নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব- ১১
সাহাবাদ যেন আজ উৎসবের রঙে ভেসে গেছে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের প্রতিটি পথে পথে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। পুরনো ইটের রাস্তা, বাজারের মোড়, পুকুরঘাট, এমনকি দূরের গ্রামগুলোতেও আজ একটাই আলোচনা জমিদার পুত্র বাইজিদের বিয়ে।
প্রাসাদের বিশাল ফটকের সামনে সারি সারি করে দাঁড়িয়ে আছে জমিদারের সৈন্য আর রক্ষীরা। সবার গায়ে একই রকম গাঢ় সবুজ পোশাক, কোমরে তলোয়ার ঝুলছে। কিন্তু আজ তাদের মুখেও কঠোরতার বদলে এক ধরনের উচ্ছ্বাস। বড় বড় বাঁশের ঝুড়ি আর কাঠের বাক্স ভর্তি করে আনা হয়েছে খেজুর আর নানা রকম মিষ্টি।
কেউ হাঁক দিচ্ছে,
“শাহজাদার বিবাহের খুশিতে মিষ্টি নিন খেজুর নিন!”
তারপর একে একে লোকজনের হাতে তুলে দিচ্ছে। শিশুরা দৌড়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, চোখে তাদের অপার আনন্দ। বয়স্করা হাসিমুখে দোয়া করছে। কেউ বলছে,
“আল্লাহ জমিদার পুত্রকে সুখে রাখুক।”
কেউ আবার মিষ্টি হাতে নিয়ে পাশের জনকে বলছে,
“দেখছো? বিয়ের এখনো চার দিন বাকি, তবুও এমন উৎসব!”
বাজারের ভেতর দিয়ে কয়েকজন রক্ষী ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে। ঘোড়ার দুই পাশে ঝুলছে বড় বড় ঝুড়ি। তারা থেমে থেমে পথচারীদের মাঝে খেজুর আর সন্দেশ বিলিয়ে দিচ্ছে। কোথাও আবার মাটির থালায় সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে মিষ্টি, যেন কেউ বাদ না পড়ে।
মাঝে মাঝে ঢোলের শব্দও শোনা যাচ্ছে দূর থেকে। গ্রামের ছেলেরা আনন্দে চিৎকার করছে, মেয়েরা পর্দার আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে এই উৎসবের দৃশ্য দেখছে।
আর এই সব কোলাহল, আনন্দ আর উল্লাসের মাঝখানে সাহাবাদ প্রাসাদ যেন আরো বেশি গম্ভীর আর রাজকীয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রাসাদের পঞ্চম তলার প্রশস্ত ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ।
গোসল সেরে সদ্য পোশাক পরেছে সে। গায়ে গাঢ় কালো পাঞ্জাবি, যার বুকের কাছে সূক্ষ্ম রুপালি কাজ করা। কালো কাপড়ের সঙ্গে তার উজ্জ্বল ফর্সা ত্বক আর সবুজ চোখ যেন আরও বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। ভেজা চুলগুলো এখনো একটু এলোমেলো, কয়েকটি গোছা কপালের ওপর এসে পড়েছে।
ব্যালকনির পাথরের রেলিংয়ে এক হাত রেখে সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। নিচে তার রাজ্য আনন্দে মেতে উঠেছে। মানুষের ভিড়, হাসির শব্দ, মিষ্টির বাক্স নিয়ে দৌড়ে বেড়ানো রক্ষীরা, সব কিছুই তার চোখে পড়ছে স্পষ্ট করে।
বাইজিদের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল একটুখানি হাসি। এমন হাসি, যা খুব কম মানুষই তার মুখে দেখতে পায়। কারণ সাহাবাদের লোকেরা জানে, জমিদার পুত্র বাইজিদ সাধারণত কঠোর স্বভাবের। তার চোখে থাকে শীতল দৃঢ়তা। কিন্তু আজ যেন সেই কঠোরতার ভেতর দিয়ে একটু নরম আলো বেরিয়ে আসছে।
সে দূরে তাকিয়ে দেখল, কয়েকটা ছোট ছেলে মিষ্টির থালা হাতে নিয়ে একে অপরকে ধাক্কাধাক্কি করছে। একজন পড়ে যেতে যেতেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
দৃশ্যটা দেখে বাইজিদের চোখে এক মুহূর্তের জন্য শিশুসুলভ আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল। চার দিন পর তার বিয়ে। এই রাজ্যের প্রতিটি মানুষ যেন সেই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছে।
বাতাসে আজ অন্য রকম গন্ধ খেজুরের মিষ্টি গন্ধ, তাজা মিষ্টির সুবাস, আর মানুষের আনন্দের উষ্ণতা মিশে আছে তাতে।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাইজিদ গভীরভাবে একবার পুরো রাজ্যটার দিকে তাকাল।তার রাজ্য। তার মানুষ। নিচে উৎসবের ঢেউ ক্রমশ আরও ছড়িয়ে পড়ছে। সৈন্যরা এখনো মিষ্টি আর খেজুর বিলিয়ে যাচ্ছে, মানুষের মুখে হাসি বাড়ছেই।
আর উপরে দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদ নীরবে সেই আনন্দ দেখছে, মুখে তৃপ্তির ছাপ নিয়ে।
যেন এই মুহূর্তে সাহাবাদের সমস্ত সুখ-আনন্দ এসে জমা হয়েছে তার সেই শান্ত, গম্ভীর সাহাবাদ প্রাসাদ আজ যেন নতুন করে জেগে উঠছে।
পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল প্রাসাদটা দূর থেকে দেখলেই মনে হয় যেন মেঘের রাজ্যে কোনো রাজ্যের দরজা খুলে আছে। চারপাশে কুয়াশা আর মেঘের স্তর ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। নিচের দিক থেকে একের পর এক জলপ্রপাত গড়িয়ে পড়ছে, সেই পানির শব্দ যেন প্রাসাদের পুরোনো পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে এক অদ্ভুত গম্ভীর সুর তৈরি করছে।
এই বিশাল প্রাসাদটাকেই এখন সাজানো হচ্ছে জমিদার পুত্র বাইজিদের বিয়ের জন্য।
প্রাসাদের দীর্ঘ সিঁড়িগুলোতে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে সাজসজ্জার কাজ। কয়েকজন কর্মচারী বড় বড় পিতলের প্রদীপ এনে সিঁড়ির দুই পাশে সারি করে বসিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যা নামলে যখন সেগুলোতে আগুন জ্বলবে, তখন পুরো পথটা সোনালি আলোয় ভরে উঠবে। কিন্তু এ প্রাসাদে যে রাতে আগুন জ্বলা নিষেধ।
উপরে বিশাল খিলানওয়ালা দরজার সামনে কয়েকজন কারিগর দাঁড়িয়ে আছে। তারা লাল, সবুজ আর সোনালি রঙের কাপড় ঝুলিয়ে দিচ্ছে খিলানের ওপর। বাতাসে কাপড়গুলো দুলে উঠছে, যেন প্রাসাদ নিজেই আনন্দে নিশ্বাস নিচ্ছে। আরও কিছু লোক বড় বড় ফুলের ঝুড়ি নিয়ে এসেছে।
তাজা জুঁই, রজনীগন্ধা, গাঁদা আর গোলাপের মালা বানানো হচ্ছে দ্রুত হাতে। সেই মালাগুলো একে একে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে বারান্দার রেলিংয়ে, পাথরের স্তম্ভে, আর প্রাসাদের দীর্ঘ করিডরের প্রবেশপথে। ফুলের গন্ধ ধীরে ধীরে পুরো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাথরের এই গম্ভীর প্রাসাদটা হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
বড় বড় ব্যালকনিগুলোতেও চলছে সাজসজ্জা। কয়েকজন দাসী হাতে করে রঙিন কাপড় নিয়ে এসে রেলিংয়ে জড়িয়ে দিচ্ছে। কেউ আবার পিতলের বড় লণ্ঠন ঝুলিয়ে দিচ্ছে, যেগুলো রাতে জ্বলে উঠলে পুরো পাহাড়টাই যেন আলোয় ভাসবে।
নিচের আঙিনায় কয়েকজন সৈন্য দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, আর তাদের পাশ দিয়েই কর্মচারীরা দৌড়াদৌড়ি করে সাজানোর জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে।
প্রাসাদের ভেতরের দিক থেকেও ভেসে আসছে ব্যস্ততার শব্দ। কোথাও কাঠের মাচা বেঁধে ঝাড়বাতি পরিষ্কার করা হচ্ছে, কোথাও আবার পুরোনো দেয়াল ধুয়ে মুছে চকচকে করা হচ্ছে। দাসীরা তামার বড় বড় থালা পালিশ করছে, যেন বিয়ের দিনে সব কিছু ঝকঝকে থাকে।
আর সব কিছুর ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে হালকা কুয়াশা।
মাঝে মাঝে সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে এসে প্রাসাদের দেয়ালে পড়ছে। তখন সেই পুরোনো পাথরগুলো সোনালি রঙে ঝলমল করে উঠছে, যেন শত শত বছর আগের গৌরব আবার ফিরে এসেছে।
দূর থেকে জলপ্রপাতের ফোঁটা বাতাসে মিশে এসে ঠান্ডা আর্দ্রতা ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে।
এই বিশাল, রহস্যময় আর গম্ভীর সাহাবাদ প্রাসাদ আজ এক অন্য রূপে সেজে উঠছে।
কারণ চার দিন পর এখানেই হবে সাহাবাদের সবচেয়ে বড় আয়োজন। যা আজ ওবদি হয় নি।
জমিদার পুত্রের বিবাহ বলে কথা।
সাহাবাদ প্রাসাদের অন্তঃপুরের বড় কক্ষটা আজ যেন অন্যরকম আলোয় ভরে উঠেছে। উঁচু ছাদের ঝাড়বাতি থেকে নরম সোনালি আলো ঝরে পড়ছে চারদিকে। মেঝেতে লাল কারুকাজ করা গালিচা বিছানো, আর তার মাঝখানে রাখা এক বড় নিমকাঠের পিঁড়ি। পিঁড়ির ওপর মখমলের কাপড় বিছিয়ে তার উপর সাজানো আছে সারি সারি স্বর্ণের গয়নার বাক্স।
বাক্সগুলো একে একে খুলতেই ঘর ভরে উঠছে সোনার ঝলমলে আলোয়। মোটা নকশা করা চুড়ি, ভারি হার, বড় নথ, কানের ঝুমকা, কোমরবন্ধনী সবকিছুই এমন ভারি যে একেকটা যেন ছোটখাটো ধনভান্ডার। পিঁড়ির একপাশে মাথা নিচু করে বসে আছে মেহেরুন্নেসা। গায়ে হালকা রঙের বোরখা, মাথায় টানা ওড়না। অন্দরে পুরুষ নেই বলে মুখটা খোলাই আছে। মুখটা শান্ত, কিন্তু তার চোখের গভীরে যেন এক অদ্ভুত স্থিরতা। সিমরান এর পলক পড়ছে না মেহের এর রুপ থেকে।
তার সামনে বসে আছে জমিদার গিন্নি মারজান। চোখে সেই চেনা কুটিল ঝিলিক। মারজানের পাশে বসে আছে সিমরান। চুপচাপ, কিন্তু চোখে অস্থিরতা। আর একটু দূরে বসে রত্নপ্রভা একটার পর একটা গয়নার বাক্স খুলে দেখাচ্ছে। মেহের এর সাথে কথা বলার ফুরসত ই হয়ে উঠছে না তার।
রত্নপ্রভা একটা বড় বাক্স খুলে ভেতর থেকে এক মোটা স্বর্ণের হার তুলে ধরল। হারটা এমন ভারি যে তুলতেই তার হাত একটু নড়ে উঠল। সে মুগ্ধ হয়ে বলল,
“দেখো তো মেহের, এই হারটা। পুরোটা খাঁটি সোনা। কত ভারি বুঝতে পারছ?
মেহেরুন্নেসা ধীরে মাথা তুলল। হারটার দিকে একবার তাকাল, তারপর মৃদু স্বরে বলল,
“হুম”।
মারজান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল।
সুন্দর তো হবেই। সাহাবাদ রাজ্যের জমিদার পুত্রের জন্য বানানো।যার তার গলায় অবশ্য মানাবে না। তুমি বরং অন্য কিছু দেখো রত্না।”
কথাটা বলেই সে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল সিমরানের দিকে। সিমরান কিছু বলল না। সুনেহেরা সিল্কের একটা লম্বা ঘাগড়া আর অনেকটা দেখতে ছেলেদের শার্টের মত কিন্ত কোমল আর কর্লার ছাড়া ছোট জামা পরেছে। যেনো কোনো বিদেশি নারী। গায়ে ওড়না নেই। সোনালি চুল গুলো ঝলমল করছে। বড় ঘের ওয়ালা ঘাগড়া টা ছড়িয়ে ধপ করে বসলো মারজান আর মেহের এর মাঝখানে। মারজান এর হাত থেকে গয়না টা নিয়ে বলল
“এটা ওকে না মানালে কাওকেই মানাবে না আম্মা।”
বলেই হিজাবের ওপর দিয়েই মেহের এর গলায় পড়ালো হার টা। গা জ্বালানো একটা হাসি দিয়ে বলল
“এই তো সুন্দর মানিয়েছে। ভাবি হলো রুপে গুণে সম্পূর্ণা। এটাকে ইংরেজি তে বলে পারফেক্ট। তাই না সিমরান”
সিমরান জোর পূর্বক একটু হাসি টেনে বলল
“এখনো তো বিয়ে হয় নি সুনেহেরা। আগেই ভাবি বলছো দেখি”
সুনেহেরা হাসলো। ভ্রু উঁচু করে মুখটা সিমরান এর দিকে একটু বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল
“জ্বলে?”
রত্নপ্রভা এবার আরেকটা বাক্স খুলল। ভেতর থেকে বের হলো মোটা নকশা করা দুটো স্বর্ণের বালা।
“এই বালাগুলো দেখো মেহের, তোমার হাতে দিলে খুব মানাবে”
সে বালাগুলো মেহেরুন্নেসার সামনে ধরে বলল,
“হাতটা একটু দাও তো”
মেহেরুন্নেসা ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল। রত্নপ্রভা বালা দুটো তার কবজির কাছে ধরতেই সোনার আলোয় হাতটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মারজান তখন হিংসাত্মক দৃষ্টিতে দেখলো মেহের এর হাত খানা। তার গায়ের রঙের কাছে স্বর্ণ কেই নেহাৎ ফিকে মনে হচ্ছে।
সুনেহেরার ঠোঁটে তির্যক হাসি।
“কারো কারো হাতে গয়না নিজেই জায়গা খুঁজে নেয়। আর কারো হাতে দিলেও ঠিক মানাতে চায় না।”
সিমরানের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। খুব ভালো করেই বুঝলো ঠেস টা কাকে মেরেছে সুনেহেরা।
সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“নিশ্চয়ই”
মারজান যেন কথাটা শুনে আর সময় নিলো না সেখানে। উঠে গেল চট করে। একজন রক্ষী এসে খবর দিলো রত্নপ্রভা কে। জমিদার বাবু ডাকছে। সেও চলে গেলো।
সুনেহেরা আরেকটা বাক্স খুলে ভেতর থেকে একটা ভারি কোমরবন্ধ তুলে নিল। কোমরবন্ধে সূক্ষ্ম কারুকাজ, মাঝখানে ছোট ছোট ঝুল।
মারজান সেটা হাতে নিয়ে বলল,
“এইটা কিন্তু খুব বিশেষ জিনিস। সাহাবাদ প্রাসাদের বউদের জন্যই বানানো।
তারপর সিমরানের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“সবাই তো আর এই বাড়ির বউ হতে পারে না, তাই না?”
মেহেরুন্নেসার কাঁধে অল্প একটু ধাক্কা দিয়ে দুষ্টুমি করে বলল
“আমি তো ভাবছি বাসর রাতে ভাইজান তোমার কোমরে এটা দেখলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে কি করে”
মেহেরুন্নেসা লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো যেন। মাথা নিচু করতে করতে থুতনি গিয়ে ঠেকলো বুকে।
ঘরের বাতাস হঠাৎ একটু থমথমে হয়ে উঠল।
সিমরান যেন অস্বস্তি ঢাকতে দ্রুত আরেকটা গয়না বের করল। একজোড়া বড় ঝুমকা। হাতে নিয়ে বলল,
“এই দুলটা দেখো সুনেহেরা। ওকে খুব সুন্দর লাগবে।
সুনেহেরা একের পর এক বলছে কোনটা নিকাহের সময় পরবে, কোনটা বিয়ের রাতে, কোনটা অতিথিদের সামনে উঠবে। মেহেরুন্নেসা তখনও শান্তভাবে বসে আছে। তার মাথা নিচু, মুখে অদ্ভুত স্থিরতা। যেন এত গয়নার ঝলক, এত আয়োজন এসব তার ভেতরের কোনো ঢেউই তুলতে পারছে না।
কিন্তু তার সামনে বসে থাকা সিমরানের বুকের ভেতর তখন আগুন জ্বলছে। সুনেহেরার বলা কথাটা মনে আসতেই সিমরানের আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো হয়ে গেল।
তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে সেই ভারি হার, মোটা বালা, কোমরবন্ধের দিকে। হঠাৎ তার চোখ স্থির হয়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন বাস্তব ঘরটা মিলিয়ে গেল তার চোখের সামনে। তার বদলে ভেসে উঠল এক অন্য দৃশ্য। সে নিজেকে দেখতে পেল বড় এক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
তার গায়ে গাঢ় লাল বিয়ের শাড়ি। মাথায় ঝুলছে লম্বা ওড়না। গলায় সেই ভারি স্বর্ণের হার। হাতে হাতভর্তি মোটা বালা। কানে বড় ঝুমকা দুলছে।
কোমরে সেই সোনার কোমরবন্ধ। সে আয়নার সামনে একটু ঘুরে দাঁড়াল।
গয়নার মৃদু শব্দে যেন ঘরটা ভরে উঠল। তার বুক ধুকপুক করছে। আজ তার বিয়ে। সে বাসর ঘরে বসে আছে। ঘরটা মৃদু আলোয় ভরা। বিছানার চারপাশে সাদা ফুল আর গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। মাঝখানে সে লাজুক মুখে বসে।
তখনই কক্ষে প্রবেশ করলো বাইজিদ।
কালো পাঞ্জাবি পরা। তার সেই আকর্ষণীয় সেই সবুজ চোখ দুটো যেন অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে। কাছাকাছি আসতেই সিমরান সালাম করতে গেলো। কিন্ত বাইজিদ আটকে দিলো।
তার চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল সিমরানের উপর।
কয়েক মুহূর্ত যেন সে নড়ল না। তারপর ধীরে ধীরে কাছে টানলো সিমরান কে। সিমরান এর চোখে তখন বিস্ময় আর মুগ্ধতার মিশ্র আলো।
বাইজিদ আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ফিসফিস করে বলছে
“তোমাকে আজ দেখে মনে হচ্ছে সদ্য এক গোলাপ ফুটেছে এই কক্ষে”
সিমরানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
তার বুক ভরে উঠছে এক অদ্ভুত আনন্দে।
এই তো সেই রাত, এই তো সেই মুহূর্ত। যার স্বপ্ন সে কতদিন ধরে দেখেছে।
ঠিক তখনই
“সিমরান!”
মারজানের কণ্ঠ হঠাৎ কানে বাজল। মুহূর্তেই সব ভেঙে গেল। বাসর ঘর নেই। আয়না নেই। বাইজিদের সেই মুগ্ধ দৃষ্টি নেই। আবার সেই অন্তঃপুরের ঘর। সামনে বসে আছে মেহেরুন্নেসা।
আর তার সামনে সাজানো সেই সব গয়না।
মারজান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী হলো? এমন করে তাকিয়ে আছো কেন? ডাকছি তো। এসো”
সিমরান দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। তার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা তখনো হিংসায় জ্বলছে। সে ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকাল। মেয়েটা তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে শান্ত, নির্লিপ্ত। কিন্তু সিমরানের মনে হলো
এই মেয়েটাই তার স্বপ্নের জায়গাটা কেড়ে নিয়েছে।
মনে মনে সে ঠান্ডা স্বরে ফিসফিস করে উঠল
“এই জায়গাটা, আমার হওয়ার কথা ছিল।”
সিমরান উঠে দাড়াতেই সেখানে গমগমে পায়ে আসলো বাইজিদ। তার গায়ে কালো হাতা কাটা ফতুয়া, নিচে সাদা অলিগিরি পায়জামা। মসৃণ চুলগুলো পেছনে আঁচড়ানো, আর তার সেই বিশেষ সবুজ রঙা চোখ দুটো অদ্ভুত স্থিরতায় ঘরটা পর্যবেক্ষণ করছে। হাতা কাটা পোষাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার পেটানো পুরুষালী পেশিবহুল বাহু।
অন্তঃপুরে তার এমন হঠাৎ উপস্থিতিতে ঘরের বাতাস যেন থমকে গেল। সুনেহেরা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। সিমরানও সোজা হয়ে দাড়ালো, যদিও তার চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময় স্পষ্ট। মেহেরুন্নেসা ধীরে মাথা তুলল।
ওড়নার আড়াল থেকে তার চোখ প্রথমবারের মতো গিয়ে থামল বাইজিদের মুখে। কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না। ঘরের বাতাসে যেন এক অদ্ভুত টান। বাইজিদের দৃষ্টি ঘরের চারদিকে একবার ঘুরে এসে থামল সেই মখমলের উপর রাখা সোনার গয়নাগুলোর দিকে। তারপর সেই দৃষ্টি ধীরে গিয়ে থামল মেহেরুন্নেসার উপর।
মারজান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“অন্দরে এভাবে ঢুকলে যে, বাইজিদ? না মানে এখানে মেহেরুন্নেসা আছে। ও তো পুরুষদের সামনে যায় না। তোমার জন্য ওর পর্দা ভঙ্গ হচ্ছে তো”
বাইজিদ যেন কথাটা শুনেও খুব একটা গুরুত্ব দিল না। সে ধীরে এক পা ভেতরে এগিয়ে এল।
তারপর শান্ত কন্ঠে বলল
“হবু স্ত্রী কে দেখার সম্পূর্ণ বৈধতা আছে”
তার চোখ মেহেরুন্নেসার দিকে স্থির। মেহের মাথা নিচু করে আছে। বাইজিদ তাকিয়েই বলল
“ভালো হয় যদি আপনারা একটু জায়গা টা ফাঁকা করেন। আমি তার সাথে একটু একান্তে কথা বলতে চাই”
ঘরের ভেতর তখন সেই নিঃশব্দ উত্তেজনা ঝুলে পড়লো যেন । সিমরান চুপচাপ হাঁটা দিলো মারজান কে নিয়ে। মারজান ও ভেংচি কেটে চলে গেলো সিমরান এর সাথে।
সবাই কে যেতে দেখে মেহের এর বুকের ভেতর আবার অদ্ভুতভাবে ধুকপুক শুরু হয়ে গেছে। সুনেহেরা বাইজিদ এর সামনে কোমরে হাত দিয়ে বলল
“ভাবি কিন্তু একদম, মিস পারফেক্ট”
বাইজিদ চোখ সরু করে মাথায় গাট্টা মেরে বলল
“আজকাল পাঠাগারে খুব সময় দিচ্ছিস মনে হচ্ছে। তা ইংরেজি গুলো কে বোঝালো?”
সুনেহেরা চোখ মেরে বলল
“সিক্রেট”
বাইজিদ আরেকবার গাট্টা মারতে নিলেই দৌড়ে পালালো। এই একটা মানুষের সাথে মন খুলে কথা বলে বাইজিদ। সুনেহেরা যাওয়ার সময় হাত ইশারা করলো। সাথে সাথে দাসীরা দড়ি টেনে দিয়ে অন্দরের মাঝখান টায় পর্দা নামিয়ে দিলো গোল করে। বাইজিদ এগিয়ে গিয়ে মেহের এর মুখোমুখি বসলো সেই মখমলের কার্পেটের ওপর। গালে হাত ঠেকিয়ে তাকালো মেহের এর দিকে। চোখ আপনা আপনি সরু হয়ে আসে তার। ঘণ নেত্রপল্লব যেন ঝাপটা দিতে ভুলে গেছে। এই রুপের সামনে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখ ঝলসে যাবে হয়তো। মেহের অস্বস্তি তে নড়েচড়ে উঠলো।
বাইজিদ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো মেহের এর অস্বস্তি দেখে। গম্ভীর হাস্কি স্বরে বলল
“আজ আর কিছু বললাম না। তবে অনেক কিছু বলার আছে। তবে সেইদিন বলবো, যেদিন আমার নিজ কক্ষে তোমাকে একান্তে পাবো। সেদিন আদরের সাথে বলবো সব কথা । আজকের মত তোলা রইলো কথা গুলো। জানিনা মাঝের তিনটা দিন কি করে কাটবে আমার।”
মেহের এর শরীরে কাটা দিয় উঠলো বাইজিদ এর মন কথায়। অদ্ভুত এক অনুভূতি তে আড়ষ্ট হলো তার কোমল শরীর। কাপা কাপা কন্ঠই বলল
“কেনো?”
“তোমার জন্যে। কী করে থাকবো বলোতো এই তিনটা দিন, তিনটা রাত।”
মেহের এর মনে হঠাৎ একটু সাহসের উদয় হলো। সাহস করে বলল
“এতদিন কি করে থেকেছেন?”
বাইজিদ অবিলম্বে উত্তর দিল
“তখন তো তোমায় দেখিনি। তোমাকে দেখার পর থেকে আর ঘুম হচ্ছে না। কবে তোমাকে নিজের করে পাবো সেই যন্ত্রণায়। অবশ্য যেদিন আমার ঘরে পাব তোমায়, সেই রাতেও ঘুম হবে না আমার। গোটা একটা রাত দেখবো তোমায়। মনে ভরে দেখবো।”
লজ্জায় যেন মিশে যাচ্ছে মেহেরুন্নেসা। অসম্ভব গতিতে আপনা আপনি কাপছে তার জড়ো করা দুই হাত। বাইজিদ সোনার বালা পরা হাত দুটোর দিকে তাকাতেই শুকনো ঢোক গিলল। হাত বাড়ালো তার পোড়ার দাগ যুক্ত হাত দুটির দিকে।
কেমন হলো? তোমরা অনেকেই বলতেছো গল্প কি রেগুলার দিব নাকি এক দিন পর পর। সেক্ষেত্রে আমি বলবো আমার ইচ্ছা একদিন পর পর ই দেওয়ার কারণ গল্পটা অনেক বড় দিই। তবে তোমরা যদি ৩k রিয়্যাক্ট পূরণ করতে পারো তবে রোজ দিব কথা দিলাম। বুঝেন ই তো কত কষ্ট করে লিখি আপনাদের জন্য। আর কেমন হলো অবশ্যই বলিয়েন।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৩
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৬ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ