নিষিদ্ধ_রংমহল 🥀
পর্ব_২৬
লেখকঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
[ বি:দ্রঃ গল্প না হারাতে আজকের পর্ব প্রোফাইলে শেয়ার করে রাখুন। কিংবা ফলো করুন লেখকের পেইজ – Atia Adiba – আতিয়া আদিবা ]
ঊষার প্রথম রক্তিম আলোকচ্ছটা যখন কারুকার্যখচিত ঝরোকা ভেদ করে সুলতানার সুসজ্জিত কক্ষে এসে পড়ল, তখনও কক্ষের বায়ুমণ্ডলে এক গুমোট নিস্তব্ধতা বিরাজমান।
জানালার বাইরে অঝোর ধারায় ঝরে যাওয়া বৃষ্টির রেশ তখনো কাটেনি। গাছের পল্লব হতে বৃষ্টির জলবিন্দু টুপটুপ শব্দে সিক্ত মৃত্তিকায় আছড়ে পড়ছে। চারপাশের সিক্ত বাতাসের সাথে মিশে আছে সোঁদা মাটির এক তীব্র ঘ্রাণ।
সুলতানা দর্পণের সম্মুখে বসে নিজের সুদীর্ঘ কেশবিন্যাসে মগ্ন ছিলেন। কক্ষের সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়া আর দামী আতরের উগ্র সুবাস এক রাজকীয় আভিজাত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
সুলতানার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে এক সুগভীর গাম্ভীর্য। চাহনিতে গূঢ় বুদ্ধির ছাপ বিদ্যমান। তিনি কেবল রূপবতী নন। বরং এক প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী, যার হৃদয়ে এই গজনবী সাম্রাজ্যের অধিশ্বরী হওয়ার লালসার দেখা মিলছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, কক্ষের ভারী রেশমী যবনিকা সরিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে এক অচেনা নারীমূর্তি ভেতরে প্রবেশ করল। সুলতানা দর্পণের প্রতিবিম্বে আগন্তুককে অবলোকন করলেন। নারীটির পরনে সাধারণ সজ্জা থাকলেও তার চক্ষুদ্বয়ে এক প্রকার ধূর্ততা আর অস্থিরতার সংমিশ্রণ রয়েছে।
সুলতানা হাতের রত্নখচিত চিরুনিটি শ্বেতপাথরের টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে অত্যন্ত ধীরপদে ঘুরে দাড়ালেন। তার ভুরু যুগল কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল। গম্ভীর স্বরে তিনি প্রশ্ন করলেন,
- আপনি কে? কার অনুমতিতে গজনবী মহলের ভাবী বেগমের কক্ষে বিনা ঘোষণায় প্রবেশ করেছেন? এ মহলের কঠোর নিয়মকানুন কি আপনার অজ্ঞাত? প্রহরীরা কি তবে আজ সারারাতের বৃষ্টির ক্লান্তিতে নিদ্রামগ্ন যে কেউ একজন এভাবে অন্দরমহলে প্রবেশ করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন?
আগন্তুক নারীটি অত্যন্ত বিনম্রভাবে কুর্নিশ জানিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়ে ললাট স্পর্শ করল। সে অতিশয় নিচু ও বিনীত স্বরে উত্তর দিল,
- মার্জনা করবেন এই অধমকে। আমি গজনবী মহলের অতি নগণ্য একজন বাঈজী। আমার নাম সিমরান। বাঈজী মহলের ধূলিকণায় আমার বাস হলেও গজনবী বংশের প্রতি আমার ভক্তি প্রশ্নাতীত। আমি এখানে কোনো যাচনা নিয়ে আসিনি, এসেছি এক নিদারুণ সত্যের সংবাদ দিতে যা আপনার ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকাকে চিরতরে ম্লান করে দিতে পারে।
সুলতানা কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন। তিনি সিমরানকে ইতিপূর্বে কখনো দেখেননি, তার নিকট কোনো বাঈজীর সরাসরি আগমনও অভাবনীয়। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সিমরানের মুখাবয়বের ওপর স্থির রেখে তিনি পুনশ্চ শুধালেন,
- বাঈজী মহলের এক নর্তকী আজ মহলের ভাবী বেগমকে সত্যের পাঠ দিতে এসেছেন? বড়ই বিচিত্র! আপনি কি জানেন না যে একজন বাঈজীর পক্ষে অন্দরমহলের ভাবি বেগমের কক্ষে প্রবেশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ? কেনই বা আপনি আজ নিজের সীমা লঙ্ঘন করে এখানে উপস্থিত হয়েছেন? কেনই বা আপনি এই গজনবী এস্টেটের মঙ্গল চিন্তায় এত ব্যাকুল হয়ে উঠলেন? আপনাদের তো কেবল সুর আর নৃত্যের মোহে থাকার কথা। তাই নয় কি?
সিমরান এক মুহূর্ত সময় নিয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে আরও আর্দ্র করে তুলল। সে জানে, সুলতানার মনে ঈর্ষার বিষ ঢোকানোই হলো এখন তার প্রধান কাজ। অতিশয় ধূর্ততার সাথে সে বলল,
- ভাবি বেগম সাহেবা, আপনি এই গজনবী এস্টেটের হবু অধিশ্বরী। আপনার সম্মানহানি মানেই এই বিশাল জমিদারি ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত। আমি বাঈজী হলেও আমার রক্তে এই মহলের অন্ন বহমান। আমি নিজের চক্ষে যা দেখেছি এবং যা শুনেছি, তা যদি আপনার অগোচরে থাকে, তবে অচিরেই আপনার এই স্বপ্নের সিংহাসন এক বাঈজীর পায়ের নিচে ধূলিসাৎ হবে যে! জমিদারপুত্র তাইমুর গজনবী আজ রাতের অন্ধকারে যা করেছেন তা জানলে আপনি এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারবেন না।
সুলতানার চক্ষুদ্বয় সন্দেহে সংকুচিত হয়ে এল। তিনি এক পা এগিয়ে এসে কিছুটা চাপা কণ্ঠে বললেন,
- হেঁয়ালি রাখুন সিমরান! স্পষ্ট করে বলুন, আপনি কী বলতে চাইছেন? জমিদারপুত্র নাম উচ্চারণে আপনার কণ্ঠে এত স্পর্ধা কেন? গত রজনীতে ঠিক কী ঘটেছে যার জন্য আপনি এত প্রত্যয় নিয়ে কথা বলছেন?
সিমরান তখন গত রজনীর সেই রুদ্ধশ্বাস ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করতে শুরু করল। সে অত্যন্ত গূঢ় স্বরে বলল,
- গত রজনীতে যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছিল, তখন হুজুর তাইমুর গজনবী অশ্ব ছুটিয়ে আপনার পিতার কুঠিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। হুজুর সিকান্দার গজনবী বাঈজী হেমাঙ্গিনীকে উপহার হিসেবে উনার নিকট পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু জমিদারপুত্র সেখানে গিয়ে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তিনি আপনার পিতাকে বাণিজ্যের মিথ্যা জালে ফেলে হেমাঙ্গিনীকে ছিনিয়ে এনেছেন। শুধু তাই নয়, অরণ্যের সেই অন্ধকার পথে তিনি হেমাঙ্গিনীকে পাঁজাকোলা করে নিজের অশ্বের পিঠে তুলেছেন। হেমাঙ্গিনী তখন তার বক্ষে মুখ লুকিয়ে পরম আশ্রয়ে ছিল। তাদের সেই নিবিড় সান্নিধ্য কোনো সাধারণ মালিক আর বাঈজীর সম্পর্ক ছিল না বেগম সাহেবা।
সুলতানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সিমরানের প্রতিটি শব্দ তার কর্ণে তপ্ত সীসার ন্যায় বিঁধল।
সিমরান পুনরায় বলল,
- জমিদারপুত্র বাঈজী হেমাঙ্গিনীকে নিজের আমানত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
সিমরানের কথা শেষ হতেই সুলতানার মুখমণ্ডল ক্রোধে, অপমানে পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করল।
জানালার বাইরে সিক্ত বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ যেন তার মনের সেই অনলকে আরো দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিল। তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটি মূল্যবান স্ফটিকের সুরাপাত্র সজোরে মেঝেতে নিক্ষেপ করলেন। মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল তা।
সুলতানা অত্যন্ত কঠিন স্বরে সিমরানকে জিজ্ঞেস করলেন,
- বাঈজী সিমরান, আপনি কি ভাবছেন এসব মিথ্যে গল্প বলে আপনি আমাকে হুজুর তাইমুর গজনবী-র বিরুদ্ধে প্ররোচিত করবেন? আপনি এক নর্তকী হয়ে কেন আজ নবাবজাদার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন? কেনই বা আমি আপনাকে বিশ্বাস করব?
সিমরান এবার মোক্ষম তাসটি ফেলল। সে করুন স্বরে বলল,
- আমি ষড়যন্ত্র করছি না, সাহেবা। আমি কেবল আপনাকে সতর্ক করছি। আমি আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। আমি চাই না গজনবী মহলের প্রকৃত বেগম কোনোদিন এক বাঈজীর কাছে নিজের গৌরব হারাক। আমার কথা মিথ্যে হলে আপনি নিজেই পরখ করে দেখুন। তিনি কি আপনাকে সত্যিই সেই মর্যাদা দিচ্ছেন যা আপনার প্রাপ্য?
সুলতানা অনেকক্ষণ স্থির হয়ে জানলার বাইরে সিক্ত আঙিনার দিকে তাকিয়ে রইলেন। পাতায় পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির জল তখনো চুইয়ে পড়ছে। তিনি অনুধাবন করলেন যে সিমরান সামান্য বাঈজী হতে পারে, তবে তার দেওয়া তথ্যগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। সুলতানা ওষ্ঠাধরে এক বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে মনে মনে ভাবলেন-
- তাইমুর, আপনি যদি ভেবে থাকেন বুদ্ধির চালে আপনি এই রণাঙ্গনে বিজয়মাল্য লাভ করবেন, তবে তা আপনার ঘোরতর ভ্রম। যে হেমাঙ্গিনীর রূপের মোহ আপনাকে আচ্ছন্ন করেছে, আমি সেই রূপকেই আপনার চোখের সামনে কলঙ্কিত করব। তাকে আমি এমন সব হীন কাজে লিপ্ত করব, যাতে তার প্রতি আপনার সমস্ত শ্রদ্ধা আর প্রেম ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়।
সুলতানা মনস্থির করলেন। তিনি সরাসরি তাইমুরের বিরোধিতা করবেন না। বরং তিনি জমিদারপুত্রের সকল সিদ্ধান্তে অতিশয় প্রীত হবার অভিনয় করবেন।
সিমরানের প্রস্থানের পর সুলতানা দর্পণের সম্মুখে পুনরাত স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। তার ওষ্ঠাধরে এক শীতল হাসি ঝুলল। সে অত্যন্ত ধীরপদে তার বস্ত্রের আঁচলটি কাঁধের ওপর গুছিয়ে নিলেন।
তিনি স্থির করলেন সরাসরি জমিদার সিকান্দার গজনবীর খাস কামরায় উপস্থিত হবেন। কেননা, গত রজনীর সেই দুঃসাহসিক ঘটনার পর জমিদার মশাইয়ের চিত্ত নিশ্চয়ই বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে। আর সেই ক্ষোভের অনলে একটু স্নেহের প্রলেপ দিয়ে নিজের আসনটি আরও সুদৃঢ় করাই হলো সুলতানার বর্তমান অভিসন্ধি।
জমিদার সিকান্দার গজনবী তার প্রশস্ত কক্ষে এক মখমলি আরামদায়ক কেদারায় আসীন ছিলেন। গত রাতে তাইমুরের সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং মনসুর আলীর নিকট হতে বাঈজীকে ছিনিয়ে আনার সংবাদটি তার আভিজাত্যে চরম আঘাত করেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দাউদ অত্যন্ত বিনম্রভাবে সংবাদ দিল যে সুলতানা বিবি হুজুরের সহিত সাক্ষাতের অভিলাষী।
সিকান্দার গজনবী হুক্কার নলটি সরিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। তার ললাটে চিন্তার রেখা প্রকট। তিনি মনে মনে এক প্রকার কুণ্ঠা অনুভব করলেন। কারণ সুলতানার পিতার নিকট পাঠানো উপহার তারই পুত্র মাঝপথ হতে লুণ্ঠন করে এনেছেন। এ বিষয়ে যদি সুলতানা কিছু জানতে চান! কি উত্তর দিবেন তিনি?
সুলতানা অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর চরণে কক্ষে প্রবেশ করে অবনত মস্তকে কুর্নিশ জানালেন। তার চোখের চাহনিতে কোনো অভিযোগের লেশমাত্র নেই, বরং এক অভাবনীয় প্রশান্তি বিরাজমান।
সিকান্দার গজনবী কিঞ্চিৎ অপরাধবোধ আর গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বরে নিজে থেকেই বললেন,
- আসুন মা, সুলতানা। আমি জানি আপনি কেন আজ এই অসময়ে এখানে এসেছেন। গজনবী বংশের অধিশ্বর হয়েও আজ আমি আপনার নিকট অত্যন্ত লজ্জিত। আপনার পিতাকে আমি যে উপহার সসম্মানে সোপর্দ করেছিলাম, আমার বড়পুত্র তাইমুর তা অবলীলায় ছিনিয়ে এনেছেন। এটি কেবল আপনার পিতার অপমান নয় মা, আপনার মতো এক মহীয়সী নারীর প্রতিও চরম অবজ্ঞা। জমিদার হয়েও আমি আজ আমার পুত্রের এই অবাধ্যতার জন্য আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থী।
সুলতানা অত্যন্ত ধীরপদে জমিদারের সন্নিকটে এগিয়ে গেলেন। তার মুখমণ্ডলে এক স্নিগ্ধ ও পবিত্র হাসি ফুটে উঠল, যা আসলে এক সুগভীর ষড়যন্ত্রের সূক্ষ্ম আবরণ মাত্র। তিনি নত মস্তকে অতিশয় শান্ত কণ্ঠে বললেন,
- হুজুর, আপনি কেন এই অধমের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন? আপনার স্থান এই বিশাল গজনবী এস্টেটের উচ্চাসনে, আর আমার স্থান কেবলমাত্র আপনার চরণে। এছাড়া হুজুর তাইমুর গজনবী যা করেছেন, তাতে আমি বিন্দুমাত্র মর্মাহত নই। বরং আমি তার এই দূরদর্শিতা এবং বংশমর্যাদার প্রতি প্রগাঢ় মমতা দেখে মনে মনে গর্বিত হয়েছি। তিনি ভুল কিছু করেননি। তিনি তো কেবল গজনবী মহলের লুপ্ত হতে বসা মান রক্ষা করেছেন!
সিকান্দার গজনবী বিস্ময়ে চক্ষু বড় বড় করে তাকালেন। তিনি আশা করেছিলেন সুলতানা হয়তো অশ্রুসিক্ত নয়নে নালিশের ডালি সাজিয়ে আসবেন। কিন্তু এই অভাবনীয় প্রতিক্রিয়ায় তিনি হতবাক হলেন। কৌতূহলী হয়ে শুধালেন,
- মান রক্ষা? মা, আপনি কি অনুধাবন করতে পারছেন না যে ওই বাঈজীকে মাঝপথ হতে ফিরিয়ে আনা মানে মনসুর আলীর সাথে চিরস্থায়ী বিবাদ সৃষ্টি করা? গজনবী বংশের আজ্ঞা লঙঘন করা কি প্রশংসনীয় হতে পারে?
সুলতানা এবার অত্যন্ত মার্জিত স্বরে বললেন,
- হুজুর, শিল্পী কেবল তার শিল্পের মাঝেই অমর। হেমাঙ্গিনী গজনবী মহলের বাঈজী মহলের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার। তাকে একজন ব্যবসায়ীর ঘরে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া মানে তো খোদ শিল্পের অবমাননা করা। লোকে ভাবত গজনবী মহলের আভিজাত্য বুঝি ফুরিয়ে গেছে, তাই তারা ঘরোয়া রত্নকেও অন্যকে বিলিয়ে দিচ্ছে। নবাবজাদা তাইমুর সম্ভবত এটাই উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি শিল্পীর মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে বিদ্রোহী প্রতিপন্ন করেছেন ঠিকই, কিন্তু আসলে তিনি আপনারই সুদীর্ঘকালের বংশমর্যাদাকে ধূলিসাৎ হওয়া হতে রক্ষা করেছেন।
সিকান্দার গজনবী হাসলেন। তিনি হুক্কার নলটি পুনরায় হাতে নিয়ে পরম তৃপ্তির সাথে ধোঁয়া ছাড়লেন। তিনি সুলতানার দিকে স্নেহার্দ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
- মা সুলতানা, আপনার এই তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধি দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত! তাইমুরও ঠিক একই যুক্তি আমার সামনে উপস্থাপন করেছিল। সে বলেছিল, হেমাঙ্গিনীকে সে আপনার ব্যক্তিগত খিদমতের জন্য অন্দরমহলে ফিরিয়ে এনেছে। সে চায় আপনি যখন এই মহলের ভাবী বেগম হবেন, তখন যেন এক শ্রেষ্ঠ শিল্পী আপনার সেবায় আর মনরঞ্জনের নিমিত্ত উপস্থিত থাকে।
সুলতানা এক মুহূর্ত থেমে জমিদারের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। তার সেই চাহনিতে প্রতিহিংসা বিদ্যমান। তবুও অত্যন্ত বিনয়সহকারে বললেন,
- হুজুর তাইমুর গজনবী যা বলেছেন, তা অবশ্যই সঠিক। তবে আমার একটি বিশেষ আরজি আছে। তিনি বাঈজী হেমাঙ্গিনীকে আমার খিদমতের জন্য আনতে চেয়েছেন, সেটি আমার প্রতি তার অগাধ বিশ্বাসের ফল। তবে আমি বাঈজী সাহেবার নিকট হতে কেবল তার শিল্পের সেই সুধাটুকুই আস্বাদন করতে চাই। আমি চাই না সে আমার সাধারণ পরিচারিকা হয়ে নিজের শিল্পী পরিচয় হারাক। কেননা, গজনবী এস্টেটের ভাবী জমিদারের ভাবী বেগম হিসেবে মহলের প্রত্যেককে, হোক সে নর্তকী কিংবা প্রহরী, যোগ্য সম্মান দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমি চাই বাঈজী সাহেবা হুজুর তাইমুর গজনবী-র ইচ্ছায় অন্দরমহলে আসুক। তবে সে যেন তার শিল্পের মর্যাদা বজায় রেখেই আমার মনরঞ্জনের খোরাক হতে পারে।
সিকান্দার গজনবী সুলতানার বিচক্ষণতায় অত্যন্ত প্রীত হলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, সুলতানার মতো এমন বুদ্ধিমতী আর আভিজাত্যবোধ সম্পন্ন মেয়েই গজনবী মহলের জন্য বিধাতার আশীর্বাদ। তিনি সুলতানার ভূয়সী প্রশংসা করে বললেন,
- আপনার এই মহানুভবতা দেখে আমি নিশ্চিত হলাম যে গজনবী মহলের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সুরক্ষিত। আপনি কেবল তাইমুরের যোগ্য অর্ধাঙ্গিনীই নন, আপনি এই এস্টেটের লক্ষ্মীস্বরূপ। আমি আজই আদেশ দিচ্ছি হেমাঙ্গিনীকে আপনার খিদমতে অন্দরমহলে প্রেরণের জন্য।
সুলতানা পুনরায় অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে কুর্নিশ জানিয়ে কক্ষ হতে বিদায় নিলেন। কিন্তু কক্ষের বাইরে আসা মাত্রই তার ওষ্ঠাধরের সেই স্নিগ্ধতা বিলীন হল। সিক্ত বাতাসের মতোই তার মন হিমশীতল হয়ে গেল।
তিনি বুঝতে পেরেছেন, তাইমুর তাকে কেবল একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু সুলতানা এবার সেই ঢালকেই শাণিত তলোয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন। তিনি হেমাঙ্গিনীকে অন্দরমহলের দাসীশালায় এমনভাবে বন্দি করবেন যেখান হতে মুক্তি পাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হবে।
এদিকে বাঈজী মহলে হেমাঙ্গিনী জানালার পাশে বসে বাইরের সেই সিক্ত আঙিনার দিকে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। অন্দরমহলের সেই আভিজাত্যের অন্তরালে তার জন্য এক মরণফাঁদ সুনিপুণভাবে পাতা হচ্ছে, এ সম্পর্কে তো সে জ্ঞাত নয়! তার হৃদয় জুড়ে গত রজনীর দৃশ্য বিচরণ করছে। তাইমুরের বলিষ্ঠ বক্ষের উষ্ণতা আর তার গম্ভীর স্বরে উচ্চারিত ‘আমানত’ শব্দটির অনুরণন শুনছে বারং বার।
গতকাল টার্গেট পূরণ হয় নি, তাই গল্প আসে নি। ৪৩০০ লাইক এবং ৬০০ কমেন্ট পূরণ করে দিবেন।❤️
উপন্যাসঃ নিষিদ্ধ রংমহল 🥀
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, নিষিদ্ধ রংমহল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল গল্পের লিংক
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৫
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২২