ঘরে গেল। সেদিনের পর হতে তারা আর আগের ঘরে থাকে না সবার সাথে। রান্না,খাওয়া সবকিছুই ভিন্ন।
চাতক পাখির ন্যায় এতক্ষণ অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল জাহেদ। অন্যরাও তাদের ঘরের দাওয়ায় গিয়ে দাঁড়াল মনি ছাড়া। রাবেয়া তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সব বলল। তবে সে পুলিশের সাথে একান্তে কথা বলতে চেয়েছে,এটা খুব মনোযোগের সাথে গোপন রাখল।
সলিমুল্লা বললেন,
“পুলিশই যা বুঝার বুইঝা নিছে। তোমারে তারা এমনিই এমনিই থানায় ডাকায় নাই।”
“সেইটা তো অবশ্যই বাবা।”
মরা কণ্ঠে বলল রাবেয়া।
সবাই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হা হুতাশ করতে করতে চলে গেল।
তানভির ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বাজারের দিকে। রাবেয়া ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিল। জাহেদের কাছে গিয়ে বসল।
ভয়ার্ত চোখে হিসহিসিয়ে বলল,
“আইচ্ছা,আপনার কী মনে হয় ট্যাবলেট নিয়া? মায়ের প্যাটের আপন ছোট ভাই হই ক্যান সে আপনারে বিছনায় ফালাইতে চাইল? বাইরের থেইকা ঔষধ আনাইলো? চিন্তা করতে পারেন,কত বড় পশু আর জালিম সে? বাড়ির সম্পত্তির জন্য না-কি? হুঁ?”
“জায়গা জমির বিষয়টার জন্য কি-না তা ঠিক জানি না। তবে পরিস্থিতিতে মাথায় আসল অন্যকিছু। বহু পুরানা ঘটনা। বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কুৎসিত ঘটনা। এক নির্জন রাতের ঘটনা।”
রাবেয়ার বুঝতে সময় লাগল না। সে বলল,
“সেইটা তো মিমাংসা হইলই।”
“না হয়নাই রাবেয়া। সেই এক রাতের পর আরেক রাতে আমি আরেকটি ঘটনা ঘটিয়েছি তাকে নিয়ে। তার উৎস তুমি। সেটা কেউই জানে না। তুমিও না। কিন্তু সেটা তো জাবেদকে তাদের বলার কথা নয়। এখন তো মনে হচ্ছে তারা বলে দিয়েছে আমার কথা। অথচ তাদের বড় অংকের টাকাও দিলাম আমার নাম প্রকাশ না করার জন্য।”
প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে বিষন্ন গলায় বলল জাহেদ।
“মানে কিছুই বুঝলাম না। মাথার উপর দিয়া গ্যালো। কি করছেন? কারে টাকা দিছেন?”
চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো রাবেয়া।
পরে বলছি রাবেয়া। দোয়া করো নামাজ পড়ে, আমাদের দুই ছেলে যেন সেই বিশ্রী বিষয়টা না জেনে যায়। ওহ! মাথাটা টনটন করছে। চুলগুলো টেনে দাও রাবেয়া। তোমার চুলটানায় খুব আরাম পাই।”
রাবেয়ার চোখ ভিজে উঠে। হৃদয়টা ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন। স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধায়,অনুরাগে,মায়ায়, মাথাটা নুইয়ে এল তার।
বেশ কিছুক্ষণ পর হাসানুল ও রকিব তালা খুলে রুমে প্রবেশ করল। চেয়ার দুটো এগিয়ে নিয়ে জাবেদের মুখোমুখি বসল। বিজ্ঞের সুরে হাসানুল জাবেদের দিকে চেয়ে বললেন,
“চোর যখন চুরি করে পালিয়ে যায়, কোনো না কোন ক্লু রেখে যায় ঘটনার স্থানে। চোর সেটা ইচ্ছে করে ফেলে যায় না কিন্তু। ভুলক্রমে কিছু একটা রয়ে যায়। তদরূপ তুমি তোমার কথায় ধরা পড়ে গিয়েছো। আমরা চাই তুমি সত্যিটা স্বীকার করো। তোমার সাজা কম হোক। যেহেতু তোমার স্ত্রী,সন্তান আছে।”
“আমি আর কী স্বীকার করব। বলেন? আপনাদের দু’জনের সামনেই তো ভাবিকে বললাম সেই ভাইকে ট্যাবলেট খাওয়াতো।”
নিরীহ সুরে বলল জাবেদ।
“জাবেদ, তুমি ভালো স্ক্রিপ্ট বানাতে পারনি। ফাঁক রয়ে গেছে। বড় ফাঁক!”
জাবেদ অসহায় চোখে তাকাল হাসানুলের মুখপানে। বলল,
“কোন ফাঁক স্যার?”
হাসানুল ফিচলে হাসল।
“ ফাঁক একাধিক হয়ে গেছে। তুমি বলেছো, রাবেয়া অজ্ঞাতে তার স্বামীকে এই ক্ষতিকর ট্যাবলেট খাওয়া তো। এটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কিন্তু আমরা বলব এটা সম্পূর্ণ পরিকল্পনা। এবং সেটা তোমার!”
জাবেদের মুখের রঙ বদলাতে শুরু করল। ঠোঁটদুটি শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে গেল।
“আপনারা আমাকে ফাঁসাতে চান! বুঝছি আপনারা বাইরে এতক্ষণ ভাবির সাথে কথা বলেছেন। সে কেঁদেকেটে আমার নামে মিথ্যা কিছু বলেছে।”
“তুমি শুধু এটার স্পষ্ট জবাব দাও আমাদেরকে। রাবেয়া ট্যাবলেট ভাতের সাথে খাওয়া তো। দুপুরে খাওয়া তো। গুঁড়ো করে ভাতের সাথে মিশিয়ে নিতো। এটা তুমি কীভাবে জানো? চট্রগ্রাম থেকে দেখা যায় না-কি? নাকি তুমি ম্যাজিক জানো। তা দিয়ে দেখতে?”
“এসব আমার স্বী বলেছে আমাকে স্যার। আমি তো কখনো দেখিনি। সে না-কি মাঝে মাঝে দেখতো ভাবি ভাইয়ের ভাতের প্লেটের সাদা ভাত উলটে পালটে মেখে নিতো!”
চোখ নামিয়ে বলল জাবেদ।
“ওকেহ! তাহলে মনিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হোক।”
বলল হাসানুল।
“নাহ স্যার, ওকে আনবেন না।” আকুরি করে বলল জাবেদ।
হাসানুলের গলা এবার বজ্রের মতো হয়ে গেল। রুম কাঁপিয়ে তিনি বলে উঠলেন,
“কেন? থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে? তোমার স্ত্রী যা জানে না তোমার সম্পর্কে, আজ সব জেনে যাবে বলে? জেনে শুনে ইচ্ছে করে বড় ভাইকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলে। ডায়াবেটিসের নাম করে খাওয়াতে মস্তিষ্কের কোষ ড্যামেজ করার ঔষধ। যা কি-না দীর্ঘদিন খেলে মানুষ ধীরে ধীরে অচল হয়ে যায়।”
হাসানুলের বলা প্রতিটি বাক্য সুঁচ হয়ে বিঁধলো জাবেদের মনে। তার ভিতরটা যেন ভেঙে পড়ল। চোখে মুখে পড়ল আতঙ্কের কালো ছাপ।
“স্যার!”
কোঁকানো স্বরে বলে উঠল জাবেদ।
রকিব সরাসরি চোখে জাবেদের দিকে চেয়ে বলল,
“সব উত্তর একসাথে বের হবে না। কিন্তু আমরা পথ পেয়ে গেছি। তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসি আগে। বাকিটা তারপর। তোমার ভুজুংভাজুং গল্প পছন্দ হয়নি আমাদের। দেখি তোমার স্ত্রী কী গল্প বলে।”
পুলিশ দু’জন গেল তৌসিফদের বাড়িতে। তারা বলল,
“আমাদের সাথে যেতে হবে না। কেউ একজন উনাকে নিয়ে থানায় আসেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একে একে আমরা সবাইকেই ডাকতে পারি থানায়।”
“আপনারা চইলা যান। আসতাছে।”
বলল মর্জিনা।
পুলিশ চলে গেলো। সলিমুল্লা মনিকে থানায় নিয়ে গেল। মনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। জাবেদের মুখোমুখি বসাল তাকে। হাসানুল ও রকিবও চেয়ার টেনে বসল। হাসানুল মনিকে জাবেদের বলা সব কথা বলল। তারপর জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার স্বামীর ভাষ্যমতে রাবেয়া যে ভাতের সাথে ট্যাবলেট মিশাতো,এটা না-কি তুমি দেখতে মাঝে মাঝে?”
“জি স্যার। একদম সত্য। আমি নিজে দেখতাম।”
আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল মনি।
“আর কেউ দেখতো না এই দৃশ্য?”
সহজ গলায় স্মিত হেসে বলল রকিব।
“তাতো আমি জানি না স্যার। মনে হয় না। একেকজন একেক দিগে থাকতো।”
ভীরু কণ্ঠে বলল মনি
“ওহ আচ্ছা! তোমার না জানারই কথা। কারণ ভাতে সেই ট্যাবলেট পাউডার করে মিশিয়ে দিতে তুমি। যেটা রাবেয়া জানতই না। কীভাবে, কোন ফাঁকে মেশাতে তা বলো? এবং এখন তুমি আমাদের সেই গল্পটাও শোনাবে ট্যাবলেট নিয়ে, যেই গল্প তোমার স্বামী তোমাকে শুনিয়েছে ও বিশ্বাস করিয়েছে।”
গর্জন করে বলল তদন্ত কর্মকর্তা হাসানুল।
“গল্প? বিশ্বাস করাইছে? মানে বুঝলাম না স্যার? উনি ক্যান আমার সাথে মিথ্যা বলব আরেকজনের ট্যাবলেটের বিষয় নিয়া?”
দ্বিধাগ্রস্ত মুখে নিষ্পলক চাহনি ফেলে করুণ কণ্ঠে জানতে চাইল মনি।
চলবে..২৩
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #mystery #twist
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২০
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪