নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
২৪ এর শেষাংশ
কক্ষের মাঝের বিশাল পালঙ্কটায় অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে রত্নপ্রভা। বৈদ্য তার পাশে বসে হাতের নারী পরীক্ষা করছে। ঘর ভর্তি কয়েকজন দাসী, আরাম কেদারায় বসে আছে মারজান। সুনেহেরা ঘরের এক কোণে দেওয়াল হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। প্রভার পাশে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরুন্নেসা। চোখ ভর্তি বিষ্ময় তার। মারজান একবার বৈদ্য কে দেখছো একবার কটমট চোখে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকাচ্ছে।
মহিলা কে দেখে এ ফোঁটাও মনে হচ্ছে না গতদিই সে তার এক মেয়েকে হারালো। বৈদ্যকে কড়া গলায় বলল
“কি দেখছেন ওতো নেড়েচেড়ে। কি হয়েছে সেটা তো বলুন”
বৈদ্য মহিলাটি অবগত মারজান এর ব্যাবহার সম্পর্কে। বিধায় তেমন কিছু মনে করলেন না। মুখ ভাড় করে শুধু বলল
“নাড়ি অত্যন্ত দুর্বল। মাত্রাতিরিক্ত চিন্তার ফলে শরীরের রক্তচাপ বেড়ে জ্ঞান হারিয়েছে।”
মারজান বসা থেকে ধপ করে দাড়ালো। দাঁতে দাঁত পিষে এগিয়ে আসতে আসতে বলল
“ওসব ভুজুংভাজুং অন্য কাউকে বুঝিও বৈদ্য সাহেবা। এত কিছু হলো তাতে কিচ্ছু হলো না আর আজ এমনি এমনি জ্ঞান হারিয়েছে? নিশ্চিত এই মেয়েটা কিছু করেছে”
মেহেরুন্নেসাকে উদ্দেশ্য করে বলল কথাটা। বড় বড় ওা ফেলে মেহেরুন্নেসার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার বাহুটা চেপো ধরে বলল
“সত্যি করে বল কি করেছিস আমার মেয়েটার সাথে। নইলে এত সকালে গোরস্থানে কি করতে নিয়ে গেছিলি? নিশ্চয়ই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো”
মেহেরুন্নেসা এবার চুপ থাকলো না। এক ঝামটা দিয়ে সরিয়ে দিলো মারজান কে। শরীর স্বাস্থ্যের অধিকারী এক মহিলাকে নিজ শক্তিতে সরাতে বেশ বল প্রয়োগ করতে হলো মেহেরুন্নেসা কে। জিদের বসে শরীর যেন আপনা আপনি শক্তি পেলো। অগ্নিমূর্তি হয়ে বলল
“কি নোংরা উদ্দেশ্যে নিয়ে যাব বলুন তো? এই মহলে আপনার থেকে নোংরা মনের মানুষ আর দুটো দেখাতে পারবেন?”
নিজের বাহু ঝাড়তে ঝাড়তে মেহেরুন্নেসা বলল
“পরের বার থেকে আমার সাথে এমন আচরণ করার আগে দশবার ভাববেন”
মারজান আরো দ্বিগুণ ক্ষেপে গেলো। হুংকার দিয়ে বলল
“আমার মহলে দাঁড়িয়ে আমাকেই হুমকি দিস? মিসকিন এর ঘরের মেয়ে কোথাকার। বের হ আমার মহল থেকে”
মেহেরুন্নেসাও গর্জে উঠলো
“এই মহল আপনার বাবার নয় মারজান বিবি। যে আমাকে বের করে দিবেন। আপনিও এই মহলে বউ হয়ে এসেছেন, আমিও এই মহলে বউ হয়ে এসেছি। এই প্রাসাদ আমার শশুড়ের, ভবিষ্যতে আমার স্বামীর। আপনার বাবা করে দিয়ে যান নি এগুলো”
মারজান মেহেরুন্নেসার কথায় হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। একটু থেমে সামান্য এগিয়ে এসে মেহেরুন্নেসা আবার বলল
“বরং আপনার চাইতে আমার অধিকার বেশি এই মহলে। কারণ আমি শাহজাদা বাইজিদ এর একমাত্র স্ত্রী। আর আপনি বাকের শাহ্ এর দ্বিতীয় স্ত্রী। ওনার সব সম্পদের প্রাপ্ত মালিল কেবল শাহজাদা, আপনার কোনো সন্তান রা নয়। পিতার কথা মান্য করে, তার প্রতি সম্মান থেকে শাহজাদা এ যাবৎকাল আপনাকে থাকতে দিয়েছে মহলে। কিন্তু আমার সাথে এমন রূঢ় আচরণ এর কথা তার কানে গেলে আপনি এই মহল থেকে বিতাড়িত হতে পারেন। তাই যা করবেন ভেবে চিন্তে করবেন”
মারজান হা করে তাকিয়ে রইলো। মেহেরুন্নেসা বড় বড় পা ফেলে কক্ষ ত্যাগ করলো। দাসীরা সরে গিয়ে তাকে পথ করে দিলো। দরজা ওবদি গিয়ে থামলো সে। পিছনে ফিরে আদেশের স্বরে বলল
“অসুস্থ মানুষের কক্ষে ভির না বাড়ানোই শ্রেয়। দয়া করে যে যার কাজে যান। কেবল একজন দাসী আর বৈদ্য সাহেবা থাকুক আপার কাছে”
বলে আর এক মূহুর্তও দেরি করলো না মেহেরুন্নেসা। সোজা চলে গেল হেঁশেলেন। এ খবর এখনো শাহজাদা ওবদি পৌঁছায় নি। মেহেরুন্নেসা নাশতার থালা সাজাতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য। সেই রাতের কথা মনে পড়তেই কেমন হাসফাস করছিলো প্রভা। শ্বাস দ্রুত হয়ে আসছিলো, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। হাত-পা কাঁপছিল রীতিমত। অবশেষে সে আর কথাই বলতে পারলো না ঢলে পড়লো মাটিতে। মেহেরুন্নেসার চিৎকারে প্রহরী রা জড় হয় সেখানে। পরে মহলের দাসীদের দিয়ে তাকে কক্ষে আনা হয়। প্রভার শরীরের চাইতে বেশি চিন্তায় মেহেরুন্নেসা কথা গুলো শুনতে পারলো না বলে।
নাশতা প্রস্তুত করতে করতেই ভাবে। কী অদ্ভুত এই মহলের প্রতিটা চরিত্র। এই মহলে এই জমিদার বংশে আরো একজন পুত্র ছিলো। অথচ কারো মুখে শোনা যায় না তা। গোটা প্রাসাদে কোনো অস্তিত্ব ই নেই তার। এমন সময় সুনেহেরা হেঁশেলে ঢুকে ঢুলতে ঢুলতে। যেন ঘুমের রেশ এখনো কাটে নি। একে আরেক নমুনা লাগে মেহেরুন্নেসার কাছে। সবচেয়ে অদ্ভুত এ গোটা মহলে। এতক্ষণ প্রভার ঘরে দিব্যি স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন এমন ঢুলছে যেন কত কালের অপূরনীয় ঘুম ছেড়ে তাকে উঠতে হলো। জড়ানো গলায় পিছন থেকে বলল
“ভাবি নাশতা দাও”
মেহেরুন্নেসা কথা বলল না। চুপচাপ রুটি আর গোশত থালায় দিয়ে দিলো। থালা টা বাড়িয়ে দিতেই সুনেহেরা কপাল কুচকালো। নাক সিটকিয়ে বলল
“এসব না ভাবিইই। আমি সকাল বেলা অয়েল ফ্রি খাবার খাই”
মেহেরুন্নেসা এমন অদ্ভুত ভাষা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো
“কী খাও?”
সুনেহেরা নির্লিপ্ত ভাবে ফের বলল
“অয়েল ফ্রি ফুড। ইট’স সো স্কিন লাইক”
মেহেরুন্নেসার চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
“এ কি ভাষা বলছো আপা? এসব তো কখনো শুনিনি। এগুলো কি খাবার আবার?”
সুনেহেরা ফিক করে হেসে ফেলল। কারণ সে জানতো মেহেরুন্নেসা ইংরেজি জানবে না নিশ্চয়ই। কারণ গোটা রাজ্যের হাতে গোনা কয়েকজন মেয়েই আছে তার শিক্ষিত। তবে তারা শিক্ষিত বলতো কেবল বাংলা পড়তে এবং লিখতে জানে। জমিদার মহলের সব মেয়েরাই পড়াশোনা শিখেছে তবে জমিদার মহলের পুরুষরাই কেবল ইংরেজি জানে। বহিরাগত বনিকদের সাথে ব্যাবসার প্রয়োজনেই মূলত তাদের ইংরেজি শেখা। বাইজিদ এর পাঠাগারে অনেক রকমের ইংরেজি ডিকশনারি এবং ইংলিশ নোভেল ও আছে। সেগুলো ঘাটাঘাটি করে সুনেহেরা বেশ অনেকটা ইংরেজি শিখেছে।
মেহেরুন্নেসার ছানাবড়া মুখটার দিকে তাকিয়ে সুনেহেরা বলল
“এটা ইংরেজি শব্দ ভাবি। অয়েল মানে হচ্ছে তেল, তেল বুঝলে? অয়েল ফ্রি ফুড মানে হচ্ছে তেল চর্বি ছাড়া খাবার। এগুলো ত্বকের জন্য খুবই ক্ষতিকর।”
মেহেরুন্নেসা বলল
“তাহলে কী খাবে?”
ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে সুনেহেরা বলল
“তুমি ভাইজান এর জন্য খাবার নিয়ে যাও। আমার টা আমি তৈরি করে নিচ্ছি। দুইটা মুরগির ডিম সিদ্ধ, এক গ্লাস ফলের তাজা রস আর শসা, টমেটো গাজর দিয়ে সালাদ বানাবো”
“ওগুলো খেয়ে পেট ভরে?”
সুনেহেরা চোখ টিপে বলল
“এগুলো হেলদি ফুড। ও তুমি বুঝবে না। তুমি এমনিই সুন্দর। যাও যাও। ভাইজান এর খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
মেহেরুন্নেসা অতগুলো খাবার সহ ট্রে টা নিজেই নিয়ে গেলো। সুনেহেরা দেখে বলল
“মেয়েটা বোকা নাকি? একটা দাসী ডেকে নিলেও তো পারতো”
সোনালি ছুড়ি টা দিয়ে গাজর কুচি করতে করতে একা একাই নিজের সাথে বিড়বিড় করলো
“তুই এসবের কী বুঝবি রে? এ হলো স্বামীর প্রতি প্রেম, মুহাব্বাত।”
খাবার হাতে দরজার সামনে এসে কিঞ্চিৎ থামলো মেহেরুন্নেসা। গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হলো। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিলো। তারপর মাথা নিচু করে আস্তে করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে ঢুকেই সে থমকে গেল। বাইজিদ সবে গোসল সেরে বেরিয়েছে। তার ভেজা চুল থেকে এখনও ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে। সাদা পোশাকটা আলগা করে পরা। সকালের আলোয় তাকে অদ্ভুত রকম সুদর্শন লাগছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। মেহেরুন্নেসাকে ঢুকতে দেখে ধীরে ধীরে ফিরে তাকালো। তারপর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত, মিটিমিটি হাসিটা ফুটে উঠলো। তার সেই সবুজাভ চোখে আজ এমন এক কামুক দৃষ্টি, মেহেরুন্নেসার মনে হলো মাটির সঙ্গে মিশে যায়। গভীর, নরম, তবু কেমন অদ্ভুত কামনা মেশানো। বাইজিদ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। নিচু গলায় বললো
“ এখন এত লজ্জা কিসের? গতরাতে তো মরিয়া হয়ে উঠেছিলে আমায় কাছে পেতে।”
মেহেরুন্নেসা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকালো। কত বড় মিথ্যে কথা। পাগল হয়েছিল সে আর দোষ দিচ্ছে মেহের কে?
“আপনি এটা বলতে পারলেন?”
“কেন?”
বাইজিদ আরও কাছে এসে দাঁড়ালো।
“ভালো লাগেনি আমার সঙ্গ তোমার?”
তারপর সে আলতো করে মেহেরুন্নেসার হাত থেকে থালাটা নিয়ে পাশে রেখে দিলো। আর অন্য হাত দিয়ে খুব আস্তে তার থুতনিটা তুলে ধরলো।
“সক্কাল সক্কাল তোমাকে দেখে আবার নতুন করে প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে।”
বাইজিদ কিছুক্ষণ মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে সেই মিটিমিটি হাসি। মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। লজ্জায় তার হাত দুটো ওড়নার প্রান্ত আঁকড়ে আছে। বাইজিদ খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে তার হিজাবের এক প্রান্ত খুলে দিলো। মেহেরুন্নেসা চমকে তাকালো, কিন্তু কিছু বললো না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তার মসৃণ, লম্বা চুল কাঁধ বেয়ে নেমে এলো। বাইজিদ চুপচাপ সেই চুলের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব আস্তে তার কাঁধের ওড়নাটাও একটু সরিয়ে দিলো।
মেহেরুন্নেসা আরও আড়ষ্ট হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও যেন সে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। বাইজিদের দৃষ্টি থেমে গেল তার গলার কাছে। ফর্সা গলার পাশে, ঘাড়ের কাছে, লালচে কয়েকটা চিহ্ন এখনও স্পষ্ট। গত রাতের কাছে আসার স্মৃতি যেন সেখানে রয়ে গেছে।
মেহেরুন্নেসা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি ওড়না টেনে নিতে গেল। কিন্তু বাইজিদ তার হাতটা আলতো করে ধরে ফেললো। তারপর খুব ধীরে, যত্ন করে, আঙুলের ডগা দিয়ে সেই লালচে দাগগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দিলো। মেহেরুন্নেসা কেঁপে উঠলো। লজ্জায় তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
বাইজিদ নিচু স্বরে হেসে বললো,
“এত লজ্জা পাচ্ছো কেন? এগুলো তো আমারই দোষ। আমারই দেওয়া দাগ। আমিই দেখছি। সমস্যা কোথায়?”
মেহেরুন্নেসা কিছু বললো না। শুধু মুখটা আরও নিচু করে ফেললো। বাইজিদ তার কানের পাশে নেমে আসা চুল সরিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার দিকে ঝুঁকে এলো। তার আঙুল এখনও মেহেরুন্নেসার গলার কাছে থেমে আছে।
“এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কিন্তু আবারও…..”
কথা শেষ করার আগেই সে তাকে কাছে টানতে গেল। মেহেরুন্নেসা তার অভিলাষ বোঝার সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো। লজ্জায় তার মুখ একেবারে লাল হয়ে গেছে। সে তাড়াতাড়ি দুহাতে বাইজিদের বুক ঠেলে একটু দূরে সরিয়ে দিলো।
“ছিঃ আপনি একদম ভালো না। কি বলছেন এসব”
বাইজিদ ভ্রু তুলে তাকালো।
“এসব মানে?”
মেহেরুন্নেসা তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
তারপর প্রায় জোর করেই তাকে একটু দূরে সরিয়ে দিয়ে থালার দিকে ইশারা করলো।
“আগে নাশতা করুন। সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
বাইজিদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠলো।
“আচ্ছা,”
বলে সে কাপড় বদলাতে চলে গেল। মেহেরুন্নেসা ততক্ষণে খাবারগুলো গুছিয়ে রাখছে। কিন্তু তার হাত এখনও কাঁপছে হালকা। নিজের গাল দুটোও যেন এখনও জ্বলছে।
কিছুক্ষণ পর বাইজিদ ফিরে এলো। এবার সে অন্য পোশাক পরে এসেছে। তবুও তার চোখের সেই দুষ্টুমি একটুও কমেনি। সে এসে মেহেরুন্নেসাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। মেহেরুন্নেসা একটু উসখুস করে উঠলো। ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কি হলো? খাচ্ছেন না কেন?”
বাইজিদ একদম ছোট ছেলের মতো গলায় বললো
“খাইয়ে দাও।”
মেহেরুন্নেসা হতভম্ব হয়ে তাকালো।
“কি?”
“খাইয়ে দাও”
সে আবার বললো।
“আজ আমার জন্মদিন। আমার একটু আদর পাওয়ার অধিকার আছে।”
“আপনি না…”
মেহেরুন্নেসা লজ্জা আর বিরক্তির মাঝামাঝি এক মুখ করে তাকালো।
বাইজিদ এবার ভ্রু উঁচু করে বললো,
“হয় খাইয়ে দাও, না হয়…..”
“দিচ্ছি দিচ্ছি”
বাইজিদ ফিক করে হেসে ফেলল। মেহেরুন্নেসা অবিশ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। এত বড় মানুষ, অথচ এই মুহূর্তে তাকে একদম জেদি বাচ্চার মতো লাগছে। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে সে রুটির টুকরো ছিঁড়ে মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে তার দিকে এগিয়ে দিলো।
বাইজিদ খেয়ে নিয়ে মিটিমিটি হেসে বললো
“এবার মনে হচ্ছে সত্যিই আমার বিয়ে হয়েছে।”
বাইজিদ আবার ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসাকে নিজের দিকে টেনে নিলো। তার ভেজা চুলের গন্ধ, নিচু গলার স্বর সব মিলিয়ে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।
নাশতা শেষ করেও বাইজিদ উঠলো না। বরং চুপচাপ বসে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে রইলো।
মেহেরুন্নেসা থালা গুছাতে গুছাতে বললো, “আপনি নিচে যাবেন না? সকলে তো খোঁজ করবে।”
বাইজিদ একদম নড়লো না।
“যাবো”
সে ধীরে বললো।
“তবে একটা শর্ত আছে।”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকালো।
“কি শর্ত?”
বাইজিদ ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু হাসিটা ফুটিয়ে বললো
“আমায় একটা চুমু খাও।”
মুহূর্তের মধ্যে মেহেরুন্নেসার মুখ লাল হয়ে উঠলো।
“আপনি এসব কি বলছেন?”
“খুব স্বাভাবিক কথা বলছি”
বাইজিদ গম্ভীর হওয়ার ভান করলো।
“আমার স্ত্রী আমাকে একটা চুমু খাবে। এতে এত ভনিতা করার কি আছে?”
“আমি পারবো না।”
“তাহলে আমিও এক পাও নড়ছি না।”
সে আরাম করে বিছানার পাশে বসে পড়লো। দুহাত গুটিয়ে বললো
“এখন তুমি যত খুশি বোঝাও।”
মেহেরুন্নেসা অসহায় হয়ে তার দিকে তাকালো। “আপনি একদম ছেলেমানুষ।”
“হতে পারি। কিন্তু চুমু না খেলে আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
“নিচে সবাই অপেক্ষা করছে।”
“করুক।”
“আপনার অনেক কাজ আছে।”
“থাকুক।”
মেহেরুন্নেসা এবার সত্যিই কি করবে বুঝতে পারলো না। তার বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে। বাইজিদ এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন সে না বলা পর্যন্ত সত্যিই উঠবে না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষ পর্যন্ত খুব আস্তে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। বাইজিদের চোখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠলো।
“এই তো”
খুব নিচু গলায় বললো সে। মেহেরুন্নেসা কাঁপা কাঁপা হাতে তার মুখের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আবার লজ্জায় থেমে গেল।
“না… আপনি তাকিয়ে থাকবেন না।”
“তাহলে?”
মেহেরুন্নেসা ইতস্তত করে নিজের দুহাত তুলে তার চোখ দুটো আলতো করে ঢেকে দিলো।
বাইজিদ মৃদু হেসে ফেললো।
“এভাবে?”
“চুপ”
ফিসফিস করে বললো মেহেরুন্নেসা।
তারপর খুব ধীরে, খুব লাজুকভাবে সে ঝুঁকে এসে বাইজিদের গালে একটুখানি চুমু দিলো।
মুহূর্তের মধ্যে সে সরে যেতে চাইল। কিন্তু বাইজিদ তার হাতটা খপ করে ধরে ফেললো।
সে ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার হাত দুটো নিজের চোখ থেকে সরিয়ে দিলো। তারপর গভীর মমতায় তার দিকে তাকালো।
“এতটুকু?”
নিচু স্বরে বললো সে। মেহেরুন্নেসা আর কিছু বলার আগেই বাইজিদ খুব আস্তে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। তারপর তার কাঁপা হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
“এবার যাই?”
মেহেরুন্নেসা ওপর নিচ মাথা নাড়লো। বাইজিদ দরজার কাছে গিয়ে আবার একবার ফিরে তাকালো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর এক পা এগিয়ে এসে নিচু গলায় বললো
“কিন্তু যাওয়ার আগে আরো একটা জিনিস চাই।”
মেহেরুন্নেসা বিস্মিত হয়ে তাকালো।
“আবার কি?”
“এবার আমি তোমাকে একটা চুমু খেতে চাই।”
মেহেরুন্নেসা কিছু বলার আগেই বাইজিদ তাকে নিজের কাছে টেনে নিলো। তার কপালে, তারপর আলতো করে ঠোঁটে ভালোবাসা ছুঁইয়ে দিল। মুহূর্তটা ছিল খুব ছোট, কিন্তু তবুও মেহেরুন্নেসার মনে হলো, যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেছে।
তারপর সে দ্রুত সরে এলো। লজ্জায় তার মুখ একেবারে রাঙা। বাইজিদ হেসে উঠলো।
“এবার যাই।
সে বেরিয়ে গেল। নিচে নামতেই দেখলো পুরো প্রাসাদ যেন আলোয়, রঙে, শব্দে ভরে উঠলো। বিশাল উঠোনে রঙিন কাপড় টাঙানো হয়েছে। দাস-দাসীরা ব্যস্ত। মশকের গোলাপজল ছিটানো হচ্ছে চারদিকে। সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাকের শাহ্। ছেলেকে দেখেই তিনি গম্ভীর মুখে এগিয়ে এলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বললেন
“শুভ জন্মদিন, শাহজাদা।”
বাইজিদ মাথা নত করলো।
“দোয়া করবেন, আব্বাজান।”
বাকের শাহ্ তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘ জীবন দিন।”
ঠিক তখনই পাশ থেকে নরম গলায় ভেসে এলো
“শুভ জন্মদিন, শাহজাদা।”
সিমরান আজ সে খুব সাজগোজ করেছে। গাঢ় লাল পোশাক, গলায় ভারি হার, ঠোঁটে হাসি। তার চোখে স্পষ্ট আশা আজ অন্তত বাইজিদ তার দিকে একটু তাকাবে।
কিন্তু বাইজিদ একবারও তার দিকে তাকালো না। যেন তার কথা সে শুনতেই পায়নি। একদম নির্লিপ্ত মুখে সে সোজা হেঁটে চলে গেল।
সিমরানের মুখের হাসিটা সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল। তার আঙুলগুলো আঁচলের কিনারা শক্ত করে চেপে ধরলো। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মহিলা নিজেদের মধ্যে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
ওদিকে মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে হেঁশেলের দিকে এলো। আজ প্রাসাদের রান্নাঘর একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। বড় বড় হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে, দাসীরা ছুটোছুটি করছে। কেউ মাংস কাটছে, কেউ মশলা বাটছে, কেউ মিষ্টির থালা সাজাচ্ছে।
মেহেরুন্নেসা ভেতরে ঢুকতেই সবাই একটু থমকে তাকালো। তারপর জায়গা ছেড়ে দিলো।
সে নিজে হাতেই রান্না করতে বসলো।
আজ বাইজিদের সবচেয়ে পছন্দের সব খাবার হবে। জাফরানি পোলাও। গরুর রেজালা। কিশমিশ আর বাদাম দেওয়া শাহী কোর্মা। আর মিষ্টির জন্য তার প্রিয় জর্দা। চুলার আগুনের সামনে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মেহেরুন্নেসা কোনো এক ভাবনায় ডুবে গেল। তখনই পাশে এসে বসলো সুনেহেরা। মেহেরুন্নেসা সুনেহেরা কে একা পেয়ে ভাবলো এই সুযোগ তার সাথে আলাপ করার।
“আচ্ছা আপা, তুমি অরণ্য শাহ্ এর ব্যাপারে জানতে না?”
সুনেহেরার সোজা সাপটা উত্তর
“ওমা। আমাদের ভাই, জানবো না?”
“তাহলে সেদিন জাহাজের বগি তে যাকে দেখেছিলাম, সে শাহজাদার মত দেখতে ছিল। কই তখন তো তোমার মাথায় আসলো না, যে ওটা অরণ্য শাহ্ হতে পারে। তুমি এমন আচরণ করছিলে যেন আমার মত তুমিও কিছু জানো না”
সুনেহেরা ঠোঁট বেকালো
“ভাবি তুমু কি পাগল? ছোট ভাইজান মারা গেছে ৭ বছর হয়ে গেছে। সে ওখানে কোথ থেকে আসবে?”
মেহেরুন্নেসার কুচকে যাওয়া কপাল শিথিল হলো। এটাও তো ঠিক। সে আবার বলল
“আচ্ছা অরণ্য শাহ্ এর সাথে বড় আপার সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু সে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলো আমার ভাই কে। এই দুইটা বছর জমিদার পরিবার একবারও খোঁজ নিলো না তাদের বড় মেয়ের। আবার যখন আপা ফিরে এলো, কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো মান অভিমান না দেখিয়েই তাকে গ্রহণ করলো।”
সুনেহেরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে শুনছে তার কথা গুলো মেহের বলল
“আমার মনে হচ্ছে কোনো ভাবে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলবে”
সুনেহেরা বড় করে শ্বাস নিয়ে গালে হাত দিয়ে বসলো মেহেরুন্নেসার পাশে। মুচকি হেসে বলল
“ভাবি? এইযে ভাইজান বড়আপা কে আনতে গেল। প্রথম দেখাতে তোমায় নিয়ে এলো। তুমি ও বাধা না দিয়ে চলে এলে। বিয়ের প্রস্তাব দিলো আর সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলে। যেন সবটাআআআ পরিকল্পিতওওওওও।”
সুর ধরে বলল সুনেহেরা। ফের মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে বলল
“তোমার বিষয়টাও তো দুইয়ে দুইয়ে চার মিলতে পারে তাই না?”
গত পর্বে তোমাদের রেসপন্স সত্যিই অসাধারণ ছিলো 😽। তোমরা এমনই থেকো প্লিজ 🥹🫶। আর কেমন লাগলো বলিও হুমম।
যারা গল্প হারিয়ে ফেলে বিভিন্ন গ্রুপে লিংক চেয়ে পোস্ট দেন তাদের বলি 🥲। আমার পেইজ টা ফলো করে রাখুন। আর হারাবে না গল্প। বুঝলেন?
আমাদের গ্রুপে কনটেস্ট চলছে। সে নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত আমি এবং আমার মডারেটর রা। কাওকে ইনবক্সে রিপ্লাই দিতে পারছি না তাই 🥹।
সুন্দর একটা কমেন্ট করিও হুমম 😽🫶
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৯
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৩
-
নূর এ সাহাবাদ বিয়ে স্পেশাল পর্ব
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১২