ধোঁয়া উঠা ধবধবে সাদা ভাতের প্লেটটার দিকে রাবেয়া পলকহীন চোখে চেয়ে আছে। বড় একটি চিংড়ি মাছ ভাজা রয়েছে সেই ভাতের উপরে। টকটকে কমলা রঙ চিংড়িটির।
রাবেয়া চিংড়িটি নিতে যাবে মুখে দেওয়ার জন্য,ঠিক সেই মুহূর্তেই তার প্লেট থেকে ভাজা চিংড়িটা তুলে নিল তার ছোট ননদ খুকি। খুকি চিংড়িটি তার ছোট মেয়ে অনুর প্লেটে দিয়ে বলল,
“হইছে? খা। আর প্যানপ্যান করিস না। বাপরে বাপ, কী চিংড়ির পাগল মাইয়া। ছোট হোক আর বড় হোক পাইলেই হইছে।”
তৌসিফ মায়ের প্লেটের দিকে হা হয়ে চেয়ে রইল। রাবেয়ার মলিন হয়ে থাকা মুখটা আরো মলিন হয়ে গেল। অন্য সবজি নিয়ে সে ভাত খাওয়া শুরু করল। তার শাশুড়ী মর্জিনা মেয়ের দিকে চেয়ে বললেন,
“ইছা মাছ সকলেরই প্রিয়। আমি তো ছোডকালে পুস্কুনীর ধার থেকে কত ইছা মাছ ধরছি।”
তৌসিফ গম্ভীর গলায় বলল,
“সেই সকলের মধ্যে কি আমার মা পড়ে না দাদী?”
হঠাৎ নাতির মুখে ফোঁড়ন কাটা কথা শুনে মর্জিনা ঝনঝনিয়ে উঠল। বলল,
“বাবুরে,একটা মাছই তো নিল। কী হইছে। ওই তো ছোডু মানুষ। নিজেরটা খাইয়া বইসা আছে আরেকটার লাইগা। কড়াইতে আর নাই। ইছা একবেলার লাইগা ভাজা হইছে মানুষ গইনা।”
“তা ঠিক আছে। ফুফু নিজের প্লেটের চিংড়ি দিল না কেন মেয়েকে? তোমারটা তুলে দিল না কেন? আমার মায়ের প্লেটেরটাই নিতে হলো কেন?”
“এতো হিসাব কইরা নিছে? কাছে তোর মায়ের ভাতের থালই ছিল বইলা নিছে। একটা মাছ তুইলা নিল মাত্র আমার মাইয়া,তাই তোর এমুন হিংসুটে কথা। আর বেশিকিছু নিলে না জানি কি করতি। আল্লাগো আল্লা! আমি মইরা গ্যালে তো মনে হয় আমার মাইয়ারা বাপের বাড়ি আহন বন্ধ কইরা দিতে হইবো।”
তৌসিফ বিরক্ত গলায় বলল,
” সোজা বিষয়টাকে বাঁকা করার চেষ্টা করো না দাদী। আমার কথার ইঙ্গিত কি এমন কিছুই মিন করে?”
এভাবে এক দুই কথায় তার সাথে তৌসিফের বেশ তর্ক বিনিময় হলো। সেও নিজের চিংড়ি শুরুতেই খেয়ে ফেলেছে। নয়তো মাকে দিতো খাওয়ার জন্য। যদিও মা তা কখনোই নিতনা। সে দ্রুত খাওয়া সেরে উঠে গেল। ফ্রিজ থেকে চিংড়ির প্যাকেট বের করে নিল। উঠানে নলকূপের নিচে বালতির ডুবো পানিতে ভেজালো প্যাকেটটি। পরে নিজ হাতে তিনটি চিংড়ি মুচমুচে করে ভেজে নিল। এনে মাকে খেতে দিল। রাবেয়া বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেল।
তৌসিফ শাসনের সুরে মাকে বলল,
“এই তিনটি চিংড়ি তুমি এখন খাবে। এবং সবার সামনেই খাবে।”
রাবেয়া বেতের মোড়াটা টেনে নিয়ে বসল। সংকোচপূর্ণ মনে বাধ্য হয়ে খেয়ে নিলো। তৌসিফ মনে অপার শান্তি পেল। এমন দৃশ্য দেখে সবার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটলো। তারা ভূত দেখার মতো চমকে উঠল যেন।
বাড়িতে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে। তার ছোট চাচার একমাত্র ছেলের সুন্নাতে খাতনা। সেই উপলক্ষে তৌসিফ ঢাকা থেকে এলো গতকাল। ঘরভর্তি নিকটাত্মীয়ের ভীড়! এবার তৌসিফ তার চোরাচোখ দিয়ে সবার প্রতি নজর রাখছে। তার মাকেও দেখছে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠার পর রাবেয়া ঘরের সব কাজকর্ম করে এক হাতে। সবার নাস্তা খাওয়া শেষ হলে তার নাস্তা খেতে হয়। তাকে কেউই বলেনি যে তুমি পরে খাবে নাস্তা। কিন্তু কাজের চাপে সে নিজেই খাওয়ার কথা ভুলে যায়। সেও যে মানুষ। তারও যে একটা পেট আছে। পেটের ভিতরে পাকস্থলী আছে। তার খাবারের প্রয়োজন রয়েছে,এটা যেন সে জানেই না। এবং অন্যরাও তাকে খাওয়ার জন্য তাগিদ দেয় না। দরদ দেখিয়ে পীড়াপীড়ি করে না। গরম গরম রুটি,কারো জন্য পরোটা,কারো জন্য রঙ চা,কারো জন্য দুধ চা এসব করতেই হিমশিম খায় রাবেয়া। এইতো গেলো সকালের ফিরিস্তি।
দুপুরের রান্না শেষে সবাই খেয়ে নেয়। রাবেয়া দুপুরে সময়মতো কবে খেতে পেরেছে তার মনেও নেই। রান্নাঘর,বড় ঘর,ছোট উঠান,বড় উঠান ঝাড়ু দিতে হয়। পুকুর ঘাটে ফেলে আসা শ্বশুর শাশুড়ীর, ননদের কাপড় ধুইতে হয়। এসব শেষেই রাবেয়া কয়টা ভাত গিলতে পারে। একই ভাবে কাটে রাবেয়ার সন্ধ্যা,রাতের খাবারের বেলাতেও। সবাইকে খাইয়ে নিজে খেতে হয়। আবার সেই খাওয়া খেতে গেলেও তার কপালে জোটে প্রায় উচ্ছিষ্ট কিছু। হাঁড়ির তলার একটু সবজি। মাছের লেজের অর্ধেক। ডিমের চার ভাগের এক ভাগ। ভাজা মাছ আধ পিস। জ্বাল দেওয়া দুধের সর,দুধও রাবেয়ার কাছে অধরা কিছু। কেননা প্রতি রাতে পাতিলের তলা কুড়িয়ে খাওয়াই যেন তার অভ্যাস হয়ে উঠেছে।
মায়ের এই বিষয়গুলো তৌসিফ প্রায় এক বছর ধরেই খেয়াল করেছে। তবুও কখনো প্রতিবাদ করেনি। মুখ খোলেনি। কারণ মা,বাবা তাকে অনুগত ও বাধ্যগত সন্তান হিসেবে বড় করেছে। কিন্তু এবার আর তৌসিফ চুপ করে থাকতে পারল না। সে কত শখ করে টাটকা দেখে দুই কেজি বড় চিংড়ি মাছ কিনে এনেছে। চিংড়ি তার মায়ের অত্যন্ত প্রিয় মাছ। তার উদ্দেশ্য ছিল মা ও সবাই মিলেই খাবে। তাই মায়ের প্লেটের চিংড়ি তার ছোট ফুফু নিয়ে যাওয়াতে সে চুপ করে থাকতে পারেনি। মায়ের উপর পরোক্ষ নির্যাতনগুলো সে আর বরদাস্ত করবে না।
সেদিন সন্ধ্যায় তৌসিফ বাজার থেকে ঘরে ফিরল একটু রাত করেই। বাজারে কেরাম খেলল পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে। বিক্ষিপ্ত মনকে একটু ফুরফুরে করার জন্যই সে খেলায় যোগ দিল। সে ঘরে পা রেখেই দেখল সবাই জড়ো হয়ে আছে। কোন একটা কারণে সে ছোট চাচার রুমে গেল। সন্দেহজনক একটা জিনিস পেল সে। লুকিয়ে নিজের পকেটে নিয়ে নিল। পরে সবার পাশে গিয়ে বসল। তার অসুস্থ বাবাও উপস্থিত আছে। সেও গিয়ে বসল তাদের মাঝে। সে ভাবল, চাচাতো ভাই অভ্রের সুন্নাতে খাতনার অনুষ্ঠান বিষয়ে কথা হবে। কিন্তু তার ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো।
তার দাদা সলিমুল্লা বলল,
“হায়াত মউত আল্লাহর হাতে। কে কখন মইরা যায় ঠিক নাই। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিছি আমার সব সম্পত্তি ভাগ কইরা দিমু তোমাগো মাঝে।”
সবাই বেশ খুশি হলো তৌসিফের বাবা,মা ছাড়া। সলিমুল্লার কথায় তাল মিলিয়ে তার ছোট ছেলে জাবেদ বলল,
“আব্বা গুড ডিসিশন। আমি খুশী হয়েছি।”
তার বড় ছেলে জাহেদ অর্থাৎ তৌসিফের বাবা বলল,
“আব্বা দরকার কি ভাগের? আমরা সবাই একসঙ্গে আছি এটাই তো সুন্দর! গ্রামের অনেক বাড়ির মানুষ আমাদের পরিবারকে ফলো করে। বিভিন্ন জায়গায় উদাহরণ হিসেবে আমাদের পরিবারকে দেখায়।”
মর্জিনা এত বড় পুত্রকে ধমকে উঠলেন। “তুই হইলি একটা গাধা। বেক্কল। ভালো মন্দ কিছু বুঝুস? খালি কয়টা টাকা কামাইতে পারলেই হয় না। জ্ঞান বুদ্ধিও থাকতে হয়।”
“দাদি,আমার বাবাকে গাধা কে বানিয়ে রেখেছে? আমি এতদিন চুপ ছিলাম বলে আপনারা ধরে নিয়েছেন আমিও বাবার মতো সহজ সরল। ভুলকে সঠিক মনে করবো। আঁধারকে আলো মনে করবো। রাতকে দিন মনে করব। দুধকে পানি মনে করবো। কিন্তু তা একদম নয় দাদী। চুপ থাকা মানেই দুর্বলতা নয়। নিরব থাকা মানেই কেউ কথা জানেনা তা নয়। দুদিন বাদে আমাদের ঘরে অনুষ্ঠান। তার আগেই কেন এখন সম্পত্তি ভাগের কথা উঠল,আমি কী বুঝিনাই?”
তৌসিফের কথা শুনে সবাই থ বনে গেল। ঘরের উত্তপ্ত পরিবেশ আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। রাবেয়া ধমকে উঠলো ছেলেকে।
” তুই অতিরিক্ত করতাছস ছেলে। এই শিক্ষা দিছি তোরে? বড়দের সাথে এতো ঝাঁঝ নিয়ে কথা বলা কোথায় শিখেছিস? তোর কোনো কথা নাই। এখানে তোর মুরুব্বিরা আছেন। বলতে হয় তারা কিছু বলবেন।”
খুকী মুখে ঝামটি মেরে রাবেয়াকে বলল,
“হইছে, থামেন আপনে। আর সাধু সাজতে হইব না। আপনে যে তলে তলে এতো সেয়ানা,তা আইজ টের পাইলাম।”
সলিমুল্লা গরম চোখে বলল,
“থামো সবাই। যা কইতাছিলাম।”
তৌসিফ বাঁকা হেসে বলল,
“হ্যাঁ দাদাজান, বলেন শুনি। আপনার বলা শেষ হলে আমিও একটা বিষয় উত্থাপন করতে চাই।”
সবাই বিস্মিত চাহনি নিক্ষেপ করল তৌসিফের মুখ পানে। তৌসিফ যা বলবে তা তাদের কল্পনার বাইরে।
#পিদিমজ্বলারাতে. ১ ✍️ #রেহানা_পুতুল
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৭