Golpo কষ্টের গল্প পিদিম জ্বলা রাতে

পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২১


পিদিমজ্বলারাতে. ২১✍️ #রেহানা_পুতুল

তানভির আতংকিত ও স্তম্ভিত হয়ে গেল! তার সারাশরীর জমে আসছে বরফখণ্ডের ন্যায়। এরা কারা? কী করছে রাতের অন্ধকারে তাদের বাগানে? সে কী মা,বাবা, দাদা,দাদীকে ডেকে তুলবে? না-কি অন্য পন্থা অবলম্বন করবে? সে খুব সাবধানী হয়ে অনুসন্ধিৎসু চোখে সেদিকে অপলক চেয়ে রইলো।

পরক্ষণেই সে সতর্কতা অবলম্বন করল। তার মোবাইলের স্ক্রিনের আলো কমিয়ে দিল। ছবি তোলা ও ভিডিও করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। ঘন আঁধারের মাঝে দূর হতে ছবি,ভিডিও ক্যাপচার করা অসম্ভব! তানভির কৌশলী হলো। কিন্তু তার ভয়ও করছে। গা ছমছম করা ভয়! সে ভাবছে তার বাবাকে ডেকে তুলবে। কিন্তু তার বাবা পুরোপুরি সুস্থ নয়। তাই এই চিন্তাও সে বাদ দিল। সে দুর্বার কৌতুহল ও ভয়কে সঙ্গী করে কয়েকটি গাছের আড়ালকে আশ্রয় করে সন্তপর্ণে এগিয়ে গেল। মূল স্থানের নিকটবর্তী গিয়ে একটি প্রকাণ্ড গাছের আড়ালে দাঁড়ালো।

মানুষ দু’জনের সারা শরীর বড় চাদর দ্বারা আবৃত। যার ফলে তানভির তাদের মুখ দেখতে পেল না। চিনতেও পারল না। তবে ব্যক্তি দুজন এটা নিশ্চিত হল সে। কিন্তু এরা দুজনই কী নারী বা পুরুষ তাও সে বুঝতে পারল না। তানভির যথাসম্ভব মোবাইলের আলো বাড়িয়ে নিল। সাউন্ড সাইলেন্ট করে নিতেও ভুল করল না। ক্যামেরা চালু করে ভিডিও মুডে নিয়ে গেল। অন্তত তাদের ফিসফিসানির আওয়াজগুলো তো রেকর্ড হবে। রাতের নির্জনতা ভেদ করে একজনের চাপা স্বর তানভির শুনতে পেল। তবুও সে বিস্মিত হওয়ার চেয়ে নিজেকে শান্ত রাখায় মনোযোগী হলো।

“হইছে হইছে,থাম। আর খোঁড়া লাগব না। দে,এইবার জিনিসগুলা গর্তে রাখ। ম্যাচের কাঠি জ্বালা। হ। হইছে। জ্বইলা যাক সব।”

হিসহিসিয়ে বলল একজন। আগুন জ্বলে উঠল গর্তের ভিতরে। তার চারপাশটা খানিক আলোয় ভরে গেল। এতে করে অন্তত অল্পক্ষণের জন্য হলেও ভিডিওতে সব ক্লিয়ার হলো। মানুষ দু’জনের মুখ এক ঝলক দেখে নিল তানভির। অতি কাছের চেনা মুখ দুটো দেখে সে স্তম্ভিত! নির্বাক! তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল অতি কষ্টে। সে শুরুতে ধরে নিয়েছিল এরা চোর হবে। গ্রামের চিঁচকে চোরগুলো রাত হলে মানুষের বাড়ির বিভিন্ন বাগান থেকে নারকেল, সুপারি চুরি করে। বাগানের ভিতরে বসে বিড়ি, তাড়ি, গাঞ্জা খায়। কিন্তু তানভিরের ধারণা শতভাগ মিথ্যে প্রমাণ হলো।

হাত দিয়ে গর্তের মুখ মাটি দিয়ে সমান করে দিল সেই দু’জন মানুষ। পরক্ষণেই চোরের মতো উঠে দাঁড়ালো আস্তে করে। ইতিউতি চেয়ে হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে। তানভির তখন গর্তের উপরে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে দেখল। তার ইচ্ছে করছে ভিতরে দেখতে। কিন্তু তাতে লাভ নেই। কারণ সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।

তানভির ঘরে চলে এলো। মা,বাবার পাশে শুয়ে পড়ল। বহু প্রশ্নের জটিলতা নিয়ে সহজে ঘুমাতে পারল না সে। কিছুক্ষণ পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনার হেতু কী হতে পারে, তা সে বুঝে উঠতে পারল না। ভাবছে বিষয়টা কাকে জানালে ভালো হবে। মাকে? বাবাকে? বড় ভাইকে? না-কি পরিবারের বাকী সদস্যদের। নাহ আপাতত সে কাউকেই বলবে না এটা। প্রমাণ যেহেতু মোবাইলে সংরক্ষিত আছে,তাহলে আর চিন্তা কী! যেকোনো সময় তাদের ধরা যাবে।

রোজ সকালে মিস্ত্রি আসে। বিকেলে যায়। তানভির যতটুকু পারে নতুন ঘর তৈরির নানাকাজে মাকে সাহায্য করে। রাতের আঁধারে দেখা মানুষ দু’জনের সাথে দিনের আলোয় দেখা হয়ে গেল তানভিরের। সে একজনের দিকে চেয়ে দুর্বোধ্য হাসল কিঞ্চিৎ। জিহবার ডগায় রাতের বিষয় এসে গেলেও জিজ্ঞেস করলো না। গিলে ফেলল।

তৌসিফ নবনীর মেসেজের রিপ্লাই না পেয়েও কিছু মনে করল না। তার বিশ্বাস নবনী তাকে মেসেজ দিবেই। সত্যি সত্যিই তার বিশ্বাস পাকাপোক্ত হয়ে গেল। নবনীর মেসেজ এল। মাত্র কয়েক শব্দের ছোট্ট একটা মেসেজ।
“চাড্ডাবাজ ক্যাফে। আগামীকাল রাত নয়টা। বকশীবাজার।”

তার মতো নবনীরও এই ব্যক্তিত্বসুলভ স্বভাবটা তার খুব ভালো লাগে। এক পাক্ষিক অনুভূতি হলেও কখনই গায়ে পড়া ভাব দেখায়নি মেয়েটা। নিজেকে ভীষণ রকমের সংযত রেখেছে। আবেগে ঢলে পড়েনি তার সামনে। প্রকট অভিমানে গুঁড়িয়ে গেলেও নিজেকে আড়ালে রেখেছে। দূর দূর করে রেখেছে।

পরের দিন নিদিষ্ট সময়ে তৌসিফ ‘চাড্ডাবাজে’ চলে গেল। দৃষ্টি ঘুরিয়ে পুরো ক্যাফেটা দেখল। পরিপাটি করে সাজানো ক্যাফের প্রতিটি দেয়াল। নান্দনিক! মোহনীয় পরিবেশ। এই প্রথম সে এই কফিশপে এলো। কর্ণারের টেবিলে গিয়ে বসল। নবনীকে ফোন দিল। ফোন রিসিভ করল।
“আমি ক্যাফেতে বসে আছি। কতক্ষণ লাগবে তোমার?”
“আসছি। জাস্ট পাঁচ মিনিট।”
“ওকেহ! আসো।”

নবনী রিকশা থেকে নেমে ক্যাফেতে প্রবেশ করল কাঁচের দরজাটা ঠেলে। তৌসিফকে পেছন থেকে দেখে নবনী একদম চিনতে পারল না। তবুও ধারণা করে কর্ণারের টেবিলের পাশে গিয়ে থামল।
“নবনী বসো। দাঁড়িয়ে কেন?”

হঠাৎ খুব নিকট হতে প্রিয় পুরুষটার গলা শুনে নবনী চমক খেল। তৌসিফের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। তৌসিফকে অন্যদিনের চেয়ে আজ বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে। হাতে ঘড়ি। গায়ে নীল,কালো,মেরুন রঙের চেকের শার্ট। পরনে জিন্স। পায়ে ক্যাডস। চুলগুলোও বেশ ঝরঝরে দেখাচ্ছে। গায়ের পারফিউমের সুবাস লাগছে গিয়ে নবনীর নাকে। তৌসিফও নবনীকে পরখ করে দেখল। নাহ,হবু বরের সাথে দেখা করতে এল বলে নবনীর মাঝে বাড়তি কোনো সাজসজ্জা নেই। রোজকার মতো ডাক্তারের গেটাপ। তৌসিফের মুখোমুখি চেয়ারটা টেনে বসল নবনী। তৌসিফ একগুচ্ছ কাঠ গোলাপ নবনীর দিকে বাড়িয়ে ধরল।
ঠোঁটের কোনে উষ্ণ মৃদু হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“নাও! তোমার প্রিয় কাঠ গোলাপ।”

নবনী কাঁপা কাঁপা হাতে ফুলগুলো নিল। তার অধরজোড়া তিরতির করে কাঁপছে। ফুলগুলো নিতে গিয়ে দু’জনের আঙুলগুলোর সামান্য সাক্ষাত হলো। তাতেই নবনীর ভিতরটা দুলে উঠলো। তৌসিফও পুলক অনুভব করল গোপনে। কিন্তু তা নবনীকে টের পেতে দিল না। ওয়েটার এলে নবনীর পছন্দের কফি, পিৎজা অর্ডার হলো। খাওয়া শেষে নবনী লাজুক ও মোলায়েম স্বরে জানতে চাইলো,

“কাঠ গোলাপ আমার প্রিয় ফুল,এটা তুমি কীভাবে জানো?”

তৌসিফ আলতো করে নবনীর এক হাতের পিঠের উপর নিজের এক হাত ছোঁয়ালো। রোমাঞ্চিত হেসে বলল,
“ফুলের কথা ফুলসজ্জায় বললে বেশী শোভনীয় হবে। তাই আজ না হয় বাকিই থাকুক, তোমার সেই আকাঙ্ক্ষিত মধুরাতের জন্য?”

নবনী ঠোঁট কামড়ে ধরল লজ্জায়! ইতস্ততবোধ করতে লাগল। যেই তৌসিফ কখনো তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবেও কথা বলেনি। সেই তৌসিফের মুখে আচমকা ফুলসজ্জা শব্দটি শুনে নবনীর মাঝে পালাই পালাই দশা। লুকাতে চায় সে এখন।

“মাত্র একটা শব্দ শুনেই ভিতরে কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গেল নবনী? তুমি ধরা দিতে চেয়েছ। আমি এখন ধরেছি। সুতরাং পালানোর পথ নেই আর।”

গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বরে বলল তৌসিফ। নবনী আজ তৌসিফের চোখে চোখ রাখতেই পারছে না। ঠিকভাবে কথাও বলতে পারছে না। তার শব্দরা জড়িয়ে যাচ্ছে। বোবা হয়ে যাচ্ছে। হৃদপিণ্ডটা ছলকে ছলকে উঠছে। তৌসিফ নবনীর নিচু হয়ে থাকা লাজরাঙা মুখের দিকে ঠায় চেয়ে রইলো। অনুভব করতে পারল তুফানের মতো লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া নবনীর হৃদয়টাকে। তাই নবনীকে বলল,
“আসো তোমাকে রিকসায় তুলে দিই। এখানে আমাদের দু’জনের কারোই আর অবস্থান করা ঠিক হবে না। পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে যেতে পারে।”

নবনী নিঃশ্চুপ! যেন নিরবে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী নদী! ক্যাফে থেকে দুজন বের হয়ে গেল। নবনীকে রিকসায় তুলে ভাড়া মিটিয়ে দিল তৌসিফ। নিজেও চলে গেল বাসায়।

থানার জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে (Interrogation Room) জাবেদকে নিয়ে যাওয়া হলো। দু’জন পুলিশ বসল তার মুখোমুখি। তাদের হাতে সেই ট্যাবলেটের পাতা। মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা হাসানুল ধীর গলায় জাবেদকে বলল,
“সমস্ত প্রমাণাদি বিবেচনা করে,অভিযোগের আঙুল আপনার দিকেই যায়। আপনার শ্যালক ইন্ডিয়া যায় ব্যবসার কাজে। তার মাধ্যমে এই ট্যাবলেট আপনাদের ঘরে পৌঁছেছে। এই ট্যাবলেট দেশের কোনো ফার্মেসী বা হসপিটালে নেই। যেকোনো উপায়ে আপনার বড় ভাইকে আপনি এই ট্যাবলেট খাওয়াতেন। যেন ক্রমশ তার স্নায়ুকোষগুলো দূর্বল হয়ে যায়। সে আপনাদের মতো সুস্থ স্বাভাবিক জীবন না পার করতে পারে। ঘরে, বিছানায় পড়ে থাকে অচল হয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, তা কেন? এবং কীভাবে ট্যাবলেটটি খাওয়াতেন? যদি সব অপরাধ স্বীকার করেন,তাহলে সাজা কম পাবেন। সুতরাং কোন ফাঁকফোকর না রেখে বলে ফেলুন। আর জেনে রাখুন সব পুলিশ ঘুষ খায় না। সব পুলিশকে কেনা যায় না। একজন মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষকে সজ্ঞানে অসুস্থ করে রাখা অমানবিক! জঘন্য! ঘৃণিত!
র * ক্তের বন্ধনের কথা না হয় বাদই দিলাম।”

জাবেদ স্থবির হয়ে বসে আছে চেয়ারে। তার মুখমণ্ডলে লেপ্টে আছে জিঘাংসা! নেই কোন ভীতিকর ছাপ! সে নিঃসংকোচে স্পষ্ট ভাষায় বলল,

“চাক্ষুষ প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধী আমি। আমার শ্যালক ইন্ডিয়া যায়। এটা সত্যি। এই ট্যাবলেট সে এনেছে তাও সত্যি। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্যি যেটা তা আপনারা বিশ্বাস করবেন না এখন। তাও আমি জানি। আমার কথা অবিশ্বাস করে যদি আমার ফাঁ* সীও দেন কিছুই করার নেই। আমি যতই খারাপ হই না কেন, মায়ের পেটের আপন বড় ভাইয়ের ক্ষতি করার মতো হীন মানসিকতা আমার নেই। আমি কথা দিচ্ছি, আমাকে ছেড়ে দিলে আমি মূল দোষীকে চিহ্নিত করতে আপনাদের সাহায্য করব।”

হাসানুল পাশে বসে থাকা আরেক পুলিশ কর্মকর্তা রকিবের দিকে নিরব চোখে তাকালেন। রকিব বিজ্ঞের সুরে জাবেদকে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা বলুন,মূল আসামী কে? কেনই বা জাহেদকে পীড়িত করে রাখতে চেয়েছে সে? আর আপনি একথা এরেস্ট হওয়ার সময় বলেন নি কেন?”

হাসানুল মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, জাবেদ সন্দেহাতীত মিথ্যা ইনফরমেশন দিলে প্রয়োজনে তাদের ইনস্পেকটর বা গোয়েন্দা শাখার একজন কর্মকর্তারাকে নিযুক্ত করবে। আগে দেখা যাক ব্যাটা কী বলে। জাবেদ বলল,
“যেহেতু ঢাকার হাসপাতালের ডাক্তার বলেছে, এই ট্যাবলেটের ক্ষতির দিকগুলো। সেই হিসেবে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমার বড় ভাইকে এই ট্যাবলেট খাওয়ানো হতো অবশ্যই। প্রতি সপ্তাহে একটা ট্যাবলেট। তার দুপুরের গরম ভাতের সাথে পাউডার করে মিশিয়ে দেওয়া হতো এই ট্যাবলেট। ভাতের সাথে তরকারি, মাছ,ঝোল মিশিয়ে ভাই খেয়ে ফেলতো। বুঝতে পারতো না। এই বিষয়টা আমি ছাড়া আমার স্ত্রীও জানে। আর জানে মাত্র একজন। আমি বাড়িতে বললে এই কথা কেউই বিশ্বাস করত না। আপনারাও না। তাই ঠিক করলাম থানায় আমাকে ধরে নিয়ে এলে আপনাদেরকে ভালো করে বলি।”

“কে সে? নাম বলুন? অপরাধী যেই হোক না কেন তার প্রাপ্য সাজা তাকে ভোগ করতেই হবে। আমরা তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। আপনি জামিন পেয়ে যাবেন।”

কঠিন অথচ শান্ত গলায় বলল হাসানুল।

“তার নাম রাবেয়া। ভাইয়ের স্ত্রী! যিনি কি-না নিজেই তার স্বামীকে অসহায় করে রাখার জন্য শারীরিকভাবে নিস্তেজ করে রাখতো।”

বিচক্ষণ পুলিশ কর্মকর্তা হাসানুল যেন নাস্তানাবুদ হয়ে গেল জাবেদের কথা শুনে। তিনি ও রকিব খুব বিভ্রান্তি নিয়ে একে অপরের দৃষ্টি বিনিময় করলেন।

চলবে..২১

#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #mystery #twist

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply