নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব- ৫
মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর সামনে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কোনো কথা নেই। বাইজিদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে। কড়া গলায় বলল
“কোন সাহসে বেড়িয়েছেন? পালাতে চাচ্ছিলেন? এতই সহজ? শুনুন, এত সহজে সাহাবাদ এর আসামি রা পালাতে পারে না। গোটা প্রাসাদের সমস্ত দরজা বন্ধ। তা টপকেও যদি পালাতে চান, মারা পড়বেন”
আসামি শব্দ টা শুনে মেহের ভ্রু কুচকে তাকায়। কথাটা যেন বড় আত্মসম্মান এ লাগলো তার। শীতল কন্ঠে বলল
“আপনি আসামি কাকে বললেন?”
বাইজিদ অবিলম্বে উত্তর দিলো
“আপনাকে”
“আসামি কাকে বলে জানেন আপনি?”
“সেটা আপনার থেকে শিখতে হবে আমার? শুধু আপনি নন, আপনার গোটা পরিবার আসামি। আমার বোন টাকে নির্মম অত্যাচার করেছেন আপনারা। এতক্ষণে তো গর্দান যাওয়া উচিত ছিলো, এখনো যে দাঁড়িয়ে আছেন সৃষ্টি কর্তার কাছে শুকরিয়া জানান।”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ হজম করলো বাইজিদ এর সব কথা। বাইজিদ আবার বলল
“রাতের বেলা প্রসাদের বাহির টা মৃত্যু পুরী। বাঁচতে চাইলে এক পা ও ফেলবেন না বাহিরে। পালানোর কথা ভুলে যায়”
এবার আর মিথ্যা অপবাদ সইলো না মেহের এর। ঝাঁঝিয়ে বলে উঠলো
“তখন থেকে এক কথা বলে যাচ্ছেন, পালানো পালানো আরে কে পালাচ্ছিল? এশার আযান হয়ে গেছে সেই কখন। পানির জন্য অযু করতে পারছি না। মানুষ ফাঁসির আসামি কে ও নামাজের সুযোগ দেয়। আপনারা আমাকে তার চেয়েও নিকৃষ্ট ভাবছেন”
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো মেহের
“আসর আর মাগরিব এর নামাজ টাও পড়তে পারিনি। একটা মেয়ে এসেছিলো, ওকে বলেছিলাম একটু পানি দিতে অযু করবো…….”
মেহের এর গলা ভেঙে কান্না আসে। বাইজিদ এর বুকের ভিতর মোচর দিয়ে ওঠে। দরদর করে ঘামতে লাগলো, কেমম হাসফাস লাগছে। নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী লাগছে। মশাল টা ঘুটঘুটে ঘরের দেওয়ালে লাগিয়ে বলল
“যে কাওকে বললেই এনে দিতো পানি। কে এসেছিলো বললেন, দেয়নি পানি?”
মেহের চোখ মুছে বলল
“পানির কথা বলতেই সে ওই প্রদীপ টা দিয়ে আঘাত করলো আমার হাতে।”
কব্জি থেকে উন্মুক্ত হাতের উল্টো পিঠে দেখা গেলো সেই ক্ষত। ফর্সা সাদা হাতটার ওপর লাল জখম হয়ে আছে। রক্ত পড়ে শুকিয়ে গেছে সেখানে। বাইজিদ এর রক্ত টগবগ করে উঠলো। কার এতবড় সাহস, নিষেধ করা সত্ত্বেও এই ঘরে এসেছে আবার আঘাত করেছে এই মেয়েটাকে।
“আপনি চিনতে পারবেন তাকে?যে আঘাত করেছে”
মেহের দুদিকে মাথা নেড়ে বলল
“নিকাব পরা ছিল”
বাইজিদ এর ইচ্ছে করছিলো ক্ষত স্থান টা একটু ছুয়ে দিতে। কিন্তু সে যে পরনারী। বাইজিদ এর মনে পড়লো কিছুক্ষণ আগের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের কথা। মেহের বলল
“আপনি এখন যেতে পারেন”
বাইজিদ কোনো কথা না বলে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে। তখন এক দাসি পানির কলস নিয়ে আসছিলো মেহের এর ঘরে। বাইজিদ কে সেই ঘর থেকে বের হতে দেখে মুখে হাত দিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়।
“ইয়া আল্লাহহ, শাহজাদা ওই মেয়েটার ঘরে? এই রাত এর বেলায়। আল্লাহ মাফ করুক”
মেয়েটা ঘরে গিয়ে দেখলো মেহের এর ঘরটা আলোকিত। হবেই তো, শাহজাদা নিজে ছিলো এই ঘরে। বাইজিদ চলে যাওয়ার পর মেহের বোরখা টা খুলে বসলো। কাল থেকে কিচ্ছু টি মুখে তুলেনি সে। শরীরটা বড় ক্লান্ত। মাথায় হিজাব পড়ে থাকায় চুল গুলো ঘেমে একাকার। খুলে দিলো চুল গুলো। দাসি পানির কলস নিয়ে রুমে ঢুকতেই থমকে গেলো। মুখ আপনা আপনি হা হয়ে গেলো মেহের কে দেখে। কলস নামাতে ভুলে গেলো যেন।
সে এমন রূপ আগে কখনও দেখেনি। মশালের কমলা আলোয় মেহেরুন্নেসার মুখ যেন সোনালি আভায় জ্বলজ্বল করছে। তার ডিম্বাকৃতি মুখের ছায়া দেয়ালে পড়ে যেন আরেকটি মূর্তি গড়ে তুলেছে। ভ্রু দু’টি তীক্ষ্ণ অথচ কোমল, চোখ দুটি গভীর, রাতে স্থির পুকুরের মতো। যার ভেতর আগুনের প্রতিফলন কাঁপছে। সেই চোখে এমন এক স্থিরতা, যেনো তিনি পৃথিবীর সব কথা বুঝেও চুপ করে আছেন।
গায়ের রং এত মসৃণ আর উজ্জ্বল যে মশালের আলো তাতে লেগে থেকে যেতে চাইছে। মনে হচ্ছিল, আলো নিজেই তার ত্বকের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। ঠোঁট দুটি অল্প ফাঁক, নিঃশ্বাসের সঙ্গে হালকা ওঠানামা করছে, ডালিমের দানার মতো লালিমা সেই আগুনের আলোয় আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। আর চুল… সেই চুল খোলা। কৃষ্ণঘন কেশরাশি ঢেউ খেলানোভাবে পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে, ছড়িয়ে পড়েছে হাঁটু পর্যন্ত। আগুনের আলোয় মাঝে মাঝে তার চুলে লালচে আভা ফুটে উঠছে, যেনো রাতের আকাশে অগ্নির রেখা।
দাসি অজান্তেই একটু এগিয়ে এলো। তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো মানুষ নয় অলৌকিক রূপকথার চরিত্রকে দেখছে। এমন সৌন্দর্য, যা দেখে চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না, আবার বেশি সময় তাকিয়ে থাকতেও ভয় লাগে।
হঠাৎ মেহেরুন্নেসা চোখ তুলে তাকাতেই দাসি কেঁপে উঠল। সেই দৃষ্টি ছিল শান্ত, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত গভীরতা। দাসি তড়িঘড়ি চোখ নামিয়ে পানি রেখে বেরিয়ে গেল। মেহের অবাক হলো তার এমন ব্যাবহারে। অন্দর পেরোনোর পরও সেই দাসির বুকের ধড়ফড় থামল না। আজ রাতের সেই দৃশ্য হয়তো সারাজীবন তার চোখে লেগে থাকবে।
সকালবেলার অন্দরে রোদ এসে পড়েছে। পাথরের মেঝেতে আলো ঝলমল করছে, অথচ বাতাসে চাপা গুঞ্জন। ইতিমধ্যেই সেই দাসি মহলে ছড়িয়ে ফেলেছে, গতরাতে শাহজাদা সেই অজ্ঞাত মেয়েটির সাথে একঘরে রাত্রিযাপন করেছে। সকলের মুখে মুখে কথাটা মুহূর্তেই গোটা প্রাসাদ ছড়িয়ে গেলো। সেই দাসী কাজ করতে করতেই হঠাৎ বলে উঠল—
“আহা রে… এমন রূপও হয়!”
সবাই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো।
সিমরান মাত্র রান্না ঘরে আসলো। বাইজিদ এস নাশতা সে নিজে হাতে বানায়। কোনো দাসি কে হাত লাগাতে দেয় না তাতে। ময়দা মাখাতে মাখাতে শুনলো
“আমার তো মনে হইছিলো এ মাইয়া মানুষ না। রাইতের আসা সেই বিভীষিকা। যার সৌন্দর্য ই মাইনসের মরণের কাল ও হইতে পারে।”
আরেকজন বলল
“হেয় সত্যিই এত সুন্দর?”
সিমরান এর হাত থেমে গেল।
“কার কথা বলছো তোমরা?”
দাসী বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে বলল,
“ওই মাইয়াডা, ওই যে শাহজাদা লইয়া আইলো। অন্দরে আলাদা ঘরে রাখছল যে। বিশ্বাস করবেন না আফা, যেইইইই সুন্দর। আল্লাহহহ। আমি তো প্রথমে বিশ্বাস ই করবার পারি নাই ওইডা মানুষ। এই জন্যেই মনে হয় শাহজাদা হেরে এত নিরাপত্তায় রাখছে। আর শাহজাদা কেও দেখলাম রাইতে ওই ঘর থেকে বের হতে।”
সিমরান এর মুখটায় কালো ছায়া নেমে এলো
“তুমি দেখেছো তাকে?”
“ হ আফা। কাইল রাইতে পানি দিতে গেছিলাম ওই ঘরে। তখনই দেখলাম শাহাজাদা সেই ঘর থেকে বের হলো। আর মেয়েটা?আল্লাহ! মুখখানা যেনো পূর্ণিমার চাঁদ। গায়ের রং কেমন দুধে-আলতা। চোখ দুটো এত্ত সুন্দর। যার ঘরে যাবে, তার কপাল খুলে যাবে। এমন বউ পেলে তো স্বামী খুব ভাগ্যবান হবে।”
চারপাশে হালকা হাসির রোল উঠল।
কিন্তু সিমরানের ভেতরে যেনো আগুন জ্বলে উঠল। মেহের এর নামে প্রসংশার শব্দগুলো তার কানে কাঁটার মতো বিঁধতে লাগল।
কড়া গলায় বলল,
“কাজে মন দাও। অন্যের সৌন্দর্য দিয়ে তোমাদের কি?”
কণ্ঠে কঠোরতা দেখে দাসী চুপ হয়ে গেল।
ময়দা মাখা রেখে নিজ কক্ষে ফিরে দরজা বন্ধ করল সিমরান। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আয়নায় নিজের মুখ। পরিচিত, যত্নে সাজানো, লাবণ্যে ভরা।
সে হাত তুলে নিজের গাল ছুঁল।
“আমি কি কম সুন্দর ?”
মনে হলো, আয়নার ভেতরের মেয়েটা উত্তর দিচ্ছে না।
চুল খুলে দিল। কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এল কালো চুল। নিজের চোখের দিকে তাকাল, সেখানে কি সেই গভীরতা আছে? কিন্তু সেই মেয়েটির সৌন্দর্যের বর্ননা মনে পড়তেই নিজের সব লাবন্য ফিকে হয়ে উঠলো তার চোখে।
দাসীর কথাগুলো আবার ভেসে উঠল—
“দুধে-আলতা রং… পূর্ণিমার চাঁদ…”
তার বুকের ভেতর হিংসা ধীরে ধীরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
“এত সুন্দর?”
হঠাৎ মনে হলো, সে যেনো অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতায় নেমে গেছে। যেখানে কেউ তাকে আহ্বান জানায়নি, তবু সে হারার ভয় পাচ্ছে।
বাইজিদ তার মনে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেনো নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে। সে কখনো কিছু বলেনি। দাবি করেনি। তবু মনে মনে বিশ্বাস করেছিল,একদিন হয়তো…
কিন্তু যদি যদি সেই আবৃত মুখ, সেই অচেনা রূপ, কারও দৃষ্টি কেড়ে নেয়?
সিমরানের হাত কাঁপতে লাগল।
সে আয়নার দিকে ঝুঁকে নিজের চোখের নিচে তাকাল।
“আমি তো সবসময় আপনার পাশে ছিলাম। আমি তো আপনার কাছে কিচ্ছুটি দাবি করিনি। তাহলে কেন মনে হচ্ছে কেউ এসে সব নিয়ে যাবে?”
তার চোখ ভিজে উঠল।
“না… না… এটা হতে পারে না।”
হঠাৎ রাগে টেবিলের ওপর রাখা চুড়ির বাক্সটা ঠেলে দিল। কয়েকটা চুড়ি মেঝেতে পড়ে টুংটাং শব্দ করল।
শরীরের ভেতর আগুন জ্বলছে।
“ও শুধু এক শত্রু পক্ষের লোক ছাড়া কিচ্ছু না। শাহজাদা ওকে শাস্তি দেবে বলে এনেছে।”
কিন্ত এসব বুঝিয়েও মনকে শানৃত করতে পারছে না। বুকের গভীরে এক ভয়।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করল
“শাহজাদা কি সত্যিই ওই মেয়ের ঘরে রাত্রি যাপন করেছে? না না। এ হতেই পারে না। এ আমি জিবনেও বিশ্বাস করিনা। এত বছর ধরে আমার দিকে একবারও ফিরে তাকালো না সে। আর ওই মেয়ে…..এমনও তো হতে পারে তাকে শাস্তি দিতে গেছিলো ওই ঘরে। চাবুকের কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়ে এসেছে। কিন্তু আমায়ও তো বলতে পারতো”
সিমরান হাসলো পাগলের মতো
“উনিও না। পাগল একটা।”
মেহের জানলোও না অজান্তেই তার সৌন্দর্যের ছায়া আরেক নারীর হৃদয়ে হিংসার দহন জ্বেলে দিয়েছে।
সিমরান চোখ মুছে মাথায় ওড়না দিয়ে গেলো বাইজিদ এর ঘরে।
প্রাসাদের পশ্চিম প্রান্তের স্নানাগার থেকে ধোঁয়াটে বাষ্প ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পাথরের দেওয়াল ভেজা, মেঝেতে জলকণা চিকচিক করছে সকালের আলোয়। দরজাটা ধীরে খুলল।
সদ্য গোসল সেরে বের হলেন বাইজিদ শাহ্।
ভেজা চুল কপালের ওপর নেমে এসেছে এলোমেলোভাবে। কপাল বেয়ে জল গড়িয়ে গালে এসে থেমে থাকছে এক মুহূর্ত, তারপর নেমে যাচ্ছে গলার দিকে। প্রশস্ত কাঁধে শুধু একটি সাদা পাতলা কাপড়। বুকের ওপর জলরেখা ঝিলমিল করছে।
গোসলের পর তার দেহ যেনো আরও তীক্ষ্ণ, আরও স্পষ্ট। শক্ত বাহু, সোজা পিঠ, দৃঢ় চোয়াল। সবুজাভ চোখদুটি আজ অদ্ভুত স্বচ্ছ, যেনো ধুয়ে-মুছে আরও গভীর হয়েছে। চারপাশ নিঃশব্দ। কেউ নেই। তিনি ধীরে একপাশে রাখা নিজের পোশাক তুললেন। ভেজা চুল হাত দিয়ে পেছনে সরালেন। সেই একটুখানি ভঙ্গিতেই অনায়াস পুরুষালি ঔজ্জ্বল্য। ঠিক তখনই করিডোরের বাঁক ঘুরে থেমে গেল সিমরান। তার মনে বয়ে নিয়ে আসা সকল অভিযোগ আজ জানাবেই জমিদার সাহেব কে। কিন্তু দৃশ্যটা দেখে তার পা যেনো মাটিতে আটকে গেল।
বাষ্পের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ভেজা শরীর, কপালে জলবিন্দু, সাদা কাপড়ে আবৃত প্রশস্ত কাঁধ। তার নিঃশ্বাস আটকে গেল যেনো।
এতদিন সে তাকে দেখেছে রাজকীয় পোশাকে, দৃঢ় ও সংযত। আজ প্রথমবার এমন অরক্ষিত, এমন স্বাভাবিক, এমন কাছের।
বাইজিদ তখনও খেয়াল করেননি। ও ধীরে ধীরে পোশাক গায়ে তুলছে। ভেজা চুল থেকে ফোঁটা পড়ে মেঝেতে টুপটাপ শব্দ করছে।
সিমরানের চোখ সরছে না। বুকের ভেতর কেমন হালকা ঘোর তৈরি হলো। যেনো চারপাশের সব শব্দ মিলিয়ে গেছে। শুধু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি দৃশ্যমান।
বাইজিদ এর গলার হাড়ের কাছে জলকণা আটকে আছে। সিমরানের মনে হলো, সে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখে, সত্যিই কি এত উষ্ণ?
সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভাবনায় নিজেই কেঁপে উঠল।
হঠাৎ বাইজিদ মাথা তুললেন। দৃষ্টি গিয়ে পড়ল করিডোরের দিকে।
সিমরান স্থির। চোখে বিস্ময়, লজ্জা, আর অদ্ভুত এক মোহ। এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখে চোখ। বাইজিদের চোখ স্বাভাবিক, সংযত।
সিমরানের চোখে ঘোর।৷ সে যেনো বাস্তব ভুলে গেছে। বাইজিদ শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“কিছু বলবেন?”
শব্দটা শুনে যেনো ঘোর ভাঙল। সিমরান তড়িঘড়ি চোখ নামিয়ে ফেলল। গাল লাল হয়ে উঠেছে।
“না… আমি… পরে আসবো।”
কণ্ঠ কাঁপল। সে দ্রুত সরে গেল। করিডোর পেরোতেই দেয়ালে হাত রেখে দাঁড়াতে হলো তাকে।
নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে।
“এমন কেন…”
চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠল ভেজা চুল, জলবিন্দু, সেই গভীর চোখ।
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেনো আরও জোরে শোনা যাচ্ছে।
সে বুঝল, এই মানুষটাকে সে শুধু পছন্দ করে না।
সে হারিয়ে যাচ্ছে তার ভেতর। আর সেই হারিয়ে যাওয়ার ভয়ই তাকে আরও অসহায় করে তুলছে।
দূরে, প্রাসাদের অন্য প্রান্তে, সকালের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। প্রভার জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু বৈদ্য উঠতে নিষেধ করেছে। বাইজিদ এসে দেখা করলো বোন এর সাথে। কথা বলে বেড়িয়ে গেলো। আজ প্রতিবেশি রাজ্যের সাথে এক চুক্তি হতে চলেছে। সেখানে যেতে হবে। বাকের শাহ এর শরীর টা ভালো যাচ্ছে না, এখনো শুয়ে আছে তাই। বাইজিদ একাই বসলো নাশতা নিয়ে। সিমরান খাবার তুলে দিচ্ছে থালায়।
বাইজিদ এর পাশে দাড়িয়ে বলল
“রাতে কোথায় ছিলেন?”
এমন প্রশ্নে একটু অবাক হলো বাইজিদ
“ঘরেই ছিলাম, কোথায় থাকবো আবার?”
সিমরান নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল
“যেই মেয়েটাকে বড় আপার শশুর বাড়ি থেকে এনেছেন, তাকে কি আপনি দেখেছেন?”
বাইজিদ পরোটার টুকরো মুখে নিতে গিয়ে থামলো
“এ কথা কেনো বললেন?”
সিমরান কিছু বলার আগেই সুনেহেরা আসলো খাবার টেবিলে। বসলো বাইজিদ এর পাশে। সোনালি চুল গুলো ভিজে। সকাল সকাল সুগন্ধি মিশ্রিত পানিতে গোসল সেরে পরিপাটি থাকা তার স্বভাব। মেয়েটার চুলের রং কেমন অদ্ভুত। রোদে গেলে ঝলঝল করে সোনালি রং, আবার ভিজলে তা রক্তজনার ন্যায় লালচে লাগে।
বাইজিদ খেতে খেতে খেয়াল করলো সুনেহেরার হাতে লম্বা কাটা দাগ। বাইজিদ ওর হাত টা ধরে বলল
“সুনেরাহ, কি হয়েছে এখানে? এতটা লাগলো কি করে?”
সুনেহেরা চট করে সরিয়ে ফেলল হাতটা। মিছেমিছি হাসার চেষ্টা করে বলল
“আ….আসলে ভাইজান হয়েছে কি, কালকে রন্ধনশালায় একটু সালাদ বানাতে গেছিলাম। তখনই….”
বাইজিদ ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।
“এত লোকজন থাকতে তোর কেনো রান্নাঘরে যেতে হয় বলতো”
সুনেহেরা শুকনো ঢোক গিলল। তলোয়ার এর আঘাত টা খুব বেশি লাগে নি। নইলে হাতটাই না আলাদা হয়ে যেত তার থেকে।
খাওয়া শেষ করে বাইজিদ বেড়িয়ে গেলো।
বাইজিদ চলে যেতেই সিমরান গেলো মারজান বেগম এর কাছে। গতকালকে দাসির দেখা সব কিছু বলল খুঁটে খুঁটে। বাইজিদ কে সেই মেয়ে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে। বাইজিদ গতরাত তার কক্ষেই কাটিয়েছে। মারজান দু’জন দাসিকে ডেকে হুকুম দিল
“যা তোরা কয়েকজন মিলে টেনে নিয়ে আয় সেই শয়তানি কে। প্রথমে আমার দুটো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে, এখন জমিদার পুত্রের চরিত্র নষ্ট করার চেষ্টা করছে? নিয়ে আয় ওকে। সব কাজ ওকে দিয়ে করাবি মহলের”
দাসিরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিে বলল
“ক্ষমা করবেন আম্মাজান। শাহজাদার নিষেধ আছে”
মারজান বলল
“আমি বলছি তোদের আনতে। যা, বাইজিদ সন্ধ্যার আগে ফিরবে। তার আগে আসবে না। নিয়ে আয়”
মেয়েটার সাথে খারাপ আচরণ করতে মন সায় দিচ্ছে না সেই দাসির। তবুও জমিদার গিন্নির হুকুম মানতে গেলো মেয়েটাকে আনতে। মেহের কে বলল
“আপনাকে আম্মাজান বৈঠক খানায় ডেকেছেন”
মেহের কিছুটা ভাবনায় পড়লেও গেলো তাদের পিছু পিছু। দাসী এই ভেবে খুশি হলো যে জোড় করতে হয়নি তাকে। গুটিগুটি পায়ে নিচে আসতেই দেখলো মারজান আর সিমরান বসে আছে সোফায়। মেহের কে দেখে সিমরান ভ্রু গুটালো। এখনো তেমন করেই ঢেকে এসেছে। একটা পশমও দেখবার উপায় নেই।
মারজান কড়া গলায় হুকুম দিলো
“সকলের জন্য দুপুরের খাবার তৈরি করো যাও। এসেছেন নবাব নন্দিনী”
মেহের টালোমালো চোখে এক দাসীর সাথে রান্না ঘরে গেলো। বেলে রাখা রুটি গুলো প্রথমে সেঁকতে শুরু করলো। মারজান দেখছে দাড়িয়ে ওর কাজ করা। আচমকা মেহের এর হাত ধরলো খপ করে। মেহের মারজান এর দিকে তাকাতেই বলল
“হাত মোজা পরে রুটি বেলবে কি করে? দাড়াও আমি খুলে দিচ্ছি”
হাত মোজাটা টেনে খুলতেই উন্মুক্ত হলো মেহের এর ফর্সা কোমল হাতটি। তালু টা লালচে বর্ন ধারন করেছে। মনে হচ্ছে টোকা দিলেই রক্ত গড়িয়ে পড়বে। সিমরান তীক্ষ চোখে দেখলো মেহের এর হাত খানা। দাসী বোধহয় মিথ্যা বলেনি। মারজান ওমনি হাতটা চেপে ধরলো গরম তাওয়ার ওপর।
মেহের চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো। দাসীরা সবাই চমকে উঠলো এমন কান্ডে। চেপে রেখেঋে তো রেখেছেই। ছাড়ানোর নাম নেই। শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছে সব দাসীদের, কারো প্রতিবাদ করার সাধ্যি নেই। সিমরান কুটিল হাসি দিলো। মেহের আকুতি মিনতি করে কান্না করেও নিস্তার পেলো না মারজান এর থেকে।
সাহাবাদ এর মধ্য অঞ্চলে তখন জমিদার এর অশ্ববহর। আচমকাই বাইজিদ এর বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি শুরু হলো। কোনো ভাবেই তা দমানো যাচ্ছে না। রক্ষী প্রধান কে বলল
“মাহাদি, সকলকে একটু থামতে বলো। একটু বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন”
তখনই মুখোমুখি হলো পাশের রাজ্যের দূত। ঘোড়া ছুটিয়ে এদিকেই আসছে। তাদের দেখে থামলো। মাহাদির কানে কানে কিছু বলে ফের চলে গেলো। মাহাদি এসে বাইজিদ কে বলল
“শাহজাদা, আজকের বৈঠক টা তারা বাতিল করেছে। আগামীকাল তারাই আসবে আমাদের কাছে। চলুন মহলে ফেরা যাক”
বাইজিদ প্রতুত্তরে বলল
“চলো মাহাদি। আমারও মন টা হঠাৎ কেমন কু গাইছিলো। খোদার কাছে প্রার্থনা, ফিরে যেন সবাই কে সুস্থ সবল দেখি”
এক ঘন্টার ব্যাবধানে তারা প্রাসাদে ফেরত এলো। মেহের তখনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। চাবুকের কয়েক ঘা ও বসিয়েছে মারজান পিঠে। বাইরে অশ্বখুর এর শব্দ পেয়ে চমকে উঠলো সবাই।
“বাইজিদ কি এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে?নাকি অন্য কেউ এসেছে?”
গল্প মেইন প্লটে ঢুকতে আরেকটু সময় লাগবে। আপনারা আগেই ভুল বুঝবে না। সব অপরাধী শাস্তি পাবে। সাহাবাদ এর নূর অর্থাৎ আলো হয়ে এসেছে মেহেরুন্নেসা। আগেই বিভ্রান্ত হবেন না অনুরোধ 🤍
চলবে?
কেমন হলো জানিও পাখিরা ☺️🫶
কেমন লাগছে বাইজিদ কে? জানাতে ভুলও না।
আমি নিয়মিত গল্প দিই, অথচ আমার গল্পেই তোমরা রিয়্যাক্ট কম দাও 😔
২.২k কিন্তু অবশ্যই পূরণ করবা কেমন 🫶🤍
আর ৫০০ কমেন্ট যেনো হয় প্লিজ 🥹🥲
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৯
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৬ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫